লীলাবতীর মৃত্যু -পর্ব-(১৮) হুমায়ূন আহমেদ

হলের বাসার টানা বারান্দায় বসে রাত জেগে কত লেখালেখি করেছি। গুলির শব্দে মাঝে মাঝে লেখায় যেমন বাধা পড়েছে, তেমনি অন্যরকম ব্যাপারও ঘটেছে। হঠাৎ শােনা গেল—বাঁশি বাজছে।লীলাবতীর মৃত্যুকাঁচা হাতের বাজনা, বড়ই সুন্দর হাত। লেখালেখি বন্ধ করে বাঁশি শুনেছি। 

আমার হলের নিশিরাতের সেই বংশীবাদক জানে না আমি কত আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতাম তার বাশির জন্যে। সে ভালাে থাকুক, তার জীবন মঙ্গলময় হােক—এই প্রার্থনা। কত আনন্দ পেয়েছি তার জন্যে ।। 

সেই হল ছেড়ে দেওয়ার সময় হলাে। বহুদূর প্রােথিত এই শিকড় ছিড়তে হবে। 

কী কষ্ট! কী কষ্ট! | ঠিক করলাম, একদিনে হল ছেড়ে যাব না। ধীরে ধীরে যাব। প্রথম দিন হয়তাে বইগুলাে নেওয়া হবে, দ্বিতীয় দিনে শুধু চেয়ার, তৃতীয় দিনে ফুলের টব… এইভাবে এক মাসের পরিকল্পনা। বােঝাও যাবে না আমরা হল ছাড়ছি। করাও হলাে তা-ই। বাচ্চাদের আগে আগে পাঠিয়ে দেওয়া হলাে। আমি এবং আমার স্ত্রী হল ছাড়লাম গভীর রাতে। 

 শেষবারের মতাে শূন্যঘরে দাঁড়িয়েছি। ছছাট বাচ্চাদের মতাে ফুঁপিয়ে কাঁদছি, গুলতেকিন বলল, তােমার যখন এত খারাপ লাগছে তখন হল ছেড়ে দিচ্ছ কেন ? থেকে যাও। 

থেকে যাও বললেই থেকে যাওয়া যায় না। প্রােথিত শিকড় ছিড়তে হয়। হয়তাে এই শিকড় ছেড়ার মধ্য দিয়েই কেউ-একজন আমাদের আসল শিকড় ছেড়ার কথা মনে করিয়ে দেন…। 

তিনি 

রাত নটার মতাে বাজে। আমি কী যেন লিখছি। হঠাৎ আমার মেজো মেয়ে ছুটতে 

ছুটতে এসে বলল, বাবা, খুব বিখ্যাত মানুষ তােমাকে টেলিফোন করেছেন। 

আমি দেখলাম আমার মেয়ের মুখ উত্তেজনায় চকচক করছে। ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না। বিখ্যাত মানুষেরা যে আমাকে একেবারেই টেলিফোন করেন না তা তাে না। মেয়ে এত উত্তেজিত কেন ? 

বাবা তুমি কিন্তু আবার বলতে বলবে না যে তুমি বাসায় নেই। তােমার বিশ্রী অভ্যাস আছে বাসায় থেকেও বলল বাসায় নেই। 

আমি বললাম, টেলিফোন কে করেছে মা? আমার মেয়ে ফিসফিস করে বলল, জাহানারা ইমাম। এই নাম ফিসফিস করে বলছ কেন ? ফিসফিস করার কী হলাে? 

বাবা, উনি যখন বললেন তার নাম জাহানারা ইমাম তখন আমি এতই নার্ভাস হয়ে গেছি যে, তাঁকে স্নামালিকুম বলতে ভুলে গেছি। 

বিরাট ভুল হয়েছে। যাই হােক দেখা যাক কী করা যায়। 

আমি টেলিফোন ধরলাম এবং বললাম, আমার মেয়ে আপনাকে সালাম দিতে ভুলে গেছে এইজন্যে সে খুব লজ্জিত। আপনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন। সে আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। 

ওপাশ থেকে তাঁর হাসির শব্দ শুনলাম। হাসতে হাসতেই বললেন, আমি কিন্তু আপনাকে টেলিফোন করেছি কিছু কঠিন কথা বলার জন্যে। 

বলুন। আপনি রাগ করুন বা না করুন, কথাগুলাে আমাকে বলতেই হবে। আমি শংকিত হয়ে আপনার কথা শােনার জন্যে অপেক্ষা করছি। 

আপনি স্বাধীনতাবিরােধীদের পত্রিকায় লেখেন কেন ? আপনার মতাে আরও অনেকেই এই কাজটি করে। কিন্তু আপনি কেন করবেন? 

তিনি কথা বলছেন নিচু গলায় । কিন্তু বলার ভঙ্গিতে কোনাে অস্পষ্টতা নেই। কোনাে আড়ষ্টতা নেই। 

আমি হকচকিয়ে গেলাম। আক্রমণ এইদিক থেকে আসবে ভাবি নি। তবে পত্রিকায় লেখা দেওয়ার ব্যাপারে আমার কিছু যুক্তি আছে। খুব যে দুর্বল যুক্তি তাও না। যুক্তিগুলাে তাঁকে শােনালাম। মনে হলাে এতে তিনি আরও রেগে গেলেন। কঠিন গলায় বললেন, আপনার মিসির আলি-বিষয়ক রচনা আমি কিছু কিছু পড়ছি, আপনি যুক্তি ভালাে দেবেন তা জানি। কিন্তু আমি আপনার কাছ থেকে যুক্তি শুনতে চাচ্ছি না। আপনাকে কথা দিতে হবে ওদের পত্রিকায় লিখে ওদের হাত শক্তিশালী করবেন না। আপনি একজন শহীদ পিতার পুত্র। তুই রাজাকার’ স্লোগান আপনার কলম থেকে বের হয়েছে। বলুন আর লিখবেন না! 

আমি সহজে প্রভাবিত হই না । সে রাতে হলাম। বলতে বাধ্য হলাম, আপনাকে কথা দিচ্ছি আর লিখব না। এখন বলুন আপনার রাগ কি কমেছে ? তিনি হেসে ফেললেন। বাচ্চামেয়েদের এক ধরনের হাসি আছে কুটকুট হাসি, বড়দের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে যে হাসিটা তারা হাসে সেই হাসি।। 

আমি বললাম, আমি সব সময় লক্ষ করেছি আপনি আমাকে আপনি আপনি করে বলেন। নিজেকে খুব দূরের মানুষ মনে হয়। দয়া করে আমাকে তুমি কবে বলবেন। তিনি বললেন, আচ্ছা বলব। এখন থেকে বলব। 

তিনি কিন্তু আমাকে তুমি কখনােই বলেন নি। যতবারই মনে করিয়ে দিয়েছি ততবারই বলেছেন, হ্যা এখন থেকে বলব । কিন্তু বলার সময় বলেছেন আপনি। হয়তাে আমাকে তিনি কখনােই কাছের মানুষ মনে করেন নি। 

তাঁর অনেক কাছের মানুষ ছিল আমার মা। আমার ছােটভাই জাফর ইকবাল । জাফর ইকবালের উল্লেখ তাঁর লেখাতে পাই। ব্যক্তিগত আলাপেও জাফর ইকবালের প্রসঙ্গে তাঁকে উচ্ছসিত হতে দেখি। শুধু আমার ব্যাপারেই এক ধরনের শীতলতা। হয়তাে তার ধারণা হয়েছিল, যে মহান আন্দোলনের নেতৃত্ব তিনি দিচ্ছেন আমি সেই আন্দোলন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছি। যে ১০১জনকে নিয়ে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আদি যাত্রা, আমি সেই ১০১জনের একজন। অথচ পরে আমার আর কোনাে খোঁজ নেই। কাজেই আমার ভূমিকায় অস্পষ্টতা তাে আছেই। তিনি আমার প্রতি শীতলভাব পােষণ করতেই পারেন। সেটাই স্বাভাবিক। 

আরেক দিনের কথা, তিনি টেলিফোন করেছেন। গলার স্বর অস্পষ্ট। কথা কেমন জড়িয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, আপনার শরীর খারাপ ? 

তিনি ক্লান্ত গলায় বললেন, শরীর আছে শরীরের মতােই। আপনাকে একটা ব্যাপারে টেলিফোন করেছি। 

বলুন কী ব্যাপার। 

এই যে একটা আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি এতে অর্থ ব্যয় হচ্ছে। আমাকে চলতে হচ্ছে মানুষের চাদায়। আপনি প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দেবেন 

অবশ্যই দেব । আমি একজনকে পাঠাচ্ছি। এ মাসের চাঁদা দিয়ে দিন। জি আচ্ছা। কত করে দেব ? আপনি আপনার সামর্থমতাে দেবেন। মাসে দু’ হাজার করে দিতে পারবেন? পারব। 

একজন এসে চাদা নিয়ে গেল। পরের দু’ মাস কেউ চাঁদা নিতে এল না। আমার একটু মন খারাপ হলাে। মনে হলাে হয়তাে সিদ্ধান্ত হয়েছে আমার কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হবে না। তৃতীয় মাসে তিনি টেলিফোন করে বললেন, কী ব্যাপার, আপনি আপনার চাদার টাকা দিচ্ছেন না কেন ? 

আমি বিনীতভাবে বললাম, কেউ তাে নিতে আসে নি। 

আমার এত লােকজন কোথায় যে পাঠাব! আপনি নিজে এসে দিয়ে যেতে পারেন না ? আপনি তাে এলিফ্যান্ট রােডেই থাকেন। দু’ মিনিটের পথ। 

আমি আসছি। ভালাে কথা, আপনার সঙ্গে রাগারাগি করার মতাে একটা ঘটনা ঘটেছে। আমি এসেই কিন্তু রাগারাগি করব। 

তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, আমি তাে কিছুই বুঝতে পারছি না। এসে নেই, তারপর বুঝবেন। 

, এখন বলুন। 

আমার বড় মেয়ে নােভার ছিল মাথাভর্তি চুল। আপনি হচ্ছেন তার আদর্শ। আপনার মাথার ছােট ছােট চুল তার খুব পছন্দ। সে আপনার মতাে হওয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে তার মাথার সব চুল কেটে ফেলেছে। 

সত্যি ? বাসায় আসুন। বাসায় এসে দেখে যান। 

একেবারে কিশােরী গলায় তিনি অনেকক্ষণ হাসলেন। তারপর বললেন, আপনার মেয়েকে বলবেন লম্বা চুল আমার খুব প্রিয়। আমি যখন ওর বয়সী ছিলাম, তখন আমার হাঁটু পর্যন্ত লম্বা চুল ছিল। ছবি আছে। আমি আপনার মেয়েকে ছবি দেখাব। চুল কেটে ছােট করতে হয়েছে ক্যানসারের জন্যে । কেমােথেরাপির কারণে চুল পড়ে যাচ্ছিল। কী আর করব! 

তিনি একবার আমার বাসায় আসার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। আমার মেয়েদের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করবেন। তার গল্প করতে ইচ্ছা করছে। গাড়ি পাঠিয়ে তাঁকে আনালাম। বাসায় আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। গ্রহ যেমন সূর্যকে ঘিরে রাখে আমার মেয়েরাও তাঁকে সেইভাবে ঘিরে গােল হয়ে বসে পড়ল।

Leave a comment

Your email address will not be published.