হুমায়ূন আহমেদের লেখা লিলুয়া বাতাস শেষ খন্ড

প্রতি বর্ষায় দুতিনবার এই কাজটা করেন। তাঁর নাকি মজা লাগে। 

ছাদের ঠিক মাঝখানে এগারােটা ফুলের টব আছে। টবগুলির মালিক ফুপু । তার জন্ম এগারাে অক্টোবর বলে এগারাে তার লাকি সংখ্যা। এইজন্যে ফুলের টবের সংখ্যা এগারাে। ফুপু তাঁর টবগুলির কোনাে যত্ন নেন না। সব গাছই কিছুদিনের মধ্যে মরে যায়। তখন আবার কেনা হয়। ফুপু ঠিক করে রেখেছেন তার গায়েহলুদ হবে ছাদে। তার চারদিকে তখন থাকবে এগারােটা ফুলের টব ।

এগারাে সংখ্যাও নাকি অতি রহস্যময়। নিউমারােলজি মতে এগারাে হচ্ছে দুই। এক এবং এক যােগ করে দুই। নিউমারােলজি মতে ফুপুর জুডায়িক সাইন ব্রিা। এদিকে জন্মতারিখ হিসেবেও তাঁর জুডায়িক সাইন ব্রিা । এটাও নাকি বিরাট ব্যাপার। লিব্রার পাওয়ার বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেল। এইসব হিসাব নিকাশ মুকুল ভাই করে দিয়েছেন। তিনি শুধু যে বিখ্যাত পরিচালক তা-না, তিনি আবার পামিস্ট্রি নিউমারােজি, এসট্রলজি এইসবও জানেন।

লিলুয়া বাতাস

ফুপু মুকুল ভাইয়ের আদিভৌতিক ক্ষমতায়ও মুগ্ধ। তার প্রসঙ্গ উঠলে ফুপু চোখ বড় বড় করে বলেন— টেলেন্টেড লােক, বুঝলি! হাত দেখে এমন হড়হড় করে তাের অতীত বলবে যে তুই টাসকি খেয়ে যাবি। হিপনােসিসও উনি জানেন। তবে করতে চান না। ব্রেইনে চাপ পড়ে তাে এইজন্যে। হিপনােসিস করে উনি যে-কোনাে মানুষকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘুম পাড়িয়ে দেবেন

লিলুয়া বাতাস শেষ খন্ড

অভিনেতা মাহফুজ ভাই অনেক বড় বড় কথা বলেছিলেন, মুকুল ভাই একদিন তার সামনে বসিয়ে কয়েকটা পাস দিলেন। মাহফুজ ভাই মুখ হা করে ঘুমাতে লাগল। অন রেকর্ড আছে। স্টিল ফটোগ্রাফারকে দিয়ে ছবি তােলানাে হয়েছে। যাতে মাহফুজ ভাই পরে অস্বীকার করতে না পারেন। অবশ্যি মাহফুজ ভাই ঠিকই অস্বীকার করেছেন। তিনি সবাইকে বলেছেন, আমি আসলে ঘুমাই নি, ঘুমের ভাণ করেছি। 

আমি ছাদ থেকে নামলাম বৃষ্টি শুরু হবার চার-পাঁচ মিনিট পর। এই চার পাঁচ মিনিট আমি ফুপুর সাজানাে এগারােটা টবের মাঝখানে বসে রইলাম। মাঝখানটা ফুপু সাদা রঙ দিয়ে বৃত্ত দিয়ে রেখেছেন। তিনি যখন এখানে এসে তখন না-কি গাছগুলি থেকে একধরনের এনার্জি পান। আমি কোনাে এনাভি পাই নি। এগারাে সংখ্যা আমার জন্যে না, হয়তাে এ কারণেই। তাছাড়া এগারোটি টবের মধ্যে মাত্র চারটাতে গাছ আছে। বাকিগুলির গাছ মরে গেছে। এটাও একটা কারণ হতে পারে। 

ফুপুর ঘরে আরেক দফা উঁকি দিলাম। আমার প্রধান উদ্দেশ্য ফুপুর কান্না থেমেছে কি-না দেখা, অপ্রধান উদ্দেশ্য টবের গাছগুলি মরে গেছে এই খবর জানানাে। চারা কিনতে হলে এখনি কিনতে হবে। বৃক্ষমেলা চলছে। এবারের বৃক্ষমেলার শ্লোগান ‘গাছ জীবনের জন্যে। 

বাবলু, দরজা ফাঁক করে উঁকি দিবি না । এইসব আমার পছন্দ না। ঘরে টেক। 

আমি ঘরে ঢুকলাম। তুই একজনকে একটা চিঠি দিয়ে আসতে পারবি ? মুকুল ভাইকে? কাকে দেব সেটা পরে বলব। তুই পারবি কি-না সেটা বল। যাওয়া আসার রিকশাভাড়া ছাড়াও আলাদা দু’শ টাকা পাবি।

লিলুয়া বাতাস শেষ খন্ড

 এখন দিতে হবে ?  হ্যা, এখনই দিতে হবে । তুই চিঠি নিয়ে যাবি, যদি দেখিস উনি বাসায় নেই, তাহলে রাস্তায় অপেক্ষা করবি। যত রাতই হােক অপেক্ষা করবি। চিঠি উনার হাতে দিতে হবে। অন্যের হাতে দেয়া যাবে না।চিঠি লিখে রেখেছ ? 

হা। তাের অন্যের চিঠি খুলে পড়ার অভ্যাস নেই তাে ? 

 আমি জানি নেই। তারপরেও জিজ্ঞেস করলাম। এই চিঠি তুই যদি পড়িস তাহলে রােজ হাশরের দিনে দায়ী থাকবি । 

ফুপু আমার হাতে চিঠি দিলেন। খামের ওপর লেখা পরম শ্রদ্ধাভাজন মুকুল ভাই । 

দু’শ টাকা দেয়ার কথা ছিল, আরাে একশ’ দিলাম । ঠিক আছে ? ঠিক আছে। 

রােজ হাশরে দায়ী থাকার বিষয়টা আমার তেমন ভয়াবহ মনে হলাে না। ফুপুর ঘর থেকে বের হয়েই চিঠি খুলে পড়লাম– 

মুকুল ভাই, 

আপনি আমার কাছে দেবতা । না না, ভুল বললাম, দেবতার চেয়েও বড়। আপনি আমার সব । আপনি যা বলেছেন আমি তাই করেছি। ভবিষ্যতেও করব । যতদিন বাঁচব ততদিন করব। এখন আমার মহাবিপদ। এখন আপনি বলে দিন, আমি কী করব ? আমি কি ঘুমের ওষুধ খাব ? না কি সিলিং ফ্যানে ফাঁস নিব ? আপনি যা বলবেন তাই হবে। 

আমার ওপর তুফান বয়ে যাচ্ছে, আর আপনি শুনলাম হােতাপাড়ায় প্রজাপতির মন’ নাটকের শুটিং শুরু করেছেন। খবরটা প্রথম বিশ্বাস করি নি। ইতি আপার কাছে টেলিফোন করে নিশ্চিত হয়েছি। 

লিলুয়া বাতাস শেষ খন্ড

মুকুল ভাই, আপনার-আমার এই ভিডিওটা কে তুলেছে ? আপনি কি বের করতে পেরেছেন ? মনে হয় না আপনার সেই চেষ্টা আছে। কারণ ভিডিওতে আপনাকে চেনা যায় না। আপনি বেশির ভাগ সময় আড়ালে ছিলেন, যে কয়বার ক্যামেরার সামনে এসেছেন আপনার মুখ দেখা যায় নি। আর আমি ছিলাম পুরােপুরি ক্যামেরার সামনে। আমাকে সবাই চিনবে । আমার সঙ্গের পুরুষ মানুষটাকে কেউ চিনবে না। 

মুকুল ভাই, আমি কী করব আপনি বলে দিন। প্লিজ প্লিজ প্লিজ! আরেকটা কথা, প্রজাপতির মন’ নাটকে আপনি আমাকে একটা রােল দিবেন বলেছিলেন। নায়িকার সৎবােন আমার করার কথা ছিল। অথচ সেই রােল এখন ইতি করছে। আমার কপাল এত খারাপ কেন মুকুল ভাই ? আমার আরাে অনেক আগেই মরে যাওয়া উচিত ছিল। কেন এখনাে বেঁচে আছি ? হে দয়াময়, তুমি আমার মৃত্যু দাও। মৃত্যু দাও। মৃত্যু দাও। 

আপনার কাছের এক অভিমানী 

নীলা 

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা মেঘের ছায়া খন্ড-১

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *