লীলাবতীর মৃত্যু -পর্ব-(৬) হুমায়ূন আহমেদ

অমরত্বের চেষ্টায় মানুষ কখনাে থেমে থাকে নি। যে-কোনাে মূল্যেই হােক মৃত্যু ঠেকিয়ে রাখতে হবে। তা সম্ভব হলাে না। মানুষ ভরসা করল মৃত্যুর পরের অমরত্বের জন্যে। পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থও (মহাযান, হীনযান ছাড়া) মৃত্যুর পর অমরত্বের কথা বলছে। স্বর্গ-নরকের কথা বলছে। এই পৃথিবীতে যে অমরত্বের 

লীলাবতীর মৃত্যুসম্ভাবনা নেই পরকালে তার অনুসন্ধান। বাদ সাধল বিজ্ঞান। বিজ্ঞান বলে, মানুষের ধ্বংস হয়ে যাওয়া শরীরের ইলেকট্রন, প্রােটনে অমরত্ব আছে। কিন্তু ইলেকট্রন, প্রােটন বা নিউট্রন মানুষের স্মৃতি বহন করবে না। 

এই যখন অবস্থা তখন Frank J. Tipler একটি বই লিখলেন। বইয়ের নাম Physics of Immortality। এই বইয়ে লেখক দেখালেন পদার্থবিদ্যার সূত্র ব্যবহার করে মৃত্যুর পর মানুষের পুনরুত্থান এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করা যায়। বইটি সম্পর্কে New York Times বলছে, A thrilling ride to the for edges of modern physics. সায়েন্স পত্রিকা বলছে, Tipler একটি মাস্টারপিস লিখেছেন। আমরা যা বিশ্বাস করতে চাই, পদার্থবিদ্যা দিয়ে তা-ই বলছেন। 

লেখকের পরিচয় তিনি Tulane বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর অব ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিক্স । 

সমকালীন পদার্থবিদরা স্বীকার করেছেন যে, Tipler-এর বইতে পদার্থবিদ্যার কোনাে সূত্রের ভুল ব্যবহার নেই। তবে…। আমি তবের ব্যাখ্যায় গেলাম না। বইটিতে ওমেগা পয়েন্টের কথা বলা হয়েছে, যেখানে ঈশ্বরের উপস্থিতি। আমি নিজে ওমেগা পয়েন্ট নাম দিয়ে একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লিখেছি।

লীলাবতীর মৃত্যু -পর্ব-(৬) হুমায়ূন আহমেদ

ওমেগা পয়েন্টে আমি যা বলতে চেয়েছিলাম তা বলতে পারি নি। 

কল্পনা করা যাক, আমগাছের মগডালে একটি পাকা আম। বানর আমটি পাড়তে পারছে না, কারণ ডাল অত্যন্ত সরু। ডাল ভেঙে পড়ে সে আহত হবে। বানরের হাতে তখন যদি একটি লাঠি দেওয়া হয়, সে লাঠি দিয়ে আম পাড়ার চেষ্টা করবে । তিনবার চেষ্টা চালিয়ে চতুর্থবার সে ডাল ফেলে চলে যাবে। মানুষ সেটা করবে না। আম না-পাড়া পর্যন্ত সে লাঠি দিয়ে চেষ্টা করেই যাবে। লাঠির সঙ্গে আরেক লাঠি যুক্ত করবে। মানুষ রণে ভঙ্গ দেবে না। 

অমরত্বের সন্ধানে মানুষ কখনােই রণে ভঙ্গ দেয় নি। তাদের প্রধান চেষ্টা ছিল মৃত্যুর রহস্য ভেদ করা। শুরুতে ভাবা হয়েছে, একটি নির্দিষ্ট বয়সের পরে শারীরিক মৃত্যুঘড়ি বেজে ওঠে। তখন মৃত্যুপ্রক্রিয়া শুরু হয়। জরা আমাদের গ্রাস করতে থাকে। 

এখন বলা হচ্ছে, মৃত্যুঘণ্টা বা মৃত্যুঘড়ি বলে কিছু নেই। মানবদেহ অতি আদর্শ এক যন্ত্র। যন্ত্রের দিকে খেয়াল রাখলেই জরা আমাদের গ্রাস করবে না। বায়ােলজিস্টরা এখন বলছেন, জরার মূল কারণ টেলােমারস (Telomeres) কণিকাগুচ্ছ । এরা DNA-র অংশ, থাকে ক্রমােজমের শেষ প্রান্তে। যখনই কোনাে  

জৈবকোষ ভাঙে, টেলােমার কণিকাগুচ্ছ দৈর্ঘ্যে ছােট হতে থাকে। যখন জৈবকোষের আর কোনাে টেলােমার থাকে না তখনই শুরু হয় জরা। আমরা ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগুতে থাকি। 

বায়ােলজিস্টরা পরীক্ষা শুরু করলেন জরাগ্রস্ত হঁদুর নিয়ে। তাদের দেওয়া হলাে টেলমােরজ (Telomerase) এনজাইম। দেখা গেল, তাদের জরা-প্রক্রিয়াই শুধু যে বন্ধ হলাে তা না, তারা ফিরতে লাগল যৌবনের দিকে। 

লীলাবতীর মৃত্যু -পর্ব-(৬) হুমায়ূন আহমেদ

এই পরীক্ষা মানুষের ওপর করার সময় এসে গেছে। যে-কোনাে দিন পত্রিকা খুলে জরা বন্ধ করার খবর পড়া যাবে। গৌতম বুদ্ধ এ সময় থাকলে আনন্দ পেতেন। তিনি জরা ও মৃত্যু নিয়ে অস্থির ছিলেন। নির্বাণে মানুষ জরা ও মৃত্যুমুক্ত হবে, এটা তাঁর শিক্ষা । 

তারপর এ-কী! সত্যি কি মৃত্যুকে ঠেকানাে যাচ্ছে ? আমার হাতে টাইম পত্রিকার একটি সংখ্যা (ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১১); প্রচ্ছদকাহিনি 2045, The year Man Becomes Immortal. প্রচ্ছদকাহিনি পড়ে জানলাম ২০৪৫ সালে মানুষ অমর হয়ে যাচ্ছে। মানুষের হাতে আসছে নতুন নতুন টেকনােলজি। টেকনােলজির বৃদ্ধি ঘটছে এক্সপােনেনশিয়েলি! ২০৪৫-এর কাছাকাছি মানুষ Singularity-তে পৌছবে। সিঙ্গুলারিটি শব্দটি এসেছে Astro Physics থেকে। এর অর্থ এমন এক বিন্দু, যেখানে পদার্থবিদ্যার সাধারণ সূত্র কাজ করবে না। এর মানেই অমরত্ব। ইচ্ছামৃত্যু ছাড়া মৃত্যু নেই। ছােট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ২০৪সাল পর্যন্ত আমি এমনিতেই টিকছি না। অমরত্ব পাওয়া এই জীবনে আর হলাে না। পৃথিবীতে ফিনিক ফোটা জোছনা আসবে। শ্রাবণ মাসে টিনের চালে বৃষ্টির সেতার বাজবে। সেই অপূর্ব অলৌকিক সংগীত শােনার জন্যে আমি থাকব না। কোনাে মানে হয়! 

প্রসঙ্গ আত্মা 

ডিকশনারিতে আত্মাকে বলা হচ্ছে, মানুষের শুদ্ধতম অংশ যা মানুষের মৃত্যুর পরও অবিনাশী । পৃথিবীর সমস্ত ধর্মগ্রন্থে আত্মার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের পবিত্র কোরআনশরিফে বলা হয়েছে, আত্মা হলাে আল্লাহর হুকুম (Order of God)। 

লীলাবতীর মৃত্যু -পর্ব-(৬) হুমায়ূন আহমেদ

বাইবেল দু ধরনের আত্মার কথা বলে—Nefes, পশুর আত্মা যা পশুদের পরিচালিত করে। মানুষের আত্মা হলাে Neshama, যা মানুষকে দিয়েছে স্বাধীন beti (Free wilt, Gen 1:27) 

হিন্দু বে-এ আত্মাকে দু’ভাগ করা হয়েছে—জীবাত্মা এবং পরমাত্মা । জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশ। | ধর্মকথা কিছুক্ষণের জন্যে বন্ধ থাকুক। এই ফাঁকে আমরা যাই বিজ্ঞানের কাছে। বিজ্ঞান কি আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে ? পৃথিবীর বড় বিজ্ঞানীদের একটি অংশ ঈশ্বরবাদী। তারা আত্মার অস্তিত্ব বিশ্বাস করলেও মুখ বুজে থাকেন। সরাসরি প্রশ্ন করলে কৌশলে এড়িয়ে যান। এর মধ্যে ব্যতিক্রম দেখা গেল সার্জন ডানকান ম্যাকডুগালকে (Dunkan Macdougall)। 

এই ডাক্তার ও সার্জন আত্মার অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণের পরীক্ষা শুরু করলেন। তিনি বললেন, আত্মা থাকলে তার ওজন থাকবে। মৃত্যুর পরপর মানুষের ওজন কমে যাবে। ডানকান সাহেব কাজ করতেন যক্ষ্মারােগীদের স্বাস্থ্যনিবাসে। কিছু মৃত্যুপথযাত্রী রােগী রাজি হলাে জীবনের শেষ মুহূর্তে দাড়িপাল্লায় শুয়ে মারা যেতে । সব মিলিয়ে ছয়জন রােগী পাওয়া গেল। তারা বিজ্ঞানের স্বার্থে গিনিপিগ হবে। 

সার্জন ডানকান পরীক্ষায় পেলেন, মৃত্যুর পরপর মানুষের ওজন একুশ গ্রাম (০.৭৫ আউন্স) কমে যায়। তাঁর এই গবেষণাপত্র বিখ্যাত জার্নাল American Medicine-এ প্রকাশিত হয় (১৯০৭)। 

পাঠক ভেবে বসবেন না জার্নালে এই গবেষণাপত্র প্রকাশ হওয়ামাত্র বিজ্ঞানীরা বলতে শুরু করলেন, আত্মা আছে। আত্মার ওজন একুশ গ্রাম। 

বিজ্ঞানের প্রধান শক্তি হলাে, কেউ কিছু বলামাত্র অন্ধভাবে তা বিশ্বাস না করা। গবেষণাপত্রের ভুল বের করা। পৃথিবীর সব মহান বিজ্ঞানীকে এই 

প্রতিকূলতার ঢেউ পার করে আসতে হয়েছে। আইনস্টাইনও বাদ থাকেন নি। 

লীলাবতীর মৃত্যু -পর্ব-(৬) হুমায়ূন আহমেদ

ডানকান সাহেবের গবেষণায় যেসব ভুল ধরা হলাে তা হলাে, ওজনযন্ত্রের ভুল। মাপে ভুল। শরীর থেকে বাষ্পীভূত ঘামের ওজনের হিসাব না থাকা। ইত্যাদি। 

ডানকান সাহেবকে ব্যক্তিগত আক্রমণও করা হলাে। বলা হলাে, বাড়িতে তিনি স্ত্রী কর্তৃক নির্যাতিত পুরুষ। স্ত্রীর কাছে পাত্তা না পেয়ে তিনি বিজ্ঞানীদের কাছে পাত্তা পেতে চেয়েছেন বলেই অদ্ভুত গবেষণাপত্র কেঁদেছেন। 

Leave a comment

Your email address will not be published.