ভয় (পর্ব-১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

রাতে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করলামতিনি প্রায় দুঘণ্টা কাটিয়ে বাড়ি চলে গেলেন ইমাম সাহেবের গল্প বলা হলাে নাতিনি চলে যাবার পর মনে হলাে ইমাম সাহেবের গল্পটাতাে তাকে শােনানাে হলাে না। 

ভয়আমি আমার মেয়েকে বলে রাখলাম যে এরপরে যদি কখনাে মিসির আলি সাহেব আমাদের বাসায় আসেন সে যেন আমার কানের কাছে ইমাম বলে একটা চিকার দেয়আমার এই মেয়ের স্মৃতিশক্তি বেশ ভালােসে যে যথাসময়ে ইমাম 

বলে চিৎকার দেবে সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। 

হলােও তাইঅনেকদিন পর মিসির আলি সাহেব এসেছেনতার সঙ্গে গল্প করছি আমার মেয়ে কানের কাছে এসে বিকট চিৎকার দিলােএমন চিৎকার যে মেজাজ খারাপ হয়ে গেলােমেয়েকে কড়া ধমক দিলামমেয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললাে, তুমিতাে বলেছিলে মিসির চাচু এলে ইমামবলে চিৎকার করতে। 

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, কানের পর্দা ফাটিয়ে দিতে তাে বলিনিযাও, এখন যাও তাে। 

মিসির আলি বললেন, ব্যাপারটা কি

আমি বললাম, তেমন কিছু নাআপনাকে একটা অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাচ্ছিলামএকজন ইমাম সাহেবের গল্পআপনার সঙ্গে দেখা হয় কিন্তু গল্পটা বলার কথা মনে থাকে নামেয়েকে মনে করিয়ে দিতে বলেছিসে এমন চিৎকার দিয়েছে, এখন মনে হচ্ছে বা কানে কিছু শুনতে পারছি না। 

ভয় (পর্ব-১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

মিসির আলি বললেন, গল্পটা কি বলুন শুনিআজ থাকআরেকদিন বলবাে। একটু সময় লাগবেলম্বা গল্পমিসির আলি বললেন, আরেক কাপ চা দিতে বলুনচা খেয়ে বিদেয় হই। 

চায়ের কথা বলে মিসির আলির সামনে এসে বসলামমিসির আলি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন ইমাম সাহেবের গল্পটা আপনি আমাকে কখনােই বলতে পারবেন না। 

আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন? আপনার মস্তিষ্কের একটা অংশ আপনাকে গল্পটা বলতে বাধা দিচ্ছেযে কারণে অনেকদিন থেকেই আপনি আমাকে গল্পটা বলতে চান অথচ বলা হয় নাআপনার মনে থাকে নাআজ আপনাকে মনে করিয়ে দেয়া হলােএবং মনে করিয়ে দেয়ার জন্য আপনি রেগে গেলেনতার চেয়ে বড় কথা মনে করে দেবার পরেও আপনি গল্পটি বলতে চাচ্ছেন নাঅজুহাত বের করেছেন বলছেন লম্বা গল্পআমি নিশ্চিত আপনার অবচেতন মন চাচ্ছে না, এই গল্প আপনি আমাকে বলেনআপনার সাবকনসাস মাই আপনাকে বাধা দিচ্ছে। 

আমার সাবকনসাস মাইও আমাকে বাধা দিচ্ছে কেন?আমি তা বুঝতে পারছি নাগল্পটা শুনলে বুঝতে পারবােচা আসুকচা খেতে খেতে আপনি বলা শুরু করুনআমার সিগারেটও ফুরিয়েছেকাউকে দিয়ে কয়েকটা সিগারেট আনিয়ে দিন। 

ভয় (পর্ব-১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

আমি আর কোনাে অজুহাতে গেলাম নাগল্প শেষ করলামগল্প শেষ হওয়া মাত্র মিসির আলি বললেন, আবার বলুন। 

আবার কেন ? মানুষ যখন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার গল্প বলে তখন মূল গল্পটি দ্রুত বলার দিকে ঝোক থাকে বেশিগল্পের ডিটেইলসযেতে চায় নাএকই গল্প দ্বিতীয়বার বলার সময় বর্ণনা বেশি থাকেকারণ মূল কাহিনী বলা হয়ে গেছেকথক তখন না বলা অংশ বলতে চেষ্টা করেনআপনিও তাই করবেনপ্রথমবার শুনে কয়েকটা জিনিশ বুঝতে পারিনিদ্বিতীয়বারে বুঝতে পারবশুরু করুন। 

আমি শুরু করলাম, বেশ সময় নিয়ে বললাম| মিসির আলি বললেন, কবে গিয়েছিলেন ধুন্দুল নাড়া? তারিখ মনে আছে

আছে” 

আমি মিসির আলিকে তারিখ বললামতিনি শান্ত গলায় বললেন, আপনার তারিখ অনুযায়ী মেয়েটির বাচ্চা এখন হবে কিংবা হয়ে গেছেআপনি বলছেন দশ মাস আগের কথামেয়েটির বাচ্চা হয়ে গিয়ে থাকলে তাকে যে হত্যা করা হয়েছে সেই সম্ভাবনা নিরানই ভাগেরও বেশিআর যদি এখনাে হয়ে না থাকে তাহলে বাচ্চাটাকে বাঁচানাে যেতে পারেএখন কটা বাজে দেখুন তাে। 

আমি ঘড়ি দেখলাম নটা বাজেমিসির আলি বললেন, রাত সাড়ে দশটায় ময়মনসিংহে যাওয়ার একটা ট্রেন আছেচলুন রওনা হইসত্যি যেতে চান

ভয় (পর্ব-১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

অবশ্যই যেতে চাইআপনার অসুবিধা থাকলে কিভাবে যেতে হবে আমাকে বলে দিনআমি ঘুরে আসি| আমার অসুবিধা আছেতবু যাবােএখন বলুন তাে জ্বীন কফিলের ব্যাপারটা আপনি বিশ্বাস করছেন?” 

আপনার ধারণা বাচ্চাগুলােকে খুন করা হয়েছে? তাতাে বটেইকে খুন করেছে

মিসির আলি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, কে খুন করেছে তা আপনিও জানেনআপনার সাবকনসাস মাইণ্ড জানেজানে বলেই সাবকনসাস মাইণ্ড গল্পটি বলতে আপনাকে বাধা দিচ্ছিলাে। 

আমি কিছুই জানি না। 

মিসির আলি হাসতে হাসতে বললেন, আপনার সাবকনসাস মাইণ্ড জানে কিন্তু সে এটি আপনার কনসাস মাইকে জানায়নি বলেই আপনার মনে হচ্ছে আপনি জানেন। 

আমি বললাম, কে খুন করেছে? লতিফাদুটি বাচ্চাই সে মেরেছেতৃতীয়টিও মারবেকি বলছেন এসব?চলুন রওনা হয়ে যাইদেরী হয়ে যাচ্ছেট্রেনে যেতে যেতে ব্যাখ্যা করবাে। 

মিসির আলি বললেন, লতিফা যে পুরাে ঘটনাটা ঘটাচ্ছে তা পরিষ্কার হয়ে যায় শুরুতেই, যখন ইমাম সাহেব আপনাকে বলেন কিভাবে জ্বীন কফিল তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছিলাে। 

পুরানাে ধরনের মসজিদ একটা মাত্র দরজাএই ধরনের মসজিদে বসে থাকলে বাইরের চিৎকার শােনা যাবে না ভেতর থেকে চিৎকার করলেও বাইরের কেউ শুনবে নাকারণ সাউণ্ড ওয়েভ চলার জন্য মাধ্যম লাগেমসজিদের দেয়াল সেখানে বাধার মতাে কাজ করছে। 

আপনি এবং ইমাম সাহেব মসজিদে ছিলেনইমাম সাহেব একসময় স্ত্রীর খােজ নিতে গেলেন এবং ফিরে এসে বললেন লতিফা খুব চিৎকার করছেতাই না

জি তাইমসজিদের ভেতরে বসে সেই চিৎকার আপনি শুনতে পাননিতাই না?” 

ভয় (পর্ব-১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

অথচ ইমাম সাহেব যখন আগুন দেখে ভয়ে চেঁচালেন, বাঁচাও বাঁচাও তখন লতিফা পানির বালতি নিয়ে ছুটে এলােপ্রথমত ইমাম সাহেবের চিৎকার লতিফার শােনার কথা নয়দ্বিতীয়ত শুনে থাকলেও লতিফা কি করে বুঝলাে আগুন লেগেছে? সে পানির বালতি নিয়ে ছুটে এলাে কেন? আগুন আগুন বলে চিৎকার করলেও আমরা চিৎকার শুনে প্রথমে খালি হাতে ছুটে আসি তারপর পানির বালতি আনিএটাই স্বাভাবিকএই মেয়েটি শুরুতেই পানির বালতি নিয়ে ছুটে এসেছেকারণ পানির বালতি হাতের কাছে রেখেই সে আগুন ধরিয়েছেআমার এই যুক্তি কি আপনার কাছে গ্রহণযােগ্য মনে হচ্ছে?” 

হচ্ছেপ্রথম শিশুটি মারা গেলােশিশুটিকে ফেলা হলাে কুয়ায়। এই খবর মেয়েটি জানে কারণ সে পাগলের মতাে ছুটে গেছে কুয়ার দিকে অন্য কোথাও নয়তার বাচ্চাটিকে কুয়াতে ফেলা হয়েছে এটা সে জানলাে কিভাবে ? জানলাে কারণ সে নিজেই ফেলেছেএই যুক্তি কি আপনার কাছে গ্রহণযােগ্য মনে হচ্ছে

হ্যা, হচ্ছে?আপনাকে কি আরাে যুক্তি দিতে হবে? আমার কাছে আরাে ছােটখাটো যুক্তি আছেআর লাগবে নাশুধু বলুন কুয়ার উপরের টিনে ঝনঝন শব্দ হতাে কেন? যেশব্দ ইমাম সাহেব নিজেও শুনেছেন কুয়ার টিনটা না দেখে বলতে পারবাে নাআমার ধারণা বাতাসে টিনটা কাপে, ঝন ঝন শব্দ হয়

ভয় (পর্ব-১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

দিনের বেলায় এই শব্দ শােনা যায় না, কারণ আশেপাশে অনেক ধরনের শব্দ হতে থাকেরাত যতােই গভীর হয় চারপাশ নীরব হতে থাকেসামান্য শব্দই বড় হয়ে কানে আসে| আপনার এই যুক্তিও গ্রহণ করলাম, এখন বলুন লতিফা এমন ভয়ংকর কাণ্ড কেন করছে

মেয়েটা অসুস্থ। মনােবিকার ঘটেছেইমাম সাহেব লােকটি তাদের আশ্রিততাদের পরিবারে চাকর বাকররা যে কাজ করে সে তাই করতােমেয়েটি ভাগ্যের 

পরিহাসে এমন একজন মানুষের প্রেমে পড়ে যায়প্রচণ্ড মানসিক চাপের সম্মুখীন হয়পরিবারের সবার কাছে ছােট হয়অপমানিত হয়এতে প্রচণ্ড চাপ সহ্য করার ক্ষমতা তার ছিলাে নাতার মনােবিকার ঘটেপােয়াতী অবস্থায় মেয়েদের হরমােনাল ব্যালান্স এদিক ওদিক হয়সেই সময় মনােবিকার তীব্র হয়মেয়েটির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে

(চলবে)

ভয় (পর্ব-১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.