শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৬)-হুমায়ুন আহমেদ

উঁহু, তুমি বরং এক কাপ চা খেয়ে আস। ঘুমুতে পারবে না।’ খােকাকে ডাকি, ও বসবে তাের পাশে। ‘না, তুমি বসে থাকবেশঙ্খনীল কারাগার কলেজ থেকে ফিরে আমি এসে বসি রুনুর পাশে। “কি রে, জ্বর কমেছে। ‘হ্যাঁ, কমেছে? 

কপালে হাত দিয়েই প্রবল জ্বরের অচি পাই। রুনু ঘােলাটে চোখে তাকায়। আমি বলি, বেশ জ্বর তাে। কি রে, খারাপ লাগে ? 

‘না, লাগে না। ‘মাথায় হাত বুলিয়ে দেব? ‘দাও।’ ‘চিটাগাং ভালাে লেগেছিল রুনু? 

‘সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলি? 

‘আচ্ছা, এক বার তােদের সবাইকে নিয়ে সমুদ্র দেখতে যাব। কক্সবাজারে হােটেল ভাড়া করে থাকব। খুব ফুর্তি করব, কি বলিস? 

‘হু করব।’ 

জ্বরের ঘােরে রুনু ছটফট করতে লাগল। হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিক ভাবে বলে উঠল, ‘দাদা, ঝুনু এখন আর আমাকে একুটুও দেখতে পারে না।’ 

‘কেন দেখতে পারে না? 

কী জানি কেন। আমার সঙ্গে কথা বলে নি। কিন্তু আমার কী দোষ? 

রুনুর জ্বর বাড়তেই থাকে। মন্টু চলে যায় ডাক্তার আনতে। রুনু আচ্ছ; ? পড়ে থাকে। ভাত খেতে খেতে রাবেয়া বলে, ‘খােকা শশান, তােকে একটা কথা বলি।’ 

‘কী কথা? রুটা বাঁচবে না রে। “কী বলছিস আবােল-তাবােল! 

‘আমার কেন জানি শুধু মনে হচ্ছে। কাল রাতে রুনুর জন্যে গরম পানি করে নিয়ে গেছি, দেখি ওর মাথার পাশে কে এক জন মেয়ে বসে আছে। 

কী বলছিস এ সব! 

‘হ্যা সত্যি। কে যে বসে ছিল, ঠিক বলতে পারব না। তবে আমার মনে হয়, তিনি মা। অল্প কিছুক্ষণের জন্যে দেখেছি।’ 

শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৬)-হুমায়ুন আহমেদ

‘যত সব রাবিশ।’ ‘না রে, ঠিকই। আমি ভয় পেয়ে বাবাকে ডেকে আনি। ‘বাবাকে বলেছিস কিছু? ‘না, বলি নি। 

দেখতে দেখতে রুনুর জ্বর খুব বাড়ল। ছটফট করতে লাগল সে। ডাক্তার এসে দু’টি ইনজেকশন করলেন। মাথায় পানি ঢালতে বললেন। জ্বরের ঘােরে রুনু ভুল বকতে লাগল, ‘বেশ করেছেন আপনি! হ্যাঁ, বেশ তাে। ঠিক আছে ঠিক আছে। 

‘কী বলছিস রুনু? 

রুনু স্বাভাবিক মানুষের মতাে বলল, কই দাদা, কিছু বলছি না তাে।’ রাবেয়াকে বলল, ‘আপা এক গ্লাস পানি আন। কানায় কানায় ভরা থাকে যেন। আমি সবটা চুমুক দিয়ে খাব।’ 

রুনু এক চুমুক পানি খেল। খুব স্বাভাবিক গলায় ডাকল, ‘বাবা।’ 

এই তাে আমি। কী মা? একটু কোলে নেন না। 

বাবা রুনুকে কোলে নিলেন। বাবার পা কাঁপছিল। আমি বাবার একটা হাত ধরলাম। রুনুটা এই ক’দিনে ভীষণ রােগা হয়েছে। বাবার পিঠের ওপর তার দু’টি শীর্ণ হাত আড়াআড়ি ঝুলছে। রুনু বলল, ‘বাবা বাইরে চলেন। বাইরে যাব।’ 

সবাই বাইরে এসে দাঁড়ালাম। সে রাতে-খুব জোছনা হয়েছিল। জামগাছের পাতা চিকচিক করছিল জোছনায়। উঠোনে চমৎকার সব নকশা হয়েছিল গাছের পাতার ছায়ায়। রুনু ফিসফিস করে বলল, ‘বাবা, কাল রাতে আমি মাকে দেখেছি। মা আমার মাথার পাশে এসে বসেছিলেন। আমি কি মারা যাচ্ছি বাবা? 

‘না মা, ছিঃ ! মারা যাবে কেন? 

শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৬)-হুমায়ুন আহমেদ

তােমরা কি রাগ করেছ আমার ওপর? ‘রাগ করব কেন? মিষ্টি মা আমার। 

বাবা চুমু খেলেন রুনুর পিঠে। রুনু বলল, আমি যে আরেকটি ছেলেকে চিঠি লিখেছিলাম। 

| রাবেয়া রুনুকে কোলে নিয়ে বসে আছে। বাবা আর মন্টু গেছে ডাক্তার ডেকে আনতে। রুনু চোখ বড়াে বড়াে করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। তার ফর্সা সরু আঙুল থরথর করে কাঁপছে। সবাই বুঝতে পারছি, রুনু মারা যাচ্ছে…..। 

রুনু মারা যাবার পর আমার মনে হল মায়ের মৃত্যু আমি ঠিক অনুভব করতে পারি নি। মা যখন মারা যান তখন অনেক রকম দুশ্চিন্তা ছিল, নিনুকে কে মানুষ করবে, ঘর-সংসার কী করে চলবে। কিন্তু এখন কোনাে দুশ্চিন্তা নেই। রুনুর জন্যে কোনাে কিছু আটকে থাকার কথা ওঠে না, কিন্তু সমস্তই যেন আটকে গেল।

রুনুর কথা মুহুর্তের জন্যেও ভুলতে পারি না। মনে হয় গভীর শূন্যতায় ক্রমাগত তলিয়ে যাচ্ছি। অসহ্য বােধ হওয়ায় লম্বা ছুটি নিয়েছি। দীর্ঘ অবসর সময়ও কাটে না কিছুতেই। একবার ভাবলাম বাইরে কোথাও যাই। কত দিন রুনুকে নিয়ে বাইরে যেতে চেয়েছি, সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়, কক্সবাজার, দিনাজপুরের পঞ্চগড়–কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠে নি। আজ একা একা কি করে যাব। 

শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৬)-হুমায়ুন আহমেদ

কিছুই ভালো লাগে না। শুয়ে শুয়ে দীর্ঘ সময় কাটে। বাবা তার ছােট ঘর থেকে কখনই বের হন না। তাঁর হাঁপানি বডড বেড়েছে। মন্টু যে কখন আসে কখন যায়, বুঝতে পারি না। শুধু নিনুর দাপাদাপি শােনা যায়। সে খেলে আপন মনে। পাগলের মতাে কথা বলে একা একা। 

এক দিন রুনুর ছােট ট্রাঙ্কটা খুলে ফেললাম। কত কি সাজিয়ে রেখেছে। সেখানে। প্রথম বেতন পেয়ে তাকে দশ টাকার নােট দিয়েছিলাম একটা নােটের উপর লিখে দিয়েছিলাম, প্রিয় রুনুকে ইচ্ছে মতাে খরচ করতে।’ রুনু সেটি খরচ করে নি। যত্ন করে রেখে দিয়েছে। একটি অতি চমৎকার মােমের পুতুল। আগে কখনাে দেখি নি। কোথেকে এনেছিল কে জানে! তার নিজের ফটো কয়েকটি , কিটকির ক্যামেরায় তােলা।

স্কুলের ক্রীড়া-প্রতিযােগিতায় পাওয়া দুটি ছােট কাপ। একটি কবিতার বই, তাতে লেখা “রাবেয়া আপাকে–রুনু। পাঁচ-ছ’টি সাদা রুমাল। প্রতিটির কোণায় ইংরেজি লেখা–তার নিজের নামের আদ্যক্ষর! পুরানাে ডায়রি পেলাম একটা, পড়তে পড়তে চোখ ভিজে ওঠে। 

আজ রাবেয়া আপা আমাকে বকেছে। মিটসেফ খােলা রেখেছিলাম, আর বিড়ালে দুধ খেয়ে গেছে। প্রথম খুব খারাপ লাগছিল। আপা সেটি বুঝতে পারল। বিকেলে আমাকে ডেকে এমন সব গল্প বলতে লাগল যে হেসে বাঁচি না। একটি গল্প এই রকম–এক মাতাল রাতের বেলা মদ খেয়ে উল্টে পড়েছে নর্দমায়। বিরক্ত হয়ে বলছে- ওরে ব্যাটা নর্দমা, তুই দিনের বেলা থাকিস রাস্তার পাশে আর রাত হলেই এসে যাস রাস্তার মাঝখানে?’ আপাটা কি হাসাতেই না পারে। 

শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৬)-হুমায়ুন আহমেদ

কিটকি আপা আমাকে এমন একটি কথা বলেছেন যে আমি অবাক। সবাইকে সে-কথাটি বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু বলা যাবে না। আপা আল্লার কসম দিয়ে দিয়েছেন। 

আজ একটা মজার ব্যাপার হয়েছে। দুপুরে আমি শুয়ে আছি, বাবা চুপি চুপি এসে ঘরে ঢুকে বলতে লাগলেন–রাবেয়া, রুনুটার কি হয়েছে? ও এমন মন-মরা থাকে কেন? আমি উঠে বললাম, আপা তাে এখানে নেই বাবা। আর কই, আমার তাে কিছুই হয় নি। বাবার মুখের অবস্থা যা হয়েছিল না। 

আজ দুপুরে লুকিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। ও আল্লা, গিয়ে দেখি সিনেমা হলের লবিতে দাদা ঘুরছে। আমাকে দেখে বলল, কি রুনু মিয়া, সিনেমা দেখবে। নাকি? তারপর নিজেই টিকেট কাটল। ছবিটা বড় ভালাে।  

 মন্টুটা তলে তলে এত! আমাকে বলছে, তিন তিনটা ডি. সি-তে সিনেমা দেখাবে। যদি না দেখায় তাহলে সব ফাঁস করে দেব। তখন বুঝবে। মন্টুর একটি কবিতা ছাপা হয়েছে। কবিতাটি সে শুধু আমাকেই দেখিয়েছে। খুব অশ্লীল কিনা, তাই কাউকে দেখাতে সাহস হয় নি। 

আজ সন্ধ্যাবেলা দেখি রাবেয়া আপা শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। খুব চাপা মেয়ে। কাউকে বলবে না তার কী হয়েছে। আমার যা খারাপ লাগছে। কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে।

Leave a comment

Your email address will not be published.