হিমুর বিয়ে – হুমায়ূন আহমেদ

আমিই মিসির আলি – হুমায়ূন আহমেদ

আমাদের দখিন হাওয়ার ছাদে অনুষ্ঠান হচ্ছে৷ আমার সর্বকনিষ্ঠ পুত্র নিষাদ হুমায়ূনের নামকরণ অনুষ্ঠান৷ হৈচৈ হচ্ছে, গান-বাজনা হচ্ছে৷ হঠাৎ আমাদের সবাইকে চমকে দিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদার৷ তিনি ঢাকায় এসেছেন এটা জানি৷ কোথায় উঠেছেন জানতাম না বলেই নিমন্ত্রণ করা হয়নি৷ অনেকদিন পর তাকে দেখে ভালো লাগল৷ আমি তার হাত ধরতেই তিনি ধমকের গলায় বললেন, আপনি নাকি হিমুকে বিয়ে দিয়েছেন৷ এটা তো আপনি করতে পারেন না৷ হিমু কেন বিয়ে করবে?

আমি হিমুর বিয়ে দেইনি৷ একটা বই লিখেছি – আজ হিমুর বিয়ে৷ বইটিতে হিমু বিয়ে করে ফেলে জাতীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়৷ বইটির প্রকাশক অন্যপ্রকাশ৷ প্রায় নিয়মিতই তারা বইমেলা উপলক্ষে হিমু বিষয়ক একটা বই পায়৷ বইটির প্রকাশনা উপলক্ষে নানা আয়োজন করে৷ এইবার বিয়ের আয়োজন করে ফেলল৷ একজন পাগড়ি মাথায় বর সাজল, আরেকটি মেয়ে সাজল বউ৷ বর-কনে অন্যপ্রকাশের স্টলে বসে রইল৷ দর্শকদের আগ্রহ এবং কৌতূহল তুঙ্গ স্পর্শ করল৷ চারদিকে দারুণ উত্তেজনা৷ বইমেলায় এমন মজার দৃশ্য আগে হয়নি৷ দু-একজন অবশ্য গম্ভীর গলায় বললেন, বইমেলার শুচিতা নষ্ট হচ্ছে৷ মহান একুশের ঐতিহ্য ভুলুন্ঠিত হচ্ছে ইত্যাদি৷

হিমুর বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম না৷ টেলিভিশনে দেখেছি৷ আমার কাছে মনে হয়েছে, মেলা মানেই আনন্দ৷ মেলার পবিত্রতা রক্ষার জন্য সবাই অজু করে মেলায় আসবেন এবং ফিসফিস করে কথা বলবেন তা কেন হবে? একজন প্রকাশক যদি বুক প্রমোশনের জন্য কিছু করেন তাতেই বা দোষ কোথায়?

ফ্রাংকফুর্ট বইমেলায় দেখেছি, রান্নার বই প্রকাশনা উপলক্ষে রান্নার বিপুল আয়োজন৷ বইয়ের রেসিপি দেখে রান্না হচ্ছে৷ সবাই মহানন্দে খাচ্ছে৷ একদিকে নাচের জলসা হচ্ছে৷ একদল ছেলেমেয়ে উদ্দাম নৃত্যে মেতেছে৷ বইমেলার ভেতরই বিয়ারের দোকান খোলা৷ প্রচুর বিয়ার খাওয়া হচ্ছে৷

থাক এসব কথা, বিবাহ অনুষ্ঠানে ফিরে যাই৷ হিমু যে হয়েছে সে মৈনাক পর্বতের কাছাকাছি৷ কনে লাক্স সুন্দরী৷ যথেষ্টই রূপবতী৷ একদল হিমু গেল রেগে৷ তারা মৈনাক পর্বতকে হিমু মানতে রাজি না৷ পাল্টা মিছিল শুরু হলো – হিমুর বিয়ে, মানি না মানি না৷

অনেকদিন আগে বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনা হেরে গিয়েছিল৷ আমি তখন ময়মনসিংহে অয়োময় নাটকের শুটিংয়ে ব্যস্ত৷ আর্জেন্টিনার পরাজয়ে বিশাল মিছিল বের হলো৷ স্লোগান – আর্জেন্টিনার পরাজয়, মানি না মানি না৷

তারা জানে মানি না মানি না বলে চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে ফেললেও কিছু হবে না৷ তারপরেও স্লোগান দিতে হবে৷ জাতিগতভাবে আমরা স্লোগান দিতে ভালোবাসি৷ বাকের ভাইয়ের ফাঁসি বন্ধ করার জন্য স্লোগান দিয়েছিল৷ হিমুর বিয়ে বন্ধ করার জন্যও স্লোগান৷

বেচারা হিমু কি কোনোদিনই বিয়ে করতে পারবে না? তার সুখী সুন্দর সংসার হবে না? কোনো শিশু হিমুকে বাবা বলে ডাকবে না? এত নিষ্ঠুর কেন আমরা?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *