মনে মনে খেলা-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

মনে মনে খেলা-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সিনেমা হলের মধ্যে অন্ধকারেই পেছন দিক থেকে ছেলেটিকে একটু চেনা চেনা মনে। হয়েছিল। আলো জ্বলতে ভালো করে দেখা গেল। হ্যাঁ, ধূর্জটিই।

সেই আগের মতনই রোগা আর লম্বা মাথাভরতি ঘন এলোমেলো চুল, কাঁধে একটা ঝোলানো ব্যাগ। চেহারায় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য নেই, শুধু লম্বা বলেই ভিড়ের মধ্যেও অনেক দূর থেকে চোখে পড়ে।

দীপংকর সুপ্রিয়াকে বলল, ওই দেখো, ধূর্জটি বসে আছে ওখানে।

সুপ্রিয়া খুব একটা উৎসাহ দেখালো না। বলল, তাই নাকি? ডান দিকে দেখো, তিনটে রো সামনে–

সুপ্রিয়া সংক্ষিপ্তভাবে বলল, ও–

দীপংকর স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝবার চেষ্টা করল, সুপ্রিয়া আগেই ধূর্জটিকে দেখেছে কি না। হয়তো দেখেও প্রকাশ করেনি।

ডাকবে ওকে?

কেন, ডেকে কী হবে?

দীপংকর হেসে বলল, কেন, ডাকি-না! অনেকদিন তো দেখা হয়নি ওর সঙ্গে।

সুপ্রিয়াও এবার স্বামীর মুখের দিকে একবার তাকাল। তারপর নিরুত্তাপ গলায় বলল, তোমার ইচ্ছে হলে ডাকতে পার!

দীপংকরের সত্যিই ডাকতে ইচ্ছে করল। ছেলেটি সম্পর্কে তার আগ্রহ আছে। সে নিজে যে জগতে ঘোরে, যাদের সঙ্গে মেলামেশা করে, সেখানে ধূর্জটির মতো ছেলের দেখা পাওয়া যায় না। এদের কথাবার্তার ধরনই অন্যরকম।

কিন্তু সেই মুহূর্তেই ধূর্জটি উঠে গেল বাইরে। সঙ্গে তার আরও দু-তিনজন বন্ধু। সে এদিকে একবারও তাকাল না। একবারও তাকাল না বলেই, দীপংকরের মনে হল, সম্ভবত ধূর্জটিও দেখেছে তাদের। দেখলেও সে নিজে থেকে কিছুতেই কথা বলবে না। দীপংকরের ঠোঁটে একটা কৌতুকের হাসি ফুটে উঠল।

মুখ না ফিরিয়েই দীপংকর সূক্ষ্মভাবে তার স্ত্রীর মুখের ভাব লক্ষ করার চেষ্টা করল। সুপ্রিয়া মুখ নীচু করে বসে আছে, কী যেন ভাবছে। ও কি ধূর্জটির কথাই ভাবছে? অনেকদিন বাদে দেখা হলে এ-রকম তো হয়ই।

সুপ্রিয়া মুখ তুলে সম্পূর্ণ অন্য প্রসঙ্গে বলল, দিলীপবাবুর ছেলেটি কেমন আছে আজ?

দীপংকর একটু চমকে উঠল। কথাটা বুঝতে তার একটু সময় লাগল। তারপর আবছাভাবে বলল, দিলীপের ছেলে, ও হ্যাঁ, আজ তো আর খবর নেওয়া হয়নি। আজ ওকে দেখিনি।

সুপ্রিয়া উদবিগ্নভাবে বলল, আজ উনি অফিসে আসেননি?

হ্যাঁ এসেছে, দূর থেকে দেখেছিলাম একবার।

কাল ছেলেটার এক-শো চার জ্বর উঠেছিল।

আজ ভালোই আছে বোধ হয়। না হলে ঠিকই খবর পেতাম। বাচ্চাদের ওরকম হয়।

ধূর্জটি ফিরল আবার অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পর। দীপংকর তার দিকে নজর রেখেছে। ধূর্জটি অন্ধকারের মধ্যেও এদিকে দেখল না।

তখন দীপংকরের মনে হল, সে কেন ইন্টারভ্যালে বাইরে গেল না? সিগারেট টানার জন্য সেও তত বাইরে যেতে পারত সুপ্রিয়াকে বসিয়ে রেখে। তাহলে ধূর্জটির সঙ্গে দেখা হতই। ধূর্জটি কি তাকে দেখে না-চেনার ভান করবে? মনে হয় না।

ছবি শুরু হয়ে গেছে। এমন জমাট গল্প যে, মগ্ন না হয়ে পারা যায় না। কোথা দিয়ে কেটে গেল দু-ঘণ্টা।

ছবি ভাঙতেই দীপংকর ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সুপ্রিয়াকে বলল, তাড়াতাড়ি এসো, শেষে বেশি ভিড় হয়ে যাবে।

নিজেই সে ভিড় ঠেলেঠুলে আগেভাগে এসে দাঁড়িয়ে রইল গেটের কাছে। ঠোঁটে সিগারেট এবং হাসি।

ধূর্জটি আসছে তার বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে। অন্য কোনো দিকে সে দেখতেই পাচ্ছে না। সুপ্রিয়া স্বামীকে বলল, দাঁড়িয়ে রইলে কেন, যাবে না?

দীপংকর বলল, দাঁড়াও-না, এত তাড়াতাড়ির কী আছে?

তুমিই তো ভিড়ের ভয়ে আগে বেরিয়ে আসতে চাইলে!

দীপংকর সে-কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ভিড়ের দিকে তাকিয়ে রইল তীক্ষ্ণভাবে।

ধূর্জটি কাছাকাছি আসতেই সে প্রায় সামনাসামনি দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, কী খবর? ধূর্জটি কি চমকে উঠল? অন্তত সেরকম কোনো ভাব দেখালো না। মুখ তুলে দীপংকরকে দেখে সে খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, আপনার কী খবর? ভালো? ছবিটা কেমন লাগল?

দীপংকর বলল, সুপ্রিয়াও এসেছে।

ধূর্জটি সুপ্রিয়ার দিকে ভালো করে তাকালও না। আলগাভাবে বলল, কী খবর? তরপরই আবার তাকাল দীপংকরের দিকে। অদূরে তার বন্ধুরা দাঁড়িয়ে। সে একটু চঞ্চল ভাব দেখিয়ে বলল, আচ্ছা চলি।

একটু দাঁড়ান-না। আমরা কোথাও বসে একটু চা-টা খাব ভাবছি। আপনিও আসুন-না।

ধূর্জটি বলল, আপনারা যান। আমার সঙ্গে বন্ধুরা আছে।

আপনার বন্ধুদেরও ডাকুন। ওঁরাও রাইটার নিশ্চয়ই। একটু আলাপ করতাম।

বন্ধুরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ধূর্জটিকে দেখছে। ধূর্জটি যেন লজ্জা পাচ্ছে একটু। বন্ধুদের চোখের সামনে কোনো সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে অনেকেই লজ্জা পায়।

সুপ্রিয়া বিরক্তভাবে বলল। এখন আবার কোথায় চা খাব?

তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে-না? বুলান একলা আছে।

দীপংকর উদারভাবে বলল, তাহলে সবাই মিলে আমাদের বাড়িতে গিয়েও চা খাওয়া যেতে পারে। চলুন, তাই চলুন।

বন্ধুর মতন সে ধূর্জটির পিঠে হাত রেখে চাপ দিল। ধূর্জটির যেন একটু আপত্তি করার ইচ্ছে কিন্তু দীপংকর তাতে আমলই দিল না।

ধূর্জটির বন্ধু তিনজনের সঙ্গে আলাপ হল। কিন্তু তাদের অন্য কাজ আছে, তারা এখন দীপংকরের বাড়িতে যেতে পারবে না। তাদের মধ্যে একজন, যার নাম প্রতুল সেনগুপ্ত, সে শুধু দীপংকরের গাড়িতে এলগিন রোড পর্যন্ত লিফট নিতে রাজি হল।

গাড়ি চালাচ্ছে দীপংকর। সুপ্রিয়া বসেছে পেছনের সিটে। ধূর্জটি আর প্রতুল দু-জনেই সামনের দিকে উঠতে যাচ্ছিল, দীপংকর তাড়াতাড়ি বলে উঠল, এ কী, আপনারা দুজনেই গাদাগাদি করে সামনে বসছেন কেন? একজন পেছনে বসুন?

প্রতুল আর ধূর্জটির মধ্যে, কে সামনে বসবে? দুই বন্ধু পরস্পরকে ঠেলাঠেলি করতে লাগল। প্রতুল আগে নেমে যাবে, সুতরাং সে-ই জোর করে সামনের সিটে উঠল। তখন অবশ্য ধূর্জটি আর মোটেই আড়ষ্টতা না দেখিয়ে বেশ সপ্রতিভভাবে উঠে বসল সুপ্রিয়ার পাশে। এবং সিগারেট ধরালো।

প্রতুল বলল, আমাকে পার্ক স্ট্রিট আর ক্যামাক স্ট্রিটের মোড়ে নামিয়ে দিলেই হবে।

দীপংকর অবশ্য ওই পথ দিয়ে যেত না, একটু ঘোরা হয়, তবু আপত্তি করল না। নামবার সময় প্রতুল শেষবার সুপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে যেন দু-চোখ দিয়ে গিলে গেল।

গাড়িতে ধূর্জটি প্রায় নি:শব্দ। দীপংকর নানা প্রশ্ন করছে, সে হুঁ-হাঁ বলে যাচ্ছে শুধু। সুপ্রিয়া সারাক্ষণ তাকিয়ে রইল বাইরের দিকে।

গলফ ক্লাব রোডে দীপংকরের ফ্ল্যাট। অফিস থেকে ভাড়া দেয়, ফ্ল্যাটটি বেশ বড়ো এবং সাজানো-গুছোনো। সুপ্রিয়া কিছুদিন আর্টস্কুলের ছাত্রী ছিল। এসব ব্যাপারে তার আলাদা রুচি আছে।

ওদের একটি মাত্র মেয়ে, বয়েস চার। রাঁধুনি আর চাকরের কাছেই সে দিব্যি থাকে।

দীপংকর আর ধূর্জটি রইল বসবার ঘরে। সুপ্রিয়া চলে গেল ভেতরে। ধূর্জটি একটু আড়ষ্ট, একবার সে পায়ের ওপর পা তুলছে, পরক্ষণেই আবার দু-পা সোজা করছে। সোফার পাশেই ছোটো টিপয়ের ওপর রাখা বেশ দামি ধরনের সুন্দর কারুকাজ করা পেতলের বাটিটা অ্যাশট্রে কি না তা বুঝতে পারছে না বলেই সে সিগারেট ধরাতে পারছে না।

দীপংকর জিজ্ঞেস করল, আপনি আমাদের এবাড়িতে তো আগে আসেননি, না?

অকারণেই একটু চমকে উঠে ধূর্জটি বলল, না তো!

আপনি আমাদের ভবানীপুরের ফ্ল্যাটে এসেছিলেন বোধ হয়।

হ্যাঁ, দু-একবার। রণজয়ের সঙ্গে। রণজয় এখন কোথায়?

ও তো মুম্বাইতে আছে। আপনার সঙ্গে যোগাযোগই নেই?

না। অনেকদিন…

রণজয় সুপ্রিয়ার মাসতুতো ভাই। তার বন্ধু হিসেবেই ধূর্জটি প্রায়ই আসত সুপ্রিয়াদের বাড়ি। বিয়ের আগে দীপংকর মাত্র দু-তিনবার গিয়েছিল সুপ্রিয়াদের বাড়ি। প্রত্যেকবারই সে রণজয়ের সঙ্গে ধূর্জটিকেও দেখেছে সেখানে। তার হাবভাব দেখে মনে হত, সে প্রায় বাড়ির ছেলের মতন। কিংবা তার চেয়েও বেশি। সুপ্রিয়াকে বিয়ে করার খুবই ইচ্ছে ছিল ধূর্জটির, সে-কথা দীপংকর জানে। বিয়ে শেষপর্যন্ত না হোক, তবু ভালোবেসেছিল তো! সুপ্রিয়া আধুনিক কালের বুদ্ধিমতী মেয়েদের মতন বিয়ের আগে সামান্য প্রেম-ট্রেম করে শেষপর্যন্ত বিয়ে করেছে পাত্র হিসেবে যে যোগ্যতর, সেই দীপংকরকেই।

প্রাক্তন প্রেমিকার স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে কীরকম লাগে? রাগ হয়! ধূর্জটি কি এখনও রেগে আছে দীপংকরের ওপর? দীপংকর কিন্তু ওর সঙ্গে ভাব জমাতেই চায়। তার কোনোরকম ইচ্ছে ছিল না ধূর্জটির মনে আঘাত দেওয়ার। সে তো সুপ্রিয়াকে জোর করে বিয়ে করেনি। সুপ্রিয়াই নিজে থেকে রাজি হয়েছিল।

দীপংকর বলল, গতমাসে আপনার একটা কবিতা বেরিয়েছিল-না অমুক পত্রিকায়? আমি পড়েছি, আমার খুব ভালো লেগেছে।

ধূর্জটি লাজুকভাবে মুখ দিয়ে কী একটা শব্দ করল, ঠিক বোঝা গেল না। দীপংকর বলল, আমরা অতিসাধারণ লোক, সাহিত্য-টাহিত্য বিশেষ বুঝি না, তবু পড়ি, যেটা ভালো লাগে।

দীপংকর পড়াশুনোয় ছিল ব্রিলিয়ান্ট। চিরকাল ভালো রেজাল্ট করেছে। এবং অতিসহজে খুব ভালো চাকরি পেয়েছে বিলিতি কোম্পানিতে। অফিসের কাজে তাকে দু-বার বিলেত যেতে হয়েছে। এইরকম সাধারণ লোক সে।

আর ধূর্জটি তখন থাকত উত্তর কলকাতায়। খুব সাধারণ পরিবারের ছেলে। পড়াশুনোতও তেমন কিছু উল্লেখযোগ্য নয়। সেইসময় ধূর্জটি কোনো চাকরিও করত না। চেষ্টা করেও পায়নি। কিন্তু কবিতা লিখে খানিকটা নাম-টাম হয়েছিল।

আপনি নতুন কী লিখছেন?

ধূর্জটি বলল, বিশেষ কিছু না। আপনি, ইয়ে, এত কাজের মধ্যেও কবিতা পড়ার সময় পান, সেটাই তো আশ্চর্য!

সবসময় শুধু কাজ নিয়ে থাকলে কী মানুষ বাঁচতে পারে? আপনার কবিতাটা আমিই সুপ্রিয়াকে পড়ালাম। ওর তো আজকাল পড়া-টড়ার অভ্যেসই চলে গেছে প্রায়, মেয়েকে নিয়েই সবসময় ব্যস্ত।

সুপ্রিয়ার প্রসঙ্গে ধূর্জটি একটাও কথা বলবে না যেন ঠিক করেছে। দীপংকর খুব ভালো করে লক্ষ করতে লাগল ধূর্জটিকে। সুপ্রিয়ার নাম শুনে মুখের একটা রেখাও কি কাঁপবে না?

ব্যর্থ প্রেমিকদের মনের ভাব কীরকম হয়, তা দীপংকর জানে না। সে কখনো প্রেমে ব্যর্থ হয়নি। সে জীবনে, প্রায় সব ব্যাপারেই সার্থক। কিন্তু একটা ব্যাপারে ধূর্জটি এখন তার থেকে বেশি উল্লেখযোগ্য। ধূর্জটি আজও প্রেমিক, আর দীপংকর স্বামী। গল্প-উপন্যাস-নাটকে স্বামীদের তুলনায় প্রেমিকরাই অনেক বেশি প্রাধান্য পায়।

চাকর এসে ট্রে-তে করে চা দিয়ে যাওয়ায় দীপংকর একটু বিরক্ত হল। ধূর্জটিকে বলল, আপনি বসুন, আমি এক্ষুনি আসছি।

ভেতরের ঘরে এসে দেখল সুপ্রিয়া বিছানায় শুয়ে পড়ে মেয়েকে ঘুম পাড়াচ্ছে। দীপংকর ফিসফিস করে বলল, এই, তুমি একবার আসবে না ওঘরে? ছেলেটা বসে আছে, ওর সঙ্গে একটু কথা-টথা বলবে না?

তুমি ডেকে এনেছ, তুমিই কথা বলো।

আমি তো বলছিই এতক্ষণ ধরে। তুমি একবারটি এসো।

আমি বুলানকে ঘুম পাড়াচ্ছি।

দীপংকর মুখ নীচু করে বিছানার কাছে এসে মেয়েকে দেখে বলল, ও তো ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ। তুমি একবারটি এসো।

তুমি যাও, আমি যাচ্ছি।

দীপংকর বসবার ঘরে ফিরে এসে দেখল, ধূর্জটি তখনও চায়ের কাপ ছোঁয়নি। দীপংকর বলল, নিন চা নিন। সুপ্রিয়া আসছে, মেয়েকে ঘুম পাড়িয়েই আসছে। মেয়ে আবার মায়ের হাতের চাপড়ানি না পেলে কিছুতেই ঘুমোতে চায় না।

কত বয়েস হল আপনাদের মেয়ের?

চার বছর।

বিয়ে হয়েছে সাত বছর আগে। ধূর্জটির নিশ্চয়ই মনে আছে সে-কথা। ধূর্জটি কি বিয়ে করেছে এর মধ্যে? খুব সম্ভবত না, তাহলে নিশ্চয়ই কানে আসত খবরটা। ব্যর্থ প্রেমিক হয়ে ধূর্জটি কি ঠিক করেছে যে সে আর বিয়েই করবে না? তাহলে ব্যাপারটা খুব দুঃখের হবে।

বিয়ে করেনি বলেই বোধ হয় ধূর্জটিকে এখনও বেশ ছোকরা ছোকরা দেখায়। দীপংকরের চেয়ে সে মাত্র বোধ হয় বছর দু-একের ছোটো। অথচ স্বামী বলেই দীপংকর এখন রীতিমতন দায়িত্বশীল পুরুষমানুষ।

বাইরের শাড়ি পালটে একটা ঘরোয়া শাড়ি পরে এসে বসল সুপ্রিয়া। খুব সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল, কেমন আছ, ধূর্জটিদা? তোমাদের বাড়ির সবার খবর কী?

দীপংকর একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হল। সুপ্রিয়া আগেও ধূর্জটিকে তুমি-তুমিই বলত। এখন যদি আবার আপনি বলা শুরু করত, তাহলে ব্যাপারটা খুব বোকার মতন হত। তবে আগে কি ধূর্জটিদা বলত, না শুধু ধূর্জটি? যদিও মাসতুতো ছোড়দার বন্ধু, তবু মেয়েরা আজকাল আর প্রেমিকদের দাদা বলে না। বিয়ের আগে দীপংকরের সঙ্গেও আলাপ হয়েছিল সুপ্রিয়ার, তখন দীপংকরের নাম ধরে ডাকেনি, দাদাও বলেনি। খানিকটা দূরত্ব রেখে বলত, দীপংকরবাবু।

ধূর্জটি ভালো করে তাকাতে পারছে না সুপ্রিয়ার দিকে। দীপংকরের মায়া লাগল। আহা, অনেকদিন পর আবার দেখা হল প্রেমিকার সঙ্গে, তাকে চোখভরে দেখবার ইচ্ছে হয় নিশ্চয়ই। কিন্তু প্রেমিকার স্বামী উপস্থিত থাকলে আর সেরকম প্রাণ ভরে দেখা যায়? ধূর্জটির কি বুক কাঁপছে? সুপ্রিয়ার কোনো ভাবান্তর দেখা যাচ্ছে না অবশ্য। মেয়েদের অভিনয় ক্ষমতা অনেক বেশি।

দীপংকরের মনে হল, সে একটা অসম প্রতিযোগিতায় ধূর্জটিকে হারিয়ে দিয়েছে। যেহেতু বেচারা একটা ভালো চাকরি করে না, কবিতা-টবিতা লেখে, তাই সমাজে তার সেরকম দাম নেই। কিন্তু ভালোবাসার ক্ষমতা ওর হয়তো অনেক বেশি। ও সুপ্রিয়াকে নিয়ে একটা কবিতা লিখে ফেলতে পারে, যা অনেক লোেক পড়বে। সে-ক্ষমতা কি দীপংকরের আছে? ধূর্জটির মতন সাজিয়ে সাজিয়ে সুন্দর কথা বলার ক্ষমতাও তার নেই।

এখন অবশ্য ধূর্জটি প্রায় কথাই বলছে না, সুপ্রিয়া কথা বলছে।

আজ যে সিনেমাটা দেখে এল সেই বিষয়ে। নিশ্চয়ই ওদের দুজনেরই অন্য কথা বলার ইচ্ছে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে।

দীপংকর বলল, চা-টা ঠিক জমল না, কী বলেন?

ধূর্জটি বলল, না, না, ঠিকই তো আছে।

সুপ্রিয়া বলল, আর এক কাপ করে আনব?

দীপংকর বলল, না, চা থাক। আপনি একটু হুইস্কি খাবেন ধূর্জটিবাবু? আমার কাছে স্কচ আছে।

ধূর্জটি বলল, হুইস্কি, মানে, না থাক, আমি একটু বাদেই উঠব।

আরে মশাই, বসুন-না। আপনি খান তো হুইস্কি!

খাই, তবে এখন ঠিক…

সুপ্রিয়া ধূর্জটির দিকে তাকিয়ে বলল, তুমিও এইসব অভ্যেস করেছ নাকি?

দীপংকর হা-হা করে হেসে বলল, দেখেছেন তো, সুপ্রিয়া এখনও টিপিক্যাল বাঙালি মেয়ে রয়ে গেছে—এখনও ঠিক মেনে নিতে পারেনি—আজকাল কে না খায়? বেশি না খেলেই হল!

দীপংকর স্কচের বোতল আর গেলাস নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখল, তারপর চাকরের উদ্দেশে হাঁক দিয়ে বলল, এই সুখেন, এক বোতল জল দিয়ে যা আর খানিকটা বরফ।

চাকর জল দেওয়ার আগেই দীপংকর আবার ব্যস্ত হয়ে উঠে গেল। একটা প্লেটে করে নিজেই নিয়ে এল খানিকটা কাজুবাদাম।

সুপ্রিয়া একটু বিস্মিতভাবে তাকিয়ে আছে স্বামীর দিকে। দীপংকরের কাছে দু-তিন বোতল মদ রাখা থাকে—মাঝে মাঝে সে একটু-আধটু খায়। বেশিরভাগই অফিসের লোকদের সঙ্গে। এই ব্যাপারেও তার একটা নীতি আছে। বন্ধুস্থানীয় বা নিজের সমান মর্যাদাসম্পন্ন অফিসের লোকেদের সে দেয় দেশি হুইস্কি, আর খুব হোমরাচোমরা কেউ এলে, সে দেয় স্কচ। তবে হঠাৎ ধূর্জটির সামনে সে আজ দামি স্কচ বার করল কেন? ধূর্জটিকে সে হকচকিয়ে দিতে চায়?

দু-টি গেলাসে স্কচ ঢেলে, জল ও বরফ মিশিয়ে সে একটা তুলে দিল ধূর্জটির হাতে। তার গেলাস উঁচু করে বেশ উৎফুল্লভাবে বলল, চিয়ার্স! অনেকদিন জমিয়ে আড্ডা হয় না। অফিসের লোকের সঙ্গে কি আড্ডা হয়?

ধূর্জটি এখনও আড়ষ্ট হয়ে আছে। তার খুব একটা আড্ডা জমাবার মতন মেজাজ নেই মনে হচ্ছে। যদিও বিয়ের আগে দীপংকর দেখেছে ধূর্জটিকে দারুণ হইহই করতে। নিজের স্ত্রীর বদলে সে সর্বক্ষণ ধূর্জটিকেই লক্ষ করছে শুধু। ধূর্জটি বোধ হয় ভাবছে, দীপংকর তাকে কোনোরকম সুযোগ দেবে না?

নিজের গেলাসে সামান্য একটু চুমুক দিয়ে হঠাৎ বলল, আপনারা একটু বসুন, গল্প করুন। আমি চট করে স্নানটা সেরে আসি। রাত্রে বাড়ি ফিরেই স্নান না করলে আমি সুস্থির থাকতে পারি না। বরাবরের অভ্যেস ধূর্জটিবাবু। আপনার গেলাস শেষ হলে নিজেই ঢেলে নেবেন কিন্তু।

ধূর্জটিকে কিছু বলতে না দিয়ে সে চট করে চলে গেল, নিজের গেলাসটা হাতে নিয়েই।

দুটো বাথরুম। একটা বাইরের দিকে, আর একটা শয়নকক্ষ সংলগ্ন। সে গেল দ্বিতীয়টায়। অনেক দূরে, এখান থেকে বসবার ঘরের কোনো কথাই শুনতে পাওয়ার উপায় নেই।

বাথরুমে ঢুকে সে কাচের তাকের ওপর গেলাসটা রাখল। তারপর সিগারেট ধরালো একটা। স্নান করার বিশেষ তাড়া নেই। ধীরেসুস্থে বেরোলেই হবে। ওদের খানিকটা সময় দেওয়া যাক। এতদিন পরে দেখা দু-জনের কিছু কী অন্তরঙ্গ কথা হবে না?

দীপংকরের মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছে। অনেকদিন পরে সে যেন সুপ্রিয়ার জন্য একটা দামি খেলনা এনে দিয়েছে। দায়িত্ববান স্বামী হিসেবে সে সুপ্রিয়াকে অনেক কিছু দিতে পারে, শুধু খেলার সময় বা সঙ্গী দিতে পারে না। দীপংকরকে সকাল ন-টার মধ্যে অফিসে বেরিয়ে যেতে হয়। বিলিতি কোম্পানি, উপস্থিতির সময়ের ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি আছে। অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে সাতটা-আটটা হয়ে যায় প্রায়ই। যারা ভালো মাইনে দেয়, তারা খাটিয়েও নেয়। এর পরেও অফিসের লোকজন প্রায়ই বাড়িতে আসে, তখনও অফিসের কথাই হয়। অফিসের লোকের সঙ্গে অন্য কোনো গল্প জমে না। তা ছাড়া অফিসের কাজে দু তিনদিনের জন্য প্রায়ই বাইরে যেতে হয়, সেসময় সুপ্রিয়া একদম একলা থাকে।

সুপ্রিয়াকে দীপংকর সুখ-সাচ্ছন্দ্যের উপকরণ সবই তো দিয়েছে। সুন্দর ফ্ল্যাট, দু-জন কাজের লোক, বসবার ঘরে কার্পেট, মাসে দু-তিনটে শাড়ি কেনার মতো হাতখরচ। যেকোনো শখের জিনিসও কিনতে পারে সুপ্রিয়া, আত্মীয়স্বজনকে যতখুশি উপহার দিতে পারে। শুধু দু-জনে একসঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পারে না। সকালটা তো ব্যস্ততার মধ্যেই কেটে যায়, রাত্রে দু-তিন ঘণ্টামাত্র কথা বলার সময়, তখনও যত রাজ্যের কাজের কথা আর ঘরোয়া সংসারের কথাই হয়। মাসে বড়জোর দু-তিনদিন শারীরিক মিলন আর কোনো কোনো শনিবার একসঙ্গে সিনেমা।

সারাদিন সুপ্রিয়া একা থাকে। ছোটো সংসার, কাজ খুব সামান্য, তার কাটবে কী করে? এই নিয়ে সুপ্রিয়া কখনো তেমন অভিযোগ করেনি বটে, কিন্তু দীপংকর বোঝে। সবরকম আরাম পেলেও মানুষের মনের ক্ষুধা মেটে না।

বছরে অন্তত একবার ওরা বাইরে কোথাও বেড়াতে যায়। দীপংকর একটা জিনিস বুঝতে পারে, বিয়ের পর প্রথম দু-এক বছর সুপ্রিয়াকে নিয়ে বাইরে কোথাও বেড়াতে গিয়ে যে রোমাঞ্চ, যে উন্মাদনা পেয়েছে, এখন আর সেরকম স্বাদ পাওয়া যায় না। সেখানে গিয়েও সংসারের কথা হয়, কিংবা এক-এক সময় কোনো কথাই খুঁজে পাওয়া যায় না। মনে হয়, আর একজন কেউ সঙ্গে থাকলে যেন ভালো হত, তাহলে কথাবার্তা অনেক সহজ হয়ে যেত। সুপ্রিয়াও নিশ্চয়ই এটা অনুভব করে, কিন্তু মুখে স্বীকার করবে না। গতবছরই তো দার্জিলিং যাওয়ার সময় দীপংকর প্রস্তাব করেছিল, অফিসের দেবনাথ আর তার স্ত্রীকে সঙ্গে নেওয়ার। সুপ্রিয়াও একটুও আপত্তি করেনি, আগ্রহের সঙ্গে রাজি হয়েছিল।

ওরা এখন কি কথা বলছে? নাকি পরস্পরের দিকে অপলকভাবে চেয়ে চুপ করে বসে আছে? ধূর্জটি সুপ্রিয়ার জন্য একসময় পাগল হয়েছিল, কিন্তু সুপ্রিয়া তাকে কতখানি ভালোবেসেছিল তা অবশ্য বোঝা যায়নি। বিয়ের ঠিক পরেই ধূর্জটির প্রসঙ্গ কখনো উঠলেই, সুপ্রিয়া হেসে বলত, ও তো একটা পাগল! কোনোরকম বাস্তব বুদ্ধি নেই। সবসময় শুধু স্বপ্ন দেখছে! দীপংকর জানে, পৃথিবীতে এইরকম কিছু পাগলেরও দরকার আছে। না-হলে কারা কবিতা লিখবে! কারা ছবি আঁকবে?

এই, তোমার হয়েছে?

তার দেরি দেখে সুপ্রিয়া ডাকতে এসেছে। দীপংকর ব্যস্ত হয়ে বলল, হ্যাঁ, আসছি।

এবার তাড়াতাড়ি স্নান সেরে সে বেরিয়ে এল। দীপংকর রীতিমতন সুপুরুষ, তার চেহারায় একটি নিখুঁত পারিপাট্য আছে। মাঝে মাঝে বুকের মধ্যে একটা চিনচিনে ব্যথা ছাড়া তার শরীরে কোনো ব্যাধি নেই। ডাক্তার অবশ্য বলেছে, ওই চিনচিনে ব্যথাটাও মানসিক। সব পুরুষমানুষের বুকেই ওইরকম ব্যথা থাকে। তার নিজের বন্ধুই ডাক্তার, দীপংকরের স্বাস্থ্যকে সে হিংসে করে।

চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে সে বসবার ঘরে এসে দেখল, ধূর্জটি সেই এক গেলাসই শেষ করেনি।

দীপংকরকে দেখেই সে বলল, আমি এবার উঠব।

বসুন-না। আর একটু বসুন। আপনি এখন কোথায় থাকেন?

কালীঘাটে।

তবে তো খুব বেশি দূর নয়। চলে আসবেন মাঝে মাঝে। এদিকে এলেই, যেকোনো সময় চলে আসবেন।

ধূর্জটি প্রায় অস্ফুটভাবে বলল, আচ্ছা!

নিন আপনার গেলাস শেষ করুন। সেই একটা নিয়েই বসে আছেন দেখছি।

দীপংকর নিজের গেলাস এক চুমুকে শেষ করল। তার মনে হল, ধূর্জটি নিশ্চয়ই তার প্রেমিকার সামনে বসে মদ খেতে লজ্জা পাচ্ছে। আগে নিশ্চয়ই সে সুপ্রিয়ার সামনে কখনো মদ খায়নি।

দীপংকর ধূর্জটির গেলাসের সামনে আবার বোতলটা আনতেই ধূর্জটি গেলাসের ওপর হাত চাপা দিল। বলল, না, না, আমাকে আর না!

সে কী!

সুপ্রিয়া বলল, কেন, মদ ছাড়া বুঝি আর আড্ডা হতে পারে না?

দীপংকর বলল, ঠিক আছে, এমনিই গল্প করা যাক।

কিন্তু আর বেশিক্ষণ ধূর্জটি বসতে চাইল না। দীপংকর তাকে সদর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে এল। এবং অত্যন্ত আন্তরিকভাবে আবার বলল, আবার আসবেন কিন্তু, যখন ইচ্ছে হয় চলে আসবেন। আমরা সাধারণ লোক, তবু মাঝে মাঝে যদি আপনাদের মতন সাহিত্যিকদের সঙ্গ পাই, তাতে আমাদেরই লাভ। সুপ্রিয়ার তো একসময় খুবই বই-টই পড়ার দিকে ঝোঁক ছিল—

ধূর্জটি কোনো মন্তব্য করল না। তার মুখে আড়ষ্ট ভাবটা তখনও কাটেনি।

দীপংকর বলল, আপনাকে কি জোর করে ধরে এনে আপনার সময় নষ্ট করলাম?

ধূর্জটি এবার মুখে খানিকটা হাসি ফুটিয়ে বলল, না, না, আমার কোনো কাজ ছিল না। ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ।

দীপংকর ওপরে এসে দেখল, সুপ্রিয়া বেশ গম্ভীর। দীপংকর তবু উৎফুল্লভাবে বলল, ছেলেটা কিন্তু বড়ড রোগা হয়ে গেছে।

সুপ্রিয়া বলল, ও তো বরাবরই রোগা!

তা হোক। তবু চোখ দুটো খুব সুন্দর!

চলো, খেতে বসবে চলো!

খাবার টেবিলে সব কিছুই তৈরি। খেতে বসে বিশেষ কোনো কথাই হল না। দীপংকর কোনো প্রসঙ্গ তুললেও সুপ্রিয়া খুব একটা উৎসাহ দেখায় না।

খাওয়া শেষ করে দীপংকর বিছানায় একটা সিগারেট ধরিয়ে বসল। চোখের সামনে একটা বাংলা পত্রিকা। সুপ্রিয়ার এখন কিছু কাজ বাকি আছে। রাঁধুনি আর চাকরকে খাবার দেওয়া, সব দরজা-উরজা বন্ধ করা।

তারপর রাত্রির পোশাক পরে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে ক্রিম ঘষতে লাগল। দীপংকর মুগ্ধভাবে তাকিয়ে রইল তার দিকে। একটি সন্তান হয়ে গেলেও সুপ্রিয়াকে এখনও কুমারী মেয়ের মতনই দেখায়। সিঁথিতে সিঁদুরের চিহ্ন এতই সূক্ষ্ম যে চোখেই পড়ে না।

সুপ্রিয়া আজকাল বুলানকে নিয়েই বেশি সময় কাটায়। এতটা বোধ হয় ভালো নয়। মেয়েরা জননী ঠিকই, কিন্তু সেটাই তাদের একমাত্র পরিচয় হয়ে যাওয়া উচিত নয় মোটেই। নারী তো পুরুষেরও সঙ্গিনী বা প্রেমিকা। কোনো নারীর মধ্যে যদি খুব বেশি জননীর ভাব এসে যায়—তাহলে তার স্বামী বা প্রেমিক তাকে আর তেমনভাবে পায় না।

ধূর্জটির কবিতাটা আবার পড়ছিলাম। বেশ লিখেছে কিন্তু। ছেলেটার হাত বেশ ভালো।

সুপ্রিয়া মুখ ফিরিয়ে স্বামীর দিকে স্থিরভাবে তাকাল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, তুমি হঠাৎ আজ ওকে বাড়িতে ডেকে আনলে কেন?

এমনিই, অনেকদিন পর দেখা হল! কেন? তুমি খুশি হওনি?

খুশি অখুশির প্রশ্ন নয়। তোমার হঠাৎ এত উৎসাহের কারণ কী?

ওকে আমার ভালো লাগে বেশ!

সুপ্রিয়া এবার হাসল। এটা সত্যিই একটা হাসির কথা। স্ত্রীর প্রাক্তন প্রেমিককে কোনো স্বামীর যদি ভালো লাগে, তাহলে সেটা একটা নতুন কথা নয়? দীপংকর আর ধূর্জটি পরস্পরের শত্রু হলেই ব্যাপারটা স্বাভাবিক হত।

সুপ্রিয়া বলল, তুমি সত্যিই অদ্ভুত! দীপংকর হাসছে। হাসতে হাসতেই বলল, আমি তো সরল সাদাসিধে লোক, আমি আবার অদ্ভুত হলাম কবে থেকে?

তুমি মাঝে মাঝে এমন ব্যবহার করো, যে তার কোনো মানেই হয় না!

যেমন?

আজ ধূর্জটিদাকে প্রায় জোর করে ধরে আনলে কেন?

দীপংকর বলল, এসো, কাছে এসো। তোমার মাঝে মাঝে ধূর্জটির কথা মনে পড়ে না?

সুপ্রিয়া স্বামীর পাশে বসে পড়ে বলল, তুমি কি জানতে চাইছ যে, আমি মাঝে মাঝে ধূর্জটির কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলি কি না? সে প্রশ্নই ওঠে না। কারণ আমাকে তো কেউ জোর করে বিয়ে দেয়নি। আমি নিজের ইচ্ছেতে বিয়ে করেছি। আমি ইচ্ছে করলেই ধূর্জটিদাকে বিয়ে করতে পারতাম। আমি নিজের ইচ্ছেতেই তোমাকে বিয়ে করেছি।

কেন?

এমনিই।

এমনিই মানে? এমনি এমনি কেউ বিয়ে করে?

এতদিন বাদে এই প্রশ্ন?

প্রশ্ন নয়, শুধু কৌতূহল।

কারণ, আমি তোমাকেই ভালোবেসেছিলাম। মানুষ হিসেবে তুমি অনেক বড়ো।

দীপংকর একটু লজ্জা পেয়ে গেল। স্ত্রীর মুখে প্রশংসা শুনতে কার-না ভালো লাগে। তবু একটু লজ্জাও হয়। সে সোজাসুজি সুপ্রিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সুপ্রিয়ার নিস্পাপ মন। সে মিথ্যে কথা বলতে জানে না। দীপংকর কথা ঘোরাবার চেষ্টা করল।

তোমরা মেয়েরা কিন্তু বড় নিষ্ঠুর। নাহয় তুমি ইচ্ছে করেই ধূর্জটিকে বিয়ে করোনি। কিন্তু ও তোমাকে ভালোবাসত, তার খানিকটা সম্মানও দিতে পার না? বিয়ের পর তো এইরকম। একজনকে বন্ধু হিসেবেও মনে রাখা যায়। ধূর্জটি কিন্তু তোমাকে এখনও মনে রেখেছে।

কী করে বুঝলে? হাতের বাংলা পত্রিকাটা সুপ্রিয়ার দিকে ছুড়ে দিয়ে দীপংকর বলল, এতে ওর কবিতাটা পড়ে দেখো ভালো করে। এই কবিতাটা তোমাকে নিয়েই লেখা।

সুপ্রিয়া এবার ব্যাপারটা হালকা করে দেওয়ার জন্য বালিকার মতন হেসে বলল, তোমার আবার এত কবিতা পড়ার শখ হল কবে থেকে? তোমার অফিসের লোকেরা শুনলে হাসবে না? এমনকী এইজন্য তোমার প্রমোশানও আটকে যেতে পারে!

দীপংকরও হাসতে হাসতে বলল, সেইজন্যই এখন থেকে খুব লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা

পড়ব ঠিক করেছি। এইসব ভালো ভালো জিনিস তোমরাই শুধু উপভোগ করবে কেন?

তুমি কবিতার কিছু বোঝো না! আজকালকার কবিরা মেয়েদের নিয়ে কবিতা লেখেই না। তারা কী লেখে কিছুই বোঝা যায় না! সবই অ্যাবস্ট্রাক্ট!

পত্রিকাটা আবার তুলে দিয়ে পাতা উলটে দীপংকর বলল, এই জায়গাটা কিন্তু বেশ ভালোই বোঝা যায়। এই যে লিখছে, কী জানি আবার কবে স্থান পাব আমি তোমার চোখের সুদীর্ঘ পল্লবে! এ তো সবাই জানে, তোমার চোখের পল্লবগুলো খুব বড়ো বড়ো।

সুপ্রিয়া ম্লান হয়ে বলল, ও কবিতাটা আমাকে নিয়ে লেখা হলে আমি খুশি হতাম নিশ্চয়ই! কিন্তু ওই লাইন দুটোর আগেই একটা গাছের কথা আছে। ওটা একটা দেবদারু গাছ নিয়ে লেখা!

দীপংকর মোটেই তর্কের দিকে না গিয়ে বলল, যাই হোক, কবিতাটা আমার খুব ভালো লাগে। আমার ইচ্ছে ছিল, কবিতাটা ধূর্জটির মুখ থেকে একদিন আবৃত্তি শুনব! আর একদিন ধূর্জটি এলে মনে করে বলতে হবে তো!

ও আবার আসবে নাকি?

কেন তোমার আপত্তি আছে?

না, আপত্তি থাকবে কেন? তবু এতদিন বাদে—

আমি ধূর্জটিকে বার বার অনুরোধ করেছি আসবার জন্য। আমি বাড়িতে না থাকলেও আসবে, তোমার সঙ্গে গল্প করবে!

সুপ্রিয়া মুখটা ফিরিয়ে নিল অন্যদিকে। তারপর আস্তে আস্তে বলল, তোমার ঘুম পায়নি? আলো নেভাবে না?

দীপংকর বলল, আর একটু পরে। আচ্ছা, ধূর্জটির কবিতা আর কোন কোন কাগজে বেরিয়েছে বলো তো? একটু পড়ে দেখি!

সুপ্রিয়া ঝংকার দিয়ে বলল, জানি না। আমার অত কবিতা পড়ার উৎসাহ নেই। তোমার শখ থাকে নিজে খুঁজে দেখো!

আহা, বেচারা ধূর্জটি তোমাদের মতন মেয়েদের উদ্দেশ্য করে কবিতা লেখে, আর তোমরা সেটা পড়েও দেখো না?

সুপ্রিয়া তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকাল। ধারালো গলায় জিজ্ঞেস করল, ও কী একটা ইঁদুর?

তার মানে?

ও কী একটা বাচ্চা ইঁদুর যে তুমি ওকে নিয়ে বেড়ালের মতন খেলা করবে? ও যেখানে আছে, সেখানেই থাকতে দাও-না!

দীপংকর একটু আহত বোধ করল। সে কি কোনো অন্যায় করেছে ধূর্জটিকে ডেকে এনে? সুপ্রিয়া এত কঠিন কথা বলল কেন? বিয়ে করে স্বামী হলেই যেকোনো পুরুষমানুষ একটি নারীর সমস্ত সত্তা গ্রাস করে থাকবে, তার কোনো মানে আছে কী, স্ত্রীদের মনের কি কোনো স্বাধীনতা থাকবে না? সে কি! অন্য কারুর সঙ্গে কখনো-সখনো একটু ঘনিষ্ঠভাবে গল্প করে মনের স্ফুর্তি আনতে পারবে না? নিশ্চয়ই পারে। আর, প্রাক্তন প্রেমিকের সঙ্গে কথা বলেই সবচেয়ে বেশি মনের স্ফুর্তি আসতে পারে। এতে দোষের কী আছে?

সুপ্রিয়ার গলার আওয়াজ শুনলেই বোঝা যায় সে এবার একটু রেগে গেছে। সে বোধ হয় ভেবেছে, ধূর্জটিকে অপমান করতে চাইছে দীপংকর, তাই সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু সে তো ধূর্জটিকে একটুও অপমান করতে চায়নি। ধূর্জটি সম্পর্কে তার পরিপূর্ণ সমবেদনা, এমনকী খানিকটা সমীহের ভাবও আছে।

দীপংকর বলল, তুমি কী করে জানলে যে ও-ই ইঁদুর আর আমি বেড়াল? এর উলটোটাও তো হতে পারে?

না, তা হতে পারে না! তুমি ওর থেকে অনেক বড়ো। তোমার অনেক ক্ষমতা, তোমার অনেক চেনাশোনা, তুমি বড়ো চাকরি করো—

শুধু চাকরি দিয়েই কী মানুষের বিচার হয়?

তা হয় না বটে, কিন্তু সামাজিক প্রতিপত্তির একটা ব্যাপার আছে তো! ও তোমার সঙ্গে কোনো দিক থেকেই পারবে না! ও বেচারা যেখানে আছে সেখানেই থাকতে দাও-না! তা ছাড়া–

দীপংকর অত্যন্ত ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞেস করল, কী তা ছাড়া?

আমি যদি তোমার বদলে ওকে বিয়ে করতাম, তাহলে ওর কোনোদিনই সাহস হত না। তোমাকে ওর বাড়ি ডেকে নিয়ে যাওয়ার। ও সবসময়েই নিজেকে তোমার চেয়ে অনেক দুর্বল মনে করত!

তাহলে তুমি স্বীকার করছ, আমি দুর্বল নই।

কে তোমাকে দুর্বল বলবে?

আমি দুর্বল নই বলেই আমার কোনো ভয় থাকার কথা নয়। ধূর্জটি যদি মাঝে মাঝে এখানে আসে, তোমার সঙ্গে গল্প করে, তাতে আমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তাতে আমি। আনন্দই পাব।

তা হলে সবটাই তোমার আনন্দের জন্য। সেইজন্যই তুমি ওকে নিয়ে খেলতে চাও?

দীপংকর হো-হো করে হেসে উঠল। তারপর বলল, কিন্তু যাই বল, আমি তো কোনোদিনই ওর মতন কবিতা লিখতে পারব না তোমাকে নিয়ে!

আঃ বলছি তো, কবিতাটা আমাকে নিয়ে লেখা নয়!

দীপংকর সুপ্রিয়ার গালে একটা টোকা মেরে বলল, তুমি এত সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছ কেন? একটু ঠাট্টা করছি, বুঝতে পারছনা!

এসো, এখন শুয়ে পড়ো।

আলো নেভাবার পর দীপংকর সুপ্রিয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরল। এইভাবেই একসময় দু জনে ঘুমিয়ে পড়বে। যে প্রথম ঘুমিয়ে পড়বে, তার কাছ থেকে অন্যজন আলিঙ্গন ছাড়িয়ে নেবে। ঘুমের পর মানুষের হাত-পা বড্ড ভারী হয়ে যায়।

সুপ্রিয়াই ঘুমিয়ে পড়ল আগে। দীপংকরের ঘুম আসছে না। একবার সে উঁচু হয়ে স্ত্রীর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কী সুন্দর, কী নির্মল মুখশ্রী! সুপ্রিয়ার মুখে কোনো গ্লানির রেখা নেই। দীপংকর সুপ্রিয়াকে কোনোদিন কোনোরকম দুঃখ দিতে চায় না। বরং যেকোনো উপায়ে আরও বেশি আনন্দ দিতে চায়। সুপ্রিয়ার যেকোনো খেলনাই পছন্দ হোক, সে ঠিক জোগাড় করে দেবে।

ঘুম আসবার আগে দীপংকর সন্তুষ্টভাবে ভাবল, সুপ্রিয়া যখন হঠাৎ চটে উঠল, তাতেই বোঝা যায় সে ধূর্জটিকে একেবারে ভুলতে পারেনি। ধূর্জটির যেকোনো অপমান হলে সুপ্রিয়ারও বুকে বাজবে। এইটাই তো স্বাভাবিক।

পরদিন অফিসে বেরোবার সময় দীপংকর ভাবল, এই যে আমি এখন বেরোচ্ছি, আর ফিরব সন্ধ্যের পর, অন্তত সাতটার আগে কিছুতেই নয়। একদিনও আমি হঠাৎ আগে আগে বাড়ি ফিরে আসিনি। দুপুর বেলা হঠাৎ বাড়ি ফেরার তো প্রশ্নই আসে না। এই সুদীর্ঘ সময়টা সুপ্রিয়ার একদম ফাঁকা। ধূর্জটি তো এলেও আসতে পারে!

ধূর্জটিকে বাড়িটা চিনিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে আসতে বলা হয়েছে বার বার। সুতরাং, যেকোনো সময় আবার আসার একটা নৈতিক অধিকার তার নিশ্চয়ই আছে। ধূর্জটি একটা কলেজে পড়ায়—ওদের তো অফিসের নির্দিষ্ট সময় নেই, যখন-তখন ছুটি। ইচ্ছে করলে একদিন ক্লাসে নাও যেতে পারে। দুপুরে আসবার ওর অনেক সুযোগ।

কিন্তু আসবে কি? যদি আসেও, শুধু গল্প করবে? প্রথম দিন নিশ্চয়ই তাই। যদি পর পর কয়েকদিন আসে? সুপ্রিয়া এখনও ঠিক আগেকার মতনই সুন্দরী—ধূর্জটির কি ইচ্ছে করবে না তাকে একটু ছুঁতে। কবিরা কী খুব একটা শারীরিক ব্যাপারে আগ্রহী? চাঁদ, ফুল, পাখির মতন তারা তো শুধু নারীর রূপ দেখেই মুগ্ধ। তারা কি নারীকে শয্যাসঙ্গিনীও করতে চায়? তাহলে অবশ্য সুপ্রিয়া একটু মুশকিলে পড়বে। রাঁধুনি আছে, চাকর আছে, কোন ছুতোয় তাদের সরাবে? চাকরটা দুপুরের দিকে নিশ্চয়ই কোথাও আড্ডা মারতে যায়। রাঁধুনিকেও বাইরে পাঠাতে হলে অনেক বুদ্ধি খাটাতে হবে। অবশ্য সুপ্রিয়ার শারীরিক অতৃপ্তি নেই বলেই তো মনে হয়। স্বামীর কাছ থেকে সে সবই পায়, শুধু শুধু সে ঝুঁকি নিতে যাবে কেন? তবে যদি ধূর্জটি করুণভাবে আবেদন জানায় কিংবা জোর করে…

ধূর্জটি করুণ আবেদন জানাবে, না জোর করবে—সেটা জানার জন্য দীপংকর কৌতূহলে একেবারে ছটফট করতে লাগল। অথচ তার জানার কোনো উপায় নেই। সে তত আর কোনোদিনই স্ত্রীর ওপর গোয়েন্দাগিরি করার জন্য অসময়ে বাড়ি ফিরে আসবে না। তা সে কিছুতেই পারবে না। তার রুচিতে বাধে।

ধূর্জটি যদি আসে, তাহলে সুপ্রিয়া কি সে-কথা গোপন করে যাবে দীপংকরের কাছে? সুপ্রিয়া তো আজ পর্যন্ত কোনো কথাই লুকোয়নি। সুপ্রিয়া ধূর্জটিকে খুব বেশি প্রশ্রয় দেবে বলে মনে হয় না। তবু, ধরা যাক, ধূর্জটি যদি বাড়াবাড়ি করে? তাহলে কি সুপ্রিয়া তার স্বামীর সাহায্য চাইবে? কোনো মেয়ে কি স্বামীর কাছে প্রেমিকের নামে নালিশ জানায়? সেটা তো প্রেমের অপমান!

সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়েও দীপংকর ওপরের দিকে একবার তাকাল। আজ যেন সে তার ফ্ল্যাটের দরজাটা নতুন করে দেখছে।

দুপুর বেলা সিঁড়িতে একটাও লোক থাকে না।

অফিসে দীপংকরের আলাদা ঘর। শুধু তার স্টেনো বসে সেখানে। মেয়েটি বাঙালি ক্রিশ্চান। নাম শুনে অবশ্য কিছুই বোঝবার উপায় নেই, সরলা বিশ্বাস। অফিসে সবাই জানে যে মিসেস বিশ্বাস বিবাহিতা, একমাত্র দীপংকরকেই মিসেস বিশ্বাস বলেছে যে, তার স্বামী আলাদা একটি মেয়েকে নিয়ে থাকে—ওদের সেপারেশন হয়ে গেছে।

এয়ার কণ্ডিশনিং-এর জন্য ঘরের দরজা সবসময় বন্ধ থাকে। সরলা নিবিষ্টমনে নিজের কাজ করে যায়। কাজ না থাকলে গল্পের বই পড়ে, কথাবার্তা বিশেষ বলে। নিজে থেকে সে কোনো দিনই দীপংকরের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেনি। তবে মেয়েটি বেশ বুদ্ধিমতী। সাধারণ একজন স্টেনোর তুলনায় সে অনেকরকম বইপত্র পড়েছে, অনেক খবর রাখে। দীপংকরের বেশ ভালোই লাগে সরলাকে। আহা, মেয়েটি সাংসারিক জীবনে সুখ পেল না।

সুপ্রিয়া কয়েকবার এসেছে স্বামীর অফিসে। মিসেস বিশ্বাসের সঙ্গে তার আলাপ আছে। প্রথম প্রথম সুপ্রিয়া ঠাট্টা করেছে দীপংকরকে, দেখো, সরলা বিশ্বাসের সঙ্গে যেন প্রেম-ট্রেম করে ফেলো না!

সুপ্রিয়া জানে, তার স্বামী কোনোদিনই এ-রকম কিছু করতে পারবে না। দীপংকর অতিমাত্রায় ভদ্রলোক। অবৈধ কোনো কিছু করার মতন ব্যাপার তার চরিত্রেই নেই! তা ছাড়া, সরলা বিশ্বাসকে দেখতেও এমন কিছু সুবিধের নয়—সুপ্রিয়ার সঙ্গে কোনো তুলনাই চলে না। ধূর্জটির চেহারাও তো দীপংকরের তুলনায় বেশ খারাপ।

নিজের স্টেনোগ্রাফারের সঙ্গে প্রেম করাটা অরুচিকর ব্যাপার হলেও অপরের স্টেনোর সঙ্গে প্রেম করায় বোধ হয় কোনো দোষ নেই। অফিসের সকলেই যখন জেনে গেল যে দীপংকর বন্দ্যোপাধ্যায় কখনো সরলা বিশ্বাসের সঙ্গে হালকা সুরে কথা বলে না, তখন অন্য দু-একজন সরলা বিশ্বাস সম্পর্কে উৎসাহী হল।

দীপংকরেরই সমবয়েসি অফিসার দিলীপ বসু প্রায়ই দীপংকরের ঘরে আসে। কখনো কাজের উপলক্ষ্যে, কখনো গল্প করার জন্য। দীপংকর বুঝতে পারে, দিলীপ ইদানীং একটু ঘন ঘন আসছে, সরলার দিকে চোরাচোখে তাকায়। সরলার সঙ্গে এমন সুরে কথা বলে, যাতে সন্দেহ হয় যে দিলীপ বোধ হয় সরলার সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করে। সম্ভবত ওর বাড়িতেও যায়। সাধারণ বাঙালির ধারণা আছে যে, অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান বা ক্রিশ্চান মেয়েদের নৈতিক মান বলে কিছু নেই।

দীপংকর কিছুই লক্ষ না করার ভান করে। কোনোদিন সে দিলীপকে সামান্যতমও নিরস্ত করার চেষ্টা করেনি। শুধু একটা ব্যাপারে খটকা লাগে। দিলীপের স্ত্রী বেশ সুন্দরী এবং সপ্রতিভ, অথচ তার কাছেও দিলীপ নিশ্চয়ই সব কিছু পায় না। নইলে তার এ-রকম চুকচুঁকে ভাব কেন? এর আগেও দিলীপ কয়েকটি মেয়ের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করেছে।

দিলীপের ভালোবাসার জন্য কোনো অতৃপ্তি নেই। সে চায় একাধিক নারীসঙ্গ। এটাকে লালসাই বলা উচিত। এ জিনিসটাও ভালো কী খারাপ, তা দীপংকর জানে না। অনেকরকম মূল্যবোধই তো আজকাল বদলে যাচ্ছে। কাজের ব্যাপারে দিলীপের বেশ সুনাম, অফিসে সে একটি রত্ন–বিশেষ, সেইজন্যই নারীঘটিত দুর্বলতার ব্যাপারটা নিয়ে কেউ বিশেষ মাথা ঘামায় না।

কিন্তু যেহেতু দিলীপ দীপংকরের ঘরে এসেই সরলার সঙ্গে ভাব জমাবার চেষ্টা করে তাই দীপংকরকে মাথা ঘামাতেই হয়। দিলীপ আবার যেন বেশি বাড়াবাড়ি কিছু করে না ফেলে। এইসব কথা যদি কোনোক্রমে দিলীপের স্ত্রীর কানে যায়, তাহলে সে কত দুঃখ পাবে! তা ছাড়া অফিসের মধ্যে কোনো কিছু ঘটে যাওয়া খুবই অরুচিকর ব্যাপার, সেইজন্যই দিলীপ যখন আসে তখন দীপংকর ঘর ছেড়ে পারতপক্ষে যায় না। আজকাল দিলীপ যেন তাকে সূক্ষ্মভাবে একটু অবজ্ঞা করতে শুরু করেছে। তার ভাবখানা যেন এই, দীপংকর নিজের ঘরের মধ্যে সর্বক্ষণের জন্য সরলাকে পেয়েও কবজা করতে পারল না। কিন্তু দিলীপ বাইরে থেকে এসে কীরকম কায়দা করে নিল।

অর্থাৎ দীপংকর যেন একটা অপদার্থ। সামান্য একটা মেয়েকে দখল করার ক্ষমতাই তার নেই। তার যে ওই ইচ্ছেটাই নেই, সেটা কি কেউ বুঝবে না।

ছাত্ৰবয়েসে দীপংকর পড়াশুনো নিয়ে এত ব্যস্ত ছিল যে, মেয়েদের সঙ্গে তেমনভাবে মেশার সুযোগই হয়নি। তার জীবনে সুপ্রিয়াই প্রথম নারী। বিয়ের আগে কিছুদিন আলাপ পরিচয় হয়েছিল সুপ্রিয়ার সঙ্গে। তাকে ঠিক প্রেম বলা যায় না। তারপর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব আসে। এবং মন্ত্র পড়ে কিছু লোককে নেমন্তন্ন খাওয়াবার পরেই সুপ্রিয়া তার শয্যাসঙ্গিনী হয়ে যায়।

দীপংকরের কোনো অতৃপ্তি নেই। বরং সে প্রায়ই ভাবে, স্বামী হিসেবে সুপ্রিয়াকে তার আরও কিছু দেওয়া উচিত। সুপ্রিয়ার পূর্বপ্রণয়ীকে ফিরিয়ে দেওয়াই কি একটা উপহার নয়! তা ছাড়া, তার আর একটা কথাও মনে পড়ে, সে যেন একটু অন্যায়ভাবেই ধূর্জটির কাছ থেকে সুপ্রিয়াকে জিতে নিয়েছে। তার ভালো চাকরি আর সামাজিক মর্যাদা দিয়ে সে ধূর্জটির ভালোবাসাকে খর্ব করে দিয়েছে। সেইজন্যই ধূর্জটিকে এখন সুপ্রিয়ার সঙ্গে দেখা করার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। ধূর্জটি আর সুপ্রিয়া কি সীমা লঙ্ঘন করবে?

দীপংকর বাল্যকালে কারুকে ভালোবাসেনি। ভালোবাসার কথা ভেবে তার এখন একটু মন কেমন করে। যেন তার বাল্যকালটা ব্যর্থ গেছে। তা বলে সেটা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য দিলীপের মতন যেকোনো মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সে করতে পারবে না কখনো। সরলা বিশ্বাসকে দেখে মনে হয়, ওকে নার্স হিসেবে বেশ মানাত, অসুখের সময় এইসব মেয়ের হাতের সেবা নেওয়া যায়। কিন্তু এদের কাছে মনের কথা বলা যায় না।

মি. ব্যানার্জি, এই ড্রাফটটা ঠিক আছে?

দীপংকর মন দিয়ে একটা ফাইল পড়ছিল, চোখ তুলে তাকাল। সরলা আজ একটা নীল রঙের শাড়ি পরে এসেছে। সাধারণত সাদা শাড়িই সে পছন্দ করে।

পদাধিকারবলে দীপংকর সরলার ওপরওয়ালা। তার ইচ্ছে-অনিচ্ছের ওপরেই সরলার চাকরি নির্ভর করছে। সাধারণত নীচের কর্মচারীরা ওপরের অফিসারদের স্যার বলে। দীপংকর সেরকম সম্পর্ক রাখতে চায়নি। সরলার মুখে প্রথম কয়েক দিন স্যার সম্বােধন শুনেই তার খুব খারাপ লেগেছে। তখনই সে বলে দিয়েছিল, আমাকে নাম ধরেই ডাকবেন। সরলা অবশ্য দীপংকরবাবু বলে না, অফিস-টফিসে সেরকম নিয়মই নেই, মি. ব্যানার্জি বলে। দীপংকরও প্রথম কিছুদিন ওকে মিসেস বিশ্বাস বলে ডাকা শুরু করেছিল, এখন সরাসরি সরলাই বলে।

সরলার হাত দু-টি নিরাভরণ। ক্রিশ্চান মেয়েরা কি গয়না পরে? সরলা যে বিবাহিতা তা বোঝার কোনোই উপায় নেই। এমনকী বিয়ের আংটিটাও খুলে ফেলেছে।

সরলা, তুমি যে ছুটি নেবে বলছিলে… বাইরে কোথাও যাবে নাকি?

না, এখন আর ছুটি নেব না, কাজের খুব চাপ।

দীপংকর ব্যস্ত হয়ে বলল, না, না, তোমার ছুটি নেওয়ায় আমি আপত্তি করছি না, কাজ যা আছে আমি কয়েকদিন ঠিকই চালিয়ে নিয়ে যেতে পারব—আমি এমনি জিজ্ঞেস করছিলাম, তুমি কোথাও বাইরে বেড়াতে যাবে কিনা—তুমি তো এ বছরে একদিনও ছুটি নাওনি।

সরলা বলল, পাটনায় আমার দিদি থাকেন, ভেবেছিলাম, সেখানে যাব—কিন্তু এখন আর যাব না, দিদিই এখানে আসছেন…

সরলার স্বামীর কথা দীপংকর নিজে থেকে জিজ্ঞেস করতে পারে না। সরলাই একদিন বলেছিল। অন্য একটা কোম্পানি থেকে একটা সুন্দর ডাইরি দিয়ে গিয়েছিল দীপংকরকে। দীপংকর এ-রকম ডাইরি একাধিক পায়। সেদিন সে ডাইরিটা সরলাকে দিয়ে বলেছিল, এটা তুমি তোমার স্বামীর জন্য নিয়ে যাও!

সরলা বলেছিল, আপনি বোধ হয় জানেন না, আমার স্বামী আমার সঙ্গে আর থাকেন না।

দীপংকর অবাক হয়ে তাকিয়েছিল শুধু। মুখে কিছু বলেনি। সরলাই বলেছিল, উনি পার্ক সার্কাসে আর একটি মেয়ের সঙ্গে থাকেন, প্রায় এক বছর হয়ে গেল।

কথাগুলো বলার সময় সরলা কোনো দ্বিধা করেনি। সাধারণ বাঙালি মেয়ের মতন তার গলার আওয়াজে রাগ কিংবা দুঃখ দুঃখ ভাব নেই। সে যেন ব্যাপারটা সহজভাবেই মেনে নিয়েছে।

কিন্তু দীপংকর মেনে নিতে পারে না। নানান টুকরো-টাকরা কথায় দীপংকর আরও কয়েকটা তথ্য জেনে নিয়েছে। সরলা বিয়ে করেছিল একজন অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানকে। তবে সাধারণ ইঞ্জিন ড্রাইভার কিংবা ডকের খালাসি নয়। রীতিমতন শিক্ষিত, একটি কমার্স কলেজে পড়ায়। সরলা লোকটিকে নিজে পছন্দ করেই বিয়ে করেছিল। সেই লোকটি, বিয়ের মাত্র দু বছর বাদে, নিজের স্ত্রীকে ছেড়ে আর একটি মেয়েকে নিয়ে প্রকাশ্যে বসবাস করছে। একই শহরে। হয়তো যাওয়া-আসার রাস্তায় সরলার সঙ্গে দেখাও হয়ে যায়। তখন কীরকম মনের অবস্থা হয় সরলার? তার ভালোবাসার এই পরিণতি?

নিশ্চয়ই সাংঘাতিক দুঃখ পেয়েছে সরলা, কিন্তু মুখে তা কক্ষনো প্রকাশ করে না। দীপংকরও চিন্তা করে সরলার জন্য, কিন্তু সে-কথা বলে না সরলাকে।

দরজাটা একটু ফাঁক করে দিলীপ বলল, কী খবর, বস?

দিলীপ যদিও কথাটা বলল দীপংকরকে উদ্দেশ্য করে, কিন্তু তাকিয়ে আছে সরলার দিকে। কী লোভীর মতন দৃষ্টি! যেন চোখ দিয়ে চেটে নিচ্ছে মেয়েটির শরীর। দীপংকর বেশ বিরক্ত হল।

একসময় দিলীপ তার বেশ বন্ধুই ছিল। দিলীপের অনেক গুণ আছে। কিন্তু সরলার প্রতি তার ব্যবহারটা বড্ড চোখে লাগে। একটি মেয়ে, স্বামী পরিত্যক্তা, দুঃখের প্রতি কোনো সহানুভূতি না জানিয়ে শুধু তার শরীরের প্রতি লোভ করতে হবে? সরলা একা থাকে বলেই যেন দিলীপ ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে। সরলার প্রয়োজন এখন ভালোবাসার। কিন্তু দিলীপ তো ভালোবাসতে জানে না, সে শুধু শরীর চেনে।

দিলীপ ঘরে ঢুকে দীপংকরের টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেট তুলে নিয়ে ধরালো। তারপর অনাবশ্যক অফিসের কাজের কথা তুলল। এসব কথা দু-দিন বাদে বললেও কোনো ক্ষতি ছিল না। দীপংকর শুধু হুঁ-হাঁ করে গেল।

দিলীপ এবার সরলার দিকে ফিরে বলল, মিসেস বিশ্বাস, আমার কাছে একটা ফ্রেঞ্চ চিঠি এসেছে, আপনি একটু সেটা পড়ে মানে বলে দেবেন তো?

দীপংকর একটু অবাক হল। সরলা ফ্রেঞ্চ জানে? তাকে তো বলেনি!

সরলা বলল, কাল নিয়ে আসবেন।

সরলা জিনিসপত্র গুছোচ্ছে। সে এখন বাড়ি যাবে। দীপংকর মাঝে মাঝেই লক্ষ করছে। সরলাকে। সে তো দিলীপ সম্পর্কে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। মেয়েদের মুখ দেখলে ঠিকই বোঝা যায়। হয়তো সরলা ভদ্রতা করে দিলীপকে সহ্য করে মাত্র। তার বেশি কিছু না। কারুকে ভালোবেসে বিয়ে করতে না-পারার যে দুঃখ, তার চেয়েও ভালোবেসে এবং বিয়ে করে তারপর ব্যর্থ হওয়ার দুঃখ অনেক অনেক বেশি। সরলার সেই দুঃখটা বোঝার মতো মন দিলীপের নেই।

দীপংকরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সরলা বেরিয়ে গেল। দিলীপও তখন চঞ্চল হয়ে কাজের কথা থামিয়ে বলল চলি।

দিলীপ নিশ্চয়ই এখন সরলার পেছন পেছন যাবে। ওর গাড়িতে লিফট দিতে যাবে। ওর বাড়িতে গিয়ে জুলুম করবে!

দীপংকর এবার ইচ্ছে করেই কতকগুলি অনাবশ্যক অফিসের কথা শুরু করল। এবার দিলীপটা বুঝুক মজা!

বাড়ি ফিরে দীপংকর কৌতূহলী হয়ে থাকে। ধূর্জটি কি এসেছিল? কোনো চিহ্ন আছে? অ্যাশট্রেতে সিগারেটের ছাই? বুলান যদি কথায় কথায় বলে দেয়, আজ একজন কাকু এসেছিল তাও সে বলে না। কোথাও কোনো চিহ্ন না-পেয়ে দীপংকর রীতিমতন নিরাশ হয়। কেন এল না ছেলেটা? এত করে বলা হল।

অবশ্য ঠিক পরের দিনই যে আসবে, তার কোনো মানে নেই। একটু চক্ষুলজ্জা হতে পারে। একদিন দু-দিন সময় নিলে তারপর আর বলার কিছু থাকে না।

এমনও হতে পারে, আরও দু-একবার ঠিক দুপুরে না এসে, সন্ধ্যে বেলাতেই আসবে। যেন দীপংকরের সঙ্গেই দেখা করা উদ্দেশ্য। তারপর আস্তে আস্তে জড়তা কেটে গেলে দুপুরে চলে আসবে।

ধূর্জটি তো দীপংকরকে ঠিক ভালোরকম চেনে না। তাই বোধ হয় বুঝে নিতে চাইছে। কিন্তু দীপংকর তো বুঝিয়েই দিয়েছে যে, ধূর্জটি যেকোনো সময় আসুক, সুপ্রিয়ার সঙ্গে গল্প করুক, তার কোনো আপত্তি নেই।

সুপ্রিয়াকে এ প্রসঙ্গে কিছু জিজ্ঞেস করা যায় না। সেটা যেন একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। অন্যান্য কথাবার্তা বলার সময় হঠাৎ হঠাৎ সে, তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। সুপ্রিয়ার মুখে কি একটু উদবেগের ভাব?

দিন পাঁচ-ছয়ের মধ্যেও ধূর্জটির কোনো পাত্তা না পেয়ে দীপংকর রীতিমতন ব্যস্ত হয়ে উঠল। এ কীরকম ব্যবহার ছেলেটার! সে যদি সুপ্রিয়াকে একেবারে ভুলে গিয়ে থাকে, সেটা সুপ্রিয়ার অপমান। সুপ্রিয়ার মতন সুন্দরী আর চমৎকার মেয়েকে একবার ভালোবেসে কেউ ভুলে যেতে পারে? কক্ষনো না। ধূর্জটি সুপ্রিয়াকে কিছুতেই ভোলেনি। এখনও বুকের মধ্যে ব্যথা পুষে রেখেছে। সেদিন কি ধূর্জটিকে যথেষ্ট ভালোভাবে আসতে বলা হয়নি? আর একবার দেখা হলে দীপংকর ওকে বেশি খাতির করবে।

ধূর্জটি কাজ করে একটা কলেজে। দীপংকর সেই কলেজের নাম জানে। সেখানে গিয়ে ধূর্জটিকে অনায়াসেই খুঁজে বার করা যায়। কিন্তু দীপংকরের সেখানে যাওয়াটা কি ভালো দেখাবে? যাঃ, সেটা একটা ছেলেমানুষি ব্যাপার। খোঁজাখুঁজি করে স্ত্রীর প্রেমিকের কর্মক্ষেত্রে গিয়ে তাকে জোর করে বাড়িতে নিয়ে আসা যায় নাকি? কিন্তু ছেলেটা এল না কেন? ধূর্জটির না-আসার কোনো কারণই সে খুঁজে বার করতে পারে না। তা হলে কী দীপংকরের ব্যবহারে সত্যিই কোনো ত্রুটি থেকে গেছে? কিছুতেই সে মনস্থির করতে পারে না।

রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল দীপংকরের। সুপ্রিয়া পাশে নেই। মেয়েটা ঘুমোচ্ছে। সুপ্রিয়া বোধ হয় বাথরুমে গেছে। আবার সে ঘুমিয়ে পড়ল। আবার ঘুম ভাঙল একটু বাদেই। তার খুব পাতলা ঘুম। সুপ্রিয়া এখনও ফেরেনি কেন?

দীপংকর ধড়মড় করে উঠে বসল। তারপর একটুক্ষণ ভাবল। সুপ্রিয়া কোথায় যেতে পারে? ফ্ল্যাটের বাইরে নিশ্চয়ই যাবে না। কোথায় যাবে, রাস্তায়? অসম্ভব! ওসব নভেল নাটকে হয়। তা হলে সুপ্রিয়া নিশ্চয়ই বাথরুমেই গেছে। শরীর-টরীর খারাপ হয়নি তো হঠাৎ? তা হলে সুপ্রিয়া সেকথা দীপংকরকে বলবে না কেন? হঠাৎ কখনো পেট ব্যথা করলে সুপ্রিয়া তো দীপংকরকেই ডেকে তোলে। দীপংকর আরও একটুক্ষণ অপেক্ষা করল। আর একখানা ঘর আছে, সেখানে দীপংকরের বাবা-মা পাটনা থেকে এসে থাকেন মাঝে মাঝে। সুপ্রিয়া সেই ঘরে শুতে গেছে? কেনই-বা যাবে? বিয়ের সাত বছরের মধ্যে সুপ্রিয়া একদিনের জন্যও আলাদা শোয়নি।

তবু দীপংকর উঠে, চুপি চুপি সেই ঘরটা দেখতে গেল। অন্ধকারে ভালো বোঝা যায় না। পাশবালিশটাকেই মানুষ মনে হয়। আসলে কেউ নেই। শূন্য ঘর।

একে একে বাথরুম, বসবার ঘর সব খুঁজে দেখল। কোথাও নেই। তারপর সুপ্রিয়ার গলার আওয়াজ পেয়ে সে চমকে উঠল একেবারে।

বারান্দাটা দেখার কথা তার মনেই আসেনি। সুপ্রিয়া দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। একবার উফ ধরনের একটা আওয়াজ করল।

দীপংকর এসে নিঃশব্দে দাঁড়াল বারান্দার দিকের দরজার পাশে। তার একটু ভয় করতে লাগল। সুপ্রিয়া ওখানে দাঁড়িয়ে কী করছে? সে কি রাস্তায় দাঁড়ানো কারুর সঙ্গে কথা বলছে? তা যদি হয়, তাহলে দীপংকর মাঝপথে মোটেই গিয়ে বাধা দিতে পারবে না! সেটা দারুণ লজ্জার ব্যাপার। সুপ্রিয়া এরপর আর তার কাছে মুখ দেখাবে কী করে? সুপ্রিয়াকে এ-রকম অপমানজনক অবস্থায় দীপংকর কিছুতেই কোনোদিন ফেলবে না। হাজার হোক, সুপ্রিয়া তার অতি আদরের মেয়ের মা।

একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরই দীপংকরের ভুল ভাঙল। এ কখনো হতে পারে? সুপ্রিয়ার মতন মেয়ে কখনো রাতদুপুরে রাস্তার কোনো লোকের সঙ্গে কথা বলতে পারে? ছি, ছি, ছি, এসব কী ভাবছিল সে?

একটু এগিয়ে গিয়ে সে ডাকল সুপ্রিয়া!

সুপ্রিয়া চমকাল না। পেছন ফিরে তাকাল না পর্যন্ত। শুকনো গলায় বলল, কী?

তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছ?

এমনিই?

দীপংকর সুপ্রিয়ার পিঠে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? মাথা-টাথা ধরেছে?

না।

তা হলে রাত্রি বেলা এখানে এ-রকমভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন?

বললাম তো, এমনিই!

সুপ্রিয়া, তোমার কী হয়েছে? আমাকে বলবে না?

সঙ্গে সঙ্গে কান্নায় একেবারে ভেঙে পড়ল সুপ্রিয়া।

দীপংকর ব্যাকুলভাবে বলতে লাগল, কী হয়েছে? এই, কী হয়েছে? আমাকে বলে? দীপংকরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলতে লাগল, তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না! আর একটুও ভালোবাসো না!

সহাস্য উদারতায় দীপংকর সুপ্রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতে লাগল, পাগল! তুমি কী ছেলেমানুষ হয়ে গেলে নাকি? তোমায় আমি ভালো না বেসে পারি? তোমার জন্যই তো আমার সব।

সিনেমা হলে ঢোকার মুখেই ধূর্জটিকে দেখতে পেয়েছিল সুপ্রিয়া। ধূর্জটি তিন-চার জন বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে করতে আসছে। সুপ্রিয়া চট করে ধূর্জটির বন্ধু ক-জনকে একবার দেখে নিল। তারপর ধূর্জটির সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ার আগেই সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। স্বামীর পাশ ঘেঁসে সে ঢুকে এল ভেতরে।

এক সময় অন্ধকারের মধ্যে দীপংকর বলল, ওই দেখো ধূর্জটি বসে আছে ওখানে।

সুপ্রিয়া নির্লিপ্তভাবে বলল, তাই নাকি?

তবু, যতক্ষণ সিনেমা চলছিল, বার বার সুপ্রিয়ার চোখ চলে যাচ্ছিল ধূর্জটির দিকে। আর কিছু না, সে দেখতে চাইছিল ধূর্জটি তার দিকে পেছনে ফিরে তাকায় কিনা। কিংবা ধূর্জটির কোনো বন্ধু। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সুপ্রিয়ার বুকের মধ্যে একটা শিরশিরানি ভাব জেগে ওঠে। পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে যায়।

তারপর সিনেমা ভাঙার পর দীপংকরই আগ বাড়িয়ে ডাকল ধূর্জটিকে। একরকম জোর করেই ধূর্জটিকে নিয়ে এল বাড়িতে। দীপংকরের এতখানি আদিখ্যেতা পছন্দ হয় না সুপ্রিয়ার।

ধূর্জটির দিকে সোজাসুজি তাকাতে ইচ্ছে করে না সুপ্রিয়ার। কী লোভীর মতন দৃষ্টি! ধূর্জটি সবসময়ই এইভাবে তাকায়, যেন শাড়ি ব্লাউজ ভেদ করে একবারে ভেতর পর্যন্ত দেখে। উঃ, বিয়ের আগে কম জ্বালিয়েছে ওই ছেলেটা! কোনো লজ্জা-শরম নেই, যখন-তখন বাড়িতে এসেছে। বিশ্বসুদ্ধ বোধ হয় কারুকেই জানাতে বাকি রাখেনি যে সে ভালোবাসে সুপ্রিয়াকে। ইশ, কী ভালোবাসার ছিরি! শুধু কথার ফুলঝুরি।

সুপ্রিয়ার মামাতো ভাই রণজয়ের সঙ্গে তার কয়েকজন বন্ধুও আসত সুপ্রিয়াদের বাড়িতে। রণজয়ের বন্ধুদের মধ্যে ধূর্জটিই ছিল সবচেয়ে আমুদে আর হইচই স্বভাবের।

সুপ্রিয়াদের বাড়ির আবহাওয়ায় কখনোই খুব গম্ভীর কিংবা কড়াকড়ির ভাব ছিল না। ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গেই আড্ডা দিত, গান গাইত। একবার একটা নাটকও করেছিল। ধূর্জটিই ছিল সেই নাটকের পরিচালক। সে যে কবিতা লিখত, একথা গোপন করার চেষ্টা করেনি কখনো। সকলেই তাকে কবি কবি বলে ডাকত। যখন-তখন সে মুখস্থ বলত কবিতার লাইন, নিজের নয় অবশ্য, রবীন্দ্রনাথ কিংবা জীবনানন্দ দাশের। ধূর্জটি নিছক পাড়ার কবি ছিল না, তখনই খানিকটা নাম হয়েছিল, বড়ো বড়ো পত্রপত্রিকায় ছাপা হত তার কবিতা।

মেয়েদের সঙ্গে আগ্রহ তার বরাবরই বেশি। সব মেয়ের সঙ্গেই সে ঘনিষ্ঠতা করার চেষ্টা করত। থিয়েটারে যে চার-পাঁচটি মেয়ে ছিল, সকলকেই সে যেন নায়িকা বলে মনে করত, কথা বলত একেবারে বিগলিতভাবে। সুপ্রিয়াকেই অবশ্য জ্বালাতন করত বেশি। সুপ্রিয়া এইজন্যই পছন্দ করত না ধূর্জটিকে। গায়ে-পড়া ছেলেদের তার মোটেই ভালো লাগে না। যখন-তখন সুপ্রিয়াকে একটু একলা পেলেই—ধূর্জটি তার রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠত। বার বার শুনতে শুনতে কথাগুলি একঘেয়ে হয়ে যায়।

এক-এক সময় সে যখন কবিতা শোনাতো সুপ্রিয়াকেই উদ্দেশ্য করে লেখা, তখন মন্দ লাগত না অবশ্য। তবে ওই পর্যন্তই। তার বেশি না। অবশ্য সুপ্রিয়া কখনোই ধূর্জটিকে কোনো রূঢ়কথা বলেনি। হয়তো দু-একবার বলা উচিত ছিল। প্রশ্রয় পেয়ে পেয়ে ধূর্জটি অত্যন্ত বেশি সাহসী হয়ে উঠেছিল।

দীপংকর ধূর্জটিকে বাড়িতে নিয়ে এল যেদিন, সেদিন সুপ্রিয়া প্রথম প্রথম বিশেষ কথা বলতে চায়নি। প্রথম থেকেই কঠিন হয়ে থাকা ভালো। নাহলে ধূর্জটি যদি আবার ঘন ঘন আসতে শুরু করে? সুপ্রিয়ার বাপের বাড়িতে সে যখন-তখন আসত বটে, কিন্তু এখানে, ফাঁকা ফ্ল্যাটে সে ওরকম আসতে শুরু করলে পাড়াপ্রতিবেশীর চোখে পড়তই। তা ছাড়া ঝি চাকর রয়েছে। শুধু শুধু একটা বদনাম।

দীপংকরের আবার বড় বেশি বাড়াবাড়ি। ওকে স্কচ দেওয়া কেন? ও কী স্কচের মর্ম বুঝবে? এই স্কচের লোভেই যদি প্রতি সন্ধ্যে বেলা আসতে চায়!

ধূর্জটি অবশ্য প্রায় চুপচাপই বসে আছে। আগে সে ছটফটে ছিল খুব, কথাও বলত অনর্গল। এখন সে গুম হয়ে আছে কেন? সে কি বদলে গেছে না সুপ্রিয়ার ওপর রেগে আছে? দীপংকরের সঙ্গে যখন সুপ্রিয়ার বিয়ের ঠিক হয়, তখন সুপ্রিয়া সে-কথাটা ধূর্জটিকে জানায়নি পর্যন্ত। ধূর্জটিকে তো সেরকম গুরুত্বই দেয়নি কখনো। ধূর্জটি যে সুপ্রিয়াকে বিয়ে করার জন্য পাগলামি শুরু করেছিল কিন্তু সুপ্রিয়াকে বিয়ে করার যোগ্যতাই ছিল কিনা, সে-কথা তো ভেবেও দেখেনি। তবে আগে ধূর্জটিকে দেখলে বেশ মজা লাগত সুপ্রিয়ার এখন এতদিন পর, তাকে গম্ভীরভাবে বসে থাকতে দেখে ভয় লাগছে। মুখ-চোখ স্বাভাবিক করে বসে থাকলেও বুক কাঁপছে সুপ্রিয়ার।

সুপ্রিয়ার স্বামী ওদের দুজনকে বসিয়ে রেখে হঠাৎ বাথরুমে চলে গেল স্নান করতে। সুপ্রিয়া জানে এর মানে কী! দীপংকর চায় তার সঙ্গে ধূর্জটির একটু নিরালায় কথাবার্তার সুযোেগ দিতে। দীপংকর ধরেই বসে আছে, সে এখনও ধূর্জটির ভালোবাসা ভুলতে পারেনি। দীপংকর উদার হতে চায়। উদার হওয়া দীপংকরের নেশা। অফিসে, বন্ধুদের মধ্যে এমনকী স্ত্রীর কাছে সবসময় তার উদার সেজে না থাকলে যেন চলে না!

দীপংকর বাথরুমে যাবার পর ধূর্জটি সোজাসুজি সুপ্রিয়ার চোখের দিকে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, কেমন আছ?

সুপ্রিয়া বলল, ভালোই তো আছি।

সাজানো ফ্ল্যাটটার চারদিকে তাকিয়ে হঠাৎ ঠাট্টার সঙ্গে ধূর্জটি বলল, হ্যাঁ ভালোই তো আছ দেখছি! মেয়েরা তো এ-রকম ভালো থাকতেই চায়।

এই ধরনের ব্যাঁকা বাঁকা কথা সুপ্রিয়া পছন্দ করে না। সে উলটে বলল, কেন, তুমি বুঝি খারাপ আছ?

আমি কখনোই খারাপ থাকি না। তোমাদের এই দামি পেতলের জিনিসটা কি অ্যাশট্রে? এতে ছাই ফেলতে পারি?

হ্যাঁ, ফেলতে পার।

ধূর্জটি সিগারেট ধরালো, তারপর জিজ্ঞেস করল, তোমার স্বামী প্রায় জোরাজুরি করে আমাকে আজ ধরে আনল কেন বলো তো?

সুপ্রিয়া বলল, জোরাজুরি আবার কী? তোমার যদি একান্তই না আসার ইচ্ছে থাকত, তুমি বললেই পারতে! জোর করে কি কেউ কারুকে আনতে পারে?

এবার ধূর্জটি হাসল।

সত্যি কথা বলতে কী, আমার একটু একটু ইচ্ছে ছিল তোমার সুখের সংসারটা দেখে যাওয়ার!

সুখের সংসার—এই কথা দু-টির ওপর ধূর্জটি এমন জোর দিল যেন সুপ্রিয়া সত্যি সত্যি অসুখী। সে কেন অসুখী হতে যাবে? তার তো কিছুরই অভাব নেই। অভাব না থাকলেও মানুষের অনেকরকম দুঃখ থাকতে পারে, কিন্তু সুপ্রিয়ার তো সেরকমও কিছু নেই। স্বামী হিসেবে দীপংকরের কোনো খুঁত নেই, তা ছাড়া ফুটফুটে একটা সন্তান রয়েছে সুপ্রিয়ার। একমাত্র ধূর্জটিই শুধু বুঝি তাকে অসুখী করতে পারে এখন। ধূর্জটির যদি সেরকম কোনো উদ্দেশ্য থাকে। ধূর্জটিই শুধু প্রশ্ন করছে, সুপ্রিয়া নিজের থেকে কিছুই বলেনি এপর্যন্ত। একটা কিছু বলা উচিত বোধ হয়।

সুপ্রিয়া জিজ্ঞেস করল, তোমার খবর-টবর কী; তুমি কেমন আছ?

ধূর্জটি হালকাভাবে বলল, ভালোই। এই চলে যাচ্ছে আর কী!

তারপর আপনমনেই সে বলল, এ-পাড়াটা আমার খুব চেনা।

সুপ্রিয়া বলল, আমরা এই ফ্ল্যাটে মাত্র দু-মাস আগে এসেছি! ধূর্জটি চুপচাপ খানিকক্ষণ সিগারেট টানল। তারপর খুব সাধারণ কথার কথা হিসেবে জানালো, তুমি আগের মতনই সুন্দর আছ!

এইকথাটা শোনার অভ্যেস আছে সুপ্রিয়ার। অনেকের কাছেই শোনে, তবে, প্রতিবারই একটু একটু ভালো লাগে। যেন একটা নিরাপত্তা বোধ। কেউ তাকে অবহেলা করতে পারবে না এখনও।

ধূর্জটি একটুক্ষণ নিঃশব্দ হাসিমুখে তাকিয়ে রইল সুপ্রিয়ার দিকে। ঠিক চোখের ওপরে চোখ। এতক্ষণ গোমড়া মুখে থাকার পর এখন যে একটু হাসি ফুটেছে ধূর্জটির, তাতেই একটু খুশি হয়ে উঠল সুপ্রিয়া।

ধূর্জটি কিন্তু পরেই আঘাতটা দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিচ্ছিল। সুপ্রিয়ার মুখের খুশির ভাবটা লক্ষ করে সে আলটপকা বলে ফেলল, অমলের সঙ্গে দেখা হয়?

সুপ্রিয়া একেবারে কেঁপে উঠল। সে কি এই কথাটারই অপেক্ষা করেছিল? কিংবা ভেতরে ভেতরে সবসময় অস্বীকার করার চেষ্টা করছিল যে, না, ও কথা আর কেউ কোনোদিন বলবে না!

তবু মুখের ভাব যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক রেখে সে বলেছিল, অমল, না তো. সে কি কলকাতায় থাকে নাকি?

তা ছাড়া কোথায় থাকবে?

দিল্লিতে চাকরি নিয়েছে শুনেছিলাম?

সে তো মাত্র বছর খানেকের জন্য। তিন-চার বছর ধরে তো এখানেই আছে।

সুপ্রিয়া নিরাসক্তভাবে বলল, কী জানি, আমি আজকাল একদম সময় পাই না, কারুর খবরই রাখি না—

ধূর্জটি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, সুপ্রিয়া তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আসছি আমি এক্ষুনি।

আর সে সহ্য করতে পারবে না। এখন খানিকটা মনের জোর না করে নিলে সোজাসুজি তাকাতে পারবে না ধূর্জটির দিকে। বাথরুমের দরজার কাছে গিয়ে সে দীপংকরকে জিজ্ঞেস করল, এই তোমার আর কত দেরি?

দীপংকর না বেরোনো পর্যন্ত সুপ্রিয়া আর বসবার ঘরে গেল না। ধূর্জটির সামনে সে একা যেতে পারবে না! সে শোয়ার ঘরে আয়নার সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এখন সুপ্রিয়া তার স্বামীর আড়ালে আশ্রয় নিতে চায়।

দীপংকর এসে পড়বার পর ধূর্জটি আর বিশেষ কিছু বলেনি। হয়তো সুপ্রিয়ার চোখ দিয়ে মিনতি ঝরে পড়েছিল। ধূর্জটি কি এতটা নীচে নামবে যে সে সুপ্রিয়ার স্বামীর সামনেই অমলের কথা…

যাওয়ার আগে ধূর্জটি শেষবার তীক্ষ্ণচোখে তাকিয়েছিল সুপ্রিয়ার দিকে। সেই দৃষ্টিতে ফুটে উঠেছিল একটাই কথা—সে অমল সম্পর্কে অনেক কিছু জানে!

দীপংকর বার বার অনুরোধ করল ধূর্জটিকে আবার আসতে। কেন, কেন, কেন? কেন ধূর্জটি আসবে? হে ভগবান, ধূর্জটি যেন আর না আসে।

রাত্রি বেলা বিছানায় শুয়েও দীপংকর বার বার বলতে লাগল ধূর্জটির কথা। আজকাল আবার ও কবিতা পড়তে শুরু করেছে। এ আবার কী উদ্ভট বাতিক দীপংকরের? বিয়ের সাত বছর বাদে সে কেন পুরোনো বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে! এর আগে তো সে কোনো কবিতার বইয়ের পাতাও উলটে দেখেনি কখনো! ধূর্জটি কেন তাকে নিয়ে কবিতা লেখে এখনও? যদিও দীপংকরের কাছে অস্বীকার করেছে, কিন্তু সুপ্রিয়া মনে মনে ঠিকই জানে যে ধূর্জটি ওই কবিতাটি তাকে নিয়েই লিখেছে। ধূর্জটির তো সুপ্রিয়ার ওপর খুব রেগে থাকার কথা।

দীপংকর যত ইচ্ছে ভাবুক যে ধূর্জটি এখনও মনে মনে সুপ্রিয়াকে ভালোবাসে। তাতে কোনো ক্ষতি নেই। মনে মনে ভালোবাসা তো কেউ আটকাতে পারে না! বিয়ের আগে মেয়েরা দু-একটা ছোটোখাটো প্রেম করে থাকলেও স্বামীরা এখন তাতে কিছু মনে করে না। বিশেষত দীপংকরের মতন সবসময় উদারতা দেখাতে পছন্দ করে যেসব স্বামী।

কিন্তু বিয়ের পরে যদি—?

অমল, অমল, অমল!

নামটা মনে পড়লেই সুপ্রিয়ার এখনও গাঁ কাঁপে। অমল তার বুকের মণি, অমলই তার সর্বনাশ!

কত সাবধানে সুপ্রিয়া লুকিয়ে রেখেছে অমলের কথা। এমনকী তার বাড়ির কেউ জানে না কিছু।

সুপ্রিয়ার যখন বারো-তেরো বছর বয়েস, সেই সময় সে হঠাৎ একদিন টের পায় যে তার জীবনে একজনই দেবতা, তার নাম অমল। অথচ তার আগে কিছুই বোঝেনি, কতদিন ধরে পাশাপাশি বাড়িতে আছে। অমল তার থেকে চার-পাঁচ বছরের বড়ো, সেই সময় সে কৈশোর ছাড়িয়ে সদ্য যুবক, খুব গম্ভীর, জেদি আর অভিমানী। খুব ছোটোবেলায় অমল তাদের বাড়িতে খেলতে আসত, একবার তাদের বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে পড়ে গিয়ে অমলের থুতনি কেটে যায়। অনেকটা মেয়েলি ধরনের চেহারা, তার ডাক নাম ছিল অমু, দূর থেকে যখন কেউ অমু অমু বলে ডাকত, তখন মনে হত যেন একটি মেয়েকেই ডাকা হচ্ছে।

কৈশোর ছাড়াবার পর অমল একেবারে বদলে যায়। হঠাৎ লম্বা হয়ে যায় অনেকখানি, শক্ত পুরুষালি চেহারাটা বেরিয়ে আসে। পাড়ার কারুর সঙ্গে সে আর মেশে না, একা একা থাকে। বই পড়ার সাংঘাতিক নেশা, শুধু গল্প-উপন্যাস নয়, অন্য ধরনের বই, কলেজ থেকে বেরিয়ে দুপুরগুলো সে বিভিন্ন লাইব্রেরিতে কাটায়। অনেক সময় মাঝরাত্রে, তার ঘর থেকে ভেসে আসে রেকর্ডের সেতার বাজনা।

একদিন সন্ধ্যে বেলা ছাদে উঠে সুপ্রিয়া দেখছিল, পাশের ছাদে, স্বামী বিবেকানন্দর ভঙ্গিতে বুকের ওপর আড়াআড়ি হাত রেখে অমল স্থিরভাবে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। কী অদ্ভুত সেই ভঙ্গি। তখন চৈত্রমাস, পরিষ্কার আকাশে অসংখ্য জ্বলজ্বলে তারা, অমল যেন, খালি চোখেই সেই নক্ষত্র জগতের সমস্ত ইতিহাস পাঠ করছে।

সেই প্রথম সুপ্রিয়ার বুক কাঁপল। সে একটি কথাও বলেনি। শুধু আড়ালে দাঁড়িয়ে নির্নিমেষে অমলকে দেখেছে। এর আগে সে অমলের সঙ্গে কত স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারত, সে-দিন পারল না।

নীচে নেমে আসার পর, সে-দিন সর্বক্ষণ, এমনকী ঘুমের মধ্যেও বার বার জেগে উঠে সে চোখের সামনে অমলের সেই মূর্তিটাই দেখতে লাগল বার বার।

এরপর থেকে অমলের সঙ্গে যতবার দেখা হয়েছে, জানলা দিয়ে কিংবা বাড়ির সামনের রাস্তায়, সুপ্রিয়া কথা বলতে পারেনি, চোখ নামিয়ে নিয়েছে। অমলও নিজের থেকে আর কোনো কথা বলে না। শুধু গম্ভীরভাবে তাকিয়ে থাকে।

অথচ অমলের কাছে যাওয়ার জন্য, তার সঙ্গে দুটো কথা বলার জন্য সুপ্রিয়ার বুকের মধ্যে আকুলিবিকুলি করে। তার মনে হয়, যেন অমলের কাছে একটা দারুণ শক্তিশালী চুম্বক রয়েছে, সেটা প্রবলভাবে সারাক্ষণ টানছে সুপ্রিয়াকে। অমল কিন্তু মুখে সেরকম কোনো ভাবই দেখায় না।

এর মাস চারেক পরেই অমলরা চলে গেল পাড়া ছেড়ে।

সে-রাত্তিরে সুপ্রিয়া কেঁদে কেঁদে তার বালিশ ভিজিয়ে দিল, কেউ টের পায়নি! কী অসহ্য কষ্ট বুকের মধ্যে! কারুকে তো একথা বলাও যায় না!

সুপ্রিয়াদের পাশের বাড়িতে অমলরা ভাড়া থাকত। এখন ওরা বালিগঞ্জ প্লেসে নিজেদের বাড়ি বানিয়ে উঠে গেল। কিন্তু মানুষ তো পুরোনো পাড়ায় বেড়াতেও আসে। কিন্তু অমল আর একবারও এল না। যেখানে ওরা সাত-আট বছর একটানা ছিল, সে-জায়গা সম্পর্কে অমলের যেন আর কোনো মায়াই নেই। সুপ্রিয়া নামের একটি মেয়ের অস্তিত্বও যেন সে ভুলে গেছে।

স্কুল ছাড়িয়ে কলেজে ভরতি হওয়ার পর সুপ্রিয়া প্রথম একা একা বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা পেল। তখন তার ইচ্ছে হত বালিগঞ্জ প্লেসে গিয়ে ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু জায়গাটা সে চেনে না। ঠিকানাও জানে না অমলদের বাড়ির, কারুকে জিজ্ঞেস করাও যায় না।

সেকেন্ড ইয়ারে উঠেই সুপ্রিয়া পূৰ্ণযুবতী হয়। তার শরীর শতদলের মতন মেলে দেখায় তার রূপ। যারাই তার দিকে তাকায়, সহজে চোখ ফেরায় না।

সেই সময় আচম্বিতে একদিন রাস্তায় অমলের সঙ্গে দেখা।

সুপ্রিয়াই প্রথম ডেকেছিল, অমলদা–!

অমল মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছিল। তার দু-চোখে গভীর বিস্ময়।

সে যেন, সুপ্রিয়াকে চিনতেই পারছে না। এ যেন, অন্য এক সুপ্রিয়া। বিরাট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, সুপ্রিয়া, তুই?

সেদিন বেশি কথা হয়নি। অমলের কী একটা জরুরি কাজ ছিল। তবু যাওয়ার সময় সুপ্রিয়া জিজ্ঞেস করল, অমলদা, তোমাদের নতুন বাড়িটা কোথায়?

অমল বলল, এই তো কাছেই–!

তারপর সে ঠিকানাটা বলল এবং দ্রুত একটা বাসে উঠে পড়ল।

সারারাস্তা সুপ্রিয়া সেই ঠিকানাটা মুখস্থ করতে করতে এল। কিছুতেই আর ভুললে চলবে না।

তার পরদিন সুপ্রিয়া তার জীবনের প্রথম চিঠি লিখল অমলকে। চিঠিতে কিছুই ছিল না, নিছক সব ছেলেমানুষি কথা, তবুও সেই চিঠি লিখতে তার হাত কাঁপছিল।

অমল কিন্তু চিঠির উত্তর দিল না। অত পড়ুয়া যে-অমল সে এক লাইন চিঠি লিখতে পারে? সাত দিন, দশ দিন, পনেরো দিন অপেক্ষা করার পর সুপ্রিয়ার মন অভিমানে পাথর হয়ে গেল। আর সে অমলের কথা ভাববে না। অমল থাক তার অহংকার নিয়ে।

যোলো দিন পর, ঠিক যেখানে আগের বার দেখা হয়েছিল সেইখানে অমলকে আবার দেখতে পেল সুপ্রিয়া। এবার অমল নিজেই এগিয়ে এসে বলল, আমি পাটনায় গিয়েছিলাম, ফিরে এসে কাল তোমার চিঠি পেলাম।

ছেলেবেলায় সুপ্রিয়াকে অমল ডাকত তুই বলে, সুপ্রিয়া বলত, অমলদা। কিছুদিনের মধ্যেই দু-জনেরই সম্ভাষণ বদলে গেল।

বালিগঞ্জ প্লেসে অমলদের নতুন বাড়িটা বেশ বড়ো। কিছু অংশ ভাড়া দেওয়া হবে কি হবে, সে-বিষয়ে অমলের বাবা আর মা এখনও একমত হতে পারেননি! অনেকগুলো ঘর ফাঁকা পড়ে আছে! অমলের দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। অমলের ছোটোভাই খঙ্গপুর আই আই টি-তে পড়ে—সবাই একসঙ্গে এলে বাড়িটা তবু জমজমাট হয়। অন্য সময় খাঁ খাঁ করে প্রায়।

তিনতলায় একটিই মাত্র ঘর, সেটা অমলের নিজস্ব। অমলের মা তখন অসুস্থ, তাই সেই ঘরের জিনিসপত্রে কোনো মেয়েলি হাতের স্পর্শ নেই। অমল সুপ্রিয়াকে এনে সেই ঘরে বসালো।

বাইরে এত গম্ভীর থাকলেও অমল তার ঘরের মধ্যে উচ্ছল। সুপ্রিয়ার সঙ্গে তার কত কথা। সেকথা একদিন দু-দিনে ফুরোয় না। প্রায় কলেজ ছুটির পর, কোনো কোনোদিন ছুটি হওয়ার আগেই সুপ্রিয়া চলে আসে অমলদের বাড়িতে।

অমলের কাছ থেকেই সুপ্রিয়া তার শরীরে প্রথম পুরুষের স্পর্শ পায়।

কিন্তু অমল কখনো লোভীর মতন সুপ্রিয়ার সঙ্গে কর্কশ ব্যবহার করেনি। কত নরম, কত সুন্দর তার আদর। অমলের বুকে মাথা রেখে সুপ্রিয়া সেই চুম্বকটির সঠিক সন্ধান পেয়েছে।

অন্যান্য ছেলেরা তখন সুপ্রিয়ার স্তুতি করে, ধূর্জটি তাকে নিয়ে কবিতা লেখে, দাদার অন্যান্য বন্ধুরাও তাকে নিয়ে কম আদিখ্যেতা করে না, তাদের সকলের কাছে সুপ্রিয়া যেন, এক রাজকুমারী। একমাত্র অমলের কাছেই সুপ্রিয়া ক্রীতদাসীর মতন। এখানে সুপ্রিয়ার ইচ্ছে অনিচ্ছের কোনো দাম নেই, অমল যা বলবে, তাই শুনতে হবে। অমল যেদিন আসতে বলবে, সে-দিন আসতেই হবে সুপ্রিয়াকে, তা সে যতরকম বাধা তার থাকুক না কেন। সুপ্রিয়া তবু এতেই কৃতার্থ।

ওদের মধ্যে ভালোবাসার কথা হয়নি, বিয়ের কথা হয়নি, তবু যেন, ধরে নেওয়াই হয়েছিল, ওদের জীবন একেবারে আচ্ছন্ন। পরস্পরকে ছেড়ে ওরা বাঁচতে পারবে না।

যদিও স্ট্যাটিসটিকসে পিএইচ ডি করছে তখন অমল, তবু সেই সময় খুব গান-বাজনার দিকেও ঝুঁকেছে! নিজে গাইতে পারে না, কিন্তু সরোদ শেখা শুরু করেছে খুব মন দিয়ে।

যেমন একসময় অমল তার সুপ্রিয়াদের পাশাপাশি বাড়িতে ছিল, সেইরকম অমলদের নতুন বাড়ির ঠিক পাশের বাড়িতে বনানী নামে একটি মেয়ে থাকে। মেয়েটি ভালো গান গায়। সারাদিনরাতই যেন সে গানের চর্চা করে, অনেক বড়ো বড়ো ওস্তাদ আসে তাদের বাড়িতে। অমলের ঘরে বসেও সেই গান শোনা যায়। কথা বলতে বলতে হঠাৎ চুপ করে গিয়ে অমল সেই গান শুনেছে।

দাদার বন্ধুরা একদিন হইচই করে মিউজিক কনফারেন্সে গিয়েছিল দল বেঁধে। সারারাত। সুপ্রিয়াকে নিয়ে গিয়েছিল। সুপ্রিয়া শুধু রাজি হয়েছিল এইজন্যই যে তাহলে সে দূর থেকেও অমলকে দেখতে পাবে। অমল নিয়মিত কনফারেন্সে যায়। সুপ্রিয়া তো আর অমলের সঙ্গে সারারাত গান শুনতে যেতে পারত না।

সেদিন দাদার বন্ধুদের মধ্যে ধূর্জটিও ছিল। ধূর্জটি সুপ্রিয়ার পাশে বসে খুনসুটি করছিল সারাক্ষণ। গান শোনার বদলে সুপ্রিয়ার রূপের স্তব করার দিকেই তার বেশি উৎসাহ। সুপ্রিয়া শুধু একদৃষ্টে তাকিয়েছিল, তাদের তিন সারি সামনে, ঠিক ডান দিকের কোণের সিটে বসা অমলের দিকে। একসময় ধূর্জটিও দেখতে পেল অমলকে।

ধূর্জটি আর আরও দু-একজন বন্ধু অমলকে আগে থেকেই চেনে। ধূর্জটি অমলকে ডেকে নানারকম ঠাট্টা-ইয়ার্কি করতে শুরু করে। অমল বাইরে যে-রকম গম্ভীর থাকে সেইরকম গম্ভীরই রইল। দুটো-একটার বেশি কথাই বলল না। সুপ্রিয়াও কথা বলেনি বিশেষ, অন্যদের সামনে অমলের সঙ্গে কোনোরকম পরিচয়ের কথাই বোঝাতে চায়নি। শুধু অমলের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলেছে, ও তো আমার, ও আমার, ও শুধু আমার–।

কিন্তু শেষপর্যন্ত সুপ্রিয়া অমলকে বিয়ে করতে পারেনি। কী যে হয়ে গেল সেই সময়টা। অমলের ধারণা হল সুপ্রিয়া বুঝি ধূর্জটিকে ভালোবেসে ফেলেছে। অমল সেই নিয়ে একটু সামান্য ভসনা করতেই সুপ্রিয়া চটে উঠেছিল। অমল এটুকুও বিশ্বাস করতে পারে না তাকে? আস্তে আস্তে, আরও দু-একটা ঘটনার পর সুপ্রিয়া বুঝেছিল অমলের ঈর্ষা কী সাংঘাতিক। আর কোনো পুরুষ, সুপ্রিয়ার সঙ্গে একটা কথা বললেই সে সহ্য করতে পারে না। এই নিয়ে সুপ্রিয়াকে আঘাত দিয়ে শুধু কাঁদায়নি সে, তাকে নিয়ে গেছে অপমানের শেষ সীমায়। কারুর সঙ্গে একটু হেসে গল্প করা মানেই কী প্রেম? তাহলে সুপ্রিয়া কী অমলের সঙ্গে বনানীকে একটা ব্যাপারে হিংসে না-করে পারত না। সুপ্রিয়ার একদম গানের গলা নেই। ছেলেবেলা থেকেই সে বুঝে গিয়েছিল, তার দ্বারা গান হবে না কোনোদিন। টনসিল অপারেশনের পর তার গলার জোর একদম কমে গেছে। তাই সুপ্রিয়া কিছুদিন সেতার শেখার চেষ্টা করেছিল। শেষপর্যন্ত ধৈর্যে কুলোয়নি। কিন্তু ছবি আঁকাটা সে ভালোই শিখেছিল।

অমল ছিল গান-পাগল। ওইখানেই বনানীর জিত, সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় সে নিশ্চয়ই সুপ্রিয়ার কাছে হেরে যাবে। কিন্তু অমল যখন মুগ্ধ হয়ে বনানীর গান শুনত, তখন হিংসেয় জ্বলে যেত সুপ্রিয়ার বুক। যদিও সে নিজেই জানত, এ-রকম হিংসে করা খুব খারাপ, ছোটোমনের পরিচয়। কিন্তু উপায় কী, তার হিংসে হলে সে, আটকাবে কী করে? হিংসে তো ভালোবাসারই মতন, কখন কী করে আসে বোঝা যায় না।

বনানীর গান শোনার জন্য অমল ঘন ঘন তার বাড়ি যাওয়া-আসা শুরু করতেই একদিন সুপ্রিয়া রাগে প্রায় অন্ধ হয়ে গেল।

সেদিন অমল তাকে দুপুর সাড়ে তিনটের সময় তার বাড়িতে আসতে বলেছিল। ঠিক সময় পৌঁছে শুনল, অমল বাড়ি নেই। বাড়ির বুড়ো চাকরটি সদর দরজার সামনেই বসেছিল। সে বলল, দাদাবাবু পাশের বাড়িতে গেছেন। আপনি একটু বসুন দিদিমণি। দাদাবাবু আপনাকে বসতে বলে গেছেন।

অমলের মা তখন ঘুমোচ্ছেন, তাঁকে জাগাল না সুপ্রিয়া। সে একা অমলের ঘরে বসে রইল। পাশের বাড়ি থেকে বনানীর গান ভেসে আসছে। খুব ঢিমে লয়ে তান বিস্তার রেওয়াজ করছে। অমল বসে আছে ওখানে। শুধু অমল আর বনানী? না, তবলার আওয়াজ শোনা

যাচ্ছে যখন, তখন একজন তবলচিও আছে। তবু সুপ্রিয়ার বুকটা পুড়ে যেতে লাগল। অমলের সময়ের হুঁশও নেই? তাকে আসতে বলে সে এখন বনানীর কাছে বসে আছে? সুপ্রিয়ার চেয়েও গান তার কাছে বড়! ওর থেকে অনেক ভালো গান তো রেকর্ড বাজিয়ে শোনা যায়।

এক ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর, রাগের বদলে সুপ্রিয়ার বুক থেকে একটা দুঃখের দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। তার মনে হল, অমল তাকে বিয়ে করে কোনোদিন সুখী হবে না, কারণ সে গান গাইতে পারে না। এমনকী বিয়ের পরেও যদি অমল বনানীকে তাদের বাড়িতে গান গাইবার জন্য নিয়ে আসে? সুপ্রিয়া তা সহ্য করতে পারবে না কিছুতেই। তার চেয়ে থাক অমল বনানীকে নিয়েই। অমলকে জব্দ করার জন্যই যেন সুপ্রিয়া তক্ষুনি দুম করে বিয়ে করে ফেলল। হাতের কাছেই সুযোগ্য পাত্র ছিল দীপংকর। বাবা-মায়ের সামান্য ইঙ্গিতেই সুপ্রিয়া তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল।

এমনই নিষ্ঠুর অমল যে সুপ্রিয়ার বিয়ের কথা শুনেও সে একটিবার আসেনি তার কাছে। একটিবারও অনুনয় করেনি সুপ্রিয়াকে। সে যেন ধরেই নিয়েছিল, সুপ্রিয়া সম্পূর্ণ তার নিজস্ব। সুপ্রিয়ার আলাদাভাবে ইচ্ছে-অনিচ্ছের কোনো দামই নেই। সুপ্রিয়া বিদ্রোহ করতেই সে যেন একবারে তাচ্ছিল্য করল ব্যাপারটাকে। হয়তো সে ভেবেছিল, বিয়ের আসর থেকেও শেষমুহূর্তে নিজের ভুল বুঝতে পেরে, সুপ্রিয়া দৌড়ে চলে আসবে তার কাছে। সেই অহংকার নিয়ে অমল দূরেই রয়ে গেল।

দীপংকর অবশ্য স্বামী হিসেবে খুবই ভালো। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য। সে নিরাপত্তা বোধ জাগিয়ে রাখতে পারে সবসময়। এক-একজন মানুষ থাকে এ-রকম, যাদের কাছাকাছি এলেই মনে হয়, এরা কখনো অন্য কারুকে কিছুতেই কোনো বিপদে পড়তে দেবে না। দীপংকরের স্নেহ, দয়া, মায়া সবই ঠিক ঠিক আছে। অবশ্য এরমধ্যে ভালোবাসার কোনো প্রশ্নই নেই। দীপংকর ভালোবাসতে জানে না। যারা ভালোবাসতে জানে না, তারাই মুখে সবসময় বলে, আমি তোমায় ভালোবাসি, আমি তোমায় ভালোবাসি! সুপ্রিয়া একবার নিজে ভালোবেসেছে বলেই জানে, ভালোবাসা কাকে বলে? দীপংকরের কাছ থেকে সেই জিনিস সে কখনো পাবে না। যাক তাতে তো কোনো ক্ষতি নেই। বিবাহিত জীবনে ভালোবাসা এমনিতেই আস্তে আস্তে মরে যায়। বিয়ের সাত বছর বাদে সুপ্রিয়া বুঝতে পেরেছে, অন্য অনেকের জীবনেও দেখেছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে-বন্ধনে সংসারটা টিকে থাকে, তার নাম ভালোবাসা নয়। সেটা এক ধরনের বোঝাপড়া।

বিয়ের দু-বছর বাদে একটা নেমন্তন্নবাড়িতে হঠাৎ অমলের সঙ্গে দেখা। দোতলার একটা ছোটো ছাদে দাঁড়িয়েছিল অমল, তাকে একপলক দেখেই সুপ্রিয়া যেন পাথর হয়ে গেল। বুকের মধ্যে এমন ঢিপ ঢিপ শব্দ হতে লাগল, যেন পাশের লোকও শুনতে পেয়ে যাবে। সুপ্রিয়া চট করে সরে গেল।

মেয়েদের কতরকম অভিনয় করতে হয়। সুপ্রিয়াকে হাসি মাখিয়ে রাখতে হল মুখে, চেনাশুনো কতরকম লোকের সঙ্গে কতরকম কথা বলতে হল, এদিকে তার ভেতরে ভেতরে একটা ঝড় বইছে, শরীরটা কাঁপছে একটু একটু। এত ভালোবাসাও ছিল বুকের মধ্যে। সুপ্রিয়া তো ভেবেছিল, সে অমলকে একেবারে ভুলে যেতে পারবে। আর কোনোদিন সে অমলের কথা চিন্তাও করবে না। এই দু-বছরে, তো সে অমলের কোনো খবর নেওয়ার চেষ্টাও করেনি। আজ একবারমাত্র চোখের দেখায় সব বাঁধ ভেসে গেল!

তারপর যতবারই সুপ্রিয়া সেই ছাদের দিকে এসেছে, ততবারই দেখেছে, অমল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে সেই একভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সে স্বভাব-গম্ভীর, তাকে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কেউ কিছু ভাববে না। অমলের চোখে চোখ পড়ল সুপ্রিয়ার, অমল একদৃষ্টিতে তাকেই দেখছে, কিন্তু আর কোনো উত্তেজনার চিহ্ন নেই। সুপ্রিয়াকে দেখে সে খুশি হয়েছে, না রেগে গেছে, তাও বোঝা যায় না।

সেদিন সুপ্রিয়া বুঝেছিল, সে কত দুর্বল। অমলকে দেখামাত্র সে সব পুরোনো রাগ ভুলে গেছে। অমলের মতন কঠিন সে থাকতে পারে না। অমলের ভেতরে চুম্বকটা তাকে সাংঘাতিকভাবে এখনও টানছে।

সেদিন অমলের সঙ্গে তার একটাও কথা হল না। অমলের সঙ্গে কথা বলতে তার ভয় করছিল। তা ছাড়া আর একটা ভয় ছিল, যদি দীপংকরের সঙ্গে অমলের আলাপ হয়ে যায়। না, না, তার দরকার নেই। দীপংকর যেন কোনো কারণেই অমলকে না লক্ষ করে।

তারপর থেকে মাঝে মাঝেই সুপ্রিয়ার মন খারাপ হয়ে যায়। বড্ড বেশি মনে পড়ে অমলের কথা। কিন্তু সে তো আর নিজে থেকে দেখা করতে পারবে না অমলের সঙ্গে। অমল তো কিছু বলেনি!

বিয়ের পর, সন্তান হওয়ার আগে পর্যন্ত সুপ্রিয়া প্রায়ই দুপুরের দিকে বাপের বাড়ি চলে আসত। নতুন বাড়িতে একা একা দুপুর বেলা কিছুতেই ভালো লাগে না। দুপুর বেলা সে নিজে নিজে বাপের বাড়িতে চলে আসে, সন্ধ্যে বেলা দীপংকর এসে তাকে সঙ্গে নিয়ে যায়। কখনো-কখনো দীপংকরের অফিসে বেশি কাজের চাপ থাকলে সুপ্রিয়া একাই ফেরে।

সে-বছর প্রথম শীত পড়তে শুরু করেছে, রোদুরটাকে ভালো লাগছে আস্তে আস্তে, সেই সময়ে এক দুপুরে বাপের বাড়ির কাছাকাছি রাস্তায় ট্রাম থেকে নেমেই সুপ্রিয়া দেখল অমলকে। তার দাঁড়াবার ভঙ্গি দেখেই মনে হয় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। চোখাচোখি হওয়ার পরও সুপ্রিয়া বুঝতে পারল না সে নিজে থেকে কথা বলবে কিনা।

অমল এগিয়ে এসে বলল, আমি চার-পাঁচদিন ধরে এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকছি—

সুপ্রিয়া মুখ নীচু করে বলল, কেন?

অমল সে-প্রশ্নের উত্তর দিল না। আপনমনেই বলে চলল, তুমি এখন কোথায় থাক, আমি সে-বাড়ি চিনি না। কিন্তু জানতাম, তুমি বাপের বাড়িতে মাঝে মাঝে আসবেই। পরশুদিনও তোমাকে দেখেছি, কিন্তু কথা বলতে সাহস করিনি।

সুপ্রিয়া জিজ্ঞেস করল, অমলদা, তুমি ভালো আছ?

না।

সুপ্রিয়া এদিক-ওদিক তাকাল। অমলের সঙ্গে এখানে দাঁড়িয়ে তাকে কথা বলতে দেখলে কেউ কি কিছু মনে করবে? একপাড়ারই ছেলে-মেয়ে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে দু-মিনিট কথা বললে কী আর এমন দোষ?

অমল বলল, আমার ভয় হচ্ছিল, তুমি রাগ করে আছ, আমি কথা বললেও কি তুমি–

অমলের কথা এবং ব্যবহার দুটোই খুব নতুন লাগল সুপ্রিয়ার কাছে। অমল তো এ-রকম বিনীতভাবে কক্ষনো কথা বলে না। সে ভয় পাচ্ছিল? অমলও তাহলে ভয় পায়? অমল সুপ্রিয়ার জন্য চার-পাঁচদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে—এও তো আগে ভাবাই যেত না। সেই অহংকারী অমল।

অমল বলল, চলো—

সুপ্রিয়া জিজ্ঞেস করল, কোথায়?

আমার সঙ্গে।

সুপ্রিয়া কেঁপে উঠে বলল, না না, না, আমি এখন কী করে যাব?

অমল কাতরভাবে অনুনয় করে বলল, সুপ্রিয়া, তোমাকে আমার ভীষণ দরকার। প্লিজ চলো, তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে–

না অমলদা, আজ নয়, মাকে বলে এসেছি—

কিছু হবে না, তুমি এক ঘণ্টা বাদে ফিরে আসবে।

সুপ্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ল। আর আপত্তি করতে পারল না। এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে এলে এমন কী আর ক্ষতি হবে।

একটু এগিয়ে গিয়ে অমল ট্যাক্সি ধরল। ট্যাক্সিতে উঠে সে সুপ্রিয়ার নতুন চুড়ি-গয়না পরা একটা হাত তুলে নিল নিজের মুঠোয়। একটাও কথা বলল না। সুপ্রিয়াও কিছু বলতে পারল না। বুকের মধ্যে যখন অনেক কথা জমে থাকে আজ প্রথম কোন কথাটা বলবে, সেটাই মনে আসে না।

ট্যাক্সি এল অমলের বাড়ির সামনে। দুপুর বেলার সেই নির্জন, শব্দহীন বাড়ি। অমলের মায়ের ঘরের দরজা বন্ধ। তিনতলার সেই চেনা ঘর।

ঘরে ঢুকেও একটাও কথা বলল না অমল। আগে যা কখনো সে করেনি, সেদিন তাই করল। দস্যুর মতন ঝাঁপিয়ে পড়ল সুপ্রিয়ার শরীরে। আগে সে যখন সুপ্রিয়াকে আদর করত, তখন কত নরম, কত শান্ত ছিল তার হাত। এখন সে এক মিনিটও অপেক্ষা করতে পারছে না।

সুপ্রিয়া প্রথমে একটু আপত্তি করার চেষ্টা করেছিল। কোথায় তা ভেসে গেল। বোধ হয়। তার মধ্যেও এই ব্যাকুলতা সুপ্ত ছিল। অমলের স্পর্শে তার যে-আনন্দ, এ-রকম আনন্দ সে আর কখনো পায় না। অমল তাকে সম্পূর্ণ করে নিয়ে নেয়।

একটু বাদে। লজ্জাকর মুখে সুপ্রিয়া আবার বেশবাস সংযত করে নিল।

অমল বলল, সুপ্রিয়া, তোমাকে ছেড়ে আমি কী করে থাকব? কেন তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে?

সুপ্রিয়া বলল, কেন তুমি আমাকে যেতে দিলে?

অমল চুপ করে গেল।

সারাবাড়িটা বড়ো বেশি নিস্তব্ধ! এমনকী রাস্তাঘাটেও কোনো আওয়াজ নেই। তখন সুপ্রিয়ার খেয়াল হল। পাশের বাড়িতে বনানীর গানও তো শোনা যাচ্ছে না!

সুপ্রিয়া জিজ্ঞেস করল, বনানী কোথায়?

অমল নিষ্ঠুরের মতন বলল, বনানী মরে গেছে।

কী?

কাগজে পড়নি? থিয়েটার রোডের মুখে মিনিবাস চাপা দেয়। এই তো মাস ছয়েক আগে। হাসপাতালে পৌঁছোবার আগেই।

সুপ্রিয়া হুহু করে কেঁদে ফেলল। বনানীর জন্যই। বনানীকে সে তার নিজের জায়গাটাই ছেড়ে দিয়েছিল। বনানী তা-ও নিতে পারল না। এত ভাগ্যহীনা মেয়েটা–!

বনানীর জন্যই সুপ্রিয়া অমলকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। বনানী আর নেই। তবে কেন সুপ্রিয়া বিয়ে করল দীপংকরকে? এখন সমস্ত জীবনটাই তাহলে তার ব্যর্থ হয়ে যায় না? আর তো ফেরারও কোনো পথ নেই।

অমল কথা না বলে একদৃষ্টে চেয়ে আছে সুপ্রিয়ার দিকে। যেমন সে একটা উত্তর চাইছে। কিন্তু সুপ্রিয়া কী উত্তর দেবে?

অমল হাতের তালু দিয়ে সুপ্রিয়ার চোখের জল মুছিয়ে দিল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, আমি তোমাকে চাই, আমি তোমাকে ছাড়তে পারব না।

কিন্তু আর যে উপায় নেই?

নিশ্চয়ই উপায় আছে।

সুপ্রিয়া ভেবেছিল অমল ডিভোর্সের কথা বলবে। যদিও সেটা একটা অসম্ভব কথা। কী যুক্তি দেখাবে ডিভোর্সের? দীপংকর কি কোনোদিন তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে? দীপংকর চমৎকার লোক। সুপ্রিয়ার কোনো অধিকার নেই তাকে অপমান করার।

অমল কিন্তু ডিভোর্সের কথা বলল না। সে বলল, তুমি যারই বউ হও, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু তুমি আমার, তুমি আমারই থাকবে।

কিন্তু শুধু মনে মনে থাকা নয়। অমল চায়, সুপ্রিয়া মাঝে মাঝে আসবে তার কাছে।

অমলের পীড়াপীড়িতে সুপ্রিয়া রাজি হয়ে গিয়েছিল। মাসে অন্তত একবার।

সে-দিনই অমলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে একা একা রাস্তা দিয়ে আসবার সময় সুপ্রিয়ার মনে হয়েছিল, এটা ভুল। এ-রকম হতে পারে না। নিজেকে তার কলঙ্কিনীর মতন মনে হয়। মনের মধ্যে একটা সৎ আর অসতের দ্বন্দ্ব থাকেই। আগে থেকে নির্দিষ্ট ধারণা সহজে বদলানো যায় না। সকলে জানে, দীপংকরকে স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছে সুপ্রিয়া, এরপর তাকে ঠকিয়ে অন্য একজনের সঙ্গে গোপন জীবন কাটানো কি পাপ নয়? পৃথিবীতে একজন নারী শুধু একজন পুরুষের, সভ্যসমাজ এইরকম নিয়ম করেছে। কিন্তু এর সঙ্গে যদি ভালোবাসা না মেলে? না মিললেও নিয়মের বাইরে যাওয়ার সাহস সুপ্রিয়ার নেই; সবচেয়ে বড়োকথা, লোকে যদি জেনে ফেলে? একদিন-না-একদিন জানাজানি হবেই! তখন, সুপ্রিয়ার মা-বাবা, আত্মীয়রা কী ভাববে? দীপংকর কত দুঃখ পাবে? না, না সুপ্রিয়া পারবে না। সে আর আসবে না অমলের কাছে। সুপ্রিয়া ভালোবাসতে চায়, কিন্তু বদনাম নিতে পারবে না কিছুতেই।

তবু ঠিক এক মাস বাদে সুপ্রিয়া এসেছিল অমলের কাছে। সেবারও একইরকমভাবে অমল হিংস্র আদর করেছিল তাকে। যেমন অমল একটা বুভুক্ষু।

সেদিনও অমলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সুপ্রিয়ার দ্বিগুণ মন খারাপ হয়েছিল। আগের কথাগুলিই আবার মনে হয়েছিল। এবার সুপ্রিয়া প্রতিজ্ঞা করেছিল, আর না, আর না, আর কিছুতেই সে আসবে না। অমল যতই বলুক, সে শুনবে না। সুপ্রিয়া যদি নিজেকে সামলাতে না পারে, যদি আবার কখনো আসে, তাহলে তারপর সে ঠিক আত্মহত্যা করবে।

তারপর আর আসেনি সুপ্রিয়া।

বুলান জন্মাবার পর সুপ্রিয়া নিজেকে আরও দৃঢ় করতে পেরেছে। এখন তো সে আর শুধু প্রেমিকা নয়, এখন সে মা। এখন তার দায়িত্ব অনেক বেশি।

অমলের বাড়িতে আর কখনো না এলেও অমলের সঙ্গে দেখা হয়েছে সুপ্রিয়ার। ব্যবস্থা করে নিজেরাই দেখা করেছে। এটুকু সুপ্রিয়া এড়াতে পারেনি। নিজের মনকে বুঝিয়েছে, শুধু দেখা করায় কী দোষ থাকতে পারে? বিয়ে মানেই তো আর সর্বস্ব বিকিয়ে দেওয়া নয়। অন্য একজনকে ভালো লাগতে পারে না? তার সঙ্গে একটু মেলামেশা, একটু গল্প করা নিশ্চয়ই অন্যায় নয়।

সুপ্রিয়া অমলের বাড়িতে আর আসবে না বলে প্রথম প্রথম অমল খুব রাগ করেছিল। কিছুদিন আর যোগাযোগ রাখেনি। কিন্তু শেষপর্যন্ত আর দূরে থাকতে পারেনি। আবার তাকেই আসতে হয়েছে সুপ্রিয়ার কাছে।

দীপংকর যখন প্রথমবার বিলেতে যায়, তখন অমল দেখা করার জন্য সুপ্রিয়াকে খুব পীড়াপীড়ি করত। সুপ্রিয়া আস্তে আস্তে নরম হয়ে পড়েছে। অবশ্য অমলকে সে কোনোদিন নিজের ফ্ল্যাটে আনেনি। অমলের অস্তিত্বই জানে না দীপংকর। কোনোদিন যেন জানতে না পারে।

এতগুলি বছর কেটে গেল, তবু অমল বিয়ে করল না। সুপ্রিয়া নিজেই কতবার বলেছে। অমল কিছুতেই রাজি হয় না। ওই প্রসঙ্গ তুললেই অমল মুখ গোঁজ করে বলেছে, আমার মেয়েদের ভালো লাগে না।

সুপ্রিয়া বলেছে, বাঃ, আমিও তো মেয়ে!

অমল বলেছে, না তুমি মেয়ে নও! তুমি সুপ্রিয়া।

একথাটা শুনলে সুপ্রিয়ার শরীরে একটা ভালো লাগার আচ্ছন্নতা আসে। আবার একটু একটু অপরাধবোধও জাগে। সুপ্রিয়ার স্বামী-সংসার রয়েছে, অমলের কিছুই থাকবে না? নারীর সাহচর্য ছাড়া পুরুষমানুষ বাঁচতে পারে? অমল এত গোঁয়ার কেন, কেন সে অন্য মেয়েদের সঙ্গে মিশতে চায় না? সুপ্রিয়াকেই কিছু সাহচর্য দিতে হয় সেই জন্য। তবে খুব সাবধানে, নিজের শরীর বাঁচিয়ে।

সুপ্রিয়া তাই দেখা করত বাইরে। খুব লুকিয়ে-চুরিয়ে। কোথাও তো গোপন জায়গা নেই। অমলের তো কোনো দায়িত্ব নেই। সে যেকোনো জায়গায় দেখা করতে রাজি সুপ্রিয়ার সঙ্গে। কিন্তু সুপ্রিয়া তো সব জায়গায় আসতে পারে না। অমল কোনো হোটেলে ঘর নেওয়ার কথা বলেছে, সুপ্রিয়া রাজি হয়নি। অমল সিনেমার টিকিট কেটেছে, সুপ্রিয়া যায়নি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ কথা বলা যায়। কিন্তু তাতে আশ মেটে না। আর ক-দিনই বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলা যায়? একদিন তো সেজদার মুখোমুখি পড়ে গিয়েছিল প্রায়। সবসময় এ-রকম ভয়ে ভয়ে কি দেখা করা যায়? শেষপর্যন্ত অমল একটা নিরাপদ জায়গার কথা বলেছিল।

অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পর সুপ্রিয়া একা একা এসেছিল গঙ্গার ঘাটে। অমল দাঁড়িয়ে ছিল আউটরাম জেটির পাশে। আগে থেকেই একটা নৌকো ভাড়া করে রেখেছিল। টপ করে উঠে পড়ল দু-জনে। তারপর নৌকো গঙ্গায় ভেসে পড়তেই আর কারুর দেখে ফেলার ভয় ছিল না।

সেই দিনটার কথা সুপ্রিয়া কখনো ভুলবে না। ভাবলেই এখন শিহরন হয় শরীরে। চমৎকার জ্যোৎস্নার রাত ছিল সেদিন! মিগ্ধ হাওয়া ছিল। অমলকে অত কাছাকাছি নিশ্চিন্তভাবে যে কোনোদিন আর পাবে, সেকথা ভাবেনি সুপ্রিয়া। দু-টি দুঃখী হৃদয়ের কত কথা।

অমলের খুব ইচ্ছে ছিল সুপ্রিয়ার সঙ্গে একটু দুষ্টুমি করার। কিন্তু মাঝিরা দেখে ফেলবে যে। যতবার অমল বুকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছে, ততবারই সুপ্রিয়া বলেছে, না, লক্ষ্মীটি, ওসব না!

অমল তখন চেয়েছে সুপ্রিয়ার কোলে মাথা দিয়ে শুতে। এই দাবিটা সে কিছুতেই ছাড়বে। যেন শিশুর মতন আবদার। সুপ্রিয়া কিছুতেই আটকাতে পারেনি। তার কোলে মাথা রেখে অমল শুয়ে পড়েছিল পা ছড়িয়ে, সুপ্রিয়া বিলি কেটে দিচ্ছিল তার চুলে।

মনের মধ্যে সেই পুরোনো অপরাধবোেধটা তখন কাজ করে। সুপ্রিয়া নিজেকে প্রশ্ন করে, এটাও কি অন্যায়? এই যে-অমল তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে, এক হাতে জড়িয়ে আছে কোমর, সুপ্রিয়াও যে একটু-একটু আদর করছে মাঝে মাঝে, সেটা পাপ?

সুপ্রিয়া নিজেই এর উত্তর তৈরি করে নেয়। মনকে বোঝায়, না, এটা পাপ নয়! সতীত্বের সংজ্ঞা কি চিরকাল একই থাকবে? না তা হতেই পারে না! সুপ্রিয়া তো নিজেকে অনেক সংযত করেছে। অমলের বাড়িতে যাওয়া সে নিজেই বন্ধ করেনি? অমল যদি আর কোনো মেয়ের সঙ্গে না মেশে, যদি আর কারুর কোলে মাথা রেখে না শোয়, তাহলে সুপ্রিয়া তাকে এইটুকু দিতে পারবে না?

কষ্ট কি সুপ্রিয়ারও কম? তারও কি ইচ্ছে করে না, অমলের কাছ থেকে আরও বেশি আদর পেতে? অমলকে আরও বেশি আদর করতে? সে-কথা সে অমলকে জানতে দেয় না। আজ অনেকদিন বাদে শুধু এই একটুখানি—এখানে কেউ দেখছে না, এখানে সমাজের ভ্রূকুটি নেই–

মাঝ গঙ্গাতেও বখাটে ছেলেদের হাত থেকে নিষ্কৃতি নেই। আর দু-একখানা নৌকো থেকে মাঝে মাঝে ছেলেদের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। অমল সুপ্রিয়ার হাত ধরে বলেছিল, ওদিকে কান দিয়ো না। মনে করো, এখন পৃথিবীতে আর কিছু নেই। আমি তো শুধু দেখতে পাচ্ছি আকাশটাকে আর তোমাকে।

সুপ্রিয়া দুঃখিতভাবে বলল, ওরা কেন যে এখানেও আসে!

অমল বলল, ওদিকে তাকিয়ো না। ওরা একটু বাদেই দূরে চলে যাবে।

যদি আমাদের কেউ দেখে ফেলে?

এখানে কে দেখবে? তোমার এখনও ভয়! এখানে এই অন্ধকারের মধ্যে আমাদের দেখলেই বা চিনবে কে? একটা নৌকো খুব কাছাকাছি এসে পড়েছিল। তার মধ্যে থেকে কর্কশ গলায় একটি ছেলে একটি অসভ্য গান গাইছিল আর মাঝে মাঝে হাসির ধুম পড়ে যাচ্ছিল। নিশ্চয়ই সেটা সুপ্রিয়া আর অমলকে উদ্দেশ্য করেই।

একবার সেই নৌকো থেকে একজন চেঁচিয়ে উঠল, দাদা, আপনার কাছে দেশলাই আছে?

সুপ্রিয়া অমলকে বলল, এই, তুমি উঠে বোসো।

অমল দৃঢ়স্বরে বলল, না।

সুপ্রিয়ার দারুণ লজ্জা করছে। সে অমলের মাথাটা ধরে তবু বলতে লাগল, ওঠো, এবার ওঠো, লক্ষ্মীটি।

নৌকোটা একেবারে পাশে এসে লাগল। দেশলাইয়ের জন্য যে-হাত বাড়িয়ে আছে, সে ধূর্জটি।

ধূর্জটি যে শুধু সুপ্রিয়াকেই চেনে তা নয়, সে অমলকেও চেনে। নিজের বন্ধু না-হলেও বন্ধুর বন্ধু। ধূর্জটি জানতই না যে, সুপ্রিয়ার সঙ্গে অমলের কোনো সম্পর্ক আছে। অমল ছিল সত্যিকারের গোপন।

ধূর্জটির বন্ধুদের মধ্যে যে-ছেলেটি কর্কশ গলায় চিৎকার করছিল, সেও চেনে অমলকে। সে নাটকীয়ভাবে জিভ কেটে বলেছিল, আরে, অমলবাবু না? সরি, সরি, ভেরি সরি! সেম সাইড হয়ে গেছে। আমরা এক্ষুনি যাচ্ছি।

নৌকোটা আবার দূরে সরে যেতে যেতে সুপ্রিয়া স্পষ্ট শুনল, সেই লোকটা ধূর্জটিকে জিজ্ঞেস করছে, এই ওই ভদ্রমহিলা অমলবাবুর কে রে? বউ? কবে বিয়ে করল?

ধূর্জটির উত্তরটা শুনতে পায়নি। কী উত্তর দিয়েছিল ধূর্জটি?

তারপর আর ধূর্জটির সঙ্গে দেখা হয়নি সুপ্রিয়ার। দেখা হয়নি বলা ঠিক নয়, দূর থেকে দেখলেও ধূর্জটির সামনে যেতে ভয় পেয়েছে সে। গতবছর ক্রিকেট টেস্ট ম্যাচের সময় মাঠে তার খুব কাছেই বসেছিল ধূর্জটি। তাকে সুপ্রিয়াই আগে দেখতে পেয়ে চট করে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। সে দিন খেলা না দেখেই চলে এসেছিল। সেদিন সিনেমা হলেও তো ধূর্জটিকে আগে দেখেই সুপ্রিয়া অন্য দিকে ফিরে চলে যেতে চেয়েছিল। কেন যে দীপংকর তাকে দেখে ফেলল?

আজও সুপ্রিয়া জানে না, ধূর্জটি ওর বন্ধুকে তার প্রশ্নের কী উত্তর দিয়েছিল? ধূর্জটি ব্যর্থ প্রেমিক, তার সাংঘাতিক রাগ থাকাই স্বাভাবিক। আজও চোখে ভাসে সেই দৃশ্যটা। আবছা জ্যোৎস্নায় গঙ্গার ওপর একটা নৌকোর পাশে আর একটা নৌকো ভিড়ল। একটা দেশলাই এর জন্য হাত বাড়িয়েছে ধূর্জটি। ধূর্জটি প্রথমে দেখেছিল সুপ্রিয়াকেই। তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকা অমলকে দেখেছে তারপরে। অদ্ভুতরকম মুখখানা হয়ে গিয়েছিল ধূর্জটির। তাতে অনেক ব্যথা, বেদনা, অনেক অপমান মেশানো। নিশ্চয়ই প্রচন্ড আঘাত পেয়েছিল, কারণ তারপর আর একটাও কথা বলেনি সে। সে সুপ্রিয়া বা অমলকে চেনার ভানও করেনি। পাশ থেকে তার অসভ্য বন্ধুটাই গলা বাড়িয়ে–।

ধূর্জটি তার জীবনের সবচেয়ে গোপন কথাটা জানে। কিন্তু ধূর্জটি একটা কথা জানে না যে তারপর থেকে সুপ্রিয়ার যথেষ্ট শিক্ষা হয়ে গেছে। আর সে কোনোদিন অমলের সঙ্গে কোনো নির্জন জায়গাতেও দেখা করবে না। অমল আর কোনোদিন তার কোলে মাথা দিয়ে শোবে না। কিন্তু ধূর্জটি কি একথা বিশ্বাস করবে? সে একবার চোখে যা দেখেছে, সেটাই তার কাছে সত্যি হয়ে আছে। ইচ্ছে করলে ধূর্জটি এখন তার নামে চারিদিকে বিষ ছড়াতে পারে। ধূর্জটির কথা সবাই বিশ্বাসও করবে। কারণ তার সাক্ষীও আছে।

কেন দীপংকর ধূর্জটিকে ডেকে আনল? সুপ্রিয়া, কিছুতেই আর ধূর্জটির চোখের দিকে তাকাতে পারবে না। সেই ঘটনার পর সুপ্রিয়ার এমন লজ্জা আর আত্মগ্লানি হয়েছিল যে, এক-একবার মরে যেতেই চেয়েছিল। কিন্তু তখন বুলান মাত্র এক বছরের শিশু।

ধূর্জটি কি আবার আসবে? যেন না আসে! যেন না আসে!

পরদিন দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর সুপ্রিয়া দাঁড়িয়েছিল রাস্তার দিকের বারান্দায়। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে, তাই দূরের সজল দৃশ্য দেখতে ভালো লাগে।

সুপ্রিয়াদের বাড়ির সামনের রাস্তাটায় একটু একটু জল জমেছে। তারমধ্যেই সুপ্রিয়া দেখল, প্যান্ট উঁচু করে, পা টিপে টিপে আসছে ধূর্জটি। এই দুপুরেই!

সুপ্রিয়ার বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। কেন আসছে ধূর্জটি? প্রতিশোধ নিতে? তার ভালোবাসাকে সুপ্রিয়া লঘু করে দেখেছিল। পাত্তাই দেয়নি। তারপরেও যদিও সে বিয়ে করত অন্য একজনকে, ত দুঃখের কারণ থাকলেও অভিযোগের কারণ থাকত না। অনেক সময় বাবা-মায়ের চাপে পড়ে মেয়েদের এ-রকম মেনে নিতেই হয়। কিন্তু আবার আর একজনের সঙ্গে প্রেম? তার মানে ধূর্জটি কেউ-ই না!

কী প্রতিশোধ নিতে চায় ধূর্জটি? সুপ্রিয়ার মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। বারান্দা থেকে সরে এসে তাড়াতাড়ি সে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। যাতে চোখাচোখি না হয়। ধূর্জটি বাড়ির একেবারে কাছে এসে গেছে। এবার সে নিশ্চয়ই গেট দিয়ে ঢুকছে। দোতলায় উঠতে আর কতক্ষণই-বা লাগবে? এক্ষুনি বেজে উঠবে কলিং বেল।

যেন ঘাতক আসছে মৃত্যুদন্ড দিতে, সুপ্রিয়া ঠিক সেইভাবে অপেক্ষা করতে লাগল। সে দিনই বাঁকাভাবে অমলের কথা উচ্চারণ করে ধূর্জটি বুঝিয়ে দিয়ে গেছে যে, অমলের কথা তার ঠিকই মনে আছে। ভুলবেই-বা কেন, ওইটাই তো তার তুরুপের তাস। আজ নির্জন দুপুরে সে আসছে বোঝাপড়া করতে। এখন সে ইচ্ছে করলে যা খুশি ব্ল্যাকমেল করতে পারে। সুপ্রিয়া তার যথাসর্বস্ব দিয়ে দিতেও রাজি কিংবা বাধ্য। কী মূল্য চাইবে ধূর্জটি? সে কবি, সে কি আর টাকাপয়সা চাইবে।

এতক্ষণে ধূর্জটি বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। একটা একটা করে সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসছে। ওপরে। এবার দরজার সামনে এসে কলিং বেলে হাত।

সুপ্রিয়া উৎকর্ণ হয়ে রইল। তার শরীরটা কাঁপছে। ধূর্জটির কাছ থেকে বাঁচবার কি কোনো উপায়ই নেই? যদি সে দরজা না খোলে? তাহলেও ধূর্জটি কতক্ষণ অপেক্ষা করবে? চাকরকে বলে রাখবে সুপ্রিয়া যে, দুপুর বেলা যে-ই আসুক, দরজা যেন না খোলে!

কিন্তু কলিং বেল বাজল না। দোতলায় উঠতে তো এর চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে না। তাহলে ধূর্জটি কোথায় গেল?

সুপ্রিয়া আবার আস্তে আস্তে উঁকি মারল বারান্দা দিয়ে। ধূর্জটি রাস্তাতেও নেই। সে কি বাড়ি ভুল করবে? একদিন মাত্র রাত্তির বেলা এসেছিল। না, তা হতে পারে না, বাড়িটার সামনে একটা পাম গাছ-ওটা দেখলে আর কারুর ভুল হওয়ার কথা নয়।

তাহলে কি সুপ্রিয়াই ভুল দেখেছে? ধূর্জটি নয়, অন্য কোনো লোক? কিন্তু স্পষ্ট দেখল, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, রোগা, লম্বা—অবশ্য মুখটা নীচের দিকে ছিল।

সারা দুপুর তবু সুপ্রিয়া উৎকণ্ঠার মধ্যে রইল। দরজায় সামান্য শব্দ হলেই উঠে বসে। কিন্তু ধূর্জটি এল না।

না এসে আরও বেশি কষ্ট দিল ধূর্জটি। তিল তিল মৃত্যুযন্ত্রণা দেওয়ার মতন। প্রতিটি মুহূর্ত অসহ্য। কখন আসবে, কখন আসবে? কেন আসছে না? এটাও কি তার কায়দা? সুপ্রিয়াকে বেশি কষ্ট দেওয়ার জন্য সে এই কায়দাটা বার করেছে? বাড়ির সামনে এসেও কোথাও লুকিয়ে আছে?

যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে সুপ্রিয়া একসময় বিছানা থেকে ঘুমন্ত বুলানকে বুকে তুলে নিল। মেয়েই তার একমাত্র আশ্রয়। মেয়ের জন্যই তাকে বাঁচতে হবে। যদি সে আগে কিছু অন্যায় করেই থাকে, তবু কি ক্ষমা পেতে পারে না? তার কোলে বুলানকে দেখেও কি ধূর্জটির দয়া হবে না?

বুলানকে কোলে নিয়ে দরজাটা খুলে রাখল সুপ্রিয়া। ধূর্জটি তবু আসে না। বারান্দায় গিয়ে কতবার উঁকিঝুঁকি দিল। না, ধূর্জটি কোথাও নেই।

তখন সুপ্রিয়ার মনে হল, আসলে বোধ হয় ধূর্জটিই ভয় পেয়েছে। বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করলেও শেষপর্যন্ত ভেতরে ঢোকার সাহস পায়নি। ধূর্জটি তো ভীতুই! আগে যখন ও প্রেমের কথা বলত, তখন মুখ-চোখ একেবারে কাঁচুমাচু হয়ে যেত। ধূর্জটি হয়তো এখনও তাকে সেইরকম ভালোবাসে, তাই ভয়টা এখনও যায়নি।

প্রত্যেকদিন সুপ্রিয়া ধূর্জটির প্রতীক্ষা করে। সে চায় না ধূর্জটি আসুক। অথচ প্রতিটি দুপুরেই মনে হয়, যেকোনো সময় ধূর্জটি এসে দরজাতে বেল বাজাবে। সে কী শেষ পর্যন্ত সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারবে না?

এর ফলে হল কী, অমলের কথা আবার নতুন করে মনে পড়তে লাগল। নৌকার সেই ঘটনার পর অমলের সঙ্গে আর দেখা করতে সাহস পায়নি। অমল মাঝে মাঝে ফোন করে। অমলকে সে চিঠি লিখতে বারণ করেছে। অবশ্য তাও দু-বার খুব কম সময়ের জন্য অমলের সঙ্গে দেখা করতেই হয়েছে। তার মধ্যে একদিন ছিল অমলের জন্মদিন। ওই দিনটা সুপ্রিয়া কখনো ভোলে না। ছেলেবেলা থেকেই ওই দিনটায় সে অমলকে ফুল দিয়েছে। এবার অবশ্য ফুল দিতে পারেনি। তবে, সেই সময় হর্টিকালচারাল গার্ডেনে একটা ফুলের প্রদর্শনী ছিল। সেইখানে গিয়ে দেখা করেছিল অমলের সঙ্গে। সেখানে কেউ দেখে ফেললেও ক্ষতি নেই। ফুলের প্রদর্শনীতে তো যে-কেউই আসতে পারে। একবার শুধু সেখানে সুপ্রিয়া চুপিচুপি অমলকে বলেছিল, এই বাগানের সব ফুল আমি তোমাকে দিলাম।

রাত্রে শুয়ে শুয়ে অমলের কথা দারুণ মনে পড়েছে। এক-এক সময় এ-রকম হয়। মনে হয়, ভুল, ভুল, সারাজীবনটাই এইরকম ভুলের ওপর দিয়ে চলবে? তখন অসহ্য লাগে, আর শুয়ে থাকাও যায় না।

মাঝে মাঝে দু-একটা অসম্ভব কথাও তার মাথায় আসে। এমন হয় না যে ধূর্জটি এলে সুপ্রিয়া তাকে সব কথা খুলে বলে তার কাছে দয়া ভিক্ষে করবে। ধূর্জটির কাছে হাতজোড় করে অনুনয় করে বলবে, অমলকে ভালো না বেসে আমার উপায় নেই। ধূর্জটিদা, তুমি আমাকে সেই সুযোগ দাও।

যেন পৃথিবীতে এখন একমাত্র ধূর্জটিই পারে তার সঙ্গে অমলকে মিলিয়ে দিতে। আর কোনো বাধা নেই। সে তো বেশি কিছু চায় না, তার স্বামী-সংসার সবই ঠিক থাকবে, শুধু অমলের সঙ্গে মাঝে মাঝে একটু দেখা করা। শুধু চোখের দেখা। অমলের নারীসঙ্গহীন রুক্ষজীবনে সামান্য একটু সান্ত্বনা।

কিন্তু না, ধূর্জটি দয়া করবে না। অন্য যে-কেউ হলে হয়তো দয়া করত, কিন্তু ধূর্জটি যে নিজেই সুপ্রিয়ার প্রেমিক। সে কী করে সুপ্রিয়াকে অপরের হাতে তুলে দেবে? তার বদলে প্রতিশোধ নেবে সে।

সুপ্রিয়া উঠে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। মধ্যরাত্রের টাটকা হাওয়ায় জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। একসময় সে টের পেল, তার স্বামী এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে।

সুপ্রিয়ার কান্না আসছে। কী করে কান্না চাপবে? যদি মনের সব কথা বেরিয়ে আসে? না, না, দীপংকরকে সে দুঃখ দিতে চায় না। দীপংকরের তত কোনো দোষ নেই। সে তো সাধ্যমতন সুপ্রিয়াকে সুখেই রাখতে চেয়েছে।

সুপ্রিয়া কান্নায় ভেঙে পড়ে দীপংকরের বুকে মাথা রেখে বলল, তুমি আর আমায় ভালোবাসো না! আমাকে একটুই ভালোবাসো না!

দীপংকর তার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলল, যাঃ তোমাকে কি ভালো না বেসে পারি? তোমাকেই তো শুধু ভালোবাসি। তুমিই তো আমার সব।

সুপ্রিয়া নিশ্চিন্ত হল। দীপংকর ভালোবাসা কথাটা বারবার উচ্চারণ করতেই ভালোবাসে। এতে তৃপ্তি পায়। তাকে এই তৃপ্তিটুকু দিতে চায় সুপ্রিয়া এবং অতিরিক্ত হিসেবে সে দীপংকরের ঠোঁটে একটি চুমু দিল।

এরপরের দু-তিনদিন মনে হল সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে। মুছে গেছে অতীতের যা-কিছু। ধূর্জটি আর আসবে না। এখন সুপ্রিয়া সন্ধ্যে বেলা স্বামীর জন্যই উতলা হয়ে অপেক্ষা করছে। দীপংকর ফিরলে সুপ্রিয়া আদর করে নিজেই তার গলার টাই খুলে দেয়। দীপংকর যা খেতে ভালোবাসে, সেরকম কিছু-না-কিছু একটা সে নিজেই রান্না করে, দীপংকর বাড়ি ফেরার পর। মেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে নাইট শোতে কোনো একটা সিনেমা দেখবার জন্য আবদার করল একদিন স্বামীর কাছে। স্বামী আর মেয়েকে নিয়ে ছোট্টসংসার, এর নামই তো সুখ।

ধূর্জটিকে নিয়ে কিছুদিনের জন্য যে-পাগলামি চেপেছিল দীপংকরের, সেটা কেটে গেছে। আর সে ধূর্জটির কথা বলে না। বাংলা পত্রিকার পাতা উলটে ধূর্জটির কবিতাও খোঁজে না।

ভীতু, কাপুরুষ ধূর্জটি এবাড়ির দরজা পর্যন্ত এসেও পালিয়ে গেছে। আর কোনোদিন

আসবার সাহস হবে না তার।

দীপংকরের গাড়ি রং হচ্ছে, তাই নাইট শো দেখে ফেরার সময় ওরা ট্যাক্সি নিল। ট্যাক্সিটাও টালিগঞ্জ মোড়ে এসে খারাপ হয়ে গেল হঠাৎ। বাড়ি আর বেশিদূর নয়, হেঁটেই যাওয়া যায়। তবু দীপংকর জিজ্ঞেস করল, রিকশা নেবে? এর আগে সুপ্রিয়া কোনোদিন দীপংকরের সঙ্গে রিক্সা চাপেনি। অল্প শীতের হাওয়ায় বেশ ভালোই লাগল। সুপ্রিয়ার মনে হল, দীপংকরের ওপর সত্যি নির্ভর করা যায়। এখন তাদের মাঝখানে অমল নেই। সুপ্রিয়া নেই—এখন শুধু দীপংকরের স্ত্রী। আঃ কী শান্তি!

পরদিনই ধূর্জটি এল। ঠিক দুপুরে নয় অবশ্য, একটু বিকেলের দিকে। চাকর ছুটি নিয়েছে। সেইদিনই, একটু আগে রাঁধুনি বুলানকে নিয়ে পার্কে বেড়াতে গেছে। আশ্চর্য, ধূর্জটি কী করে এতসব খবর রাখল? বাড়িতে সুপ্রিয়া একদম একা।

দরজা খুলেই সুপ্রিয়া বিবর্ণ মুখে তাকিয়ে রইল। আজ বুলানও নেই যে তাকে বুকে চেপে ধরে আত্মরক্ষা করবে সুপ্রিয়া। আজ সে সম্পূর্ণ একা। ধূর্জটি কি লুকিয়ে এতদিন লক্ষ রেখেছে, কখন বাড়িটা সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে যায়।

ধূর্জটি হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। তবু ওর আড়ালে সুপ্রিয়া দেখতে পাচ্ছে প্রতিহিংসার আগুন। আর কোনো উপায় নেই, আর কোনো উপায় নেই। ধূর্জটি ভেতরে এসে কৌতুকের সুরে বলল, বকা খেতে এলাম।

সিনেমা হলে ঢোকার সময়ই ধূর্জটি ওদের দেখতে পেয়েছিল। সুপ্রিয়া আর তার স্বামী। কী যেন নাম ভদ্রলোকের? সুধাময়, না অনিরুদ্ধ? না, মনে পড়েছে, দীপংকর। সরলাদের অফিসে চাকরি করে। সরলার বস।

দেখতে পেয়েও ধূর্জটি মুখটা ঘুরিয়ে নিল চট করে। কারণ, তার সঙ্গে কয়েকজন বন্ধুবান্ধব রয়েছে, তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে প্রতুল। প্রতুল বড় মুখ খিস্তি করে, সে যদি একবার দেখে যে ধূর্জটি কোনো সুন্দরী মহিলার সঙ্গে কথা বলছে, তাহলেই তা নিয়ে এমন জ্বালাবে পরে! প্রতুল মেয়েদের সঙ্গে মিশতে পারে না। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষমতা নেই, তাই আড়ালে তাদের নিয়ে খিস্তিখাস্তা পছন্দ করে।

ওরই মধ্যে তবু একবার সুপ্রিয়ার সঙ্গে ধূর্জটির চোখাচোখি হয়ে গেল। কেউই চেনার ভাব করল না। সুপ্রিয়া যেন মুখটা ফিরিয়েই নিল মনে হয়। সেইরকম আগের মতনই অহংকারী ভাবটা এখনও আছে। সুপ্রিয়া তার স্বামীর গা-ঘেঁষে চলে গেল ভেতরে। ধূর্জটি বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট শেষ করল, তারপর ভেতরে ঢুকল অন্ধকার হবার পর।

অন্ধকারেও সে দেখতে পেল সুপ্রিয়া আর তার স্বামী কোথায় বসেছে। তাদের সিটের চেয়ে কয়েক রো পেছনে। সুপ্রিয়ার স্বামী বোধ হয় দেখতে পায়নি ধুর্জটিকে। দেখলেও চিনতে পারবে কিনা সন্দেহ।

কিন্তু সিনেমা ভাঙার পর ধূর্জটি দেখল, সুপ্রিয়ার স্বামী গেটের কাছেই গ্যাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই রে, কী করে এড়ানো যায়? এদিক দিয়ে তো বেরোতেই হবে। প্রতুলটা আবার এরই মধ্যে একটা পাঞ্জাবি মেয়েকে দেখে নানারকম মন্তব্য শুরু করে দিয়েছে। ওরা আবার শুনতে না পায়!

এই যে, কেমন আছেন?

দীপংকরের কথা শুনে ধুর্জটিকে দাঁড়াতেই হল। নমস্কার করে বলতেই হল দুটো-একটা কথাবার্তা। সুপ্রিয়া অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। ভয় পেয়েছে মনে হচ্ছে।

সুপ্রিয়ার বর আবার তাকে বাড়িতে চায়ের নেমন্তন্ন করে ফেলল! শুধু তাকে একা নয়, বন্ধুদেরও। প্রতুলকে নিয়েই তো যত ভয়, তাই ধূর্জটি কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল খুব! যাক বন্ধুরা কেউ রাজি হল না। প্রতুলটা শুধু পার্ক স্ট্রিটে মদ খেতে যাবে বলে ওদের গাড়িতে লিফট নিল। এটুকু সময়েই প্রতুলটা লোভীর মতন তাকিয়ে রইল সুপ্রিয়ার দিকে। নাঃ, এ ছেলেটাকে নিয়ে আর রাস্তাঘাটে চলা যায় না। পার্ক স্ট্রিটে প্রতুল নেমে যাবার পর ধূর্জটি একটু নিশ্চিন্ত হল।

দীপংকরই বেশি কথা বলছে ধূর্জটির সঙ্গে। সুপ্রিয়া চুপচাপ। সুপ্রিয়া অবশ্য এত গম্ভীর আগে কখনো ছিল না! স্বামীর কাছাকাছি বসে ধূর্জটির সঙ্গে কী কথা বলবে তা ভেবেই পাচ্ছে না।

এ কী, ওরা গলফ ক্লাব রোডে থাকে? এ পাড়াটা তো ধূর্জটির খুব চেনা। অনেকবার আসতে হয় এই রাস্তায়। এই বাড়িটার পাশ দিয়েও কতবার গেছে, তখনও ধূর্জটি জানত না, সুপ্রিয়া এখানেই রয়েছে এতদিন। ফ্ল্যাটটা বেশ সুন্দর সাজিয়েছে। মন্দ-না।

এ ধরনের ফ্ল্যাট দেখলেই তার মালিকের চরিত্রটা বোঝা যায়। প্রাইভেট ফার্মের চাকরি। যারা মাইনে খুব বেশি না দিয়ে ইনকাম ট্যাক্স বাঁচাবার জন্য, অন্য অ্যালাউয়েন্স দেয় হাজাররকম। ফ্ল্যাটটার ভাড়া হাজার-বারো-শো হবেই, কোম্পানি দেয়। নিশ্চয়ই দীপংকর সকাল সাড়ে আটটা থেকে সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্ত চাকরের মতন অফিসে খাটে! এ ছাড়া মাঝে মাঝে পার্টি আর সিনেমা দেখা—এই তো এদের জীবন। এদের সকলের বাড়িই একইরকম দেখতে হয়। সকলেই শৌখিন তামার অ্যাশট্রে রাখে। উঃ, এই তামার অ্যাশট্রে দেখলেই ধূর্জটির গা জ্বলে যায়।

সুপ্রিয়া সেই যে ভেতরের ঘরে চলে গেল, আর আসার নাম নেই। তার স্বামীই একা বকবক করছে।

অবশ্য একটা ব্যাপারে ধূর্জটি একটু খুশি হল। সুপ্রিয়ার স্বামী দীপংকর কবিতা পড়ে এবং বোঝে। এইসব লোকের সঙ্গে তবু দু-একটা কথা বলা যায়। সুপ্রিয়া তো কবিতার কিছুই বোঝে না।

সুপ্রিয়াকে অনেকদিন থেকে চেনে ধূর্জটি। রণজয়ের কীরকম যেন বোন হয়। রণজয়ের সঙ্গে ওদের বাড়িতে গেছে অনেকবার। এক সময় ধূর্জটি সুপ্রিয়াকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিল। তখন ওকে দেখতে আরও অনেক বেশি সুন্দর ছিল। বিশেষত চোখ দুটি একেবারে অপূর্ব। স্নান করবার পর মুখটা যখন ভিজে ভিজে থাকত, তখন অপ্সরী বলে মনে হত এক-এক সময়। এখন অবশ্য সে চেহারার কিছুই নেই। কীরকম একটা মা-মা ভাব এসে গেছে।

সুপ্রিয়ার বিয়ের আগেই ধূর্জটি বুঝে নিয়েছিল, সুপ্রিয়া শুধুই সুন্দরী, তার মনের কোনো গভীরতা নেই। যে-নারীর মনটাও আকর্ষণীয় নয়, তার যতই সৌন্দর্য থাক, শেষপর্যন্ত তাকে পুতুল পুতুল দেখায়।

তবু, যে-রকম মেঘলা আকাশ, বর্ষাকালের নদী বা জঙ্গলে শালগাছের ফুল। সেইরকম নারীর রূপেরও একটা আলাদা আকষর্ণ আছে। ধূর্জটি সেই রূপ দেখে ভুলেছিল। সুপ্রিয়া সেইটাকেই ভেবেছিল ভালোবাসা। সুপ্রিয়ার মধ্যে একটা আমায় ভালোবাসো, আমায় ভালোবাসো ভাব আছে। অনেক মেয়ে যেমন বিয়ের আগে একটু ভালোবাসার ট্রেনিং নিয়ে নিতে চায়, রাতে স্বামীর সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয়ে যেন কোনো ভুল না হয়।

রণজয়ের অনেক বন্ধুই যদিও সুপ্রিয়ার প্রতি বেশ খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তবু সুপ্রিয়া বেশি প্রশ্রয় দিত ধূর্জটিকেই। ধূর্জটিও বাড়িতে গেলেই সুপ্রিয়া ওপর থেকে তরতর করে নেমে আসত। জোর করে ধূর্জটির কাছে কবিতা শুনতে চাইত। যেকোনো কবিতা শুনেই ভাবত, সেটা ওকে নিয়ে লেখা। ও সুন্দরী বলেই ওর ধারণা ছিল পৃথিবীর সব কবিতা ওকে নিয়ে লেখা হবে। ধূর্জটি অবশ্য আপত্তি করত না। সুপ্রিয়া যখন ধূর্জটির পিঠে হাত রেখে বলত, ধূর্জটিদা, আর একটা পড়ো। তখন ধূর্জটির শরীরে একটা শিরশিরানি ভাব এসে যেত। কৃত্রিম দুঃখের ভাব দেখিয়ে ধূর্জটি বলত, তোমার মতন মেয়েকে বিয়ে করতে পারলে আমি ধন্য হয়ে যেতাম। কিন্তু জানি, তা তো হবে না—তুমি রাজেন্দ্রাণী হওয়ার যোগ্য, আমি একজন সামান্য কবি।

তাতেই সুপ্রিয়া ভাবত, ধূর্জটি বুঝি তার প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খাচ্ছে। সুপ্রিয়া তক্ষুনি রাজি হলেও ধূর্জটি তাকে কিছুতেই বিয়ে করত না। সুন্দরী বউকে সাজাতে-গোছাতেই ধূর্জটিকে সর্বস্বান্ত হতে হত। সুপ্রিয়ার কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা নেই। এইসব মেয়েকে বিয়ে করা যায় না, দূর থেকে দেখতেই ভালো লাগে।

সকলের মুখে সুন্দরী সুন্দরী শুনে সুপ্রিয়ার একসময় একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিল যেন পৃথিবীতে তার চেয়ে সুন্দরী আর নেই। ধূর্জটি এই ব্যাপারটাতে বেশ মজা পেত। সেইজন্যই ধূর্জটি ইচ্ছে করেই আরও বেশি উচ্ছাসের সঙ্গে রূপের প্রশংসা করত সুপ্রিয়ার। সুপ্রিয়া তার প্রত্যেকটি কথা বিশ্বাস করত। ধূর্জটির পাশে এসে বসত সবসময়, ধূর্জটির হাত ছুঁয়ে কথা বলত। যেন সে ধূর্জটিকে দয়া করছে। ধূর্জটি যে, সেই সময়েই আরও দুটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে, তা আর সুপ্রিয়া জানবে কী করে।

সুপ্রিয়া অবশ্য বেছে বেছে সবচেয়ে সুযোগ্য পাত্রটিকেই বিয়ে করেছিল। দীপংকরের চেহারা সুন্দর, ভালো ফ্যামিলি, চাকরিও পেয়েছে জব্বর। স্বামী হিসেবে আদর্শ। দীপংকরের এইরকম স্ত্রী দরকার ছিল, বড়ো অফিসারদের সুন্দরী স্ত্রী না থাকলে চলে না। নানান পার্টিতে বউকে নিয়ে যেতে হয় তো।

দীপংকর ধূর্জটিকে হুইস্কি খেতে অনুরোধ করল। ইস, স্কচ। দীপংকর কি ধূর্জটির কাছে চাল মারতে চাইছে নাকি? বোতলটিতে অর্ধেকেরও কম আছে। ওটুকু তো ধূর্জটি একাই এক চুমুকে শেষ করে দিতে পারে। কিন্তু যাক দরকার নেই, ভদ্রলোক নিশ্চয়ই টিপে টিপে খরচ করেন।

সুপ্রিয়া বাইরের দামি শাড়িটা পালটে একটা সাধারণ আটপৌরে শাড়ি পরে এসেছে। স্বামীর সামনে দেখাতে চায়, আমায় বিশেষ কোনো আলাদা মূল্য নেই ওর কাছে। আমার জন্য সেজে থাকারও দরকার নেই। আমার দিকে সোজাসুজি তাকাতে পারছে না। চোখে একটা ঘুম ঘুম ভাব—যেন আমি চলে গেলেই ভালো হয়! চলেই তো যাবে ধূর্জটি, সে কি থাকতে এসেছে নাকি!

সুপ্রিয়ার স্বামী হঠাৎ ভালোমানুষি দেখাবার জন্য, ওদের আলাদা রেখে বাথরুমে চলে গেল কেন? ভাবল বুঝি, এই সুযোগে ধূর্জটি কিছু গোপন কথা বলে নেবে? পাগল! কোনো প্রেমিকই কোনো বিবাহিতা মহিলার স্বামীর উদারতার সুযোগ নেয় না! স্বামীকে ঠকিয়েই বেশি সুখ।

ধূর্জটি আর সুপ্রিয়া মুখোমুখি বসে আছে। দু-জনেই চুপ। কী কথা বলবে, ধূর্জটি ভেবেই পাচ্ছে না। এক সময় সুপ্রিয়ার সামনে কতরকম প্রগলভতাই করেছে। এখন কথাই খুঁজে পাচ্ছে না সে। মাত্র দু-তিন বছর আগে হলেও, সে নানারকম ঠাট্টা-ইয়ার্কি কিংবা সুপ্রিয়ার রূপের প্রশংসা করে তার অহংকার উসকে দিত। কিন্তু এখন আর সে তা পারবে না। এখন তার জীবনে অনেক বদল এসেছে।

সুপ্রিয়ার মুখে একটু দুঃখী দুঃখী, ভীতু ভীতু ভাব। ও কি অসুখী? কিন্তু অসুখী হওয়ার তো কোনো কারণ নেই। মধ্যবিত্ত বাঙালি ঘরের মেয়ে তো এইরকম স্বামী আর সংসারই চায়। কোনো কিছুরই তো অভাব নেই, এমনকী স্বামীর ভালোবাসারও।

অবশ্য অনেকে ইচ্ছে করে দুঃখী সাজতে ভালোবাসে। আসল কোনো দুঃখ না থাকলেও মনগড়া দুঃখ নিয়ে মেতে থাকে। তা ছাড়া, সুপ্রিয়ার একসময় অভ্যেস ছিল বহুপুরুষের স্তুতি শোনার, এখন কি সে শুধু তার স্বামীর প্রেম নিয়েই তৃপ্ত থাকতে পারবে?

সেইজন্যেই কি অমল গুপ্তের সঙ্গে—

সেদিনের সেই সন্ধ্যেটার কথা ভাবলেই ধূর্জটির গা গুলিয়ে ওঠে। ধূর্জটি সেই একদিনই মাত্র গঙ্গায় নৌকো করে বেড়াতে গিয়েছিল। ওরকম উটকো বেড়াবার শখ তার নেই। সেদিন গিয়েছিল নিতান্ত বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে, এক বন্ধু চাকরিতে একটা বড়ো প্রোমোশন পেয়েছে, সেই উপলক্ষ্যে। ডজন খানেক বিয়ারের বোতল ছিল সঙ্গে, তাই খেয়েই কয়েকজন রীতিমতন মাতাল হয়ে পড়ল। গান আর হইহল্লা। দলের মধ্যে ছিল প্রতুল, তার আবার ভীষণ খিস্তি-খেউড় করা স্বভাব। মেয়েদের দেখলেই তার জিভ লকলক করে। অবশ্য মাঝগঙ্গায় আর মেয়ে কোথায়!

একটা মুশকিল হয়েছিল এই, সেদিন কারুর কাছে দেশলাই ছিল না। মাঝিদের দেশলাইটা চেয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেটাতেও দুটো মাত্র কাঠি, দুরন্ত হাওয়ায় দুটোই নিভে গেল। সিগারেট না টানতে পেরে তখন ওদের প্রায় দমবন্ধ হয়ে আসার অবস্থা। মাঝিরাই বলল, অন্য একটা নৌকো থেকে তারা দেশলাই চেয়ে দেবে।

আর একটা নৌকোর কাছাকাছি যেতেই ধূর্জটি দেখেছিল, এক জন মহিলার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে একজন পুরুষ। তখনই সে বলেছিল, ওদিকে যেতে হবে না। কোনো প্রেমিক-প্রেমিকার নিরালা মুহূর্তে ব্যাঘাত ঘটাতে তার একটুও ইচ্ছে করে না। কিন্তু প্রতুল দেখে ফেলেছে, সে আর ছাড়বে না। সে বলেছিল, চল না মাইরি, একটু হিড়িক দিই! আমাদের কোনো মেয়েছেলে জোটে না

নৌকো দু-টি পাশাপাশি আসবার পর ধূর্জটি চিনতে পেরেছিল সুপ্রিয়া আর অমলকে! অমলকে দেখে সে একটুও অবাক হয় নি। কিন্তু সুপ্রিয়া? অমল গুপ্তের সঙ্গে? ধূর্জটির কোনো নীতি বাতিক নেই। কোনো বিবাহিতা মহিলা অপর কারুর সঙ্গে প্রেম করতে পারবে না, এর কোনো মানে হয় না। রাধা যদি কৃষ্ণের সঙ্গে প্রেম না করত, তাহলে এতগুলো বৈষ্ণব কবি বেকার হয়ে যেত!

সুপ্রিয়ার কি সামান্য ক্ষমতাও নেই মানুষ চেনার! লুকিয়ে প্রেম করার জন্য সে শেষপর্যন্ত অমল গুপ্তর খপ্পরে গিয়ে পড়ল। ভঙ্গিটা দেখেই সেদিন মনে হয়েছিল, সুপ্রিয়া প্রায়ই ওরকমভাবে গঙ্গার ওপরে প্রমোদ ভ্রমণে আসে। নিশ্চয়ই হোটেলেও যায়। সুপ্রিয়ার জন্য সেদিন খুবই দুঃখ হয়েছিল ধূর্জটির।…

এতদিন পর, সুপ্রিয়াদের ফ্ল্যাটে এসে, তার মুখখামুখি বসে থেকে বার বার সে-দৃশ্যটার কথাই মনে পড়ছে। অমল সম্পর্কে সুপ্রিয়াকে কিছু বলা দরকার। কীরকমভাবে বলবে, সেটাই ভেবে পাচ্ছে না।

কিন্তু ধূর্জটি একবার অমলের নাম করতেই সুপ্রিয়া এমন ভাব দেখালো, যেন অমলকে সে ভালো করে চেনেই না! মেয়েরা কত কী পারে! তারপরেই সুপ্রিয়া একটা অছিলা করে ত্ৰস্তে উঠে গেল, ফিরে এল স্বামীর সঙ্গে। কেন সুপ্রিয়া এখন স্বামীর আড়ালে থাকতে চায়, তা ধূর্জটি ভালোই বোঝে!

সুপ্রিয়ার স্বামী দীপংকর এত বেশি বেশি খাতির করছে কেন? ধূর্জটি এই ব্যাপারটাই বুঝতে পারছে না। এমন ভাব করছেন যেন উনি একটি নিপাট ভালো মানুষ। কিন্তু তা তো নয়।

সরলা বিশ্বাস বলে একটি ক্রিশ্চান মেয়ে ধূর্জটির সঙ্গে কলেজে পড়ত। সে এখন দীপংকরেরই স্টেনোগ্রাফার হয়েছে। মেয়েটার বড় দুর্ভাগ্য, কলেজে থাকতে থাকতেই যাকে বিয়ে করেছিল, সে ওকে ছেড়ে চলে গেল। সেই সরলার মুখে দীপংকরের সম্পর্কে কিছু কিছু খবর পেয়েছে ধূর্জটি! ভদ্রলোক এমন ভাব করে থাকেন, যেন ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানেন না। অথচ ভেতরে ভেতরে লোভ আছে ষােলো আনা। অফিসাররা মনে করে তাদের স্টেনোগ্রাফাররা যেন তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। তারা কীরকম পোশাক পরবে, কার সঙ্গে মিশবে, কখন কোথায় যাবে, তাও বসরাই ঠিক করে দেবেন। সরলার সঙ্গে দীপংকর খারাপ ব্যবহার করে না ঠিকই, কিন্তু ভালোমানুষির মধ্যেই একটা দমবন্ধ করা ব্যাপার আছে। সরলার দিকে প্রায়ই লুকিয়ে লুকিয়ে চেয়ে থাকেন, কিন্তু মুখে কিছু বলার সাহস নেই। এখন দিলীপ বোস বলে ওরই অফিসের আর এক ভদ্রলোক অনেকরকমভাবে সাহায্য করছেন। সরলাকে। তিনিই তো গরজ করে সরলাকে ভরতি করে দিয়েছেন ফ্রেঞ্চ ক্লাসে। সেখানে ধূর্জটির সঙ্গে দেখা হয়। দিলীপ বোস সম্ভবত শিগগিরই বিয়ে করবেন সরলাকে। কিন্তু এই দীপংকরই নাকি ব্যাগড়া দিতে চাইছে। এইসব লোক হচ্ছে ডগ ইন দা ম্যানজার টাইপ। নিজে যা খেতে পারবে না, অন্যদেরও তা খেতে দেবে না।

আর এখানে বসতে ভালো লাগছে না। কথাবার্তা ক্রমশ একঘেয়ে হয়ে আসছে। ধূর্জটি উঠে পড়তে চাইছে, কিন্তু দীপংকর কিছুতেই উঠতে দেবে না। স্কচ এখনও অনেকটা আছে কিন্তু ধূর্জটির এখন মদ্যপানে রুচি নেই। আড্ডার সময় হুইস্কি-টুইস্কি থাকলে ভালোই লাগে, কিন্তু এ-রকম আড়ষ্টভাবে বসে মদ্যপান করতে ইচ্ছে করে না।

একসময় ধূর্জটি জোর করেই উঠে পড়ল। দীপংকর অনেকখানি এগিয়ে দিল তাকে এবং বার বার বলতে লাগল, আবার আসবেন, নিশ্চয়ই আসবেন, যেকোনো সময়ে চলে আসবেন।

ভদ্রলোকটি এত বাড়াবাড়ি করছেন কেন? কী এমন খাতির তার সঙ্গে ধূর্জটির? কেন আসতে যাবে সে, তার কি আর কাজকর্ম নেই? যারা বড়ো অফিসার তারা ভাবে, তারাই বুঝি খুব ব্যস্ত। কিন্তু যারা কবিতা লেখে, তাদেরই সময়ের অভাব সবচেয়ে বেশি।

বিদায় নেওয়ার আগে একবার ধূর্জটি তাকিয়েছিল সুপ্রিয়ার দিকে। সুপ্রিয়া একটিবারও তাকে আসতে বলেনি।

সুপ্রিয়ার মুখে তখনও সেই ভয়ভয় ভাব। কাকে ভয় পাচ্ছে সুপ্রিয়া, তার স্বামীকে, না ধূর্জটিকে? ধূর্জটিকে সুপ্রিয়া ভয় পাবে? সেই ধূর্জটি, যার সঙ্গে সুপ্রিয়া একসময় কতরকম হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকত! ধূর্জটিকে কেউ কখনো ভয় করেনি, সে কবিতা লেখে বলে অনেকে তাকে মানুষ হিসেবে গুরুত্বই দেয় না—তাকে সুপ্রিয়ার মতন মেয়ে ভয় পেতে যাবে কেন?

তবু, সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়ার সময় ধূর্জটি মনে মনে বলেছিল, তুমি নিশ্চিন্ত থেকো সুপ্রিয়া, তোমার স্বামী যতই অনুরোধ করুক, আমি আর তোমাদের বাড়িতে আসব না!

দীপংকর আর সুপ্রিয়ার সঙ্গে নতুন করে দেখা হওয়ার পর, ধূর্জটির বেশ একটা অসুবিধে হয়ে গেল। এখন আর এ পাড়ায় যখন-তখন আসা যাবে না।

পরদিনই ধূর্জটির বাড়িতে প্রতুল এসে হাজির। প্রথমেই জিজ্ঞেস করল, কালকের ওই ভদ্রমহিলা কে রে?

প্রতুলের চোখে-মুখে একটা লুব্ধ ভাব। ধূর্জটি জানত, প্রতুল আসবেই। কোনো সুন্দরী মেয়ে দেখলেই প্রতুল পাগল হয়ে ওঠে। যদিও সেইসব মেয়েদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া তো দূরে থাক, আলাপ করার সাহস তার নেই। সে শুধু ভালোবাসে কেচ্ছা-কাহিনি।

ধূর্জটি আলগাভাবে বলল, ওই তো আমাদের রণজয়ের মাসতুতো বোন। আমি চিনি অনেকদিন আগে থেকেই।

আমারও কীরকম যেন চেনা চেনা মনে হল। ধূর্জটি প্রতুলকে বলল, তুই চিনবি কী করে? তুই কি রণজয়ের সঙ্গে ওর মাসিদের বাড়িতে গেছিস কখনো?

না।

তবে? তোর যেমন মুখ আলগা, তোকে কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নিয়ে যেতে সাহস পায় না।

চোপ শালা!

কথা ঘোরাতে চেয়ে ধূর্জটি বলল, তুই কোচবিহারে কবে যাবি?

প্রতুল সে-দিকে গেল না। অন্যমনস্কভাবে বলল, যাই বলো মেয়েটাকে আগে যেন কোথায় দেখেছি। সুন্দরী মেয়েদের একবার দেখলে আমি তো সহজে ভুলি না!

ও আর সুন্দর দেখতে কোথায়? আগে বরং দেখতে মন্দ ছিল না!

যাই বল, এখনও বেশ দারুণ। ঠিক যেন পটের বিবি। কোথায় দেখেছি? আগে কোথায় দেখেছি?

তোর তো সব মেয়েকেই চেনা মনে হয়!

না, না, আচ্ছা, গঙ্গায় সেই যে, অমল গুপ্তর সঙ্গে একজনকে—

ধূর্জটি সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল, কথাটা একেবারে উড়িয়ে দিয়ে বলল, যাঃ, কী যা-তা বলছিস? আমি একে বহুদিন ধরে চিনি। খুব সরল আর ভালো মেয়ে।

কিন্তু অমল গুপ্ত তো বিয়ে করেনি, সেদিন ওর সঙ্গে যে ছিল—

খুব সম্ভবত বাজারের মেয়ে।

কিন্তু দারুণ চেহারা ছিল মাইরি,—দেখলে বোঝাই যায় না–

তুই ওরকম মেয়ে চাস? সন্ধ্যের পর মিউজিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে থাক, পেয়ে যাবি! তোর তো আর কিছু জুটবে না!

প্রতুল ধূর্জটির পিঠে এক চাপড় মেরে বলল, সবাই কি তোর মতন লাকি হয় রে শুয়োরের বাচ্চা! কবিতা তো অনেকেই লেখে, কিন্তু তুই যেরকম একটি মেয়ের ভালোবাসা পেয়েছিস, তুই বেঁচে গেলি এ-জন্মে..

কথাবার্তা অন্য দিকে সরিয়ে দিল ধূর্জটি। প্রতুলকে বিশ্বাস নেই। চতুর্দিকে আজেবাজে কথা বলে বেড়াতে পারে। সুনাম ছড়াতে দেরি হয়, কিন্তু দুর্নাম ছোটে ঝড়ের বেগে। সুপ্রিয়ার একটা সংসার আছে, স্বামী আছে—যদি ঘুণাক্ষরেও সেখানে অমল গুপ্তর সঙ্গে সুপ্রিয়ার নৌকাবিলাসের খবর পোঁছে যায়, তাহলে সব কিছু তছনছ হয়ে যাবে। ধূর্জটি কিছুতেই তা চায় না। যদি সুপ্রিয়াকে কিছু বলতে হয়, তাহলে ধূর্জটি নিজেই কখনো বলবে।

শেষপর্যন্ত বোঝা গেল যে, প্রতুল বিশ্বাস করেছে, অমল গুপ্তের সঙ্গে সে-দিন অন্য একটি মেয়ে ছিল, যার চুল কোঁকড়া কোঁকড়া, নাকটা একটু চাপা এবং বুক দুটো বড্ড বড়ো বড়ো— তখন ধূর্জটি নিশ্চিন্ত হল।

দু-তিন দিন হয়ে গেছে, ধূর্জটির গলফ ক্লাব রোডে যাওয়া হয়নি। তার মন কেমন করে। ওখানে না গিয়ে সে পারবে না।

এক বৃষ্টির দিনে ধূর্জটি বাস থেকে ওই রাস্তায় নামল। এই দুপুর বেলা নিশ্চয়ই কেউ থাকবে না। জলের মধ্যে ছপছপ করে ধূর্জটি এগোলো।

একটু দূরে গিয়েই দেখল, দোতলার বারান্দায় সুপ্রিয়া দাঁড়িয়ে আছে। চুলগুলি পিঠের ওপর মেলা। চোখের দৃষ্টি উদাস।

ধূর্জটি চমকে উঠল। সুপ্রিয়াকে দেখে মনে হয়, সে যেন কারুর প্রতীক্ষা করছে। কার? ধূর্জটির? না, সুপ্রিয়া তো একবারও নিজের মুখে ধূর্জটিকে আসতে বলেনি। তবু সে দুপুর বেলা উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে থাকে কেন বারান্দায়? তবে কি সে অমলের জন্য? অমল বুঝি এখানে আসে নিয়মিত? যাক গে, অমল আসুক বা না আসুক, তাতে ধূর্জটির কিছু যায়-আসে না! সুপ্রিয়া কি তাকে দেখতে পেয়েছে? সে তাড়াতাড়ি দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। তারপর দেওয়াল ঘেঁষে এগোতে লাগল। পার হয়ে গেল সুপ্রিয়াদের বাড়ি।

সুপ্রিয়া দেখতে পেলে নিশ্চয়ই ভাবত, সে ওদেরই বাড়িতে আসছে। সেদিন ওর স্বামী অত করে বলেছিল যখন, তখন তো ধূর্জটি আসবেই।

ধূর্জটির হাসি পেল। দুপুর বেলা চুপি চুপি সে সুপ্রিয়ার সঙ্গে প্রেম করতে আসবে! সেরকম ঘনিষ্ঠতা কী কখনো সুপ্রিয়ার সঙ্গে হয়েছে? সুপ্রিয়ার স্বামী কী সেরকম কিছু ভেবে বসে আছে নাকি?

সুপ্রিয়াদের বাড়ি পেরিয়ে বেশ কয়েকটা বাড়ির পর ধূর্জটি আর একটা বাড়ির সামনে দাঁড়াল। চারপাশটা দেখে নিয়ে ঢুকে গেল ভেতরে।

সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল চারতলায়। দরজা খুলে দিল একটা বাচ্চা চাকর। ধূর্জটি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, দিদিমণি ঘুমোচ্ছেন?

চাকর বলল, না, বই পড়ছেন।

পা টিপে টিপে এসে একেবারে কোণের ঘরটার পর্দা সরিয়ে সে দাঁড়াল। বিছানায় শুয়ে আছে একটি স্থির বিদ্যুৎ। চুলগুলি খোলা, একটি নীল শাড়ি পরা। বুকের ওপর একটা মোটা বই।

ভেতরে এসে ধূর্জটি জিজ্ঞেস করল, আজ কেমন আছ?

বইটি সরিয়ে মেয়েটি নরম আলো ছড়িয়ে তাকাল ধূর্জটির দিকে। তারপর বলল, তুমি তিনদিন আসনি!

ধূর্জটির মুখখানা অপরাধীর মতন। মেয়েটি হাতের ইশারায় বিছানার এক প্রান্ত দেখিয়ে বলল, বোসো।

মেয়েটির বয়েস বাইশ-তেইশের বেশি না। খুব ফর্সা নয়, মাজা মাজা গায়ের রং। তার নাক, চোখ, ঠোঁট কোনোটাই সৌন্দর্যে নিখুঁত নয়, কিন্তু অদ্ভুত একটা আলগা লাবণ্য ছড়িয়ে আছে তার সারাশরীরে। মেয়েটি কিছুদিন ধরে অসুস্থ, তবু রোগও কেড়ে নিতে পারেনি তার সেই লাবণ্য।

মেয়েটির নাম স্মৃতিকণা। এতদিনকার বাউণ্ডুলে জীবনে ধূর্জটিই এই প্রথম একটি মেয়েকে সত্যিকারের ভালোবেসেছে। এর পায়ের কাছে তার হৃৎপিন্ডটা উপড়ে তুলে দিতে পারে।

ধূর্জটি মেয়েদের ব্যাপারে কোনোদিনই তেমন গুরুত্ব দিয়ে কিছু চিন্তা করেনি। হালকা সুরে কথা বলাই তার স্বভাব। সে রূপের পূজারি, রূপ দেখে সে বার বার মুগ্ধ হয়েছে। শুধু রূপসি মেয়েদের রূপ তার ভালো লাগে তা নয়, অনেক সাধারণ মেয়েরও বিশেষ একটা তাকানোর ভঙ্গি কিংবা অসময়ের হাসি কিংবা কারুর কোমল স্বভাব তাকে মুগ্ধ করেছে।

কলেজজীবন থেকেই সে প্রেম করতে শুরু করেছে মেয়েদের সঙ্গে, কিন্তু কারুকেই বিয়ে করার কথা ভাবেনি। বন্ধুরা একে একে বিয়ে করে সংসারী হয়ে গেল, ধূর্জটি সেইরকমই রয়ে গেল। মেয়েদের সাহচর্য তার ভালো লাগে, কিন্তু প্রতিদিনের জীবনসঙ্গিনী হিসেবে কারুকে ঠিক ভাবতে পারে না। কিংবা সেইরকম মেয়ের সন্ধান সে কখনো পায়নি, যে তাকে পুরোপুরি বুঝবে।

স্মৃতিকণার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল অদ্ভুতভাবে। একটা কলেজের সাহিত্যসভায় গিয়েছিল ধূর্জটি। তার কবিতা পাঠ ছাত্র-ছাত্রীরা বেশ আগ্রহের সঙ্গেই শোনে, এমনকী অনেকে চেঁচিয়ে বলে, আর একটা, আর একটা!

সেদিনও, সেই কলেজের সাহিত্যসভায় সগৌরবে কবিতাপাঠ করার পর বাইরে বেরিয়ে এসেছে, ছেলে-মেয়েরা তাকে ঘিরে ধরেছে অটোগ্রাফের জন্য, একটি মেয়ে দূরে তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। লম্বা ছিপছিপে চেহারার মেয়েটি, সে কিন্তু অটোগ্রাফ চায়নি। ধূর্জটি দু একবার তাকিয়েছে তার দিকে, বিশেষত্ব কিছু চোখে পড়েনি।

ভিড় কাটিয়ে বেরিয়ে আসবার সময় ধূর্জটি যখন মেয়েটির পাশ দিয়ে আসছিল, তখন ধূর্জটি টের পেল, মেয়েটি তখনও একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে, যেন চোখ দিয়ে ডাকছে তাকে। ধূর্জটি থমকে দাঁড়াতে মেয়েটি খুব নীচু গলায় বলল, শুনুন, আপনি আজকাল এত বাজে বাজে লিখছেন কেন?

আর সব সহ্য করতে পারে ধূর্জটি, কিন্তু নিজের লেখার একটুও নিন্দে সইতে পারে না। তাই ব্যঙ্গের সুরে উত্তর দিল, বাজে লিখছি? তাই নাকি?

মেয়েটি বলল, নিশ্চয়ই!

এবার ধূর্জটি মেয়েটিকে সম্পূর্ণ অবহেলা করতে পারে। তাই আবার এগিয়ে যেতে যেতে মশলা চিবোবার মতন ভঙ্গি করে বলল, তা কী আর করা যাবে। আমি বাজে লিখলে লোকে তাই পড়বে!

মেয়েটি তবু বলল, আপনি খারাপ লিখলে আমার খুব কষ্ট হয়।

তখনও অবহেলার সুরটা বজায় রেখে ধূর্জটি বলল, কেন? আমি খারাপ লিখলে কার কী আসে-যায়?

তার কারণ, আমি শুধু আপনার লেখাকেই ভালোবাসি-না, আমি আপনাকেও ভালোবাসি! ধূর্জটি যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল। কী বলছে মেয়েটি? আগে তাকে কোনোদিন দেখেনি; সে এ-রকম প্রকাশ্য জায়গায় তাকে ভালোবাসার কথা বলছে! ধূর্জটি দাঁড়িয়ে আবার মেয়েটির কাছে আসতে চাইল। কিন্তু পারল না। আরও অনেক ছেলে-মেয়ে তাকে ঘিরে ধরে তখন নানারকম প্রশ্ন করছে। ভিড় ঠেলে ধূর্জটি এগোবার চেষ্টা করল, কিন্তু মেয়েটি তখন কোথায় যেন আড়ালে পড়ে গেছে। এদিকে তখন ধূর্জটি এবং অন্যান্য অতিথিদের জন্য ট্যাক্সি ডেকে আনা হয়েছে, আর অপেক্ষা করা যায় না। আর দেখা হল না।

সারাসন্ধ্যে ধূর্জটি সেই মেয়েটির কথা ভাবল। শ্যামলা রং, রোগা-পাতলা, মেয়েটির মুখ ধূর্জটির ভালো মনে পড়ে না। ধূর্জটিকে আগে কোনো মেয়ে নিজের থেকে ভালোবাসার কথা বলেনি। এই মেয়েটি তাকে না চিনেই। হয়তো, নতুন দশকের ছেলে-মেয়েরা ভালোবাসার কথাটা অনেক আলগাভাবে বলে। হয়তো ভালোবাসা কথাটার মানেই তাদের কাছে অন্য কিছু।

তবু মেয়েটিকে আর একবার দেখবার ইচ্ছে হয়েছিল তার। কিন্তু উপায় কী? সেই কলেজে গিয়ে তো আর মেয়েটির খোঁজ করা যায় না। তার নামটাও জানা হয়নি।

এর কিছুদিন পরে, একটি পত্রিকা অফিসে ধূর্জটির নামে একটি মেয়ের চিঠি এসেছিল। এ রকম মাঝে মাঝেই আসে। এই মেয়েটি ধূর্জটির একটি লেখার সমালোচনা করে জানিয়েছিল যে, ধূর্জটির যে-নতুন লেখাটা বেরিয়েছে, তার একটা অংশ, অনেকদিন আগে ধূর্জটি আর একটা লেখায় ব্যবহার করেছিল। এ-রকম উচিত নয়। ধূর্জটির কি অভিজ্ঞতা ফুরিয়ে যাচ্ছে?

চিঠিটার সুর দেখেই ধূর্জটির মনে হয়েছিল, এই হয়তো সেই মেয়েটি! শুধু মনে হওয়া নয়, ধূর্জটির দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সে উত্তর লিখল, মেয়েটির সঙ্গে দেখা করে সে সামনাসামনি আলোচনা করতে চায়।

স্মৃতিকণার সঙ্গে প্রথম দিন আলাপের পরই ধূর্জটি বুঝল এ অন্য ধরনের মেয়ে, এ-রকম মেয়ে তার অভিজ্ঞতায় আগে আসেনি।

স্মৃতিকণা তার প্রত্যেকটি লেখা পড়েছে, প্রত্যেকটি লেখা নিজের কাছে জমিয়ে রেখেছে। শুধু তাই নয়, নানান লোকজনের কাছে শুনে শুনে সে ধূর্জটির জীবনযাত্রা সম্পর্কেও খানিকটা আন্দাজ করে নিয়েছে। অর্থাৎ ধূর্জটির লেখকজীবনের গোড়া থেকেই সে অনুসরণ করছে তাকে। স্মৃতিকথা নিজে কিছু লেখে না, কিন্তু তার মনের কথাগুলোই যেন ধূর্জটির কলম দিয়ে বেরোয়। সেইজন্যই, ধূর্জটির লেখার মধ্যে কোনো দুর্বলতা দেখা দিলে সে দুঃখ পায়। অত্যন্ত বুদ্ধিমতী মেয়ে সে, এত অল্প বয়সে পড়াশুনোও করেছে অনেক।

ধূর্জটি বুঝতে পারল, ইংরেজিতে যাকে গার্ডিয়ান এঞ্জেল বলে, স্মৃতিকণাও তার জীবনে অনেকটা তাই। কিংবা আরও সহজ ভাষায় স্মৃতিকণাই তার নিয়তি। কোনো কবির পক্ষে এ রকম একটি মেয়ের ভালোবাসা পাওয়া, নোবেল প্রাইজ পাওয়ার চেয়েও বড়ো।

সমস্ত অহংকার বিসর্জন দিয়ে, ধূর্জটি স্মৃতিকণার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলেছিল, তুমি আমাকে সত্যিই ভালোবাসবে? তাহলে দেখো, আমি নিশ্চয়ই আরও অনেক বেশি ভালো লিখতে পারব।

তারপর থেকে ধূর্জটির জীবনযাত্রা বদলে গেছে। সেই লঘু চপলতা কিংবা যখন-তখন মিথ্যে কথা বলা কিংবা বিভিন্ন মেয়ের কাছে নকল স্তুতির খেলা আর নেই। এতদিন বাদে সে চেয়ে দেখল নিজের মনের গভীরে। আত্ম-আবিষ্কারে মত্ত হয়ে উঠল।

তারপর থেকে প্রতিদিনই স্মৃতিকণার সঙ্গে দেখা না করলে আর চলে না। প্রত্যেকটা নতুন লেখা স্মৃতিকণাকে আগে শোনানো চাই। স্মৃতিকণাও লেখাগুলো নিয়ে এমনভাবে কথা বলে, যেন সেগুলো তার নিজেরই লেখা। দু-জনে একাত্ম হয়ে গেল।

মাস ছয়েকের মধ্যেই স্মৃতিকথা পড়ল অসুখে। সাংঘাতিক অসুখ, জীবনসংশয় হয়েছিল। এর আগে স্মৃতিকণার বাড়ির লোকজন ধূর্জটির অস্তিত্বই জানত না। কিন্তু প্রথম কয়েকদিন ধূর্জটিকে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টাই হাসপাতালে থাকতে দেখে তাঁরা অবাক হলেও কোনো রূঢ় ব্যবহার করতে পারেনি। যেন ধূর্জটির অধিকার সম্পর্কে কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সেই সময়টাতে ধূর্জটি এক লাইনও লেখেনি, কলেজের চাকরিতেও যায়নি। বন্ধুরা ধূর্জটির পরিবর্তন দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। ধূর্জটিকে অনুসরণ করে তারাও কয়েকজন হাতপাতালে এসে স্মৃতিকণাকে দেখেছে। তারপর আর তারা ধূর্জটিকে এ বিষয়ে ঠাট্টা করার সাহস পায়নি।

স্মৃতিকণা এখন অনেকটা সেরে উঠেছে। প্রথম যেদিন স্মৃতিকণার ভালো করে জ্ঞান ফিরল

সেদিন ধূর্জটি দুপুর বেলা গিয়েছিল হাসপাতালে, তার চেনা এক ডাক্তারকে ধরে। সে-সময় স্মৃতিকণার বাড়ির লোকজন কেউ থাকে না। সে ধূর্জটিকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমি যদি মরে যেতাম!

ধূর্জটি দৃঢ় স্বরে বলেছিল, না।

কী না?

তুমি মরতে পার না।

সেটা কী আমার ইচ্ছে? তবু যদি মরে যেতাম?

সেটা অন্যায় হত। এত তাড়াতাড়ি যদি মরবে, তাহলে সেদিন আমার সঙ্গে আলাপ করেছিলে কেন? তুমি মরে গেলে আমাকে একদম লেখা ছেড়ে দিতে হত!

স্মৃতিকণা তার দুর্বল হাতটা তুলে ধূর্জটিকে ছুঁয়ে বলেছিল, আমার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। এই যে বেঁচে উঠলাম, এটাই খুব আনন্দের না!

একটু থেমে স্মৃতিকণা বলেছিল, হাসপাতাল থেকে শিগগিরই বাড়ি চলে যাব। আমার হাসপাতাল ভালো লাগে না, চারদিকে এত অসুখ! তুমি আমাদের বাড়িতে আসবে তো? কোনোরকম ভয় পেয়ো না। তোমার যখন খুশি চলে আসবে।

ধূর্জটি স্মৃতিকণার কপালে হাত দিয়ে দেখল, আজও জ্বর আছে। ধূর্জটি মুখটা নামিয়ে স্মৃতিকণার জ্বরতপ্ত ঠোঁটে একটা আলতো চুমু খেল।

তুমি কেন তিনদিন আসনি?

আটকে গিয়েছিলাম।

এখন তো কলেজ ছুটি তোমার।

রোজই বেরোবার সময় কেউ-না-কেউ এসে যায়। তাদের কাছে তো তোমার কথা বলতে পারি না। তুমি আমার সবচেয়ে গোপন।

যদি আজ এসে দেখতে আমি মরে গেছি?

ধূর্জটি হেসে বলল, তা কখনো হতে পারে? আমি আমার অর্ধেক জীবনীশক্তি যে তোমাকে দিয়ে দিয়েছি। দরকার হলে বাকি অর্ধেকটাও দেব।

সেরকমভাবে আমি বেঁচে উঠলেই বা লাভ কী হবে?

স্মৃতিকণার মা নেই। প্রায় মাস দেড়েক সে হাসপাতালে ছিল। দিন কুড়ি আগে বাড়ি ফিরে এসেছে। এখন সে সেরে ওঠার মুখে। স্মৃতিকণার বাবা ধূর্জটিকে খুব একটা পছন্দ করেন না। কিন্তু স্মৃতিকণা সেরে উঠলেই তাকে ধূর্জটি এ-বাড়ি থেকে হরণ করে নিয়ে যাবে। এরজন্য সে, সারাপৃথিবীটাই মূল্য হিসেবে দিতে রাজি আছে।

স্মৃতিকণার সবচেয়ে বড়ড়া গুণ, সে ধূর্জটিকে বোঝে। ধূর্জটির দুঃখ, না লিখতে পারার অতৃপ্তি সে তার চোখের দিকে তাকালেই জেনে যায়। স্মৃতিকণাকে ভালোবাসার পরই ধূর্জটি নতুন করে ভালো কবিতা লিখতে পারছে।

স্মৃতিকণার চোখের পাতায় ধূর্জটি আস্তে আস্তে আঙুল বুলোয়। কাশ্মীরি মেয়েদের মতন স্মৃতিকণার চোখের পাতাগুলো খুব বড়ো বড়ো।

পরদিন দুপুরে স্মৃতিকণাদের বাড়িতে আসবার সময়ও ধূর্জটি দেখল সুপ্রিয়া দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। আবার লুকিয়ে পড়ল ধূর্জটি।

স্মৃতিকণাদের বাড়ি থেকে ধূর্জটি ফেরে চারটে-সাড়ে চারটের সময়। তখন বিকেল। তখন কিন্তু সে সুপ্রিয়াকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে না। তার প্রতীক্ষা যেন শুধু দুপুরেই।

সুপ্রিয়াকে আগে তো দুপুরে এ-রকম দাঁড়িয়ে থাকতে সে দেখেনি। সে কি কারুর জন্য অপেক্ষা করে? নিশ্চয়ই ধূর্জটির জন্য নয়। সুপ্রিয়া খুব ভালোভাবেই জানে, ধূর্জটি এ-রকম হ্যাংলা নয়! যে-মেয়েকে সে ভালোবাসতে পারেনি, তার কাছ থেকে ধূর্জটি অন্য কিছু দাবি করতে কখনো যাবে না!

সুপ্রিয়া কি অমলের জন্য অপেক্ষা করে? অমল কি আসে এবাড়িতে? আসতেই পারে। অমল যা লোক।

ধূর্জটির এক-এক সময় ইচ্ছে করে, সুপ্রিয়াকে সাবধান করে দিতে। অমল গুপ্ত সত্যিই একটি বিচিত্র চরিত্রের মানুষ। এমনিতে দারুণ বুদ্ধিমান, ভদ্র, আরও অনেক গুণ আছে, কিন্তু মেয়েদের ব্যাপারে একেবারে উন্মাদ।

ওকে দেখে কেউই বুঝতে পারবে না ওর চরিত্রে ডক্টর জেকিল অ্যাণ্ড মিস্টার হাইডের মতন একটা ব্যাপার আছে। নিতান্ত ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া কেউ জানেও না। যেকোনো গানের আসরে কিংবা ভদ্র সমাবেশে অমলকে দেখে সবাই মুগ্ধ হবে। কিন্তু এই অমল গুপ্তই প্রতি সপ্তাহে বাজারের অতিখারাপ মেয়েছেলে নিয়ে ডায়মণ্ড হারবারে ফুর্তি করতে যাবেই। এমনকী কলকাতার হোটেলেও যায়। এই ব্যাপারে একেবারে বেপরোয়া। ওর রুচিও অদ্ভুত। সাধারণত অমলকে ভদ্র মেয়েদের নিয়ে এ-রকম লাম্পট্য করতে দেখা যায় না। অতিসাধারণ বেশ্যাদের নিয়ে ফুর্তি করার দিকেই ওর ঝোঁক। বন্ধুবান্ধবরা অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়েও ওকে ফেরাতে পারেনি। বছর চারেক ধরে ওর এই রোগ ধরেছে।

অমল সম্পর্কে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের আগে বেশ একটা উচ্চ ধারণা ছিল। তার সুন্দর চেহারা, তার গাম্ভীর্য—সব মিলিয়ে আলাদা ধরনের একটা ব্যক্তিত্ব ছিল। কেউ কেউ ভাবত, অমল একসময় বিরাট কিছু হবে।

কিছুই হল না। এখন বোঝা গেছে, সুন্দর চেহারায় সে আসলে একটি লাল মুলো। তার গাম্ভীর্য আসলে তার বোকামিটা ঢেকে রাখার জন্য। তার মতামতের কোনো গভীরতা নেই। কোনো বিষয়ে যখন সে হঠাৎ দু-একটা কথা বলে ফেলে, বোঝা যায়, সে একটা অতিসাধারণ লোক।

অবশ্য মেয়েরা তাকে দেখলেই মুগ্ধ হয়। অধিকাংশ মেয়েই তো মুখ দেখে ভোলে। অমলকে কোনো ঘরোয়া পরিবেশে নিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। মেয়েরা তার দিকে আকৃষ্ট হবেই, আর অমলও তার পরিপূর্ণ সুযোগ নেবে। সঞ্জয় অভিযোগ করেছিল, সে অমলকে একদিন তার দাদার বাড়িতে নিয়ে গেছে, সেখানে অমল একদিনের পরিচয়েই তার বউদির সঙ্গে প্রেম করার চেষ্টা করেছিল।

ধূর্জটি নিজের চোখে দেখেছে, অমল রাত ন-টা-দশটার সময় মিউজিয়ামের সামনে ট্যাক্সি থামিয়ে অপেক্ষা করে। ওই সময় ফুটপাথে অতিসাধারণ বেশ্যারা ঘোরে তাদের গালে সস্তা পাউডার, ঠোঁটে চড়া রঙের লিপস্টিক—অমল তাদের ডাকে, দরাদরি করে, তারপর ট্যাক্সিতে তুলে উধাও হয়ে যায়। এ-রকম প্রায় প্রত্যেক দিন। অমল মদ-টদ খায় না, অন্য নেশা নেই, শুধু তার এই এক মেয়েছেলের নেশা। বন্ধুবান্ধবরা অনেকভাবে তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফেরাবার চেষ্টা করেছে, খারাপ অসুখের ভয় দেখিয়েছে। কিন্তু অমল কিছুতেই শুনবে না। এখন অনেকেই অমল সম্পর্কে আশা ছেড়ে দিয়েছে।

সেইজন্যই গঙ্গায় নৌকোর ওপরে অমলের সঙ্গে সুপ্রিয়াকে দেখে ধূর্জটি শুধু অবাক হয়নি, দুঃখিত হয়েছিল খুব। সুপ্রিয়া এ কী সাংঘাতিক ভুল করেছে! সুপ্রিয়া যদি অন্য কারুর সঙ্গে প্রেম করতেই চায়, তাহলে তার স্বামীর বন্ধু দিলীপ বসুর মতন কারুর সঙ্গে প্রেম করুক না। এইসব লোক অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। তা ছাড়া কক্ষনো মনে আঘাত দেওয়ার মতন কিছু করবে না। অমল তো তার নিজের শরীর থেকে সুপ্রিয়ার স্পর্শ মেলাতে-না-মেলাতেই আবার আর একটা মেয়ের কাছে চলে যাবে!

স্মৃতিকণার বিছানার পাশে বসে ধূর্জটি একটা গভীর তৃপ্তির স্বাদ পায়। এ-রকম সুখ আর কেউ কখনো পায়নি। দু-জনে দু-জনকে যদি ঠিক মতন বুঝতে পারে—তার থেকে বড়ো ভালোবাসা আর কী থাকতে পারে? স্মৃতিকণা যখন ধূর্জটির কবিতার দু-একটা লাইন উচ্চারণ করে, তখন তার মনে হয়, সে নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেল!

স্মৃতিকণার হাতটা একটু ছুঁয়েই ধূর্জটি যে আনন্দ পায়, সহস্র নারীকে ভোগ করেও রাজা যযাতি সে-আনন্দ পায়নি। স্মৃতিকণাকে ভালোবেসে ধূর্জটির যেন পুনর্জন্ম হয়েছে।

স্মৃতিকণাদের বাড়ি থেকে ফেরবার সময় ধূর্জটির একদিন হঠাৎ মনে হল, প্রায় রোজই এ পাড়ায় আসছে যখন, তখন একদিন বোধ হয় সুপ্রিয়াদের বাড়িতেও যাওয়া উচিত। হয়তো সুপ্রিয়া দু-একদিন তাকে দেখে ফেলেছে।

সুপ্রিয়া যদি ভাবে, এ পাড়াতে এসেও ধূর্জটি ওদের বাড়িতে আসছে না, তার মানে সে ওদের অগ্রাহ্য করতে চায়। না, সেরকম তো কিছু নয়। সুপ্রিয়ার ওপর তার তো কোনো রাগ নেই। বরং খানিকটা করুণার মতন ব্যাপার আছে।

বিকেল হয়ে গেছে। এখন গেলে নিশ্চয়ই খুব একটা খারাপ দেখাবে না। খুব অন্তরঙ্গতা না থাকলে ঘোর দুপুর বেলা কেউ কারুর বাড়ি যায় না। কিন্তু বিকেল বেলা যে-কেউ আসতে পারে।

ওপরে উঠে এসে ধূর্জটি দরজার কলিং বেলের বোতাম টিপল।

চাকর বা রাঁধুনি নয়, দরজা খুলল সুপ্রিয়াই। যেন সে অন্য কারুর কথা ভেবে তাড়াহুড়ো করে নিজেই দৌড়ে এসেছে।

সুপ্রিয়া ধূর্জটিকে দেখে খুবই অবাক হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত কোনো কথাই বলতে পারছে না। তাই ধূর্জটি হালকা করে বলল, এই একটু চা খেতে এলাম। সুপ্রিয়া তবুও কোনো কথা বলছে না দেখে ধূর্জটি বলল, কি, অসময়ে এসে বিরক্ত করলাম নাকি? তুমি ব্যস্ত আছ? অন্য কারুর আসার কথা আছে?

সুপ্রিয়া নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, না, না এসো! তুমি তো সেই সেদিনের পর আর এলেই না।

দু-জনে এসে বসবার ঘরে সোফায় বসল। সারাফ্ল্যাটটা নিস্তব্ধ। বাচ্চামেয়েটা কোথায় গেল?

সে-কথাই জিজ্ঞেস করল ধূর্জটি।

তোমার মেয়ে কোথায়? এখনও তো দেখলামই না। সেদিনও ঘুমিয়ে পড়েছিল।

সুপ্রিয়া বলল, সে তো রাঁধুনির সঙ্গে পার্কে বেড়াতে গেছে। তুমি একটু বোসো, চায়ের জল চাপিয়ে দিয়ে আসি। চাকরটাও আজ ছুটি নিয়েছে—

সুপ্রিয়া রান্নাঘরে যাওয়ার পর ধূর্জটি চিন্তা করতে লাগল। চাকর ছুটিতে, মেয়েকে নিয়ে রাঁধুনি বেড়াতে গেছে, ফ্ল্যাট একদম ফাঁকা। যেন একটা সাজানো স্টেজ। সুপ্রিয়ার মুখের অস্থিরতা দেখে মনে হয়, নিশ্চয়ই কারুর জন্য অপেক্ষা করছিল সে।

কার জন্য? অমল? তা ছাড়া আর কে? ওরা দু-জনে কি এতটা নীচে নেমে গেছে? দীপংকরবাবু তো এখন কলকাতাতেই আছে!

অমলের সাহস খুবই বেড়ে গেছে। কিংবা সে এখন বেপরোয়া হয়ে গেছে। বন্ধুবান্ধবরা

অমলকে সাবধান করে দিয়েছিল, সে যখন বাজারের মেয়েদের নিয়েই সন্তুষ্ট, তখন সে যেন আর ভদ্র মেয়েদের দিকে নজর না দেয়। তার ওই রূপ দেখিয়ে ভদ্র মেয়েদের সর্বনাশ করার অধিকার আর নেই। অমল শোনেনি একথা। সে সুপ্রিয়াকে নষ্ট করতে আসে। আহা, সুপ্রিয়া রণজয়ের বোন, সে যদি এ-রকম একটা বিশ্রী লোকের পাল্লায় পড়ে—

ফিরে এসে সুপ্রিয়া বলল, রোজই ভাবতাম, কবে তুমি আসবে। আমি অপেক্ষা করতাম তোমার জন্য।

মুখটা কুঁচকে গেল ধূর্জটির। কত বড়ো মিথ্যে কথা! মেয়েরা অম্লানবদনে এ-রকম মিথ্যে কথা বলতে পারে! (না, না, সব মেয়ে নয়, স্মৃতিকথার মতন মেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা)। সুপ্রিয়া খুব ভালো করেই জানে, ধূর্জটি যেকোনো সময় আসবার মতন সম্পর্ক পাতায়নি কখনো তার সঙ্গে। সে তো কখনো অমলের মতন সুপ্রিয়ার কোলে মাথা দিয়ে শোয়নি! এক্ষুনি যদি অমল এসে পড়ে, তাহলে বেশ মজা হবে।

সুপ্রিয়াকে একটু আঘাত দেওয়ার লোভ সে সামলাতে পারল না। সিগারেট ধরিয়ে বলল, অমলের কী খবর?

যা ভেবেছিল তাই, সুপ্রিয়ার মুখখানা সাদা হয়ে গেল। ভূত দেখার মতন চোখ করে তাকিয়ে রইল ধূর্জটির দিকে।

কয়েক পলক ওইরকম ভাবে তাকিয়ে থাকার পর আবার হঠাৎ সুপ্রিয়ার মুখটা লালচে হয়ে গেল। সে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, তুমি আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে এসেছ?

ধূর্জটি অবাক হয়ে বলল, কীসের প্রতিশোধ?

তুমি আমাকে শাস্তি দিতে এসেছ?

কীসের শাস্তি? তুমি কী বলছ, সুপ্রিয়া?

তুমি অমলের নাম করে…

শোনো, শোনো, আমি বলছিলাম যে, অমল…

না, না, তোমাকে কিছু বলতে হবে না!

এরপর সুপ্রিয়া যা করল, তা আরও নাটকীয়। সে হঠাৎ উঠে এসে ধূর্জটির হাত ধরে ব্যাকুলভাবে বলল, ধূর্জটিদা, তুমি আমায় ক্ষমা করবে?

বিব্রত হয়ে ধূর্জটি বলল, আরে, এ কী, এ কী! ক্ষমার কি আছে?

না, তুমি কথা দাও! আমি একবার ভুল করেছি, আর জীবনে কখনো করব না। তুমি ক্ষমা করবে কথা দাও!

তুমি কী দোষ করেছ? তোমাকে আমি কীজন্য ক্ষমা করব?

তুমি অমলের কথা আর কখনো উচ্চারণ করবে না। কোনো দিন আর কারুকে বলবে না। আমার গা ছুঁয়ে বলো। ওটা একটা দুঃস্বপ্ন। আমি নিজেই ওই পরিচ্ছেদটা একেবারে ভুলে যেতে চাই। তুমি কারুকে বলবে না বলো!

ধূর্জটি একটুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল। সুপ্রিয়ার গলার স্বর শুনেই একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যায় সে ধূর্জটিকে ভয় পাচ্ছে। সে ভেবেছে, ধূর্জটি সুপ্রিয়ার গোপন অভিসারের কথা চতুর্দিকে বলে বেড়াবে। কিংবা ধূর্জটি বুঝি সুপ্রিয়ার গোপনীয়তার জন্য তাকে ব্ল্যাকমেল করতে এসেছে।

ছি ছি সুপ্রিয়া তাকে এত ছোটো ভাবে? সুপ্রিয়া তার বন্ধুর বোন, তার কোনো ক্ষতি করার কথা ধূর্জটির মাথায় কখনো আসতে পারে?

সুপ্রিয়া, আমি কী এমন কিছু করতে পারি, যাতে তোমার কোনো বিপদ হয়? না, না, তুমি কথা দাও! আগে আমার গা ছুঁয়ে কথা দাও! ধূর্জটির মনটা খারাপ হয়ে গেল। সুপ্রিয়া একেবারে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ধূর্জটি আলতোভাবে তার বাহু ছুঁয়ে আস্তে আস্তে বলল, এই তোমার গা ছুঁয়ে দিলাম, কোনোদিন অমলের কথা কেউ জানবে না।

সুপ্রিয়ার মুখ থেকে যেন দমকা হাওয়ায় সব মেঘ উড়ে গেল। ঝলমল করে উঠল আলো। সে বলল আমি তো জানি, তোমার ওপর সবসময় নির্ভর করতে পারি। তুমি আমার বন্ধু!

আবেগ লুকোবার জন্য সুপ্রিয়া দৌড়ে চলে গেল চা নিয়ে আসতে। ধূর্জটির আর এক মুহূর্তও বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না। তার মুখ বিস্বাদ হয়ে গেছে। সুপ্রিয়া শেষপর্যন্ত তাকে এত খারাপ ভেবেছে! সুপ্রিয়া অন্য কারুর সঙ্গে প্রেম করলেই বা ধূর্জটি আপত্তি করতে যাবে কেন? অন্য কারুকে বলতেই-বা যাবে কেন? সে যত ইচ্ছে অন্য পুরুষের সঙ্গে গঙ্গায় নৌকো নিয়ে বেড়াক না, তাতে ধূর্জটির কী আসে-যায়? সে শুধু ভেবেছিল, অমল সম্পর্কে একটু সাবধান করে দেবে। তাও তো বলেনি শেষপর্যন্ত।

নেহাত এসেই চায়ের কথা বলেছিল ধূর্জটি, চা না খেয়ে উঠে যেতে পারল না। চুপ করে বসে রইল।

চা নিয়ে আসতে আসতে সুপ্রিয়ার মনে হল, ধূর্জটির কাছে যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা দেখানো হয়নি। ধূর্জটির মুখটা খুব শুকনো দেখাচ্ছে।

সুপ্রিয়া চা নিয়ে বসল ধূর্জটির একেবারে পাশে। খুব অন্তরঙ্গ সুরে জিজ্ঞেস করল, ধূর্জটিদা,

তোমায় একটা কথা জিজ্ঞেস করব, সত্যি করে উত্তর দেবে?

কী?

সত্যি করে উত্তর দেবে বলো?

নিশ্চয়ই।

তুমি এখনও আমাকে আগের মতন ভালোবাসো?

ধূর্জটি দীপংকরের মতন যখন-তখন ভালোবাসা কথাটা উচ্চারণ করা পছন্দ করে না। সে মনে মনে একটু কৌতুকবোধ করল। আগের মতন মানে কী? আগেও তো তোমাকে ভালোবাসিনি সুপ্রিয়া! কিন্তু কোনো মেয়ের ব্যগ্র মুখের সামনে এ-রকম কথা বলা যায় না। ধূর্জটির এইটুকু রসবোধ আছে।

সে হালকা গলায় বলল, নিশ্চয়ই?

সুপ্রিয়ার মনটা হঠাৎ খুব নরম হয়ে গেল। সে অনুভব করল, ধূর্জটির ওপর একসময় সে সত্যিই খুব অবিচার করেছে। ধূর্জটি একসময় তাকে খুবই ব্যাকুলভাবে ভালোবাসত, সুপ্রিয়া সেই ভালোবাসা নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করেছে।

সুপ্রিয়া বলল, এবার আমি তোমাকে একটা সত্যি কথা বলি?

বলো!

বিয়ের আগে আমি প্রায় ছেলেমানুষ ছিলাম তো! তখন অনেক কিছুই বুঝতে পারতাম না। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে পড়ে সেইসব দিনের কথা, তখন বুঝতে পারি, আমি তোমাকে তখনই খুব ভালোবাসতাম। আমি জীবনে অনেক ভুল করেছি, কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি!

ধূর্জটি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল, সুপ্রিয়ার বিয়ে হয়েছে চব্বিশ বছর বয়েসে। চব্বিশ বছর বয়েসেও যদি কেউ ছেলেমানুষ থাকে, তবে সে কি আর সারাজীবনে বড়ো হতে পারে? বরং বয়েস বাড়লে মানুষ মিথ্যে কথা বলাটা একটু কমায়। সুপ্রিয়া তাও কমায়নি।

তবু সে সুপ্রিয়ার এই কথাটা শুনে ঠাট্টা বা ইয়ার্কি করতে পারল না। সত্যি হোক, মিথ্যে হোক, সুপ্রিয়া বলেছে তো যে সে ধূর্জটিকে ভালোবাসে। এ-রকম একটি সুন্দরী মেয়ের মুখ থেকে কথাটা উচ্চারিত হতে শুনলেই একরকমের মোহ জন্মায়।

সে একটু গাঢ় স্বরে বলল, সুপ্রিয়া, আজ আমি ধন্য হলুম।

সুপ্রিয়া ধূর্জটির চোখে চোখ রাখল। বেশ কিছুক্ষণ। চোখে চোখে অনেক কথা হয়ে গেল। সত্যিকারের প্রেমিক-প্রেমিকার মতন। সেইমুহূর্তে ধূর্জটি স্মৃতিকণার কথা একেবারেই ভুলে গেল! তার মনে হল, সুপ্রিয়া আগের চেয়েও বেশি সুন্দরী হয়েছে। এক সন্তানের মায়েরাই পরিপূর্ণ নারী হয়। তার আগে মেয়েদের কেমন যেন, পেনসিল স্কেচের মতন আলতো দেখায়।

ধূর্জটি সুপ্রিয়ার একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিল। সুপ্রিয়া বিন্দুমাত্র আপত্তি করল না। সে যেন আরও বেশি কিছু চায়।

ধূর্জটির মধ্যে সেই পুরোনো রূপ-চাতকটি ফিরে এসেছে। নির্জন বাড়ি, সুপ্রিয়া তার এত কাছাকাছি, সে নিশ্বাসের সঙ্গে টেনে নিচ্ছে সুপ্রিয়ার শরীরের ঘ্রাণ। এইমাত্র সুপ্রিয়া তাকে বলেছে, সে ধূর্জটিকে ভালোবাসে। হোক না মিথ্যে, তবু জীবনে অনেক মিথ্যেও তো সুন্দর।

সুপ্রিয়া আদুরে মেয়ের মতন মুখভঙ্গি করে বসে আছে। যেন সে আদর চায়। ধূর্জটি কি তাকে এখন একটু আদর করতে পারে না? এতে কী দোষ আছে? বুকের মধ্যে তৃষ্ণার তো নিবৃত্তি নেই। খানিকক্ষণ আগেই স্মৃতিকণাদের বাড়িতে, স্মৃতিকণার হাত ছুঁয়ে ধূর্জটি ভেবেছিল, পৃথিবীতে তার আর কিছুই চাইবার নেই।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধূর্জটি সুপ্রিয়ার হাতটা নামিয়ে রাখল। না, অমল গুপ্তর উচ্ছিষ্ট মেয়েকে সে করুণা করতে পারে, আদর করতে পারে না। চা খাওয়া হয়ে গেছে, এবার তার উঠে পড়াই উচিত।

তোমার নিজের হাতের লেখা দুটো কবিতা এখনও আমার কাছে আছে।

কোন কবিতা?

সে-কবিতা দুটোর কথা বোধ হয় তোমারও মনে নেই। তুমি ছোড়দাকে দিয়েছিলে, ছোড়দা তো কবিতা-টবিতা সেরকম বোঝে না। একটা বইয়ের ভাঁজে রেখে দিয়েছিল। হারিয়েই যেত, আমি যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম। আজও আমার কাছে আছে।

কই, দেখাও তো!

বোধ হয় আলমারিতে আছে।

এবাড়িতে!

হ্যাঁ, বাপের বাড়ি থেকে আমার সব জিনিসপত্তর আনবার সময়… দাঁড়াও খুঁজে দেখছি। ধূর্জটি একটু উত্তেজিত বোধ করল। তার শিগগিরই একটা নতুন বই বেরোবে। পুরোনো অনেক কবিতারই কপি হারিয়ে গেছে। যদি সুপ্রিয়ার কাছ থেকে দুটো কবিতা পাওয়া যায়, তাহলে অনেক সুবিধে হবে। সুপ্রিয়া সত্যি তার কবিতা যত্ন করে রেখে দিয়েছে? সুপ্রিয়ার কাছে কবিতার কোনো দাম আছে? ধূর্জটি তাহলে সেই সময় সুপ্রিয়াকে চিনতে ভুল করেছিল?

সুপ্রিয়া উঠে দাঁড়াল। তারপর ধূর্জটিকে বলল, তুমিও এসো! কোন আলমারিতে রেখেছি, ঠিক মনে পড়ছে না। খুঁজতে সময় লাগবে। ততক্ষণ তুমি একলা একলা বসে থাকবে কেন?

সুপ্রিয়াকে অনুসরণ করে ধূর্জটি এল ওদের শোয়ার ঘরে। এটা তার কিছুই অস্বাভাবিক মনে হল না। বাড়িতে যখন কেউ নেই, তখন বসবার ঘরে থাকা আর শোয়ার ঘরে থাকা তো একই কথা।

এঘরে কোনো চেয়ার নেই। বসতে হলে বিছানাতেই বসতে হবে। সুপ্রিয়া বিছানার দিকে হাত দেখিয়ে বলল, বোসো-না!

ঘরে তিনটে আলমারি। সত্যিই সুপ্রিয়ার খুঁজে দেখতে সময় লাগবে।

দেওয়ালের গায়ে একটা কাচের আলমারি, তাতে দীপংকরের মদের বোতল সাজানো। কয়েকটা বোতল খালি, কয়েকটা সুদৃশ্য বোতল এমনিই রাখা আছে। দুটো বোতল বোধ হয় ভরতি।

ধূর্জটিকে সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সুপ্রিয়া ছোটো ছেলে-মেয়েদের ষড়যন্ত্র করার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, খাবে?

না থাক।

চাবির গোছা সুপ্রিয়ার কোমরে গোঁজা। সুপ্রিয়া সেখান থেকে চাবির রিংটা তুলে নিতেই ধূর্জটি লক্ষ করল, সুপ্রিয়ার কোমরের খাঁজ এখনও কী নিখুঁত। পিঠটা যেন ইংরিজি ভি অক্ষরের মতন। লাল ব্লাউজ পরে আছে। এক-একবার আঁচল খসে যাচ্ছে, এই সময় যদি একবার এদিকে ফিরত। এই নারীটি সত্যিই বড়ো মোহময়ী।

সুপ্রিয়া একটা আলমারি খুঁজে পেল না। সে আলমারি শুধু শাড়িতে ভরতি। শাড়ি-গয়নার সঙ্গে কি কেউ কবিতা রাখে? সুপ্রিয়া কি সত্যি কবিতা দুটো খুঁজে পাবে? হয়তো সুপ্রিয়া মিথ্যে কথা বলেছে। তবু, হোক-না মিথ্যেকথা, সুপ্রিয়ার মতন মেয়ের মুখ থেকে এ-রকম মিথ্যেও অনেক মধুর! আবার সে স্মৃতিকণাকে ভুলে গিয়ে সুপ্রিয়ার রূপের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ল। সুপ্রিয়া যদি আবার তার সামনে এসে দাঁড়ায়, তার কাঁধে হাত রাখে—

ধূর্জটির দিকে পেছন ফিরে দ্বিতীয় আলমারি খুঁজছে সুপ্রিয়া। ধূর্জটি উন্মুখভাবে তাকিয়ে রয়েছে। এই সময় দরজায় কলিং বেল বেজে উঠল।

ধূর্জটি চমকে উঠল। কে হতে পারে? অমল নয় তো? এই সময় যদি অমল গুপ্ত এসে পড়ে! বেশ মজাই হবে তাহলে।

সুপ্রিয়াও এদিকে ঘুরে বিহ্বলভাবে তাকাল ধূর্জটির দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, কে?

যেন ধূর্জটিই জানে এর উত্তর। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি দরজা খুলে দিয়ে আসব? বোধ হয় অমল এসেছে–।

সুপ্রিয়া চেঁচিয়ে বলল, না। অমল এ বাড়িতে কখনো আসে না। তুমি বিশ্বাস করো, সেই যে তুমি একদিন দেখেছিলে, তা ছাড়া আমি অমলের কাছে আর কোনোদিন যাইনি। তার আগেও না, পরেও না

ধূর্জটি হাসল।

আড়াইটা বেজে গেছে। দীপংকর রীতিমতন অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে। কয়েকটা জরুরি চিঠি পাঠাতে হবে। কিন্তু সরলা বিশ্বাস এখনও ফেরেনি।

একটার সময় লাঞ্চ আওয়ার শুরু হয়। এতক্ষণে নিশ্চয়ই ফিরে আসা উচিত ছিল। দীপংকর সময়ের ব্যাপারে কক্ষনো কড়াকড়ি করে না। অনেকদিন তো কাজই থাকে না তেমন। কিন্তু যখন কাজ থাকে, তখন দায়িত্বজ্ঞানহীনতা দীপংকর পছন্দ করে না মোটেই। আর কোন সময় কাজ থাকবে কী না থাকবে সেটার খোঁজ রাখা স্টেনোগ্রাফারেরই কর্তব্য।

বেশি রাগ হয়ে গেলে দীপংকর কক্ষনো তা প্রকাশ করে না। সে নিজেই তখন বেশি কাজ করে। দীপংকর নিজেই লং হ্যাণ্ডে তিনখানা চিঠি লিখল। তার নিজের হাতে টাইপ করতে বসল।

কাজে মন বসছে না দীপংকরের। সরলা বিশ্বাসের ওপর সে বড়োবেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে আজকাল। এ-রকম হয়। সরলা খুব কাজের মেয়ে বলেই দীপংকর তাকে অনেকখানি বিশ্বাস করে বসে আছে। অনেক জরুরি চিঠির কথা দীপংকর ভুলে গেলেও সরলাই তাকে মনে করিয়ে দিয়েছে।

ইদানীং অবশ্য সরলাকে প্রায়ই অন্যমনস্ক দেখা যায়। ঘন ঘন ছুটি নেয়। এটা পছন্দ হয় দীপংকরের। সরলা ছুটি নিক, তাতে তার আপত্তি নেই, পাওনা ছুটি তো নেবেই—কিন্তু সরলা তো একবারও বলে না ছুটিটা তার কীজন্য দরকার। আগে সব কিছুই বলত। এখন বেশ একটা দূরত্ব রচনা করে ফেলেছে। দীপংকর কোনো দিন সরলার কোনোরকম অসম্মান করেনি, নানা ভাবে তার উপকারই করতে চেয়েছে—সরলা কি সেটা বোঝে না?

সরলার কাজে কোনো ত্রুটি নেই। সমস্ত কাগজপত্রই সে বেশ সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে রাখে। বেচারি নিজের ঘরসংসারই শুধু সাজাতে পারল না। ওর স্বামীটা একটা পাষন্ড, এমন একটা মেয়ের মূল্য বুঝতে পারল না। দীপংকরের যদি ক্ষমতা থাকত তাহলে সে ঘাড় ধরে সরলার স্বামীকে ফিরিয়ে আনত। সে লোকটা অন্য মেয়েকে নিয়ে বেলেল্লা করে বেড়াচ্ছে—আর সরলার ব্যবহার ঠিক শুদ্ধ তপশ্চারিণীর মতন—অন্য কোননা পুরুষের দিকে সে চোখ তুলে তাকায় না। বন্ধঘরের মধ্যে দীপংকরের এত কাছাকাছি সে বসে, কিন্তু একদিনের জন্যও দীপংকর ওর ব্যবহারে কোনো খুঁত পায়নি। দিলীপ বোসটা অবশ্য মাঝেসাঝে ওকে খুব জ্বালাবার চেষ্টা করছিল। আজকাল দিলীপকে আর এঘরে বেশি দেখা যায় না। আগের মতন কাজ না থাকলেও ছলছুতো করে যখন-তখন এঘরে আসে না। দিলীপ নিশ্চয়ই অন্য কোনো মেয়ের সন্ধান পেয়েছে। ওর কাজই তো এই।

অনেক দিন টাইপ করার অভ্যেস নেই দীপংকরের। খট খট শব্দ নিজের কানেই বাজছে। তবু সরলার ওপরে বিরক্তিটা সে কাটাবার চেষ্টা করছে। ঘড়ি দেখছে ঘন ঘন।

সরলা বিশ্বাস ফিরল পৌনে চারটের সময়।

দীপংকর তাকে দেখেও মুখ তুলল না। সে তার রাগি মুখ বাথরুমের আয়না ছাড়া আর কারুকেই দেখায় না। তা ছাড়া আজ সকাল থেকেই তার মাথা ধরে আছে।

সরলা বলল, মি. ব্যানার্জি, আমি খুবই দুঃখিত। হঠাৎ এমন আটকে পড়েছিলাম।

হুঁ, ঠিক আছে।

আপনাকে আমার খবর দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু টেলিফোনে কিছুতেই কানেকশান পেলাম না।

আচ্ছা।

যেহেতু দীপংকর সরলারই টেবিলে বসে টাইপ করছে, তাই সরলা বসতে পারছে না। সে তো তার ওপরওয়ালার চেয়ারে বসতে পারে না।

মি. ব্যানার্জি, রাগ করবেন না। অন্তত আজকের দিনটা আমার ওপর রাগ করবেন না!

সরলার গলার আওয়াজে এমন একটা ব্যাকুলতা ছিল, যে-জন্য দীপংকর চমকে মুখ তুলে তাকাল।

অন্য দিনের তুলনায় সরলা আজ যেন একটু বেশি সেজেছে। সাধারণত সাদা শাড়িই সে পরে, আজ তার শাড়ির রং হালকা নীল। বড়ো চমৎকার, মায়াময় নীল। মুখে নতুন কোনো প্রসাধন নেই, তবু মুখখানা অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল।

সরলার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। যেকোনো কারণেই হোক, সে আজ বেশ উত্তেজিত হয়ে আছে মনে হয়। সেই শান্ত ধীরস্থির সরলা বিশ্বাস আজ যেন সম্পূর্ণ নতুন মেয়ে।

কী ব্যাপার?

সরলার মুখ লজ্জায় আরক্ত। কী করে সে নিজেকে প্রকাশ করবে ঠিক ভেবে পাচ্ছে না। একটু কিন্তু কিন্তু করে সে বলেই ফেলল আমি আবার বিয়ে করছি।

তাই নাকি? খুশি হলাম।

মানে, আজই বিয়ের নোটিশ দিয়ে এলাম…হঠাৎ ঠিক হল…আপনাকে আগেই বলা উচিত ছিল…

দীপংকর আবার মুখ নীচু করে টাইপ রাইটারে চিঠিটা শেষ করতে লাগল। সরলার ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহই নেই। আসলে সে তার অভিমান গোপন করার চেষ্টা করছে। সরলা আবার বিয়ে করছে, কবে সব ঠিকঠাক হয়ে গেল? দীপংকরকে একবার জানালো না। দীপংকর কি তার শত্রু? কাকে বিয়ে করছে, আবার কোনো একটা অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানকে? এ বিয়েই বা আবার কতদিন টিকবে কে জানে? ওদের কি কোনো নীতিবোধ আছে?

অনেকক্ষণ মাথা নীচু করে টাইপ করবার জন্যই হয়তো দীপংকরের ঘাড়ের কাছে চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়েছে। দু-তিনদিন ধরে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। এবার সে কিছুদিন ছুটি নেবে। চুলোয় যাক অফিস। সে একা আর কত কাজ করবে?

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অস্বস্তি বোধ করছে সরলা। সে টের পাচ্ছে দীপংকরের রাগ। কিন্তু আজকের দিনটাতে উনি রাগ না করলেই পারতেন!

সে আস্তে আস্তে বলল, আমি ভেবেছিলাম, আপনার বন্ধুর কাছ থেকেই আপনি সব জানতে পারবেন।

কী?

দিলীপবাবু নিজেই আপনাকে সব খুলে বলবেন!

কিন্তু দিলীপের তো বউ আছে।

ওদের মধ্যে অনেকদিন বনিবনা নেই!

দীপংকর বিশ্বাসই করতে পারছে না কথাটা। এ কখনো হতে পারে? দিলীপের স্ত্রী। সুতপাকে সে চেনে। অত্যন্ত বুদ্ধিমতী মেয়ে, দেখতেও ভালো—ওদের তো বেশ সুখী মনে হয়েছিল।

কী করে বিয়ে হবে? ওদের কি ডিভোর্স হয়ে গেছে?

আমারই মতন। এখন সেপারেশন চলছে, আগামী মাসেই—

দিলীপের তো দু-টি ছেলে-মেয়ে আছে।

তা থাক-না। তাতে তো কোনো ক্ষতি নেই।

মিসেস বিশ্বাস, একজনের সংসার ভেঙে, আর একটা সংসার গড়লে, সে-সংসার নিয়ে কি সুখী হওয়া যায়? সুতপার সঙ্গে দিলীপের সাময়িক ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে—আমাদের মতন পরিবারে ওরকম হয়ই, কিন্তু সেটা শোধরাবার চেষ্টা করাই কি উচিত নয়? হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় একটা কিছু করে ফেলাই কি ঠিক? এ-দিকটা একবারও ভাববেন না? বিশেষ করে ওদের ছেলে-মেয়ে দুটোর কথা

দীপংকরের কথাগুলো গুরুগম্ভীর উপদেশের মতো শোনালো। সরলা চট করে উত্তর দিল, একটু সময় নিল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, মিস্টার ব্যানার্জি আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে সব জায়গায় এক নিয়ম খাটে না। আমার অভিজ্ঞতা থেকেই আমি জানি, এক বাড়িতে, এক সংসারে, একই ঘরে থেকে নিত্য তিরিশ দিন ঝগড়া করার চেয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া অনেক ভালো। তাতে ছেলে-মেয়েদেরও ক্ষতি হয় না। উপকারই হয়। বাপ-মাকে রোজ রোজ ঝগড়া করতে দেখলে কী ছেলে-মেয়েদের খুব একটা ভালো লাগে বলতে চান? অনেক সময় সেটা তাদের জীবনের ওপর ছাপ ফেলে দেয়। আমরা অনেক ভেবেচিন্তেই এটা ঠিক করেছি। দিলীপবাবু ভীষণ অসুখী ছিলেন…

সরলাকে একসঙ্গে এতকথা বলতে কোনোদিন শোনেনি দীপংকর। সে বুঝতেই পারল, তার যতই আপত্তি থাক, ওরা বিয়ে করবেই। একসঙ্গে তার মনের ওপর দিয়ে অনেক কথা খেলে গেল। দিলীপ তাহলে সত্যি বিয়ে করছে! দীপংকরের ধারণা ছিল, দিলীপ শুধু বিভিন্ন মেয়ের সঙ্গে সুখের খেলা খেলে বেড়ায়, কারুর দায়িত্ব নিতে চায় না। …একবার বিয়ে ভেঙে আবার বিয়ে করা—এতবড়ো একটা ঝামেলার কাজ দীপংকর নিজে কখনোই পারত না। …বিয়ের পর সরলা আর চাকরি করবে না। সরলা ছাড়া এই ঘরটা…। তার ওপর যত কাজ দিয়ে নির্ভর করা যায়, সেরকম কি আর কারুকে..। কিংবা চাকরি করতেও পারে। মেয়েরা একবার চাকরিতে ঢুকলে সহজে ছাড়তে চায় না। আসবে সরলা এই ঘরে… কিন্তু তখন সে দিলীপের স্ত্রী। এ-ঘরে দরজা বন্ধ…সে কি তখনও সরলাকে যখন-তখন কাজের জন্য অনুরোধ করতে পারবে?

দীপংকর জোরে বলে উঠল না, এ হতেই পারে না।

বলে সে নিজেই চমকে উঠল। এ কী বলছে সে? এরকমভাবে কখনো বলা যায়? এটা তো দিলীপ আর সরলার নিজস্ব ব্যাপার। ওরা তো ছেলেমানুষ নয়!

রুমাল দিয়ে মুখ মুছে সে বলল, আপনারা নিশ্চয়ই বুঝেসুঝেই করেছেন, আমার এতসব কথা বলা উচিত নয়।

তবু দীপংকর নিজেকে সামলাতে পারছে না। তার রাগ ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে, সরলা বিয়ে করে চলে যাবে এই ঘর থেকে—এটা যেন সে বিশ্বাসই করতে পারছে না। এখন সে বুঝতে পারছে, সরলা একটুক্ষণ ঘরের বাইরে থাকলে কেন সে ছটফট করত। তার ইচ্ছে হল, সে সরলার হাত জড়িয়ে মিনতি করে বলে, সরলা, তুমি দিলীপকে বিয়ে কোরো না! তুমি আর যাকে খুশি বিয়ে করো, এই অফিসের কারুকে নয়। তুমি আমাকে ছেড়ে যেয়ো না!

কিন্তু একথা দীপংকর বলতে পারে না। সরলা তার কে? সামান্য একজন কর্মচারী মাত্র। একজনের বদলে আর একজন আসবে। সে তো সরলাকে এতদিনের মধ্যে একবারও অন্তরঙ্গ সুরে কোনো কথা বলেনি। অভিমানে দীপংকর মুখ গোঁজ করে রইল।

আপনি উঠুন না, আমি চটপট শেষ করে দিচ্ছি।

না, ঠিক আছে।

আপনি উঠুন-না, আমি চটপট শেষ করে দিচ্ছি।

শিশুর মতন জেদ ধরে দীপংকরও বলল, বলছি তো, দরকার নেই!

আসলে দীপংকর বলতে চাইল, এরপর থেকে আমাকেই সব করতে হবে। আমি আর কোনো স্টেনোগ্রাফারকে আমার ঘরে বসাব না।

সরলা একদম কাছে এসে খুব নরম গলায় বলল, মি. ব্যানার্জি আপনি রাগ করবেন না। আমি চিঠিগুলো এক্ষুনি—

সরলার খোলা চুল, পুরো হাত ব্লাউজ, তার শরীরের মৃদু গন্ধদীপংকরের এত কাছে! সরলার যে একটা আলাদা ধরনের রূপ আছে, তা যেন দীপংকর আগে কখনো লক্ষ করেনি। এই মেয়েকে তার কাছ থেকে অন্য একজন কেড়ে নিয়ে যাবে? … না, না, কেড়ে তো নিচ্ছে না, দিলীপ রীতিমতন আইনসম্মত ভাবে বিয়ে করছে—এতে দীপংকর কোনোরকম বাধা দিতে পারে না। তবু রাগে দীপংকরের কপালের দু-পাশের শিরা দপদপ করছে।

উঠে বাথরুমে যেতে গিয়ে দীপংকর অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।

দীপংকর নাটকীয় ঘটনা একদম পছন্দ করে না। অফিসের সব লোক এসেছে। ধরাধরি করে তাকে তুলছে, নানারকম সহানুভূতিসূচক মন্তব্য—জ্ঞান ফিরে আসার পর দীপংকর এসব একটুও পছন্দ করছে না। তার লজ্জা করছে। সে নিজেই উঠে দাঁড়াল। চোখে-মুখে জল ছেটাতে গিয়ে এরা তার জামা-প্যান্ট একদম ভিজিয়ে ফেলেছে! ভেতরে ভেতরে তার যে কবে এত ব্লাড-প্রেসার বেড়ে গেছে সে নিজেই জানে না। এখন কোনোরকম মানসিক উত্তেজনার কারণ ঘটানো একদম উচিত না।

দীপংকরের ইচ্ছে না থাকলেও অফিসের দু-জন সহকর্মী তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে এল।

একবার বেল দিতেও দরজা খুলল না, দ্বিতীয়বার বেশ জোরে বেল দিতেই দরজা খুলে দিল সুপ্রিয়া। এবং শয়নকক্ষ থেকে বেরিয়ে এল ধূর্জটি।

দীপংকর এখন অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে। নেহাত জামা আর প্যান্ট ভিজে গেছে এবং চুল এলোমেলো হয়েছে বলেই তার পক্ষে আর অফিসে থাকা সম্ভব ছিল না।

ধূর্জটিকে দেখে সে ভাবল, যাক, এসে গেছে তাহলে? আগেও এসেছে না এই প্রথম? তা জানবার উপায় নেই, কারণ দীপংকর তো কখনো এ সময় বাড়ি ফেরে না।

তবে, মনে হয় ধূর্জটি মাঝেমাঝেই দুপুরের দিকে আসে, সেইজন্যই কয়েকদিন ধরে সুপ্রিয়াকে বেশ খুশি খুশি দেখাচ্ছিল! যাক, সুপ্রিয়া তাহলে তার সময় কাটাবার জন্য উপযুক্ত একটা খেলনা পেয়েছে। এটা দীপংকরেরই কৃতিত্ব।

দীপংকর মনে মনে বলল, আমি কিন্তু গোয়েন্দাগিরি করতে আসিনি। ধূর্জটি আর সুপ্রিয়া কি সেইকথা ভাবছে? না, না, না, সত্যি, বিশ্বাস করো, আমি সত্যিই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। এ-রকম কখনো আমার হয় না। এটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট।

ধূর্জটি অপ্রস্তুত মুখে দাঁড়িয়েছিল, দীপংকর তার সঙ্গে সহকর্মীদের আলাপ করিয়ে দিল, ইনি ধূর্জটি চৌধুরি, বিখ্যাত কবি—সম্পর্কে সুপ্রিয়ার দাদা হন।

বাড়িতে রাঁধুনি আর চাকরও নেই, মেয়েটাও নেই! সুপ্রিয়ার সঙ্গে রয়েছে অন্য একটি যুবকতার সঙ্গে একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক খুঁজে বার করতেই হয়। অফিসের সহকর্মীরা তো সব ব্যাপারটা বুঝবে না!

রাঁধুনি আর চাকর, দু-জনকে একসঙ্গে কী করে বাইরে পাঠাল সুপ্রিয়া? বিশেষ কিছু দরকার পড়েছিল? ধূর্জটি বুঝি সম্পূর্ণ নির্জনতা চায়? ধূর্জটি হঠাৎ খুব অপ্রস্তুত হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।

সবাই মিলে দীপংকরকে বলতে লাগল, আপনি এবার শুয়ে পড়ন গিয়ে।

দীপংকর কিছুতেই যেতে চায় না। সে তো এখন ভালো হয়ে গেছে। সে তো এখন অনায়াসেই গল্প করতে পারে অন্যদের সঙ্গে! ধূর্জটিকে সেই কবিতাটা পড়তে বলবে নাকি?

তারপরেই দীপংকর বুঝতে পারল। এখন বিছানায় শুয়ে পড়াই উচিত! নইলে তার অসুখটা বিশ্বাসযোগ্য হবে না। হয়তো কেউ ভাবতেও পারে, সে এমনিই অজ্ঞান হওয়ার ভান করেছিল!

সুপ্রিয়া পাশেই দাঁড়িয়ে! অসুখের ব্যাপারে সুপ্রিয়া কখনো বেশি আদিখ্যেতা করে না। সে জানে হুড়োহুড়ি-দৌড়োদৗড়ি কিংবা হা-হুতাশ করলে অসুখের কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না। সে এর মধ্যেই তাদের পারিবারিক ডাক্তারকে ফোন করে দিয়েছে। এখন অপেক্ষা করছে। ডাক্তারের জন্য। তার মুখে উদবেগের চিহ্নটা দীপংকর ছাড়া আর কেউ দেখতে পাবে না।

দীপংকর উঠে দাঁড়িয়ে সুপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট গলায় বলল, সত্যি, এখনও একটু একটু মাথা ঘুরছে। আমার হাতটা ধরো তো!

অতিব্যস্ত সহকর্মী দু-জন সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমরাও ধরছি, আমরাও ধরছি!

তিনজনে মিলে ধরাধরি করে দীপংকরকে নিয়ে গেল শোয়ার ঘরে।

বাইরের ঘরটায় ধূর্জটি দাঁড়িয়ে রইল অপ্রতিভ মুখে! এইসব অবস্থায় সে নিজেকে ঠিক মানিয়ে নিতে পারে না। দীপংকর অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে সে কি তাকে সান্ত্বনা দেবে, না কোনো কথা বলবে? কী করতে হয় এই সময়ে?

আসলে কিছুই করার নেই। শোয়ার ঘরে একটা আলমারি এখনও খোলা। সুপ্রিয়া ধূর্জটির লেখা দুটো খুঁজে পায়নি। পুরোনো লেখা সম্পর্কে ধূর্জটির খুব আগ্রহ ছিল। কিন্তু আজ আর পাওয়ার আশা নেই! এখন ধূর্জটি চলে গেলেই পারে। ডাক্তার-টাক্তার আসবে, সবাই এখন ব্যস্ত থাকবে, সে তো উপস্থিত থেকেও বিশেষ কোনো সাহায্য করতে পারবে না।

ধূর্জটি চলে যেতেই চায়। তবু পারছে না। তার পা দুটো যেন পেরেক দিয়ে গাঁথা। খালি পা! এর মধ্যে সে বোকার মতন একটা কান্ড করে ফেলেছে। তাড়াহুড়োর মধ্যে সে তার চটিজোড়া সুপ্রিয়াদের শোয়ার ঘরেই ফেলে এসেছে। ঠিক খাটের নীচে। যে-খাটে এখন দীপংকর শুয়ে আছে। ধূর্জটি কি ওখান থেকে এখন চটিজোড়া আনতে যেতে পারে?

যদি দীপংকর অন্য কিছু ভাবে?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *