হৃদয়বৃত্তান্ত-শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায় -(পর্ব-৩১)

শােনাে, বাড়ির কেউ আমার অ্যাকসিডেন্টো কথ জানে না। তুমিও কাউকে বােলো না। ঘরের বাতিটা নিবিয়ে দেবে? তুমি বরং হলঘরে থাকো। 

হৃদয়বৃত্তান্ত-শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়আচ্ছা। আর একটা কথা রতন। বলুন। তুমি খুব ভাল ছেলে। কী যে বলেন! যনি ভাল হই, যদি মা ভাল হয়ে ওঠে, একবার তােমার গাঁয়ে যাবাে। নিশ্চয়ই যাবেন। রতন, কেউ কখনও তােমাকে অপমান করেছে? 

কী যে বলেন! আমাদের লাঞ্ছনা গঞ্জনা কি শেষ আছে! অপমান ছাড়া দিন যায় নাকি একটাও? কোনও মেয়ে? আমাদের ছােটোলােকদের কথা বাদ দিন। রামেও মারে, রাবণেও মারে। তুমি ভাল ছেলে রতন । বাতিটা নিবিয়ে দিলাম সাদ। আপনি ঘুমােন। আমি হলঘরে বসে রইলাম। 

ঘুমের ওষুধ কেন দিল বলাে তো! আমার যে জেগে থাকাই দরকার। ওরা এলে মাকে ডেকে নেবে? 

দেবাে। 

আমার বাবার বয়স হয়েছে। এবার এই মেন্টাল শক খুব খারাপ। রতন, আমার বাবার কিছু হবে না তাে! 

আপনি কেন অত ভাবছেন? যা হয়নি তা নিয়ে ভাবতে নেই। 

সব কিছু যে আমার জন্য হল! শুধু আনার জন্য। রতন, টেলিফোনের শব্দ হচ্ছে না। শীগগির যা নিঃশেতি পানপাত্রের মতাে । 

কিন্তু শুনতে পাচ্ছি চাকরিতে নাকি উন্নতি হবে শীগগিরই। সেটা হতে পারে। কী যায়, আলে তাতে। উন্নতি না হলেও গ্রাসাচ্ছাদন চলে যাবে কোনওমতে। রােজ জগিং করছেন? 

ডাক্তারা বলেছে। রােজ ভােরে? 

যা । কটার সময় ওঠেন? পটা ! তাৎপরই বােরন? মিনিট পনেয়ের মধ্যেই বেরিয়ে পড়ি। কেন বউদি? 

বলাঃ. পারেন আপনি। আমার কথাটি তে ফিজিক্যাল ফিটনেসের ধার ধারেন না। আর বলে সঙ্গে দেখা হয়নি । 

রাগ হলে, ন: বউদি তবে এখন সামিও তার যুক্তি তার বড় পয়নও } স 

ক এ আমা: নালন? আষা নেন। 

অসুবিধে কি? আমি কি খারাপ বাঁধি? 

, তা বলছি না। প্লীজ । আলবেন। সঙ্গী সাথী কেউ থাকলে তাকেও আনতে পারেন । আমার আবার সঙ্গী সাথী কোথেকে জুটবে? যদি গার্ল ফ্রেন্ড কেউ জুটে গিয়ে থাকে ইতিমধ্যে। এত প্রােপােজ “ন: ১.খন 

পরাগ করুণ গলায় বলে, আমাকে নিয়ে ঠাট্টা কেন বউদি? :৫৬; জীবস্মৃত লােক গরিব, আপনার মায়া হয় না ঠাট্টা করতে? 

হয়। খুব হয় । আসবেন কিন্তু ভাই। যারা। 

পরাগ এইসব নেমন্তন্ন বিশেষ পছন্দ করে না। বাঙালীদের বাড়িতে নানা কথা ওঠে। হাঁড়ির খবর বেরিয়ে পড়ে । ওসব আর ভাল লাগে না পরাগের । সে একটা নিস্পহ, নিস্তরঙ্গ জীবন যাপনের বলয় তৈরি করে নিচ্ছে তার চারপাশে। খুব ধীরে ধীরে। কোনও ঘটনা ঘটবে না, কোনও উত্থান পতন থাকবে না, শুধু ধীরে ধীরে সময় গড়িয়ে যাবে। তার পক্ষে এর চেয়ে বেশী কাম্য আর কী হতে পারে? 

ফল শেষ হয়ে একটু একটু শীত পড়তে শুরু করেছে। সকালে বেরােতে বেশ কষ্ট হয় আজকাল । চনচনে একটা ঠাভা হাওয়া বয়ে যায় এ-সময়ে। পরাগ কিছু গরম জামাকাপড় বের করেছে বাক্স পাট ঘেটে । 

ভােরবেলা দৌড়াতে কী যে ভাল লাগে পরাগের। সতেজ বন গ.দহ ব্যতাল যেন জাপটে ধরে তাকে। আকাশ যেন নেমে আসে বুকের মাধে। জগিং নয়, সে আজকাল সত্যিকারের দৌড়োয়। ক্রস 

কান্তি রানারের মতাে সে উচ্চাবচ ভূমিখও অনায়াসে হরিণের মতো পার হয়। 

সকলে আজ তার গায়ে জ্যাকেট, জ্যাটের নিচে কি সুট। পায়ে ভণের মেজো । 

রাস্তা এক চৌপাট পার হয়ে তার প্রিয় অরণ্য ভূমিতে ঢুকে পড় পরাগ। আমেরিকাকে এই একটি কারণেই ভীষণ ভালবাসে পরাগ । এত গাছ, এত বন-জঙ্গল, এত বদ্ধ প্রকৃতি । এরকম আর কোথায় আছে। 

ঘন নীল ট্র্যাক সুট আর মাথায় হড পরা একটি মেয়ে প্রায় পাশাপাশি চলে এল । নিনাই বােধ 

হাই রয়, ওট ইউ ডেট মি এভার! দুড়ের তলা থেকে নিনার গলাটা ভ্রমকম শােনান : পরাগ তাল না। বলল, ইয়া মাই ডিয়ার, নাম ভে; মে বি ভেকি কুন।। রােজই নিনা তাকে ছাড়িয়ে যায়। আজ পিছিয়ে পড়ল। হাই নিনা, হােয়াটস দা ম্যাটার উইথ ইউ, ক্যাচ মি আপ। নিনা একটু পিছন থেকে অসহায় গলায় পরিষ্কার বাংলায় বলল, আমি কি অত ছুটতে পারি? পরাগ থমকে দাড়াল। 

মেয়েটি গড়ানে রাস্তা ধরে উঠে এল কাছকাছি। হুড যখন খুলে দিল তখন তার সেই বিখ্যাত দুটি চোখ অজু জলধারা ভেসে যাচ্ছে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে সে। 

একটা ছােট্ট হার্ট অ্যাটাক সামলে নিল পরাগ। অস্ফুট গলায় বলল, তুমি! এখানে! এভাবে! আমি নিজে কিছু বুদ্ধি করে করিনি। বউদি শিখিয়ে দিয়েছে। রাত থাকতে 

উঠে… 

কাঁদতে কাঁদতে এর বেশী আর বলতে পারল না। কোপ্যনিতে কষ্ট ক্ষুব্ধ হয়ে গেল। 

জীবনের কাছ থেকে পরাগ খুব বেশী কিছু আশা করে না আর। খুব বেশী কিছু নয়। বিবর্ণ, কুণ্ঠিত, সন্দেহাকুল গলায় সে মৃদু প্রশ্ন করে, কী চাও তুমি? 

কনতে হাঁসতে হঠাৎ ঝলসে উঠল তার চোখ। বৃষ্টিতে কেমন ঝলকে ওঠে বিদ্যুৎকান্নায় জড়ানো তীব্র রে সে বলে উঠ। কি চাই! জমি কি চাই। আমি কি চাই। আমি চাই তোকে কতে! শেষ করতে, একবার শেষ করতে। 

মেয়েটি দুম দুম কারে দিল এলছিল রাগের বুকে। তারপর বুকের মধ্যেই জো দিল মা এই গলায় বলল, তোমাকে ত ঘো করি ভালো না! জানি 

তােমাকে কিছুতেই হীরা হতে দেবাে না আমি কিছুতেই না। সব কেড়ে নেবাে । ভিখিনি, ছেড়ে দেবাে তােমায়। বুঝলে! 

শুকনাে গলায় পরাগ বলল, বাড়ি যাবে? 

কেন বাড়ি যাবাে? বলে মেয়েটি মুখ তােলে। সেই দুটি চুম্বক চোখ, তাতে জলধারা ও বিদ্যং কেন বাড়ি যাবাে? কার বাড়ি? 

কারও নয় । বাড়ি । শুধু বাড়ি। যখন যার তখন তার । 

মােটেই তা নয়। কেন বাড়ি যাবে বল! তা জানি না। মনে হয় তােমার একটু বিশ্রাম দরকার । কেন বিশ্রাম? রুমাল দিচ্ছি, নাকটা মুছে নাও।। কেন মুছবাে তােমার রুমালে? বলাে কেন মুছবে? 

Leave a comment

Your email address will not be published.