শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৯)-হুমায়ুন আহমেদ

বাবার হঠাৎ কেন জানি শখ হয়েছে, রান্নার বই লিখবেন একটি। রকমারি রান্নার কায়দা-কানুন নােট বইয়ে লিখে রাখছেন। বাজার থেকে অনেক বইপত্রও কিনে এনেছেন।শঙ্খনীল কারাগারপুরানাে‘বেগম’ থেকে ঘেটে ঘেটে নারকেল-ইলিশ বা ছানার ডালনার রন্ধনপ্রণালী অসীম আগ্রহে খাতায় তুলে ফেলেছেন। এ ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করছে নিলু আর ওভারশীয়ার কাকুর ছেলের বউ। মাঝে মাঝে দু’-একটি রানা বাসায়ও রাধা হয়। সেদিন যেমন ‘নােয়াপতি মিষ্টি বলে একটা মিষ্টি তৈরি হল। খেতে ভালাে হয়েছে বলায়, সে কী ছেলেমানুষি খুশি।। 

ভালােই হয়েছে, কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকছেন। রাবেয়াও তার পড়াশােনা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। তার দেখা পাওয়াই মুশকিল। যদি বলি ‘ আয় রাবেয়া একটু গল্প করি’, রাবেয়া আৎকে ওঠে, দু দিন পরেই আমার পরীক্ষা–এখন তাের সাথে আড্ডা দিই! পাগল আর কাকে বলে! 

মন্টু রাতে বাসায় ফেরাই বন্ধ করে দিয়েছে। কয়েক জন বন্ধু মিলে নাকি এক ঘর ভাড়া করেছে। সেখানে গল্পগুজব হয়। কাজেই বাসায় তার বড়াে একটা আসা হয় না, হঠাৎ এক-আধ দিন আসে। মেহমানের মতাে ঘুরে বেড়ায়, বাবাকে গিয়ে বলে, ‘মােট ক’রকম রান্নার যােগাড় হল বাবা? 

শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৯)-হুমায়ুন আহমেদ

এক শ’ বারাে।’ ‘ও বাবা, এত! একটা রান্না কর না আজ, খাই। কী-কী লাগবে বল, আমি বাজার থেকে নিয়ে আসি।’বাবা মন্টুকে নিয়ে মহা উৎসাহে রান্না শুরু করেন। 

ঝুনু চলে যাবার পরপরই আমি একলা পড়ে গেছি। 

সবাই সবার কাজ নিয়ে আছে। বাসায় আমার তেমন কোনাে কাজ নেই। শুয়ে বসে সময় কাটাতে হয়। কাজেই আমি দেরি করে বাসায় ফিরি। সেদিন রাত এগারটার দিকে ফিরেছি, দেখি রাবেয়া মুখ কালাে করে বসে আছে আমার ঘরে। 

কী হয়েছে রাবেয়া ? ‘কিছু হয় নি। তুই হাত-মুখ ধুয়ে আয়, বলছি। ‘বল শুনি কী ব্যাপার। ‘তুই কলেজে যাবার পরপরই খালা এসেছিলেন। 

কী জন্যে ? ‘তুই জানিস না কিছু? না তাে।’ 

‘কিটকির বিয়ে। আগামী কাল রাতেই সব সেটেল হবে। খালা সবাইকে যেতে বলেছেন। গাড়ি পাঠাবেন। 

‘এক রিটায়ার্ড ডিস্ট্রিক্ট জজের ছেলে। ফরেন সার্ভিসে আছে। ফ্রান্সে পােস্টেড। ছুটিতে এসেছে, বিয়ে করে ফিরবে। ম্যানিলাতেই নাকি কিটকির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। ছেলে গিয়েছিল সেখানে কী কারণে যেন। কিটকির সঙ্গে জানাজানি হয়। কিটকিরও ছেলে খুব পছন্দ। 

শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৯)-হুমায়ুন আহমেদ

‘এসব আমাকে শুনিয়ে কী লাভ রাবেয়া ? ‘কোনাে লাভ নেই? 

এ রকম হল কেন? চুপ করে আছিস যে? 

আমি চুপ করেই রইলাম। আমার কী করার আছে? আমি কী করতে পারতাম? রাবেয়া একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কেঁদে ফেলবে কিনা কে জানে। রাবেয়া ফিসফিস করে বলল, ‘আমার আর এখানে থাকতে ভালাে লাগছে। 

আমি পাশ করলেই বাইরে কোথাও চলে যাব। থাকব একা একা। আর খােকা, শােন। ‘বল।’ ‘তুই একটা গাধা, ইডিয়েট। আমি তাের মুখে থুথু দিই।’ 

আমি গায়ের শার্ট খুলে কলঘরের দিকে যাই। রাবেয়া আসে আমার পিছনে পিছনে। এক সময় ধরা গলায় বলে, ‘খােকা, তুই রাগ করলি? ছিঃ, রাগ করবি না। আমার কথায় রাগ করতে আছে বােকা? খােকা,  গত পরশু সন্ধ্যাবেলা পৌছেছি এখানে। স্টেশনে স্কুলের সুপারিনটেনডেট এসেছিলেন নিজেই। ভারি ভালােমানুষ।

সারাক্ষণই মা মা বলে ডাকছেন। তার নিজের টাকায় স্কুল, নিজের জমির উপর দোতলা স্কুলঘর। নিজের সমস্ত সঞ্চয় ঢেলে দিয়েছেন বলেই প্রতিটি জিনিসের ওপর অসাধারণ মমতা। আর যেহেতু আমি স্কুলের এক জন, কাজেই তার ভালােবাসার পাত্রী। 

শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৯)-হুমায়ুন আহমেদ

ট্রেন থেকে খুব ভয়ে ভয়ে নেমেছিলাম। নতুন জায়গা–কাউকে চিনি না, জানি না। কিন্তু তাঁকে দেখে সব ভয় কেটে গেল। কাউকে কাউকে দেখলে মনে হয় যেন অনেক দিন আগে তার সঙ্গে গাঢ় পরিচয় ছিল, ঠিক সে-রকম। তিনি প্রথমে তাঁর বাসায় নিয়ে গেলেন। বাসায় তিনি আর সুরমা–এই দু’টিমাত্র প্রাণী। সুরমা তাঁর মেয়ে। রাতের খাওয়া সেরে তিনি আমাকে হােস্টেলে পৌছে দিলেন। সতের জন ছাত্রী থাকে সেখানে। আমি হয়েছি তাদের হােস্টেল সুপারিনটেনডেন্ট। ছােট্ট একটা লাল ইটের দালান। সামনে গাঁদা ফুলের এক টুকরাে বাগান। পেছনেই পুকুর। সমস্ত মন জুড়িয়ে গেছে আমার।

 খােকা, তােদের সঙ্গে যখন থাকতাম তখন এক ধরনের শান্তি পেয়েছি, এ অন্য ধরনের। এখানে মনে হচ্ছে জীবনের সমস্ত বাসনা কামনা কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে। আর বেশি কিছু চাইবার নেই। কাল রাতে ছাদে বসে ছিলাম একা একা। কেন যেন মনে হল, একটু কাঁদি নির্জনে। মার কথা ভেবে, রুনুর কথা ভেবে দু এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলি। কিন্তু একটুও কান্না আসল না! কেন কাঁদব, বল ? প্রচুর দুঃখ আছে আমার। এত প্রচুর যে কোনাে দিন কেউ জানতেও পারবে না।

কিন্তু তবুও আমি খােকার মতাে ভাই পেয়েছি, কিটকির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে শুনে যে-ভাই আমাকেই সান্ত্বনা দিতে আসে। রুনু, ঝুনু, মন্টু, নি–এরা আমার পারুল বােন, চম্পা ভাই। চারদিকে এমন চাঁদের হাটে কি কোনাে দুঃখ থাকে? মন্টু একটি কবিতার বই উৎসর্গ করেছে আমাকে। সবগুলি কবিতা হতাশা আর বেদনা নিয়ে লেখা। আমার ভেতরের সবটুকু সে কী করে দেখে নিল ভেবে অবাক আমি। সেই যে দু’টি লাইন । ‘দিতে পারাে একশাে ফানুস এনে? 

শঙ্খনীল কারাগার-পর্ব-(১৯)-হুমায়ুন আহমেদ

আজ সলজ্জ সাধ-এক দিন আকাশে কিছু ফানুস ওড়াই।’ যেন আমার বুকের ভেতরের সুপ্ত কথাটিই সে বলে গেছে। দোওয়া করি, মস্ত বড়াে হােক সে। 

এমন কেন হল খােকা? সব এমন উল্টেপাল্টে গেল কেন? রুনুটার স্মৃতি কাঁটার মতাে বিধে আছে। আমার হােস্টেলের একটি মেয়ে সুশীলা পুরকায়স্থ, অবিকল রুনুর মতাে দেখতে। তাকে কাল ডেকে অনেকক্ষণ আদর করেছি, মন্টুর কবিতার বই পড়তে দিয়েছি। সে বেচারি ভারি অবাক হয়েছে, সে তাে জানে না– তাকে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে সারা রাত দিবার কি প্রচন্ড ইচ্ছাই না হচ্ছে! 

নিনুটার কথাও মনে হয়। এত অল্প বয়সে কী ভারিক্কি হয়েছে দেখেছিস? আমি যেদিন চলে আসব, সেদিন দুপুরে সে গম্ভীর হয়ে একটা সুটকেস আমার বিছানায় রাখল। আমি বললাম, ‘কি রে নিন, সুটকেসে কী? 

‘কিছু নয়। আমার কাপড়চোপড় আর বই। এটিও ভুমি সঙ্গে নেবে। সে কি! এটা নিয়ে কী করব? ‘বাহ, আমিও তাে থাকব তােমার সঙ্গে। 

কাণ্ড দেখলি মেয়ের? কাউকে কিছু বলে নি। নিজে নিজে সমস্ত গুছিয়ে তৈরি হয়ে রয়েছে। আমার সঙ্গে যাবে। এ সমস্ত দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। মনে হয় কিসের দুঃখ কিসের কি? মমতার এমন গভীর সমুদ্রে দুঃখ তাে টুপ করে ডুবে যাবে। হাসছিস মনে মনে, না? আমিও কবি হয়ে গেলাম কিনা ভেবে। সব মানুষই 

তা করি রে বােকা। বাবার কথাই মনে কর না কেন। রাতের বেলা একা একা কলতলায় বসে গান গাইতেন ‘ও মন মন রে– আমি ঠাট্টা করে বলতাম ‘নৈশ সঙ্গীত। 

Leave a comment

Your email address will not be published.