• Wednesday , 3 March 2021

সৌরভ-পর্ব-০৫-হুমায়ূন আহমেদ

গত চার দিন ধরে মতিন সাহেব দোতলায় আমার সঙ্গে আছেন। এই চার দিন সারাক্ষণই তিনি আমার সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে আছেন। আমি বাজারে যাচ্ছি।–তিনি সঙ্গে যাচ্ছেন। আমি ইজাবুদ্দিন সাহেবের কাছে কাঁদেরের খোঁজে যাচ্ছি, তিনি আছেন। আজকেও বেরুবার জন্যে কাপড় পরছি, দেখি তিনিও কাপড় পারছেন।

আমি থমথমে স্বরে বললাম, কোথায় যাচ্ছেন আপনি?আপনার সঙ্গে যাচ্ছি।আজ আমি একটা বিশেষ কাজে যাচ্ছি। আপনি আমার সঙ্গে যাচ্ছেন না।মতিনউদ্দিন সাহেব অত্যন্ত অবাক হলেন, সে কি, আমি এক-একা থাকব কীভাবে!যে-ভাবেই থাকেন থাকবেন।

তাঁকে রেখেই আমি বের হয়ে এলাম। এই লোকটি দিনে দিনে অসহ্য হয়ে উঠছে। এখন মনে হচ্ছে, সঙ্গে টাকা পয়সা নেই। আমার কাছে সেদিন একটি মিনোন্টা এস এল আর ক্যামেরা বিক্রি করতে চাইলেন। আমি বললাম, আপনার টাকা পয়সা নেই নাকি?

কিছু আছে। যা নিয়ে এসেছিলাম, খরচ হয়ে যাচ্ছে।কাজটাজ কিছু দেখেন।কী দেখিব বলেন? ইউনিভার্সিটিতে কোনো পোস্ট এডভ্যাটাইজ করছে না। মাস্টারী ছাড়া আর কিছু তো করতেও পারব না আমি।আত্মীয়স্বজন কে কে আছে আপনার?আত্মীয়স্বজন কেউ নেই।

কেউ নেই মানে! এক জন বড়ো ভাই তো আছেন জানি। গাড়ি করে আপনাকে নিয়ে যাওয়ার যার কথা ছিল।ও রকিব ভাই, সে অনেক দূরসম্পর্কের আত্মীয়। তাছাড়া আমাকে সে পছন্দও করে না।নীলুরাও তো শুনেছি আপনার আত্মীয়া, ওদের সঙ্গে চলে গেলেন না কেন?

মতিনউদ্দিন সাহেব ইতস্তত করে বললেন, ওরা আমাকে এখন আর পছন্দ করে না। বিলুর ধারণা আমার মাথা খারাপ। দেখেন তো অবস্থা! তবু আমি যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু নীলু। খুব রাগ করল।

মতিনউদ্দিন সাহেবকে এক ঘরে রেখেই আমি চলে এলাম। সারাক্ষণ কাউকে গাদাবোটের মতো টেনে বেড়ানর কোনো অর্থ হয় না। বাইরে বেরিয়ে আবার আমার খারাপ লাগতে লাগল। সঙ্গে নিয়ে এলেই হত। রাস্তার মোড় পর্যন্ত এসে থমকে দাঁড়ালাম, ফিরে গিয়ে ডেকে নিয়ে আসব? ঠিক তখনি কে যেন ডাকল, ও ছোড उठाई, e cহাष्ट उठाহুঁ।চমকে তাকিয়ে দেখি, কাদের মিয়া। রিকশা করে আসছে। চোখ কোটরাগত, কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে আছে।

এই কাদের, এই।রিকশা ভাড়াডা দেন ছোড ভাই।কখন ছাড়া পেলি?এক ঘণ্টার মতো হইব। বালা আছেন ছোড ভাই? আজিজ সাব আর নেজাম সাবে বালা?তুই ভালো?মতিনউদ্দিন সাবের শইলড কেমন?বলতে বলতে কাদের মিয়া হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সেই রিকশায় করেই কাদেরকে ঘরে নিয়ে এলাম।

ছোড ভাই, পেটে ভূখ লাগছে, চাইরডা ভাত খাওন দরকার।তুই চুপচাপ বসে থাক। আমি ভাত বসাচ্ছি। শুয়ে থাকবি?জ্বি-না।ঘরে ঘি আছে। গরম গরম ভাত খাবি ঘি দিয়ে। রাত্ৰে মতিনউদ্দিন সাহেব রানা করবে। খুব ভালো রাধে।কাদের বসে বসে ঝিমুতে লাগল। সে কোথায় ছিল, কেমন ছিল–আমি কিছুই জিজ্ঞেস করলাম না।ছোড ভাই, নিচতলাটা দেখলাম খালি।

ওরা দেশের বাড়িতে চলে গেছে।বালা করছে, খুব বালা কাম করছে।ভাত খেতে পারল না। কাদের। খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করে উঠে পড়ল।কিছুই তো মুখে দিলি না, এই কাদের।শইলডা জুইত নাই ছোড ভাই।শুয়ে থাক, আরাম করে শুয়ে থাক। ভয়ের কিছু নেই।

সন্ধ্যার পর থেকে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হল। এবং যথারীতি কারেন্ট চলে গিয়ে চারদিক অন্ধকার হয়ে পড়ল। তাকিয়ে দেখি হারিকেন জ্বালিয়ে মতিনউদ্দিন সাহেব নেজাম সাহেবের ঘর থেকে বেরুচ্ছেন। এতক্ষণ সেখানেই বসে ছিলেন। আমার তাঁর কথা মনেই হয় নি। আমাকে দেখেই একগাল হেসে বললেন, ঝড়-বৃষ্টির রাতে মিলিটারি বের হবে না। আরাম করে ঘুমান যাবে। ঠিক না শফিক সাহেব?

এই বলেই কাদেরের দিকে তাঁর চোখ পড়ল। ভীতস্বরে বললেন, মরে গেছে নাকি?না, মরে নি।আসছে কখন?বিকালে।আপনি আমাকে খবর দেন নি কেন? কেন আমাকে খবর দেন নি?মতিন সাহেব বড়োই রেগে গেলেন। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, তার চোখমুখ লাল হয়ে উঠেছে।আমাকে কেউ মানুষ বলে মনে করে না। যখন কাদেরকে ধরে নিয়ে গেছে, তখনো কেউ আমাকে বলে নি। আমি জেনেছি। এক দিন পরে। কেন আপনার আমার সঙ্গে এ-রকম করেন? আমি কী করেছি?

হৈ-চৈ শুনে কাদের জেগে উঠল। মতিনউদ্দিন সাহেব হঠাৎ অত্যন্ত নরম স্বরে বললেন, তোমার জন্যে আমি খুব চিন্তা করেছি। কাদের। হয়রত শাহজালাল সাহেবের দরগাতে সিন্নি মানত করেছি।

অ্যাপনের শইলড) বাংলা?আমার শরীর বেশি ভালো না কদের। রাত্রে ঘুম হয় না। কিন্তু তোমার পায়ে কী হয়েছে? ভেঙে ফেলেছে নাকি?মা, ভাঙে নাই!বললেই হয়, ভাঙে নি? নিশ্চয়ই ভেঙেছে। পায়ে কোনো সেন্স আছে? চিমটি দিলে বুঝতে পোর?জ্বি, পারি।

মতিনউদ্দিন সাহেব খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তুমি রাজাকারে ভর্তি হয়ে যাও কাদের মিয়া। তাহলে মিলিটারি তোমাকে কিছু করবে না। ভয়ডর থাকবে না, আরাম করে ঘুমাতে পারবে। যেখানে ইচ্ছা সেখানে যেতে পারবে। নব্বুই টাকা বেতন পাবে, তার সঙ্গে খোরাকি। ভালো ব্যবস্থা। ভর্তি হয়ে যাও। কালকেই যাও।

আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম মতিন সাহেবকে। লোকটির বয়স হঠাৎ করে যেন অনেক বেড়ে গেছে। অনিদ্রার জন্যে চোখের নিচে গাঢ় হয়ে কালি পড়েছে। মোটাসোটা থাকায় আগে যেমন সুখী—সুখী লাগত, এখন লাগে না। কেমন উদভ্ৰান্ত চোখের দৃষ্টি। সমস্ত চেহারাটাই কেমন যেন রুক্ষ।

মতিন সাহেব সেই রাত্রে আমাকে খুবই বিরক্ত করলেন। একটা চিঠি লিখছিলাম। তিনি পেছন থেকে বারবার সেই চিঠি পড়ার চেষ্টা করতে লাগলেন। আমি রাগী গলায় বললাম, কী করছেন এই সব!

দেখছি মিলিটারির বিরুদ্ধে কিছু লিখেছেন। কিনা। চিঠি এখন সেন্সার হয়। আপনার লেখার জন্যে শেষে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে।আপনার ভয় নেই, মিলিটারির বিরুদ্ধে কিছু লিখছি না।

কী লিখেছেন, পড়ে শোনান।আপনি ঘুমাতে চেষ্টা করেন মতিন সাহেব।রাত্রে তো আমি ঘুমাই না। তার উপর আজকে আধার ইলেকট্রিসিটি নেই। মিলিটারির জন্যে খুব সুবিধা।মতিন সাহেব।জ্বিআপনি দয়া করে আপনার ঘরে যান তো।কেন, আমি থাকলে কী হয়? আমি তো আর আপনাকে বিরক্ত করছি না। বসে আছি চুপচাপ।

বহু কষ্টে রাগ থামালাম আমি। নেজাম সাহেব কবে যে ফিরবেন, আর কবে যে এই গ্রহের হাত থেকে বাঁচিব কে জানে? মতিন সাহেব হঠাৎ উঠে জানালা বন্ধকরতে লাগলেন।জানালা খোলা থাকলে অনেক দূর থেকে আলো দেখা যায়। এত রাত পর্যন্ত আলো জ্বালা খুব সন্দেহজনক।গরমে সিদ্ধ হয়ে মরণব মতিন সাহেব।গরম কোথায়, হারেকোনটা নিভিয়ে দেন। দেখবেন শীত–শীত লাগবে।

গলা ব্যথার জন্যে ওষুধ কিনতে গিয়েছি, দেখি ওষুধের দোকানে রফিকের ছোট ভাই। এ্যাসপিরিন কিনছে। আমাকে দেখে তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। আমি অত্যন্ত পরিচিত ভঙ্গিতে বললাম,  এই যে, কী ব্যাপার?

সে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। যেন আমাকে ঠিক চিনতে পারছে না। আমি হাসি-হাসি মুখে বললাম, তারপর, সব খবর ভালো তো? হানিমুন কোথায় করলে?সে তার উত্তর দিল না। এ্যাসপিরিনের দাম দিয়ে লম্বা মুখ করে বেরিয়ে গেল।এই ছেলেটিকে আমি দু চোখে দেখতে পারি না। তবু রাস্তায় দেখা হলে কথা বলি। সে-ই সবজান্তার ভঙ্গিতে দু একটা জ্ঞানগর্ভ কথা বলেই গম্ভীর হয়ে থাকে। কিন্তু আজকে এ-রকম করল কেন? ছেলেটির সঙ্গে আমার মোটামুটি খাতির আছে। আমার নিজের ধারণা, আমি বোকা সেজে থাকি বলে ছেলেটা আমাকে খানিকটা পছন্দও করে। আমি ওষুধ কিনে বাড়ি না ফিরে চলে গেলাম রফিকের ওখানে। রফিক বাসায় ছিল না। তাঁর ছোট ভাই বেরিয়ে এসে পাথরের মতো মুখ করে বলল, আমাদের টেলিফোন নষ্ট।

টেলিফোন করতে আসি নি, রফিকের সঙ্গে কথা ছিল।দাদা তো সন্ধ্যার আগে আসবে না।রফিক এসে পড়ল মিনিট দশোকের মধ্যেই। কোনো কাজে এসেছিস? না, দেখা করতে আসলাম। কাদের ছাড়া পেয়েছে, জনিস নাকি?জানব না কেন, তুই-ই তো টেলিফোন করেলি। আছে কেমন এখন?ভালোই আছে। তোদের খবর কী?রফিক মুখ কালো করে বলল, তুই জানিস না কিছু?

না। কী জানব?সারা ঢাকার লোক জানে, আর তুই জনিস না! আয় আমার সাথে, চায়ের দোকানটাতে গিয়ে বসি। সিগারেট আছে?চায়ের দোকানে রফিক খুব গম্ভীর হয়ে বসে রইল। আমি বললাম, বল কী হয়েছে?আমার ছোট ভাই ফিরোজ, সে এখন আর তার বৌকে দেখতে পারে না। মেয়েটা থাকে বাপের বাড়ি। সে যায় না। ওখানে। খুবই অশান্তি।কারণটা কী?

কোনোই কারণ নেই। একটা গুজব উঠেছে বুঝলি–দু-এক জন লোক বলাবলি করছে মেয়েটাকে নাকি এক বার মিলিটারিরা উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। দু রাত নাকি রেখেছিল।আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।গুজব ছাড়া আর কিছুই না। এই সিগারেটের আগুন হাতে নিয়ে বলছি। কিন্তু ফিরোজের ধারণা এইটা গুজব না। ঐটা তো আসলে একটা গরু, চিলে কান নিয়ে গেছে শুনলে চিলের পিছে দৌড়ায়।

রফিক আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে নিচু গলায় বলল, ফিরোজকে দোষ দিয়ে কী হবে বল! আমার মায়েরও সেই রকম ধারণা। মা ঐদিন বলছিলেন-কোনো দোষ না থাকলে এই রকম একটা সুন্দরী মেয়েকে ফিরোজের কাছে বিয়ে দেয় কেন? ফিরোজের আছে কী?

রফিক আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দিল। আমি বললাম, আর চা নিস না। দুপুরবেলা গাদাখানিক চা খাওয়-ঠিক না।রফিক বলল, কাউকে বলিস না, তোকে একটা কথা বলছি।–আমি ঠিক করেছি। মুক্তিবাহিনীতে চলে যাব। আমার জীবনের কোনো দাম আছে নাকি? বেঁচে থাকলেই কি আর মরলেই কি! আমার আর সহ্য হচ্ছে না।মুক্তিবাহিনীতে যাবি কীভাবে?

প্রথম মেঘালয়ে যাব। সেখানে গেলেই ব্যবস্থা হবে। সোর্স পাওয়া গেছে।কবে যাবি?দু-এক দিনের মধ্যে যাব।কাউকে বলেছিস বাড়িতে? বাবাকে বলেছি। চাচা কী বলেন?কী বলেন, শুনে লাভ নেই। দে, আরেকটা সিগারেট দে।উঠে আসবার সময় রফিক ইতস্তত করে বলল, এবণ্টা কথা শফিক, আমার ভাইয়ের ব্যাপারটা একটু গোপন রাখিস। বড়ো লজ্জার ব্যাপার হয়েছে রে ভাই। সে অবিষ্কার গত সোমবার নয়টা ফেনোবারবিটল খেয়েছে। চিন্তা করে দেখ।

কে খেয়েছে?ফিরোজ, আর কে? কী লজ্জা ভেবে দেখ। ঈমাক ওয়াশ টোয়াশ করাতে হয়েছে।ঘরে ফিরে দেখি বাচ্চ ভাই দরবেশের দোকানের সেই ছেলেটা (বাদশা মিয়া) এসে বসে আছে! কাদের বাচ্চ ভাই দরবেশের কোনো খবর পেয়েছে কিনা তাই জানতে এসেছে। কাদের গম্ভীর হয়ে বলছে, বাঁইচা আছে। এই খবর পাইছি।কে কইছে?ইজাবুদ্দিন সাব।এইটা কেমুন কথা কাদের ভাই! ইজাবুদ্দিন সাব তো কইছে উল্টা কথা।

আমি কি তার সাথে মিছা কইছি?না, তুমি মিছা কইবা ক্যান।দরবেশ সাবের পরিবাররে কইছ।১,ন্তর কোনো কারণ নাই।দেখা করনের কোনো উপায় আছে কাদের ভাই?দেখা করনের চিন্তা বাদ দে বাদশা। বাইচা আছে–এইটাই বড়ো কথা। কয় জন বাঁচে কি দেখি?তা ঠিক।বাদশা মিয়া ছেলেটি খুব কাজের, সে একাই বাচ্চু ভাই দরবেশের দোকান চালু করে দিয়েছে। আগের মতো বিক্রি নেই, তবু বাজার খরচ উঠে যায়। বাচ্চু ভাইয়ের পরিবারকে পথে বসতে হয় নি।

এক দিন গেলাম তার ওখানে চা খেতে। লোকজন নেই, খালিদোকান সাজিয়ে বাদশা মিয়া বসে আছে।কি রে, লোকজন তো কিছু নেই।চা তুই একাই বানাস, না অন্য কেউ আছে?জ্বি-না, আমি একলাই আছি, অন্য কেউ নাই।কিছুতেই তাকে চায়ের দাম দেওয়া গেল না। চোখ কপালে তুলে বলল, আপনার কাছ থাইক্যা দাম নেই ক্যামনে? কন কী স্যার!

আমার প্রতি তার এই প্রগাঢ় ভক্তির কারণ কী, কে জানে?বাড়িতে ফিরে এসে দেখি আজিজ সাহেবের কাছ থেকে লম্বা একটি চিঠি এসেছে। চিঠিটি লিখে দিয়েছে নীলু। দুটি খবর জানা গেল সে-চিঠিতে। আজিজ সাহেব তাঁর মেয়েদের জন্যে বিয়ে ঠিক করেছেন। বিলুর বিয়ে হচ্ছে যে-ছেলেটির সঙ্গে সে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ফিফথ ইয়ারে পড়ে; দেখতে ভালো, বংশও ভালো। ছেলের বাবা স্কুলের হেডমাস্টার। আজিজ সাহেব লিখেছেন।–বর্তমান পরিস্থিতিতে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে ভালো। সমগ্র চিঠিতে নীলুর বিয়ে কোথায় হচ্ছে, কার সঙ্গে হচ্ছে, কিছুই লেখা নেই। নেজাম সাহেবের কথাও নেই। সেটিও বেশ রহস্যময়।

চিঠির সঙ্গে বিলুর একটি চিরকুটও আছে। আমি অসংখ্য বার পড়লাম সেটি।শফিক ভাইমাতিন ভাইয়ের কাছে একটি চিঠি দিয়েছিলাম। আপনাকে দেবার জন্যে। লিখেছিলাম এক মাসের মধ্যে অবশ্যি যেন তার জবাব দেন। আপনি দেন নি। এমন কেন আপনি?বিলু।মতিন সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, বিলুকি যাবার আগে আপনাকে কোনো চিঠি দিয়েছিল?মতিন সাহেব অনেক ভেবেচিন্তে বললেন, হ্যাঁ, আপনাকে দিতে বলেছিল। খুব নাকি জরুরী।

কোথায় সে-চিঠি?মতিন সাহেব চোখ কপালে তুলে বললেন, আমি কী করে বলব কোথায়?সে চিঠি আর কোথাও পাওয়া গেল না।মানুষ যে-কোনো অবস্থাতেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। ফাঁসির আসামীও শুনেছি এক সময় মৃত্যুভয়ে অভ্যস্ত হয়ে যায়, নিয়মিত খাওয়াদাওয়া করে, তরকারিতে লবণ কম হলে মেটকে চৌদ্দপুরুষ তুলে গালি দেয়। সেই হিসেবে আমাদের দীর্ঘ ছ মাসে মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হওয়া গেল না। তার মূল কারণ সম্ভবত অনিশ্চয়তা; রাস্তায় রিকশা নিয়ে বের হলে দুটি সম্ভাবনা-মিলিটারিরা রিকশা থামাতে পারে, না-ও থামাতে পারে। থামলে ধরে নিয়ে যেতে পারে, না-ও ধরতে পারে। ধরে নিয়ে গেলে আবার ফিরে আসতে পারে, আবার না-ও ফিরে আসতে পারে। এই ধরনের অনিশ্চয়তায় বেঁচে থাকা যায় না।

যদি নিশ্চিতভাবে জানা যেত–এর বেশি আর কিছু হবে না, স্বাধীনতাটাধিনতার কথা চিন্তা করে লাভ নেই, তাহলে হয়তো সময় এত দুঃসহ হত না। কিন্তু একটি আশার ব্যাপার আছে। এক দিন হয়তো আবার আগের মতো রাস্তায় ইচ্ছামতো হাঁটা যাবে। রাত বারোটায় চায়ের দোকানে বসে সিঙ্গেল চায়ের অর্ডার দেওয়া যাবে। স্বাধীনতা একেক জনের কাছে একেক রকম। এই মুহুর্তে আমার কাছে স্বাধীনতা মানে হচ্ছে, রাত এগারটায় রাস্তায় হাঁটতে-হাঁটতে গম্ভীর হয়ে পানের পিক ফেলা। মতিনউদ্দিন সাহেবের কাছে স্বাধীনতার মানে খুব সম্ভব রাতের বেলায় জানালা খোলা রেখে (এবং বাতি জ্বলিয়ে রেখে) ঘুমোনর অধিকার।

আজকাল আমি রাস্তায় দীর্ঘসময় হেঁটে বেড়াই। আগে কেউ আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করত না। এখন মাঝে-মাঝে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বাসা কোথায়? কোথায় যাচ্ছি? মুসলমান না। হিন্দু (হিন্দু বলতে পারে না, বলে ইন্দু)? এক বার শুধু—শুধু দু ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখল। আমার ধারণা, নিছক ভয় দেখিয়ে মজা করবার জন্যেই। আমার সঙ্গে আরেকটি ছেলে ছিল। সে বাজার করে ফিরছে। বাজারের ব্যাগ থেকে ইলিশ মাছের লেজ বের হয়ে আছে। ছেলেটি কুলকুল করে ঘামতে শুরু করল। নেহ্যাঁয়েত বাচ্চা ছেলে। হয়তো কাজের ছেলেটা আসে নি, মা জোর করে পাঠিয়েছে। আমি বললাম, ভয়ের কিছু নেই। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থােক। এক্ষুণি ছেড়ে দেবে। যে সেপাইটি আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখেছে, সে এক বার এসে জিজ্ঞেস করল, কেয়া, ডর লাগিতা?

ছেলেটি কোনো কথা বলতে পারল না। আমি বললাম, ইলিশ মাছ কত দিয়ে কিনেছ?বেচারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। প্রচণ্ড ঘামছে সে। আমি বললাম, এক্ষুণি ছাড়বে, তয়ের কিছু নেই।যদি না ছাড়ে?কী যে বল! ছাড়বেই। তোমার নাম কী?

লম্বামতো একটি মিলিটারি এগিয়ে এল। এই সময়, এবং আমি কিছু বোঝবার আগেই প্রচণ্ড এক চড় মারাল ছেলেটির গালে। আমি হাত বাড়িয়ে ছেলেটিকে টেনে তুললাম। তার ব্যাগ ছিটকে পড়েছে দূরে। সেখান থেকে আলুগুলি বেরিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। মিলিটারিটি আমাদের হাত নেড়ে চলে যেতে বলল। ছেলেটির গা কপিছিল, ঠিকমতো হাঁটতে পারছিল না। সে ফিসফিস করে বলল, আমাকে একটু বাসায় পৌঁছে দেবেন? আমরা একটা রিকশা নিলাম। ছেলেটি রিকশায় উঠে ক্রমাগত চোখ মুছতে লাগল। আমার খুব ইচ্ছা হল বলি–আজ তুমি যে লজ্জা পেয়েছ, সে শুধু তোমার একার লজ্জা নয়।–আমাদের সবার লজ্জা। কিন্তু কিছুই বললাম না। এই সব বড়ো বড়ো কথার আসলে তেমন কোনো অর্থ নেই।

আমি তাকে বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। ছেলেটির মা এমন ভাব করতে লাগল, যেন আমি তাকে মিলিটারির হাত থেকে ছুটিয়ে এনেছি। আমার জন্যে হালুয়া এবং পরোটা তৈরি হল। হালুয়া খাবার সময় ভদ্রমহিলা একটা তালপাখা নিয়ে বাতাস করতে লাগল। আমি বললাম, রোজার সময় দেখবেন। এরা বেশি ঝামেলা করবে না। আর কয়েকটা দিন।

আমাদের কাদের মিয়াও খবর আনল, প্রথম রোজার দিন সব আটক লোকদের ছেড়ে দেয়া হবে। ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠকে বসবে। সব ঠিকঠাক। আমেরিকা নাকি শক্ত ধমক দিয়েছে। ইয়াহিয়া খানকে। ইয়াহিয়া মিটমাটের জন্যে একটা পথ খুঁজছে।বুঝলেন ছোড ভাই, সাপ গিলার অবস্থা হইছে। না পারে গিলতে না পারে রাখতে। কাদের পহেলা রমজানের জন্যে খুব উৎসাহ নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। তার উৎসাহের প্রধান কারণ, দরবেশ বাচ্চু ভাই ছাড়া পাবে।

দরবেশ বাচ্চু ভাই ছাড়া পেলেন না। রমজানের সময় অবস্থা অনেক বেশি খারাপ হল। আলবদর বাহিনী তৈরি হল। প্রথম বারের মতো অনুভব করলাম, কিছু কিছু যুদ্ধ সত্যি সত্যি হচ্ছে। নয়তো এতটা খারাপ অবস্থা হওয়ার কোনো কারণ নেই। ইজাবুদ্দিন সাহেবও অনেকখানি মিইয়ে গেলেন। বারান্দায় এখন আর তিনি এক শ পাওয়ারের বাতি দুটি জ্বালান না। ছয় রোজার দিন রাতে তারাবীর নামাজ শেষে ফেরবার পথে তিনি মারা পড়লেন। হাসিমুখে খবর আনল কাদের মিয়া। প্রচণ্ড ধমক লোগালাম কাদেরকে, এই লোকটার জন্য বেঁচে আছিস তুই কাদের। আর যেই হাসে হাসুক, তুই হাসিস না।

কাদেরের হাসি বন্ধ হল না। চোখ ছোট-ছোট করে বলল, খেইল শুরু হইছে। ছোড ভাই। বিসমিল্লাহ দিয়া শুরু।মতিনউদ্দিন সাহেব শুধু বললেন, মানুষ মারাটা ঠিক না। মানুষ মারাটা কোনো হাসির জিনিস না কাদের মিয়া। ইজাবুদ্দিন সাহেব মানুষের অনেক উপকার করেছেন।

দুলাভাই খবর পাঠিয়েছেন এক্ষুণি যেতে হবে। দুলাভাইয়ের গাড়ির এই ড্রাইভারটি নতুন রাখা হয়েছে। লোকটি বিহারী। মিলিটারি গাড়ি থামালেই সে গলা বের করে একগাদা কথা হড়হড় করে বলে। ফলস্বরূপ গাড়ি থেকে নামতে হয় না।

দুলাভাইয়ের বাসায় গিয়ে দেখি, জিনিসপত্র গোছগাছ হচ্ছে। আপার মুখে আষাঢ়ের ঘনঘটা। দুলাভাই বললেন, ইণ্ডিয়া যুদ্ধে নামবে, বুঝলে নাকি শফিক? শহর ছাড়ার সময় হয়ে গেছে।

কখন ছাড়ছেন শহর?আন্দাজ করা দেখি?আজকেই যাচ্ছেন নাকি?ঠিক। এক ঘণ্টার মধ্যে। গাড়িতে করে যাব ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহে খবর দেয়া আছে।হঠাৎ করে যাচ্ছেন দুলাভাই! আজকেই ঠিক করলেন নাকি?হ্যাঁ।

আজকে ঠিক করার পিছনে কোনো কারণ আছে?আছে। সিরিয়াস কারণ আছে।বলেন শুনি।তার আগে বল, তুমি একটা কাজ করতে পারবে কিনা?কী কাজ?লুনাকে তো চেন, শীলার বান্ধবী–এক মেজর বিয়ে করতে চায় তাকে।চিনি।

সেই মেয়েটিকে তোমার ওখানে নিয়ে রাখবে। শুধু আজকের রাতটা। কাল ভোরে মেয়ের এক চাচা এসে মেয়েকে নিয়ে যাবে। খবর দেওয়া হয়েছে, তাঁকে তোমার ঠিকানা দিয়ে দিয়েছি।

কিছুই বুঝতে পারছি না দুলাভাই। মেয়েটা কোথায়?এইখানেই আছে। শীলার ঘরে আছে।ব্যাপার মোটামুটি এই রকম, গত দশ দিন ধরে লুনা এই বাড়িতে আছে। মেয়ের বাবা-মা মেজর ভদ্রলোককে বলেছেন, মেয়ে চিটাগাং তার নানার বাড়িতে আছে। ঈদের পর আসবে। বিয়ের পাকা কথাবার্তা হবে তখন। মেজর সাহেব কিছুই বলেন নি। আজ সকালে কিছু লোকজন এসে মেয়ের বাবা-মাকে তুলে নিয়ে গেছে। দুলাভাইয়ের ধারণা, তাঁকে ধরতে আসবে আজকালের মধ্যে।

বড়ো আপা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, মেয়েকে আমার এখানে রাখার কথা তো আমি বলি নি, তোর দুলাভাই গলা বাড়িয়ে বলেছে। এখন দেখ না ঝামেলা।ঝামেলা তো সবারই আপা। তুমি ঝামেলায় পড়লে দেখবে সাহায্যের জন্যে লোক আসছে।রাখা রাখা। লম্বা লম্বা কথা ভালো লাগে না। লম্বা কথা অনেক শুনেছি।বড়ো আপার ঢাকা ছাড়ার ইচ্ছা মোটেই নেই। তিনি আমার সামনেই এক বার দুলাভাইকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, সবচেয়ে ভালো হয়। এই বাসা ছেড়ে দিয়ে অন্য কোথায়ও ওঠা।

শফিকের ওখানে উঠতে দোষ কী? ঘর তো খালি পড়ে আছে।দুলাভাই অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বললেন, ঢাকা শহরে এক ঘণ্টার বেশি আমি থাকব না। ওরা আমাকে খুজছে।তুমি তো শেখ মুজিব! তোমাকে না হলে ওদের ঘুম হচ্ছে না।দুলাভাই শান্ত স্বরে ড্রাইভারকে বললেন গাড়ি বের করতে। আমাকে বললেন, লুনাকে সবকিছু বলা হয়েছে, খুব শক্ত মেয়ে। একটুও ঘাবড়ায় নি।

আমি বললাম, যদি ওর চাচা না আসে?আসবেই। আর যদি না-আসে, তাহলে তুমি বুদ্ধি খাটিয়ে যা করবার করবে। মেয়ের এক দূরসম্পর্কের খালা আছে। ঢাকায়। লুনার কাছে ঠিকানা আছে।ওর বাবা-মার খবর ওকে বলেছেন?কান্নাকাটি করছে না?

আমাদের সামনে না। মেয়ে বড়ো শক্ত, মাচকাবার মেয়ে না। আমি খুবই ইমপ্রেসড!দুলাভাই খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, একটা টেলিফোন নাম্বার দিচ্ছি, সেই টেলিফোন নাম্বারে ফোন করে বলবে যে আমি চলে গেছি।কাকে বলব?যে টেলিফোন রিসিত করবে, তাকেই বলবে। বলবে মেসেজ রাখতে।এইটি কি আপনার ব্রিগেডিয়ার বন্ধুর নাম্বার?হ্যাঁ, তোমার ওর কাছে যাওয়ার দরকার নেই।লুনাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরছি।

রাস্তায় নেমেই প্রচণ্ড ভয় লাগল। মনে হল রাস্তাঘাটগুলি যেন বড়ো নির্জন। যেন আজকেই ভয়ংকর একটা কিছু ঘটবে। শাহবাগের পাশে প্রকাণ্ড একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে ছিল। তার পাশ দিয়ে যাবার সময় আমার বুক কাঁপতে লাগল। মনে হল ওরা আজ অবশ্যই আমাদের গাড়ি থামাবে। ঠাণ্ডা স্বরে বলবে, তোমার সঙ্গের ঐ মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করবার জন্যে আমরা নিয়ে যাব। আমি বলব, জনাব, ও একটি নিতান্ত বাচ্চা মেয়ে। ক্লাস নাইনে পড়ে। ওরা দাঁত বের করে হাসবে। এবং হাসতে হাসতে বলবে, জিজ্ঞাসাবাদ করবার জন্যে বাচ্চা মেয়েরাই ভালো।

আমি নিজেকে সাহস দেবার জন্যেই বললাম, লুনা, ভয়ের কিছু নেই। তুমি শান্তভাবে চুপচাপ বসে থাক।চুপচাপই তো বসে আছি।জানালা দিয়ে বারবার। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছ কেন? মাথাটা নিচু করে বস না।আহ, আপনি কেন এত ভয় পাচ্ছেন? মাথা নিচু করে বসব কেন শুধু শুধু?

ড্রাইভার গাড়ি ছোটাচ্ছে ঝড়ের মতো। এত জোরে গাড়ি চালোনর দরকারটা কী? শুধু শুধু মানুষের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করা। আমি বললাম, ড্রাইভার সাহেব, একটু আস্তে চালান।ড্রাইভার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ফার্স্ট গিয়ারে নিয়ে এল, যা আরো সন্দেহজনক। যেই দেখবে, তারই মনে হবে বদ মতলব নিয়ে গাড়ির ভেতর কেউ বসে আছে, সম্ভবত একটি লুকান স্টেনগান আছে, সুবিধামতো টার্গেট পেলেই বের হয়ে আসবে।

বাড়ির সামনে এসেও আমার বুকের ধকধকানি কমে না। এত খাঁ-খাঁ করছে কেন চারদিক? আগে তো কখনো এ-রকম লাগে নি। আমি গলা উঁচিয়ে ডাকলাম, এই কাদের–কাদের।কাদেরের সাড়া পাওয়া গেল না। মতিনউদ্দিন সাহেব জানালা দিয়ে মাথা বের করে আবার কচ্ছপের মতো মাথা টেনে নিলেন। তার পরই বিপাং করে জানালা বন্ধ করে ফেললেন। ভদ্রলোকের মাথা কি পুরোপুরিই খারাপ হয়ে গেছে?

মতিন সাহেব, আপনি নিচে এসে সুটকেসটা নিয়ে যান দয়া করে।মতিন সাহেব নিচে নামলেন না। শব্দ শুনে বুঝলাম ভদ্রলোক অন্য জানালাগুলি বন্ধ করছেন।লুনা বলল, আমি নিতে পারব।তোমার নিতে হবে না। রাখ তুমি। মতিন সাহেব, ও মতিন সাহেব।কোনোই সাড়া নেই।লুনা বলল, ঐ লোকটিরই কি মাথা খারাপ?

 

Read more

সৌরভ-শেষ পর্ব-হুমায়ূন আহমেদ

Related Posts

Leave A Comment