সাজঘর (পর্ব-৯): হুমায়ূন আহমেদ

দুপুরে দরজা জানালা বন্ধ করে খানিকক্ষণ ঘুমুলঘুম ভাঙার পর মনে হল আসিফ থাকলে বেশ হত। দুজন মিলে বিকেলে কোথাও বেড়াতে যাওয়া যেতমিরপুর বােটানিক্যাল গার্ডেন কিংবা বলধা গার্ডেন। 

সাজঘরআসিফকে আজকাল কাছেই পাওয়া যায় নাবেচারা চাকরির জন্যে ব্যস্ত হয়ে সারাদিন ঘােরেকোথায় কোথায় ঘােরে, কার কাছে যায় কে জানে। 

আজ অবশ্যি আসিফ চাকরির সন্ধানে ঘুরছিল নাসে চুপচাপ টেলিভিশন রিহার্সেল রুমে বসেছিলশেষ পর্যন্ত ঋণপ্রার্থী লােকটির ক্ষুদ্র ভূমিকা নিতে সে রাজি হয়েছেকৌতূহল থেকেই রাজি হয়েছেদেখাই যাক না টিভি অভিনয় ব্যাপারটা কি? টেলিভিশন এখন অতি শক্তিশালী একটি মাধ্যমএকে উপেক্ষা করার প্রশ্নই ওঠে না। 

অভিনেতাঅভিনেত্রীরা সবাই এসে গেছেনআসিফ এদের কাউকে চিনতে পারছে নাতার ঘরে টিভি নেইটিভি তারকারা তার কাছে অপরিচিত

প্রযােজক এলেন পাঁচটার দিকেমধ্যবয়স্ক এক জন ভদ্রলােক। হাসিখুশি ধরনের মানুষঘরে ঢুকেই কি একটা রসিকতা করলেনকেউ হাসল নাআসিফ কী করবেবুঝতে পারল নাএই ভদ্রলােক এখন মনে হচ্ছে তাকে চিনতে পারছেন নাএকবার চোখে চোখ পড়ল, তিনি চোখ সরিয়ে নিলেন

সাজঘর হুমায়ূন আহমেদ 

সবাইকে স্ক্রিপ্ট দিয়ে দেয়া হয়েছেআসিফ কোনাে স্ক্রিপ্ট পেল নাছােট রােলের আর্টিস্টদের হয়ত স্ক্রিপ্ট দেয়া হয় নাকিন্তু সংলাপগুলােতাে জানতে হবে। আসিফ উঠে দাঁড়াল; বেশ খানিকটা দ্বিধা নিয়ে এগিয়ে গেল প্রযােজকের দিকেপ্রযােজক তাকে এইবার মনে হল চিনতে পারলেনহাসিমুখে বললেন, ভেরি সরিভাই, একটা সমস্যা হয়েছে‘ 

আসিফ বলল, কি সমস্যা

লাস্ট মােমেন্টে নাটকে কিছু কাটছাঁট করা হয়েছেষাট মিনিটের বেশি হয়ে যাচ্ছিল, কাজেই বাধ্য হয়েআপনি ভাই কিছু মনে করবেন নানেক্সট নাটকে দেখব আপনাকে একটা রােল দেয়া যায় কি না| আসিফের কান ঝাঝাঁ করছেসবাই তাকিয়ে আছে তার দিকেসবার চোখে মুখে সহানুভূতির ছায়াআসিফ বলল, আমি তাহলে যাই

প্রযােজক বললেন, বসুন না, চা খেয়ে যানএকটা রিডিং হবার পরই চাআসবে‘ আসিফ নিজের জায়গায় এসে বসলএরকম একটা পরিস্থিতিতে চট করে চলে যাওয়া যেমন মুশকিল, আবার বসে থাকাও মুশকিল। 

সাজঘর হুমায়ূন আহমেদ

রিহার্সেল শুরু হয়েছেরিহার্সেলের ধরনটা অদ্ভুতসবাই নিজের নিজের জায়গায় বসে রিডিং পড়ে যাচ্ছেএকেক জনের পড়া হয়ে যাওয়া মাত্র সে পাশের জনের সঙ্গে গল্প করছেমনে হচ্ছে পুরাে নাটকটার ব্যাপারে কারাে কোনাে আগ্রহ নেইনিজের অংশটা হয়ে গেলেই যেন দায়িত্ব শেষ। 

একজন অভিনেতা পড়ার মাঝখানেই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমিতাে ভাই আর থাকতে পারছি নাজরুরি এ্যাপয়েন্টমেন্টপ্রযােজক তাঁকে রাখতে চেষ্টা করছেনতিনি রাজি হচ্ছেন না। 

আসিফ মনে মনে ভাবলঅতটা অনাগ্রহ নিয়ে এরা নাটক কেন করে? তারমনটাই খারাপ হয়ে গেল। 

বজলু ভাই রাগী গলায় বললেন, এসব তুমি কী বলছ লীনা আসবে না মানে? এর মানেটা কিআসিফ বলল, লীনার শরীরটা ভালাে নাদিন ধরেই শরীর খারাপ যাচ্ছে। 

কালই তাে দেখলাম ভালােবাইরে থেকে ভালাে মনে হয়েছেআসলে ভালাে নাসবাই যদি রকম অসুখবিসুখ বাঁধিয়ে বসে থাকে তাহলে নাটক চলবে কী ভাবে ? নাটকফাটক বন্ধ করে চল বাসায় চলে যাই‘ 

সাজঘর হুমায়ূন আহমেদ

প্রক্সি দিয়ে কোনাে মতে চালিয়ে নিন। 

প্রক্সি দিয়ে এইসব হয়? প্রত্যেকের তার নিজের রােল আছে, প্রক্সিটা দেবে কে? মুভমেন্ট সিনক্রোনাইজ করতে হবে না

বজলু ভাই, আপনার সঙ্গে একটু আড়ালে কথা বলা দরকারআসুন বাইরে যাই‘ 

আমার সঙ্গে আবার আড়ালে কথা কি? ফিসফিসানি, গুজগুজানি এর মধ্যে আমি নেই। চল কোথায় যাবে‘ 

দুজন রাস্তায় চলে এলবজলু সিগারেট ধরালেনতাঁর প্রেসার আছে। অল্পতেই প্রেসার বেড়ে যায়সামান্যতম টেনশান সহ্য করতে পারেন না। এখন তাঁর টেনশান খুব বেড়েছেআসিফ কী বলবে কে জানে। 

একটা সমস্যা হয়েছে বজলু ভাইকী সমস্যা

লীনা অভিনয় করতে পারবে বলে মনে হয় নাকী বলছ তুমি এসবওর শরীরটা খারাপ। 

শরীর খারাপ, শরীর ঠিক হবেচিরজীবন কারাের শরীর খারাপ থাকে? আজ রাতটা রেস্ট নিকদরকার হলে আগামীকালও রেস্ট নেবেআজ রিহার্সেলের পর আমি তােমার সঙ্গে গিয়ে দেখে আসব‘ 

সাজঘর হুমায়ূন আহমেদ

ওর বাচ্চা হবে বজলু ভাইআপনি তাে ওর অবস্থাটা জানেনএর আগে দুটো বাচ্চা মারা গেছেজন্মের কিছুদিনের মধ্যেই বাচ্চাগুলাে মরে যায়ডাক্তাররা বলছে পুরাে রেস্টে থাকতে। 

তুমি তাে ভয়াবহ খবর দিলে আসিফআমার তাে মনে হচ্ছে হার্ট এ্যাটাক হয়ে যাচ্ছেশশা পিছিয়ে দিতে হবেতাে মাথায় বাড়ি। 

‘শাে পেছানাের দরকার নেইঅন্য কাউকে এই রােলটা দিনএটা তাে খুব কমপ্লিকেটেড রােল নয়যে কেউ পারবে। 

এটা কি সাপ লুডু খেলা যে, যে কেউ পারবেফালতু কথা আমার সঙ্গে বলবে না তো। যে কেউ পারবেযে কেউ পারলে তাে কাজই হত। 

দিন যে মেয়েটি এসেছিলপুষ্প, ও পারবে, ওকে...

মাথাটা তােমার কি খারাপ হয়ে গেল নাকি? অভিনয়ের জানে না যে মেয়ে, গলা দিয়ে স্বর বের হয় না...‘ 

আমি ওকে শিখিয়েপড়িয়ে ঠিক ঠাক করে দিতে পারব‘ 

আমার কাছ থেকে একটা জিনিস শিখে রাখছবি আঁকা, গান গাওয়া আর অভিনয়, এই তিন জিনিস শেখান যায় নাভেতরে থাকতে হয়‘ 

‘ঐ মেয়ের মধ্যে অভিনয় আছেখুব সহজে মেয়েটা ইনভলভড় হতে পারেঅভিনয় দেখতে দেখতে মেয়েটা কাঁদছিল। 

সাজঘর হুমায়ূন আহমেদ

অভিনয় দেখেই যে কেঁদে ফেলে, সে আবার অভিনয় করবে কি

কে অভিনয় পারবে, কে পারবে না, এটা আমি বুঝি বজলু ভাইলীনাকে আমি অভিনয়ে নিয়ে এসেছিলামলীনা কিন্তু আগে কোনােদিন করে নি। 

মেয়েটা রাজি হবে কি না কে জানেযেতে বলছ? ‘া বলছি। 

এখনই চলে যাই মীনাকে সাথে নিয়ে যাইওই প্রথম দিন মেয়েটিকে এনেছিলতুমি বরং থার্ড সিন শুরু করে দাও‘ 

বজলু আরেকটা সিগারেট ধরালেন

 তাঁর টেনশান যেমন দ্রুত আসে তেমনি দ্রুতই চলে যায়এখন টেনশান একেবারেই নেই। 

আসিফ, শাে কি সময় মতাে যাবে? অবশ্যই যাবেটেনশান ফিল করছিটেনশানের কিছু নেই। 

জাতীয় উৎসব, বড় বড় দল আসবেকোলকাতা থেকেও নাকি দুটো টিম আসছে‘ 

‘আসুক না‘ 

তােমাকে সত্যি কথা বলি আসিফ, নাটকটা আমার কাছে বেশি সুবিধার মনে হচ্ছে নাকোনাে কনফ্লিকট নেইরিলিফ নেইক্লাইমেক্স নেই। 

জিনিস কিন্তু ভালােভালাের তুমি কী দেখলে

সাজঘর হুমায়ূন আহমেদ

প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন স্বপ্ন ব্যাপার আছেকঠিন কিছু কথা খুব নরম করে বলা। 

নরম করে বললে এই দেশে কিছু হয় নাশক্ত করে বলতে হয়। পাছায় লাথি দিতে হয়। 

সবাই তাে পাছায় লাথি দেয়া নাটক নিয়ে যাবেআমরা না হয় একটা নরম নাটক নিয়ে যাইনরম হলেও এটা খুব নামকরা নাটক বজলু ভাইকবি এমিলিজোহানের কাব্যনাটকবাংলায় ভাবানুবাদ করাসত্যি করে বলুন তাে আপনার ভালাে লাগে না

আর আমার ভালাে লাগাতােমাকে আরেকটা সত্যি কথা বলি আসিফ, আজ পর্যন্ত কাউকে বলি নিতােমাকে বলছি নাটক ভাললা না মন্দ এটা আমি বুঝি নাআমি শুধু বুঝি অভিনয় ঠিকমতাে হচ্ছে কি না। 

আপনি সবই বােঝেনশুধু বােঝেন বললে কম বলা হবে, খুব ভালােই বােঝেনদেখুন বজলু ভাই, আমি মানুষটা খুব অহংকারী, আমি অভিনয় ভালাে করিনিজে সেটা জানি অভিনয়ের ব্যাপারে আমি কারাের কোনাে উপদেশ শুনি না, কিন্তু আপনার কথা আমি শুনিবজলু ভাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে, আপনি চলে যান। 

সাজঘর হুমায়ূন আহমেদ

রিহার্সেল শুরু হতে খানিকটা দেরি হলপ্রণব বাবুর বড় মেয়ে বৃত্তি পেয়েছে, সেই উপলক্ষে তিনি প্রচুর খাবারদাবার এনেছেনহৈহৈ করে খাওয়াদাওয়া হচ্ছেগ্রুপের মেয়েরা কেউ নেইসবাই বজলু সাহেবের সঙ্গে পুষ্প মেয়েটির কাছে গেছে। 

এই সুযােগে জলিল সাহেব আদিরসের দুটো গল্প বলে ফেললেন

(চলবে)

সাজঘর (পর্ব-৮): হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.