শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৫)-হুমায়ুন আহমেদ

‘না তাে। চল, আপার কাছে যাই। “না, ও থাকুক একা একা। আয়, এদিকে আয়।’ শঙ্খনীল কারাগাররুনু হাঁটতে হাঁটতে আমার একটা হাত ধরল। ছােটবেলায় যেমন করত, তেমনিভাবে হাতের আঙুল নিয়ে খেলা করতে করতে হাল্কা গলায় বলল, ‘দাদা, তােমরা কি আমার ওপর বিরক্ত হয়েছ? 

‘কেন? “চিঠি লিখেছি বলে ? ‘তাের কী মনে হয়? 

রুনু কথা বলল না। চুপচাপ হাঁটতে থাকল। আমি বললাম, রুনু, ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে? 

কোন কথা? ‘তুই যে এক দিন পালিয়েছিলি? 

‘ও মনে আছে। ঝুনু একটা কাপ ভেঙে ফেলেছে। ভেঙেই দৌড়ে পালাল, আর আম্মা এসে আমার গালে ঠাস করে এক চড়। 

রুনু বলতে বলতে হাসতে লাগল। আমি বললাম, তারপর কি ঝামেলায়। পড়লাম সবাই। তাের কোনাে খোঁজ নেই। সকাল গেল, দুপুর গেল, সন্ধ্যা গিয়ে রাত, তবু তাের খবর নেই। বাসায় খাওয়াদাওয়া বন্ধ। বাবা সারা দিন খুঁজেছেন এখানে ওখানে। আড়ালে আড়ালে চোখের পানি ফেলেছেন। আমি থানায় খবর দিতে গেছি। মা কিন্তু বেশ স্বাভাবিক, যেন কিছুই হয় নি। আর ঝুনুটা করল কি, সন্ধ্যাবেলায় রাবেয়াকে জড়িয়ে ধরে ভেউ ভেউ করে সে কী কান্না। কোনােমতে বলল, ‘আপা আমিই ভেঙেছি কাপটা, রুনু ভাঙে নি।’

শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৫)-হুমায়ুন আহমেদ

‘তাের সব মনে আছে রুনু? 

‘খুব মনে আছে। আমি চুপচাপ বসে আছি ছাদে। তােমরা তাে কেউ ছাদে খুঁজতে আস নি। সারা দিন একা একা বসেছিলাম। রাত হতেই ভূতের ভয়ে নেমে এসেছি।’ 

 ‘তারপর কী হল বল তাে রুনু? 

‘আরেকটা চড় খেলাম। ‘চড়টা কে দিয়েছিল মনে আছে? ‘হ্যাঁ, তুমি। সশব্দে দু’ জনে হেসে উঠলাম। 

‘কে? কে হাসছে ? তাকিয়ে দেখি রাবেয়া টলতে টলতে আসছে। ‘ও তােরা! বেশ ভয় পেয়েছি। হঠাৎ করে হাসলি। ধক করে উঠছে বুকটা।’ ‘বস রাবেয়া, গল্প করি।’ 

‘না, ভাের হয়ে আসছে দেখছিস না। সবাই চা-টা খাবে। এত মানুষের ব্যাপার, আমি রান্নাঘরে যাই। 

‘চল আপা, আমিও যাই। 

আমি একা একা বসে রইলাম। ভােরের কাকের কা-কা শােনা যাচ্ছে। আকাশ ফর্সা হয়ে উঠেছে ধীরে ধীরে। 

বুঝতে পারছি মনের ভেতর জমে থাকা অবসাদ কেটে যাচ্ছে। ঠিক ভাের হবার মুহূর্তে মনের গ্লানি কেটে যায়। সুন্দর সুখের স্মৃতিগুলি ফিরে আসে। কিটকি লিখেছে, গতকাল নৌকায় করে ৬ মাইল উত্তরের ‘ক্যানসি সিটিতে গিয়েছিলাম বেড়াতে। ও মা! আমাদের দেশের ময়লা ঘিঞ্জি চাঁদপুরের মতাে দেখতে। এটিকে আবার বাহার করে বলা হচ্ছে সিটি। শহরটা বাজে, বমি আসে। কিন্তু শহর থেকে বেরুলেই চোখ ভরে ওঠে। নীল সমুদ্র, নীল নীল পাহাড়, ঘন নীল আকাশ। উহ কী অদ্ভুত! আপনি যদি আসতেন, তাহলে খুব ভালাে লাগত আপনার। সত্যি বলছি। 

শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৫)-হুমায়ুন আহমেদ

আই. এ পরীক্ষায় রুনু ফেল করল। 

বেশ অবাক হলাম আমরা। পড়াশােনায় আমার সব ভাইবােনই ভালাে। রুনু নিজে সাত শ’র উপর নম্বর পেয়ে ম্যাট্রিক পাশ করেছিল। অঙ্কে আর ভূগােলে | লেটার মার্ক ছিল। পরীক্ষায় একেবারে ফেল করে বসবে, এটা কখনাে ভাবা যায় । কাগজে তার রােল নাম্বার যখন কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না এবং রােল নম্বরটি পাওয়া যাবে না এটিও ধারণা করতে পারছি না, তখন রুনু বলল, ‘খুঁজে লাভ হবে 

দাদা, আমি ফেল করেছি। ‘ফেল করবি কেন ? 

‘খাতায় যে কিছুই লিখি নি। ইতিহাসের খাতায় সম্রাট বাবরের ছবি এঁকে দিয়ে এসেছি।’ 

‘কার ছবি? ‘সম্রাট বাবরের। 

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। রুনু অবশ্যি বদলে যাচ্ছিল। কিন্তু পরিবর্তনটা এত ধীর গতিতে হচ্ছিল যে আমি ঠিক ধরতে পারি নি। হয়তাে বই নিয়ে পড়তে বসেছে, আমি যাচ্ছি পাশ দিয়ে–হঠাৎ ডাকল, ‘দাদা, শােন একটু। 

‘কি? ‘মানুষের গােস্ত যদি বাজারে বিক্রি হ’ত হলে তােমার গােস্ত হ’ত সবচে 

সস্তা, তুমি যা রােগা। 

এই জাতীয় কথাবার্তা রুনু আগে বলত না। কিংবা আরেকটি উদাহরণ সরা যাক। 

এক দিন রাবেয়াকে গিয়ে সে বলছে, ‘আপা, একটা কথা শুনবে? ‘বল। 

তােমার মাথাটা কামিয়ে ফেলবে? রাবেয়া বিস্মিত হয়ে বলল, কেন রে?’ ‘এমনি বলছি! ঠাট্টা করছি।’ 

শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৫)-হুমায়ুন আহমেদ

রুনুর এ জাতীয় কথাবার্তা কোনাে বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। রুনু বদলে যাচ্ছিল। কথাবার্তা কমিয়ে দিচ্ছিল। অথচ তার মতাে হৈচৈ করা মেয়ে আমি খুব কম দেখেছি। বাসায় যতক্ষণ আছে, গুনগুন করে গান গাইছে। রেডিও কানের কাছে নিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে বিছানায়। সিনেমার তাে কথাই নেই, প্রতি সপ্তায় দেখা চাই। তার হাতে টাকা পড়তে না পড়তে ধোঁয়ার মতাে উড়ে যাচ্ছে। যখনই দেখতাম রাতের খাওয়ার পর রুনু আমার ঘরে ঘুরঘুর করছে কিংবা আমার পরিষ্কার করে সাজান বিছানা আবার নতুন করে ঝাড়ছে, তখনি বুঝতাম তার কিছু টাকার প্রয়ােজন।। 

“কি রে রুনু, টাকা দরকার ? 

-না।’ ‘সেদিন যে দশ টাকা দিলাম, খরচ করে ফেলেছিস? 

‘আরাে চাই? 

‘আচ্ছা আচ্ছা, প্যান্টের পকেটে হাত দে, মানি ব্যাগ পেয়েছিস? খােল। নে একটা নােট, নিয়ে যা। আরে আরে, দশ টাকারটাই নিলি ? ডাকাত একেবারে।’ রুনু খিলখিল হেসে পালিয়ে যায় দ্রুত। 

সেই রুনু এমন বদলে গেল। আমরা কেউ বুঝতেই পারলাম না। পরীক্ষার রেজাল্ট শুনে তার কোনােই ভাবান্তর নেই। সেদিন শুনি জানালা দিয়ে মুখ বের করে ওভারশীয়ার চাচাকে বলছে, ‘ও চাচাজি, শুনছেন? 

কি মা? ‘আমার পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে। ‘কি রেজাল্ট? ‘আমি ফেল করেছি চাচাজি। 

শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৫)-হুমায়ুন আহমেদ

একমাত্র বাবাই রুনুকে ধরতে পেরেছিলেন। প্রায়ই বলতেন, ‘রুনুটার কি কোনাে অসুখ করেছে? এমন দেখায় কেন? এক দিন রুনকে আসমানী রঙের একটি চমৎকার শাড়ি এনে দিলেন। সিনেমা দেখাতে নিয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত মন ভালাে থাকবে বলে পাঠালেন ঝুনুর কাছে। 

ঝুনুর বাসা থেকে ফিরে এসেই রুনু অসুখে পড়ল। প্রথমে একটু জ্বর-জ্বর ভাব, সর্দি, গা ম্যাজম্যাজ। শেষটায় একেবারে শয্যাশায়ী। 

এক দিন দু’ দিন করে দিন পনের হয়ে গেল, অসুখ আর সারে না। ডাক্তার কখনাে বলে দুর্বলতা, কখনাে বলে রক্তহীনতা, কখনাে-বা লিভার ট্রাবল। সঠিক রােগটা আর ধরা পড়ে না। 

রাতে সে বড়াে ঝামেলা করে। নিজে একটুও ঘুমােয় না, কাউকে ঘুমুতেও দেয় না। রাবেয়া প্রায় সারা রাত জেগে থাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, গল্প পড়ে। শােনায়, পিঠ চুলকে দেয়। অনেক রাতে যখন রাবেয়া বলে, আমি একটু শুই, 

‘না-না, শুলেই তুমি ঘুমিয়ে পড়বে। ‘তাের বালিশে একটু মাথাটা রাখি, ভীষণ মাথা ধরেছে। 

Leave a comment

Your email address will not be published.