হৃদয়বৃত্তান্ত-শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায় -(পর্ব-১৩)

বাচ্চাটাকে চালান করে এখন অনেকক্ষণের মতাে হাওয়া হবে মিষ্টি। সেটা টের পেয়ে নােটন বলে, ধবৃছি, কিন্ত বাথরুম থেকে একটু তাড়াতাড়ি আসিস। আমি বোরােবাে। 

আচ্ছা বাবা, আচ্ছা । 

শিশুদের গায়ে স্বর্গের গন্ধ অক্ষুট কথা আর শব্দে সংগীতের ধ্বনি। দুনিয়াটা এদের জন্যেই যা একটু ভাল লাগে নােটনের। 

হৃদয়বৃত্তান্ত-শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

বাচ্চাটা কোলে এসেই নােটনের নাক খামছে ধরে ‘আম আম করে কি বলতে চেষ্টা করছে। নােটন টের পেল, বাচ্চাটার নখ বড় হয়েছে। নাকের নুনছাল উঠে গেল বােধহয় এই হচ্ছে আজকালকার যুগে মা, বাচ্চার দিকে খেয়ালই নেই। নিজেদের নখে বাচ্চারা নিজেরাই ক্ষতবিক্ষত হয়। 

নােটনের ঘরে এসে তার ড্রয়ার থেকে একটা নেল-কাটার বের করল। তারপর অখও মনােযােগে ভাগ্নের নখ কাটতে বসে গেল । বাচ্চাটাও বাসে রইল তার কোলে, চুপ করে । বিস্ময়ে দেখতে লাগল তার হাত নিয়ে কী একটা হচ্ছে । 

এইসব ছােটখাটো কারণের জন্যেই না পৃথিবীতে বেঁচে থাকা। 

বেঁচে থাকার ও কয়েকটা ছােটখাটো কারণ আছে নােটনের { তার মধ্যে একটা হল জনসংযােগ তার পরিচিতির পরিধি বিশাল। এবং বাড়ির পিছন দিককার বিরাট বস্তি অঞ্চলে তার বদান্যতা ও সাহায্যের খ্যাতি বেশ ব্যাপক । বাচ্চাটাকে বেশীক্ষণ ঘাঁটাটি করে আদর করা হল না নােটনের। বস্তির নারায়ণ এসে খবর দিল, কানাইয়ের ঠাকুর্দা মরেছে। ই-খরচার জোগাড় নেই। | না খাকারই কথা। কানাইয়ের বাপ চোলাইয়ের ঠেক চালাত। ক্লাবের ছেলেরা নােটনের নেতৃত্বেই ঠেক বাঙে। কানাইয়ের বাপ কালাচাঁদ সহজে ছাড়েনি, দলবল নিয়ে হামলাবাজি করায় পুলিশ ধরে। তারপর কী হয়েছিল ঠিক জানে না নােটন। তবে জেল হাজতে লােকটা গলায় গামছা দিয়ে মরে। কেউ বলে খুন, কেউ আত্মহত্যা। ইতিমধ্যে কালাচাঁদের বউ অন্য জায়গায় বিয়ে বসেছে । তার নতুন বর ছেলে নিতে চায়নি। অগত্যা কালাচাঁদের বুড়াে বাপ হরিপদর ঘাড়েই নাতির দায় পড়ল। খুবই খারাপ অবস্থা গেছে তখন। বাচ্চাটাকে মিষ্টির হতে চালান করে নােটন গায়ে জামা চড়িয়ে বলল, চল, দেখি গে । 

হৃদয়বৃত্তান্ত-শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

গিরিবালা চেঁচাল, ও কি গাে ছােড়দা, কচুরি করতে বললে যে! নেচি হয়ে গেছে, গরম ভেজে দিচ্ছি, খেয়ে যাও। 

আসছি টপ করে । গিরিবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, এসে খাবে? মড়া ছুঁয়ে এলে চান করতে হয় তা জানাে? জ্বালাস নে। কচুরির চেয়ে অনেক বড় ব্যাপার আছে দুনিয়ায়, বুঝলি? নােটন বেরিয়ে যাওয়ার পর জ্যোৎস্নাময়ী নামলেন । 

গিরিবালা আর্তনাত করে উঠল, ও মা, ওই দেখ আমি কাঁড়ি কচুরির জোগাড় করে বসলুম তােমাৱা চেলে বস্তির মড়া পােড়াতে চলে গেল। 

জ্যোৎস্নাময়ী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এই জন্যেই তাে বিয়ে করতে চায় না। উড়নচলা চলবে না যে । বউ হলে ঢিট কত । কখন ফিরবে? 

আর ফিরেছে! মড়াটড়া ছুয়ে আসবে মা, জামাকপড় না ছেড়েই বসে যাবে যেতে, ও অনাচারি মানুষকে বিশ্বাস কি? বড় অনাচার তােমার বাড়িতে। 

অত বাছবিচার করতে যাস কেন? দেখিনা- দেখিনা ভাব করে থাকতে পারিস না? আমি তাে তাই করি। সব বাছবিচার মানতে গেলে কি আর মা হয়ে থাকতে পারতুম? এক একটা এক এক রকম, কাকে ফেলি বল। কথাও কি শােনে। 

এত কচুরির এখন কী হবে? এলে বাবে। নইলে ভূতভূজিতে লাগাবি । 

ওই একটি ছেলের জন্যে মস্ত একটা দীর্ঘশ্বাস জমা আছে বুকে। উনচল্লিশ বছর বয়সের বাড়ি ছেলে। এখনও নাবালক একনও শিশু। 

আর একটা দীর্ঘশ্বাস ইদানিং জমেছে তেনের জননী। কী হবে মা মঙ্গলচণ্ডী জানেন। কিন্তু যা হচ্ছে তা ভাবলে বুক শুকিয়ে যায়। কোথাকার জল কোথায় গড়াবে কে জানে! পরের জন্যে আর মা হবেন না জ্যোৎস্নাময়ী । হলে বাবা হবেন ছেলেদের সংসার-সন্তান ভূলে দিব্যি মজে আছেন বাগান নিয়ে, ওরকম থাকতে পারলে জ্যোৎস্নাময়ীর আরাম হত । 

হৃদয়বৃত্তান্ত-শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

মনটায় সব সময়ে একটা ভার চেপে আছে। উৎকণ্ঠায় রাতের ঘুম ছিড়ে ছিড়ে যায়। আমেরিকা অনেক দূরের দেশ, সেখানে চোখের আড়ালে কী হয়েছে না হয়েছে তা কে বলবে? জ্যোৎস্যময়ী দু’বার আমেরিকা গেছেন। শেষ বার গেছেন বছর চারেক আগে। তখনও তােতন তােতনের মতােই ছিল। একা, ভাবুক ঝঞাটহীন । যা কিছু ঘটেছে গত বছর তিনেকের মধ্যে । মরার আগে মাদি একটা দীর্ঘ চিঠি লিখেছিল জ্যোৎস্নাময়ীকে। তার ছেলের জীবন নাকি তােতনই নষ্ট করে দিয়েছে। সেই চিঠি আজও শক্তিশেলের মতো বুকে বিধে আছে । কত শপাশাপ না জানি মাদি করে গেছে তােতনকে। শাপ-শাপান্ত কি ফলে না? নিশ্চয়ই ফলে। চক্ষুলজ্জায়, সংকোচে তোতনকে প্রায় কিছুই জিজ্ঞেস কর, যায়নি। মিষ্টি প্রসঙ্গটা তুলতে গিয়েছিল, ধমক খেয়েছে তােতনের কাছে । বান্টি, অর্থাৎ জ্যোৎস্নামীর বড় মেয়ে মিষ্টির চেয়ে বুদ্ধিমতী। সেও প্রসঙ্গ তােলেনি। তবে বিয়ের সম্বন্ধ করার আগে ভাইকে ভুলিয়ে ভালিয়ে জিজ্ঞেস করেছে, তার পছন্দের কেই আছে কিনা। তােতন একটু কেঁকে জবাব দিয়েছে কি থাকবে? ও জবাবটাও গােলমেলে।

Leave a comment

Your email address will not be published.