• Wednesday , 3 March 2021

বৈরুত বিস্ফোরণ ও লেবানন সংকট ‍

বৈরুত বিস্ফোরণ ও লেবানন সংকট ‍

জন্ম থেকেই জ্বলছে মধ্যপ্রাচের দেশ লেবানন । দেশটির বৈভ’ব ও ঐশ্বর্যের ঝিলিক ১৯৭৫-১৯৯০ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধ, বেপরোয়া দুর্নীতি ও আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে । সর্বশেষ ৪ আগস্ট ২০২০ দেশটির রাজধানী বৈরুতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা এ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে ।বৈরুত বিস্ফোরণ বৈরুত বিস্ফোরণের আদ্যোপান্ত ও দুর্দশাগ্রস্ত লেবাননের ভবিষ্যত নিয়ে আমাদের বিশেষ আয়োজন । 

বৈরুত বিস্ফোরণ 

৪ আগস্ট ২০২০ এক সময়ের ‘মধ্যপ্রাচ্যের প্যারিস’ হিসেবে খ্যাত লেবাননের রাজধানী ও আশেপাশের এলাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় । এতে অন্তত দেড় শতাধিক মানুষ নিহত ও ছয় হাজারের বেশি মানুষ আহত হন । গৃহহীন হয়ে পড়ে তিন লাখ মানুষ । ক্ষয়ক্ষতি হয় ১৫ কোটি ডলারের । শহরটির ৫,০০০ বছরের ইতিহাসে । এমন পরিস্থিতি আর কখনো তৈরি হয়নি । 

বিস্ফোরণের কারণ 

বৈরুত বিস্ফোরণের উৎস ছিল বন্দরের গুদামে ৬ বছর ধরে মজুদ থাকা ২,৭৫০ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট । এতে আগুন লেগেই বৈরুতের বিপর্যয়কর এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে বন্দরে ৪৩ মিটার বা ১৪১ ফুট গর্তের সৃষ্টি হয় । মার্কিন ভূ-পদার্থ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, এ বিস্ফোরণে ৩.৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয় ।

সমসাময়িক ইতিহাসে পারমাণবিক বোমা ছাড়া এত বড় বিস্ফোরণ দেখেনি বিশ্ব । এতে যে শকওয়েভ তৈরি হয়, তা হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার ২০-৩০% বেশি শক্তিশালী ছিল । বিস্ফোরণটি এতই শক্তিশালী ছিল যে, বৈরুত থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরের দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসেও তা অনুভূত হয়। 

বৈরুত বিস্ফোরণ-পরবর্তী লেবানন 

৪ আগষ্ট ২০২০ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট কেবল লেবাননের রাজধানী বৈরুতকেই বিধ্বস্ত করেনি, বিধ্বস্ত করেছে পুরো দেশ এবং এর সরকারকেও । বিস্ফোরণের পরপরই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিধ্বস্ত নগরী থেকে ক্রমেই বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হয় বৈরুত । হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আরব বসন্তের মতো স্লোগান দেয় ‘আল শা’ব ইউরিদ ইশকাত আল নিজাম’ (জনতা ক্ষমতাসীনের পতন চায়) ।

সরকারের পদত্যাগ 

৬ মে ২০১৮ দীর্ঘ ৯ বছর পর দেশটিতে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । নির্বাচনে ৫৩% আসনে জয়ী হয় হিজবুল্লাহ সমর্থিত প্রার্থী । কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সাদ আল হারিরি । সরকারের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভের মুখে ২৯ অক্টোবর ২০১৯ পদত্যাগ করেন তিনি । এরপর ২৯ অক্টোবর  ২০১৯ পদত্যাগ করেন তিনি । এরপর ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯ নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন বৈরুতের আমেরিকা ইউনিভার্সিটির সাবেক অধ্যাপক ও দেশটির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী হাসান দিয়াব । প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ লাভের প্রায় এক মাস পর ২১ জানুয়ারি ২০২০ তিনি নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা দেন ।

তার ২০ সদস্যের মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্যই ছিল হিজবুল্লাহ ও মিত্র দলগুলোর সদস্য । হাসান দিয়াব তার মন্ত্রিসভাকে দেশটির ইতিহাসে প্রথম সম্পূর্ণ টেকনোক্রেট সদস্য নিয়ে গঠিত বলে দাবি করেন । বৈরুত বিস্ফোরণের পর গণবিক্ষোভের মুখে ১০ আগষ্ট ২০২০ মন্ত্রিসভাসহ পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব । তবে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন না হওয়া পর্যন্ত তার সরকার তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকায় থাকবে । আটমাস বয়সি দিয়াব সরকারের পদত্যাগ আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত লেবাননকে কতটা উওরণ ঘটাতে পারবে, তাই এখন দেখার বিষয় । 

দুর্দশাগ্রস্ত লেবানন 

রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং দুর্নীতির কবলে পড়ে অর্থনৈতিকভাবও খুব একটা এগোতে পারেনি  লেবানন । দীর্ঘদিন থেকেই অর্থনৈতিকভাবে প্রায় পঙ্গু দেশটি বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ সাহায্য চরম দুর্নীতির কারণে শুকিয়ে আসছিল । প্রায় ৭০ লাখ জনসংখ্যা এ দেশে উৎপাদন প্রায় নেই বললেই চলে । মুদ্রার দরপতনের কারণে বহু লেবানিজের পক্ষে মৌলিক খাদ্যের ব্যবস্থা করাও এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে । লেবাননের মৌলিক খাদ্য চাহিদার বেশির ভাগই অন্য দেশ থেকে কিনে আনতে হয়। এর বেশির ভাগ আমদানি হয় বৈরুত বন্দরের মাধ্যমে, যা ৪ আগষ্ট ২০২০ পরমাণু বোমার মতো বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে গেছে। বহু খাদ্যগুদাম ছিল বন্দরের আশপাশের এলাকাগুলোতে । সেগুলো ও ধসে পড়ে লেবানিজদের দুর্ভিক্ষের কিনারায় ঠেলে দেয় । হাজারো বাড়িঘর ধুলার সাথে মিশে গেছে । বৈরুত বিস্ফোরণের অর্থনৈতিক সংকটের মুখে থাকা লেবাননকে আরো গভীর সংকটে নিক্ষেপ করেছে । 

হতাশাগ্রস্ত লেবানন 

বৈরুত বিস্ফোরণের পর হতাশার পথেই অগ্রসর হচ্ছে লেবানন । পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, নাগরিকরা নিজের দেশকে আরেক দেশের অধীনে দিয়ে দিতে আবেদন জানান । ‘লেবাননকে আগামী ১০ বছরের জন্য ফ্রান্সের অধীনে নিন’ শীর্ষক ঐ আবেদনে বলা হয়, লেবাননের কর্মকর্তারা দেশ পরিচালনায় পুরোপুরি ব্যর্থ । তাই সুষ্ঠু পরিচালনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে লেবাননের ফ্রান্সের অধীনে যাওয়া উচিত । 

সর্বশেষ পরিস্থিতি বৈরুত পুনর্গঠনে তহবিল গঠন 

১৪ আগষ্ট ২০২০ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত লেবাননের রাজধানী বৈরুত পুনর্গঠনে জাতিসংঘ ৫৬.৫ কোটি ডলারের একটি তহবিলের ঘোষণা দেয় । সহায়তা তহবিলে অর্থদানে সদস্যরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীগুলোর প্রতি আবেদন জানায় সংস্থাটি ।

সেনাবাহীর ক্ষমতা বৃদ্ধি 

রাজধানী বৈরুতে বিস্ফোরণের পর ১৩ আগষ্ট ২০২০ পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনে দেশটির সেনাবাহিনীর ক্ষমতা বাড়ানোর একটি বিল অনুমোদন করা হয় । এর মধ্য দিয়ে দেশটির সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা অধিগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে বাকস্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারবে দেশটির সেনাবাহিনী । এছাড়া তারা প্রত্যেক গৃহে প্রবেশ করতে পারবে এবং গেপ্তার করতে পারবে । 

১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হলে ফরাসি উপনিবেশের অধীনে আসে লেবানন । ১৯৮৩ সালে অলিখিত এক চুক্তির ভিত্তিতে যাত্রা শুরু করে আজকের লেবানন প্রজাতন্ত্র । 

২. লেবাননের বর্তমানে ১৫ টি ধর্মের মানুষের বাস । প্রায় ৭০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ২০ লাখই সিরিয় আর ফিলিস্তিনি শরণার্থী।

৩. ১৯৭৫-১৯৯০ সাল পর্যন্ত লেবাননে গৃহযুদ্ধে নিহত হয় ১,২০,০০০ মানুষ । আর দেশটির ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হয় ৭৫,০০০ । 

৪. ১৯৪৩ সালের অলিখিত চুক্তি অনুযায়ী, ‘রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগাভাগি পদ্ধতি’র মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে লেবানন । চুক্তি অনুযায়ী লেবাননের প্রেসিডেন্ট হন । একজন ম্যারোনাইট খ্রিস্টান, যার মেয়াদ ৬ বছর । কোনো ব্যক্তি একবারই এ পদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন । চার বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন একজন সুন্নি মুসলমান । আর স্পিকার হন শিয়া সম্প্রদায় থেকে।

 

রফিক হারিরি হত্যার বিচার  

 

ক্ষমতার টানাপড়েনে ১৪ ফ্রেব্রুয়ারি ২০০৫ লেবাননের রাজধানী বৈরুতের সমুদ্র তীরবর্তী সড়কে এক গাড়িবোমা হামলায় নিহত হন তখনকার প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি । এ ঘটনায় হারিরিকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে হিজবুল্লাহর পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় । এর মধ্যে হিজবুল্লাহর সামরিক অধিনায়ক মুস্তাফা আমিন বদর-এদ্দিন ২০১৬ সালে সিরিয়ায় নিহত হলে তার নাম অভিযোগ থেকে সরিয়ে নেয়া হয় । রফিক হারিরির হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের লক্ষ্যে ৩০ মে ২০০৭ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে । এরপর ১ মার্চ ২০০৯ নেদারল্যান্ডসে কার্যক্রম শুরু করে জাতিসংঘ-সমর্থিত স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল ফর লেবানন (STL) ।

হারিরি হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ১৫ বছর পর ১৮ আগষ্ট ২০২০ নেদরল্যান্ডসের দ্য হেগে STL রফিক হারিরি হত্যা মামলায় রায় প্রদান করে । বিচারের ২৬০০ পৃষ্ঠার রায় পড়ে শোনান বিচারক ডেভিড রে । রায়ে লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক আল হারিরির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দেশটির শিয়া রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর নেতাদের বা প্রতিবেশী সিরিয়া সরকারের যুক্ত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি ।

তবে অভিযুক্ত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর নিচের সারির চার সদস্যের মধ্যে আসাদ সাবরা, হুসেইন ওনাইসি ও হাসান হাবিব নেরহিকে খালাস দেয়া হয় । অপর অভিযুক্ত সেলিম আয়াশকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় । তার ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন বোমা হামলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে প্রসিকিউটররা প্রমাণ করেন ।

Related Posts

Leave A Comment