Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

রূপা পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

স্যার, আপনের শইল খুবই খারাপ করল। একজন ডাক্তার ডাইকা আনলাম। উনি আপনেরে হাসপাতালে ভর্তি করাইছে। আমি স্যার প্রত্যেক দিন আপনেরে দেখতে আসি। কাইলও আসছি। আপনার কি ইয়াদ আছে? এখানের এক ডাক্তার সাব বলেছেন আমি আমার পুলারে নিয়া রাতে থাকতে পারি। স্যার আমি কি থাকব? মুখে কথা বলতে না পারলে মাথা নাড়েন।

রাশেদ কিছু না বুঝেই মাথা নাড়ল।স্যার, আপনার চিন্তা নাই, আমরা বাপ-বেটা আপনের সাথে আছি। উপরে আল্লাহ আর নিচে আমরা দুই বাপ-বেটা।রাশেদের খুব জানতে ইচ্ছা করছে লোকটা তার ছেলের নাম কিন্তু কেন রেখেছে। নিশ্চয়ই কারণ আছে। মানুষ কারণ ছাড়া কিছুই করে না। মানুষের জগত cause and effect এর জগত। কিন্তু নিয়ে শৈশবের একটা ছড়া মাথায় এসেছে

If যদি is হয়

But কিন্তু Not নয়

What মানে কি?

লোকটা হড়বড় করে কথাই বলছে। মানুষ এত কথা বলে কেন।স্যার আপনার একটা চিকিৎসা আমি করব বলে ঠিক করেছি। কচি পান পাতার উপরে কালিজিরা তেল দিয়া সেই পান পাতা গরম কইরা আপনার পায়ের পাতায় ঘষব। সাথে সাথে বল পাইবেন। আধুনিক ডাক্তার এইসব চিকিৎসা জানে না। এইগুলো গেরাইম্যা চিকিৎসা। একটাই সমস্যা পান পাতা গরম করব কেমনে?

ঠাণ্ডা পান পাতা ঘষলে হিতে হবে বিপরীত। দেখি কি করা যায়। একবার যখন পান পাতা ঘষার সিদ্ধান্ত নিয়েছি তখন ঘষব ইনশাল্লাহ। স্যারের মাথা আস্তে কইরা টিপ্যা দেই? রাশেদ টের পেল তার কপালে হিমশীতল আঙুল। আঙুল কপালের উপর দিয়ে যাচ্ছে আর রাশেদের শরীর কেঁপে উঠছে। তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা বলল, ঐ কেনতু বাপধন! স্যারের পায়ের আঙ্গুল আস্তে কইরা ফুটা।

স্যার আরাম পাই।ছেলেটার নাম তাহলে কেন। কিন্তু না। কেনতু শব্দটার মানে কি? মাথার কাছে সব সময় দুটা ডিকশনারি রাখা দরকার। একটা বাংলা একটা ইংরেজি। ভুল হয়ে গেছে। বিরাট ভুল। Life is a bundle of mistakes. এটা কার কথা? জীবন হচ্ছে এক বান্ডেল ভুলের… 1 Bandle শব্দটার বাংলা কি? ডিকশনারি খুবই প্রয়োজন।

বোমা ফাটার মতো শব্দ হচ্ছে কোথায়? ও আচ্ছা কেনতু নামের ছেলেটা, আঙুল ফুটাচ্ছে। আঙুল ফুটানোর এত শব্দ। আশ্চর্য।রাশেদ চোখ বন্ধ করে ফেললো। চুরুটের গন্ধ আবার নাকে আসছে। শরীর গুলাচ্ছে।সামছু বলল, কেনতু বাপধন! স্যারের সাথে কিছুক্ষণ একলা থাকতে পারবি?

কেনতু বলল, হুঁ।আমি বুদ্ধি পাইছি। ঘরে খবরের কাগজ জ্বালায় আগুন করব। সেই আগুনে পান গরম করব। আমি যাই, পান আর কালিজিরা তেলের জোগাড় দেখি।রাত এগারোটায় বাপ-ছেলেকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হল। সামছু হাসপাতালের দারোয়ানের চড়-থাপ্পড় খেলো। অপরাধ? বাপ-বেটা রুমে আগুন জ্বালিয়ে পান গরম করছিল।

ঘড়ি-কন্যা মদিনার ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্যে হারুন তার বাল্যবন্ধু সুলতানকে খবর দিয়ে এনেছেন। তারা দুজন বসেছে গেস্টরুমে। রূপা। ঢুকল।ঘড়ি পরীক্ষায় সেও থাকবে। সুলতান পকেটে করে দুটা ঘড়ি এনেছেন। একটার সময় তিন ঘণ্টা বাড়ানো। অন্যটায় ঘণ্টার কাটা নেই, বন্ধ ঘড়ি। রূপা বলল, সুলতান চাচা আপনাকে দেখলেই আমার অস্বস্তি লাগে।সুলতান বললেন, আমি কি করেছি রে মা? আমি কি করেছি?

রূপা বলল, আপনি প্রতিটি কথা দুবার করে বলেন। ভয়ংকর অস্বস্তিকর ব্যাপার।আর বলবনা রে মা। আর বলব না।রূপা বলল, অসহ্য। পরীক্ষা-নিরীক্ষা আপনারা করুন। আমি ছাদে যাচ্ছি।হারুন বললেন, তোকে থাকতে হবে। তুই না থাকলে মেয়েটা ফ্রি ফিল করবে না। কঠিন পরীক্ষা দিচ্ছে।এক শর্তে থাকব। সুলতান চাচা কোনো কথা দুবার বলতে পারবেন না।সুলতান বললেন, দুবার বলব না। বলব না। অবশ্যই বলব না।রূপা হতাশ গলায় বলল, এখন তত তিনবার করে বলছেন।হারুন বললেন, কথা বন্ধ। পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। মদিনা মদিনা।

মদিনা ঘরে ঢুকল। তার মুখ শুকনা। যে কোনো কারণেই হোক সে ভয় পেয়েছে। হারুন বললেন, মদিনা! আমার বন্ধু সুলতান সাহেবের পকেটে একটা ঘড়ি আছে। ঘড়ির টাইম ঠিক নেই। অর্থাৎ এখন ১১টা বাজে। তার ঘড়িতে ১১টা বাজে না। তুমি বল তার ঘড়িতে কয়টা বাজে।মদিনা বলল, পারব না স্যার।হারুন বললেন, আমার পকেটে দুটা ঘড়ি আছে। একটা কালো বেল্টের আরেকটা মেটালিক বেল্টের কোনটায় কত বাজে।

মদিনা ক্ষীণ গলায় বলল, পারব না স্যার।পারবে না মানে? অবশ্যই পারবে। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চিন্তা কর তারপর বল।মদিনা চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ সময় থেকে চোখ মেলে বলল, পারব না স্যার।সুলতান বললেন, তুমি কোত্থেকে কি শুনেছ। মেয়ে ফ্রড। মেয়ে ফ্রউ। এই মেয়ে ফ্রউ।হারুন বললেন, মেয়েকে নিয়ে পত্রিকায় নিউজ হয়েছে। পেপার কাটিং আমার কাছে আছে। দেখবে?

না। ফালতু নিউজ। পাত্তা দেয়াই ঠিক না। পাত্তা দেয়াই ঠিক না। ঠিক না।হারুনকে বিপর্যস্ত মনে হচ্ছে। তিনি আশাই করেন নি ঘটনা এ রকম ঘটবে। তিনি হুংকার দিয়ে বললেন, থাপড়ায়ে এই মেয়ের দাঁত ফেলে দেয়া দরকার।রূপা বলল, শুধু শুধু চিৎকার করবে না বাবা। মেয়ে এমন কোনো অপরাধ করেনি যে থাপড়ায়ে তার দাঁত ফেলতে হবে। মদিনা! তুমি আমার ঘরে যাও কিছু হ্যান্ড মেড পেপার বাথটাবে ভেজাও। ছবি আঁকব।মদিনা বের হয়ে গেল। তার চোখভর্তি পানি। রূপা বলল, বাবা তুমি তো তাকে পরীক্ষা করেছ। তোমার ঘড়ির সময় ঠিক ঠিক বলেছে। তাই না?

হুঁ।রূপা বলল, আমার ধারণা তুমি কোনো পরীক্ষা নাও নি। পত্রিকায় খবর দেখে মদিনাকে নিয়ে চলে এসেছ। তোমার ঘড়ির টাইম বলে দিয়েছে এই গল্পটা তোমার বানানো।

খামাখা গল্প বানাবো কেন?

সেটা আমি কি করে বলব.

বেশি জ্ঞানী হবার চেষ্টা করিস না। কাগের ঠ্যাং বগের ট্যাং ছবি আঁকছিস ছবি আঁক। আমি মদিনা মেয়েটাকে কানে ধরে তার বাড়িতে পাঠাবার ব্যবস্থা করছি। আমি সহজ চিজ না।কবে পাঠাবে? আজই পাঠাব। বদ মেয়েটাকে রেডি হতে বল। আমি মাইক্রোবাসে গ্যাস ভরে নিয়ে আসি। সুলতান যাবে নাকি আমার সাথে? সুলতান হাই তুলতে তুলতে বললেন, যেতে পারি। একা মানুষের এই সুবিধা যেখানে ইচ্ছা সেখানে যেতে পারি।

এখন তোর দুপা

যেখানে ইচ্ছা সেখানে যা

যখন হবে চার পা

ভাত কাপড় দিয়া যা,

যখন হবে ছয় পা

বাবা! তুমি যাবা না।

ছড়া স্টপ কর। সত্যি যাবে?

অবশ্যই। রাগে আমার শরীর চিড়বিড় করছে। এক কাজে দুই কাজ হবে। রথ দেখব, কলাও বেচব। পথে বগুড়ার কাছে একটা কুয়া আবিষ্কার হয়েছে তার কোন তল নেই।শুল নেই মানে? তল নেই মানে?

হারুন উৎসাহের সঙ্গে বললেন, মনে কর তুমি পাথরের বড় একটা চ্যাং কুয়াতে ফেললে। পাথরটা কোথাও না কোথাও হিট করবে। শব্দ হবে। সেটাই লজিক, কিন্তু এই কুয়ায় কিছু ফেললে শব্দ হয় না।বল কি? বল কি? দড়ি ফেলেও মাপার চেষ্টা করা হয়েছে। দড়ি নেমেই যায় নেমেই যায়।সুলতান বললেন, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি পত্রিকায় ছাপা হবার মত নিউজ। ঠিকানা জান তো?

খুঁজে বের করব।দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে দুজন মাইক্রোবাস নিয়ে বের হয়ে গেলেন। মদিনাকে সঙ্গে নেবার কথা তাদের মনে রইল না।রূপা রাশেদের সুটকেস ঘাটছে। তার ঠিকানা যদি কোথাও পাওয়া যায়। বইপত্রের সঙ্গে একটা ডায়েরি পাওয়া গেছে। সেখানে অনেক কিছু লেখা কিন্তু কোথাও ঠিকানা নেই। অন্যের ডায়েরি পড়ার প্রশ্নই উঠে না।

তারপরেও দুই লাইনের একটা লেখা রূপা পড়ে ফেলল। লেখাটা ইংরেজিতে। শিরোনাম suspicion.

My own suspicion is that the Universe is not only queerer than we suppose, but qucerer then we can suppose.

বাংলায় কি হবে? বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আমরা যত অদ্ভুত মনে করি তার চেয়েও অদ্ভুত। অন্য কেউ এই ব্যাপারটা জানুক বা না জানুক, রূপা জানে। খুব ভাল করেই জানে।আফা একটা কথা বলব? রূপা তাকালো। তার সামনে মদিনা দাঁড়িয়ে, সে তাকিয়ে আছে ভীত চোখে। মনে হয় পরীক্ষায় ফেল করে ভালই কান্নাকাটি করেছে। তার চোখ লাল।রূপা বলল, বল কি বলবে?

আমার উপরে রাগ হইয়েন না আফা।তুমি ঘড়ির সময় বলতে পার নি। এটাই তো স্বাভাবিক। ঘড়ি না দেখে আমরা কেউ সময় বলতে পারি না। খানিকটা অনুমান হয়ত করতে পারি। এর বেশি না।আফা অন্য একটা কথা বলব। আপনের পায়ে ধরি রাগ হইয়েন না।বল কি বলবে। রাগ হব না।মদিনা ক্ষীণ গলায় বলল, উনার অবস্থা ভাল না।রূপা বলল, কার অবস্থা ভাল না? মদিনা আঙ্গুল দিয়ে রূপার হাতের ডায়েরি দেখাল। রূপা গম্ভীর গলায় বলল, আমি যার লেখা পড়ছি তার অবস্থা ভাল না?

মদিনা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। রূপা বলল, বোস আমার সামনে।মদিনা বসল। রূপা বলল, তোমার কথাবার্তা যথেষ্টই বিরক্তিকর। সুলতান চাচার চেয়েও বিরক্তিকর। তুমি এ বাড়িতে পা দিয়েই ভূত দেখে ফেললে। এখন আবার দেখছ একজনের অবস্থা ভাল না। বেশি বেশি দেখা ভাল না। এখন থেকে কম কম দেখবে।মদিনা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।আমি একজন ভদ্রলোকের একটা খাতা হাতে নিয়েছি তাই দেখে তুমি তার শারীরিক অবস্থা বলে ফেললে? শারীরিক অবস্থা দেখার জন্যে মানুষের শরীর পরীক্ষা করতে হয়। তার জন্যে ডাক্তার আছেন। তুমি কি ডাক্তার?

না আফা।তোমাকে কিছু জ্ঞানের কথা বলি, মানুষ তার ক্ষমতার সবটাই অর্জন করে। জন্ম থেকে বিশেষ কোনো ক্ষমতা নিয়ে কেউ আসে না। তুমি আর কখনো ভূত দেখা, অমুকের শরীর ভাল না, তমুক দুর্ঘটনায় মারা যাবে এইসব বলবে না।জী আচ্ছা বলব না।এখন সামনে থেকে যাও। তোমাকে দেখলেই রাগ লাগছে।মদিনা উঠে গেল।

হারুন অনেক ঝামেলা করে তলহীন কুয়া খুঁজে পেয়েছেন। বগুড়া জেলার ভেতর কাহালু রেল স্টেশন। রেল স্টেশনে মাইক্রোবাস রেখে রিকশায় গেছেন উত্তরে এগারো কিলোমিটার। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে সাত কিলোমিটার। সুলতান বললেন, তোমার সঙ্গে বের হওয়া বিরাট বোকামি হয়েছে। তুমি বিপজ্জনক ব্যক্তি। অবশ্যই বিপজ্জনক ব্যক্তি।হারুন বললেন, আমার মেয়ে ঠিকই বলে তুমি বিরক্তিকর মানুষ। প্রতিটা কথা দুবার তিনবার বল।

তোমার কথায় বিভ্রান্ত হয়ে বিরাট ভুল করেছি। বিরাট ভুল করেছি। দেখো আমার পায়ের অবস্থা হাঁটতে হাঁটতে পা ফুলে গেছে। পা ফুলে গেছে।চুপ একটা কথা বলবে না। একটাও কথা বলবে না।সুলতান অবাক হয়ে বললেন, এখন তো তুমিও দুবার করে বলছ।হারুন চিৎকার করে উঠলেন, আমার সঙ্গে আসতে চাইলে আস। না আসতে চাইলে স্টেশনে ফিরে যাও।একা একা কীভাবে ফিরব? আমি তো পথ চিনব না। পথ চিনব না।

দুজন যখন তলহীন কুয়ার পাশে উপস্থিত হলেন তখন রাত দশটা। গ্রামের সবাই খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেক ডাকাডাকির পর তলহীন কুয়ার মালিক বের হয়ে এলেন। মধ্যম বয়সের মানুষ। গালভর্তি শাদা দাড়ি। দাড়িতে মেহেদি দিয়েছেন। এখন মুখভর্তি লাল-শাদার সমারোহ।হারুন বললেন, জনাব আপনার নাম কি? আমি মেরাজ ফকির।তলহীন কুয়া আপনার? জী, এই কুয়ার আরেক নাম জিন্দা কুয়া।সুলতান বললেন, কুয়া আবার জিন্দা মুর্দা হবে কীভাবে?

মেরাজ ফকির বললেন, সবাই জিন্দা কুয়া বলে। কেন বলে জানি না।কুয়াটা দেখতে এসেছি।দেখতে এসেছেন দেখেন। একশ টাকা করে হাদিয়া। কুয়ার রক্ষণাবেক্ষণ আছে।হারুন বললেন, আমরা আপনার কুয়ার ছবি তুলব। একটা পাথর ফেলব। পাথর ফেললে শব্দ হয় না এটা যদি নিশ্চিত হই তাহলে আপনাকে দুশ টাকা দিব।

মেরাজ ফকির বললেন, কুয়া হাত দিয়া ছোঁয়া নিষেধ, ছবি ভোলা নিষেধ। কিছু ফেলাও নিষেধ। জিন্দা কুয়া, তারে ইজ্জত করতে হয়।সুলতান বললেন, আমরা দুজন অত্যন্ত ক্ষুধার্ত। কিছু খাওয়াতে পারবেন। টাকা দিব।আমি হোটেল খুলি নাই। নিশি রাইতে অনেক ত্যাক্ত করেছেন, এখন ফিরত যান।ফেরার পথে হারুনের সঙ্গে সুলতানের বন্ধু-বিচ্ছেদ হয়ে গেল।আমি যে কজন গাধা মানুষকে চিনি তোর সুলতান চাচা তাদের মধ্যে এক নম্বর। গাধা শ্রেষ্ঠ।

সুলতান চাচা মোটেই গাধা মানুষ না। ভাল মানুষ, বুদ্ধিমান মানুষ। কথা রিপিট করলেই মানুষ গাধা হয় না।চুপ করে ভাত খা। তোর জ্ঞানী কথা ভাল লাগছে না।চুপ করেই তো খাচ্ছি। কথা তুমি শুরু করেছ। তুমি একতরফা কথা বলবে আমি চুপ করে থাকব এটা তো ফেয়ার না।তোর সুলতান চাচাকে গাধা মানব প্রমাণ করে দেব। প্রমাণ করাব? কর।থাক। তোর সঙ্গে কোন কথা নেই। আমি নিঃশব্দে খাব।নিঃশব্দে তুমি খাচ্ছ না বাবা। কড়মড় করে শসা কামড়াচ্ছ। আমার উপরের রাগ শসার উপরে ঢালছ।

হারুন মেয়েকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে বসেছেন। খাবার সময় হালকা গল্প-গুজব করতে তিনি পছন্দ করেন। রূপা বেশির ভাগ সময় আলোচনা হালকা পর্যায়ে রাখে না। কঠিন পর্যায়ে নিয়ে যায়। হারুনকে মেজাজ খারাপ করে আলোচনা শেষ করতে হয়।রূপা বলল, বাবা। তোমার ইতিহাস কাব্য কেমন চলছে? হারুন বললেন, তোর কথার মধ্যে ফাজলামী ভাব লক্ষ করছি। এটা আমার পছন্দ না।রূপা বলল, তাহলে ঐ প্রসঙ্গ থাক। অন্য প্রসঙ্গ। তলাবিহীন কুয়া সম্পর্কে তো কিছুই বললে না। কুয়া পেয়েছিলে? হুঁ।সত্যি তলা নেই?

মস্ত বড় একটা পাথর ছুড়ে মেরেছিলাম। সেই পাথর পানিতে হিট করেছে এমন শব্দ পাই নি।রূপা বলল, মনে হয় কুয়ায় পানি নেই।হারুন বললেন, পানি না থাকলে মাটি তো থাকবে। মাটিতে পড়ার শব্দ হবে না? হয়ত নিচে মাটি নেই। নরম কাদামাটি। পাথর কাদামাটিতে শব্দ না করেই দেবে গেছে।হতে পারে।বাবা! তুমি মেজাজ খারাপ করে খচ্ছি। বদ হজম হবে। মেজাজ ঠিক কর। আমি একটা থিওরি বের করেছি। শুনবে?

বল শুনি।আমার ধারণা এই পৃথিবীর প্রতিটি মানব সন্তানকে কোনো না কোনো Special gift দিয়ে পাঠানো হয়। বেশির ভাগ মানুষই তাদের এই গিফট সম্পর্কে জানে না। তোমার ঘড়ি বালিকা, ঘড়ি না দেখে সময় বলতে পারে। তার মতো আমিও হয়ত কিছু পারি। তুমিও পার। যদিও এখন কোনো কারণে পারছো না।হারুন কিছু বললেন না। রূপা বলল, বাবা তুমি কি গিফট নিয়ে এসেছ বলে তোমার ধারণা?

আমি কোন গিফট নিয়ে আসিনি।অবশ্যই এসেছ। চিন্তা করে বল।হারুন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, কোনো কারণ ছাড়া মানুষকে বৈরী করার ক্ষমতা নিয়ে আমি পৃথিবীতে এসেছি। এটাই আমার Special Gift. উদাহরণ হল তোর মা। আমি এমন কি করেছি যে সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল? তুই একটা কারণ দেখা সে কেন গেছে।

রূপা বলল, মানুষ হিসেবে তুমি খুবই Predictable. কোন কাজের পর তুমি কোন কাজ করবে তা আগে থেকে বলে দেয়া যায়। প্রেডিকটেবল মানুষ হল যন্ত্রের মতো। মেয়েরা যন্ত্র মানব পছন্দ করে না। মা এই জন্যেই তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে এবং ভাল করেছে।হারুন বললেন, যার কাছে গেছে সে খুব আনপ্রেডিকটেবল? সে তো চশমা চোখে ছাগল ছাড়া কিছু না। ছাগলের সঙ্গে তার একটাই তফাৎছাগল ব্যা ব্যা করে আর সে চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলে। যখন কথা বলে তখন মনে হয় জাবর কাটছে। ছাগলার ছাগলা।

রূপা বলল, বাবা তুমি উনার উপর শুধু শুধু রাগ করছ। উনি মাকে তোমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে যান নি। মা স্বেচ্ছায় গেছেন। রাগ করলে তুমি মার উপর রাগ করতে পার।ঐ ছাগলাটা তোর কাছে রসগোল্লা? রূপা বলল, খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে মানুষের তুলনা করা ঠিক না, তবে উনি মানুষ ভাল। যথেষ্টই ভাল।ছাগলাটার ভাল কি আছে যা আমার নেই?

আলোচনাটা থাক না বাবা।থাকবে না। আমি শুনতে চাচ্ছি। তোর কাছে ছাগলাটা কীভাবে মহামানব হয়ে গেল।বাবা। তুমি প্রচণ্ড রেগে গেছ। আমি তোমার রাগ আর বাড়াব না। খাওয়া শেষ কর। মটরশুটি দিয়ে কৈ মাছের ঝোল ক্লাসিক পর্যায়ের ভাল হয়েছে! তোর ক্লাসিক কৈ মাছের আমি গুষ্ঠি কিলাই। হারুন খাওয়া ছেড়ে উঠে দাড়ালেন।রূপা হতাশ গলায় বলল, বাবা তুমি ছেলেমানুষ না। দুই মাস আগে আমরা তোমার ষাট বছর পূর্তির উৎসব করেছি। এই বয়সে তুমি যদি রাগ করে ভাত না খাও সেটা হবে খুবই হাস্যকর।

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

রূপা পর্ব – ৩ হুমায়ূন আহমেদ

হারুন বললেন, আচ্ছা যা, তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না এটা মানলাম। আমি যে একজন গাধা মানব সেটাও মানলাম।হারুন কিছু বলতে যাচ্ছিলেন তখন হন্তদন্ত হয়ে মলিনা চুকল। তার হাতে রূপার মোবাইল ফোন সেট। মলিনা বলল, আফা আম্মা টেলিফোন করছেন। রূপার মা টেলিফোন করলেই মলিনার মধ্যে অস্বাভাবিক ব্যস্ততা দেখা যায়।

রূপা বলল, মাকে বল আমি ভাত খাচ্ছি। এখন টেলিফোন ধরব না। তোমাকে আগেও বলেছি খাওয়ার সময় আমাকে টেলিফোন দিবে না।হারুন বললেন, তুই যে কাজটা করলি তা অভদ্রতা এবং অসভ্যতা। বাইরের কেউ টেলিফোন করেনি, তোর মা টেলিফোন করেছে। নিশ্চয়ই জরুরি কোনো কথা।রূপা বলল, যে কোনো কথা জরুরি ভাবলেই জরুরি, না ভাবলেই জরুরি না।এটা কার কথা?

জ্ঞান রূপার কথা।হারুন রাগি গলায় বললেন, এইসব বাণীগুলি তুই একটা খাতায় লিখে ফেল। আমি নিজ খরচে ছাপিয়ে দেব। একুশে ফেব্রুয়ারি বইমেলায় বের হবে। বইয়ের নাম হবে কথামৃত। লেখিকা জ্ঞান রূপা।রেগে রেগে কথা বলছ কেন বাবা?

তুই তোর মার সঙ্গে অভদ্রতা করেছিস দেখে রাগ উঠেছে। সন্তানরা মাবাবার সঙ্গে অদ্ৰতা করবে এটা আমার পছন্দ না।রূপা বলল, বাবা-মা অকারণে আমার উপর রাগ করবে এটাও আমার পছন্দ না। কাজেই এখন অপছন্দে অপছন্দে কাটাকাটি।রূপার মার নাম শায়লা খানম। বাংলা সাহিত্যে এম.এ, তিনি স্কুল শিক্ষক বাবার পাঁচ ছেলেমেয়ের সর্বশেষ জন। তরুণী বয়সে অসম্ভব রূপবতী ছিলেন। এখনো সেই রূপ ধরে রেখেছেন। হারুনের ধারণা এখন শায়লা আগের চেয়েও রূপবতী। যতই দিন যাচ্ছে ততই না-কি তার রূপ বাড়ছে।রূপার যখন সাত বছর বয়স তখন এক ঝড়বৃষ্টির রাতে তিনি রূপার ঘরে ঢুকলেন। নরম গলায় বললেন, ভয় লাগছে না-কি মা?

রূপা বলল, হ্যাঁ।শায়লা বললেন, ভয় লাগারই কথা, মনে হচ্ছে কাছেই কোথাও বাজ পড়ছে।রূপা বলল, আজ রাতে তুমি আমার সঙ্গে ঘুমাবে? শায়লা বললেন, হ্যাঁ।রূপার আনন্দের সীমা রইল না। রূপার ঘরটা সুন্দর করে সাজানো। ফ্যানের হুক থেকে একটা দোলনা ঝুলে। রূপার খাটটা কুষ্টিয়ার এক জমিদার বাড়ি থেকে কেনা। খাটের চারদিকে আয়না বসানো। খাটে বসলেই আয়নায় অনেকগুলি রূপ দেখা যায়। কিন্তু রূপা তার ঘরে রাতে একা ঘুমুতে তার খুবই ভয় লাগে। আকবরের মা কাজের বুয়া মেঝেতে বিছানা করে রূপার সঙ্গেই ঘুমায়। তারপরেও রূপার ভয় যায় না। শুধু মা পাশে থাকলে তার ভয় লাগে না।

রাতের খাবার শেষ করে শায়লা রূপার সঙ্গে ঘুমুতে এলেন। রূপা মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, আমার আর ভয় লাগছে না মা।শায়লা বললেন, খুব ভালো।রূপা বলল, মা গল্প বল।শায়লা বললেন, গল্প না, আজ রাতে তোমার সঙ্গে জরুরি কিছু কথা বলি। মন দিয়ে শোন।রূপা বলল, আচ্ছা। শুধু যখন বজ্রপাত হবে তখন মন দিয়ে শুনতে পারব না।শায়লা বললেন, জরুরি কথাটা হচ্ছে, আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। তোমাকে ঠিক করতে হবে, তুমি আমার সঙ্গে যাবে না-কি তোমার বাবার সঙ্গে থাকবে? তুমি কোথায় যাবে?

চিটাগাং। সেখানের এক কলেজে আমি চাকরি পেয়েছি। যাবে আমার সঙ্গে? রূপা বলল, হুঁ। হুঁ না, স্পষ্ট করে বল–আমি তোমার সঙ্গে যাব।রূপা কি বলল, বুঝা গেল না, সেই সময় প্রচণ্ড বজ্রপাত হল।শায়লা বললেন, এখন কি কবিতা বলে তোমাকে ঘুম পাড়াব? রূপা বলল, হুঁ।শায়লা রূপার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কবিতা শুরু করলেন। সক মায়েরা সন্তানদের ঘুম পাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পাড়ান। শায়লা কবিতা আবৃত্তি করেন। একটি কবিতাই আবৃত্তি করেন

দিনের আলো নিবে এল সূয্যি ডোবে ডোবে।

আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে

মেঘের উপর মেঘ করেছে, রঙের উপর রঙ।

মন্দিরেতে কাঁসর ঘণ্টা বাজল ঠঙ ঠঙ।

পরের অংশ রূপার কাছে অস্পষ্ট। রূপা দেখল এক সন্ধ্যাবেলা তার মা ব্যাগ। স্যুটকেস নিয়ে চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদিও তিনি বলেছেন, চিটাগাং যাবেন আসলে তী-না, তিনি থাকবেন ঢাকাতেই। আকবরের মা বুয়া রূপাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, তোমার বাপ-মার ছাড়াছাড়ি হইছে।রূপা বলল, ছাড়াছাড়ি কি?

ছাড়াছাড়ি হইল তালাক। তারার তালাক হইছে।তালাক কি? তোমার মা অন্য এক লোকরে হাঙ্গা বইছে।হাঙ্গা বইছে মানে কি? অত কিছু বলতে পারব না। তোমার কপাল ভাঙছে।পুরো বিষয়টা হারুন মেয়েকে ব্যাখ্যা করলেন। সুন্দর করেই ব্যাখ্যা করলেন। তিনি মেয়েকে বললেন, তোমাদের ক্লাসে এমন কেউ কি আছে যাকে তুমি সহ্য করতে পার না। দেখলেই রাগ লাগে।রূপা বলল, আছে সুমি নাম।সে কি করে?

পেনসিল দিয়ে আমাকে খোঁচা দেয়। একদিন আমার স্যান্ডেলে থুথু দিয়েছিল। আমার অংক বইয়ের পাতা ছিঁড়েছে।সুমি অন্য সেকশানে চলে গেলে ভালো হয় না? খুব ভালো হয় বাবা।তোমার মার সঙ্গে আমার এই অবস্থা হয়েছে। তোমার মা চলে গেছেন অন্য সেকশানে।মা তো তোমাকে পেনসিল দিয়ে খোঁচা দেয় না।বড়রা পেনসিলে খোঁচা দেয় না। কথা দিয়ে খোঁচা দেয়। তোমার মা কথার খোঁচা দেন। আমিও দেই। খোঁচাখুঁচি করতে করতে দুইজনই ক্লান্ত। তোমার মা অনেক বেশি ক্লান্ত বলেই এখন অন্য এক ভাল মানুষকে বিয়ে করেছেন। বুঝেছ?

হুঁ।তোমার মা চাচ্ছেন তুমি তাদের সঙ্গে গিয়ে থাক। আমিও তাই চাচ্ছি। তোমার বয়স খুব কম। এই বয়সের ছেলেমেয়েদের জন্যে মায়ের আদর দরকার। মা তুমি কি যাবে তোমার মার সঙ্গে? রূপা বলল, না।হারুন বললেন, তোমার জন্যে যা ভাল তাই তোমার করা উচিত। তোমার জন্যে ভাল হল তোমার মার সঙ্গে থাকা। আমি প্রতি সপ্তাহে তোমাকে দেখতে যাব। খেলনা চকলেট এইসব নিয়ে যাব।

আমি মার সঙ্গে থাকব না। তোমার সঙ্গে থাকব।রূপা! তুমি তোমার মায়ের মতই জেদি হচ্ছ।আমি তোমার সঙ্গে থাকব।আচ্ছা যাও আমার সঙ্গে থাকবে। একটু বড় হও দেখবে কত ধানে কত চাল। আমি কথার খোঁচা দিতে শুরু করব। তুমি পালাবার পথ পাবে না।শায়লা মেয়েকে নিজের কাছে রাখার অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কোনো লাভ হয় নি।রূপী তার মাকে টেলিফোন করল। শায়লা বললেন, তোর খবর কি?

রূপা বলল, ভাল।জরুরি একটা বিষয় নিয়ে তোর সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।বল।কথাটা তোর বাবার বিষয়ে। সে আশেপাশে নাই তো? না।তোর বাবা ইদানীং খুব বিরক্ত করছে।কি করছে? মাছ পাঠাচ্ছে, তরিতরকারি পাঠাচ্ছে। টেলিফোনে খোঁজ-খবর করছে। ব্যাপারটা আমার কাছে ভাল লাগে না, টগরের বাবার কাছেও না। টগরের বাবা অতিমাত্রায় ভদ্র। সে কখনো কিছু বলবে না। কিন্তু সে যে বিরক্ত হচ্ছে তা বুঝা যাচ্ছে। এই মাসের ১২ তারিখ সে কি করেছে তা-কি জানিস?

জানি না।আমাকে দামী একটা শাড়ি পাঠিয়েছে। ১২ তারিখ তোর বাবার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল এই উপলক্ষে শাড়ি। এখন ব্যাপারটা আমার জন্যে কতটা অস্বস্তিকর বুঝতে পারছিস? যে বিয়ের অস্তিত্বই নেই সেই বিয়ের দিন আবার কি?ঠিক বলেছ মা।টারের বাবা আমাকে বলল, তুমি তোমার প্রথম হাজব্যান্ডকে নিয়ে কোনো একটা রেস্টুরেন্টে ডিনার করে এসো। ঘণ্টা দুই স্মৃতি রোমণ কর।ভদলোককে কিছু সময় দাও। ভদ্রলোক তোমার হাত ধরতে চাইলে হাত ধরতে দাও। তিনি তোমাকে মিস করেন। কি রকম বিব্রতকর অবস্থা বুঝতে পারছিস?

পারছি।তুই কি তোর বাবাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে পারবি? পারব তবে বলব না।বলবি না কেন? কারণ সমস্যাটা তোমার, আমার না। তোমার সমস্যা তুমি সমাধান করবে। বাবাকে টেলিফোন করে বলবে, স্টপ দিস ননসেন্স। মা টেলিফোন রাখলাম। রূপী ফোনের লাইন কেটে দিন। হারুন তখনি মেয়ের পাশে এসে দাড়ালেন, আগ্রহ নিয়ে বললেন, এতক্ষন তুই কি তোর মার সঙ্গে কথা বলছিলি?

রূপা বলল, হ্যাঁ।কি বলল তোর মা? হাবিজাবি কথা।হাবিজাবি কি কথা? আমি ভাল আছি, তুমি কেমন আছে এই জাতীয় কথাবার্তাকে বলে হাবিজাবি muit আর কিছু বলেনি? না। আমার বিষয়ে তোর মা কিছু বলেছে? না।আজ একটা বিশেষ দিন তো। আমি ভাবলাম এই বিষয়ে তোকে কিছু বলল কি না।বিশেষ দিনটা কি? তোর মার সঙ্গে আজ আমার প্রথম দেখা হয়।তোমাদের তো আর প্রেমের বিয়ে না। প্রথম দেখাটা এত ইস্পর্টেন্ট কেন হবে?

হারুন লজ্জিত গলায় বললেন, তোর মাকে দেখে বাসায় ফিরে বিরাট এক কবিতা লিখেছিলাম। বয়স কম ছিল তো। খানিকটা বোকাও ছিলাম। পুরো কবিতাটা আমার মুখস্ত আছে। শুনবি? রূপা বলল, না শুনব না। তুমি ছাদে চলে যাও। নিজের মনে কবিতা আবৃত্তি করতে থাক। ছাদে অনেক গাছপালা আছে, তারা তোমার কবিতা শুনে মজা পাবে। বাবা প্লিজ।

চারা লাইন শোন। চার লাইন কবিতায় তোর তেমন কোনো ক্ষতি হবার কথা না।রূপা হতাশ গলায় বলল, শুনাও।হারুন সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তি শুরু করলেন। তাকে আনন্দে অভিভূত হতে দেখা গেল। রূপা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল।

আষাঢ়ের কলি ছিল

সময় সন্ধ্যা

চারদিক সুনসান

জীবন বন্ধ্যা॥

গিয়েছিলাম মালিবাগ

বাড়ি নম্বর সাত

কিছু সময় কাটালাম

হয়ে গেল রাত।

আমার এক বন্ধু

নাম সুমন

বলল সে আজ তুমি

থাকে কিছুক্ষণ

শায়লা নামে এক মেয়ে

ঐ বাড়িতে থাকে।

দেখবে তার শান্ত মুখ

কোন এক ফাঁকে…

রূপা বলল, চার লাইন বলার কথা। তুমি দেখি ফেরদৌসির শাহানামা শুরু করেছ। কবিতা বন্ধ।হারুন বন্ধ করলেন না, আগ্রহ এবং আনন্দ নিয়ে আবৃত্তি করতে লাগলেন।

সুমনের কথা সত্য

মিথ্যা মোটেই নয়

শায়লার সঙ্গে আমার

হল পরিচয়॥

রাশেদ বুঝতে পারছে না সে কোথায় আছে। তার গায়ে নীল রঙের কম্বল। কম্বল থেকে ওষুধের গন্ধ আসছে। ফরমালডিহাইডের গন্ধ। HCHO. সোডিয়ামের সঙ্গে ফরমালডিহাইড কি কোন বিক্রিয়া করে?

Na + HCHO কি হয়? আচ্ছা হঠাৎ সোডিয়ামের কথা কেন মনে হল? প্রচুর সোডিয়াম আমরা লবণের কারণে খাচ্ছি। এই সোডিয়াম শরীর কীভাবে বের করে? হেভি মেটাল শরীর বের করতে পারে না। লেড পয়জনিং হয়। মারকারি পয়জনিং হয়, মারকারির ইংরেজি কুইক সিলভার। রাশেদের একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তার নাম সিলভার। না না সিলভার না, অন্য কিছু, সেটাও সিলভার। তা কি করে হয়।আপনি এখন কি একটু ভাল বোধ করছেন? রাশেদ বলল, আমি কোথায়? আপনি হাসপাতালে।ও আচ্ছা হাসপাতাল। আপনি ডাক্তার? জী।রাশেদ বলল, সোডিয়াম অতি রিএ্যাকটিভ একটা ধাতু। আমাদের শরীর ভর্তি সোডিয়াম। এখন…

ডাক্তার বললেন, আপনি কথা বলবেন না। চুপ করে শুয়ে থাকুন। আপনার নিঃশ্বাসের কষ্ট কি কমেছে? অক্সিজেন মাস্ক কে খুলেছে, আপনি নিজেই খুলেছেন?জানি না।আপনার পরিচিত কেউ কি আছে যে আপনার টেক কেয়ার করবে। রাতে আপনার সঙ্গে থাকবে।না।ডাক্তার রাশেদের মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে দিলেন।আপনি চোখ বন্ধ করুন। তাকিয়ে থাকবেন না।

রাশেদ চোখ বন্ধ করল। তারপরেও নানান ধরনের আলো সে দেখতে পাচ্ছে। অনেক দূরে তারার আলোর মতো আলো দেখা যায়। সেই আলো ছুটে কাছে আসছে। ব্যাপারটা কি? আলোর গতিবেগ আমরা জানি। সেকেণ্ডে কত যেন? আচ্ছা অন্ধকারের গতিবেগ কত? আলো হল ফোটন। একটা সোডিয়াম এটমের গায়ে যদি ফোটন এসে আঘাত করে তাহলে কি সোডিয়াম থেকে ইলেকট্রন ছুটে বের হবে?

ফটো ইলেকট্রিক এফেক্ট। যিনি প্রথম ফটো ইলেকট্রিক এফেক্টের ব্যাখ্যা দেন তিনি পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। তার নাম কি বলতে হবে। সময় তিন সেকেন্ড। ওয়ান থাউজেন্ড ওয়ান, ওয়ান থাউজেন্ড টু, ওয়ান থাউজেন্ড থ্রি। তিন সেকেন্ড শেষ। নাম বলতে না পারার জন্যে শাস্তি। কানে ধরে উঠবস কর। তার নাম আইনস্টাইন। এখন বললে হবে না, তিন সেকেন্ড পার হয়ে গেছে। ভিসকোয়ালিফাইড। ইউ লস্ট দ গেম। সেকেন্ড চান্স। এখন বলতে হবে মানুষ ধর মানুষ ভজ গান যে করেছে তার বাবার নাম। হিন্টস দেয়া হবে। তার একটা চায়ের দোকান আছে। তার নামের প্রথম অক্ষর হল সা। এখন রাশেদের মাথায় গান হচ্ছে–

মানুষ ধর মানুষ ভজ শুন বলিরে পাগল মন

মানুষের ভিতর মানুষ করিতেছে বিরাজন।

দুটা লাইন ক্রমাগত বেজে যাচ্ছে। রাশেদ বলল, পানি খাব।

তার পাশে কেউ নেই। রাশেদ আবার বলল, পানি খাব।

এ্যাপ্রন পরা একজন মহিলা এসে দাঁড়িয়েছেন, নিশ্চয়ই ডাক্তার। তার চেহারার সঙ্গে কোথায় যেন পরিচিত একজনের চেহারার মিল আছে। পরিচিত জনের নাম মনে আসছে না। ভুল হয়েছে, পরিচিত জনের নকল নাম মনে আসছে আসল নাম মনে আসছে না।ডাক্তার বললেন, কোন কিছুর প্রয়োজন হলে এই বোতামটা চাপবেন। আমি ছুটে আসব। আমি ডিউটি ডাক্তার। অক্সিজেন মাস্ক আবার আপনি খুলেছেন? রাশেদ বলল, আপনার নাম কি?

রুবিনা।আপনার চেহারার সঙ্গে একজনের চেহারার কোথায় যেন মিল আছে। তার নাম বলতে পারবেন? নাম বলতে পারলে পুরস্কার। বলতে না পারলে তিরস্কার। তিন সেকেন্ড সময়। ওকে স্টার্ট ওয়ান থাঊজেণ্ড ওয়ান, ওয়ান থাউজেন্ড টু, ওয়ান থাউজেন্ড থ্রী। পারলেন না। আপনি ডিসকোয়ালিফাইড। আর সুযোগ দেয়া হবে না। ফ্লাই উইথ দ্য উইন্ড।রাশেদ চোখ বন্ধ করল। মনে হচ্ছে সে দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে।

আচ্ছা সে কি মারা যাচ্ছে? মৃত্যুর আগে নাকি যাপিত জীবন পুরোটা চোখের সামনে ভেসে যায়। যদি সত্যি হয় তাহলে মৃত্যুর এই অংশটা ভালো। দ্বিতীয়বার পুরো জীবনযাপন করা।ঘরের ভেতর কে যেন সিগারেট ধরিয়েছে। সিগারেটের কড়া গন্ধ নাকে আসছে। রাশেদ বাঁ দিকে তাকালো। পায়ের উপর পা তুলে রূপা ব্যানার্জি বসে আছে। তার হাতে সিগারেট।রাশেদ সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল ঘটনা সত্যি না। হাসপাতালের ঘরে সিগারেট খাওয়া যায় না। তার হেলুসিনেশন হচ্ছে।রূপা ব্যানার্জি বলল, মারা যাচ্ছি না-কি?

রাশেদ বলল, জানি না।জানি না বলার জন্যে তাকে ঠোঁট নাড়তে হল না। হেলুসিনেশনের পুরো ব্যাপারটা মাথার ভেতরে ঘটে। ঠোঁট না নেড়েও কথা বলা যায়। চোখ বন্ধ করেও দেখা যায়।রূপা ব্যানার্জি বলল, আমার কাছ থেকে পালিয়ে এসেও তো রক্ষা পাও নি। আমি চলে এসেছি।রাশেদ বলল, হুঁ।আমাকে দেখে খুশি হয়েছ?

রাশেদ বলল, সিগারেট খেও না। গন্ধ নাকে লাগছে।মরেই তো যাচ্ছ। সিগারেটের কড়া গন্ধ থাকুক কিছুক্ষণ। তাছাড়া সিগারেট আমি খাচ্ছি না। আমি খাচ্ছি চুরুট। হাভানা ব্র্যান্ড। একটান দিয়ে দেখবে? না।কিছু হবে না। একটা টান দাও।না রূপা, না।‘না রূপা না’ অনেক শুনেছি। এবার শুনব না।রূপা ব্যানার্জি উঠে দাঁড়িয়েছে। রাশেদের মুখের উপর লাগানো অক্সিজেন মাস্ক টান দিয়ে খুলে সে চুরুট ঠোঁটের ভেতর খুঁজে দিল। রাশেদ তাকে আটকাতে পারল না। তার হাত-পা অনড় হয়ে গেছে।

টান দাও, জোড়ে টান দাও। তোমার নষ্ট ফুসফুস চুরুটের ধোঁয়ায় শুদ্ধ করে নাও। এটা শুদ্ধি প্রক্রিয়া। রাশেদের জগত অন্ধকার হয়ে গেল।এক সময় সে চোখ মেলল। কত সময় সে পার করেছে তা বুঝতে পারছে না। দিন না রাত তা বুঝতে পারছে না। সে বাঁ দিকে তাকালো, রূপা ব্যানার্জি নেই। আধবুড়া একজন কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে বাচ্চা একটা ছেলে। ছেলেটার চোখ বড় বড়। লোকটা কথা বলছে তবে কথা স্পষ্ট না। কিছু বুঝা যাচ্ছে, কিছু বুঝা যাচ্ছে না।

স্যার, আমাকে চিনেছেন? আমি সামছু। আমার দোকানে এক রাইত ছিলেন। আমার পুলাটারে নিয়া আসছি। এর নাম কেনতু।রাশেদ বুঝার চেষ্টা করছে–এই দুটা চরিত্র কি বাস্তব। না তার মাথার কল্পনা। একটা বাচ্চা ছেলের নাম কিন্তু হবে না। কিন্তু কারো নাম হয় না। কাজেই এ দুজন আন রিয়েল। এখন সমস্যা What is reality? মানুষের পাঁচটি ইন্দ্রিয় যা ধরতে পারে তাই কি রিয়েলিটি।

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

রূপা পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

ঢাকা শহর নষ্ট হয়ে গেছে, ছিনতাইকারী, মলম পার্টি, মরিচগুড়া পার্টি। এত রাইতে হোটেলে যাওয়ার চিন্তা বাদ দেন।রাতে থাকব কোথায়? আমার রাতে থাকার কোনো জায়গা নেই।আমার এই দোকানে থাকবেন? আমরা বাপ-বেটায় রাইতে দোকানে থাকি। নয়া একটা লুঙ্গি খরিদ করেছি। সেলাই হয় নাই বইল্যা পরি নাই। লুঙ্গি পেঁচায়া শুইয়া পড়বেন। এক ঘুমে রাইত পার।

আমি খুব আগ্রহের সঙ্গে এবং আনন্দের সঙ্গে আপনার দোকানে থাকব। এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আপনার দয়ার কথা সারাজীবন মনে রাখব।সামছু জিভে কামড় দিয়ে বলল, স্যার কি যে কন। আমি গরিব মানুষ, আমার কি দয়া করার কোনো ক্ষমতা আছে? গরম পানি দেই সিনান করেন।গরম পানি কোথায় পাবেন?

কেতলিতে গরম পানি বলক উঠতাছে। সিনান কইরা দোকানে উঠেন। তারপর খানা।রাশেদের হট বাথের শখ ছিল সে আয়েশ করেই হট বাথ নিল। বালতিতে গরম পানি, মাথায় পড়ছে ঠাণ্ডা পানি। একইসঙ্গে হিমশীতল পানি এবং গরম পানির ধারা স্নান। খেতে বসেও চমক। খিচুড়ি সঙ্গে ডিমের ভর্তা। রাশেদ আনন্দিত গলায় বলল, খিচুড়ি কোথায় পেয়েছেন?

সামছু বলল, বাপ-বেটা না খায়া থাকব? খিচুড়ি সইন্ধ্যা ওয়াক্তে আমরা খাইছি। সকালের নাশতার জন্য কিছু ছিল সেইটা আপনারে দিলাম! খাইতে কি সোয়াদ হইছে স্যার? অমৃতের মতো লাগছে। আপনাকে ধন্যবাদ।আমারে খামাখা ধন্যবাদ দেন কি জন্যে? আল্লাপাক আপনের রিজিক রাখছে এইখানে, প্রত্যেকটা দানার মধ্যে আপনার নাম লেখা।প্রতি দানায় আমার নাম লেখা?

জ্বে। যে দানায় নাম লেখা নাই সেই দানা মুখে দিতে পারবেন না। ভুলক্রমে মুখে দিলেও থু করে ফেলে দিতে হবে। আল্লাহ পাকের এমনই হিসাব।দোকানে পাটিপাতা। তার উপরে পত্রিকার কাগজ বিছানো হয়েছে। সামছু বলল, কম্বলটা গায়ে দেন। গত বছর শীতের সময় দুইটা কম্বল পাইছিলাম। কমিশনার সাব দিছিলেন। রাতটা কষ্টমষ্ট কইরা পার করেন।রাশেদ বলল, আমি খুব আনন্দ করে রাতটা পার করব।সামছু বলল, আমার পুলা কিন্তু গাতক আছে।গাতক কি?

সংগীত যে জানে তারে কয় গাতক। আপনেরে সরম পাইতেছে। সরম ভাঙলে গানে টান দিব। খুব ইচ্ছা ছিল তারে ক্ষুদে গান রাজ-এ দিব। ক্যামনে দিতে হয় জানি না বইল্যা পারলাম না।ক্ষুদে গান কি? টেলিভিশনে পুলাপানের গান। যারা ফার্স্ট সেকেন্ড হয় তারা লাখ লাখ টেকা পায়, বাড়ি পায় তারপর ধরেন লন্ডন যায়, বিলাত যায়।আপনার ছেলে কি ফাস্ট হওয়ার মতো গান গায়?

অবশ্যই। যদি না পায় তাইলে আমি একটা কান কাইট্যা আপনেরে দিয়া দিব। আপনে কুত্তারে দিয়া খাওয়ায় দিবেন। বাকি জীবন এক কান নিয়া ঘুরব। এই ওয়াদা করলাম।রাশেদ বলল, খোকা শুনি একটা গান।পামু না।কেন না?

আমি আপনেরে সরমাই।বৃষ্টির জোড় বেড়েছে। টিনের ছাদে ঝুমুর ঝুমুর শব্দ। রাশেদ বলল, I am a blessed person no doubt of that, what an experience. সামছু বলল, স্যার কি কইছেন বুঝি নাই।বললাম, আমি একজন সুখী মানুষ।সামছু বলল, অনেক বকর বকর করেছি। স্যার ঘুম দেন। মশা নাই। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে মশা আসে না। আর যদিও আসে মশার কয়েল দিয়া দিব।বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে রাশেদ গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। ঘুমের মধ্যেই শুনল কে যেন গান করছে—

মানুষ ধর মানুষ ভজ শুন বলি এ পাগল মন।

মানুষের ভিতর মানুষ করিতেছে বিরাজন॥

সামছুর ছেলে গান করছে। সামছু একটু পর পর বলছে–সব্বাস ব্যাটা। সাব্বাস। স্যার ঘুমায়া পড়ছেন। স্যার জাগনা থাকলে পুরস্কার পাইতি।স্বর্গের অপ্সরাদের আরেক নাম কিন্নর। কিন্নরদের আছে ত্রিকাল ভুলানি কণ্ঠ। হতদরিদ্র সামছুর মাতৃহারা শিশুটি পৃথিবীতে এসেছে কিন্নর কণ্ঠ নিয়ে। সেই কিন্নর কণ্ঠ প্রকাশিত হবার জন্যেই হয়ত বৃষ্টিস্নাত রজনিতে রাশেদের প্রয়োজন ছিল। প্রকৃতি রাশেদকে নিয়ে এসেছে কিন্নর কণ্ঠের কাছে। প্রকৃতি লীলাময়, তার লীলা বোঝা বড়ই কঠিন।

সামছু মিয়া খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে চুলা ধরাল। বৃদ্ধের দলের কেউ কেউ মর্নিং ওয়াকে যাবার সময় তার স্টলে চা খায়। দুধ চিনি ছাড়া লিকার চা, আদা চা এবং লেবু।আজ কেউ আসবে না, এখনো বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ ঘন কালো। দীর্ঘ জীবন পিয়াসী বৃদ্ধের দল আজ এই বৃষ্টিতে বের হবে না। সকালের প্রথম ব্যবসা মার গেল।রাশেদ জেগেছে। তার চোখ খোলা। সামছু বলল, ঘুম ভাল হইছে স্যার? রাশেদ বলল, না। সারারাত আজেবাজে স্বপ্ন দেখেছি।স্বপ্ন কি দেখছেন?

জন্তুর মতো একটা কি যেন কামড়ে কামড়ে আমার পা খাচ্ছে। আমার প্যারালাইসিস। হাত পা নাড়াতে পারছি না। চিৎকার করে কাউকে ডাকতেও পারছি না। গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না।একটা মুরগি ছদকার ব্যবস্থা করেন স্যার।মুরগির ছদকা ব্যাপারটা কি? একটা মুরগি কিনবেন। গরিব মিসকিনরে দিয়া দিবেন। স্বপ্নের দোষ কাটা যাবে। স্যার চা খাবেন? না। আমার ধারণা আমার জ্বর এসেছে। মুখ দিয়ে ভাপ বের হচ্ছে। আপনার কাছে থার্মোমিটার আছে? জ্বর মাপার যন্ত্র?

জ্বে না। আমরা গরিব মানুষ। মাথায় হাত দিয়া জ্বর মাপি।আমার মাথায় হাত দিয়ে জ্বরটা মাপুন তো।সামছু রাশেদের মাথায় হাত রাখল। রাশেদ বলল, জ্বর আছে? আছে। বেশি? জী বেশি। খুব বেশি।আমার নিজেরও তাই ধারণা। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। জনু থেকেই আমার লাংসে কিছু সমস্যা আছে। আপনি কি আমাকে ভালো কোনো হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারবেন? অবশ্যই পারব।ঢাকার সবচে বড় হাসপাতালের নাম কি?

সেটা তো স্যার জানি না।সামছু লক্ষ করল মানুষটার চোখ লাল। ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। মুখ থেকে শাঁ শাঁ শব্দ আসছে।সামছু বলল, কি করি কিছুই তো বুঝতে পারতেছি না। স্যার পানি খাবেন? না। বমি আসছে। আপনি একজন ডাক্তারের ব্যবস্থা করতে পারবেন? স্যার পারব। ডাক্তারের ভিজিট ক্যামনে দিব? আমার কাছে ডলার আছে।রাশেদ কথা শেষ করতে পারল না। বমি শুরু করল। বমির সঙ্গে রক্ত আসছে।

সামছু বলল, ইয়া খোদা এখন কি করি? বাবা কেনতু! এখন করবটা কি? কেনতু বলল, ডাক্তার ডাক। দৌড় দেও।সামছু দোকান থেকে নেমে দৌড়াতে শুরু করল।রূপা ছবি আঁকতে বসেছে। জলরঙের ছবি আঁকার আয়োজন অনেক। পেপারে ট্রিটমেন্ট দিয়ে আয়োজনের শুরু। বাথটাবে হ্যান্ডমেড পেপার ভেজানো হয়েছে। ভেজা কাগজ রোদে খানিকটা শুকিয়ে রঙের প্রথম ওয়াশ দিতে হবে।

জলরঙ ছবির বিষয়বস্তু আগেভাগে ঠিক করা কঠিন। ছবি তার নিজের প্রাণে এগিয়ে চলে। তারপরেও রূপা ঠিক করে রেখেছে তার ছবির মূল বিষয় হবে জানালা। জানালা দিয়ে ঘরে রোদ ঢুকছে এ রকম ছবি। ছবির নাম রোদ্র। কিংবা রোদ। রোদের আলাদা কোনো ইংরেজি প্রতিশব্দ নেই। রোদ হচ্ছে Sunshine, একইভাবে জোছনা Moonshine. কবি-সাহিত্যিকরা নতুন নতুন শব্দ তৈরি করেন। ইংরেজি ভাষার কেউ রোদ এবং জোছনার কোনো প্রতিশব্দ কেন করলেন না ভাবতে ভাবতে রূপা একটা শব্দ নিজেই তৈরি করল, রোদ হল Sube. তার ছবির নাম Sube. কেউ যদি জিজ্ঞেস করে Sube কি? সে বলবে রোদ। একইভাবে জোছনা হল Mube.

রূপা ডিকশনারি খুলল, হয়ত দেখা যাবে sube বলে কোনো শব্দ আছে। Oxford Advanced Learners Dictionary-তে Sube বা Mube নামে কোনো শব্দ নেই। কাজেই ছবির নাম sube রাখা যেতে পারে।আফা, খালুজান আসছে। সাথে একটা মাইয়া নিয়া আসছে। মাইয়াটারে দেইখা মনে হয় দোয়াইতের কালি দিয়া সিনান কইরা আসছে। এমুন কালা মাইয়া আমি বাপের জন্মে দেখি নাই। মা কালীও এই মাইয়ার কাছে ফর্সা।

রূপা উঠে দাঁড়াল। বাথটাবে কাগজ আরো কিছুক্ষণ ভিজলেও ক্ষতি হবে না। এই মুহূর্তে তার ইচ্ছা করছে বাবার ব্যস্ত মুখ দেখতে। বাবা যেখানেই যান মাইক্রোবাস ভর্তি জিনিসপত্র নিয়ে আসেন, কলার কাদি, মানকচু। মাটির হাঁড়িতে জিয়ল মাছ। একবার দুটা রাজহাঁস নিয়ে এসেছিলেন। ছাড়া পেয়েই দুটা হাঁসের একটা ছুটে এসে রূপার হাঁটুতে ঠোকর দিয়েছিল।

রূপা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। হারুন ব্যস্ত ভঙ্গিতে জিনিসপত্র নামাচ্ছেন। একটু দূরে কাপড়ের পুঁটলি হাতে দশ-এগারো বছরের এক বালিকা। বালিকার গাত্রবর্ণ ঘন কালো। তার মুখ গোলাকার। এতই গোল যে দেখে মনে হয় কাঁটা কম্পাস দিয়ে আঁকা।

গোলাকার মুখের সঙ্গে মিলিয়ে বড় বড় গোল চোখ। গোল চোখে আপনাতেই বিস্ময় ভাব চলে আসে। বালিকার চোখের বিস্ময় নেই, বিষণ্ণতা আছে।হারুন রূপার দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যালো ইয়াং লেডি।রূপা বলল, হ্যালো ওল্ড বাবা। এই কি তোমার ঘড়ি-কন্যা? হারুন বললেন, ইয়েস।জীবন্ত ঘড়ি নিয়ে চলে এসেছ? হুঁ। ঘরের টুকটাক কাজ করবে। স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব। পড়াশোনা করবে।বাবা-মা ছেড়ে দিল?

না দিয়ে করবে কি? একবেলা খাওয়া জুটে তো দুই বেলা জুটে না এমন অবস্থা। আমি যখন বললাম, মেয়েটাকে আমার কাছে দিয়ে দাও, তারা মনে হল আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। মেয়েটাকে কাছে ডেকে দুএকটা কথা বল। ঘড়ির সময় জিজ্ঞেস কর। ওর ভয়টা কাটিয়ে দে।সে ভয় পাচ্ছে না বাবা।ভয় অবশ্যই পাচ্ছে। বস্তি থেকে উঠে আসা মেয়ে। প্রথম ঢাকা শহরে এসেছে। ভয় পাবে না মানে? নাম মদিনা! তাই না বাবা? হুঁ। বাবা-মা ডাকে লতি।নাম মদিন, বাবা-মা লতি ডাকবে কেন? আমি জানব কীভাবে? আমাদের বাড়িতে তার স্টেটাস কি?

কাজের মেয়ে? তার স্টেটাস হচ্ছে A gifted child. হারুন গলা উঁচিয়ে ডাকলেন, লতি এদিকে আস। তোমার আপার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই।মদিনা এগিয়ে এল। তার আসার মধ্যে কোনো জড়তা নেই। রূপার আবার মনে হল, নতুন পরিবেশে এসে মেয়েটা মোটেই ভয় পাচ্ছে না। ভয় না পেলেও কৌতূহল থাকবে। মেয়েটার চোখে কৌতূহলও নেই।হারুন বললেন, লতি! রাজকন্যার মতো যে মেয়েটাকে দেখছ সে হচ্ছে আমার মেয়ে। তার কথা তোমাকে বলেছি। ছবি আঁকে। আমার মেয়ের নাম রূপা তাকে তুমি আপা ডাকবে।

রূপা বলল, মদিনা এসো আমার সঙ্গে। আমি জরুরি কিছু কাজ করছি। কাজ করতে করতে গল্প করব।মদিনা মেঝেতে মাথা নিচু করে বসেছে। আরচোখে রূপার কাজ দেখছে। রূপা বাথটাব থেকে ভেজা কাগজ মেঝেতে বিছিয়ে দিল। কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে মদিনার দিকে তাকিয়ে থাকলো। মদিনাও চোখ তুলে তাকালো। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে।রূপা বলল, নতুন জায়গায় এসে তোমার কি ভয় লাগছে?

মদিনা মুখে কিছু বলল না, তবে মাথা নেড়ে জানালো তার ভয় লাগছে। রূপা বলল, ভয় লাগার কিছু নেই। আমার বাবা অত্যন্ত ভাল মানুষ। ভাল মানুষের ছেলেমেয়েরাও ভাল মানুষ হয়। আমিও ভাল মেয়ে।মদিনা বলল, আপনি যে ভাল মেয়ে আমি জানি।রূপা বলল, কীভাবে জান? মদিনা জবাব দিল না।

রূপা বলল, এ বাড়িতে তোমার প্রধান কাজ কি হবে জান? তোমার প্রধান কাজ হবে আমাকে সাহায্য করা। কাগজ পানিতে ভেজানো, শুকানো, বোর্ডে কাগজ বসিয়ে টেপ লাগানো, রঙের টিউবের মুখ বন্ধ করা, ব্রাশ পরিষ্কার করা এইসব। আমি কি করি দেখবে। দেখে দেখে শিখবে।

মদিনা ঘাড় কাত করে জানালো সে শিখবে।তুমি কি লেখাপড়া জান? ক্লাস ফাইভ পাস করছি।খুব ভাল। এখন তুমি একটা কাজ কর। তোমার এই মুহূর্তে কি কি লাগবে একটা কাগজে লিখে আমার কাছে দাও। আমি আনিয়ে দেব। একই সঙ্গে তোমার হাতের লেখারও একটা পরীক্ষা হবে।আমার কিছু লাগবে না।

অবশ্যই লাগবে। তুমি খালি পায়ে এসেছ। তোমার একজোড়া স্যান্ডেল লাগবে। টুথপেস্ট, ব্রাশ লাগবে। মুখে মাখার ক্রিম লাগবে, নারিকেল তেল লাগবে, সাবান, তোয়ালে লাগবে।মদিনা হাসল। রূপা লক্ষ করল মেয়েটার হাসি অস্বাভাবিক সুন্দর। বেশির ভাগ মানুষ যখন হাসে শুধু তাদের ঠোঁট হাসে। চোখ হাসে না। এই মেয়েটার ঠোঁট এবং চোখ একসঙ্গে হাসছে।আফা একটা কথা বলব? বল।আপনার এই বাড়িতে ভূত আছে।তাই নাকি? জী। খারাপ ভূত।ভূতের ভাল-খারাপ আছে? হুঁ।তুমি কি ভূতটাকে দেখতে পাচ্ছি?

হুঁ! ঘরের কোনায় খাড়ায়া আপনার দিকে তাকায়াছিল। এখন নাই।রূপা হাতের কাজ বন্ধ করে কিছুক্ষণ মদিনার দিকে তাকিয়ে বলল, মদিনা শোন, ভূত-প্রেত, রাক্ষস-খোক্কস এইসব পৃথিবীতে নেই। মানুষ কল্পনা করতে ভালবাসে বলে এইসব কল্পনা করে। তুমি এখন মলিনার কাছে। যাও। মলিনা দেখিয়ে দেবে তুমি কোথায় থাকবে। তোমাকে যে লিস্ট করতে বলেছি লিস্টটা করবে। মলিনাকে বল আমাকে এক কাপ চা বানিয়ে দিতে। তুমি কি চা বানাতে পার? না।মলিনার কাছ থেকে শিখে নেবে কীভাবে চা বানাতে হয়। পারবে না?

পারব।রূপা মদিনার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ অন্য রকম গলায় বলল, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বল কয়টা বাজে।মদিনা বলল, বলতে পারব না।বাবা বলছিল, জিজ্ঞাস করা মাত্র তুমি সময় বল।সবসময় পারি না। মাঝে মাঝে পারি।আচ্ছা যাও।

মদিনা উঠে দাঁড়াল। নীচু গলায় বলল, আফা ভূতটা আবার আসছে। ঐ যে কোনায় খাড়ায়া আছে।রূপা বলল, ভূত ভূতের মতো দাঁড়িয়ে থাকুক। তোমাকে যা করতে বলেছি কর।দুপুরে খেতে বসে হারুন বললেন, ঐ ছেলে রাশেদ না ফাসেদ কি যেন নাম, সে কি তার জিনিসপত্র নিয়ে গেছে? রূপা বলল, না।কতদিন হল গেছে? তিন দিন দুই রাত।টেলিফোনে কোনো খোঁজ খবর করেছে?

না।হারুন বিস্মিত হয়ে বললেন, আশ্চর্য তো।রূপা বলল, আশ্চর্যের কিছু নেই। উনি ইচ্ছা করেই এটা করছেন। আমার উপর মানসিক চাপ দেয়ার চেষ্টা। জিনিসপত্র ফেলে রেখে Mental pressure. তোকে মেন্টাল প্রেসার সে কেন দিবে? তুই তার কে? আমি তার কেউ না। তিনি আমার উপর মানসিক চাপ কেন দেবেন তাও। জানি না। হয়তো তিনি এক ধরনের খেলা খেলছেন। কিছু মানুষ আছে, আশেপাশের মানুষদের নিয়ে খেলতে পছন্দ করে, যেমন তুমি।আমি?

তুমি জীবন্ত ঘড়ি নিয়ে চলে এসেছ। এটা তোমার খেলার একটা অংশ। তাকে নিয়ে এসেছ তোমার সব আগ্রহের সমাপ্তি।তোর জ্ঞান তো বেশি হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন পর তোকে আর রূপা ডাকা যাবে না। ডাকতে হবে জ্ঞান রূপা।জ্ঞান রূপা নাম আমার পছন্দ হয়েছে। বাবা থ্যাংক য়্যু।ঐ ছেলেকে খুঁজে বের করতে হবে। আমার নেক্সট প্রজেক্ট–অপারেশন রাশেদ কিংবা ফাসেদ হান্ট।

রূপা বলল, ঢাকা শহরে এক কোটি মানুষ বাস করে। কেউ যদি এক কোটি মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে চায় সে সারাজীবন লুকিয়ে থাকতে পারবে।হারুন বললেন, কোনো বুদ্ধিমান লোক চেষ্টা করলে খুঁজে বের করতে পারবে।রূপা বলল, বাবা তুমি বুদ্ধিমান মানুষ না। তুমি পারবে না।আমি বুদ্ধিমান না? না। যে কবিতায় ইতিহাসের বই লেখে সে বুদ্ধিমান না।হারুন কঠিন গলায় বললেন, আমি গাধা মানব?

রূপা বলল, বাবা তুমি রেগে যাচ্ছ।আমি তাকে কীভাবে খুঁজে বের করব শোন–ছবি দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেব। শিরোনাম হবে–রাশেদ কিংবা ফাসেদ তোমাকে খুঁজছি।রূপা বলল, বারবার রাশেদ কিংবা ফাসেদ বলবে না। তার নাম রাশেদ। এখন বল তার ছবি কোথায় পাবে? থানায় ডায়েরি করাব। পুলিশ ছবি জোগাড় করবে।তোমার কি ধারণা ডায়েরি করানোর সঙ্গে সঙ্গে থানার সব পুলিশ হাতে রাশেদ সাহেবের ছবি নিয়ে তাকে খুঁজতে বের হয়ে যাবে?

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

রূপা পর্ব – ১ হুমায়ূন আহমেদ

দোতলায় রূপাদের তিনটা কামরা। একটায় তার বাবা থাকেন। সেটা সবচে ছোট। বড় ঘরে তার নাকি ফাপড় লাগে। ঘুম ভাঙলে মনে হয় মাঠে শুয়ে আছেন। তার ধারণী শোবার ঘর এমন হবে যে বিছানায় শুয়ে সবকিছু হাতের নাগালে পাওয়া যাবে। বুকশেলফ, টেবিল, ওয়ারড্রোব সব থাকবে বিছানার সঙ্গে লাগানো।দোতলার বিশাল সাইজের দুটা ঘরই রূপার। একটাকে রূপা ছবি আঁকার স্টুডিও বানিয়েছে।

এই ঘরের ছোট দুটা জানালা ভেঙে বড় একটা জানালা করা হয়েছে। ঘরে প্রচুর আলো আসে। এই ঘরের সঙ্গে টেরাসের মতো আছে। টেরাসে সুন্দর বাগান। এক কোনায় বিশাল চৌবাচ্চা বানানো হয়েছে হারুন সাহেবের উৎসাহে। সেখানে দেশী মাছ ছাড়া হয়েছে, শিং, মাগুর, কৈ, তেলাপিয়া মাছগুলি আনন্দে আছে। হারুন চৌবাচ্চা আরো বড় করে সেখানে গলদা চিংড়ি চাষের চেষ্টা করার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন। রূপা রাজি হচ্ছে না। সে বলেছে বাড়ির ছাদে পুকুর বানানোর কিছু নেই। ছাদ হচ্ছে সুন্দর বেড়ানোর একটা জায়গা। সেখানে মাছ চাষ করতে হবে কেন?

হারুন বলেছেন, মাছ কি অসুন্দর? মাছ অসুন্দর না। চৌবাচ্চা থেকে ছিপ দিয়ে তোমার মাছ ধরাটা অসুন্দর।অসুন্দরকে বাদ দিয়ে সুন্দর হয়? বাবা তোমার সঙ্গে আমি বাজে তর্কে যাব না। যাবি না কেন? কোনো একটা তর্কে গেলেই তুমি টিচার ভাব ধরে ফেল। ক্লাসে বক্তৃতা দিচ্ছ এরকম ভঙ্গি। আর আমি যেন তোমার ছাত্রী। তাও বুদ্ধিমান কোনো ছাত্রী না। বোকা ছাত্রী।

রূপা যদিও বলে মাছের চৌবাচ্চা তার খুব অপছন্দ, ঘটনা তা না। সে চৌবাচ্চার পাশে বসে মাছ দেখে অনেকটা সময় কাটায়। গত মাসে মাছের একটা জল-রঙ ছবি এঁকেছে। ছবিতে একটা ড়ুবন্ত মাছের গায়ে আলো পড়েছে। ছবির নাম–জনে মীন রাশি। পুরো ছবিতে একটাই রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। নীল রঙের নানান শেড।হারুন ছবি দেখে বলেছেন, নামের অর্থ কি? জন্মে মীন রাশি বলতে তুই কি বুঝাচ্ছিস?

ছবিটা দেখে তোমার কেমন লাগছে সেটা বল। নাম কোনো ব্যাপার না।হারুন বললেন, দর্শক নামের সঙ্গে ছবি রিলেট করবে। নাম ব্যাপার হবে না কেন? মনে কর আমি একটা গোলাপের ছবি এঁকে ছবির নাম দিলাম হংস ডিম্ব! তার কোনো অর্থ হবে? বাবা! ধরে নাও ছবিটার কোনো নাম নেই। এখন বল ছবি কেমন লাগছে।

হারুন গম্ভীর গলায় বললেন, ছবি দেখে মনে হচ্ছে পেইন্টারের কাছে নীল রঙের একটা টিউবই ছিল। সে তা দিয়েই ছবি আঁকার চেষ্টা করেছে। চেষ্টা খুব যে সফল হয়েছে তাও না।বাবা তুমি ইতিহাস বুঝ, ছবি বুঝ না।সেটাই তো স্বাভাবিক রে মা। তোরা যারা ছবি আঁকিস তারা ছবি বুঝবি। ইতিহাস বুঝবি না।বাবা, আমি ওয়াটার কালারে গোল্ড মেডেল পাওয়া মেয়ে।

ক্রিয়েটিভ ক্ষেত্রে গোল্ড মেডেল কোনো কাজের কথা না। পিকাসো কখনো গোল্ড মেডেল পান নি। জয়নুল আবেদিন কোলকাতা আর্ট স্কুল থেকে পাস করেছিলেন। তার রেজাল্ট ভাল ছিল না। পাকিস্তানের ওরিয়েন্টাল পেইন্টার আবদুর রহমান চুঘতাই আর্ট কলেজের পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন।বক্তৃতা বন্ধ কর বাবা।শেষ কথাটা শোন Louvre Museum-এ ভারতবর্ষের মাত্র একজন পেইন্টারের ছবি আছে। তিনি কখনো আর্ট স্কুলে বা কলেজে পড়েন নি। তার নাম জানতে চাস? না।জেনারেল নলেজ বাড়াবি না? না।

তার নাম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের কে হন সেটা বল।আমি জানি না। দয়া করে এখন চুপ কর।আচ্ছা যা চুপ করলাম। জন্মে মীন রাশি নিয়ে মন খারাপ করিস না। যখন ভাল ছবি আঁকবি আমিই প্রথম বলব।তোমার কিছু বলার দরকার নেই। রূপা বসে আছে চৌবাচ্চার দক্ষিণ দিকে। আকাশে মেঘ জমছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। চৌবাচ্চার পানিতে বিদ্যুৎ চমকের প্রতিবিম্ব পড়ার সঙ্গে মাছদের জগতে এক ধরনের আলোড়ন তৈরি হচ্ছে।

রূপার দেখতে মজা লাগছে। মাছরা ভয় পাচ্ছে। সবচে বেশি ভয় পাচ্ছে তেলাপিয়াগুলি। বিদ্যুৎ চমকের সঙ্গে সঙ্গে এরা লাফিয়ে পানি থেকে শূন্যে উঠে যাচ্ছে। একটা মাছ তো রূপার কোলে এসে পড়তে পড়তে পড়ে নি।রূপাদের দোতলা বাড়িটা কলাবাগানের ভেতরের দিকে। তাদের বাড়ির পাশ দিয়েই ভূতের গলি গিয়েছে। রূপার দাদা এক বিঘা জমিতে ছোট্ট একটা দোতলা বাড়ি বানিয়ে বাড়ির নাম দিয়েছিলেন ভূতের বাড়ি। তিনি বৃক্ষপ্রেমিক মানুষ ছিলেন। বাড়ি ঘিরে নানান ধরনের গাছপালা লাগিয়েছিলেন।

ভূতের বাড়ি নামকরণের জন্যেই কি-না কে জানে এই বাড়িতে ভূতের খুব উপদ্রপ শুরু হয়। নিশিরাতে ছাদে নূপুর পায়ে হাঁটার শব্দ। ঝড় নেই, বাতাস নেই, আপনাআপনি জানালা বন্ধ হচ্ছে, খুলছে। রান্নাঘরের মিটসেফের সব খাবার দেখা যায় রান্নাঘরময় ছড়ানাে।রূপার দাদা হাজী শরিফউদ্দিন নিজেও একদিন ভূতের হাতে পড়লেন। রাতে বাথরুমে গিয়েছেন।তারপর আর বাথরুম থেকে বের হতে পারেন না। দরজা খুলে না। তিনি ছিলেন দোতলায় একা। এক তলায় একজন দারােয়ান আর রান্নার ছেলে। শরিফউদ্দিন চিৎকার করে গলা ফাটাচ্ছেন। কেউ শুনছে না।

দরজা খুলল ফজরের আযানের পর। শরিফউদ্দিন বাড়ি ছেড়ে গ্রামে চলে গেলেন। ভূতের বাড়ি পরিত্যক্ত হয়ে গেল।রূপার জন্মের পর বাড়ির নাম বদলে হারুন বসবাস শুরু করলেন। বাড়ির নতুন নাম হল রূপা। রূপার ধারণা তাদের বাড়িতে এখনাে ভূত আছে তবে ভূতদের আগের সেই ক্ষমতা নেই। আশেপাশে বিশাল সব অ্যাপার্টমেন্ট হাউস হওয়ায় তারা কোনঠাসা হয়ে আছে।বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। রূপা দোতলা থেকে একতলায় নামল। মলিনার সঙ্গে সিঁড়ির গােড়াতেই দেখা। মলিনা বলল, আফা খানা লাগামু? উনি বিদায় হয়েছেন?

জ্বে না। একবার আমারে বললেন, ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি দাও। পানি দিলাম। পানি খাইয়া আবার ঘুম। আমারে বললেন, তােমার নাম মলিনা, অর্থাৎ মলিন। নামটা সুন্দর না। এখন থেকে আমি তােমাকে ডাকব মলি। আমি বললাম, ভাইজান আপনের যা মনে চায় ডাকবেন। আমার কোনাে সমস্যা নাই। আমারে মহারানী ডাকলেও যা, মরনি ডাকলেও তা।রূপা বলল, তুমি কি তাকে বলেছ যে উনি ভুল ঠিকানায় এসেছেন ?

বলার সুযোগ কই পাইলাম আফা। উনি আছেন ঘুমের মধ্যে। আমারে বলেছেন প্লেইনে উঠলে কি জানি হয়। তখন খালি ঘুম ধরে। দুই তিন দিন সমানে ঘুমাইতে হয়। আজব ব্যাপার না আফা? আল্লাহ বাচাইছে যে আমি কোন দিন প্লেইনে উঠি নাই।হারুন আবার টেলিফোন করেছেন। তাঁর উদ্বিগ্ন গলা শোনা গেল। ব্যাটা বিয়ে হয়েছে? না।কেন? কি করছে? ঘুমাচ্ছে।রূপা! তুই ঠিক করে বল তো সমস্যা কি?

আমি তেমন কোনো সমস্যা দেখছি না। জেট লেগের ধাক্কায় পড়ে ঘুম দিয়েছে। তার ঘুম ভাঙানো যাচ্ছে না।আমি টেলিফোন ধরে আছি–যা থাপ্পড় দিয়ে ঘুম ভাঙ্গা। কষে থাপ্পড় দিবি যেন আমি টেলিফোনে থাপ্পড়ের শব্দ শুনতে পাই।বাবা অস্থির হয়ো না।অজানা অচেনা একজন ট্রেসপাস করেছে আমি অস্থির হব না? না। কারণ এতদূর থেকে অস্থির হয়ে তুমি কিছু করতে পারবে না। যে ট্রেসপাস করেছে সে কোনো সন্ত্রাসী না।বুঝলি কি করে?

চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছি।চোখের ডাক্তার হয়ে গেছিস? ফাজিল মেয়ে। পাঁচ মিনিট সময় দিলাম, এর মধ্যে যন্ত্রণা বিদায় করবি। পাঁচ মিনিট পর আবার টেলিফোন করব।বাবা, তোমার ঐ আধ্যাত্মিক ক্ষমতাধর মেয়ের বিষয়ে একটা কথা জানতে চাচ্ছি। তোমার রাগ একটু কমিয়ে প্রশ্নের জবাব দাও।কি জানতে চাস? মনে কর তুমি মদিনার কাছে গেলে। তোমার হাতে হাতঘড়ি সেখানে বাজে বঁটা, পকেটে আছে পকেট ঘড়ি। তার টাইম সেট করা হয়েছে আটটায়। তোমার সঙ্গের মোবাইল টেলিফোনের ঘড়িতে নয়টা। এখন মদিনা কোন সময়টা বলবে?

এই পরীক্ষা তো করি নি। ইন্টারেস্টিং পরীক্ষা।বাবা! তুমি ইন্টারেস্টিং ঘড়ি পরীক্ষা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে থাক। এখানে কি হচ্ছে তা নিয়ে মাথা ঘামিও না। আমি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী মেয়ে।মেয়েদের বুদ্ধি কাজে লাগে না।বুদ্ধি কাজে লাগাতে পারলেই কাজে লাগে। বেশির ভাগ মানুষ কাজে লাগাতে পারে না। বাবা টেলিফোন রাখি ঐ লোকের ঘুম মনে হয় ভেঙেছে।

রাশেদ গেস্টরুম থেকে বসার ঘরে এসেছে। রূপাকে দেখে বলল, আপনি বললে হয়ত বিশ্বাস করবেন না, আমার জীবনটা ভুলে ভর্তি। ছোটখাটো ভুল না। বড় বড় ভুল। আপনি যখন বললেন, আপনার নাম রূপা তখনই আমার বুঝা উচিত ছিল, যে ঠিকানায় আমার যাবার কথা সে বাড়ির মেয়েটির নাম রুনা। রুনার সঙ্গেও আমার কথা হয়েছিল। একবার না অনেক বার। যাই হোক, আমি তিন মিনিটের মধ্যে বিদায় হচ্ছি।

রূপা বলল, এখন রাত দশটা চল্লিশ। বাইরে ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। এই অবস্থায় বের হবেন এবং ভুল করে আবারও অন্য একটা বাড়িতে উঠবেন। সেই বাড়ির মেয়ের নাম হয়ত রুমা। তাকে ব্রাজিলের চকলেট দেবেন, ভয়েস রেকর্ডার দেবেন। এটা ঠিক হবে?

আমি হোটেলে উঠব। দিনে ঠিকানা খুঁজে বের করব।যাদের কাছে যাচ্ছেন তাদের টেলিফোন নাম্বার নিশ্চয়ই আছে। তাদের টেলিফোন করে দিন তারা এসে আপনাকে নিয়ে যাক।টেলিফোন বুক আনতে ভুলে গেছি।ভাল করেছেন। আসুন খেতে বসি। খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ুন। সকালে ঘুম থেকে উঠে চলে যাবেন।থ্যাংক য়্যু। তুমি খুবই ভাল মেয়ে।আমাকে তুমি তুমি করে বলবেন না। তুমি বলার মত ঘনিষ্ঠতা আপনার সঙ্গে আমার হয় নি।সরি।যান হাত মুখ ধুয়ে আসুন। আমরা ডিনার করি। ক্ষিধে লেগেছে না?

হুঁ।রূপা খাবার টেবিলের দিকে রওনা হল। তার মোবাইল ফোন বাজতে শুরু করেছে। হারুন টেলিফোন করেছেন। রূপা ধরল না। খাওয়া-দাওয়া শেষ হোক তারপর বাবাকে সব জানানো যাবে।মলিনা শুকনা মুখে খাবার ঘরে ঢুকে বলল, আফা উনি তো চলে গেছেন। জিনিসপত্র সব ফালায় ধুইয়া বৃষ্টির মধ্যে রওনা।সে কি! আমি বললাম, বৃষ্টির মধ্যে যান কই? উনি বললেন, হোটেলে। তারপর ইংরেজিতে কি যেন বললেন। মনে হয় ভাবছেন আমি ইংরেজি জানি। আমিও ভাব ধরলাম ইংরেজি জানি। আমি বললাম, ইয়েস। ইয়েস।

রূপা বলল, কথা বন্ধ করে খাবার দাও। আগে মোমবাতি জ্বালাও। যে রকম ঝড়-তুফান হচ্ছে এক্ষুণি কারেন্ট চলে যাবে।কারেন্ট গেল মোমবাতি জ্বালানোর পর। রূপা টেলিফোন করল তার বাবাকে।বাবা, ঢাকায় ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে–তোমার দিকের খবর বি কি হচ্ছে।না। ঐ লোক কি গেছে?

হ্যাঁ বাবা, চলে গেছে। তুমি শোকরানা নামাজ পড়তে পার।ভেরি গুড। আমি তো টেনশানে পড়ে গিয়েছিলাম ভদ্রলোক তিনটা স্যুটকেস ফেলে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় নেমেছে। রাস্তাঘাট কিছুই চিনে না, কোথায় যাবে কে জানে। হয়ত মলম পার্টির হাতে পড়বে মলম পার্টি চোখে মলম ডলে মানিব্যাগ নিয়ে চলে যাবে। কিংবা ক্ষুর পার্টির হাতে পড়বে। তারা পেটে ক্ষুর বসাবে। রাস্তায় মরে পড়ে থাকবে।এত রাতে ছাড়লি কেন?

বাবা! তোমার কি এখন মায়া লাগছে।হারুন চুপ করে রইলেন। রূপা বলল, তোমার মায়া লাগছে তার কারণ কি জান বাবা? তার কারণ লোকটা তার সবকিছু ফেলে গেছে। জিনিসপত্র সব নিয়ে গেলে মায়া লাগত না। এই লোক কিন্তু তার জিনিসপত্র নিতে ফিরে আসবে না।কীভাবে জানিস ফিরে আসবে না।তুমি তো প্যারানরমাল ক্ষমতাধর মানুষের খোঁজে সারা দেশ ঘুরে বেড়াও, তোমার নিজের মেয়েরই যে এই ক্ষমতা আছে তা জান না। বাবা রাখি? প্রচণ্ড ক্ষিধে লেগেছে।কি রান্না করেছে?

জানি না কি রান্না করেছে। তোমার সঙ্গে কথা বলতে আর ভাল লাগছে রূপা লাইন কেটে দিল। হারুন লাইন কাটার পরেও হ্যালো হ্যালো করতে লাগলেন।রাস্তার মোড় পর্যন্ত যেতেই রাশেদ পুরোপুরি ভিজে গেল। বৃষ্টির পানি বরফের মতো ঠাণ্ডা। দমকা বাতাস। বাতাস পেছন দিক থেকে আসছে। তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। রাশেদের একবার মনে হল সে ফিরে যায়। হট সাওয়ার নিয়ে খেয়েদেয়ে কম্বল গায়ে শুয়ে থাকে। রূপাদের বাড়ি খুঁজে বের করা সমস্যা না।

গাছপালায় ভর্তি বাড়ি। বাড়ির নাম রূপা। ফিরে গেলেই হয়, রূপা যদি জিজ্ঞেস করে, চলে গিয়েছিলেন কেন? তখন সত্যের মতো করে কিছু মিথ্যা বলতে হবে। যেমন হঠাৎ সিগারেট খাবার ইচ্ছা করল। ডিনারের শেষে সিগারেট খাব। এই জন্যেই সিগারেটের সন্ধানে গিয়েছিলাম। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে পড়ব ভাবিনি।রাশেদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মাথার ভেতরের লজিক অংশ বলছে ফিরে যাও। আবেগ অংশ বলছে না।

রূপার ওপর হঠাৎ রাগ উঠে যাওয়াতেই সমস্যা হয়েছে। এমন মিষ্টি চেহারার একটা মেয়ে, কি কোমল গলার স্বর, সে কি করে বলে, আমাকে তুমি তুমি করে বলবেন না। তুমি বলার মতো ঘনিষ্ঠতা আপনার সঙ্গে আমার হয়নি। সে কি ভেবেছে ঘনিষ্ঠতা করার জন্যে তুমি বলা? মেয়েটিকে অনেকগুলি কারণে তুমি সে বলতে পারে। কারণগুলো ভাবতে ভাবতে হাঁটা যাক। কোনকিছু নিয়ে ব্রেইনকে ব্যস্ত রাখলে সে ঝড়-বৃষ্টি তুচ্ছ করবে। ক্ষিধের কষ্টও কমিয়ে দেবে। আচ্ছা এখন তুমি সমস্যা–

আমি বয়সে তোমার চেয়ে বড়। কাজেই তুমি বলেছি। এটা বড় কোনো অন্যায় না। অসৌজন্যমূলক কোনো আচরণও না। সামাজিকভাবে স্বীকৃত আচরণ ব্যবস্থা।আমি যে দেশে বাস করছি সেখানে আপনি তুমি তুই নেই। সবাই তুমি। আমার ভুল সেখান থেকেও হতে পারে।কোনো মানুষই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ না। সবার সঙ্গে সবার সম্পর্ক। তুমি আমার সঙ্গে অত্যন্ত ভদ্র ব্যবহার করেছ। ভুল করে তোমার বাড়িতে উঠে পড়েছি জেনেও তুমি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বের করে দাওনি।

বরং ঝড়-বৃষ্টিতে বের না হয়ে রাতে ডিনার করে থেকে যেতে বলেছ। কাজেই তোমার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়নি তা-না। ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। এই ঘনিষ্ঠতার কারণে আমি তোমাকে তুমি বলতে পারি।আচ্ছা ঠিক আছে ধরে নিলাম আমি তোমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করার জন্যে তুমি বলেছি। এতেই সমস্যা কি? মানুষের স্বভাব হচ্ছে ঘনিষ্ঠ হওয়া। দূরে সরে যাওয়া না।রাশেদের হঠাৎ পা পিছলালো।

সে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। কাদায় পানিতে মাখামাখি হয়ে উঠে দাড়াল। বিদেশের অচেনা পথঘাটে সাবধানে হাঁটতে হয়। বাংলাদেশ এখন তার কাছে বিদেশ। তার পাসপোর্ট আমেরিকান। তার অনেক সাবধানে হাঁটা উচিত ছিল।ঠাণ্ডায় শরীরে কাঁপুনি উঠে গেছে। বুকে ঠা না বসলেই হল। তার লাংসে সমস্যা আছে। যে পরিমাণ রক্ত তার লাংসের পরিষ্কার করার কথা সে পরিমাণ করতে পারে না।

চারদিক জনশূন্য। এমন কিছু রতি হয়নি যে সব লোকজন ঘরে ঢুকে খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ঝড়-বৃষ্টির দেশ। সামান্য দমকা বাতাসে শহরের পথঘাট জনশূন্য হবার কথা না। রাশেদ অন্যমনস্কভাবে কিছুদূর হাঁটল। রাস্তার মাথায় একটা চায়ের দোকান দেখা যাচ্ছে। চুলায় আগুন জ্বলছে। আগুন দেখা যাচ্ছে। দোকানি চাদর গায়ে দিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। দোকানির সঙ্গে ছয় সাত বছরের একটা ছেলে। সে একই চাদরের নিচে। সম্ভবত দোকানির ছেলে। রাশেদ এগিয়ে গেল।শীতে তার শরীর কাঁপছে। দাঁতে দাঁত লেগে কটকট শব্দ হচ্ছে। রাশেদ বলল, আমাকে আগুন গরম এক কাপ চা খাওয়াতে পারবেন?

দোকানি বলল, পারব স্যার। ইশ আপনার কি অবস্থা! পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম।আপনার কপাল কাটছে? রক্ত পড়তাছে।পড়ুক রক্ত। আপনার দোকানে খাবার কি আছে? আমি খুব ক্ষুধার্ত। দুপুরে লাঞ্চে দিয়েছিল স্যালমন মাছ। মাছ খেতে পারি না বলে খাইনি। এখন ক্ষুধায় মারা যাচ্ছি।কেক আছে, খাবেন? কেক কিন্তু টাটকা না, বাসি।কত দিনের বাসি? এক হপ্তা।কেক বাদ। আর কি আছে? ডিম আছে। ডিম সিদ্ধ করে দিলে খাবেন?

হ্যাঁ খাব। থ্যাংক য়্যু।আপনে বাইরে দাঁড়ায়া বিষ্টিতে ভিজতেছেন। ভিতরে আসেন। একটা গামছা দেই। মাথাটা মুছেন।থ্যাংক য়্যু এগেইন। ভাই আপনার নাম কি? সামছু।সামছু আমি একটা জরুরি কথা বলতে ভুলে গেছি। আমার সঙ্গে বাংলাদেশি কোনো টাকা নেই। আমেরিকান টাকা আছে, ডলার।স্যার টেকা পরে দিয়েন অসুবিধা নাই। আপনে কই মেলা দিছেন? মেলা দিছেন মানে কি? যান কই?

ভাল কোনো হোটেলে যাব। রাতটা হোটেলে থাকব।সামছু চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। কেটলিতে দুটা ডিম ছেড়ে দিতে দিতে বলল, সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস আছে স্যার? একটা সিগারেট দেই। টান দিলে শীতটা কমব।সিগারেট খাই না।স্যার গরিবের একটা কথা কি শুনবেন? অবশ্যই শুনব।

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

দিঘির জলে কার ছায়া গো শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

মুহিব এখন আছে তার অতি পছন্দের একজন মানুষের সঙ্গে। তার নাম নিলি। এর মধ্যে আমি উপস্থিত হব না।নিলি বলল, আমি একটা ভুল করেছি। এত সুন্দর নাটক হয়েছে। আপনার উচিত ছিল লীলাকে পাশে নিয়ে দেখা। আমি একটা তুচ্ছ অজুহাতে আপনাকে আটকে রেখেছি। সরি। আমি ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলছি। আপনি লীলার কাছে যান। বিশাল একটা ফুলের তোড়া কিনবেন। চকলেট কিনবেন। এবং তাকে একটা বিশেষ কথা খুব গুছিয়ে বলবেন।কী কথা বলব?

আমি বলে দিচ্ছি কী বলবেন। আজ যতটা সুন্দর করেছেন, লীলার সঙ্গে অভিনয় যেন তারচেয়ে সুন্দর হয়। কথাগুলি যেন হৃদয়ের গভীর থেকে বের হয়ে আসে। পারবেন না।পারব।আপনি বলবেন, লীলা! আমি নিতান্তই দরিদ্র একজন ছেলে। চোখে আশা এবং স্বপ্ন ছাড়া আমার আর কিছুই নেই। আমার চারদিক অন্ধকার। তবে আমার বিশ্বাস, তুমি যদি একটা মশাল হাতে আমার পাশে এসে দাড়াও আমি অনেক দূর যাব। বলতে পারবেন?

জি মাডাম, পারব।অভিনয় করে দেখান। মনে করুন এটা চকলেটের বাক্স। আর এই হচ্ছে ফুল। মনে করুন আমি লীলা। কলিংবেল বেজেছে। আমি দরজা খুললাম, ক্যামেরা রোল করছে। অ্যাকশান।মুহিব কথাগুলি বলল। তার চোখ পানিতে ভর্তি হয়ে গেল। সে একবার চোখও মুছল।নিলি বলল, খুব সুন্দর হয়েছে। ছোট্ট একটা ভুল হয়েছে। একটা পর্যায়ে লীলার হাত ধরা প্রয়োজন ছিল। মূল জায়গায় ভুলটা করবেন না।মুহিব বলল, ভুল করব না।

নিলি বলল, একটি মেয়ের ভালবাসাকে আমি যুদ্ধের ট্যাংকের মতো মনে করি। সত্যিকার প্রেমিক-প্রেমিকা ট্যাংকের কঠিন বর্মের ভেতর থাকে। কোনো চড়াইউতরাই ট্যাংককে আটকাতে পারে না। আমার কথা না। আমি এত গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। মনে হয় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কথা। উপন্যাসের নাম ফেয়ারওয়েল টু দা আর্মস কিংবা ফর হুম দা বেল টেলস।

মুহিব লীলাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ফুল নেই। চকলেটের বাক্সও নেই। দোকান বন্ধু হয়ে গেছে বলে কিনতে পারে নি। মুহিব লীলাদের বাড়িতে ঢুকছে না। কারণ গাড়িবারান্দায় আহসান সাহেবের প্রকাও গাড়িটা দেখা যাচ্ছে।আজ সারাদিন বৃষ্টির ছিটেফোঁটা ছিল না। এখন টিপটিপ করে পড়তে শুরু করেছে। আহসানের গাড়ি গেট দিয়ে বের হচ্ছে। মুহিব উল্টোদিকে তাকাল যেন তাকে দেখা না যায়। গাড়ি মুহিবের সামনে এসে থামল। গাড়ির কাচ নামিয়ে আহসান মুখ বের করল।

মুহিব সাহেব, লীলার কাছে যাবেন তো? চলে যান। এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আপনার নাটক দেখে লীলা খুব কেঁদেছে। আমারও চোখের পানি ফেলার ইচ্ছা ছিল। পুরুষমানুষ বলে ফেলতে পারি নি। পুরুষদের errotion দেখানোর অনেক।imitation. গাড়িতে উঠুন, আপনাকে নিয়ে একটা লং ড্রাইভ দেব, তারপর নামিয়ে দেব লীলাদের বাড়ির সামনে।

মুহিব গাড়িতে উঠল।গাড়ি ঝড়ের গতিতে ছুটছে। আহসান নিচু গলায় গল্প করছে।আহসান বলল, লীলার সঙ্গে আমার পরিচয়ের শুরুটা কি জানেন? আপনাদের পরিচয়ের শুরুটা জানি। নর্দমায় পরিচয়। আমাদের সেরকম না। তবে সেই পরিচয়ও ইন্টারেস্টিং। বলব? বলুন।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি। হঠাৎ রাস্তার একটা নেড়ি কুকুর আমাকে তাড়া করল। ভয়ে এবং আতঙ্কে অস্থির হয়ে একটা খোলা গেট দেখে ঢুকে পড়লাম। ততক্ষণে কুকুরটা আমাকে কামড়ে ধরেছে। সেই বিশাল বাড়ির বারান্দায় অতি রূপবতী এক বালিকা কী যেন করছিল। আমি আশ্রয়ের জন্যেই বোধহয় মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। কুকুরটা আমাকে কামড়াল। মেয়েটাকে কামড়ালি। মেয়ের মা আমাদের উদ্ধার করতে এলেন, তাকেও কামড়াল। ঐ মেয়েই লীলা।লীলার মা আপনাকে খুব পছন্দ করতেন?

আহসান বলল, হ্যাঁ। উনি বলতেন, পাগলা কুকুর তাড়া করে আমার মেয়ের জামাইকে আমার ঘরে ঢুকিয়েছে।মুহিব বলল, লীলার সঙ্গে আপনার পরিচয়ের গল্পটা খুব সুন্দর।আহসান বলল, গল্পটা চমৎকার, কারণ গল্পটা মিথ্যা। লীলার সঙ্গে প্রথম দেখার অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত সিনারিও আমি কল্পনা করি। তারই একটা আপনাকে বললাম। আবার যেদিন দেখা হবে সেদিন আরেকটা বলব। আপনার সঙ্গে আমার কিছু মিলও আছে। আপনি যেমন গভীর রাতে লীলাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন, আমিও থাকি। তফাত একটাই, আপনি থাকেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে, আমি থাকি দামি গাড়ির ভেতর। চলুন আপনাকে লীলার কাছে দিয়ে আসি।

ব্রাউন পেপারে মোড়া টাকা টেবিলের ওপর রাখা। মুহিব সালমার বাবা আশরাফ সাহেবকে বলল, টাকাটা নিয়ে এসেছি। আপনি পাঁচ লাখ চেয়েছেন, এখানে চার লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা আছে। বাকিটা আমি এক মাসের মধ্যে দেব।আশরাফ কিছুক্ষণ ব্রাউন পেপারের দিকে তাকিয়ে বিভূবিড় করে নিজের মনে কী যেন বললেন।

ভদ্রলোকের ভাবভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি সবই প্রতিবন্ধীদের মতো। তিনি এখন তাকিয়ে আছেন তার সামনে রাখা গ্লাসভর্তি সবুজাভ পানীয়ের দিকে। গ্লাসের পাশে পিরিচে একটুকরা লেবু কাটা। তিনি বললেন, গ্লাসে আছে চিরতার পানি। ভোরবেলা খালি পেটে একগ্লাস চিরতার পানি খেয়ে লেবু দিয়ে মুখশুদ্ধি যে করে তার রোগবালাই হয় না।মুহিব বলল, ও।

আশরাফ বললেন, আরেকটা মহৌষধ হলো কালিজিরা। হাদিসে আছে— মৃত্যুরোগ ব্যতীত সর্বরোগের মহৌষধ কালিজিরা।মুহিব বলল, চাচা, টাকাটা রাখুন। আপনি বলেছিলেন মামলা তুলে নিবেন। আপনাকে আর আপনার মেয়েকে কোর্টে যেতে হবে। আমি টেক্সিক্যাব নিয়ে এসেছি।আশরাফ মুহিবের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি কি আমাকে খারাপ ভাবছ?

মুহিব বলল, জি-না।আশরাফ বললেন, মুখে না বললেও মনে মনে অবশ্যই ভাবছ। তবে বাবা শোন, আমি কিছুদিন সৌদিতে ছিলাম। সেখানে দেখেছি টাকার বিনিময়ে অপরাধ ক্ষমা করা হয়। কেউ যদি খুনও করে, রক্ত ঋণ দিলে তারও ক্ষমা হয়। এই কারণেই তোমার কাছে টাকা চেয়েছিলাম। আমি অতি দরিদ্র ব্যক্তি। ভিক্ষুকের কাছাকাছি।মুহিব বলল, চাচা, টাকাটা রাখুন।

আশরাফ বললেন, বাবা, টাকাটা আমি রাখতাম, কিন্তু বড় একটা সমস্যা হয়েছে। আমার মেয়ে আমার কাছে স্বীকার করেছে, এই জাতীয় কোনো ঘটনা ঘটে নাই। হিশাম সাহেবের আদেশে সে কাজটা করেছে। নিজেই দৌড় দিয়ে আলাউদ্দিন সাহেবের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে চিৎকার শুরু করেছে। দরজা ভেঙে তাকে সবাই বের করেছে। সে অজ্ঞান হবার ভান করেছে। বাবা, অত্যন্ত লজ্জার একটা ঘটনা। আমার মেয়েকে আল্লাহপাক এই কারণে কঠিন শাস্তি দিবেন। নবিজীর শেফায়াত সে পাবে এরকম মনে হয় না।

মুহিব আগ্রহ নিয়ে বলল, তাহলে তো চাচা, ঘটনা অনেক সহজ হয়ে গেল। আপনার মেয়ে কোর্টে গিয়ে আসলে কী ঘটেছে সেটা বলবে। আমার বাবা ছাড়া পাবেন।আশরাফ চুকচুক করে তার সামনে রাখা চিরতার পানি সবটা খেলেন। মুখে লেবুর টুকরা দিয়ে থেমে থেমে বললেন, এই কাজটা আমার মেয়ে করবে না। মেয়েটা নষ্ট হয়ে গেছে। হিশাম মেয়েটাকে নষ্ট করেছে। হিশাম বিপত্নীক মানুষ। সালমাকে বিয়ে করবে— এইরকম লোভ দেখাচ্ছে। সালমা এখন তার সঙ্গেই থাকে। কিয়ামতের আগে আগে এই ধরনের পাপাচার হয়। কেয়ামত নজদিক।

মুহিব বলল, ঘটনা কী ঘটেছে আপনি যদি কোর্টে গিয়ে বলেন তাহলেও মনে হয় হবে।আশরাফ বললেন, আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব না। আমি হিশামের আশ্রয়ে বাস করি। তবে আমি খাস দিলে তোমার পিতার জন্য দোয়া করব। বিচারকের দিলে যেন রহম হয়, তার জন্যে রোজা খব। এবং কোরান খতম দিব। বাবা, তোমাকে কি এক গ্লাস চিরতার পানি দিতে বলব? শরীরের জন্যে অত্যন্ত উপকারী। সারাদিনের নানান কর্মকাণ্ডে শরীরে যে বিষ উৎপন্ন হয়, সব নষ্ট করে দেয়।

মুহিব উঠে পড়ল। এর সঙ্গে কথা বলার আর কিছু নাই।মুহিব গেল হামিদুজ্জামানের কাছে। হামিদুজ্জামান বললেন, ঘুরে ফিরে সেই আমার কাছে? মুহিব বলল, জি চাচা।টাকা এনেছ? না-কি empty handed? টাকা এনেছি। এখানে সাড়ে চার লাখ আছে।চার চেয়েছিলাম, সাড়ে চার এনেছ কেন?

মুহিব কিছু বলল না। হামিদুজ্জামান মানিব্যাগ খুলে তার মেয়ের ছবি বের করলেন। ছবি এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, মেয়ে দেখতে কেমন বলো।জি সুন্দর।সুন্দর কিছু দেখলে বলতে হয় মাশাল্লাহ। বলো মাশাল্লাহ।মুহিব বলল, মাশাল্লাহ।মেয়ের ডাকনাম মায়া। তোমার নামের সঙ্গে মিল আছে। তুমি মুহিব, সে মায়া। স্বামী-স্ত্রীর নামের মিল থাকলে সংসার সুখের হয়। মায়ার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে চাও? জি-না।সামনাসামনি কথা বলতে চাইলে গাড়ি পাঠিয়ে তাকে আনাই?

মুহিব বলল, চাচা, আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করব না। আপনি যা টাকা চেয়েছেন, আপনাকে দিলাম। বাবাকে বাঁচান। বিনা অপরাধে উনার জেল হলে দুঃখেই আমার বাবা মারা যাবেন আঠারোই এপ্রিল, রবিবার, দ্রুত বিচার আইনে আলাউদ্দিনের সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়ে গেল। বিচারক তার রায়ে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক সমাজের নৈতিক অধঃপতনের জন্যে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, শাস্তি আরো কঠোর করার ইচ্ছা ছিল। আসামির বয়স এবং স্বাস্থ্য বিবেচনা করে লঘু দণ্ড দেয়া হয়েছে।

আজ বুধবার।মুহিবের মিথ্যাদিবস। সে অপেক্ষা করছে জেলখানার গেটে অজ তার বাবা আলাউদ্দিন মুক্তি পাবেন। তার সাজার মেয়াদ শেষ হয়েছে।মুহিবের পাশে লীলা দাঁড়িয়ে আছে। লীলা বলল, বাবার জন্যে একটা ফুলের মালা আনার দরকার ছিল না?

মুহিব বলল, বাবা কোনো রাজনৈতিক নেতা না লীলা যে ফুলের মালা গলায় দিয়ে তাকে বের করতে হবে।দীর্ঘদিন অন্যায় শাস্তি তিনি ভোগ করেছেন। একটা ফুলের মালা তার অবশ্যই প্রাপ্য।এখন ফুলের মালা আমি পাব কোথায়? লীলা বলল, ফুলের মালা আমি নিয়ে এসেছি।গুড।লীলা বলল, আমাকে কি তোমার বাবা পছন্দ করবেন?

মুহিব বলল, না। উনি কাউকেই পছন্দ করেন না। তবে দীর্ঘদিন জেলে থেকেছেন। তার মানসিকতা বদলাতেও পারে।লীলা বলল, আজ যে তোমাকে রাজপুত্রের মতো দেখাচ্ছে সেটা কি তুমি জানো? মুহিব বলল, এখন জানলাম।লীলা বলল, তোমার কেমন আনন্দ হচ্ছে একটু বলবে?

মুহিব বলল, বাবা ঘরে ফিরবেন। আগের মতো আমাকে গাধাপুত্র বলে গালি দেবেন, ভাবতেই ভালো লাগছে।লীলা বলল, Home এর defination কি মনে আছে? তোমাকে শিখিয়েছিলাম।মুহিব বলল, Home is the place where if you want to go there, they have to take you in.

লোকজন মুহিবকে চিনতে পেরেছে। তাকে ঘিরে ভিড় বাড়ছে। ক্রমাগত মোবাইল ক্লিক ক্লিক করছে। ছবির পর ছবি উঠছে। ভিড় সামলানোর জন্যে পুলিশ এসেছে। পুলিশের ওসি ওয়াকিটকিতে আরো কিছু পুলিশ চেয়েছেন। ওসি সাহেব মুহিবকে বললেন, স্যার, আপনি গাড়িতে বসুন। সব কন্ট্রোল করা যাবে না। পাবলিকের বিশ্রী স্বভাব, সেলিব্রেটি দেখলে হুশ থাকে না।

মুহিবের মা এবং বোন জেলগেটে আসে নি। অশ্রুর বিয়ে হয়েছে। সে স্বামীর সঙ্গে রাজশাহীতে থাকে। তাদের একটা মেয়ে হয়েছে। মেয়ের নাম মুহিব রেখেছে নিলি। এই নাম অশ্রু বা অশ্রুর স্বামীর কারোই পছন্দ হয় নি। মুহিব বলেছে—এই নামের মেয়ের হার্ট হয় পৃথিবীর মতো বড়। নামটা রেখে দেখ! অশ্রু স্বামী এবং মেয়েকে নিয়ে ভোরবেলা ঢাকা পৌঁছেছে। নিলির সামান্য জ্বর এসেছে বলে তারা আসে নি। অশ্রুর স্বামীর নাম সাজ্জাদ। তার ভুবনে স্ত্রী এবং মেয়ে ছাড়া আর কিছুই নেই। মাঝে মাঝে অশ্রুর খুবই বিরক্ত লাগে

সে বলে, আমি খাটের নিচে যে ভূতটা দেখতাম তুমি তারচেয়ে খারাপ। ভূতটা শুধু রাতে থাকত। তুমি দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা থাক। ভূতটার চেহারার সঙ্গে তোমার মিল আছে। ভূতটার মাথায় চুল ছিল না। তোমার মাথায় টাক। ভূতটার মুখ ছিল লম্বা, তোমার মুখও লম্বা। কোনো কথাতেই সাজ্জাদের কিছু হয় না। সাজ্জাদের ধারণা, অশ্রু যখন বেশি রাগারাগি করে তখন তার চেহারা অনেক সুন্দর হয়ে যায়। তার দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে।

রাজিয়া বেগম জেলগেটে যান নি। কারণ তার অনেক কাজ। মানুষটা কতদিন পরে ঘরে আসবে। ঘরের ভাত খাবে। দীর্ঘ ছয় বছরের জেলখানায় এক বছর শাস্তি রেয়াত হয়েছে, জেলের বছর নয় মাসে হয়) কত কথা জমা আছে। কোনটার পর কোনটা বলবেন সেটা একটা সমস্যা।

অশ্রুর বিয়ের দিন কত বড় ঝামেলা হলো। বিয়ে ভেঙে যায় ভেঙে যায় অবস্থা। তারপর হঠাৎ করেই সব সমস্যার কী আশ্চর্য সমাধান! অশ্রুর স্বামীকে শুরুতে তার পছন্দ হয় নি। বুড়োটে চেহারা। মাথায় চুলের বংশও নাই। কথাবার্তাও যেন কেমন কেমন। অর্ধেক কথা বলে তো অর্ধেক বলে না। এখন মনে হচ্ছে, এরকম জামাই পাওয়া যে-কোনো মেয়ের জন্যেই ভাগ্যের কথা।

হিশাম সাহেবের গল্পটা গুছিয়ে বলতে হবে। সালমা মেয়েটাকে বিয়ে করেছে। ধুমধাম করে। বিয়ের কার্ড দিতে এসেছিল। কী সুন্দর সুন্দর কথা–ভাবি মেয়েটাকে উদ্ধারের জন্যে এই কাজটা করলাম গাঁয়েক গছে কে এই মেয়েকে বিয়ে করবে বলুন?

মুহিবের ফ্ল্যাট কেনার ঘটনাটা সুন্দর করে বলতে হবে। ঘটনা বলতে গিয়ে আগপিছ হয় কি-না সেই ভয়ও আছে। আগপিছ হলে ঘটনার মজাই শেষ হয়ে যাবে। একদিন মুহিবকে নিয়ে গেল। ফ্ল্যাট দেখাতে সে চারতলার একট ফ্ল্যাট কিনেছে। এখনো লিফট বসে নি। তিনি বললেন, বাবারে, আমি তো সিঁড়ি বাইতে পারব না। মুহিব বলল, কোনো চিন্তা নাই মা। আমি কোলে করে তুলব।রাজিয়া বললেন, পাগল না-কি? তুই কোলে করে তুলবি কীভাবে?

মুহিব বলল, দেখ না কীভাবে তুলি। সত্যি সত্যি সে তাঁকে কোলে করে চারতলায় তুলে বলল, সবচেয়ে সুন্দর ঘর ঘর কোনটা মা খুঁজে বের কর। তিনি খুঁজে বের করলেন। বারান্দাওয়ালা বিরাট ঘর। দক্ষিণ দিকে জানালা। সারাক্ষণ হাওয়া আসছে। মুহিব বলব, মা, এই ঘরটা তোমার আর বাবার। এই ঘরের পাশের ঘরটাও তোমার। বাবার সঙ্গে যখন রাগারাগি হবে, তখন এই ঘরে দরজা বন্ধ করে ঘুমাবে।

মুহিব তার বাবার ঘরটা আগের মতো করে সাজিয়েছে। পুরনো চটি জুতা। পুরনো কাপড়। দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো মুহিবের ছেঁড়া BA-র সার্টিফিকেট। টিভি নষ্ট হয়ে গেছে বনে টিভি কেনা হয়েছে। একটা বেতের ইজিচেয়ার কেনা হয়েছে। ঘরে এসি লাগানো হয়েছে। মানুষটা যেন এসির বাতাসে আরাম করে ঘুমাতে পারে।রাজিয়া বেগম দুপুরের খাবার আয়োজন করছেন। কাজের ছেলেটি বাজার নিয়ে এসেছে। ঘরে রান্নার মেয়ে আছে। রাজিয়া ঠিক করেছে আজ নিজেই রাঁধরেন। সবই মুহিবের বাবার পছন্দের খাবার।

করল ভাজি (সঙ্গে কুচি কুচি আলু দিতে হবে। অল্প ভাজা হবে, যেন করলা সবুজ থাকে।)

সাজন (সর্ষে বাটা দিয়ে, সঙ্গে কাঁচামরিচ।)

কৈ মাছের ঝোল (টমেটো দিয়ে। কাঁচা টমেটো পেলে ভালো হয়।)

মাষকালাইয়ের ডাল (সঙ্গে টাকি মাছ দিতে হবে।)

রাতে করবেন হাঁসের মাংস। চালের আটার রুটি।

মুহিবকে ঘিরে ভিড় প্রচও বেড়েছে। ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়েছে। লীলা ডানে সরতে সরতে ঝুপ করে নোংরা নর্দমায় পড়ে গেল। পুরনো দিনের কথা মনে করে খিলখিল করে হেসে ফেলল। প্রকৃতি বড়ই অদ্ভুত। প্রকৃতি পুনরাবৃত্তি পছন্দ করে।আলাউদ্দিন জেলগেট থেকে বের হয়েছেন। মুহিব ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছে।আলাউদ্দিন বলেন, নর্দমায় পড়ে আছে মেয়েটা কে?

মুহিব বলল, বাবা, ও তোমার বৌমা। ওর নাম লীলা।আলাউদ্দিন ছেলেকে কঠিন ধমক দিলেন, বৌমা নর্দমায় পড়ে আছে, তুই তাকে তুলবি না? গাধা। অর্ধমানব।লীলার হাতে ফুলের মালা। সে চেষ্টা করছে মালায় যেন নোংরা না লাগে

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

দিঘির জলে কার ছায়া গো পর্ব – ৮ হুমায়ূন আহমেদ

আহসান বলল, আমার ধারণা আমি কারণটা জানি। নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত যুবকদের নিজেকে বিশেষভাবে প্রকাশ করার তেমন সুবিধা নেই। সে ব্র্যান্ডের শার্ট কিনতে পারবে না। নতুন মডেলের গাড়ি কিনতে পারবে না। ইচ্ছা করলেই বান্ধবীকে নিয়ে দামি কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে পারবে না। তাকে খুঁজে বের করতে হয় তার আয়ত্ত আছে এমন কিছু। যেমন— মিথ্যাদিবস, কথা বন্ধ দিবস, এইসব। আমার ধারণা যদি সত্যি হয় তাহলে একদিন শুনবে, সে শনি বা রবিবারকে ডিক্লেয়ার করেছে কথা না-বলা দিবস।

সেদিন সে তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। কিন্তু কথা বলবে না। তুমি প্রশ্ন করলে লিখে উত্তর দিবে।লীলা বলল, আপনার observation সত্যি হতেও পারে।আহসান বলল, তোমার মিথ্যাদিবস বান্ধব কিন্তু শুন্যে ভাসার ম্যাজিকটা অতি দ্রুত শিখেছে এবং ভালো শিখেছে। আমি নিজেই অবাক হয়েছি।সে যে কাজই করে খুব মন দিয়ে করে। একটা পর্যায় পর্যন্ত করে, তারপর থেমে যায়। পরিস্থিতি তাকে থামিয়ে দেয়।

আহসান বলল, আমাকে একটা কথা বলো তো। মুহিবের বিষয়ে তোমার পরিকল্পনা কী? তাকে বিয়ে করবে? না সে হবে তোমার দুই ময়ূর মিত্রা এবং চিত্রার মতো পোষা বন্ধু। বাঁদরটার কথা বললাম না। বাঁদরের কথা বললে তুমি আহত হবে এই সম্ভাবনা আছে।লীলা বলল, মনে করুন আপনি আহসান না। আপনি লীলা। আপনি হলে কী করতেন? আপনার honest মতামত কী?

আহসান বলল, তোমার মেন্টাল মেকাপের কাছাকাছি যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। মেয়েদের মেন্টাল মেকাপের কমপ্লেক্সিটি আমার জানাও নেই। কাজেই মতামত দিতে পারছি না। শুধু একটা জিনিস বলতে পারছি, মুহিবের প্রতি তোমার প্রেম নেই।প্রেম নেই?

না। তুমি তার কর্মকাণ্ড দেখে খুশি হও, আবার তোমার পোষা জীবজন্তুর কর্মকাণ্ড দেখেও খুশি হও। তাকে তুমি আশেপাশে অবশ্যই রাখতে চাও। তার শূন্যে ভাসা দেখে মজা পাবার জন্যে বা অন্যান্য কাজকর্মে মজা পাবার জন্যে। এর বেশি কিছু না। সত্যি যদি তার প্রেমে পড়তে, তাহলে তার এতবড় দুঃসময়ে তুমি তার পাশে থাকতে। তুমি কিন্তু পাশে নেই।

লীলা বলল, তার পাশে থাকা মানে তাকে লজ্জা দেয়া। এই লজ্জাটা তাকে দিতে চাচ্ছি না।আহসান বলল, শুধু লজ্জা দেয়া না। লজ্জা পাওয়াও। তুমি লজ্জাটাও পেতে চাচ্ছ না। আচ্ছা লীলা, তুমি কখনো তার বাসায় গিয়েছ? তার মা, বোন, এদের সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছে?

না।কোনো মেয়ে যদি সত্যি সত্যি কোনো ছেলের প্রেমে পড়ে, সে তখন এই ছেলের আশেপাশের সবকিছুর প্রেমে পড়ে।লীলা তাকিয়ে আছে। সে এইভাবে কখনো চিন্তা করে নি। আহসান বলল, তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তুমি সামান্য মন খারাপ করেছ। দাড়াও, মন ভালো করে দেই। মুহিব ছেলেটা কিন্তু তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসে! আমি কাল রাতে বিষয়টা টের পেয়েছি।কীভাবে টের পেয়েছেন?

শূন্যে ভাসা ম্যাজিক শিখে আমার ঘর থেকে সে যখন বের হলো আমি তার পেছনে একজন লোক লাগিয়ে দিলাম। তার দায়িত্ব হচ্ছে মুহিবকে ফলো করা।এটা কেন করলেন? তোমার প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে করলাম। তুমি মুহিবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশছ। মুহিব ছেলেটা কেমন জানা দরকার। মুহিব কী করল জানো? কী করল?

অনেক কিছুই করল। হাঁটাহাঁটি। চায়ের দোকানে চা খাওয়ী। একটা পর্যায়ে সে এসে তোমাদের বাসার সামনে দাঁড়াল। তখন রাত বারোটা দশ। তোমার ঘরে বাতি জুলছিল। সে তাকিয়ে ছিল বাতির দিকে। যখন ৰাতি নিভল সে চলে গেল। প্রায় দুঘণ্টা ছিল।লীলা বলল, যে স্পাই লাগিয়ে ছিলেন সে এত Detail মনে রেখেছে?

আহসান বলল, স্পাইটা আমি নিজে। একটা কালো চাদর গায়ে জড়িয়ে বের হয়েছিলাম। মুহিব লক্ষ করে নি। তার অবশ্য চারদিক লক্ষ করার মতো মানসিক অবস্থাও ছিল না।লীলা বলল, খেতে আস। আমার ক্ষিধে লেগেছে। আজ সকাল সকাল খেয়ে নেব।আহসান বলল, তুমি বলা শুরু করেছ? লীলা বলল, হ্যাঁ।সর্বনাশ! সামনের মাসে পনেরো দিনের জন্যে জাপান যাবার কথা। ফিরে এলে আবার আপনি?

জাপান যেও না।আহসান বলল, আমাকে যেতেই হবে, উপায় নেই। একটা কাজ অবশ্য করা যায়। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যায়। যাবে? লীলা চুপ করে আছে। পরী মূর্তি ছাদে বসানো হচ্ছে। তার দৃষ্টি সেদিকে। কী সুন্দর দেখাচ্ছে মূর্তিটা! এত জীবন্ত! আহসান বলল, আজ আমার জন্মদিন। লীলা, শুভ জন্মদিন বলবে না? শুভ জন্মদিন।থ্যাংক য়্যু। আমি ঠিক করে রেখেছিলাম, ছাদটা পুরোপুরি গোছানো হলে তোমাকে ছাদে এনে আমার জন্মদিনের কথা তোমাকে বলব। সরি, আগেভাগে বলে ফেলেছি।চল খেতে যাই।

আহসান বলল, খাওয়ার পর ভ্রমণে বের হলে কেমন হয়? দুজন কিছুক্ষণ হাঁটলাম। একসময় ধাক্কা দিয়ে তোমাকে বড় কোনো নর্দমায় ফেলে দিলাম, তারপর টেনে তুললাম। তখন আর আমি পিছিয়ে থাকব না। মুহিবের কাছাকাছি চলে আসব।লীলা হাসল।মুহিব বলল, তোমার মেয়েটা আজ কী বেঁধেছে? জানি না। অনেক আইটেম নিশ্চয়ই করেছে। সে অল্প আইটেম রাঁধতে পারে। না।তুমি কি জানো আসমা কুয়েতের ঐ শেখের কাছে ফিরে যাচ্ছে? তাই না-কি?

হ্যাঁ, কুয়েতের বদ শেখটা আসমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সে জানিয়েছে আসমার কথা তার খুব মনে পড়ে। প্রায়ই তাকে স্বপ্নে দেখে। আসমা এতেই খুশি। সে এখন ফিরে যাবার জন্যে তৈরি। মেয়েরা কত অল্পতে খুশি হয় দেখেছ? ক্রিমিনাল লইয়ার হামিদুজ্জামানের চেম্বারে মুহিব বসে আছে। তার কাছে আসার কোনো ইচ্ছা মুহিবের ছিল না। নিলি ম্যাডাম তাকে পাঠিয়েছেন। যদি কেউ কিছু করতে পারে হামিদুজ্জামানই পারবে। হামিদুজ্জামানকে পঞ্চাশ হাজার টাকা আপাতত দেয়া হয়েছে। হামিদুজ্জামান বললেন, উকিল আর ডাক্তার এদের কাছে কিছু গোপন করবে না। গোপন করলে নিজেদেরই সমস্যা। বলো দেখি তোমার কাছে এখন ক্যাশ টাকা কত আছে?

মুহিব বলল, পাঁচ লাখের সামান্য বেশি। উত্তরখানের জমি বিক্রি করেছি। টাকা দিয়ে মামলা মিটমাট করব এইজন্যে। মেয়ের বাবা আশরাফ সাহেব পাচ লাখ টাকার বিনিময়ে মামলা তুলে নিবেন বলেছেন।হামিদুজ্জামান বললেন, মুখে মামলা তুলে নিলাম বললে তো হবে না। মেয়েকে এবং মেয়ের বাবাকে কোর্টে এসে বলতে হবে মামলা মিথ্যা। তারপর তারা ফেঁসে যাবে। মিথ্যা মামলা করার জন্যে জেলে ঢুকতে হবে। বুঝেছু ঘটনা? বুঝার চেষ্টা করছি।জমি কার কাছে বিক্রি করেছ?

হিশাম চাচার কাছে। উনি বাবার বিজনেস পার্টনার। বাবার বিজনেস নিয়ে নেয়ার জন্যে মামলা উনি করিয়েছেন। সালমা মেয়েটা তার ভাগ্নি। দূরসম্পর্কের ভাগ্নি।জমির দখল ছেড়ে দিয়েছ? জি-না। আমার মা এবং অশ্রু এখনো উত্তরখানের বাড়িতে আছেন। হিশাম চাচা সাতদিন সময় দিয়েছেন। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নাই।

দখল ছাড়বা না। কোনোভাবেই না। আমরা উল্টা মামলা করব— জোর জবরদস্তি করে জমির দলিল করে নিয়েছে। বাঘ তখন ধান খাবে। দবিরকে পাঠাব। দবির এক ফাঁকে হিশাম আর মেয়ের বাপ— এই দুইটাকে ডলা দিয়ে আসবে।দবির কে?

আছে একজন। তার সঙ্গে তোমার পরিচয় মা হওয়াই ভালো। আমি ক্রিমিনাল লইয়ার। কিছু ক্রিমিনাল আমার পোষা থাকবে না। এখন আমাদের একটা কাজ করতে হবে। জমির বায়না যে তারিখে হয়েছে, তার আগের কোনো তারিখে থানায় জিডি এর ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানে থাকবে হিশাম তোমাকে ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে।মুহিব বলল, ব্যাক ডেটে জিডি এন্ট্রি কীভারে হবে।হামিদুজ্জামান বিরক্ত মুখে বললেন, সেটা তো তোমার দেখার বিষয় না। আমার দেখার বিষয়। বুঝেছ কিছু?

বুঝার চেষ্টা করছি।পত্রিকায় আমার পোষী লোক আছে।ক্রয়/তোমার বাবাকে নিয়ে একটা ফিচার। লিখবো।কী ফিচার লিখবে? লিখবে—একজনু সুম্মানিত শিক্ষক এবং এ দেশের প্রথম সারির গীতিকার ষড়যন্ত্রের শিকার। মিথ্যা অপবাদে তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে এবং তার বিষয়ছপত্তি ইতিমধ্যেইvদলিল রেজিস্ট্র করে নিয়ে নেয়া হয়েছে দলিলের কপি ছেপে দেয়া হবে। এইখানেই শেষ না আরো বাকি আছে।আর কী বাকি? মেয়েটার নাম কী সালমা

জি।আমরা প্রমাণ করব আলম অতিদুষ্ট উইল ড্রাগ অ্যাভিষ্ট এক তরুণী। অসামাজিক কার্যকলাগালিভার কিছুছবি আমরা যোগাড় করব। নেংটা পুংটা ছবি প্রয়োজনে সস্তা কিছু ম্যাগাজিনে ছেপে দিব।

ছবি কোথায় পাবেন।ছবি ম্যানুফেকচার করা হর। পুরনো আমল নয় যে গান হবে—তুমি কি কেবলি ছবি শুধু পটে আঁকা? এই সময়ের গান হচ্ছে, তুমি কি নগ্ন ছবি? কম্পিউটারে আঁকা? হা হা হা।মুহিব বলল, চাচা,আমি এর মধ্য দিয়ে যাব তোমার বাবার সাত বছরের জেল হয়ে যাবে, তারপরেও যাবে না? না। হামিদুজ্জামান টেবিলের ওপর খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, তুমি বরং এক কাজ করা আমার সঙ্গে কন্ট্রাক্টে আসি।কী কন্ট্রাক্ট?

তোমার কাছে পাঁচ লাখ টাকা আছে। সেখান থেকে চার লাখ আমাকে দাও। তোমাকে কিছুই করতে হবে না, নাকে সরিষার তেল কিংবা অলিভ ওয়েল যে কোনো একটা দিয়ে ঘুমাবে। আমার দায়িত্ব তোমার বাবাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসা। আরো সহজ করে দেই। টাকা এখন দিতে হবে না। তোমার বাবা ছাড়া পেয়ে আসুক তারপর দিবে।

চাচা, আপনাকে কিছু করতে হবে না।আমাকে যে পঞ্চাশ হাজার দিয়েছ সেটা কিন্তু গেল।গেলে গেল।তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করা হয় নাই। তুমি কর কী? আমি তেমন কিছু করি না। চাকরি খুঁজি।

পড়াশোনা কতদূর?

বিএ পাশ করেছি।

রেজাল্ট কী?

থার্ড ক্লাস।

বিবাহ করেছ?

না।

চা খাবে?

জি-না।

আরে বাবা, এক কাপ চা খাও। এত রাগ কেন? তোমার কাছে আমার আরেকটা প্রপোজাল আছে। আমি সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করি। এখনো সরাসরি যা বলার বলব। ধানাইপানাই করে নষ্ট করার সময় আমার নাই।মুহিব বলল, বলুন কী বলবেন।

আমার বিষয়সম্পত্তি অনেক। ঢাকা শহরে বাড়ি আছে তিনটা। চালু দোকান আছে দুটা। দুটাই বসুন্ধরা কমপ্লেক্সে। আমার একটাই মেয়ে। সে বেহেশতের দূর না, আবার খারাপও না। ফিজিক্সের মতো কঠিন বিষয়ে M.Sc, পড়ছে। অনার্সে ফার্স্টক্লাস পেয়েছে। আমার মানিব্যাগে তার ছবি আছে। যদি চাও দেখাতে পারি। আমি নিজে অসৎ বলেই একজন অতি সৎ ছেলের সন্ধানে আছি। পাই না। বাংলাদেশে সব ধরনের পাত্র আছে, সৎপাত্র নাই। তুমি রাজি থাকলে আমি তোমার এবং তোমার পরবর্তী জেনারেশনের সব সমস্যার সমাধান করে দেব।

মুহিব বলল, চাচা, আমি উঠলাম। যা করার নিজেই করব।হামিদুজ্জামান থুথুদানে থুথু ফেলতে ফেলতে বললেন, তুমি যা করবে তা হলো বুড়া বাপকে সাত বছর জেল খাটাবে।মুহিব রাস্তায় কিছুক্ষণ এলোমেলো হাঁটল। বাবার সঙ্গে দেখা করার কথা আছে। এখনো সময় হয় নি। আগে থেকে জেলখানার গেটে বসে থাকার মানে হয় না। সে দুটা বেদনা কিনল। আলাউদ্দিন স্বপ্নে দেখেছেন বেদানা খাচ্ছেন। আজকাল প্রায়ই তিনি স্বপ্নে নানান খাদ্যদ্রব্য খেতে দেখেন। মুহিবকে সেইসব কিনে নিয়ে যেতে হয়।

হাঁটতে হাঁটতে মুহিব আজ দিনের কাজগুলি গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করল। ডিরেক্টর সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে হবে। নতুন একটা নাটক নিয়ে তিনি কথা বলবেন। লীলার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না। একবার লীলাকে দেখে আসা দরকার। আজ শেষরাতে সে স্বপ্নে দেখেছে, লীলা তার সঙ্গে ঝগড়া করছে। শাড়ি আঁচলে পেঁচিয়ে কঠিন ঝগড়া। মুহিব ঝগড়ার বিষয়টা মনে করার চেষ্টা করল। কিছুতেই মনে পড়ছে না। হঠাৎ কোনো একদিন মনে পড়বে।

লীলাকে একটা টেলিফোন কি করবে? তার মোবাইলে ক্রেডিট নেই বললেই হয়। মুহিব মনে মনে বলল, লীলা, আমাকে একটা টেলিফোন কর। প্লিজ লীলা কর। টেলিপ্যাথির মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা। হিমুর একটা বইয়ে এরকম আছে। হিমু এই ভঙ্গিতে যোগাযোগ করতে পারত। বাদলের সঙ্গে তার কথা বলা দরকার। সে চোখ বন্ধ করে বলত–বাদল। বাদল। সঙ্গে সঙ্গে বাদলের টেলিফোন।মুহিবের টেলিফোন বাজছে। আশ্চর্য, লীলার টেলিফোন। লীলা বলল, আজ সন্ধ্যায় তুমি কী করছ? মুহিব বলল, কেন বলো তো?

আজ রাতে তোমার নাটকটা দেখাবে। তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে দেখতাম। তিনজন মিলে দেখব। আমি, তুমি আর আহসান সাহেব।মুহিব বলল, না।না কেন? তোমাকে সঙ্গে নিয়ে নাটক দেখতে লজ্জা লাগবে।নিজের নাটক নিজে দেখবে না? নিলি ম্যাডাম দাওয়াত দিয়েছেন। আজ রাতে তাঁর বাসায় নাটকটা দেখব। নাটকের শেষে আমার কী সব ভুল হয়েছে তিনি ধরিয়ে দেবেন।লীলা হাসছে।মুহিব বলল, হাসছ কেন?

লীলা বলল, আমার ক্ষীণ সন্দেহ নিলি ম্যাডাম তোমার প্রেমে পড়েছেন। ছোট্ট উপদেশ দেই, উনার আকর্ষণী ক্ষমতা প্রচণ্ড। তুমি আবার বিপদে পড়ে যেও না।মুহিব বলল, বিপদে পড়ব না, কারণ নিলি ম্যাডাম কাউকে বিপদে ফেলার মানুষ না।লীলা বলল, বাসায় চলে এসো। আহসান সাহেব ছাদে একটা বাগান তৈরি করে দিয়েছেন। এত সুন্দর হয়েছে।মুহিব বলল, এখন আসতে পারব না। বাবার কাছে যেতে হবে। তাকে বেদানা খাওয়াতে হবে। তিনি বেদানা খেতে চাচ্ছেন। লীলা রাখি?

আলাউদ্দিন বেদানার দানা ভেঙে ভেঙে মুখে দিচ্ছেন। আগ্রহ নিয়ে চাবাচ্ছেন। তাকে কেন জানি খুব অসহায় লাগছে। মুখের চামড়া ঝুলে পড়েছে। চোখের দৃষ্টি ছানিপড়ার মতো।আলাউদ্দিন বললেন, তোর পিতা কি বাংলার লট? এক কথায় পঞ্চাশ হাজার টাকা হামিদুজ্জামানকে দিয়ে চলে এসেছিস? আশেপাশে লোকজন না থাকলে এখনই থাপড়ায়ে তোর চাপার দাঁত ফেলে দিতাম। এক্ষণ তাঁর কাছে যাবি। পা ধরে পড়ে থাকবি। বলবি, চাচা মাথা গরম ছিল, ভুল করেছি। আপনি ছাড়া গতি নাই।

মুহিব বলল, উনি তখন নতুন শর্ত দেবেন। বলবেন আমার মেয়েকে বিয়ে কর।বিয়ে করবি। বিয়ে তো করতেই হবে। তুই তার সঙ্গে কন্ট্রাক্টে চলে যা। তুই বল, আপনি বাবাকে রিলিজ করে নিয়ে আসুন। বিনিময়ে আপনার মেয়েকে আমি বিয়ে করব। বাপের জন্যে এই সামান্য কাজটা করতে পারবি না? কথা বলছিস না কেন? পারবি না? না-কি কারো সাথে এর মধ্যে লদকালদকি প্রেম হয়ে গেছে?

বেকার ছেলে আর কিছু পারুক না-পারুক প্রেমটা পারে। তার জন্মই নেয় রোমিওজুলিয়েটের রোমিও হিসেবে। তার চেহারা দেখেই বুঝেছি জটিল প্রেম। নাটকের মেয়ে? তুই তো আবার শুনেছি নাটকে নেমেছিস। নাটকের মেয়েগুলি তো প্রেমের জন্যে জিহ্বা লম্বা করেই রাখে। মেয়েটার নাম কী? নাম বল। মুহিব বলল, নাম জেনে কী করবে?

আলাউদ্দিন হতাশ গলায় বললেন, তাও তো কথা। আমি নাম জেনে কী করব? নাম দিয়ে তুই তসবির মতো জপ করবি। আমার কী? নাম ফুলকুমারী হলে যা, গাধাকমারী হলেও তা।সেন্ট্রি ঘরে ঢুকে বলল, আপনাদের সময় শেষ। এখন যান।আলাউদ্দিন বললেন, বাবারে, আসল কথাই তো বলা হয় নাই।সেন্ট্রি বলল, নকল কথা যা বলেছেন তাতেই হবে।লীলা টিভির সামনে বসে আছে। লীলার পাশে আহসান। কিছুক্ষণ আগে নাটক শেষ হয়েছে। লীলা চোখে রুমাল চেপে বসে আছে। তার কান্না শেষ হয় নি, এখনো তার শরীর ফুলে ফুলে উঠছে।

আহসান বলল, আমি নাটক-সিনেমা বুঝি না, কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, মুহিবের অভিনয় অসাধারণ। সে তার ব্যক্তিগত হতাশা ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। যখন সে হাসতে হাসতে বলল, আমি চলে যাচ্ছি—কিন্তু আমি চাই তোমার সুন্দর সংসার হোক। তোমার উঠানে তোমার ছেলেমেয়েরা খেলা করুক। তখন তার হাসিতে কান্না ঝরে পড়ছিল। যদিও ডায়ালগ সস্তা ধরনের হয়েছে। তারপরেও।

লীলা বলল, রবীন্দ্রনাথের কবিতার দুটা লাইন বললে অনেক সুন্দর হতো—

আমি বর দিনু দেবী তুমি সুখী হবে

ভুলে যাবে সর্বগ্লানি বিপুল গৌরবে।

আহসান বলল, রবীন্দ্রনাথ ছাড়াই কিন্তু ইমোশন তৈরি হয়েছে। এ তো কম কথা না। মুহিবকে টেলিফোন কর।লীলা বলল, না।আহসান বলল, না কেন?

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

দিঘির জলে কার ছায়া গো পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

মুহিব বলল, লীলা ভালো আছে। ওর দুই ময়ূর চিত্রা এবং মিত্রা ভালো আছে। শুধু তার বাঁদরটার শরীর খারাপ করেছে। কাশি হয়েছে। মানুষের মতো খক খক করে কাশছে। লীলার বাবা শওকত সাহেব কলার ভেতর হোমিওপ্যাথিক ওষুধের দানা ভরে তাকে খেতে দিচ্ছেন। তার চিকিৎসা চলছে।

নিলি বলল, মুহিব, আপনি বসুন তো। কথা না বলে চুপ করে বসুন। আমি যা জিজ্ঞেস করব শুধু তার জবাব দেবেন! Something is very Wrong. I can feel it. টেবিলে খাবার দেয়া হোক। এর মধ্যে আমরা গল্পগুজব করি। আপনাকে পেয়ে ভালো লাগছে। আমি একা খেতে পারি না। সব পশু একা খেতে পছন্দ করে, শুধু মানুষ এবং পাখি এই দুই শ্রেণী একা খেতে চায় না।

মুহিব বলল, এটা আমি জানতাম না। পাখিদের বিষয়ে শুধু একটা বিষয় জানি। লীলার বাবা বলেছেন, পাখিরা আগে সরীসৃপ ছিল পরে পাখি হয়েছে।নিলি বলল, এই তথ্য আবার আমি জানি না। ভালোই হয়েছে, exchange of ideas. এখন বলুন, আপনি কি কোনো বিপদে পড়েছেন?

মুহিব বলল, আমি বিপদে পড়ি নি। আমার বাবা বিপদে পড়েছেন। মহাবিপদে। তিনি এখন থানা হাজতে ঘাপটি মেরে বসে আছেন। আপনাকে যেমন মশা কামড়ায়, বাবাকেও কামড়াচ্ছে।নিলি বলল, আমি কি কোনো সাহায্য করতে পারি? অবশ্য আমার তেমন কানেকশন নেই। পদ্মর বাবার অনেক কানেকশন। সে যেমন মানুষকে বিপদে ফেলতে পারে, আবার বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে। আমি একটা কথা বললে সে ফেলবে না।

মুহিব বলল, ম্যাডাম! আপনাকে কিছু বলতে হবে না।নিলি বলল, পদ্মর বাবা টেলিফোনে আপনার প্রশংসা করছিল। আপনি নাকি সজিরনকে ধমকাধমকি করে এসেছেন। ও বলছিল, যে ছেলে খাচায় ঢুকে বাঘকে খোচা দেয়ার সাহস রাখে, সেই ছেলের সাহসের তারিফ করতে হয়। আপনি চাইলেই সে আপনাকে ভালো একটা চাকরি দিয়ে দেবে। তাকে বলব? না।না কেন?

ম্যাডাম, আমি দুষ্ট লোকের চাকরি করি না। আমি হিমু হতে চাচ্ছি। হিমুরা দুষ্ট লোকের অধীনে কাজ করে না।আমি কোনো চাকরি দিলে করবেন? আমি ম্যানেজার জাতীয় একজনকে খুঁজছিলাম।ম্যাডাম, আপনার চাকরিও করব না।আমি তো দুষ্ট লোক না। আমার চাকরি কেন করবেন না? মুহিব বলল, এখন আপনি আমাকে দেখছেন খানিকটা বন্ধুর মতো। আমাকে নিয়ে টেবিলে খেতে বসছেন। আপনার চাকরি নেবার পরপর আপনি আমাকে দেখবেন বেতনভুক্ত কর্মচারীর মতো। আমাকে এক টেবিলে নিয়ে খেতে বসবেন।

আমি যদি অভিনয় করি, আমার বিপরীতে নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করবেন।নিলি বলল, খাওয়া দেয়া হয়েছে। খেতে আসুন। আর যদি আপনার আপত্তি না থাকে, আপনার বাবা কী সমস্যায় পড়েছেন সেটা বলুন।মুহিব বলল, আমার বাবা একটা মেয়েকে রেপ করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। এখন হাজতে আছেন।এই নিউজটাই কি পত্রিকায় এসেছে?

জি। ম্যাডাম, আমি কিছু খাব না। আমার মা এবং বোন সারাদিন আমার জন্যে অপেক্ষা করেছে। তাদের সঙ্গে দেখা হয় নি। তারা নিশ্চয়ই না খেয়ে আছে। ম্যাডাম, যাই! আপনার ছেলেটাকে দেখে এত ভালো লেগেছিল। কী মিষ্টি যে তার কথা! বলে কী— গোলাপ ফুল আমাকে গোঁতা দিয়েছে।মুহিব বাসায় ফিরল না। রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতে থাকল। প্রথম উপস্থিত হলো আলাউদ্দিন কোচিং সেন্টারে। সাইনবোর্ড এখনো আছে। সাইনবোর্ড নামানো হয় নি। কাল-পরশুর মধ্যে নিশ্চয়ই নামিয়ে ফেলবে। কোচিং সেন্টারের চারদিকে তিনবার চক্কর দিল। সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে গেল লীলাদের বাড়িতে।

পুরো বাড়ি অন্ধকার, শুধু লীলার ঘরে বাতি জ্বলছে। অর্থাৎ লীলা জেগে আছে। মুহিব ঠিক করল, লীলার ঘরের বাতি না নেভা পর্যন্ত সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে। বাতির দিকে তাকিয়ে থাকবে। কিছু না, একটা খেলা। অতিরিক্ত দুঃশ্চিন্তার সময় ছেলেমানুষী খেলা খেলতে ভালো লাগে।মুহিব বাসায় ফিরল রাত তিনটায়। তার মা এবং অশ্রু দুজনই না খেয়ে অপেক্ষা করছে। ভয়ে এবং দুঃশ্চিন্তায় দুজনই অস্থির।রাজিয়া বেগম বললেন, কোথায় ছিলিরে বাবা? মুহিব বলল, রাস্তায় হাঁটছিলাম। গরম পানির ব্যবস্থা কর তো মা, গোসল করব। তোমরা খাওয়াদাওয়া করেছ?

না।ঘরে রান্না কী? রান্না হয় নাই। ডিম ভাজি করে দেই? দাও।তোর বাবার অবস্থা কী? মুহিব বলল, বাবার আলাপ এখন থাকুক। বাবা ভালো আছেন। সিগারেট খাওয়া ধরেছেন। একজন হাজতি পাওয়া গেছে যে সিগারেটের বিনিময়ে বাবার পা টিপে দিচ্ছে।রাজিয়া বললেন, আমাকে নিয়ে যাবি? দেখা করতাম।দেখা করে কী বলবে? রাজিয়া জবাব দিলেন না। গরম পানির ব্যবস্থা করতে গেলেন। অশ্রু ভাইয়ের পাশে বসে রইল।মুহিব বলল, তোর ভূতটার খবর কী? এখনো খাটের নিচে বসে থাকে?

অশ্রু বলল, বাবার ঐ ঝামেলার পর ভূতটাকে দেখছি না।মুহিব বলল, বাবার ঘটনায় তুই বিশাল এক ধাক্কার মতো খেয়েছিস। সেই ধাক্কা ভূত বাবাজির গায়েও লেগেছে, ভূত পালিয়েছে। আমার মনে হয় না তুই এই ভূত আর দেখবি। সব মন্দের একটা ভালো দিক আছে।অশ্রু বলল, ভাইয়া, তোমার গা থেকে বিকট সিগারেটের গন্ধ আসছে।মুহিব বলল, একটার পর একটা সস্তা সিগারেট খেয়ে যাচ্ছি। গন্ধ তো আসবেই। এখন একটা ধরাব। পানি গরম না হওয়া পর্যন্ত সিগারেট ব্রেক।মুহিব সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, শূন্যে ভাসা খেলা দেখবি? শূন্যে ভাসা খেলা কী?

মুহিব বলল, আমি তোর চোখের সামনে শূন্যে ভেসে থাকব।অশ্রু বলল, ভাইয়া, আমার মনে হয় তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।মুহিব বলল, সম্ভাবনা আছে। ইচ্ছা করছে সারাক্ষণ শুন্যে ভেসে থাকি।আলাউদ্দিন আবার পত্রিকার প্রথম পাতায় চলে এসেছেন। পুলিশ তাকে তিনদিনের রিমান্ডে নিয়েছিল। রিমান্ডে তিনি সব স্বীকার করেছেন। পত্রিকার খবরের শিরোনাম–

ধর্ষক শিক্ষকের অপরাধ স্বীকার

ঘটনার রগরগে বর্ণনা

খবরের কাগজের প্রতিবেদক লিখছেন— ধর্ষক আলাউদ্দিন ছাত্রীকে নিজের খাসকামরায় ডেকে আনেন। ছাত্রীর লেখা রচনায় ইংরেজি বানানের ভুলগুলি ধরিয়ে দেবার জন্যে। এক পর্যায়ে তাকে বলেন— বাইরে হৈচৈ হচ্ছে, দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে এসো। সরল মনে ছাত্রী তাই করে। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি উঠে পড়েন এবং বলেন— দরজা পুরোপুরি না বন্ধ করলে শব্দ যাবে না। এই বলে নিজেই দরজার ছিটিকিনি লাগিয়ে দেন এবং ছাত্রীর সামনে এসে বসতে বসতে বলেন, তোমাকে আমার খুবই ভালো লাগে। কিন্তু আমার পক্ষে তোমাকে বিবাহ করা সম্ভব না। ঘরে আমার বড় বড় ছেলেমেয়ে আছে। এখন তোমার কাছে বৃদ্ধের একটা আবদার…

এই পর্যন্ত পড়ে মুহিব কাগজ ভাঁজ করে একপাশে রাখল। সে বসেছে আমানুল্লাহ টি স্টলে। নিলি ম্যামের বাড়ির কাছে টি স্টল। প্রায়ই সে এখানে চা খেতে আসে। তার সঙ্গে বড় লাল রঙের ফ্লাস্ক। আজ সারাদিনে তার অনেক কর্মকাণ্ড আছে। একেকটা কাজ শেষ করবে আর এক কাপ করে চা খাবে। প্রথম যাবে আলাউদ্দিন কোচিং সেন্টারে। কোচিং সেন্টারের বর্তমান প্রধান আবু হিশাম তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। জরুরি কী কথা না-কি আছে।মুহিবের পাশে বসা কাস্টমার বলল, ব্রাদার, কাগজটা কি পড়া হয়েছে? হ্যাঁ।ইন্টারেস্টিং কিছু আছে?

ধর্ষণ নিউজ আছে। পড়লে মজা পেতে পারেন। মুহিব কাগজ এগিয়ে দিল। তার দুকাপ চা খাওয়া হয়ে গেছে। এখন উঠে যাবার সময় হয়েছে। উঠতে ইচ্ছা করছে না। আবার বসে থাকতেও ভালো লাগছে না। গত পাঁচদিন তার বাবার সঙ্গে মুহিবের দেখা হয় নি। ওসি সাহেব বলেছেন আজ দেখা করা যাবে। আজকের পর দেখা করা সমস্যা হবে। তাকে থানা-হাজত থেকে জেল-হাজতে পাঠিয়ে দেয়া হবে।

মুহিব আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দিল। তার পাশে বসা লোক গভীর আগ্রহে আলাউদ্দিনের স্বীকারোক্তি পড়ছে। মুহিব তাকিয়ে আছে লোকটির দিকে এবং চিন্তা করছে বাবাকে নিয়ে তার নিজের আনন্দের কোনো স্মৃতি আছে কি-না। তেমন কিছু মনে পড়ছে না। কোনো না কোনো স্মৃতি নিশ্চয়ই আছে। মাথা Blank হয়ে গেছে। অশ্রুকে জিজ্ঞেস করতে হবে। মেয়েরা সুখের স্মৃতি দুঃখের স্মৃতি সবই মনে করে রাখে। কিছুই ভোলে না।ব্রাদার! বুড়ার কারবার পড়েছেন?

হুঁ।আরে তোর এই অবস্থা—তুই বেশ্যাবাড়ি যা, চন্দ্রিমা উদ্যানে যা। দিনেদুপুরে ছাত্র-ছাত্রীর সামনে দরজা বন্ধ করে এইসব কী? এদের কী করা উচিত জানেন? স্টেডিয়ামে সবার সামনে গুলি করা উচিত। ফায়ারিং স্কোয়াড।মুহিব ফ্লাস্ক হাতে উঠে পড়ল। ফায়ারিং স্কোয়াড-বিষয়ক আলোচনায় অংশ নিল না।আবু হিশাম অফিসেই ছিলেন। মুহিবকে দেখে গম্ভীর গলায় বললেন, আজকের কাগজ পড়েছ?

আজ বুধবার। মিথ্যাদিবস। কাজেই মুহিব বলল, না।না পড়ে ভালোই করেছ। তোমার বাবা অতি নোংরা কথাবার্তা নিজের মুখে স্বীকার করেছে। মানুষটা যে বিকারগ্রস্ত আগে বুঝতে পারি নাই। কঠিন বিকার ছাড়া এই ধরনের কথাবার্তা বলাও সম্ভব না। নিজের অপমান। তার ঘনিষ্ঠজনের অপমান। বন্ধুবান্ধবদের অপমান।মুহিব বলল, জরুরি কী কথা বলার জন্যে না-কি খবর দিয়েছেন?শুনলাম জমিটা বিক্রি করার চেষ্টা করছ। দালাল লাগিয়েছ? জি চাচা।জমি বেঁচলে তোমরা থাকবে কোথায়?

মার এক ছোটভাই আছেন, বাড্ডায় থাকেন। মোটর মেকানিক। মাকে আর অশ্রুকে ঐ বাড়িতে পাঠিয়ে দিব।আর তুমি? তুমি কোথায় থাকবে? আমার ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করি নাই চাচা। সব চিন্তা একটার পর একটা করতে হয়। একসঙ্গে তিন-চারটা চিন্তা করা যায় না।জমির দাম কত চাও? বাজারে যে দর আছে তাই চাই। সেটা পাব বলে মনে হয় না।খদ্দের পাওয়া গেছে?

একজন পেয়েছি, সাত লাখ দিতে চায়। বলেছে রাজি হলে আগামীকাল বায়না করবে (এটা মিথ্যা। একজন পাওয়া গেছে ঠিকই, তবে সে চার লাখ দাম বলছে। বুধবার হবার কারণে অনায়াসে মিথ্যা বলতে পারছে।) মুহিব! এই জমিটা নিয়ে আমার কিছু কথা আছে।জি চাচা বলুন।তোমার বাবা এবং আমি দুজনে মিলে ঠিক করি জমিটা কিনব। বায়নার টাকা অর্ধেক আমার দেয়া। বিশ্বাস না হলে তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পার।

যাই হোক, তোমার পিতা ছিলেন অতি ধান্ধাবাজ লোক। জমি কিনলেন তার নামে। পুরনো প্রসঙ্গ তুলে লাভ নাই। জমিটা আমি কিনব। তবে পাঁচ লাখ টাকার বেশি একটা কানা পয়সাও পাবে না।মুহিব বলল, ইচ্ছা করলেও কানা পয়সা দিতে পারবেন না চাচা। কানা পয়সা বলে কিছু বাজারে নাই।তোমার সঙ্গে রসিকতা করার সময় আমার নাই। পাঁচ লাখে দিবে?

জি দিব। যদি টাকাটা আজকালের মধ্যে পাই।টাকা আগামীকাল দিব। জানি তোমার টাকাটা ইমিডিয়েট দরকার। এখন বায়না বাবদ কিছু নিয়ে যাও।তিনি ড্রয়ার খুলে পঁচিশ টাকার একটা বান্ডেল বের করলেন। একটা স্ট্যাম্প পেপার বের করলেন, সেখানে আগেই টাইপ করে লেখা— বায়না বাবদ পঞ্চাশ হাজার টাকা বুঝিয়া পাইলাম। ইত্যাদি। মুহিবকে স্বীকার করতে হলো, হিশাম নামের মানুষটা কাজেকর্মে যথেষ্ট গোছানো।মুহিব বলল, চাচা, চা খাবেন? চা ?

জি চা। খুব ভালো চা, আফিং দেয়া। এককাপ খেলে আরেক কাপ খেতে ইচ্ছা করবে।হিশাম সাহেব চোখ সরু করে তাকিয়ে আছেন। মুহিব ফ্লাস্ক খুলে ফ্লাস্কের মুখে চা ঢালছে। হিশাম সাহেব না খেলে সে নিজেই খাবে।হিশাম বললেন, আমি চা পান করি না।মুহিব বলল, চাচা, অনুমতি দিলে আমি পান করে ফেলি? তারপর ফ্রাঙ্ক নিয়ে বাবার কাছে যাব। বাবাকে পান করাব।

আলাউদ্দিন উবু হয়ে বসে চুক চুক করে চা খাচ্ছেন। তার গায়ে হাতাকাটা গেঞ্জি। পরনে লুঙ্গি। লুঙ্গি সামান্য উঁচু হয়ে আছে বলে কাঠি কাঠি পা দেখা যাচ্ছে। তাকে এখন মোটামুটি একজন ভিখেরির মতোই লাগছে। চোখের চশমাটা শুধু পোশাকের সঙ্গে যাচ্ছে না। চশমার বা-দিকের কাচটা ভেঙে তিন টুকরা হয়ে ফ্রেমের সঙ্গে ঝুলে রয়েছে।মুহিব বলল, চশমা ভাঙল কীভাবে?

আলাউদ্দিন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন, ভালো চা বানিয়েছে। তোর মা যে চা বানায় মুখে দেয়া যায় না। মনে হয় ঘোড়ার পিশাব। জীবন পার করে দিয়েছি ঘোড়ার পিশাব খেয়ে।মুহিব বলল, জায়গা বিক্রির ব্যবস্থা হয়েছে। হিশাম চাচা কিনবেন।কিনুক। বদের বাচ্চা।হিশাম চাচা বলছিল, তোমরা দুজন মিলে একসঙ্গে জমিটা কিনতে চেয়েছিলে। বায়নার টাকার অর্ধেক তুমি দিয়েছিলে, অর্ধেক উনি দিয়েছেন।বদটার কোনো কথা বিশ্বাস করবি না। বায়নার সময় কিছু টাকা ধার করেছিলাম, পরে শোধ দিয়েছি। বাদ দে এইসব কথা। জমি বিক্রির পর তোর মা-বোন কোথায় যাবে কিছু ভেবেছিস?

বাড়ায় সালাম মামার কাছে পাঠিয়ে দেব। সালাম মামা মাকে পছন্দ করেন। প্রতি ঈদে শাড়ি পাঠান।বুদ্ধি খারাপ না। সালামটা বেকুব টাইপ। বোনকে রাস্তায় ফেলবে না। কিছুদিন অবশ্যই রাখবে। এর মধ্যে আমি বের হয়ে ব্যবস্থা করে ফেলব।কী ব্যবস্থা করবে? কোচিং সেন্টার দেব। আর কী করব? যে জুতা সেলাই করে সে সারাজীবন জুতা সেলাই করে, অন্যকিছু করতে পারে না। মেয়েটাকে পাঁচ লাখ টাকা কবে দিবি কিছু ঠিক করেছিস?

মুহিব বলল, টাকা হাতে পেলেই দিব।তিন-চারের মধ্যে রক্ষা করা যায় কি-না দেখবি। টাকা দেয়ার সময় চোখের পানি ফেলে রিকোয়েস্ট করবি? পুরো বিষয়টাই যে সাজানো এটা তুই জানিস না এইরকম ভাব করবি।আচ্ছা।রিমান্ডে পুলিশের মার খেয়ে অনেক কিছু বলেছি। এটা আমি যেমন জানি ঐ মেয়েও জানে। কোনো একদিন মেয়েটা স্বীকার করবে।আলাউদিনের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। মুহিব বলল, আরেক কাপ চা খাও। একটা সিগারেট ধরাও চা দিব বাবা?

দে।চশমাটা দিও, কাচ ঠিক করে ফেরত দিয়ে যাব।আলাউদ্দিন কিছু না বলে চশমা খুলে ছেলের হাতে দিলেন। মুহিব বলল, আমার সঙ্গে টাকা আছে। হিশাম চাচা দিয়েছেন। পঞ্চাশ হাজার। তোমার হাতে কিছু টাকা দিব? টাকা সঙ্গে সামান্য আছে। লাগবে না। হাজত জায়গা খারাপ। টাকা চুরি লেগেই আছে।রাতে ঘুম হয়?

না। তবে অসুবিধা হয় না। দিনে ঘুমাই।কোনো গানটান এর মধ্যে মাথায় এসেছে? একটা নোটখাতা আর কলম কিনে দেই? মাথায় কিছু এলে লিখে ফেলবে। অনেকদিন গান লেখ না।আলাউদ্দিন হেসে ফেললেন। মুহিব বলল, বাবা, আমি উঠি? তোমার আর কিছু বলার থাকলে বলো।আলাউদ্দিন বললেন, একটা কথা বলার আছে। সারাজীবন তোকে গাধা বলেছি। অর্ধমানব বলেছি। হাজতে এসে বুঝতে পেরেছি, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পুণ্য তোর মতো গাধামানবের জন্ম দেয়া।আলাউদ্দিন আবার কাঁদতে শুরু করলেন। মুহিব বলল, বাবা, চায়ে চুমুক দাও।

আলাউদ্দিন কাঁদতে কাঁদতেই চায়ে চুমুক দিয়ে বিষম খেলেন। মুহিব বাবার পিঠে হাত রাখল। আলাউদ্দিন নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ছোট্ট ভুল কথা বললাম, হাজতে ঢুকে বুঝেছি এটা ঠিক না। তুই যে রাতে কোলে করে তোর মাকে ঘরে নিয়ে গেলি সেদিনই বুঝেছি।মুহিব উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, বুঝলে বুঝেছ। বাবা, আমি এখন যাচ্ছি।বাসায় যাবি?

কিছু কাজ আছে। কাজ সেরে বাসায় যাব।তোর বড় দুই বোন রেশমা, শিউলি, এরা কোনো খোঁজখবর করেছে? রেশমা আপু কুরিয়ারে একটা চিঠি পাঠিয়েছে।সঙ্গে আছে? আছে। তোমার না পড়াই ভালো।আলাউদ্দিন বিরক্ত গলায় বললেন, সিচুয়েশন বুঝতে হলে ভালো-মন্দ সব কিছুই জানা দরকার। একচক্ষু হরিণের মতো হলে চলবে না। শুধু ভালো দেখব, মন্দ দেখব না।মুহিব চিঠি রেখে চলে গেল।

চিঠি মুহিবকে লেখা—

প্রিয় খোকন (মুহিবকে রেশমা খোকন ডাকে),

কুত্তা বাপের কারণে আজ আমি অকূলপাথারে। দিনরাত তোর দুলাভাইয়ের কথা শুনতে হচ্ছে! সেদিন গায়ে পর্যন্ত হাত তুলেছে। আগে এই সাহস ছিল না। লোক জানাজানির আগে তুই কুত্তা বাপটার গলা টিপে মেরে ফেলতে পারলি না?…

আলাউদ্দিন দীর্ঘ চিঠি দুবার পড়ে বললেন, ভেরি স্যাড। দশটা বানান ভুল।আজ সকাল থেকেই লীলা ছাদে। আহসান ট্রাকভর্তি গাছপালা নিয়ে এসেছে। ছাদে বাগান হবে। একজন মালি এসেছে। রাজমিস্ত্রি এসেছে। সিঙ্গাপুর থেকে কিছু মূর্তিও আনা হয়েছে। পরীর মূর্তি। মূর্তিগুলি গাছপালার ফাকে ফাকে বসানো হবে। আহসান বলল, লীলা, তুমি তোমার ঘরে থাক। আমি ছাদটা গোছাই, তারপর ছাদে এসে দেখে চমকাবে।

লীলা বলল, আমিও আপনার সঙ্গে গোছাব। সব রেডি হয়ে গেলে মুহিবকে আসতে বলব। সে চমকাবে।আহসান বলল, সব নদী যেমন সাগরে পড়ে, তোমার সব কথাবার্তা মুহিবে শেষ হয়।লীলা বলল, আমি নিজে চমকাতে পছন্দ করি না, তবে মুহিবকে চমকাতে পছন্দ করি।

আহসান বলল, মুহিবের বাবা যে ধর্ষণ মামলায় জেলে আছেন এই খবর জানো?আপনাকে কে বলেছে? মুহিব? হ্যাঁ। মুহিবের এই গুণটি দেখলাম, তার মধ্যে লুকোছাপা নেই। সত্যি কথা বলে।লীলা বলল, বুধবারে সে সত্যি বলে না। বুধবার হচ্ছে তার মিথ্যাদিবস। ঐদিন সে মিথ্যা বলবে।তোমার কাছেও? হ্যাঁ, আমার কাছেও।এর কারণ কী জানো? লীলা বলল, জানি না। জানতে চাইও নি।

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

দিঘির জলে কার ছায়া গো পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

অশ্রুকে সাথে নিয়ে আসিস। সেও যেন ওসি সাহেবের পায়ে ধরে। এক লাখ বিশ থেকে দশ চলে গেল। বাকি থাকল এক লাখ দশ। দশ দিবি উকিলকে। হমিদুজ্জামান নামে আমার পরিচিত এক ক্রিমিনাল লইয়ার আছে। ঘাগু লোক। ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি, তার সঙ্গে দেখা করবি।আচ্ছা।

এক লাখ টাকা নিয়ে ঐ মেয়েটার সঙ্গে দেখা করবি। তোর মাকে সাথে নিয়ে যাবি। মামলা যাতে তুলে নেয় সেই ব্যবস্থা করা যায় কিনা দেখবি। টাকা আগেই দিবি না। যদি বলে মামলা তুলে নিবে তখন দিবি। মনে হয় তুলবে না।মেয়েটার নাম কী?

সালমা। বাবার নাম আশরাফ। তার ঠিকানা জানি না। মিরপুরে কিসের যেন দোকান আছে। খুঁজে বের করবি। কোচিং সেন্টারের রেজিষ্টারে ঠিকানা আছে। বের করতে পারবি না? পারব।আলাউদ্দিন হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে আরেকটা ধরলেন। কিছুক্ষণ কাশলেন, তারপর লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, তুই অন্যদিকে তাকিয়ে আছিস কী জন্যে? কোনোরকম ঘটনা ঘটে নাই। মিথ্যা মামলা।মিথ্যা মামলা?

অবশ্যই। যে-কোনো গাধা বুঝবে মিথ্যা মামলা। তোর বুদ্ধি গাধারও নিচে বলে ভেবেছিস সত্যি। বাবার দিকে তাকাচ্ছিস না। অথচ আমি তোর জন্মদাতা পিতা। এক হাদিসে আছে— রসুলুল্লাহ সাল্লালাহে আলায়হেস সালাম বলেছেন, আমি যদি আল্লাহপাক ব্যতীত অন্যকাউকে সেজদা দেয়ার হুকুম দিতাম সে হতো জন্মদাতা পিতা। বুঝেছিস?

জি।মামলা যে মিথ্যা প্রমাণ দেই। যদিও তোর কাছে প্রমাণ দেয়ার কিছু নাই। তুই তো হাকিম না। প্রমাণ করতে হবে কোটে। যাই হোক শোন, ঘটনা ঘটেছে বেলা বারোটায়। বারোটায় কোচিং-এর ক্লাস হচ্ছে। চারদিকে ছাত্র-ছাত্রী। এর মধ্যে আমি এক মেয়েকে ঘরে ঢুকাব। দরজার ছিটকানি লাগাব। এটা কি সম্ভব? আর ঐ হারামজাদি সালমা দেখছে আমি দরজা বন্ধ করছি, সে কিছুই বলবে না? সে একটা চিৎকার দিলেই তো সব ছুটে আসে। দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করতে হয় না। বুঝতে পারছিস?

হুঁ।মিথ্যা মামলাটা কেন করেছে শোন। কোচিং সেন্টারে আমার শেয়ার ফিফটি, বাকি ফিফটি হিশামের। চলে আমার নামে আলাউদ্দিন কোচিং সেন্টার। সবাই একনামে চিনে। গত বছর থেকে টাকা আসা শুরু হয়েছে। আমাকে আউট করা দরকার। পুরা ঘটনা সাজায়েছে হিশাম। সালমা মেয়েটা তার আত্মীয়। ভাগ্নি না কী যেন হয়।আমি কি হিশাম চাচার সঙ্গে দেখা করব?

করতে পারিস। যা করবি বিবেচনা করে করবি। গাধার মতো কিছু করবি। মাথা ঠান্ডা রাখবি। যে-কোনো বিপদ থেকে উদ্ধারের একটাই পথ— মাথা ঠান্ডা রাখা। You got to keep your head cool, চেকবইটা দে। এক কাপ চা জোগাড় করা যায় কি না দেখ।

ক্রিমিনাল লইয়ার হামিদুজ্জামানের চেহারা ক্রিমিনালদের মতো। মুখভর্তি খোচা খোচা দাড়ি। ছোট ছোট চুল। মাথা কামানো। যখন কথা বলেন না তখন ঠোট উল্টে রাখেন। তার টেবিলে ছোট্ট আয়না আছে। ঠোট উল্টে আয়নায় নিজেকে দেখেন। চেয়ারের পাশে পিতলের পিকদানি। কিছুক্ষণ পরপর সেখানে থুথু ফেলেন।মুহিব বলল, স্যার। বাবা বলেছেন, মিথ্যা মামলা।

হামিদুজ্জামান থুথু ফেলে কিছুক্ষণ ঠোট উল্টা করে বসে রইলেন। তারপর বললেন, বাবারে, সত্য মামলা মিথ্যা মামলা বলে কিছু নাই। মামলা হলো জজ সাহেব। উনি যখন বলবেন মামলা মিথ্যা, তখন সত্য মামলাও মিথ্যা। টাকাপয়সা কী এনেছ?

দশ হাজার টাকা এনেছি।যেখানে এক সমুদ্র পানি লাগে সেখানে এক চামচ পানি নিয়ে উপস্থিত হয়েছ। মামলার ধরন খারাপ। নন বেলেবল। জামিন হবে না। সেখানে কোর্টে চালান করা মাত্র জামিনে ছাড়ায়ে নিয়ে আসব। আলাউদ্দিনের চেরাগের দৈত্য দিয়ে তো আনতে পারব না। টাকা দিয়ে ছুটায়ে আনতে হবে। মেয়ের ডাক্তারি পরীক্ষা কি হয়েছে?

জানি না।ভোমার জানার প্রয়োজনও নাই। যদি মামলা আমি নেই তখন আমিই জানব। ডাক্তারকে টাকা খাওয়ায়ে সার্টিফিকেট বের করব ধর্ষণের আলামত সনাক্ত করা যায় নাই। এই বাবদই শুধু লাগবে পঞ্চাশ হাজার। বুঝেছ?

জি। এত টাকা তো আমাদের নাই চাচা।হামিদুজ্জান থুথু ফেললেন। ঠোট উল্টে কিছুক্ষণ বসে থাকলেন। তারপর হাসিমুখে বললেন, তাহলে তো বাবা কিছু করার নাই। তোমার পিতাজিকে কম করে হলেও সাত বছর জেলে থাকতে হবে। তোমাকে পরিষ্কার বলি, ক্রিমিনাল লইয়ার হিসাবে আমার নামডাক আছে। লোকে বলে, ফাঁসির দড়ির ভেতর থেকে আমি আসামি খালাস করে আনতে পারি। কথার মধ্যে কিছু সত্য আছে। তবে লইয়ার আমি ভালো না। আমি টাকা খাওয়ানোতে ভালো।

কাকে টাকা খাওয়াতে হবে, কীভাবে টাকা খাওয়াতে হবে, এটা আমি জানি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা নৃত্যনাট্য আছে, নাম মায়ার খেলা। কোর্টের নৃত্যনাট্য হলো— টাকার খেলা। তুমি যাও, তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলে।শুরুতে মিনিমাম এক লাখ টাকার ব্যবস্থা করতে পারলে আসবে। ব্যবস্থা করতে না পারলে আসবে না। তোমার বাবা আমার পূর্বপরিচিত, এটা ঠিক আছে। পরিচয়ে কিছু হবে না। তোমার বাবাকে কি কোর্টে চালান দিয়েছে? চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কোর্টে হাজির করার নিয়ম। রিমান্ডের অর্ডার যদি পুলিশ বের করে ফেলে তাহলে সাড়ে সর্বনাশ।মুহিব বলল, দশ হাজার টাকা নিয়ে এসেছি চাচা, টাকাটা কি রাখবেন?

হামিদুজ্জামান থুথু ফেলতে ফেলতে বললেন, না।মুহিব উঠে দাড়াল। এখন সে যাবে আলাউদ্দিনের কোচিং বিজনেসের পার্টনার হিশাম সাহেবের কাছে। মুহিব তাকে ভালো করেই চেনে। অনেকবার তাদের বাড়িতে এসেছেন। শান্ত-ভদ্র চেহারা। হজ্জ করে আসার পর দাড়ি রেখেছেন। চোখে সুরমা দেন। গলার স্বর মিষ্টি।হিশাম সাহেব কোচিং সেন্টারেই ছিলেন।

মুহিকে দেখে বললেন, তুমি আসবে জানতাম। কী ঘটনা ঘটে গেছে দেখেছ? কেউ কি আর এই কোচিং সেন্টারে ভর্তি হবে? ছিঃ ছিঃ, কী কেলেংকারি! সালমা মেয়েটা আমার আপন ভাগ্নি। তার সামনে মুখ দেখাতে পারি না। আমি তাকে বললাম, দরজা ভেঙে তোকে বের করতে হলো কেন? আগে চিৎকার দিলি না কেন? গাধি মেয়ে বলে, লজ্জায়। এখন লজ্জা কই গেল! দুনিয়ার পত্রিকার তোক বাড়িতে আসছে। এক টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক এসেছে ক্রাইম রিপোর্টিং করবে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ।মুহিব বলল, চাচা, আমি কি সালমা মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে পারি? কী কথা বলবে?

মুহিব চুপ করে রইল। হিশাম বললেন, তোমার তো কথা বলার কিছু নাই। তোমার বাপ এত বড় একটা ঘটনা ঘটায়েছে— তুমি ছেলে হয়ে তার সামনে যাকে কীভাবে? মুহিব বলল, তাও ঠিক।হিশাম বললেন, জানাজানি বেশি হয়ে গেছে। জানাজানি কম হলে ঘটনা ধামাচাপার ব্যবস্থা করতাম। এখন সেই পথও নাই।চাচা, মেয়েটার সঙ্গে কি আমি টেলিফোনে কথা বলতে পারি?

তুমি কথা বলার জন্য কেন অস্থির হয়েছ বুঝলাম না। তোমার কথা বলার তো কিছু নাই।মুহিব বলল, বাবার হয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইতাম। পায়ে ধরে পড়ে থাকতাম।তুমি কি ভেবেছ পায়ে ধরে পড়ে থাকলেই সে মামলা তুলে নিবে? মামলা তুলতে তো চাচা বলছি না। মামলায় বাবার যা হয় হবে। আমরা উকিলও দেই নাই।দাও নাই কেন?

উকিল যত টাকা চায় অত টাকা নাই। আমি ধরেই নিয়েছি বাবার সাত বছরের জেল হবে।হিশাম বললেন, তুমি সালমার সঙ্গে কথা বলতে চাও দেখি কী করা যায়। কয়েকটা দিন যেতে দাও। পরিস্থিতি ঠান্ডা হোক। মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। জামাই জনতা ইনস্যুরেন্সের ক্যাশিয়ার। বিয়ে ভেঙে গেছে। এই নিয়েও বাড়িতে কান্নাকাটি। এই মেয়ের আর বিয়ে হবে বলে মনে হয় না।সন্ধ্যাবেলা মুহিব গেল লীলার কাছে। লীলা চমকে উঠে বলল, কী হয়েছে? তোমাকে এরকম লাগছে কেন?

মুহিব বলল, আজকের কাগজ পড়েছ? কাগজের ফ্রন্ট পেজে বাবার ছবি ছাপা হয়েছে। কয়জনের বাবার ছবি ফ্রন্ট পেজে ছাপা হয়? এই আনন্দেই আমার চেহারা অন্যরকম হয়ে গেছে।লীলা বলল, উনার নাম কি আলাউদ্দিন? হ্যাঁ।লীলা বেশ কিছু সময় চুপ করে থেকে বলল, তুমি দুপুরে কিছু খেয়েছ? না।

বাথরুমে যাও, হাত-মুখ ধোও। তারপর টেবিলে আস। মাংস রান্না করা আছে। পরোটা ভেজে দেবে। নতুন একটা মেয়ে পেয়েছি। আসমা নাম। ভালো পরোটা বানায়। বসে আছ কেন? হাত-মুখ ধুতে যাও।মুহিব খেতে বসেছে। লীলা বসেছে তার সামনে। এত আগ্রহ করে খাচ্ছে, লীলার চোখ ভিজে ওঠার উপক্রম হলো। লীলা বলল, ডেভিড ব্রেইনের নাম শুনেছ? না।উনি একজন ম্যাজিশিয়ান। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের পথে পথে তিনি ম্যাজিক দেখান। স্ট্রীট ম্যাজিশিয়ান। কী ম্যাজিক দেখান জানো? কী ম্যাজিক? শূন্যে ভাসার ম্যাজিক। তুমি শিখবে?

মুহিব বলল, না। আমি তো শূন্যে ভেসেই আছি।তুমি যখন শূন্যে ভেসেই আছ, তোমার জন্যে সুবিধা হবে। আমি তোমাকে আহসান সাহেবের কাছে পাঠাব। তিনি তোমাকে শিখিয়ে দেবেন। আজ যেতে পারবে? রাত আটটার পর।শূন্যে ভেসে থাকার ম্যাজিক শিখে কী করব? মাঝে মাঝে আমার সামনে শূন্যে ভেসে থাকবে। আমি দেখে মজা পাব। যেতে পারবে? বলব উনাকে টেলিফোন করে?

বলো।পরোটা কেমন হয়েছে? খুব ভালো। দুটা পরোটা আর মাংস কি প্যাকেট করে দিতে পারবে? কেন? বাবার জন্যে নিয়ে যাব।দিয়ে দেব। পরোটা মাংস ছাড়া আর কিছু কি লাগবে? না। তারপরই মুহিব বলল, তোমাকে একটা কথা বলার জন্য এসেছি। বাবা এই নোংরা কাজটা করেন নি।লীলা বলল, তুমি যখন বলছ করেন নি, তাহলে অবশ্যই করেন নি। তুমি কি এখন তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাবে? হ্যাঁ।রাত আটটায় আহসান সাহেবের কাছে যাবে, মনে আছে?

মনে আছে।কাগজে ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। এক কাজ করি, তোমাকে গাড়ি দিয়ে দেই। ড্রাইভার তুমি যেখানে যাবে নিয়ে যাবে। দেই? না।লীলা বলল, তোমার হাত-পা কাঁপছে? কেন? জানি না কেন? তোমার সঙ্গে গাড়িটা থাকুক প্লিজ। আরেকটা কথা শোন, মনে কর তোমার বাবা এই কাজটা করেছেন, তার জন্যে আমি কখনো, কোনোদিনও তোমাকে দায়ী করব না। Never ever. মুহিব বলল, আমি সেটা জানি।সত্যি জানো?

হ্যাঁ। আমি আমার জীবনে নিজের অজান্তেই কোনো একটা মহাপুণ্য করেছিলাম বলে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে।মহাপুণ্যটা কী তুমি জানো না? না।লীলা হাসতে হাসতে বলল, আমি কিন্তু জানি। তুমি আমাকে নর্দমা থেকে টেনে তুলেছ। এইটাই মহাপুণ্য।আলাউদ্দিন মাংস-পরোটা খাচ্ছেন। তিনি ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, কোন রেস্টুরেন্ট থেকে এনেছিস?

মুহিব বলল, লীলা হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট।ওয়ান্ডারফুল রান্না। পরোটা হয়েছে মাখনের মতো মোলায়েম। ঘি দিয়ে ভেজেছে মনে হয়, ঘিয়ের গন্ধ পাচ্ছি।বাবা, আরাম করে খাও।ওসি সাহেবের টাকাটা এনেছিস? এনেছি।পায়ে ধরার কথা মনে আছে তো? মনে আছে।বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্যে পায়ে ধরা যায়। দোষ হয় না।তুমি কখনো কারো পায়ে ধরে বাবা? না। হামিদুজ্জামান সাহেবকে টাকা দিয়েছিস? ঘাগু লইয়ার। কেইস পানি করে ছেড়ে দিবে।মুহিব বলল, উনি শুরুতেই এক লাখ টাকা চান।বলিস কী? সস্তা কাউকে খুঁজে বের করা দরকার। বদ মেয়েটার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিস? না।

গাধার মতো কাজ করলে হবে মাথায় এত বড় বিপদ।মুহিব বলল, তার বাবার সূত্রে টেলিফোনে কথা বলেছি। কোচিং সেন্টার থেকে উনার নাম্বার জোগাড় করেছিলাম।আলাউদ্দিন বিরক্ত গলায় বললেন, টেলিফোনে কথা চালাচালি কী জন্যে? সামনাসামনি কথা বলবি। না-কি আমার কারণে মুখ দেখাতে লজ্জা হয়? ঐ লোক কী বলেছে? উনি টাকা দিতে রাজি হয়ছেন।রাজি হয়েছে?

হুঁ। উনি পাঁচ লাখ টাকা চান। পাঁচ লাখ দিলে মামলা তুলে নিবেন বলেছেন। তার বিজনেস খারাপ যাচ্ছে, এইজন্যে টাকাটা দরকার।আলাউদ্দিন হতাশ গলায় বললেন, পাঁচ লাখ কই পাব? মুহিব বলল, উনি টাকা নিলেন, তারপর মামলা তুললেন না? আলাউদ্দিন বিরক্ত গলায় বললেন, আগেই কু ডাক ডাকা শুরু করলি? জায়গাটা বেচে দে। চার কাঠা জায়গা। পাঁচ ছয় লাখ পাওয়ার কথা।আমরা থাকব কোথায় বাবা?

আমি জেল থেকে বের হই। একটা কিছু ব্যবস্থা করবই। জায়গা বেচে দে। দ্রুত ব্যবস্থা করা মামলা কোর্টে ওঠার আগেই ব্যবস্থা করা দরকার। তোর মা আছে কেমন? ভালো? আমার বিষয়ে কিছু বলে? বোকা মেয়েমানুষ। যা শুনবে সবই বিশ্বাসী করবে। ধরেই নিয়েছে আমি এই কাজ করেছি। ধরে থাপড়ানো দরকার।মুহিব বলল, মা তো কিছুই বলছে না। শুধু শুধু তাঁকে থাপড়ানোর কথা কেন বলছ?

কথার কথা বলছি। দুই প্যাকেট সিগারেট কিনে নিয়ে আয়। মশার কামড়ে রাতে এক ফোঁটা ঘুম হয় না। সারারাত জেগে থাকি আর সিগারেট খাই।মুহিব উঠে দাঁড়াল। বাবার এখান থেকে সেযাবে আহসান সাহেব নামে এক লোকের কাছে। তিনি তাকে শূন্যে ভেসে থাকা শেখাবেন। তারপর সে কী করবে? বাসায় ফিরে যাবে? আতঙ্কে অস্থির হয়ে থাকা মা এবং বোনের সামনে বসে থাকবে। মোটেই ইচ্ছা করছে না। তারচেয়ে বরং নিলি ম্যাডামের কাছে যাওয়া যায়। তিনি নিশ্চয়ই আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন জন্মদিনের উপহার পেয়ে ছেলে কী করেছে তা জানার জন্যে।

হয়তো নিলি ম্যাডাম বাড়িতে ঢুকতে দেবেন না। তখন সে রাস্তায় হাঁটবে। পুরোপুরি হিমু হয়ে যাবে। টহল পুলিশ যদি জিজ্ঞেস করে সে বলবে, আমি হিমু।পুলিশ জিজ্ঞেস করবে, যাচ্ছেন কোথায়? সে বলবে, জানি না। হিমুরা কোথায় যায় তারা জানে না।নিলি ম্যাডামের গেটের দারোয়ান মুহিবকে চিনল। মুখভর্তি করে হাসল।স্যার, ভালো আছেন?

মুহিব বলল, ভালো আছি।যান ভেতরে চলে যান।লেখাপড়া করতে হবে না? দারোয়ান বলল, না, ম্যাডাম বলে দিয়েছেন আপনার ব্যাপারে কিছু লাগবে। চলে যান।দরজা খুলে নিলি মোটেই অবাক হলো না। তার ভাব দেখে মনে হলো সে অপেক্ষা করছিল। নিলি বলল, আপনি নিশ্চয় কোনো সমস্যায় পড়েছেন। আপনাকে ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে।মুহিব বলল, সমস্যায় পড়ি নি। আপনাকে একটা জিনিস দেখাতে এসেছি। দেখিয়ে চলে যাব।কী দেখাবেন?

সোফায় বসুন। দেখাচ্ছি। জিনিসটা দেখাবার জন্যে আমাকে একটা বিশেষ জায়গায় দাড়াতে হবে।নিলি সোফায় বসেছে। তার চোখেমুখে একই সঙ্গে শঙ্কা এবং কৌতূহল।মুহিব বলল, আপনার ড্রয়িংরুমে আলো বেশি। কিছু কমিয়ে দেই? দিন।মুহিব কয়েকটা বাতি নিভিয়ে নিলির সামনে দাঁড়াল। ক্লান্ত গলায় বলল, আপনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকুন। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখবেন আমি শূন্যে ভাসছি।নিলি বলল, পাগলের মতো এইসব কী বলছেন? আপনার কী হয়েছে? সমস্যাটা কী?

মুহিব বলল, এই দেখুন ভাসছি।নিলি হতভম্ব গলায় বলল, আসলেই তো ভাসছেন! কী আশ্চর্য! কতক্ষণ ভেসে থাকতে পারেন? বেশিক্ষণ পারি না।মিলি বলল, এইসব কী দেখাচ্ছেন? আমি জীবনে এত অবাক হই নি। নেমে পড়ুন। দেখে মনে হচ্ছে আপনার কষ্ট হচ্ছে। আসলেই শূন্যে ভেসেছেন, নাকি এটা কোনো Tricks? মুহিব শূন্য থেকে নামল। কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, ম্যাডাম যাই? অনেক রাতে এসেছি বলে কিছু মনে করবেন না।

নিলি বলল, যাবেন মানে? আপনি আমার সঙ্গে ডিনার করবেন। আমি কয়েকবার আপনাকে টেলিফোন করেছি। আপনি টেলিফোন ধরেন নি, লাইন কেটে দিয়েছেন। গতকাল আপনার শুটিং ছিল, আপনি আসেন নি। কী হয়েছে আপনার জানতে পারি? আমার কিছু হয় নি ম্যাডাম। আমি ভালো আছি।আপনার বান্ধবী রূপা।–সে কি ভালো আছে? ওর নাম লীলা।লীলা ভালো আছে?

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

দিঘির জলে কার ছায়া গো পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

নিলি বলল, মানুষের চোখের দৃষ্টি হচ্ছে Convergent, দুই চোখের দৃষ্টি একবিন্দুতে মিলে। যদি ইচ্ছা করে মিলতে না দেয়া হয়, তাহলেই চোখে মায়া চলে আসে। আপনি এখন পেইন্টিং-এর দিকে তাকিয়ে থাকুন, তবে ছবি দেখবেন না। ডান চোখে দেখার চেষ্টা করেন পেইন্টিং-এর ডান ফ্রেম। বাঁ চোখে বা ফ্রেম। একটু চেষ্টা করলেই হয়ে যাবে। এই তো হয়েছে। এবং আপনার চোখে মায়া চলে এসেছে।মুহিব বলল, চোখে মায়া আনার ব্যাপারটা কি কেউ আপনাকে শিখিয়েছে?

নিলি বলল, না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজেই বের করেছি। ভালো কথা, আপনার বাসায় কি বড় আয়না আছে? পুরো শরীর দেখা যায় এমন আয়না? না।বড় একটা আয়না কিনবেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলবেন।লাভ কী? অভিনয় ভালো হবে। এক্সপ্রেশন ভালো হবে। শব্দ করে হাসবেন। এতে মুখের চামড়ায় ফ্লেক্সিবিলিটি আসবে। আপনাকে অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু টিপস দিয়ে দিলাম। কারণ জানতে চান? চাই।

আপনি খুব ভালো একটা দিনে এসেছেন। আজ আমার বাবুর জন্মদিন। দুবছর আগে এইদিনে সকাল দশটা চল্লিশ মিনিটে বাবু জন্মেছিল। ডাক্তার যখন আমার কোলে বাবুকে দিল আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, ডাক্তার সাহেব, এই পদ্মফুল কি আমার? সেই থেকে ছেলের নাম পদ্ম! নিলির চোখে পানি এসে গেছে। সে কোনোরকম অস্বস্তি বোধ না করে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল। মুহিব বলল, আপনার পদ্মকে কি একটু দেখতে পারি?

নিলি বলল, না। পদ্মার বাবা তাকে নিয়ে গেছেন। পদ্মার কাস্টডি নিয়ে মামলা চলছিল। মামলায় সে জিতেছে। সাত বছর বয়স পর্যন্ত সব মায়েরা বাচ্চাকে রাখার অধিকার পায়। আমি পাই নি। কারণ তার বাবা কোর্টে প্রমাণ করতে পেরেছেন। আমি চরিত্রহীনা নারী। আমার বাড়িতে রোজা রাতে দুষ্ট লোকের আড্ডা হয় মদ্যপান করা হয়।

অভিনয়ের নাম করে আমি দিনের পর দিন বিভিন্ন শুটিংস্পটে রাত কাটাই। আমার ছেলে কাজের মেয়েদের কাছে একা একা থাকে। বাবুর যে মূল আয়া সজিরন কোর্টে তাই বলেছে। বাবুর বাবা সজিরনকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েছেন। পঞ্চাশ হাজার টাকা ওদের কাছে অনেক বড় ব্যাপার।মুহিব বলল, সজিরন কি এখন বাড়িতে পল্লীর দেখাশোনা করে?

ঠিকই ধরেছেন। আপনার বুদ্ধি ভালো। আপনি অভিনয় ভালো করবেন। বেকুবরা অভিনয় করতে পারে না। চা খাবেন? মুহিব বলল, না। আমি চা খেয়ে এসেছি। রাস্তার মোড়ে একটা চায়ের দোকান আছে, ভালো চা বানায়। সেখান থেকে পরপর তিনকপি চা খেয়েছি। চা এরকম যে এক কাপ খেলে আরেক কাপ খেতে ইচ্ছা হয়।নিলি বলল, আফিং টাফিং নিশ্চয় মেশায়া চা এমন কোনো নেশার জিনিস যে পরপর তিন কাপ খেতে ইচ্ছা করবে।

একদিন খেয়ে দেখতে হবে।মুহিব বলল একটা ফ্লাস্ক দিন। ফ্লাস্কে করে নিয়ে আসি।নিলি বলল, চা আনতে হবে না। আচ্ছা শুনুন, সন্ধ্যাবেলা একটা কাজকরে দিতে পারবেন? মুহিব বলল, পারব।নিলি বলল, কী কাজ না জেনেই বললেন পারব? মুহিব বলল আমার ধারণী পদ্মার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তাকে আপনি উপহার। পাঠাবেন। সেই উপহার নিয়ে যেতে হবে আমাকে।নিলি বলল, ঠিক ধরেছেন। ফ্লাস্ক দিচ্ছি। চা নিয়ে আসুন।চুহিব বলল, গিফট কি কেনা হয়েছে?

নিলি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, হ্যাঁ। বড় একটা গাড়ি কিনেছি। ব্যাটারি অপারেটেড প্যাডেলে চাপ দিলেই গাড়ি চলবে। পদ্মর বয়স দুবছর–প্যাডেলে চাপ দেয়ার বিষয়টা সে বুঝতে পারবে কিনা জানি না। আমার ধারণা বুঝবে। ওর অনেক বুদ্ধি। ওর বুদ্ধির একটা গল্প শুনবেন?

গুনব।নিলি বলল, না থাক।নিলির চোখে পানি এসে গেছে। সে চোখ মুছছে। আশ্চর্যের ব্যাপার, মুহিবের চোখে পানি এসে গেছে। সে অন্যদিকে ঘুরে তাকিয়ে আছে। সে চাচ্ছে চোখের পানি যেন চোখেই শুকিয়ে যায়। সে চোখের পাতা ফেলছে না।মুহিব! জি ম্যাডাম। You are a good soul, আমি যে নাটকটা করব না বলেছিলাম সেটা করব। আপনার জীবনের প্রথম অভিনয় নষ্ট হতে দেব না।ম্যাডাম, অভিনয় নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। হলে হবে। না হলে হবে না।নিলি হাসতে হাসতে বলল, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম আপনি হিমু হবার চেষ্টা করছেন। আপনার কি রূপা বলে কেউ আছে?

মুহিব বলল, আছে। তার নাম লীলা।বাহ কী সুন্দর নাম! লীলার একটা পোষা বদর আছে। বাঁদরটার নাম সুন্দর–হড়হড়কু।সুন্দর কোথায়? অদ্ভুত নাম। এই নাম কেন? লীলার ধারণা এই নাম উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে মুখ খানিকটা বাঁদরের মতো হয়। ওর দুটা পোষা ময়ুর আছে। একটার নাম চিত্রা আরেকটার নাম মিত্রা।নিলা বলল, আপনার বান্ধবীকে দেখার ইচ্ছা করছে। আপনাদের প্রথম দেখা কীভাবে হয়? নর্দমাতে দেখা। লীলা এই নিয়ে চারলাইনের একটা ইংরেজি কবিতাও লিখেছে, শোনাব? অবশ্যই শোনাবেন।মুহিব বলল,

We were in the drain

I looked at him and saw his pain

with weariness and fault

I cave the dirty stain.

লীলার জ্বর নেই তবে চেহারায় জুরের ছায়া পড়ে আছে। তাকে ক্লান্ত এবং বিষণ্ণ লাগছে। তার ইচ্ছা করছে বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতে। লবণ-বাতির রহস্য আলো ছাড়া ঘরে আর কোনো আলো থাকবে না। লবণ-বাতি লীলার ছোট মামা স্পেন থেকে পাঠিয়েছেন। খনিজ লবণের একটা টুকরার ভেতর বাল্ব জ্বলে। বাল্বের আলো লবণের দেয়াল ভেদ করে আসার সময় অদ্ভুত লাল হয়ে যায়। লীলা এই লালের নাম দিয়েছে লবণ-লাল। এই লাল রঙ নিয়ে সে অনেকদিন থেকে একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করছে। প্রথম লাইনটা মাথায় এসেছে— When the salt red glows in the dark radiating sorrow…। দ্বিতীয় লাইন আসছে না।

লীলা বসার ঘরে সোফায় বসে আছে। তার সামনে আদার রস দেয়া এক কাপ গ্রিন টি। সে মাঝে মাঝে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। তার সামনে আহসান বসে আছে। তার গায়ে হালকা মেরুন রঙের পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির রঙের সঙ্গে লবণ-আলোর মিল আছে। দ্রলোককে সুন্দর লাগছে। আহসান নিচু গলায় কথা বলে যাচ্ছে। লীলা আগ্রহ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে তার প্রতিটি কথা সে মন দিয়ে শুনছে। আসলে তা-না। লীলার মাথায় লবণ-আলো কবিতার দ্বিতীয় লাইন ঘুরছে। দুটা মাত্র শব্দ মাথায় এসেছে Radiating sorrow…। আর আসছে না।

আহসান বলল, লীলা, তুমি কি ডেভিড ব্রেইনের নাম শুনেছ? লীলা বলল, না। উনি কি কবি? আহসান বলল, ম্যাজিকের কবি। street magician, অসাধারণ সব ম্যাজিক দেখান।তার কথী এল কেন? আমি নিউইয়র্কে তার একটা ম্যাজিক দেখেছি। Levitation Magic. লেভিটেশন ম্যাজিক মানে?

লেভিটেশন মানে শূন্যে ভাসা। উনি নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তায় সবার সামনে শূন্যে ভেসেছেন। রাস্তা থেকে ছয় ইঞ্চি ওপরে উঠে দুই মিনিট ত্রিশ সেকেন্ড ছিলেন।লীলা বলল, দুই মিনিট শূন্যে ভেসে লাভ কী? মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে দুই মিনিটের জন্যে অগ্রাহ্য করে পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছেন, এইটাই লাভ। লীলা, তুমি মনে হয় মন দিয়ে আমার কথা শুনছ। আবার জ্বর আসছে না-কি?

দেখি হাতটা বাড়াও তো, জ্বর দেখি।লীলা হাত বাড়াল। আহসান লীলার হাত ধরল। লীলা মনে মনে গুনছে one thousand one, ore thousand two one thousand three… আহসান কতটা সময় হাত ধরে থাকে সেটা জানার জন্যেই one thousand one, two… বলা। একবার one thousand one বলতে এক সেকেন্ড লাগে।লীলার হিসেবে এগারো সেকেন্ড পর আহসান হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, মনে হচ্ছে জ্বর আসছে।লীলা বলল, আসুক। ঝড় আসছে আসুক।ঝড় বলছ কেন?

লীলা বলল, জ্বর হলো শরীরের ঝড়। এই কারণেই ঝড় বলছি। ম্যাজিক সম্বন্ধে কী বলছিলেন বলুন। ম্যাজিশিয়ান ভদ্রলোক দুই মিনিট ত্রিশ সেকেন্ড শূন্যে ঝুলে রইলেন।আহসান বলল, তুমি মনে হয় ridicule করছ। সবার সামনে কোনো যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়া শূন্যে ভেসে থাকী কঠিন কাজ। যে দেখে তার মধ্যে এক ধরনের অলৌকিক অনুভূতি হয়। তুমি দেখবে? লীলা বলল, আমি কীভাবে দেখব? ব্লেইন সাহেবকে আমি কোথায় পাব? আহসান বলল, আমি দেখাব।লীলা বলল, আপনি দেখবেন মানে? আপনি ম্যাজিক জানেন না-কি?

ম্যাজিক জানি না, তবে দেশের বাইরে যখন যাই দুই একটা ইজি আইটেম ম্যাজিক শপ থেকে কিনে নিয়ে আসি।শূন্যে ভাসা ইজি আইটেম? কৌশলটা খুবই সহজ। Optical illusion তৈরি করা। শূন্যে ভাসার ডেভিড ব্লেইনের এই ভার্সানটার কৌশল জানতে তিনশ ডুলার খরচ করতে হয়েছে। তোমাকে দেখাব?

দেখান।আহসান উঠে দাঁড়াল। ঘরের শেষমাথায় চলে গেল। বড় করে নিঃশ্বাস ফেলে একটু নিচু হলো, তারপর লীলাকে অবাক করে দিয়ে সত্যি সত্যি শূন্যে ছয় ইঞ্চি ওপরে উঠে গেল। লীলা বলল, Oh God! আহসান শূন্য থেকে নামতে নামতে বলল, আনন্দ পেয়েছ? লীলা বলল, অবশ্যই আনন্দ পেয়েছি।কৌশলটা শিখিয়ে দেব?

লীলা বলল, না। কৌশল কেন শেখাবেন? কৌশল শিখলে তো রহস্যই নষ্ট। তবে আপনি মুহিবকে দেখাতে পারেন। মাঝে মাঝে সে শূন্যে ভেসে আমাকে দেখাবে। আমি মজা পাব।আহসান ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আচ্ছা তাকে শিখিয়ে দেব।লীলা বলল, এখন একটা কাজ করুন, আপনার শূন্যে ভাসার খেলা বাবাকে দেখিয়ে আসুন। বেচারা একা একা ঘরে বসে আছে।

আহসান বললেন, তুমি চল। তিনজন মিলে গল্প করি।লীলা বলল, আমার জ্বর আসছে। জ্বর আসার সময় বাবার বক্তৃতা অসহ্য লাগে। আমি কিছুক্ষণ শুয়ে থাকব। ডিনারের সময় আমাকে ডেকে পাঠাবেন। আপনার সঙ্গে ডিনার করব।লীলা উঠে দাঁড়াল। তাকে দ্রুত বিছানায় শুয়ে পড়তে হবে। কবিতার দ্বিতীয় লাইনটা মনে হয় চলে এসেছে।আহসানকে পেয়ে শওকত সাহেব আনন্দিত।

তিনি নতুন একটা বই পড়ছেন। বইয়ে বিবর্তনবাদের জনক Darwin সাহেবকে ধরাশায়ী করা হয়েছে। বিষয়টায় তিনি বিপুল আনন্দ পেয়েছেন। তার পূর্বপুরুষ বানর এটা তিনি নিতেই পারতেন না। এখন সমস্যার সমাধান হয়েছে। তিনি আহসানের দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, তুমি ডারউইনবাদে বিশ্বাস কর? আহসান বলল, জি চাচা করি।তোমার বিশ্বাস তুমি এখন যে-কোনো একটা ভালো ডাস্টবিন দেখে ফেলে দিয়ে আসতে পার?

আহসান বলল, জি আচ্ছা।পুরো বিষয়টা না শুনেই জি আচ্ছা বলবে না। আগে পুরো বিষয়টা শোন।আহসান হতাশভঙ্গিতে পুরো বিষয়টা শোনার জন্যে প্রস্তুত হলো। সহজে এই বিরক্তিকর মনুষটার কাছ থেকে ছাড়া পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না।শওকত সাহেব বললেন, তোমাদের ডারউইনের থিওরি বলে পাখি এসেছে সরীসৃপ থেকে। তুমি এখন একটা সাপ এবং ময়ূর পাশাপাশি রাখ। চিন্তা কর যে ময়ুরের পূর্বপুরুষ সাপ। যে সাপ এখন ময়ূরের প্রিয় খাদ্য। বলো তোমার কিছু বলার আছে?

এই মুহূর্তে কিছু বলার নেই চাচা।মনে মনে দশের ওপরে ৯৫০টা শূন্য বসাও। এই বিশাল প্রায় অসীম সংখ্যা দিয়ে এককে ভাগ কর। কী পাবে জানো? শূন্য। এটা হলো অ্যাটমে অ্যাটমে ধাক্কাধাক্কি করে DNA অনু তৈরির সম্ভাবনা। মিলার নামে কোনো সাইন্টিস্টের নাম শুনেছ? ছাগলটাইপ সাইনটিস্ট।চাচা, শুনি নি।ঐ ছাগলটা ১৯৫০ সনে একটা এক্সপেরিমেন্ট করে অন্য ছাগল সাইন্টিস্টদের মধ্যে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল। ছাগলটা করেছে কী, ল্যাবরেটরিতে আদি পৃথিবীর আবহাওয়া তৈরি করে ঘনঘন ইলেকট্রিক কারেন্ট পাস করেছে।

কিছু প্রোটিন অনু তৈরি করে বলেছে— এইভাবেই পৃথিবীতে প্রাণের শুরু। প্রাণ সৃষ্টিতে সৃষ্টিকর্তার কোনো ভূমিকা নেই। এখন সেই ছাগল মিলারকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে হাসাহাসি। Life ম্যাগাজিনে কী লেখা হয়েছিল পড়ে শোনাই।চাচা, আরেকদিন শুনি। জটিল কিছু শোনার জন্যে আমি এই মুহূর্তে মানসিকভাবে তৈরি না।শওকত সাহেব বললেন, জটিল কিছু বলছি না। জলবৎ তরলং। মন দিয়ে শোন। আল্ডারলাইন করে রেখেছি।শওকত সাহেব পড়তে শুরু করলেন। আহসান হতাশ চোখে জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইল।

Geologist now think that the premordial atmosphere consisted mainly of carbon dioxide and Nitrogen gases that are less reactive than those used in the 1953 Mitler experiment…

পদ্মর জন্মদিন অনুষ্ঠানে মুহিব উপস্থিত হয়েছে। তার হাতে গিফট র্যাপ দিয়ে মোড়ানো বিশাল বাক্স দেখে দারোয়োন কিছু জিজ্ঞেস করল না। দারোয়ান বলল, ছাদে চলে যান। ছাদে প্যান্ডেল খাটিয়ে উৎসব।

ছাদে উঠে মুহিব পুরোপুরি হকচকিয়ে গেল। বিশাল প্যান্ডেল। প্যান্ডেলের এক মাথায় স্টেজ করা হয়েছে। বিচিত্র পোশাক পরা একজন ডিসকো জকি ভয়ঙ্কর ধরনের বাজনা বাজাচ্ছেন। সেই বাজনার সঙ্গে ছেলেমেয়েরা যার যেমন ইচ্ছা নেচে যাচ্ছে। পাশেই বার তৈরি করা হয়েছে। নানান সাইজ এবং নানান ধরনের বোতল টেবিলে ঝলমল করছে। দুজন বারটেন্ডার ড্রিংক্স দিচ্ছে। বারের ওপর বড় বড় করে লেখা–

Dont over do it. মুহিব উপহারের বাক্স নিয়ে কী করবে বুঝতে পারছে না। এখানে কারো হাতেই উপহারের কোনো প্যাকেট দেখা যাচ্ছে না। হলুদ ব্লেজার পরা অতি সুদর্শন এক ভদ্রলোক এসে মুহিবের সামনে দাঁড়ালেন। বিনয়ী গলায় বললেন, আপনার পরিচয় জানতে পারি?

মুহিব বলল, আমি পদ্মর জন্যে একটা উপহার নিয়ে এসেছি। পদ্মর মা পাঠিয়েছেন।ভদ্রলোক ইশারা করে কাকে যেন ডাকলেন। তাকে বললেন, জলিল, উনার কাছ থেকে গিফট নিয়ে যাও।মুহিব বলল, নিলি ম্যাডাম বলে দিয়েছেন আমি যেন নিজের হাতে তাকে গিফটটা দেই।ভদ্রলোক বললেন, জলিল, উনাকে পদ্মর কাছে নিয়ে যাও। আর ভাই, আপনি গিফট দিয়ে ছাদে চলে আসবেন। পার্টি এনজয় করবেন। আপনার নাম?

মুহিব।মুহিব সাহেব, পরে আপনার সঙ্গে দেখা হবে।ঘরভর্তি উপহারের মাঝখানে একটা দুবছরের বাচ্চা লাল শার্ট লাল প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কৌতূহলী হয়ে উপহার দেখছে। কোনো একটা বাক্সে হাত দেয়া মাত্র বৃদ্ধা এক মহিলা ধমক দিচ্ছে, হাত দিবা না কইলাম।মুহিবের মনে হলো এই মহিলাই সজিরন। পদ্মর আয়া।মুহিব বলল, পদ্ম! কাছে আস, তোমার মা তোমার জন্যে কী পাঠিয়েছেন দেখ।পদ্ম পরিষ্কার গলায় বলল, আমার মা পাঠিয়েছে?

মুহিব বলল, হ্যাঁ।নিলি মা পাঠিয়েছে? হ্যাঁ।বলেছে—বাবুকে আদর? হ্যাঁ বলেছেন। এসো আমরা উপহার খুলি।পদ্ম ছুটে এল। বৃদ্ধা খ্যাখ্যান গলায় বলল, বাক্স এখন খোলা স্যারের নিষেধ আছে। পরে খোলা হবে। একপাশে থুইয়া দেন। সময় বুইঝা খোলা হইব।মুহিব বলল, তোমার নাম সজিরন না? জে।

মুহিব বলল, বাঘের ওপরে আছে টাগ। তোমার স্যারের ওপরে আছে নিলি ম্যাডাম। তুমি মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছ, এই খবর আমরা জানি। হাইকোর্টে আপিল করা হয়েছে। যদি প্রমাণ হয় তুমি মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছ, তোমার চার বছরের জেল হবে। জেলে যাবার জন্যে তৈরি হয়ে যাও। পান খাওয়ার অভ্যাস আছে দেখতে পাচ্ছি। অভ্যাস ছাড়ার চেষ্টা কর। জেলে পান পাবে না। সমস্যা হবে।মুহিব প্যাকেট খুলছে। পদ্ম ছোট ছোট হাতে তাকে সাহায্য করছে। এবং টুক টুক করে কথা বলছে।গোলাপ ফুল আমাকে গোঁতা দিয়েছে।মুহিব বলল, কাটা লেগেছে হাতে?

হুঁ। এইখানে।পদ্ম হাত বাড়িয়ে বলল, উম্মা দাও।উম্মা ব্যাপারটা কী মুহিব বুঝতে পারছে না।সজিরন বলল, হাতে চুমা দিতে বলতাছে।মুহিব সজিরনের দিকে তাকিয়ে বলল, এই বেটি খবরদার, আমার সাথে কথা বলবি না। বদের হাডিড। ইয়া নফসি ইয়া নফসি করতে থাক। তোর কপালে দুঃখ আছে।

সজিরন বলল, আমি স্যারের বগলে যাইতেছি। আপনি কী বলছেন সব বুলব।মুহিব বলল, যা তাড়াতাড়ি যা।সজিরন ঘর থেকে বের হওয়া মাত্র মুহিব পদ্মকে গাড়িতে বসিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেল। এখানে বেশিক্ষণ থাকা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।মুহিব বাড়িতে ফিরল রাত নটায়। বাড়িতে ঢুকতে পারল না।

বাড়ির সামনে ভিড়। লোকজন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। পুলিশের একটা জিপ গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সেই গাড়ি ঘিরেও ভিড়। মুহিবের চোখের সামনে তার বাবা আলাউদ্দিনকে পুলিশের গাড়িতে তুলল। আলাউদ্দিনের হাতে হাতকড়া। কোমরে দড়ি। তিনি বিড়বিড় করে দোয়া ইউনুস পড়লেন। মুহিব পুলিশের গাড়ির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছে। ভিড় ঠেলে কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। সে বাবা বলে চিৎকার দিতে যাচ্ছে, তার আগেই গাড়ি ছেড়ে দিল।তিনটা খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় আলাউদ্দিনের ছবি ছাপা হয়েছে। তাদের সংবাদ শিরোনাম–

প্রধান শিক্ষক কর্তৃক

ছাত্রী ধর্ষিত।

কোচিং সেন্টারে প্রধান শিক্ষক

কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণের চেষ্টা।

শিক্ষক হাজিতে।

কন্যাসম ছাত্রী

শিক্ষকের যৌন লালসার শিকার।

ধর্ষণের চেষ্টাকালে শিক্ষক ধৃত।

মুহিব হাজতে তার বাবার সামনে বসে আছে। সে তার বাবার দিকে তাকাতে পারছে না। অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আলাউদ্দিন সিগারেট খান না। তার হাতে সিগারেট। ভুস ভুস করে ধোয়া ছাড়ছেন। তার চোখ রক্তবর্ণ। চুল উসকোখুসকো। একটা চোখের নিচে গাঢ় হয়ে কালি পড়েছে। মুহিব বলল, মারধোর করেছে না-কি বাবা?

আলাউদ্দিন বললেন, হুঁ। ওসি সাহেবকে টাকা খাওয়াতে হবে। টাকা খাওয়ালে মারধোর হবে না। চেকবই আনতে বলেছিলাম, এনেছিস? হুঁ।ব্যাংকে এক লাখ বিশ হাজার টাকা আছে। চেক লিখে দেই। পুরাটাই তুলবি। ওসি সাহেবকে দিবি দশ হাজার। হাতেপায়ে ধরে বলবি, এর বেশি দেওয়ার সামর্থ্য নাই। পায়ে ধরতে পারবি না? পারব।

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

দিঘির জলে কার ছায়া গো পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

টেনশনের ব্যাপার হচ্ছে, দৃশ্যটা আমার পছন্দ হচ্ছিল না। কাশি বান্ধবীর দৃষ্টি আকর্ষণ কেন করব? আমি তখন ডিরেক্টর সাহেবকে বললাম, কাশি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ না করে আমি যদি নিচু গলায় এক লাইন গান করি–আজ তোমারে দেখতে এলেম অনেক দিনের পরে– তাহলে কেমন হয় স্যার?

আমি গান গাইতে পারি। ডিরেক্টর স্যার বললেন, খুবই ভালো হয়। ম্যাডাম নিলি বললেন, মোটেই ভালো হয় না। পুরো ব্যাপারটা সিনেমেটিক হয়। সস্তা বাংলা সিনেমা। দুজনের মধ্যে তর্ক বেধে গেল। এক পর্যায়ে ম্যাডাম কঠিন গলায় বললেন, আমি এই নাটকে কাজ করব না। আমি চলে যাচ্ছি, আপনি অনা কোনো নায়িকা খুঁজে বের করুন।উনি চলে গেলেন?

হ্যাঁ চলে গেলেন। আমার জন্যে পুরো ব্যাপারটা কেঁচে গেল। আগামীকাল শুটিং ছিল। শুটিং ক্যানসেল হয়ে গেছে।লীলা বলল, তুমি সমস্যা বাঁধিয়েছ, তোমার উচিত সমস্যা মেটানো।কীভাবে মেটাব? যে সমস্যা তৈরি করে সে জানে কীভাবে সমস্যা মিটাবে। এই অনেক কথা বলে ফেলেছি— আমার নিজেরই এখন ঘুম পাচ্ছে। গুড নাইট।বৃষ্টিতে ভিজবে না?

অবশ্যই ভিজব। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ঘুমাব। তুমি কখনো বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ঘুমিয়েছ? না।একটা পাটি পেতে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে হবে। টাওয়েল দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে হবে। মুখে বৃষ্টি পড়লে ঘুম আসবে না। মনে হবে মশা কামড়াচ্ছে।লীলা টেলিফোন রেখে দিল।রাতে বৃষ্টিতে ভিজে লীলার ভালো ঝামেলা হয়েছে। শেষরাতে জ্বর এসেছে। শুরু হয়েছে ভাঙা ভাঙা স্বপ্ন। একটা শেষ হওয়া মাত্র আরেকটা।মাঝে মাঝে পানির পিপাসায় ঘুম ভাঙছে।

খাটের পাশের সাইড টেবিলে পানির বোতল থাকে। বোতলে পানি নেই। ফ্রিজ থেকে পানির বোতল আনার প্রশ্নই আসে না। যতবার ঘুম ভেঙেছে ততবারই লীলা ক্লান্ত গলায় বলছে, কেউ কি আমাকে ঠান্ডা এক গ্লাস পানি খাওয়াবে? বলার জন্যে বলা। ঘরে সে এবং তার বাবা ছাড়া দ্বিতীয় প্রাণী নেই। শওকত সাহেবের ঘর সর্বক্ষিণে। তিনি দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘুমান। চিল্কার করে ডাকলেও তার কানে যাবে না। কে তার জন্যে পানি নিয়ে আসবে?

তবে জাগ্রত অবস্থায় পানি চাওয়ার একটা সুফল পাওয়া যাচ্ছে। স্বপ্নে তার জন্যে পানি আসছে। প্রতিবারই সাত-আট বছরের একটি বালক পানি নিয়ে আসছে। বিশাল সাইজের গ্লাসভর্তি পানি। সে পানি এনে বলছে, মা, পানি এনেছি। লীলা হাতে পানির গ্লাস নিচ্ছে, কিন্তু গ্লাসে মুখ দেবার আগেই ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। স্বপ্নের বাচ্চাটা তাকে মা ডাকছে কেন কে জানে? তার অবচেতন মন কি চাইছে তার বিয়ে হোক? একটা বাচ্চা হোক। বাচ্চা তাকে মা ডাকুক?

সকাল আটটা। লীলা চাদরের নিচে। সে বুঝতে পারছে না। তার কি ঘুম ভেঙেছে, না-কি স্বপ্ন দেখছে। ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের শব্দ কানে আসছে। কে চালাবে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার? কাজেই এটা স্বপ্ন। রান্নাঘর থেকে কল ছাড়ার শব্দ আসছে। কেউ থালাবাসন ধুচ্ছে। অবশ্যই স্বপ্ন। লীলা চেষ্টা করল জেগে ওঠার। আর তখন তার ঘরের দরজা কেউ একজন সামান্য ফাক করে বলল, আপা, গুড মর্নিং! বাইশ-তেইশ বছরের মেয়ে। সুশ্রী চেহারা। বড় বড় চোখ। মাথাভর্তি ঘন কালো চুল। অ্যাপ্রন পরে আছে। লীলা বলল, কে?

ম্যাডাম, আমার নাম আসমা। আমি আপনাদের হাউসড়ে। আহসান স্যার আমাকে আর গনি মিয়াকে পাঠিয়েছে। আজ এই বাড়িতে উনার পার্টি আছে। আমরা গুছাচ্ছি। ম্যাডাম, চা-কফি কিছু খাবেন?

ঠান্ডা এক গ্লাস পানি খাব।ম্যাডাম! আপনার কি শরীর খারাপ? মনে হয় জ্বর এসেছে।ম্যাডাম, আমি কি কপালে হাত দিয়ে জ্বর দেখব? দেখ।আসমা কপালে হাত দিয়ে বলল, অনেক জ্বর। ঘরে নিশ্চয় থার্মোমিটার আছে? বাবার কাছে আছে।ম্যাডাম, আমি পানি নিয়ে আসছি।লীলা শুয়ে পড়ল। তার চোখ বন্ধ।

জানালা দিয়ে রোদ এসে বিছানায় পড়েছে, সেই রোদের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। চোখ কট কট করছে। ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের শব্দটা মাথায় লাগছে। আসমা পানি নিয়ে এসেছে। ট্রে-তে পানির গ্লাস, টিস্যুবক্স, এককাপ চা এবং একটা থার্মোমিটার। লীলা অবাক হয়ে দেখল, আসমা মেয়েটির কাজকর্ম অত্যন্ত গোছানো। সে লীলার হাতে পানির গ্লাস দিল। পানি খাওয়া শেষ হওয়ামাত্র তার হাতে দুটা টিস্যুপেপার দিল। কী জন্যে দিল লীলা বুঝতে পারল না। চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। পিরিচে দুটা প্যারাসিটামল ট্যাবলেট।

ম্যাডাম, প্যারাসিটামল খেয়ে চা খান। জ্বর সঙ্গে সঙ্গে কমবে। অনেকেই বলেন, খালি পেটে ওষুধ খাওয়া যায় না। কথাটা ঠিক না। অ্যাসপিরিন জাতীয় ট্যাবলেট খাওয়া যায় না। প্যারাসিটামল খাওয়া যায়। আগে থার্মোমিটারটা মুখে দিন, জ্বর দেখে দেই। টিপেপার দিয়ে থার্মোমিটারের মুখটা মুছে নিন।

হাতে টিস্যুপেপার দেবার রহস্য এখন ভেদ হলো। লীলা মুখে থার্মোমিটার দিয়ে বসে আছে। ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের শব্দ বন্ধ, এটা একটা স্বস্তির ব্যাপার। চেয়ার টানাটানির শব্দ হচ্ছে। এই শব্দ ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের শব্দের মতো অসহনীয় না।ম্যাডাম! আপনার জ্বর একশ দুই পয়েন্ট পাঁচ। আপনি শুয়ে থাকুন।

লীলা বাধ্য মেয়ের মতো শুয়ে পড়ল। আসমা বলল, আহসান স্যার আমাকে বলে দিয়েছেন আপনার ঘুম ভাঙামাত্রই যেন তার সঙ্গে আপনাকে টেলিফোনে যোগাযোগ করিয়ে দেই। ম্যাডাম দেব? না।ম্যাডাম, উনি বিশেষ করে বলে দিয়েছেন। এর মধ্যে দুবার টেলিফোন করেছেন। আপনার জ্বর স্যারকে আমি জানিয়েছি। সার খুবই চিন্তিত। স্যারকে ধরে দেই? শুধু হ্যালো বলুন। এতেই হবে।দাও।

আসমা অ্যাপ্রনের পকেট থেকে মোবাইল টেলিফোন বের করল। নাম্বার টিপল এবং মোবাইল কানে দিয়ে বলল, স্যার, কথা বলুন। সে মোবাইল লীলার হাতে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে দরজা ভেজিয়ে দিল।লীলা! জ্বর না-কি বাঁধিয়েছ? হ্যাঁ।নিশ্চয়ই তোমার অভ্যাস মতো কাল রাতে বৃষ্টিতে ভিজেছ। ঠিক না? হ্যাঁ ঠিক।কতক্ষণ ভিজেছ? ঘড়ি দেখি নি, তবে অনেকক্ষণ ভিজেছি। বৃষ্টিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।আজকের পার্টি অফ করে দেই?

দিন।আমি কিন্তু আসব। রোগী দেখে যাব।কখন আসবেন? রাত আটটায়। তবে আমার ধারণা, তার আগেই তোমার জ্বর সেরে আঁবে। আসমা মেয়েটি তোমাকে সুস্থ করে তুলবে। এই মেয়ে খুব expert. আসমা মেয়েটি সম্পর্কে বলুন। পার্টি গোছানোর জন্যে পাঠিয়েছেন?

পার্টি গোছানোর জন্যে গনি মিয়াকে পাঠিয়েছি। আর আসমা হলো আমার দিক থেকে তোমাকে উপহার। সংসার ঘড়ির কাটার মতো সচল রাখতে ওর মতো একটি মেয়েই যথেষ্ট।তাকে পেয়েছেন কোথায়? সে দিনাজপুরের মেয়ে। ইন্টারমিডিয়েট পাশ। কুয়েতে এক আমীরের বাড়িতে হাউসমেড় ছিল। নানান ঝামেলায় পড়ে দেশে ফিরে আসে। তার অতীত ইতিহাসের তো তোমার দরকার নেই। না-কি আছে?

দরকার নেই।তুমি রেস্ট নাও। জ্বর নিয়ে অতি প্রিয়জনদের সঙ্গেও কথা বলতে ভালো লাগে না। আর আমি অতি প্রিয়জনদের তালিকায় নেই।লীলা বলল, আমার অতি প্রিয়দের তালিকায় কে কে আছে বলে আপনার ধারণী?আহসান বলল, তোমার বাবা। মুহিব নামের যুবক, যে তোমাকে ডাস্টবিন থেকে উদ্ধার করেছে। তোমার ডাক্তার ছোটখালা সালেহা। ছাদে তোমার পোষা দুই ময়ূর এবং বাঁদরটা। বাঁদরটার নাম যেন কী? হড়হড়কু না?

জি, হড়হড়কু।এই অদ্ভুত নামটা কেন দিয়েছ? লীলা বলল, আপনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকবার হড়হড়কু বলুন, দেখবেন হড়হড়কু বলার সময় চেহারাটা বাঁদরের মতো হয়ে যায়। এইজন্যেই নাম রেখেছি হড়হড়কু।আহসান বলল, এক্ষুনি ব্যাপারটা টেস্ট করছি। লীলা, কথা শেষ করার আগে ছোট্ট আরেকটা কথা। ভিন্ন প্রসঙ্গ। বলি?

বলুন।আমি বিদেশ থেকে যখন আসি, তুমি আমার সঙ্গে আপনি আপনি করে কথা বলো। একটা পর্যায়ে এসে তুমি বলতে শুরু কর, তখন বিদেশে যাবার সময় হয়। বিদেশ থেকে ফিরে আসি, আবার শুরু কর আপনি।লীলা বলল, এবার যখন তুমি বলা শুরু করব তখন বিদেশ যাবেন না। তাহলেই তো হয়।আহসান বললেন, এটা মন্দ বলে নি। লীলা রাখি। দেখা হবে সন্ধ্যায়। দ্রুত সেরে উঠ।চেষ্টা করছি।থ্যাংক য়্যু

লীলা টেলিফোন রাখার পরপরই আসমা গামলাভর্তি পানি এবং তোয়ালে নিয়ে ঢুকেছে। লীলা বলল, কী? ম্যাডাম, আপনার গা স্পঞ্জ করে দেব।লাগবে না।আপনি চুপ করে শুয়ে থাকুন। আমি গা স্পঞ্জ করছি, দেখবেন কত ভালো লাগবে। ম্যাডাম, আমি আপনার সারা গা স্পঞ্জ করব। আপনি চোখ বন্ধ করে থাকুন। আমাকে লজ্জা করার কিছু নেই।আসমা গা স্পঞ্জ করছে। লীলা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। তার ভালো লাগছে। মনে হয় জ্বর কমতে শুরু করেছে।ম্যাডাম, ছাদে আপনার ময়র দুটা দেখে এসেছি। এদের স্বাস্থ্য বেশ ভালো। কিছুদিনের মধ্যেই পালকে রঙ ধরবে।তুমি জাননা কীভাবে?

আমি কুয়েতে যে শেখের বাড়িতে কাজ করতাম, উনার দশটা ময়ূর ছিল। দুটা ইমু পাখি ছিল। ময়ুরকে খাওয়ানোর জন্যে উনি তার প্রাইভেট প্লেনে করে হংকং থেকে সাপ আনাতেন।শেখের নাম কী? অনেক লম্বা নাম— আল হাসান ইবনে মোহম্মদ ইবন জাফর ইবনিল হোসায়ান। সবাই ডাকত শেখ হাসান।তাঁর চিড়িয়াখানায় আর কী ছিল?

নানান ধরনে পাখি ছিল। কোনো পশু ছিল না। তিনি পশু পছন্দ করতেন। অনেক জাতের ঈগল ছিল। একটা ঈগল ছিল তার পোষা। নাম সাব্বাই। তিনি ছাদে উঠে ঈগলটা ছেড়ে দিতেন। ঈগল সোজাসুজি আকাশে উঠে নিমিষের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যেত। আবার নেয়ে এসে তার হাতে বসত। ঈগলকে খাওয়ানোর জন্যে রোজ একটা করে দুম্বা জব হতো। উনার পাখি দেখাশোনার জন্যে চারজন লোক ছিল।তোমার দায়িত্ব কী ছিল?

ম্যাডাম, আমি, ফিলিপিনের তিন মেয়ে, শ্রীলঙ্কার একটা মেয়ে আর ইন্ডিয়ার একটা মেয়ে, আমরা ছিলাম হাউসমভ।এতজন? শেখের বাড়িটা ছিল প্রকাণ্ড। শোবার ঘর ছিল একুশটা। ম্যাডাম, বাথরুমে যান, হাতমুখ ধোন। আমি নাশতা আনিচ্ছি। আপনার জ্বর নামছে, গা ঘামছে।কী নাশতা খাব?

রুটি আর ভাজি। আমি একটা লিস্টি করে রেখেছি। লিস্টি মতো জিনিস আনিয়ে দিলে সকালের নাশতার সমস্যা হবে না।তোমার ঐ শেখ, উনি সকালে কী নাশতা খেতেন? প্যারিসের একটা রেস্টুরেন্টের সঙ্গে উনার কন্ট্রাক্ট ছিল। তারা নাশতার ব্যবস্থা করত। উনার এত টাকা যে খরচ করার পথ জানতেন না। ম্যাডাম, আপনার জ্বর এখন আরেকবার মাপব?

দরকার নেই। আমি বুঝতে পারছি জ্বর কমেছে।আসমা থার্মোমিটার হাতে নিয়ে বলল, জ্বর কতটা কমেছে জানা দরকার ম্যাডাম।তুমি আমাকে এখন থেকে আপা ডাকবে। ম্যাডাম ডাকবে না। বারবার ম্যাডাম ডাকছু। মনে হচ্ছে আমি সিনেমার নায়িকা। এক্ষুনি ডিরেক্টর সাহেব আমাকে শট দেবার জন্যে ডাকবেন। আমাকে লীলা আপা ভাকবে। যতবার লীলা শব্দটা শুনি আমার ভালো লাগে।আসমা বলল, আমি আপা ডাকব। লীলা আপা ডাকব না। আপনার নাম ধরে ডাকবেন আপনার প্রিয়জনরা।

লীলা বলল, থার্মোমিটার মুখে দিয়ে আমি এক মিনিট বসে থাকব, কথা বলতে পারব না। এই এক মিনিটে তুমি তোমার স্যার আহসান সাহেব সম্পর্কে যা জানো বলবে।আসমা বলল, পুরুষমানুষের মধ্যে মন্দভাব বেশি। মন্দ নাই এমন পুরুষ পাওয়া কঠিন। স্যারের মধ্যে মন্দ অংশ কম। আপা, আপনি এক সময় না এক সময় জানবেন এইজন্যে এখনই বলছি— কুয়েতের ঐ শেখ সৰু কয়জন মেয়েকে ব্যবহার করত। অনেক ঝামেলা করে আমি ফিরে আসি।

আহসান স্যার ফিরে আসার ব্যাপারে আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। আমার মতো মেয়েদের পুরুষরা বেশ্যা বিবেচনা করে। তাদের সঙ্গে সেই আচরণ করে। আহসান স্যার কখনো এরকম করেন নি। তিনি সম্মানের সঙ্গেই আমার সঙ্গে কথা বলেন।আসমা থার্মোমিটার হাতে নিয়ে বলল, আপা, আপনার টেম্পারেচার এখন একশর সামান্য নিচে।

লীলা বলল, শেখের নামটা আরেকবার বলো তো! আসমা বলল, আল হাসান ইবনে মোহম্মদ ইবন জাফর ইবনিল হোসায়ান।মুহিব নিলি ম্যাডামের বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। দুজন দারোয়ান গেট পাহারা দিচ্ছে। আর একজন সম্ভবত কেয়ারটেকার জাতীয় কেউ। সে-ই মুহিবকে আটকেছে।আপনার নাম, কোথেকে এসেছেন সেই ঠিকানা এবং কেন এসেছেন সেটা লেখেন।মুহিব বলল, এত লেখাপড়া? জি এইটাই নিয়ম। নিলি ম্যাডাম এই নিয়ম করেছেন। তাকে অনেক উটকা লোক বিরক্ত করে তো এইজন্যে। আপনি করেন কী?

আমি কিছু করি না। আমিও একজন উটকো লোক।তাহলে দেখা হবে না। লেখালেখি করে লাভ নাই। চলে যান।এসেছি যখন চেষ্টা করে দেখি।বসেন ঐ চেয়ারে। দশটা বাজুক। দশটার পর ভেতরে খবর দেব। দশটার আগে ম্যাডামের কাছে খবর পাঠানো নিষেধ।মুহিব বলল, তিনতলা বাড়ির পুরোটাতেই কি ম্যাডাম থাকেন? জি।

মুহিব বলল, এমন কেউ কি আছে যাকে আপনারা গেটে আটকান না? সে সরাসরি চলে যেতে পারে। ফ্রি পাশ।এমন কেউ নাই। ম্যাডামের হাসবেন্ড যদি আসেন তাকেও খবর পাঠাতে হয়।ম্যাডাম বিবাহিত? জানতাম না তো।কেয়ারটেকার বলল, সম্পর্ক নাই। দুজন আলাদা থাকে। পুলা একটা আছে। স্যার তরে মাঝে মইদ্যে দেখতে আসে।মুহিব বলল, ছেলের নাম কী? পদ্ম।

পদ্ম তো মেয়েদের নাম।কথা ঠিক বলেছেন, তয় বড়লোকদের কারবার। মেয়ের নাম দেয় ছেলেরে। ছেলের নাম দেয় মেয়েরে।মুহিব বলল, ভাই, সিগারেট খাওয়া যাবে? না রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেয়ে আসতে হবে? খান সিগারেট।মুহিব একটা সিগারেট ধরালো। কেয়ারটেকারের দিকে প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আপনিও একটা খান। আসুন দুই ভাই মিলে ধোয়া ছাড়ি। আপনার নাম কী?

মকবুল।মকবুল ভাই, সিগারেট ধরান।মকবুল সিগারেট নিল। গম্ভীর গলায় বলল, আমার সাথে খাতির কইরা লাভ নাই। ম্যাডাম পারমিশন না দিলে No see. মুহিব বলল, আশেপাশে চায়ের দোকান আছে? চা খেয়ে সময় কাটাই, দশটার পরে একবার এসে খোঁজ নিব পারমিট পাওয়া গেল কি-না।বড় রাস্তার উল্টাদিকে একটা চায়ের দোকান আছে। চা ভালো বানায়।পারমিশন পাওয়া গেছে। পারমিশন পাওয়ায় মকবুলকে অসন্তুষ্ট বলে মনে হচ্ছে। সে বিরক্ত মুখে বলল, চলে যান। ফিরত যাবার সময় যে টাইমে ফিব্রত যাচ্ছেন সেই টাইম লিখে যাবেন।

কলিংবেলে হাত রাখার আগেই নিলি দরজা খুলল। কোনো একটা ম্যাগাজিনে (খুব সম্ভব তারকা সংবাদ) মুহিব পড়েছিল, মেকাপ ছাড়া নায়িকাদের চেহারা প্রায় পেতনির কাছাকাছি। নিলি মনে হয় তার মধ্যে পড়েন না। তাকে মেকাপ ছাড়া অনেক বেশি মিষ্টি লাগছে।নিলি বলল, মুহিব বসুন। আমার মন বলছিল আজকালের মধ্যে আপনি নাটকের বিষয়ে সুপারিশ করতে আসবেন। সুপারিশ করতে আসা দোষের কিছু না। জীবনের প্রথম নাটক প্রচারিত হোক সবাই চায়। আমি কিন্তু ঐ নাটকটা করব না।

মুহিব বলল, ম্যাডাম, আমি সুপারিশ করতে আসি নাই। আমার কপালে আছে সবকিছুতে আমি ফাইনাল পর্যন্ত যাব, তারপর ভজঘট হয়ে যাবে।তাই না-কি? জি। টুথপেস্টের একটা অ্যাড করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সব ফাইনাল। যেদিন শুটিং হবে সেদিন ডিরেক্টর বললেন আমাকে দিয়ে হবে না। আমার চোখে না-কি মায়া নাই।ডিরেক্টর সাহেবের নাম কী?

নাম মনে নাই।চোখে মায়া নেই বলে বিজ্ঞাপন বাতিল? জি।নিলি বলল, চোখের মায়াটা আসলে কী? মুহিব বলল, জানি না।নিলি বলল, ভালো করে তাকিয়ে দেখুন তো। আমার চোখে কি মায়া আছে? মুহিব কী বলবে বুঝতে পারছে না। লীলার মতো সহজ সম্পর্ক থাকলে বলতো, ম্যাডাম আপনার চোখে তেমন মায়া দেখছি না। কাঠিন্য দেখছি। বিজ্ঞাপনের ছবিতে কাজ করতে গেলে ডিরেক্টর সাহেব আপনাকেও বাদ দিয়ে দিতেন।

নিলি বলল, আমার চোখে মায়া নেই এই কথাটাই তো বলতে চাচ্ছেন। চক্ষুলজ্জায় বলতে পারছেন না। ঠিকই ধরেছেন। আমার দৃষ্টি কঠিন। যখন আমি আমার ছেলের দিকে তাকাই, তখন দৃষ্টি কোমল হয়। চোখে মায়া চলে আসে। চোখের মায়ার এই হচ্ছে রহস্য। চোখের মায়া গণবিষয় না। শুধুমাত্র প্রিয়জনদের জন্যে। আরো রহস্য আছে। জানতে চান? জানলে অভিনয়ে সুবিধা হবে।মুহিব বলল, বলুন।নিলি বলল, আপনি আপনার সামনের পেইন্টিংটার দিকে তাকান। কী দেখছেন?পাথরের ওপর পাখি বসে আছে।