Categories
শিক্ষা

চার্লি চ্যাপলিন

চার্লি চ্যাপলিন [১৮৮৯–১৯৭৭]

শিল্প-সংস্কৃতির এক বিশেষ ধারা হাস্যকৌতুক দর্শক এবং শ্রোতাকে নির্মল আনন্দদানই যার লক্ষ্য । বিষয়টি হালকা মনে হলেও কিন্তু সহজ নয় ।অনেক হাসির খোরাক হয় বটে, কিন্তু মানুষ হাসিয়ে আনন্দদানের ব্যাপারটি আয় ত্ত করতে পারে এমন লোকের সংখ্যা খুব কম । কিন্তু এই অসাধ্য কাজটি যিনি অনায়াসে সাধন করতে পেরেছিলেন তিনি ছিলেন হাসির রাজা স্যার চার্লি চ্যাপলিন ।

যার নাম শুনলেই বিশ্বজুড়ে সবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি হাস্যকৌতুকপূর্ণ মুখের ছবি । যাকে দেখামাত্রই শিশু-কিশোর যুবক-বৃদ্ধা সবাই এমনিতেই হাসিতে আপ্লুত হয়ে ওঠে ।

চলচ্চিত্রে কৌতুকাভিনয় বলে একটি বিশেষ ধারা গড়ে উঠেছে । কৌতুক, হাসি, তামাশা, ঠাট্টা, ইয়ার্কি ইত্যাদির একটি বিশেষ ধরনই আধুনিক কৌতুক । আর এই বিশেষ ধারাটি যার দক্ষ হাতের স্পর্শে পুর্ণাঙ্গ বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে তিনি হলেন কৌতুকাভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন ।

চার্লি চ্যাপলিনের আসল নাম ছিল চার্লস স্পেনসার । চ্যাপলিনের পিতার নামও ছিল চার্লস চ্যাপলিন । মায়ের নাম ছিলি লিলি হার্নি । পিতামাতা দু’জনেই ছিলেন অতি সাধারণ পরিবারের সন্তান । ভবঘুরে যাত্রদলের নর্তক-নর্তকী । মা লিলি হার্নি গান গাইতেন আর নাচতেন । আর চার্লস বাদ্য বাজাতেন আর মাঝে মাঝে অভিনয় করতেন । লিলি হার্নির একবার বিয়ে হয়েছিল জনৈক বড়লোকের সাথে । কিন্তু এ বিয়ে টেকেনি । যাত্রাদল থেকেই এক বড়লোকের সাথে ভাব করে বিয়ে বসেছিলেন লিলি । তিন বছর পর এই বিয়ে ভেঙে গেলে লিলি আবার এসে জুটেছিলেন আগের দলে । তখনো চার্লস সে দলেই কাজ করতেন । দু’জনের সাথে আগেই পরিচয় ছিল । এবার সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হলো । তারপর বিয়ে আর তাঁদের সংসারেই জন্ম হলো বিশ্বখ্যাত কৌতুকাভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের ।

স্বামী-স্ত্রী দু’জনে যাত্রাদলে নেচে আর গান গেয়ে সমান্য আয় করতেন । তা দিয়ে তাদের সংসার চলতো না ঠিকমতো । সব সময় অভাব-অনটন লেগেই থাকতো । এছাড়া চ্যাপলিনের বাবা চার্লসের স্বভাবও খুব ভালো ছিল না । ছিলো নেশা করার অভ্যাস । সামান্য যা আয় করতেন তার বেশিরভাগই খরচ করতেন নেশা করে । অতঃপর লিলি হার্নির দ্বিতীয় বিয়েও টিকলো না । নেশাখোর স্বামীর ঘর করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হলো না । চার্লির জন্মের কয়েক বছর পরেই তাঁদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলো । মা লিলি ছেলে চ্যাপলিনকে নিয়েই রয়ে গেলেন যাত্রাদলে । বাবা চলে গেলেন অন্যত্র ।

মায়ের দেখাদেখি ছোটবেলা থেকেই গানের এবং অভিনয়ের চর্চা করতেন চ্যাপলিন । তাঁর গলার সুর ছিল ভারি চমৎকার । মা যেখানেই যেতেন ছেলে তাঁর সাথে থাকতেন । মা যতক্ষণ স্টেজে গান গাইতেন বা নাচতেন, চ্যাপলিন পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতেন । সর্বক্ষণ নজর থাকতো মায়ের ‍উপর । হঠাৎ একদিন তাঁর মায়ের অনুষ্ঠানে ঘটলো এক অঘটন । সেটা ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের কথা । মা স্টেজে গান গাইতে উঠেছেন । তাঁর শরীরটা দু’দিন থেকেই খারাপ ছিল । পয়সার অভাবে অসুস্থ শরীর নিয়েও গান গাইতে এসেছিলেন । ফলে যা হবার তাই হলো । স্টেজে গান গাইতে গাইতেই মায়ের গলার আওয়াজ আর বের হলো না । ওদিকে দর্শকের গ্যালারি থেকে শুরু হলো হই হল্লোড়-চিৎকার । মা নিজের অবস্থা এবং স্টেজের হইচই দেখে আরো ঘাবড়ে গেলেন । পরে ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় তিনি পালিয়ে এলেন স্টেজ থেকে । 

পাশে দাঁড়িয়ে সব তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে লক্ষ করছিলেন বালক চ্যাপলিন । যখন মা স্টেজ থেকে বের হয়ে এলেন তখনই চ্যাপলিন এক অবাক কান্ড করে বসলেন ।

তিনি গিয়ে সোজা দাঁড়ালেন স্টেজে দর্শকের সামনে । তারপর ধরলেন গান – 

Jack Jones well and

Known to everybody.

তাঁর চমৎকার গলা শুনের দর্শকরা তো থমকে গেলো । মুহূর্তে থেমে গেলো গোলমাল । এবার দর্শকরা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো এবং সেই সাথে টাকা আধুলি সামনে এসে ছিটকে পড়তে লাগলো স্টেজে । বৃষ্টির মতো । সবাই তাঁর গানে খুশি । তবে এরই মধ্যে আরেক মজার কাণ্ড করে বসলেন চ্যাপলিন । যখন দেখলেন বৃষ্টির মতো তাঁর চারপাশে টাকাপয়সা এসে ছিটকে পড়ছে অমনি গান থামিয়ে দর্শকদের লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন আমি এখন আর গান গাইব না । আগে পয়সাগুলি কুড়িয়ে নিই, তারপর আবার গাইবো । চ্যাপলিন এমন বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে কথাগুলো বললেন যে, দর্শকরা একটুও রাগ না করে বরং আরো মজা করে হাসতে লাগলো এবং আরো পয়সা পড়তে লাগলো । চ্যাপলিনও নানা অঙ্গভঙ্গি করে করে স্টেজের পয়সা কুড়াতে লাগলেন ।

সব পয়সা সংগ্রহ শেষ হলে স্টেজের বাইরে দাঁড়ানো মায়ের হাতে তুলে দিয়ে এসে আবার নতুন গান ধরলেন চ্যাপলিন । শুধু দর্শকবৃন্দ নয়, সেদিন মা নিজেও ছেলের প্রতিভা দেখে বিস্মিত হয়ে ভাবছিলেন, হয়েতো বা ভবিষ্যতে তাঁর ছেলে বিস্ময়কর কিছু একট হবে ।

মায়ের আশা পূর্ণ হয়েছিলো চ্যাপলিনের জীবন প্রতিষ্ঠায় । 

চার্লি চ্যাপলিন প্রথম জীবনে অনেক দুঃখকষ্ট সহ্য করেছেন । তাঁর কিশোর-জীবন কাটে মুদি দোকানে, ছাপাখানায়, রাস্তায় কাগজ বেঁচে, ঔষদের দোকানে এবং লোকের বাড়িতে কাজ করে । চার্লি চ্যাপলিন ছিলেন তাঁর সময়কার সবচেয়ে আলোচিত ও প্রশংসিত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের একজন । বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক আজো তাঁর অপূর্ব অভিনয়দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হন, প্রশংসায় হন পঞ্চমুখ ।

চিত্রসমালোচকদের মতে চার্লি চ্যাপলিন তাঁর সময়কার নির্বাক চলচ্চিত্রকে একটি উন্নত শিল্পে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন । এই কৌশলী অভিনেতার জন্ম হয়েছিলো ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৬ এপ্রিল ইংল্যান্ডে । মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি জন্মভূমি ইংল্যান্ড ছেড়ে চলে আসেন আমেরিকায় ।

এখানে এসে তিনি জড়িয়ে পড়েন চলচ্চিত্র জগতের সাথে । প্রবেশ করেন হলিউডে । 

১৯১২ খ্রিস্টাব্দে কিস্টোন স্টুডিওতে চ্যাপলিন একটি কমেডি ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ লাভ করেন । তবে এখানে তিনি ছিলেন অন্যান্য সাধারণ অভিনেতাদের মধ্যে একজন । তাঁর ভূমিকা সম্পর্কেও তিনি ছিলেন অনিশ্চিত । কিন্তু দ্বিতীয় ছবি ‘কিড আটোরেসেস অ্যাট ভোনস’ ছবিতে অভিনয় করেই চার্লি তাঁর নিজস্ব ভঙ্গি প্রদর্শন করতে সক্ষম হন । 

এই ছবিতে অভিনয় করার সময় তিনি প্রযোজকের পোশাক-পরিচ্ছদেও কৌতুক আনার চেষ্টা করেন এবং সেজন্য বিশেষ অদ্ভুত ধরনের ব্যাগের মতো, প্যান্ট, বিরাট জুতো পরিধান করেছিলেন । আর সেই সাথে লাগিয়েছিলেন একটি নকল গোঁফ এভাবেই তৈরি হয় ‘লিটল ট্রাম্প’ ।

চলচ্চিত্র জগতে চ্যাপলিন নিজেই নিজের ভাগ্যকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন । 

তাঁর উদ্দেশ্য সফল করতে সক্ষমও হয়েছিলেন । তাঁর দক্ষতা, বিপুল জনপ্রিয়তা একদিকে সৃজনশীল প্রতিভার এবং অন্যদিকে অর্থের দ্বার দুটোই খুলে দিয়েছিলো।

চ্যাপলিনের জীবনের প্রথম প্রযোজক ম্যাকসিনট ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দেই যুবক চ্যাপলিনকে দিয়েছিলেন ছবি পরিচালনান গুরু দায়িত্ব আর পারিশ্রমিক দিয়েছিলেন সপ্তাহে ১৫০ ডলার করে । এক বছর সময়ের মধ্যে তিনি ৩৫টি স্বল্পদৈর্ঘ ছবি নির্মাণ করেন ।

এর পরের বছর এখানে ছবি তৈরি করার জন্য তাঁকে সপ্তাহে ১২০০ ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন । তারও বছর দেড়েক পর, ’মিউচ্যুায়াল ফিল্ম করপোরেশন’ তাঁকে সপ্তাহে ১২,৮৪৪ ডলার করে দেয় এবং বোনাস হিসেবে দেয় দেড় লাখ ডলার । এরপর আরো উন্নতি হয় তাঁর । ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রদর্শক সার্কিটের সাথে ১০,০০,০০০ ডলারের এক চুক্তি করেন ।

এরপরে বছরই (১৯১৬) তিনি হলিউডে গড়ে তোলেন নিজস্ব চলচ্চিত্র স্টুডিও । ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি তাঁর সমসাময়িক আরো দু’জন তারকা ডগলাস ফায়ারবাংক এবং মেরি পিকপোর্ডকে নিয়ে গঠন করেন ইউনাইটেড আর্টিস্টস । চার্লি চ্যাপলিনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনী হলো ‘দ্যা কিড’ । ছবিটি নির্মিত হয়েছিলো ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে এবং এতে তাঁর সাথে ছিলেন শিশু অভিনেতা জ্যাকি কুগানে । ছবিটি প্রদর্শিত হবার সাথে সাথেই এটি মাস্টারপিস ছবি হিসেবে প্রশংসিত হয় । 

এই ছবিতে তিনি শিল্পকর্মে ডিফেন্সীর আবেগপ্রবণতা ও দুঃখ ফুটিয়ে তোলার সুযোগ লাভ করেন । ছবিটির পরিচালক হিসেবে চ্যাপলিনের বিচক্ষণাতও পরম বিশুদ্ধতা প্রমাণিত হয় ।

’দ্যা কিড’ ছবিতে ট্রাম্প রাস্তার পরিত্যক্ত একটি শিশুকে আশ্রয় দেয় । গোটা শিল্পীজীবনেই চ্যাপলিন ছিলেন পরম বিশুদ্ধতার প্রয়াসী । হাজার হাজার ফুট ছবি তুলে তাঁর মধ্যে কেবল কয়েকশো ফুট তাঁর কাছে বিবেচিত হতো । যেমন, ’দ্যা কিড’ ছবিতে ব্যবহৃত প্রতি ফুট ফিল্মের জন্য তুলেছেন ৫৩ ফুট ছবি, যা বর্তমান সময়ের জন্য একটি বিস্ময়কর অপচয়বিশেষ । চলতি শতাব্দীর গোড়ার দিকে সোনার সন্ধানে আলস্কা অভিমুখে মানুষের ছুটে চলা সম্পর্কে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত ‘দ্যা গোল্ড রাশ’ ছবিটি কতিপয় সমালোচকের মতে, চ্যাপলিনের সবচেয়ে সফল কমিডি ছবি । এই ছবির একটি বিখ্যাত দৃশ্যে ক্ষুধার্ত চ্যাপলিন খাদ্যভোজনের আয়েসে নিজের জুতো সেদ্ধ করে খান । সবাক চলচ্চিত্র আগমনের সাথে সাথেই কিন্তু চ্যাপলিন সেদিকে ঝুঁকে পড়েননি । ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত নাৎসীবাদ নিয়ে ব্যাঙ্গত্মক ছায়াছবি ‘দ্যা গ্রেট ডিক্টেটর’ ছিলো তাঁর প্রথম সবাক ছায়াছবি ।

এ ছবিতেই তিনি ট্রাম্প ভূমিকায় শেষ অভিনয় করেন । তিনি মনে করতেন মূকাভিনয়ের মাধ্যমেই একটি চরিত্রকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় ।

চ্যাপলিন বিশ্বশান্তির জন্য আবেগময় আবেদন জানিয়ে ‘দ্যা গ্রেট ডিক্টেটর’ এর শৈল্পিক দিককে ক্ষুণ্ণ করলেও এটি একটি মাস্টারপিস ছবি হিসাবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত । ‘দ্যা গ্রেট ডিক্টেটর’ ছবিতে চ্যাপলিন সবাক চিত্র মাধ্যমকে ব্যবহার করে হিটলারের মানসিকতাকে চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন । তাঁর পরবর্তী ছায়াছবি ‘মশিয়ে ভার্দু ফিলো’ বিয়োগাত্মক এবং ’লাইমলাইট’ ছিলো আবেগধর্মী । চ্যাপলিনের ব্যক্তিজীবনও খুব সুশৃঙ্খল ছিলো না । তবে তিনি ব্যাপক প্রচার পেয়ে এসেছিলেন । ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি নীতিগর্হিত কাজের জন্য অভিযুক্ত হয়েছিলেন । অবশ্য এ অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন । এরপরতিনি সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়েও একটি মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন এ ছাড়া যুদ্ধোত্তর আমেরিকায় কম্যুনিস্টবিরোধী পরিবেশ কম্যুনিস্টদের প্রতি তাঁর কথিত সহানুভূতি ও তাদের সাথে গোপন যোগাযোগ সম্পর্কে একটি কংগ্রেসী নিয়েও একটি মামলায় জড়িয়ে তদন্ত করে ।

১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপ ভ্রমণকালে তাঁর যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশের পারমিট বাতিল করা হয় । অবশ্য তিনি কখনো যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেননি । তাঁর এই মর্মবেদনা নিয়ে তিনি সুইজার‌ল্যান্ড চলে যান । সেখানেই তাঁর বাদবাকি জীবন কাটে সর্বশেষ স্ত্রী উনা ও নীলের সাথে । উনা ছিলেন নোবেল বিজয়ী নাট্যকার ইউজীবন ও নীলের মেয়ে । ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে চ্যার্লি চ্যাপলিনের আত্মকথা ”My Autobiography” প্রকাশিত হয় । সে সময় তাঁর এই বই চ্যার্লি বেস্টসেলার হিসাবে বিক্রি হয় । তবে চ্যাপলিনের বইতে তাঁর কাজ করার ভঙ্গি বা কায়দা সম্পর্কে কোনো বর্ণনা ছিলো না ।

সুইজারল্যান্ডেই অবশেষে বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের প্রিয় অভিনেতা হাসির সম্রাট চার্লি চ্যাপলিন প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে ২৫ ডিসেম্বর পরলোকগমন করেন । চার্লি চ্যাপলিন আমাদের মধ্যে না থাকলেও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মনে এক বিশাল শিল্পীর ক্যানভাস হিসেবেই বেঁচে আছেন । 

 

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২২

মধ্যরাতে হামিদা বানু স্বামীকে বললেন, তাঁর বিশ্রাম প্রয়োজন । শরীর টানছে না ।

হুমায়ূন সঙ্গে সঙ্গে যাত্রাবিরতির নির্দেশ দিলেন ।খোলা প্রান্তর । চাঁদে আলোর ফিনকি ফুটেছে । অচেনা ঝাঁকড়া একটা গাছের নিচে চাদর পেতে বসেছেন হামিদা বানু । গাছ থেকে অনেকটা দূরে রাতের খাবারের আয়োজন হচ্ছে । খিচুড়িজাতীয় খাদ্য তৈরি হচ্ছে । রসদ ফুরিয়ে আসছে । খাদ্য তৈরিতেও সাবধানতা ।

ক্লান্ত ঘোড়ার দলকে পানি এবং গম খাওয়ানো হচ্ছে । এদেরকে সুস্থ রাখা অত্যন্ত জরুরি ।

হুমায়ূন একা একা হাঁটছিলেন হঠাৎ হামিদা বানুর খিলখিল হাসির শব্দ শুনে এগিয়ে গেলেন । এই অবস্থায় এত সুন্দর করে কেউ হাসতে পারে না ।

হামিদা বানু স্বামীকে দেখে গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসলেন । হুমায়ূন বিস্মিত গলায় বললেন, কী হয়েছে হামিদা ?

হামিদা বললেন, কিছু হয় নি তো ।

তুমি হাসছিলে ।

আপনার এমন কোনো নির্দেশ আছে যে হাসা যাবে না ?

এই অবস্থায় কেউ আনন্দে হাসছে দেখে বিস্মিত হয়েছি । হাসার মতো কোনো কারণ কি ঘটেছে ?

ঘটেছে । আপনি আমার পাশে বসুন, তারপর বলছি কী ঘটেছে । হুমায়ূন হামিদা বানুর পাশে বসলেন । হামিদা বানু গলা নামিয়ে বললেন, আপনার হাত এগিয়ে ‍দিন । হাত ধরে বলব ।

হুমায়ূন হাত এগিয়ে দিলেন । হামিদা বানু স্বামীর হাত ধরতে-ধরতে বললেন, ভাগ্য আপনাকে অতি সাধারণ একজন মানুষের কাতারে নিয়ে এসেছে । এমন সাধারণ যে আমি ইচ্ছা করলেই এখন আপনার হাত ধরতে পারি । এই আনন্দেই হাসছি ।

হুমায়ূন ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন । স্ত্রীর কথার উত্তরে কিছু বললেন না ।

হামিদা বানু বললেন, আপনি একসময় কথায় কথায় শের বলতেন । অনেকদিন আপনার মুখ থেকে শের শুনি না । জোছনা নিয়ে কোনো শের কি আপনার জানা আছে ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২২

না ।

বিয়ের রাতে আমাকে নিয়ে যে দীর্ঘ কবিতাটি লিখেছিলেন সেটি বলুন শুনি ।

হামিদা! কবিতাটা আমার মনে নেই ।

একটা লাইনও মনে নেই ?

না ।

মনে করার চেষ্টা করুন । আজ রাতে আমি আপনার কাছ থেকে কবিতা শুনবই । যদি মনে না পড়ে নতুন কবিতা লিখবেন । কলমচিকে কাগজ-কলম নিয়ে আসতে বলুন । চাঁদের আলো তীব্র । এই আলোতে লিখতে আপনার অসুবিধা হবে না ।

হামিদা! তোমাকে খুব অস্থির লাগছে । কী হয়েছে বলো তো ?

আপনার মুখ থেকে কবিতা শুনতে ইচ্ছা করছে । এর বেশি কিছু না ।

হুমায়ূন বললেন, আমি কি তোমাকে একটা অনুরোধ করতে পারি ?

হামিদা বানু বললেন, সম্রাট কখনো অনুরোধ করেন না । আদেশ করেন ।

তুমি ভালো করেই জানো আমি রাজ্যহারা সাধারণ একজন । আমি আমার স্ত্রীকে অবশ্যই অনুরোধ করতে পারি ।

কী অনুরোধ বলুন ।

তুমি কান্দাহারে ফিরে যাও । তোমার পরিচিত প্রিয়জনরা সবাই সেখানে আছেন । আমার সঙ্গে পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর কোনো অর্থ হয় না । কখন কোন বিপদ ঘটে ।

হামিদা বানু কঠিন গলায় বললেন, আমি আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাব না । আমার মন বলছে একদিন আপনি রাজত্ব ফিরে পাবেন । দিল্লীর সিংহাসনে বসবেন । তখন আপনার সামনে আমাকে যেতে হবে কুর্নিশ করতে করতে । এই যে আমরা হাত ধরাধরি করে গাছের নিচে বসে আছি এরকম তো হবে না । এই সুযোগ আমি ছাড়ব না । আমি সারাক্ষণ থাকব আপনার পাশে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২২

কে যেন পেছন দিকে এসেছে । শরীর চাদরে ঢাকা বলে তাকে চেনা যাচ্ছে না ।

হুমায়ূন বললেন, কে ?

আমি বৈরাম খাঁ । আমাদের এক্ষুনি রওনা হতে হবে । রাতের খাবার খাওয়ার সময় পাওয়া যাবেনা । ঘোড়া কি প্রস্তুত ?

জি জাহাঁপনা ।

হুমায়ূন তার স্ত্রীকে হাত ধরে তুললেন। কোমল গলায় বললেন, ক্লান্তভাবটা একটু কি কমেছে ?

হামিদা বানু বললেন, হ্যাঁ কমেছে । আমরা যাচ্ছি কোথায় ?

বৈরাম খাঁ জানে । আমি জানি না ।

হামিদা বানু বললেন, আমি আপনার মুখ থেকে একটা শের না শুনে ঘোড়ায় উঠব না ।

হুমায়ূন বললেন,

‘‘ একজন প্রেমিকের কাছে চন্দ্র হলো তার

প্রেমিকার মুখ ।

আর জোছনা হলো প্রেমিকার দীর্ঘশ্বাস।’’

হামিদা বানু বললেন, বাহ্ সুন্দর শের! আপনাকে একটা কথা বলা হয় নি । আমি সন্তানসম্ভবা । আমার বিশ্রামের দিকে আপনাকে একটু নজর দিতে হবে । দিন-রাত ঘোড়ার পিঠে থাকতে পারব না ।

হতভম্ব হুমায়ূন বললেন, কী বললে ?

হামিদা বানু হাসতে হাসতে বললেন, একবার তো লজ্জার মাথা খেয়ে বলে ফেলেছি, আর বলেতে পারব না ।

হুমায়ূন বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে । জোছনা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে । হুমায়ূন হামিদা বানুর পাশাপাশি যাচ্ছেন। দুজনের কারও মুখেই কোনো কথা নেই । ঘোড়া ক্লান্ত হলেও ছুটছে তীব্র গতিতে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২২

হামিদার গা গুলাচ্ছে । ঘোড়ার গায়ের ঘামের গন্ধ এখন আর সহ্য হচ্ছে না । তিনি কথাবার্তায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করলেন। হুমায়ূনকে বললেন, আমাদের পরিকল্পনাটা কী ? আমরা কি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালিয়ে বেড়াব ?

হুমায়ূন জবাব দিলেন না । হামিদা বানু বললেন, উদ্দেশ্যহীন পালিয়ে বেড়ানো বন্ধকরে আমাদের ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনা করতে হবে….

হামিদা বানুর কথা শেষ হওয়ার আগেই ছোট কামানের গোলার আওয়াজ পাওয়া গেল । তারপর কয়েকবার । হুমায়ূনকে ধাওয়া করা বাহিনীর কামান নিয়ে আসার কথা না। ব্যাপারটা কী?

বৈরাম খাঁ’র নির্দেশে হুমায়ূনের বাহিনী মূল পথ ছেড়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে পড়ল। ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়া ঘোড়ার মতো একটি প্রাণীর পক্ষে যথেষ্ট জটিল । এই কাজটি ঘোড়ারা ভালোমতোই করছে। তারা বিপদ আঁচ করতে পারছে ।

হামিদা বানু বললেন, চমৎকার বুনো ফুলের সুবাস পাচ্ছি । আপনি কি পাচ্ছেন ?

হুমায়ূন বললেন, পাচ্ছি ।

হামিদা বানু বললেন, আমার কী সৌভাগ্য সুন্দর ফুলের ঘ্রাণ পেলাম! আল্লাহপাকের দরবারে হাজার শুকরিয়া।

মীর্জা কামরান লাহোর যাত্রা করবেন। জ্যোতিষী শুভক্ষণ ঠিক করে দিয়েছে । ফজরের নামাজের পরপরই যাত্রা শুরু করতে হবে। পরের শুভক্ষণ মধ্যনিশা । মীর্জা কামরান প্রথম শুভক্ষণ বেছেছেন ।

কান্দাহারের রাজমহিষীরা সবাই যাবেন । কান্দাহারে থাকবেন আসকারি মীর্জা ।

যাত্রা শুরুর আগে মীর্জা কামরান তাঁর মা গুলরুখ বেগমের কাছে গেলেন দোয়া নেওয়ার জন্যে । গুলরুখ বেগম লাহোর যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ।

মীর্জা কামরান মা’র কাছ থেকে বিদায় নিলেন। গুলরুখ বেগম বললেন, আমি মা হিসেবে তোমার মঙ্গল কামনা করছি । যাত্রা শুভ হোক । আমার কিছু প্রশ্ন আছে ।

বলুন কী প্রশ্ন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২২

তুমি নাকি তোমার বড়ভাই হুমায়ূনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেবে ?

তাকে ধরিয়ে দেবে শের শাহ্’র হাতে ?

কোথায় শুনলেন এমন কথা ?

গুলরুখ বেগম বললেন, দরবারের সব কথাই অন্তঃপুরে আসে । অতীতেও এসেছে, ভবিষ্যতেও আসবে । এখন আমার প্রশ্নের জবাব দাও ।

মীর্জা কামরান বললেন, আমি আপনার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি । তার আগে আমার চারটি প্রশ্ন আছে । আপনাকে দীর্ঘ জবাব দিতে হবে না । দীর্ঘ জবাব শোনার মতো সময় আমার হাতে নেই । শুধু ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ বলবেন । প্রথম প্রশ্ন, রাজ্যহারা হুমায়ূন কি এখন বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ?

হ্যাঁ ।

তার সঙ্গীসাথীরা একে একে সরে পড়ছে । সৈন্যবাহিনীল প্রায় সবাই তাঁকে ত্যাগ করেছে । হ্যাঁ নাকি না ?

হ্যাঁ ।

তৃতীয় প্রশ্ন, রাজ্যহারা হুমায়ূনের কি এখন কোনো ভবিষ্যৎ আছে ?

গুলরুখ বেগম জবাব দিলেন না । মীর্জা কামরান বললেন, আপনি জবাব দেন নি, কাজেই ধরে নিলাম এই প্রশ্নের উত্তরও হ্যাঁ ।

চতুথ্য এবং শেষ প্রশ্ন, আপনি কি চান আপনার মহান স্বামী যে মোঘল রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা টিকে থাকুক ?

হ্যাঁ ।

তাহলে আমি যা করছি তার বিকল্প নেই । আমি লাহোরে শক্তি সংগ্রহ করব ।

তুমি তোমার বড়ভাইয়ের পাশে দাঁড়াবে না ?

মীর্জা কামরান বললেন, অন্যের দুর্ভাগের সঙ্গে আমি নিজেকে জড়াব না ।

এই ভাই তোমার প্রতি যে মমতা দেখিয়েছে তা তুমি বিস্মরণ হয়েছ ?

মমতা দুর্বলের অস্ত্র । আমি দুর্বল না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২২

গুলরুখ বেগম দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এর অর্থ কি এই যে তুমি তোমার ভাইকে শত্রুর হাতে তুলে দেবে?

মীর্জা কামরান চুপ করে রইলেন। গুলরুখ বেগম কঠিন গলায় বললেন, মা হিসেবে তোমার কাছে আমার একটাই অনুরোধ-ভাইকে শের শাহ্’র হাতে তুলে দেওয়ার আগে তুমি নিজ হাতে তাকে হত্যা করবে । তোমার প্রতি সে যে মমতা এবং ভালোবাসা দেখিয়েছে এটা হবে তার পুরষ্কার ।

মেয়েলি কথাবার্তা শোনার সময় আমার নেই মা ।

তোমার ভাই কিন্তু শুনতো ।

শুনে শুনেই তো আজ তাঁর এই অবস্থা । শিয়ালের মতো সে ঘুরে বেড়াচ্ছে । তাঁকে তাড়া করছে শিকারি কুকুর ।

তার মতো শিয়াল হতে পারা মহা সৌভাগ্যের ব্যাপার । আচ্ছা তুমি রওনা হও । তোমাকে দেরি করিয়ে দিলাম ।

হুমায়ূন আছেন সিন্ধুর নাদান দুর্গে । এই দুর্গের প্রধান উছি বেগ দুর্গ হুমায়ূনের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন । তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে দুর্গের বাইরে অবস্থান নিয়েছেন । উছি বেগের উদ্দেশ্য পরিষ্কার না । এটা কি কৌশলে হুমায়ূনকে বন্দির চেষ্টা ? হুমায়ূন দুর্গে বন্দি থাকবেন । শের শাহ্’র কাছে খবর যাবে। বিশাল পুরষ্কারের বিনিময়ে উছি বেগ হুমায়ূনকে তুলে দেবেন শের শাহ্’র হাতে ?

হামিদা বানু দুর্গের একটি কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছেন । এই বিশ্রাম তাঁর জন্যে প্রয়োজন ছিল । এই মুহূর্তে তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন না । তাঁর শরীর খুবই খারাপ করেছে । গায়ে প্রবল জ্বর । সেবা করার কেউ নেই।

বৈরাম খাঁ’র হাতে এখন সৈন্যসংখ্যা মাত্র নয় শ’ । তবে এরা সবাই সুশিক্ষিত। এক শ’ তীরন্দাজ আছে, যাদের নিশানা অব্যর্থ । বৈরাম খাঁ দুর্গপ্রাচীরের বিশেষ বিশেষ জায়গায় তাদের বসিয়ে দিয়েছেন ।

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২১

শের শাহ্ বিশাল বাহিনী নিয়ে লাহোরের দিকে ছুটে আসছেন । এই বিশাল বাহিনীকে পরাস্ত করা এই মুহূর্তে সম্রাটের পক্ষে সম্ভব না । এমন পরিস্থিতিতে আপনার পরামর্শ কী ?

আমি অতি ক্ষুদ্র একজন । সম্রাটকে পরামর্শ দেওয়ার যোগ্যতা আমার নেই । তারপরও বলব সম্রাট যেন কান্দাহারের ‍দিকে চলে যান পালিয়ে যেতে বলছেন ?

হ্যাঁ । ‘য পলায়তি স্ব জীবতি’ ।

এর অর্থ কী ?

এর অর্থ যে পলায়ন করে সে বেঁচে থাকে ।

মীজা কামরানকে সম্রাটের সামনে উপস্থিত করা হয়েছে । তাঁর কোমরের তরবারি গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে । দুই হাত শক্ত করে পেছনদিকে বাঁধা । সম্রাটের সামনে বন্দিদের এইভাবেই উপস্থিত করানোর রীতি।

কামরান কুনিশ করার চেষ্টায় সামান্য নিচু হলেন ।

হুমায়ূন বললেন, আমার ভাইকে কেন তোমরা এভাবে আমার সামনে উপস্তিত করেছ ? এক্ষুনি হাতের বাঁধন খুলে দাও । গলা থেকে তরবারি নামাও ।

তা-ই করা হলো । সম্রাট উঠে এসে ভাইকে আলিঙ্গন করলেন । সম্রাট বললেন, আমার মহান পিতা মৃত্যুর আগে আমাকে বলেছেন, তুমি সমসময় ভাইদের দেখবে ক্ষমাসুন্দর চোখে । আমি তা-ই করছি । ভাই কামরান, এসো তুমি আমার ডানপাশে এসে বসো ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২১

কামরান মীর্জা তা-ই করলেন । অসময়ের একটি তরমুজ এসেছিল খোরাসান থেকে । সম্রাট নিজের হাতে সেই তরমুজের খণ্ড ভাইয়ের মুখে তুলে দিলেন । এমন আবেগঘন মুহূর্তে দরবারে ‘মারহাবা’ ধ্বনি উচ্চারিত হয় । কেউ মারহাবা ধ্বনি দিল না । সম্রাট ভাইকে বিশ্রাম নিতে পাঠালেন ।

মধ্যরাতে বৈরাম খাঁ সম্রাটকে ডেকে তুললেন । দুটি দুঃসংবাদ আছে, সম্রাটকে জানানো প্রয়োজন । প্রথম দুঃসংবাদ, শের শাহ্ লাহোরের কাছাকাছি চলে এসেছেন ।

দ্বিতীয় দুঃসংবাদ, মীর্জা কামরান কিছুক্ষণ আগেই তার সেনাবাহিনী নিয়ে কান্দাহার রওনা হয়েছেন । সম্রাট হুমায়ূনের সেনাবাহিনীর বেশির ভাগ সৈন্য কামরানের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন । তিনজন ছাড়া বাকি আমীররাও তাই করেছেন ।

হুমায়ূন বললেন, বৈরাম খাঁ, এর কারণ কী ?

বৈরাম খাঁ বললেন, বিচারসভায় আপনার কর্মকাণ্ড দেখা হয়েছে আপনার দুর্বলতা হিসেবে । সবাই থাকে সবলের পক্ষে ।

আমি কি দুর্বল ?

আপনি অনেক বেশি সবল । এটা ধরার ক্ষমতা তাদের নেই । হুমায়ূন বললেন, সবকিছুই তিনবার করে ঘটে । সৌভাগ্য এবং দুর্ভাগ্য আসে পরপর তিনবার । তুমি আমাকে দুটি দুঃসংবাদ দিয়েছ । এখন তৃতীয়টি দাও ।

বৈরাম খাঁ বললেন, সম্রাট যদি কামরান মীর্জাকে মৃত্যুদণ্ড দিতেন তাহলে সেই আদেশ দ্রুত কার্যকর করার ব্যবস্থা নেওয়া ছিল । হাতি এবং হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট করার জন্যে পাথর ছিল । কামরান মীর্জা সেই পাথরে সাদ মুহম্মদকে হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট করেছেন ।

সাদ মুহম্মদ কে ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২১

সম্রাটের এবং আমার অতি অনুগত একজন । তার হাতেই কামরান মীর্জা বন্দি হয়েছিলেন।

বৈরাম খাঁ, আপনি কি নিয়তি বিশ্বাস করেন ?

করি না । কিন্তু আপনি বললে করব ।

সম্রাট দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমি বলছি না । স্বয়ং আল্লাহ্পাক নিয়তির কথা বলেছেন । সূরা বনি ইসরাইলে বলা আছে, ‘আমি তোমাদের ভাগ্য তোমাদের হলায় হারের মতো ঝুলাইয়া দিয়াছি।’

নিয়তির হাতে সম্রাট নিজেকেই সমর্পণ করলেন। স্ত্রী হামিদা বানু এবং অল্পকিছু অনুগতজন নিয়ে শুরু হলো তাঁর পথেপ্রান্তরে পালিয়ে থাকার দিন । তাঁকে তাড়া করে ফিরল আরেক নিয়তির সন্তান শের খাঁ । ভুল বললাম, খাঁ না । তিনি এখন শের শাহ্ ।

এশার নামাজ শেষ হয়েছে । মীর্জা কামরান নামাজ শেষ করে নৈশকালীন মদের আসরে বসেছেন । আসরে ছয়জন আমীর উপস্থিত । তাদের হাতে রুপার পানপাত্র । মীর্জা কামরানের হাতে সোনার পানপাত্র । মীর্জা কামরান ক্ষুদ্ধ চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন । তাঁর মেজাজ সপ্তমে । তবে মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন । তাঁর মেজাজ খারাপের প্রধান কারণ, স্বর্ণের পানপাত্রে তাঁকে ছাড়াও আরেকজনকে মদ পরিবেশন করা হয়েছে । তার নাম বরকত খাঁ । বরকত খাঁকে কান্দাহার পাঠিয়েছেন শের শাহ্-পুত্র জালাল খাঁ । বরকত খাঁ’র মর্যাদা একজন আমীরের চেয়ে বেশি হতে পারে না । তাঁকে স্বর্ণপানপাত্রে মদ পরিবেশন করে মীর্জা কামরানকে ছোট করা হয়েছে । মীর্জা কামরান ভেবে পাচ্ছে না, স্বর্ণপাত্রের এই ভুলটা কারা করেছে! খেদমতগাররা এমন বড় ভুল করবে না । নিশ্চয়ই এখানে আমীরদের ভূমিকা আছে ।

বরকত খাঁ পানপাত্রে চুমুক দিচ্ছেন না । এটিও এক ধরনের অপমান । মীর্জা কামরান বললেন, আপনার কি নেশার পানীয় বিষয়ে আসক্তি নেই ?

বরকত খাঁ বললেন, জি না জনাব । আমি ধর্মভীরু মানুষ । ধর্মের অনুশাসন মেনে চলি । পরকালে হুররা যে মদিরা পরিবেশন করবেন তার জন্যে অপেক্ষা করাটাকে উওম মনে করি । মীর্জা কামরান বললেন, আপনি কি জালাল খাঁ’র কাছ থেকে কোনো পত্র এনেছেন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২১

জি না জনাব । জালাল খাঁ তার পিতার স্বভাব পেয়েছেন । কলমের খেলার চেয়ে অসির খেলা তার অধিক পছন্দ । মীর্জা কামরান পানপাত্রে দীর্ঘ চুমুক দিয়ে বললেন, জালাল খাঁ আপনাকে পাঠিয়েছেন কেন ?

আপনার কুশল জানার জন্যে । আপনার শরীর কেমন জনাব ?

শরীর ভালো ।

পেটের পীড়ার ঘনঘন আক্রমণে শিকার হন বলে শুনেছি । পেট কি ঠিক আছে ?

পেট ঠিক না থাকলে আপনি কি ওষুধ দেবেন ?

সেই যোগ্যতা আমার নাই জনাব । আমি সামান্য দূত । কথা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার বাহনবিশেষ ।

মীর্জা কামরান বললেন, জালাল খাঁ’র কাছ থেকে কী কথা এনেছেন বলুন শুনি ।

আমি কথা এনেছি আপনার জন্যে । আপনার আমীরদের জন্যে না । তাদের সামনে আমি মুখ খুলব না ।

ওরা সবাই আমার বিশ্বস্ত ।

বরকত খাঁ হাসতে হাসতে বললেনম, এদের মধ্যে অনেকেই কিছুদিন আগে হুমায়ূনের বিশ্বস্ত ছিলেন। আমীরদের বিশ্বস্ততা আর বেশ্যাপল্লীর শারীরিক পরিত্রতা তুল্যমূল্য ।

মীর্জা কামরান কঠিন ভাষায় বললেন, আপনি আমার সামনে আমার আমীদের অপমান করছেন!

দুঃসময়ে কোনো অপমান গায়ে মাখতে হয় না । মোঘলদের এখন চরম দুঃসময় ।

মীর্জা কামরান বললেন, আপনার যদি কিছু বলার থাকে আমার আমীরদের সামনে বলতে হবে ।

বরকত খাঁ বললেন, আমার কিছুই বলার নাই জনাব । আপনার কুশল জানতে এসেছিলাম । কুশল জানা হয়েছে । সন্তোষ লাভ করেছি । এখন অনুমতি পেলে বিদায় হব ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২১

বলতে-বলতে বরকত খাঁ উঠে দাঁড়ালেন । লোকটির ঔদ্ধত্য এবং দুঃসাহস দেখে মীর্জা কামরানের পিত্তি জ্বলে গেল । প্রধান আমীর বললেন, আমরা চলে যাচ্ছি । আপনারা আলোচনায় বসুন । সবার শান্তির জন্যেই আলোচনা জরুরি ।

মীর্জা কামরান ইশারায় বরকত খাঁকে বসতে বললেন, । আমীররা ঘর খালি করে চলে গেল । দুজন খিদমতগারকেও চলে যেতে হলো ।

বরকত খাঁ বললেন, এখন মূল কথায় আসা যাক । জালাল খাঁ আপনার কাছে জানতে চাচ্ছেন, আপনি শের শাহ্’র জন্যে অর্থাৎ দিল্লীর মহান সম্রাটের জন্যে কী করতে পারেন ।

মীর্জা কামরান বললেন, আমাকে শান্তিতে থাকতে দিলে অনেক কিছুই করতে পারি । আপনারা আমাকে শান্তি দেবেন, আমি আপনাদের শান্তিতে থাকার ব্যবস্থা করব ।

আপনার কি ধারণা দিল্লীর সম্রাট অশান্তিতে আছেন ?

অবশ্যই । আপনারা হুমায়ূন-আতঙ্কে ভুগছেন । তাঁকে তাড়া করে ফিরছেন । আপনাদের ধারণা, তিনি দ্রুত শক্তি সংগ্রহ করবেন । আপনাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেবেন । যাই হোক আমি সরাসরি বলি, আমি আমার বড়ভাইকে জীবিত বা মৃত আপনাদের হাতে তুলে দিতে পারি । তার বিনিময়ে আমি কী পাব ?

বরকত খাঁ বললেন, রেশমের কাজ করা মণিমুক্তা বসানো একজোড়া পাদুকা শের শাহ্ নিশ্চয়ই আপনাকে দেবেন ।

রসিকত করছেন ?

রসিকতা কেন করব! শের শাহ্ পাদুকা উপহার ‍দিতে পছন্দ করেন । তিনি যোধপুরের রাজা মালদেবকে একজোড়া পাদুকা উপহার দিয়েছেন । ঘটনার সত্যতা সন্ধান করলেই জানতে পারবেন । যাই হোক, জালাল খাঁ আমাকে পাঠিয়েছেন হুমায়ূনকে বন্দি করার বিষয়ে আপনার সাহায্য কামনা করতে । বিনিময়ে আপনি লাহোর ফিরে পাবেন । শুনেছি লাহোরের জলবায়ু আপনাকে পীড়ামুক্ত রাখতে সাহায্য করে ।

মীর্জা কামরান বললেন, শুধু মুখের কথা! এই বিষয়ে কোনো চুক্তি হবে না ?

বরকত খাঁ বললেন, যাদের মুখের কথা মূল্যহীন তারাই চুক্তির জন্যে লালায়িত হয় । জালাল খাঁ’র মুখের কথা মূল্যহীন না ।

আমি কবে লাহোর যেতে পারি ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২১

ইচ্ছা করলে এখনই রওনা দিতে পারবেন । পান বেশি করেছেন, এই অবস্থায় রওনা দেওয়া ঠিক হবে না । বলতে ভুলে গেছি, জালাল খাঁ আপনার জন্যে উপহার পাঠিয়েছেন । উপহার আপনার পছন্দ হবে ।

কী উপহার ?

বাংলা মুলুক থেকে আনা দুজন হিজড়া । হিজড়ার বিষয়ে আপনার আগ্রহের কথা আমরা জানি । শারীরিক ক্রটির কারণে ওদের অন্য গুণাবলি বিকশিত হয় ।*

আমি উপহার পেয়ে খুশি হয়েছি, ওনাকে ধন্যবাদ ।

বরকত খাঁ বললেন, আপনি আমীরদের আসরে ডাকুন ।

*বঙ্গদেশের হিজড়াদের মোঘল হেরেমে কদর ছিল । রাজপুরুষরা যৌন কদর্যতামুক্ত ছিলেন না । ভারতবর্ষের বাইরেও তাদের চাহিদা ছিল ।

আনন্দযাত্রা অব্যাহত থাকুক । জালাল খাঁ’র উপহার কেমন তাও দেখুন । আমি বিদায় নিচ্ছি ।

মীর্জা কামরানের আনন্দফুর্তি সারা রাত স্থায়ী হলো । হিজড়াদের নৃত্যগীত মীর্জা কামরানকে বিমোহিত করল।

কিছুক্ষণের জন্যে আমরা আচার্য হরিশংকরের কাছে ফিরে যাই । তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণে হুমায়ূনের সঙ্গী হন নি । তিনি এখন আছেন পুণ্যধাম কাশিতে ।

তাঁর হাতে স্বর্ণমুদ্রা এবং রৌপ্যমুদ্রার সংগ্রহ ভালো । হুমায়ূন তাঁকে দুটি রুবি পাথরও দিয়েছেন । হরিশংকরের বাকি জীবন ভালোমতোই যাওয়ার কথা

তিনি কাশিতে একটি ঘর ভাড়া করেছেন । একজন পাচক রেখেছেন, দারোয়ান রেখেছেন । তাঁর সময় কাটে মন্দিরে মন্দিরে ।

একদিনের কথা, তিনি মন্দিরে সন্ধাপূজা দেখে ঘরে ফিরে দেখেন তার বিছানায় হুমায়ূন-কন্যা আকিকা বেগম। সে হাসিমুখে বসে আছে ।

হরিশংকর বুঝলেন চোখের ধাক্কা । কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখে রাম নাম নিয়ে চোখ খুললেন, আকিকা বেগম আগের জায়গাতেই বসা । সে মিষ্টি গলায় বলল, আমার বাবা সম্রাট হুমায়ূন কোথায় ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২১

হরিশংকর মূর্ছিত হয়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন ।

জোছনাপ্লাবিত রজনী । রাজ্যহারা সম্রাট দলবল নিয়ে পালাচ্ছেন । তিনি যাচ্ছেন সিন্ধুর দিকে । তাঁর সারা দিন ঘোড়ার পিঠে কেটেছে । সন্ধায় মাগরেবের নামাজের কিছু বিরতি নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করেছেন ।

হুমায়ূনকে অনুসরণ করছেন কুতুব খাঁ । শের শাহ্’র আরেক পুত্র । তার ওপর নির্দেশ হুমায়ূনকে হিন্দুস্থান-ছাড়া করতে হবে । তাঁর ওপর সরাসরি চড়াও হওয়ার প্রয়োজন নেই ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২২

 

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২০

তোমার কতবড় সৌভাগ্য সেটা একটু চিন্তা করো ।

পরাজিত সম্রাটের সঙ্গে বিবাহ হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য । সম্রাটের মন্দ ভাগ্যের সঙ্গে আমার ভাগ্য জড়াতে চাই না ।

তুমি নিতান্তই বালিকার মতো তর্ক করছ ।

হামিদা বানু হাসতে হাসতে বলল, আমি তো বালিকাই । সারা রাত চেষ্টা করেও হামিদা বানুকে রাজি করানো গেল না । মীর্জা হিন্দাল ঘটনা শুনে ভাইয়ের ওপর প্রচণ্ড রাগ করলেন । যাকে শের শাহ্ তাড়া করছে যার পালানোর পথ প্রায় বন্ধ সে কী করে এইসময় বিয়ের জন্যে পাগল হবে ?

দিলদার বেগম হুমায়ূনের সম্মানে বিরাট ভোজের আয়োজন করেছিলেন । হুমায়ূন ঘোষণা করলেন, হামিদা বানুর সঙ্গে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো খাদ্য গ্রহণ করবেন না । উপবাস থাকবেন ।

সম্রাট কোনো খাদ্য গ্রহণ করছেন না শুনে হামিদা বানু বিয়েতে রাজি হলেন ।

দিলদার বেগমের কাছ থেকে পাওয়া দুই লক্ষ রৌপ্যমুদ্রা সম্রাট বিবাহের ‘নিকাহানা’ হিসেবে হামিদা বানুর বাবা মীর আবুল বকাকে দিলেন । এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা দিলেন নবপরিণীতা স্ত্রীকে ।

বাসর রাতে হামিদা বলল, আমি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আপনার ভাগ্যের সঙ্গে নিজের ভাগ্য জড়িয়েছি । তবে আমি আপনাকে ওপর আসুক আমি আপনাকে ছেড়ে যাব না ।

সম্রাট বললেন, তোমাকে নিয়ে আমি একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করেছি । কবিতাটা শুনবে ?

হামিদা বললেন, না । আমি এখন ঘুমাব । আমার ঘুম পাচ্ছে ।

সম্রাট বললেন, আমি হুকুম না দেওয়া পর্যন্ত তুমি ঘুমাতে পারবে না । আমি হুকুম দিই নাই ।

হামিদা বানু চোখ বন্ধ করলেন এবং পাশ ফিরলেন ।

সম্রাট বললেন, তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছ ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২০

না ।

তোমাকে আমি একটা উপহার দেব । উঠে বসো । উপহারটা কী দেখো ।

কী উপহার ?

একটা হীরা । এর নাম কোহিনুর ।

কোহিনুরের আমার কোনো প্রয়োজন নেই । আপনি কপর্দকহীন

একজন মানুষ । এই হীরা আপনার প্রয়োজন ।

কোহিনুর তুমি নেবে না ?

না । এখন অনুমতি দিন, আমি ঘুমাব ।

যাও অনুমতি দিলাম ।

সম্রাট ঘুমন্ত স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে লেখা দীর্ঘ কবিতাটি আবৃত্তি করলেন ।

আবৃত্তি শেষ হওয়ামাত্র হামিদা বানু বললেন, আপনি দুর্বল সম্রাট কিন্তু অত্যন্ত সবল একজন কবি । কবিকে অভিনন্দন ।

হামিদা বানুর গর্ভেই পৃথিবীর সেরা নৃপতিদের একজন জন্মান ।

তিতি সম্রাট আকবর । আকবর দ্য গ্রেট ।

এই প্রসঙ্গ যথাসময়ে আসবে ।

ফজরের নামাজ শেষ করে সম্রাট হুমায়ূন কিছুক্ষণ ঘুমান । ‍দিনের কাজকর্ম শুরু হয় ঘুম থেকে ওঠার পর। আজ নিয়মের ব্যতিক্রম হয়েছে । সম্রাট নামাজ শেষ করে বাগানে গেছেন । তাঁর মন প্রফুল্ল । গত রাতের শেষ অংশে সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখেছেন । শেষরাতের স্বপ্ন অর্থবহ । একজন তফসিরকারীকে দিয়ে স্বপ্নের অর্থ করাতে হবে ।

স্বপ্নে তিনি তাঁর পিতা বাবরকে দেখেছেন । বাদশাহ বাবর ঘোড়ায়ে চড়ে যাচ্ছেন । পেছনে পেছনে যাচ্ছেন হুমায়ূন । জায়গাটা মনে হলো কাশ্মীরের কোনো বাগান । কাশ্মীর বাদশাহ বাবরের অতি প্রিয় স্থান । কাশ্মীরকে তিনি বলতেন, আমার ব্যক্তিগত বাগিচা ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২০

ঘোড়ায় যেতে যেতে একটা জলা জায়গার কাছে বাবর থামলেন । ঘোড়া থেকে নামলেন না । হুমায়ূনকে বললেন, তাকিয়ে দেখো কী সুন্দর জলপদ্ম ! যাও এই পদ্মটি তুলে আনো । আমি এত সুন্দর জলপদ্ম কখনো দেখি নি ।

পিতার আদেশ শুনে হুমায়ূন ঘোড়া থেকে নামলেন । পদ্ম আনতে তাঁকে পানিতে পা ফেলতে হলো । পানি বরফশীতল । কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ ।

স্বপ্নের এই পর্যায়ে সম্রাটের ঘুম ভাঙল । অনেকদিন তিনি পিতাকে স্বপ্নে দেখেন না । তাঁর চেহারাও হুমায়ূনের কাছে অস্পষ্ট হয়ে আসছিল ।

স্বপ্নে পিতাকে অতি স্পষ্ট দেখে হুমায়ূনের মন আনন্দে পূর্ণ হয়েছে । তিনি নিশ্চিত এটি একটি ভালো স্বপ্ন ।

লাহোরের এই বাগানে জলপুষ্প ফোটার জন্যে একটি জলাধার করা হয়েছে । সম্রাট হুমায়ূন জলাধারের দিকে যাচ্ছেন । তাঁর মন বলছে জলাধারে তিনি জলপদ্ম ফুটে আছে দেখবেন ।

খুব কাছ থেকে কেউ একজন বলল, আমি কি সম্রাটের সঙ্গে কিছুক্ষণ থাকতে পারি? অতি জরুরি কিছু কথা আমার সম্রাটকে বলা দরকার ।

সম্রাট ঘাড় ফিরিয়ে বৈরাম খাঁকে দেখলেন । বৈরাম খাঁকে চিন্তিত এবং বিষণ্ন দেখাচ্ছে । হুমায়ূন বললেন, আপনার সঙ্গ আমার সবসময় প্রিয় । আসুন আমরা দুজন জলপদ্মের সন্ধানে যাই । জরুরি আলাপের জন্যে সময় অনেক পাওয়া যাবে ।

বৈরাম খাঁ এগিয়ে এলেন । হুমায়ূন বললেন, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে বিনিদ্র রজনী কেটেছে । বলুন জরুরি কথা ।

আমি একটি পত্র নিয়ে এসেছি ।

হুমায়ূন বললেন, পত্র কে পাঠিয়েছে? শের শাহ্ ?

না, পত্রটি লেখা হয়েছে শের শাহকে । লিখেছেন আপনার ভ্রাতা মীর্জা কামরান ।

হুমায়ূন জলাধারের দিকে যাচ্ছিলেন, বৈরাম খাঁর কথায় তাঁর থমকে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা । তিনি থমকে দাঁড়ালেন না । জলাধার পর্যন্ত গেলেন । সেখানেও জলপদ্ম ফুটেছে । স্বপ্নের মতো সুন্দর না হলেও সুন্দর । একসঙ্গে অনেকগুলি ফুটেছে বলেই সুন্দর । স্বপ্নে একটা জলপদ্মই ছিল । হুমায়ূন আনন্দিত গলায় বললেন, বাহ্ !

বৈরাম খাঁ বরলেন, পত্রটা কি এখন পড়বেন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২০

হুমায়ূন বললেন, এই অপূর্ব দৃশ্য কিছুক্ষণ দেখতে দিন, তারপর পত্র পাঠ করব ।

দীর্ঘনিঃশ্বাস চাপতে চাপতে বৈরাম খাঁ বললেন, অবশ্যই । আপনি দৃশ্য দেখুন ।

শের শাহকে লেখা মীর্জা কামরানের পত্র-

দিল্লীর মহান সম্রাট, জগৎস্বীকৃত বীরপুরুষ মহানুভব শের শাহ্ ।

আমি দীর্ঘ পত্রালাপে যাচ্ছি না । আমার ভাই

হুমায়ূন মীর্জা এই বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী । মূল

কথায় যাই । আমি  আমার ভাইকে বন্দি করে

আপনার হাতে তুলে দিতে রাজি আছি । বিনিময়ে

আমি কী পাব তা দূত মারফত জানালে খুশি হব ।

ইতি

আপনার অনুগত

মীর্জা কামরান

হুমায়ূন ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে আবারও জলাধারভর্তি পদ্মের দিকে চোখ ফিরিয়ে বললেন, বৈরাম খাঁ, আপনি কি এই ফুলগুলির আয়ু জানেন ?

বৈরাম খাঁ বললেন, আমি সৈনিক মানুষ । আমার চিন্তা আমার মহান সম্রাটের এবং আমার সৈন্যদের আয়ু নিয়ে ।

হুমায়ূন বললেন, অপূর্ব এই ফুল মধ্যরাতে ফোটে এবং মধ্যদুপুরে বুজে যায় । সাত দিন এরকম চলে, তারপর এর আয়ু ফুরায় ।

সম্রাট, আমরা কি মূল বিষয়ে আসতে পারি?

মূল বিষয়ে যেতে মন চাচ্ছে না বলেই পুষ্প বিষয়ে কথা ।

অবস্থা যে গুরুতর তা কি বুঝতে পারছেন ?

পারছি ।

আপনার কি মনে হয় না এই মুহূর্তেই কামরান মীর্জাকে বন্দি করা প্রয়োজন ?

তা কি সম্ভব ?

বৈরাম খাঁ বললেন, গত রাতে শেষ প্রহরে আমি তাকে বন্দি করেছি । আপনার হুকুম পাওয়ামাত্র তাঁকে আপনার সামনে উপস্থিত করা হবে ।

সম্রাট বললেন, শাবাশ ।

বৈরাম খাঁ মাথা নিচু করে প্রশংসা গ্রহণ করলেন । হুমায়ূন বললেন, কেউ চমৎকার কোনো কাজ করলে আমরা বলি শাবাশ । কেন বলি জানেন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২০

না ।

পারস্য-সম্রাট শাহ আব্বাসের কারণে বলি । শাহ আব্বাস সারা জীবন প্রশংসনীয় সব কাজকর্ম করে গেছেন। সেখান থেকেই শাবাশ শব্দটি এসেছে ।

বৈরাম খাঁ বললেন, আমি সৈনিক মানুষ । এত কিছু আমার জানার প্রয়োজন নাই । যুদ্ধবিদ্যা জানা প্রয়োজন । তারপরেও সম্রাটের কাছ থেকে শিক্ষামূলক প্রতিটি বিষয়ে আমি মনে রাখি । এখন অধীনের আপনার প্রতি দুটি বিশেষ অনুরোধ আছে ।

আপনার যে-কোনো অনুরোধ রাখা হবে । অন্যায় অনুরোধ হলেও আমি রাখব । বলুন কী অনুরোধ ?

আমার দুটি অনুরোধ-কামরান মীর্জাকে বিদ্রোহ এবং গোপন ষড়যন্ত্রের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেবেন । এবং এই দণ্ডাদেশ আজ সূর্যাস্তের আগেই কার্যকর করবেন ।

দ্বিতীয় অনুরোধ কী ?

যার কারণে আমরা এই ষড়যন্ত্রে বিষয়ে জানতে পারি তাকে পুরষ্কৃত করবেন ।

সে কে ?

তার নাম হরিশংকর ।

হরিশংকরকে পুরষ্কৃত করা হবে । তাঁকে আমার সামনে উপস্থিত করুন ।

কামরান মীর্জাকে কখন উপস্থিত করব ?

আসরের নামাজের পর ।

বৈরাম খাঁ বললেন, আমি কি আশা করতে পারি, মাগরেবের নামাজের আগেই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে ?

হুমায়ূন জবাব দিলেন না ।

বৈরাম খাঁ বললেন, হাতির পায়ের নিচে মস্তক পিষ্ট করে মৃত্যুই হলো এমন অপরাধীর নিম্নতম শাস্তি ।

হুমায়ূন এবারও কিছু বললেন না ।

আমি শাস্তির ব্যবস্থা সম্পূর্ণ করে রাখব । আপনার আদেশ পাওয়ামাত্র শাস্তি কার্যকর হবে ।

কামরান মীর্জাকে বন্দি করা হয়েছে-এই খবর অন্তঃপুরের রাজমহিষীরা জেনেছেন । কামরান মীর্জার মা গুলরুখ বেগম আতঙ্কে অস্থির । তিনি জানেন তাঁর ছেলেকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে । ষড়যন্ত্রকারীদের এই শাস্তির বিধান । মা হয়ে সন্তানের মৃত্যু তিনি নিতে পারছেন না । তিনি কিছুক্ষণ পরপর জ্ঞান হারাচ্ছেন । দুপুরের ‍দিকে খবর পাওয়া গের সম্রাট হুমায়ূন এসেছেন, গুলরুখ বেগমের সঙ্গে দেখা করতে । গুলরুখ বেগমের উঠে দাঁড়ানোর শক্তি ছিল না । দুজন দাসী তাঁকে ধরাধরি করে সম্রাটের সামনে উপস্থিত করল ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২০

হুমায়ূন বললেন, মা! আপনি নিশ্চয়ই কামরান মীর্জার কর্মকাণ্ড বিষয়ে অবগত হয়েছেন ?

গুলরুখ বেগম হাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন।

হুমায়ূন বললেন, আপনার কি কামরান মীর্জার বিষয়ে কিছু বলার আছে ? বাদ আসর তার বিচার বসবে ।

গুলরুখ বেগম বললেন, অপরাধী অপরাধের জন্য শাস্তি পাবে । আমার কিছু বলার নেই ।

আপনার করুণ অবস্থা দেখে আমি ব্যথিত । আমি দুপুরে আমার সঙ্গে খাবার গ্রহণের জন্য আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি । আপনি কি আমার সঙ্গে খাবার গ্রহণ করবেন ?

না ।

হুমায়ূন বললেন, আল্লাহ্ পাক আপনার মনের কষ্ট দূর করুক । আমিন ।

কামরান মীর্জাকে রাখা হয়েছে সাধারণ একটি তাঁবুর ভেতরে । তাঁর দুই হাত পেছনে দিকে শক্ত করে বাঁধা। তাঁকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে । তাঁবুর চারদিকে বৈরাম খাঁ’র অনুগত একদল ঘোড়সওয়ার সৈন্য ।এদের নেতৃত্বে আছে সাদ মুহম্মদ । সে কামরানের সঙ্গে তাঁবুর ভেতর আছে ।

কামরান মীর্জা বললেন, তোমার নাম কী ?

সাদ মুহম্মদ ।

কামরান বললেন, এটা আবার কেমন নাম! আমি তোমার নাম দিলাম বাদ মুহম্মদ ।

আপনার অভিরুচি ।

আমার বাঁধন খুলে দাও । আমি জোহরের নামাজ আদায় করব ।

বিশেষ বিশেষ অবস্থায় ইশারায় নামাজ পড়ার বিধান আছে ।

আপনার এখন সেই অবস্থা ।

আমি ক্ষুধার্ত । আমার জন্যে দুপুরের খাবারের কী ব্যবস্থা ?

সাদ মুহম্মদ জবাব দিল না । অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রইল ।

কামরান বললেন, তুমি ব্যাঙাচির কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে আসো,

আমাকে দুপুরের খাবার দেওয়া হবে কি না ।

কাকে ব্যাঙাচি বলছেন ?

বৈরাম খাঁকে । ব্যাঙাচি তার যথার্থ পরিচয় ।

আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার হুকুম নেই ।

সম্রাটের সামনে আমাকে কখন হাজির করা হবে ?

জানি না । শুনেছি আসরের পর ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২০

আমি আমার ভাইকে চিনি । আমার ভাই যখন শুনবেন আমাকে না খাইয়ে রাখা হয়েছে তিনি রাগ করবেন। তুমি যাও, আমার খাবারের ব্যবস্থা করো ।

আপনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্যে হাতি এবং পাথর প্রস্তুত করা হয়েছে । আমার উপদেশ, আপনি আহারের কথা চিন্তা না করে আসন্ন মৃত্যুর কথা চিন্তা করুন । এবং আল্লাহ্ পাকের নাম নিতে থাকুন ।

আমি তৃষ্ণার্ত । পানি খাব ।

আপনার সামনে থেকে উঠে যাওয়ার হুকুম আমার নেই ।

বাদ মুহম্মদ, তোর ধৃষ্টতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার মনে থাকবে ।

হুমায়ূন আচার্য হরিশংকরকে ডেকে পাঠিয়েছেন । তিনি তাঁর সঙ্গে দুপুরের খাদ্য গ্রহণ করবেন। হরিশংকর নিরামিশাষী । তাঁর জন্যে ত্রিশ পদের নিরামিষের ব্যবস্থা করা হয়েছে । তিনি ছোঁওয়া বাঁচিয়ে রেশমের আসনে আলাদা বসেছেন ।

সম্রাট বললেন, আম আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ ।

হরিশংকর বললেন, আমার জীবন আমি আপনাকে নিবেদন করেছি । কাজেই আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার কিছু নেই ।

আপনি কীভাবে জানলেন, কামরান মীর্জা শের শাহ্’র কাছে পত্র পাঠিয়েছে ?

সম্রাটের স্বার্থেই আমি কামরান মীর্জার আস্থাভাজন হয়েছি । আমি এই পত্রের বিষয়ে সরাসরি তাঁর কাছ থেকে জানতে পারি ।

আপনি একজনের বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন ।

আমি যা করেছি সম্রাটের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে করেছি । সম্রাটের জন্যে যদি আরও হাজারজনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে হয়, আমি করব ।

আপনি খাদ্য গ্রহণ করছেন না । খাবার নাড়াচাড়া করছেন । কারণ জানতে পারি  ?

আমি একটি বিষয় নিয়ে কঠিন উদ্বেগের মধ্যে আছি বলেই আমার

ক্ষুধা-তৃষ্ণা লোপ পেয়েছে ।

উদ্বেগের কারণ জানতে পারি ?

 

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৯

শুভদিন দেখে হুমায়ূন শের শাহকে লণ্ডভণ্ড করে দিতে যুদ্ধযাত্রা করলেন । শেষ মুহূর্তে মীর্জা কামরান সরে দাঁড়ালেন । কারণ নদীর এক মাছ খেয়ে তিনি পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়েছেন । বিছানা থেকে উঠে বসার ক্ষমতাও নেই এই অবস্থায় যুদ্ধযাত্রা করা যায় না । তবে তিনি পাঁশ শ’ ঘোড়সওয়ার পাঠিয়ে দিলেন । তারা কিছুদূর গিয়ে পাঞ্জারে ফিরে এল । সম্ভবত এরকম নির্দেশই তাদের উপর ছিল ।

হুমায়ূন ভাইকে একটি চিঠি পাঠিয়ে তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখলেন । চিঠিতে লেখা-

ভাই কামরান,

তোমার অসুখের খবর শুনে ব্যথিত বোধ

করছি । আমার ব্যথা আরও প্রবল হয়েছে, কারণ

শের শাহ্ নামক দস্যুর পরাজয় তুমি নিজের চোখে

দেখতে পেলে না ।

যুদ্ধক্ষেত্রে আমি কল্পনা করে নেব তুমি আমার

পাশেই আছ । কল্পনার শক্তি বাস্তরের চেয়ে কম না ।

আমার প্রধান ভরসা কল্পনার তুমি এবং

তোপখানার দুই প্রধান উস্তাদ আহমাদ রুমী ও

হোসেন খলিফা । শুধু এই দুজনই কামান দেগে শের

শাহ্’র বাহিনীকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিতে পারবে ।

আমি তোমার আশু রোগমুক্তি কামনা করছি ।

আশা করছি তুমি তোমার বিজয়ী ভ্রাতাকে অভ্যর্থনা

করার জন্যে তোরণ নির্মাণ করে অপেক্ষা করবে ।

যদি দ্রুত আরোগ্য লাভ করো, তাহলে

বড়ভাইকে সাহায্য করার জন্যে কনৌজে চলে

আসবে ।

তোমার বড়ভাই

হুমায়ূন মীর্জা

সম্রাট এই চিঠি সম্রাট হিসেবে লিখলেন না । ভাইয়ের কাছে ভাইয়ের চিঠি গেল । সম্রাটের সীলমোহর চিঠিতে পড়ল না ।

কামরান মীর্জা অসুস্থের ভান করলেন । বড় বড় হেকিমরা তার কাছে আসা-যাওয়া করতে লাগল । হেকিমরা ঘোষণা করলেন, কামরান মীর্জাকে বিষ খাওয়ানো হয়েছে । এই জঘন্য কাজ কে করেছে তা জানার চেষ্টা শুরু হলো । সন্দেহ অন্তঃপুরের দিকে । রাজপরিবারের নারীরা আতঙ্কে দিন কাটাতে লাগলেন ।

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার

এবারের যুদ্ধে হুমায়ূন কোনো রাজপরিবারের মহিলা সদস্যকে নিয়ে যান নি । কামরানের আদেশে তাদের সবাইকে গৃহবন্দি করা হলো ।

কামরান মীর্জা বিছানায় শুয়ে শুয়েই আমীরদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করতে লাগলেন । সব আমীরকে একসঙ্গে ডেকে বৈঠক না, আলাদা আলাদা বৈঠক । এক বৈঠকে আচার্য হরিশংকরের ডাক পড়ল । তিনি দিল্লী থেকে লাহোরে এসেছেন অসুস্থ মীর্জা কামরানের শারীরিক কুশল জানার জন্যে ।

মীর্জা কামরান বললেন, শুনেছি আমার বড়ভাই আপনার সূক্ষ্ম বুদ্ধি এবং জ্ঞানের একজন সমজদার ।

হরিশংকর বললেন, সম্রাট হাতি, আমি সামান্য মূষিক ।

যুদ্ধক্ষেত্রে হাতি মারা পড়ে । মূষিকের কিছু হয় না ।

হরিশংকর বললেন,হাতির মৃত্যুতে যায় আসে, মূষিকের মৃত্যুতে

কিছু যায় আসে না বলেই মূষিকের কিছু হয় না ।

আপনার কী ধারণা ? সম্রাট শের শাহকে পরাজিত   করতে পারবেন  ?

আমি কি নির্ভয়ে আমার মতামত জানাব  ?

অবশ্যই ।

সম্রাট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবেন ।

কারণ  ?

প্রধান কারণ আপনি । আপনি না থাকায় তার মনোবল ভেঙে গেছে । যুদ্ধক্ষেত্রে মনোবলের বিরাট ভূমিকা আছে ।

মীর্জা কামরান বললেন, আচার্য হরিশংকর! সম্রাট বিপুল সৈন্যবাহিনী নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করেছেন । তাঁর আছে বিশাল গোলন্দাজ বাহিনী ।

শের শাহ্’র কূটবুদ্ধির কাছে বিশাল গোলন্দাজ বাহিনী দাঁড়াতেই পারবে না, হুমায়ূন পরাজিত এবং নিহত হবেন ।

নিহত হবেন  ?

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার

প্রথমবার ভাগ্যগুণে প্রাণে বেঁচে গেছেন । ভাগ্য বারবার সাহায্য করে না । সম্রাট পরাজিত হলে দিল্লীর সিংহাসনের কী হবে  ?

নির্ভর করছে আপনার কর্মকাণ্ডের উপর । আপনি যদি অসুস্থতার ভান করে বিছানায় শুয়ে থাকেন, তাহলে দিল্লীর সিংহাসন চলে যাবে শের শাহ্’র হাতে । আর আপনি যদি গা ঝাড়া দিয়ে ওঠেন, সৈন্য সংগ্রহ করতে শুরু করেন তাহলে দিল্লীর সিংহাসন আপনার ।

আপনি কি আমার উজিরদের একজন হতে রাজি আছেন ?

না ।

না কেন ?

যতদিন সম্রাট জীবিত ততদিনই আমি সম্রাটের অনুগত নফর । কোনো কারণে সম্রাটের প্রাণহানি হলে আমি আপনার প্রস্তাব বিবেচনা করব । তার আগে না ।

আছরের নামাজের পরপর মীর্জা কামরান বিছানা ছেড়ে উঠলেন । ঘোষণা করলেন, আল্লাহপাকের অসীম করুণায় তিনি রোগমুক্ত হয়েছেন । তিনি রোগমুক্তি-স্নান করে মাগরেবের নামাজ আদায় করার প্রস্তুতি নিলেন । রোগমুক্তি উপলক্ষে রাজমহিষীরা সবাই উপহার পেলেন । যাঁরা গৃহবন্দি ছিলেন, তাঁদের বন্দিদশা দূর হলো । সর্ব সাধারণের কাছে গেল তিন হাজার রৌপ্য মুদ্রা । আমীররা খেলাত পেলেন । আচার্য হরিশংকরকে দেওয়া হলো রত্নখচিত ভোজালি ।

কনৌজের যুদ্ধে হুমায়ূনের শোচনীয় পরাজয় হলো । চৌসার যুদ্ধে তিনি যেসব ভুল করেছিলেন এই যুদ্ধেও সেইসব ভুল করলেন । কামানচির দর কামানের একটি গোলাও ছুঁড়তে পারল না ।

হুমায়ূনের ছত্রভঙ্গ বাহিনীর একটা বড় অংশ গঙ্গার পানিতে ডুবে মরল । যারা বেঁচে রইল তাদের তাড়া করল শের শাহ্’র বড় পুত্র জালাল খাঁ ।

চৌসার যুদ্ধে হুমায়ূন গঙ্গার পানিতে পড়েছিলেন । এবারও তাই হলো । তিনি হাতি নিয়ে গঙ্গায় পড়লেন  । হাতি তাঁকে নিয়ে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে । শের শাহ্’র তীরন্দাজ বাহিনী ধনুক উঁচিয়ে আছে । ইচ্ছা করলেই তীর ছুঁড়ে তারা সম্রাটকে মারতে পারে । তারা এই কাজটি করছে না । কারণ শের শাহ্’র কঠিন নির্দেশ-হুমায়ূনকে হত্যা বা আহত করা যাবে না । তাঁকে বন্দি করাও যাবে না । তাঁকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে ।

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার

জালাল খাঁ পরাজিত সৈন্যদের ধাওয়া করে দিল্লী পর্যন্ত নিয়ে গেলেন । পনেরই জুলাই ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে শের শাহ্ দিল্লীর সিংহাসন দখল করে বসলেন ।

ওই দিন প্রবল বর্ষণ হলো । দীর্ঘদিন দাবদাহে অতিষ্ঠ দিল্লীবাসিদের আনন্দের সীমা রইল না । তারা বৃষ্টিতে ভেজার জন্যে পথে নেমে পড়ল । তারা লক্ষে করল অতি সাধারণ চেহারার এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে দিল্লীর পথে নেমে বৃষ্টিতে ভিজছে । এই ব্যক্তি দিল্লীর সিংহাসন দখল করে নিয়েছে জনতার কেউ তা বুঝতে পারল না ।

হুমায়ূন লাহোর থেকে শের শাহকে একটি কবিতা লিখে পাঠালেন । কবিতাটি হলো-

দর আইনা গরচে খুদ নুমাই বাশদ

পৈবস্তা জ খেশতান জুদাই বাশদ ।

খুদ রা ব মিশলে গোর দীদন অজব অস্ত;

ঈ বুল অজবে কারে খুদাই বাশদ।*

[যদিও আয়নার নিজ চেহারা দেখা যায় তারপরেও তা আলাদা থাকে । এ হলো আল্লাহর অলৌকিক কাজ।]

শের শাহ্ চিঠির জবাবে লিখলেন, আমি মূর্খ বিশেষ । আপনার কবিতার অর্থ বোঝা আমার জ্ঞানের অতীত । আমি লাহোর দখল করতে রওনা হব । আপনার জন্যে লাহোর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া মঙ্গল হবে । মীর্জা হিন্দালের মা দিলদার বেগমের দিনলিপি । শ্রুতিলিখন করেছে তার এক দাসী হোসনা জান ।

‘‘আমার রাতের ঘুম এবং এবাদত হারাম হয়ে

গেছে। আমি চোখর পাতা বন্ধ করলেই দস্যু শের

শাহকে স্বপ্নে দেখি । এই দস্যু তার পঙ্গপাল বাহিনী

নিয়ে ছুটে আসছে । তার একমাত্র ইচ্ছা মোগল

বংশকে সমূলে ধ্বংস করা হুমায়ূন তাঁর হাতে ধরা

পড়লে না জানি কী পরিণতি হবে । মনে হয় সে

আমার অতি আদরের হুমায়ূনকে জ্বলন্ত আগুনে

নিক্ষেপ করবে। শুনেছি দস্যুটা মানুষকে আগুনে

পুড়িয়ে মারতে পছন্দ করে । আল্লাহপাকের কাছে

আমার প্রার্থনা-যেন কোনো ভয়ঙ্কর ব্যাধিতে দস্যু

তার দলবল নিয়ে মৃত্যুবরণ করে ।’’

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার

দিনলিপিতে যে অস্থিরতা দিলদার বেগম দেখালেন তার চেয়ে অনেক বেশি অস্থির সম্রাট হুমায়ূন । তিনি তাঁর দিনলিপি লেখা বন্ধ রেখেছেন । সৈন্য সংগ্রহের মতো অর্থের জোগাড় করতে পারছেন না । প্রতিটি মিত্র রাজার কাছে চড়া সুদে অর্থ চেয়ে পত্র লিখেছেন । কেউ পত্রের জবাব দেওয়ার সৌজন্যও দেখাচ্ছে না । তারা এখন এমন কিছুই করবে না যাতে দিল্লীর অধীশ্বর শের শাহ্ বিরক্ত হন ।

হুমায়ূনের ব্যক্তিগত ঘোড়সওয়ার বাহিনীর একটি অংশ কামরান মীর্জার সঙ্গে যোগ দিয়েছে । কামরান মীর্জা তাতে আপত্তি করে নি কেন ? সে কি হুমায়ূনকে ত্যাগ করে শের শাহ্’র সঙ্গে যুক্ত হবে ? এও কি সম্ভব ? কামরান মীর্জা আমীরদের নিয়ে ঘনঘন দরবার করছে । এর কোনোটাতেই হুমায়ূনকে ডাকা হচ্ছে না । সম্রাট কাছে খবর আছে, গভীর রাতে কামরানের এক আমীর ফতে খাঁ লাহোর ত্যাগ করেছে । তার সঙ্গে বারোজন সৈন্যের একটা দল আছে । এই আমীর কি কামরানের গোপন কোনো চিঠি নিয়ে শের শাহ্’র কাছে গেছে ?

হুমায়ূন সব ভাইদের এক করার জন্যে একটি আলোচনা-সভা ডেকেছিলেন । সেই সভায় তাঁর সব ভাইরা উপস্থিত থাকলেও কামরান আসে নি ।

বড় অস্থির সেই সময়ে দিলদার বেগম হুমায়ূনকে গোপন এক পত্র পাঠালেন । সেখানে লেখা-

পুত্রসম হুমায়ূন

সম্রাট

বাদশাহ নামদার

তুমি নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়েছ বলে শুনেছি ।

এই মুহূর্তে তোমার অর্থের অবশ্যই প্রয়োজন ।

আমার কাছে দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা এবং দুই লক্ষ

রৌপ্যমুদ্রা গোপনে রাখা আছে । তুমি আমার কাছ

থেকে এই অর্থ সংগ্রহ করে কাজে লাগাও । তোমার

চন্দ্রের মতো মুখমণ্ডল অনেকদিন দেখি না ।

ইতি

দিলদার বেগম

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার

হুমায়ূন ‍দিলদার বেগমের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন । হুমায়ূনের সঙ্গে চার পত্নী । পত্নীরা হলেন-

বেগাম বেগম

মাহ চুচক বেগম

গুনবার বেগম

মেওয়াজান

হুমায়ূন পত্নীদের সঙ্গে না নিয়ে কোথাও যেতেন না । চৌসার যুদ্ধেও তাঁর পত্নীরা সঙ্গী ছিলেন । চৌসার যুদ্ধে তাঁর দুই পত্নী চাঁদ বিবি এবং সাদ বিবি পানিতে ডুবে মারা যান । বেগা বেগম শের শাহ্’র হাতে ধরা পড়েন । শের শাহ্’র মহানুভবতায় তিনি স্বামীর কাছে ফিরতে পারেন ।

হুমায়ূনের সর্বশেষ পত্নী মেওয়াজান ছিলেন হুমায়ূনভগ্নি গুলবদনের দাসী । হুমায়ূন তার রুপে মুগ্ন হয়ে মেওয়াজানকে বিয়ে করেন এবং বিয়ের রাতে আমীরদের বলেন, বেহেশতের হুর এই মেয়ের চেয়ে রুপবতী হবে আমি তা বিশ্বাস করি না ।

সম্রাট তার বিমাতার কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করলেন । আনন্দে তাঁর চোখ ভিজে উঠল । দিলদারের নির্দেশে রাজপরিবারের মহিলার একে একে সম্রাট কুর্নিশ করতে এলেন । চৌদ্দ বছর বয়সী এক মেয়েকে দেখে সম্রাট চমকে উঠলেন ।

সম্রাট বললেন, তোমার নাম কী ?

হামিদা বানু ।

তুমি কি রাজপরিবারের কেউ ?

না । আমি সামান্য একজন । আমার পিতার নাম মীর আবুল বকা । তিনি একজন শিক্ষক । আপনার কনিষ্ঠ ভ্রাতা মীর্জা হিন্দাল আমার পিতার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন ।

তুমিও কি তোমার পিতার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে ?

জি জাহাঁপনা ।

তুমি খুব সহজভাবে আমার সঙ্গে কথা বলেছ । একজন সম্রাটের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পাও নি ।

আপনি এখন সম্রাট না । পরাজিত এক নৃপতি। নির্বাসিত ।

আচ্ছা তুমি যাও ।

হামিদা বানু ঘর থেকে বের হওয়ামাত্র হুমায়ূন ‍দিলদার বেগমকে বললেন, আমি এই মেয়েটিকে বিবাহ করতে চাই । আপনি ব্যবস্থা করে দিন ।

দিলদার বেগম অবাক হলে বললেন, এ নিতান্তই বালিকা । এবং মুখরা ।

হুমায়ূন বললেন, হোক বালিকা, হোক মুখরা ।

মেয়েটি শিয়া সম্প্রদায়ের । তুমি সুন্নি ।

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার

হুমায়ূন বললেন, শিয়া সুন্নির মতের এবং প্রার্থনার কিছু পার্থক্য আছে, কিন্তু তাদের বিয়েতে কোনো বাদা নেই । আপনার কাছে অনুরোধ, আপ রাতেই আপনি তার কাছে বিবাহ প্রস্তার নিয়ে যাবেন ।

বাবা, তুমি বিষয়টা নিয়ে আরেকটু চিন্তা করো ।

চিন্তা যা করার করেছি । আর চিন্তা করব না ।

হতভম্ব দিলদার বেগম নিজেই সম্রাটের ইচ্ছার কথা হামিদা বানুকে জানালেন । হামিদা বানু বলল, আমি এমন একজনকে বিয়ে করব যার হাত আমি যে-কোনো সময় ধরতে পারব । যাকে তিনবেলা কুর্নিশ করতে হয় তাকে আমি বিয়ে করব না । কোনো অবস্থাতেই না । সম্রাটের চার স্ত্রী জীবিত । তিনি আরও বিবাহ করবেন । আমি এমন একজনকে বিবাহ করব যার বিয়ে-রোগ নেই। আমিই হবে তার একমাত্র স্ত্রী ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২০

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৮

প্রধান নকিব ঘোষণা করল, আল সুলতান আল আজম ওয়াল খাকাল মুকররাম, জামিই সুলতানই হাকিকি ‍ওয়া মাজাজি ভিসতি নিজাম পাদশাহ্ ।

আমীররা কুর্নিশ করলেন ।

নতুন সম্রাট পাশে দাঁড়ানো আমীরকে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে নিচুগলায় জানতে চাইলেন, দুপুরের খাবার কখন দেওয়া হবে? তাঁকে সময় বলা হলো । তিনি বললেন, ‍দিল্লীতে তাঁর দূরসম্পর্কের এক দেশিয়াল ভাই আছেন । দুপুরের খানায় তাকে কি আমন্ত্রণ জানানো যাবে ?

অবশ্যই যাবে । তাকে আনতে এক্ষুনি হাতি পাঠানো হবে ।

খাওয়ার পর আমার দেশিয়াল ভাইকে নিয়ে আমি কি মোগল হেরেম পরিদর্শনে যেতে পারি ?

আপনি যখন ইচ্ছা তখন যেতে পারবেন, তবে আপনার ভাই যেতে পারবেন না । সম্রাট ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই ।

আমি যদি ফরমান জারি করি ?

আপনি ফরমান জারি করলেও হবে না । সম্রাটকেও নিয়মকানুনের ভেতর দিয়ে যেতে হয় ।

আমার ভাইয়ের খুব শখ ছিল হেরেম পরিদর্শন করা । কোনো উপায় কি আছে ?

একটা উপায় আছে । আপনার ভাইকে খোজা করানো হলে উনি যেতে পারবেন । সেই ব্যবস্থা কি করব ?

নতুন সম্রাট গম্ভীর হয়ে গেলেন ।

সন্ধ্যাবেলায় নতুন সম্রাটের সময় শেষ হলো । তিনি প্রচুর ধনরত্ন নিয়ে নিজ গ্রামের দিকে রওনা হলেন । তিনি নিজে ঘোড়ায় করে যাচ্ছেন, তাঁর পেছনে দুটা গাধা । গাধার পিঠে স্বর্ণমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা । তাঁকে নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে দশজন অশ্বারোহীর একটি দল আগে আগে যাচ্ছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৮

দিল্লীর উপকণ্ঠে ভিসতি নিজামের উপর ডাকাত দল ঝাঁপিয়ে পড়ল । তারা অনেকক্ষণ ধরেই নিজামকে অনুসরণ করছিল । ডাকাতের ছদ্মবেশে এরা সবাই কামরান মীর্জার দেহরক্ষী বাহিনী । নিজামকে রক্ষাকারী দলের সবাই ঘটনা বুঝতে পেরে দ্রুত পালিয়ে গেল । ডাকাত দল ধনরত্ন এবং ঘোড়া নিয়ে চলে গেল । আধাবেলার দিল্লীশ্বরের মৃতদেহ নর্দমায় পড়ে রইল । তার উপর নীল রঙের স্বাস্থ্যবান মাছি ভনভন করতে লাগল । দুটি গাধার একটি প্রভুর মৃতদেহের দিকে বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল ।*

 

*গুলবদনের লেখা হুমায়ূননামায় বলা হয়েছে, নিজাম ভিসতি দুই দিনের জন্যে দিল্লীর সিংহাসনে ছিলেন । অন্য কোনো সূত্র তা সমর্থন করে না । নিজাম ভিসতি অর্ধদিবসের সম্রাট-এই তথ্যই প্রতিষ্ঠিত ।

 

দিল্লীর পথে ঘাটে জনৈক নগ্নপদ বৃদ্ধকে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে । তার চক্ষু কোটরাগত । অনাহারে-অর্ধাহারে শরীর ভেঙে গেছে । সে কপর্দকহীন । তার বেশির ভাগ সময় কাটে হালুকাবির দোকানের আশেপাশে । দোকানিদের কেউ কেউ একটা লাড্ডু, একটা লুচি ছুঁড়ে দেয় । বৃদ্ধ তা লুফে নেয় । খাবারের সন্ধানে সে শ্মশানঘাটেও বসে থাকে । সেখানে গুড় মাখানো চিঁড়া বিতরণ করা হয় । বৃদ্ধ উড়ুনি পেতে চিঁড়া গ্রহণ করে । বৃদ্ধ উচ্চবর্ণের ব্রাক্ষণ । কিন্তু সে পৈতা লুকিয়ে ফেলেছে । ব্রাক্ষণরা উচ্ছিষ্ট খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না । বৃদ্ধ নিরুপায় । উচ্ছিষ্ট খাদ্যগ্রহণে তার কোনো আপত্তি নাই । দিল্লী শহরের অন্য ভিক্ষকদের সঙ্গে তার কোনো তফাত নেই । খাদ্য নিয়ে ভিক্ষুকদের সঙ্গে সে কাড়াকাড়িও করে ।

ভিক্ষুকো ভিক্ষুকং দৃষ্টা

শ্বতুলং গুরগুরায়তে

(কুকুর যেমন অন্য কুকুরকে দেখলে গর্জন করে,

ভিক্ষুকও সেরকম অন্য ভিক্ষুককে দেখলে গর্জন করতে থাকে । )

এই বৃদ্ধ আমাদের পরিচিত । তাঁর নাম হরিশংকর । আচার্য হরিশংকর । তিনি শত মাইল হেঁটে দিল্লী এসেছেন সম্রাট হুমায়ূনের সাক্ষাৎপ্রত্যাশী হয়ে ।

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার

সম্রাট তাঁর অতীত জানেন না । কাজেই সম্রাটের কৃপা প্রার্থনা তিনি করতে পারেন । সম্রাট সন্দেহ করবেন না । সম্রাটের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টার তিনি ক্রটি করেন নি । সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে । ভিক্ষুককে রাজদরবারে ঢোকানো যায় না । সম্রাটের দর্শনপ্রাথীদের উপহার নিয়ে যেতে হয় । আচার্য হরিশংকরের কাছে তার নোংরা উড়ুনি ছাড়া কিছু নেই ।

প্রতি শুক্রবার হাতির পিঠে চড়ে সম্রাট জুমার নামাজ পড়তে যান । এই সময় রাস্তায় পাশে দাঁড়িয়ে হরিশংকর সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে নানান অঙ্গভঙ্গি করেন, উচ্চস্বরে কাঁদেন । তাতে লাভ হয় না সম্রাট তাকান না ।

একন হরিশংকর লাফ দিয়ে হাতির সামনে পড়ার চিন্তাভাবনা করছেন । সাহস সঞ্চয় করতে পারছেন না ।

এক জুমাবারে হরিশংকর লাফ দিয়ে হাতির সামনে পড়ার চিন্তাভাবনা করছেন । সাহস সঞ্চয় করতে পারছেন না ।

এক জুমাবারে হরিশংকর রাস্তায় পাশ থেকে দৌড়ে এসে সম্রাটের হাতির সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন । হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হওয়ার দৃশ্য না দেখাই ভালো ।

চারদিক থেকেই হৈচৈ হচ্ছে । ঘন্টা বাজছে । ভীত হরিশংকর চোখ খুললেন ।

আশ্চার্য! হাতির পিঠের হাওদায় বসা সম্রাট তার দিকে তাকিয়ে আছেন । তিনি কি তাকে চিনতে পারছেন? উত্তেজনায় হরিশংকর কুর্নিশ করতে ভুলে গেল ।

সম্রাট বললেন, আপনি কি আচার্য হরিশংকর ?

হরিশংকর সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন । সেখান থেকে উঠে হাতজোড় করে বললেন, সম্রাট আমাকে চিনতে পেরেছেন । আমার জীবন ধন্য । আমি শের শাহ্’র হাতে বন্দি ছিলাম । কোনোক্রমে পালিয়ে এসেছি। আমি সম্রাটের দেখা পেয়েছি, আমার জীবন ধন্য ।

আমার দেখা পাওয়ার জন্যেই কি আপনি এসেছেন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৮

হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে হরিশংকর আবার মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন । সম্রাট বললেন, আপনার অতি মলিন বেশ ভগ্ন শরীর দেখে আমি ব্যথিত । কাল রাজদরবারে আমার সঙ্গে দেখা করবেন ।

সম্রাট হুমায়ূন হরিশংকরকে সভাসদের পদ দিলেন । তিনি সম্রাটের উপদেষ্টাদের একজন হলেন । সম্রাট হুমায়ূনের অনেক বড় বড় ভুলের মধ্যে এটিও একটি ।

সাত দিনের মধ্যে আচার্যের চেহারায় জেল্লা ফিরে এল । নতুন পোশাকে তাঁকে দরবারে মোটেই বেমানান মনে হলো না । তিনি অবশ্যি নিজেকে সবকিছু থেকে আলাদা করে মৌনী ভাব ধরলেন । যদিও তিনি জানেন-

বিদ্যা স্তব্ধস্য নিষ্ফলা

(যে কথা কইতে ভয় পায়, তার বিদ্যা নিষ্ফল হয় । )

আচার্য হরিশংকর অপেক্ষায় আছেন । কথা বলার সময় অনেক পাওয়া যাবে । কিছু কথা সম্রাটকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বলতে চান । কী বলবেন তা ভেবে রেখেছেন । সম্রাটের সঙ্গে একান্তে কথা বলার সুযোগ হচ্ছে না ।

যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়ে সম্রাট ব্যস্ত । মিত্র রাজাদের কাছে সাহায্য চেয়ে সম্রাটের চিঠি নিয়ে রাজদতরা যাচ্ছেন । তিনি নিজের ভাইদের সঙ্গে ঘনঘন বৈঠক করছেন । মীর্জা কামরান পবিত্র কোরান শরীফে হাত রেখে প্রতিঙ্গা করেছেন, তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে সম্রাটের ডানহাত হয়ে কাজ করবেন ।

মীর্জা কামরানকে নিয়ে সম্রাটের সামান্য আশঙ্কা ছিল । সেই আশঙ্কা অমূলক প্রামাণিত হয়েছে ।

রাজজ্যোতিষীদের শুভক্ষণ বের করতে বলা হয়েছে । সম্রাট নিজে ইস্তেখারা নামাজ পড়েছেন । ইস্তেখারার নামাজের পর অজু করে ঘুমিয়ে পড়লে স্বপ্নে নির্দেশ আসে । স্বপ্নে যা দেখা যায় তার সবটাই প্রতীকী । এই প্রতীকের অর্থ-উদ্ধার বেশিরভাগ সময় কঠিন হয় ।

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার

সম্রাট স্বপ্নে দেখেছেন ধবধবে সাদা একটা বক গাছে বসেছে । গাছের পাতা খাচ্ছে ।

স্বপ্নের তফসিরকারীরা স্বপ্নের অর্থ করেছেন এইভাবে-

বক মাংসাশী । সে জীবন্ত মাছ, পোকামাকড় ধরে

ধরে খায় । স্বপ্নে সে তার স্বভাব পরিবর্তন করে

তৃণভোজী হয়ে গাছের পাতা খাচ্ছে । প্রতীকীভাবে

বক হলো শের শাহ্ । কারণ সে পাখির মতোই এক

জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ায় । বক

যেমন ধবল সাদা, শের শাহ্’র মাথার পাপড়িও

ধবল সাদা । স্বপ্নের পূণাঙ্গ অর্থ-বক তার স্বভাব

পরিবর্তন করেছে অর্থাৎ শের শাহ্ স্বভাব পরিবর্তন

করেছে । এই পরিবর্তন হবে যুদ্ধে পরাজয়ের কারণে ।

রাজদরবারের সবাই স্বপ্নের তফসিরে সন্তোষ প্রকাশ করলেন । শুধু আচার্য হরিশংকর মৌন রইলেন । সম্রাট বললেন, আচার্য হরিশংকর, আপনি চুপ করে আছেন কেন ? স্বপ্নের এই ব্যাখ্যার বিষয়ে আপনার কি কিছু বলার আছে ?

আচার্য হরিশংকর বললেন, আমার বলার আছে । তবে আমি মৌন থাকতে চাচ্ছি । জ্ঞানীদের সামনে কথা বলার অর্থ নিজের মূর্খতা ঢোল পিটেয়ে প্রচার করা ।

হুমায়ূন বললেন, আপনার বক্তব্য আমি শুনতে চাচ্ছি । হরিশংকর বললেন, আমি মনে করি এই বক সম্রাট নিজে । সম্রাটের অন্তর অতি পবিত্র । পবিত্রতার রঙ সাদা । বকও সাদা । বক মাছ না খেয়ে পাতা খাচ্ছে, কারণ সে কৌশল পরিবর্তন করেছে । স্বপ্নের মাধ্যমে সম্রাটকে যুদ্ধকৌশল পরিবর্তন করতে বলা হচ্ছে ।

হুমায়ূন বললেন, আপনার ব্যাখ্যা আমি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলাম । যুদ্ধযাত্রায় আপনি আমার সঙ্গী হবেন ।

হরিশংকর বললেন, সম্রাট যে আদেশ করবেন তা-ই হবে । তবে আমার উপস্থিতি আপনার জন্যে অমঙ্গলস্বরুপ । আমাকে রাজধানীতে রেখে যাওয়াই আপনার জন্যে শুভ হবে ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৭

গুলবদন বললেন, যা কিছু ঘটে আল্লাহ্ পাকের নির্দেশেই ঘটে । এই ভেবে শান্তি পাওয়ার চেষ্টা করুন ।

সম্রাট বললেন, এই ভেবে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা আমি সবসময় করি । তাতে লাভ হয় নি । মন শান্ত হয় না । মনের উপর কর্তৃত্ব মানুষের নেই । ‘মন’ আল্লাহ্ পাকের হাতে ।

কথা শেষ করেই সম্রাট হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে তাঁর আদরের কন্যাকে ডাকতে লাগলেন, মা আকিকা । আয় আমার কোলে আয় মা।

হতাশ এবং ক্লান্ত হুমায়ূন আগ্রায় ফিরে প্রবল জ্বরের মধ্যে পড়লেন । কোনো চিকিৎসাতেই জ্বরের উপশম হলো না । হুমায়ূনভগ্নি গুলবদন ভাইয়ের রোগমুক্তির জন্যে এক মাস রোজা মানত করলেন ।

জ্বরের দশম দিনে সম্রাট বিছানায় উঠে বসলেন । তিনি ঘোষণা করলেন, শাসনকার্য পরিচালনায় তিনি এখন সক্ষম । আগামীকাল থেকে দরবার বসবেন ।

হুমায়ূনের রোগমুক্তি উপলক্ষে আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করা হলো । সম্রাটের ওজনের সমপরিমাণ ওজনের রৌপ্যমুদ্রা গরিব-দুঃখীদের বিতরণ করা হলো ।

সম্রাট দরবারে বসেছেন । তাঁর ভাইরাও উপস্থিত । হুমায়ূন তিন ভাইয়ের জন্যে উপহার ঘোষণা করলেন । প্রত্যেকেই একটি করে ঘোড়া, পোশাক, এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা পেলেন । তিনজনকেই একটি করে নীলকান্তমণি দেওয়া হলো । দরবারে উপস্থিত আমীররা নীলকান্তমণির সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে ‘মারহাবা’ ‘মারহাবা’ ধ্বনি ‍দিলেন । সম্রাট অত্যন্ত আবগময় ভাষায় বললেন, আমার তিন ভাই আমার সর্বশক্তির উৎসস্বরুপ । তারা কিছু ভুল-ভ্রান্তি করেছে । মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করার প্রধান সমস্যা হলো, মাঝে মাঝে ভূল-ভ্রান্তির কাছে পরাজয় স্বীকার করা । আমি আমার প্রাণপ্রিয় ভাইদের সকল ভুল ক্ষমা করে দিলাম । আমীররা আবারও বললেন, মারহাবা! মারহাবা! সম্রাট সিংহাসন থেকে নেমে এসে তাঁর ভাইদের আলিঙ্গন করলেন । আবারও আনন্দ ধ্বনি-মারহাবা! মারহাবা !

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৭

এই দরবার আমজনতার জন্যে উন্মুক্ত না । হুমায়ূনের তিন ভাই ছাড়া আমীররা আছেন, সেনাপতিরা আছেন ।পারস্য-সম্রাটের একজন দূত আছেন । রাজমহিষীরা আছেন চিকের আড়ালে । প্রথম দরবারে কী হয় তা তাঁদের দেখার ইচ্ছা । ভাইদের মিলনদৃশ্য দেখার নাটকীয়তা থেকে তারা নিজেদের বঞ্চিত করতে চাচ্ছেন না ।

দরবারের বাইরে প্রধান ফটকে এক নাটক শুরু হয়েছে । নগ্নপদের এক লোক দরবারে ঢুকতে চাচ্ছে । তার গায়ে সস্তা উড়ুনি । গরমের মধ্যেও উড়ুনির উপর একটা নোংরা চাদর । মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা কাঁচাপাকা দাড়ি । চোখ রক্তবর্ণ । সে বলছে তার নাম নিজাম । সে ভিসতিয়ালা সম্রাটের জীবনরক্ষাকারী ।

প্রধান প্রহরী বলল, তুমি যথেষ্ট বিরক্ত করেছ । এই মুহূর্তে বিদায় না হলে তোমাকে কারাগারে ঢোকানো হবে ।

নিজাম ভিসতি বলল, সম্রাট আমাকে দেখলেই চিনতে পারবেন । আমাকে একবার সাক্ষাতের সুযোগ দিন ।

সম্রাটের সাক্ষাৎ পেতে যে যোগ্যতা লাগে তা তোমার নেই । তোমার পোশাক মলিন । পা খালি । তুমি সম্রাটের জন্য কোনো উপহার আনো নি । প্রহরীদের পরিতোষক তো অনেক পরের ব্যাপার ।

নিজাম ভিসতি বলল, সম্রাট আমার কাছে ওয়াদা রক্ষা করলেই আমি আপনাদের সবার পারিতোষিকের ব্যবস্থা করব ।

প্রধান প্রহরী বলল, আমি আমার জীবনে অনেক হাস্যকর কথা শুনেছি, এমন শুনি নাই ।

বিশ্বাস করুন, সম্রাট আমাকে দেখামাত্র চিনতে পারবেন । তিনি যদি চিনতে না পারেন তাহলে বাকি জীবন আমি অন্ধকূপে কাটাতে রাজি আছি ।

ভিসতি নিজামের কথা সত্যি হলো । সম্রাট দেখামাত্র তাকে চিনলেন । হাসিমুখে বললেন, তুমি ভিসতি নিজাম না ?

নিজাম কুনির্শ করতে করতে বলল, জি আলামপনা । আপনার স্মৃতিশক্তি প্রশংসারও ঊর্ধ্বে ।

আমি তোমাকে বলেছিলাম একদিনের জন্যে হলেও তোমাকে সিংহাসনে বসাব । আজ অর্ধেকবেলা পার হয়ে গেছে, তারপরেও তুমি চাইলে আজই সিংহাসনে বসতে পার । তুমি কি আজই সিংহাসনে বসতে চাও ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৭

সম্রাটের অনুগ্রহ এবং মহানুভবতা সমুদ্রের পানির চেয়েও বেশি । আমি আজই সিংহাসনে বসতে চাই । সম্রাটের তিন ভাই স্তস্ভিত । আমীররা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছেন । কী ঘটতে যাচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না । সম্রাট বললেন, এই ভিসতিওয়ালা তার মশকের সাহায্যে আমার জীবন রক্ষা করেছে । জীবনরক্ষার পুরষ্কার হিসেবে সে আধাবেলার জন্য সিংহাসনে বসবে । আমীররা তার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করবেন । একজন সম্রাটের প্রাপ্য সম্মানের পুরোটাই ভিসতি নিজাম পাবেন । ভিসতি নিজাম ইচ্ছা করলে রাজকীয় ফরমানও জারি করতে পারবেন ।

দরবার কিছুক্ষণের জন্য শব্দহীন হয়ে গেল । সামান্য ভিসতিওয়ালা দিল্লীর সম্রাট ? এ কেমন কথা ? সবার দৃষ্টি ভিসতি নিজামের দিকে । দরবারের শান-শওকত দেখে সে খুব যে বিচলিত তা মনে হচ্ছে না ।তার দৃষ্টি সম্রাটের দিকে নিবদ্ধ ।

কামরান মীর্জা সম্রাটের দিকে এগিয়ে গেলেন । নিচুগলায় বললেন, আমি কি ভারতবর্ষের সম্রাটের সঙ্গে কিছু কথা বলতে পারি ?

হুমায়ূন বললেন, অবশ্যই পার । তবে ভারতবর্ষের সম্রাট এখন আমি না । সম্রাট হলেন ভিসতিওয়ালা নিজাম ।

আমি আপনার সঙ্গেই কথা বলতে চাচ্ছি ।

বলো ।

আমার কথায় কোনো অসৌজন্য প্রকাশ পেলে আগেই মার্জনা চাই । সম্রাট আমার কথায় আহত হলেও কথাগুলি আমাকে বলতে হবে ।

বলো । তবে বারবার আমাকে সম্রাট বলে সম্বোধন করবে না । তোমাকে বলা হয়েছে সম্রাট এখন ভিসতি নিজাম ।

ভিসতি নিজাম এখনো সিংহাসনে বসে নি । দরবারে দাঁড়িয়ে আছে । সে যথন সিংহাসন বসবে তখন তার প্রতি যোগ্য আচরণই আমি করব ।

কী বলতে চাও বলো ?

আমার যা বলার তা আমি আলাদা করে শুধু আপনাকেই বলতে চাই । সবার সামনে বলতে চাই না ।

হুমায়ূন বললেন, পবিত্র কোরান শরীফে একটি আয়াত আছে, সেখানে আল্লাহপাক বলছেন, তোমরা দুজন যখন কথা বলো তখন তৃতীয়জন হিসেবে আমি সেখানে উপস্থিত থাকি ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৭

কামরান মীর্জা বললেন, অনেক কথা আছে যা আল্লাহপাক শুনলে ক্ষতি নেই, অন্য কেউ শুনলে ক্ষতি আছে । হুমায়ূন কিছুক্ষণের জন্যে দরবার থেকে বিদায় নিয়ে চিকের পর্দার আড়ালে গেলেন । সেখানে রাজমহিষীদের অনেকেই ছিলেন । তাঁরা কৌতূহলী চোখে ভিসতি নিজামকে দেখছেন এবং তাকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছেন । সম্রাটকে আসতে দেখে সবাই সরে গেলেন, শুধু গুলবদন থেকে গেলেন । তিনি হুমায়ূনের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বললেন, আপনাদের আলোচনায় আমি কি থাকতে পারি ? সম্রাট কিছু বলার আগেই কামরান মীর্জা বললেন, আমার বোন থাকতে পারে । আমি কী বলছি তার একজন সাক্ষী থাকারও প্রয়োজন । হুমায়ূন হাতের ইশারা করলেন । এই ইশারার অর্থ গুলবদন থাকতে পারে।

কামরান মীর্জা বললেন, এক সামান্য ভিসতিওয়ালাকে দিল্লীর সিংহাসনে বসানোর কিছু নেই । তাকে ধনরত্ন দেওয়া যেতে পারে, জায়গির দেওয়া যেতে পারে । সিংহাসনে কেন বসানো হবে ?

হুমায়ূন বললেন, আমি কথা দিয়েছি এইজন্যে বসানো হবে ।

আপনি ভয়ঙ্কর দুঃসময়ে কথা দিয়েছিলেন । তখন আপনার মস্তিঙ্ক কাজ করছিল না । আপনি ছিলেন প্রবল ঘোরের মধ্যে । আমরা দুঃসময়ে অনেক কথা বলি, সবই অর্থহীন কথা ।

আমার কাছে অর্থহীন কথাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ।

কামরান মীর্জা বললেন, মোগল সাম্রাজ্য বিরাট বিপদের মুখে । এখন আপনার উচিত শের শাহ্ নামের দস্যুকে কীভাবে শায়েস্তা করবেন তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা । একজন মিসকিনকে সিংহাসনে বসানোর ছেলেখেলার সময় এটা না ।

আধাবেলার ব্যাপার ।

এক পলকের ব্যাপারও হতে পারে না । দিল্লীর সিংহাসন দড়ির চারপাই না । যাকে তাকে সেখানে বসানো যায় না  ।

তোমার কথা কি শেষ হয়েছে ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৭

হ্যাঁ ।

আমার নির্দেশ-তুমি দরবারে যাবে এবং নতুন সম্রাটকে কুর্নিশ করে সম্মান প্রদর্শন করবে ।

আপনার নির্দেশে পালন করা আমার কর্তব্য । কিন্তু আমি অপারগ । কারণ আমি অসুস্থ বোধ করছি । শারীরিক এবং মানসিক দুইভাবেই অসুস্থ ।

তুমি দরবারে যাবে না ?

না । এবং আমি আশা করব আপনিও যাবেন না । নতুন সম্রাট সিংহাসনে বসবেন আর আপনি অন্যসব দরবারির মতো তাকে সম্মান দেখাবেন তা হতে পারে না । নিজেকে হাসি-তামাশার বিষয়ে পরিণত করবেন না ।

গুলবদন বললেন, কামরান মীর্জার কথা যুক্তিপূর্ণ । হুমায়ূন বললেন, যুক্তিই সবকিছু না । যুক্তির উপরে অবস্থান করে হৃদয় ।

কামরান মীর্জা তিক্ত গলায় বললেন, এই বিষয়ে নিশ্চয়েই আপনার শের মুখস্থ আছে । শেরটা বলুন শুনি ।

হুমায়ূন শের আবৃত্তি করলেন । শেরটির ভাবার্থ এ রকম-

হে প্রিয়তমা!

যুক্তি বলছে তোমাকে পাওয়া আকাশের চন্দ্রকে হাতে

পাওয়ার মতোই দুঃসাধ্য । মন বলছে তোমাকে

পেয়েছি । মনের কথাই সত্য । তুমি আমার ।

ভিসতি নিজাম গম্বীর মুখে সিংহাসনে বসে আছেন । তাঁর চেহারা মলিন, পোশাক মলিন । তবে রাজমুকুট এবং পাদুকা ঝকঝক করছে । পাদুকা সরবরাহ করা হয়েছে । রাজমুকুট স্বয়ং হুমায়ূন নিজামের মাথায় পরিয়েছেন । পাদুকা তিনি পায়ে পরেন নি, কারণ তাঁর পা অনেক বড় । মাপে হয় নি । পাদুকার উপর পা রেখে তিনি বসেছেন ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৮

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

শের শাহ্ বললেন, হ্যাঁ আমার অনেক দয়া । তবে পরাজিত  মোঘল সম্রাট হুমায়ূনের মতো দয়া আমার নেই । তোমাকে যে বিশেষ সুবিধা আমি দেব তা হলো কোন পদ্ধতিতে তুমি মৃত্যু চাও তা তুমি ঠিক করবে । আমার হাতে অনেক পদ্ধতি আছে । যেমন-

১. হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মৃত্যু ।

২ শলদণ্ড ।

৩. তলোয়ার দিয়ে মাথা কেটে আলাদার করা ।

৪. আগুনে পুড়ে মৃত্যু ।

হরিশংকর শুন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন । তাঁর ঠোঁট কাঁপছে । নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে । শের শাহ্ বললেন, তুমি নিজে যদি তোমার পছন্দের কোনো বিশেষ পদ্ধতিতে মরতে চাও তাও করা হবে । বলো কী পদ্ধতিতে মরবে ?

হরিশংকর কিছু বলতে পারলেন না । শের শাহ্ তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দিয়ে দলবল নিয়ে বের হলেন-সম্রাট হুমায়ূনের খবর পাওয়া গেছে । গ্রাম নোকরা, জেলা বীরভূম ।

লছমি বাইয়ের বাড়ি শের শাহ্’র সৈন্যরা ঘিরে রেখেছে । লছমি বাইকে আনা হয়েছে শের শাহ্’র সামনে । শের শাহ্ ঘোড়ার উপর বসে আছেন । তাঁর দুইপাশে দুই পুত্র । তারাও ঘোড়ার পিঠে । শের শাহ্ বললেন, তোমার নাম ?

লছমি বাই ।

হুমায়ূন কোথায় ?

জানি না ।

তুমি তাঁকে সেবা-শুশ্রুষা করেছে ?

উনি নিজেকে হিন্দুস্থানের সম্রাট বলেছিলেন । আমি বিশ্বাস করি নাই ।

হুমায়ূন কোন পথে পালিয়েছেন ?

লছমি জবাব ‍দিল না । চুপ করে রইল ।

তিনি কোন দিকে গেছেন তা জেনেও যদি না বলো তাহলে তোমার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড । এখন বলো ।

আমি বলব না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

শের শাহ্ তার বড় পুত্র জালাল খাঁ’র দিকে তাকিয়ে বললেন, হুমায়ূন নামের ওই মানুষটার কী অদ্ভুত ক্ষমতা লক্ষ করেছ ? মেয়েটি কিছুক্ষণ তাঁর সঙ্গে ছিল । এই কিছুক্ষণেই তার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে । সে হুমায়ূনকে রক্ষা করবে, বিনিময়ে প্রাণ দিতেও প্রস্তুত । এই ঘটনা আমাদের জন্যে ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ ।

দুঃসংবাদ কেন ?

জাদুকরী ক্ষমতার হুমায়ূনের মতো মানুষরা যা কিছু হারায় সবই ফিরে পায় । মানুষের ভালোবাসার কারণে ফিরে পায় । মানুষের ভালোবাসা আমরাও যেন ফিরে পাই সেই চেষ্টা এখন থেকেই করতে হবে ।

জালাল খাঁ হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন । শের শাহ্ লছমি বাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি একজন অসুস্থ, হতাশ এবং ভগ্নহৃদয় মানুষকে সেবা-যত্ন করে সুস্থ করেছ । তাঁকে রক্ষার চেষ্টা করেছ । মানুষটি আমার শক্র হলেও তোমার আচরণে আমি খুশি । এই স্বর্ণমুদ্রাটি রাখো । আমার বকশিশ ।

লছমি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, নড়ল না । লছমি বাইয়ের স্বামী মুখভর্তি হাসি নিয়ে এগিয়ে এল ।

সম্রাট হুমায়ূন নদীপথে আগ্রার দিকে রওনা হয়েছেন । অতি সাধারণ মাছ ধরার নৌকা । নৌকার মাঝি তিনজনই বলশালী । তারা আরোহীর পরিচয় জানে না ।

হুমায়ূন দুপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে যাচ্ছেন । কয়েকবারই তাঁর মনে হলো, পৃথিবী এত সুন্দর কেন ? তাঁর হাতে কাগজ-কলম নেই, তিনি মনে মনে একটি শের রচনা করলেন । শেরটির ভাবার্থ-

আমরা বাস করি সুন্দরের মধ্যে

সুন্দরকে ঘিরে থাকে অসুন্দর ।

যেমন পুণ্যের চারদিকে থাকে

পাপের শক্ত খোলস ।

ভাগ্যবান সেইজন যে অসুন্দরের পর্দা ছিঁড়ে

সুন্দর দেখে পুণ্যের কাছে যায় পাপের

শক্ত খোলস ভেঙে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

সম্রাট নৌকার পাটাতনে শুয়ে আছেন । আকাশ মেঘে ঢাকা । হিন্দুস্থানের কঠিন রোদ এখন আর তাঁর চোখে লাগছে না । আরামদায়ক বাতাসে চোখ বুজে আসছে । তাঁকে ঘুমুলে চলবে না । জেগে থাকতে হবে।

তিনি চোখ বন্ধ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে লাগলেন । শের শাহ্ কে অতি দ্রুত পরাজিত করতে হবে । তিনি কি ভাইদের সাহায্য পাবেন? অবশ্যই পাবেন । ভাইদের প্রতি স্নেহ এবং মমতার কোনো অভাব তিনি দেখান নি । সাধারণ নিয়মে সিংহাসনে বসার পরপর ভাইদের হত্যা করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে কেউ বিদ্রোহ করতে না পারে । তিনি তা করেন নি । তিনি পিতার আদেশ মনে রেখেছেন ।

মৃত্যুর আগে সম্রাট বাবর পুত্র হুমায়ূন মীর্জার হাত ধরে বলেছিলেন, আমার মন বলছে তোমার ভাইরা তোমাকে অনেক যন্ত্রণা দেবে, তারপরেও তুমি তাদের প্রতি কোমল থাকবে । যে ভাইদের প্রতি কোমল থাকে, আল্লাহ্ পাক তার প্রতি কোমল থাকেন । নৌকার মাঝির কথায় তাঁর চিন্তা বাধাগ্রস্ত হলো ।

নৌকার মাঝি বলল, হুজুর, বিশাল একটা নৌকা আমাদের পিছনে পিছনে আসছে । আমাদের থামতে ইশারা করছে । আমরা কি থামব ?

হুমায়ূন শুয়ে রইলেন । জবাব ‍দিলেন না । তাঁর কাছে কোনো জবাব নেই ।

নৌকার মাঝি বলল, ওই নৌকায় সৈন্য আছে । আমরা না থামলে বিরাট সমস্যা হবে ।

শের শাহ্’র সৈন্য ?

মাঝি বলল, সে রকমই অনুমান করি । চারদিকেই এখন শের শাহ্’র সৈন্য ।

হুমায়ূন বললেন, ছোট কোনো খালে নৌকা ঢুকিয়ে দিতে পার ?পারি । তাতে লাভ হবে না । আমরা ওদের নজরের মধ্যে আছি । খালে নৌকা ঢোকালে ওরাও খালে ঢুকবে ।

হুমায়ূন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন ।

হুজুর! ওরা খুব কাছে চলে এসেছে ।

হুমায়ুন হতাশ গলায় বললেন, আসুক । আর তখনই শুনলেন ওই নৌকা থেকে কে একজন বলছে-হিন্দুস্থানের মহান সম্রাট হুমায়ূন কি নৌকায় আছেন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

কণ্ঠস্বর হুমায়ূনের পরিচিত । অবিকল বৈরাম খাঁ’র গলা । প্রচণ্ড মানসিক চাপে মানুষের মাথা এলোমেলো হয়ে যায়, তখন সে নানান ধরনের ভ্রান্তির মধ্যে পড়ে । তাঁর বেলাতেও কি এরকম হয়েছে ?

সম্রাট উঠে বসলেন । অবাক হয়ে দেখলেন, পনেরোজনের মতো মোঘল সৈন্য নিয়ে বৈরাম খাঁ নৌকায় দাঁড়ানো ।

সম্রাটের চোখে পানি এসে গেল । তিনি মনে মনে বললেন, বৈরাম খাঁকে পেয়েছি । আমার আর কোনো ভয় নেই ।

বৈরাম খাঁ । ভালো আছেন ?

সম্রাট ভালো থাকলেই আমি ভালো ।

আপনাকে দেখে আমি বুকে এক শ’ হাতির বল পাচ্ছি ।

আল্লাহ্ পাকের দরবারে হাজার শুকরিয়া । নৌকার তিন মাঝি হতভম্ব হয়ে তাকাচ্ছে । তারা ঘটনা কিছুই বুঝতে পারছে না ।

হরিশংকরকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপের সব ব্যবস্থা সম্পন্ন । বৃষ্টির পানিতে কাঠ ভেজা থাকায় আগুন ধরাতে সমস্যা হচ্ছিল । কাঠে তার্পিন এবং গালা ঢেলে এই সমস্যার সমাধান করা হয়েছে । এখন সুন্দর আগুন জ্বলছে । হরিশংকর মন্ত্রমুগ্ধের মতো জ্বলন্ত আগুনের দিকে তাকিয়ে আছেন । অগ্নিমন্ত্র পাঠ করে সাধু-সন্ত্ররা আগুন নেভাতে ও জ্বালাতে পারেন । হরিশংকর জানেন তিনি সাধু-সন্তদের একজন না । অগ্নিমন্ত্র তাঁর ক্ষেত্রে কাজ করবে না, তারপরেও তিনি অগ্নিমন্ত্র জপ করার চেষ্টা করলেন । কিছুতেই মন্ত্রের প্রথম চরণ মনে এল না, মাঝখানের একটা লাইন শুধু মাথায় আসছে-

‘যা অগ্নিদায়েনো নমঃভূপে…’

এই সময় হঠাৎ করে বিরাট হইচই শুরু হলো । সম্রাট হুমায়ূন নাকি ধরা পড়েছেন । তাঁকে এখানে আনা হচ্ছে । সম্ভবত হুমায়ূনকেও অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হবে । চরম বিশৃঙখলার সুযোগে হরিশংকর পালিযে গেলেন । সম্রাট হুমায়ূনের ধরা পড়ার সংবাদ মিথ্যা । ধরা পড়েছে কামানচির এক সেনাপতি তোরাব জান। জ্বলন্ত অগ্নিতে তোরাব জানকে নিক্ষেপ করা হলো ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

ভগ্নহৃদয় হুমায়ূন আগ্রায় পৌঁছেছেন । ফরমান জারি করেছেন, তিনি মাগরেবের নামাজের আগে কারও সঙ্গে দেখা করবেন না । সম্রাট রোজা রেখেছেন । সূর্যাস্তের পর রোজা ভেঙে নামাজ আদায় করবেন । তারপরই যদি তাঁর মন চায় তিনি পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন । ঘনিষ্ঠজনদের একটি তালিকাও তিনি জওহর আবতাবচির কাছে ‍দিয়েছেন । তালিকায় আছেন তাঁর মা, কামরান মীর্জার মা এবং বোন গুলবদন ।

সম্রাট বিছানায় শুয়ে আছেন । চোখ বন্ধ । তাঁর সামান্য শ্বাসকষ্টও হচ্ছে । গঙ্গা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় ডানপায়ে ব্যথা পেয়েছিলেন । সেই ব্যথা এখন প্রবল । পা ফুলে উঠেছে । তাঁর শোবার ঘরের দরজা আধখোলা । দরজার বাইরে রুপার ছোট ঘন্টা। সেই ঘণ্টা বেজে উঠল । সম্রাট বিরক্ত গলায় বললেন, আমি ফরমান জারি করেছি কারও সঙ্গেই সাক্ষাৎ করব না ।

কোমল নারীকণ্ঠ দরজার বাইরে থেকে বলল, আমি সম্রাটের কাছে আসি নি । আমি আমার ভাইয়ের কাছে এসেছি ।

গুলবদন! কী চাও ?

আমি আমার ভাইকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদতে চাই ।

এসো । ভেতরে এসো ।

গুলবদন ছুটে এসে বিছানায় শোয়া হুমায়ূনকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন ।

হুমায়ূন বোনের মাথায় হাত বুলাত বুলাতে নিজেও কাঁদলেন । একটি শের আবৃত্তি করলেন । যার অর্থ, ‘পৃথিবীর পবিত্রতম বস্তু হলো গভীর দুঃখ থেকে নিঃসৃত অশ্রুধারা ।’

গুলবদন বললেন, আমি সম্রাটের জন্যে দু’টি আনন্দসংবাদ নিয়ে এসেছি । সম্রাট অনুমতি দিলে সংবাদ দুটি তাঁকে দেব ।

হুমায়ূন বললেন, আমার বোন গুলবদন সম্রাটের অনুমতি ছাড়াই যা ইচ্ছা বলতে পারে । সে সম্রাটের অনুমতির উর্ধ্বে । প্রথম সুসংবাদ । আপনার বিদ্রোহী ভাইদের শুভবুদ্ধি জাগ্রত হয়েছে । তারা আপনার ক্ষমার অপেক্ষায় আছে । মোঘল সাম্রাজ্যের প্রবল দুঃসময়ে তারা একত্রিত হয়ে আপনার সঙ্গে শের শাহ্’র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবে । কামরান মীর্জা পঁচিশ হাজার সৈন্য নিয়ে প্রস্তুত। আপনার অনুমতি পেলে সে শের শাহ্’র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

সম্রাট বললেন, এই সংবাদে আমি পরম করুণাময় আল্লাহ্ পাকের দরবারে শুকুরগোজার করছি । দ্বিতীয় সুসংবাদটি বলো ।

আপনি কামরান মীর্জার কাছ থেকে জাদুবিদ্যার একটি বই অনেকদিন থেকে চাচ্ছিলেন । কামরান মীর্জা বইটি নিয়ে এসেছেন । তিনি নিজে আপনার হাতে তুলে দেবেন ।

সম্রাট দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, জাদুবিদ্যার অতি মূল্যবান একটি বই আমাকে শের শাহ্ দিয়েছিলেন । আফসোস সেই বইটা নাই । হারিয়ে ফেলেছি ।

গুলবদন বললেন, সম্রাট শুধু বই কেন, অনেক কিছুই তো আপনি হারিয়ে ফেলেছেন ।

ঠিক বলেছ । আমার প্রাণপ্রিয় কন্যা আকিকা বেগম নাই । তাকে নিয়ে অদ্ভুত সব দুঃস্বপ্ন দেখি । পালিয়ে যাওয়ার আগে কেন যে মেয়েটাকে নিজের হাতে হত্যা করলাম না !

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৭

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

নদীর প্রবল স্রোতে হুমায়ূন ভেসে যেতে শুরু করেছেন । তিনি দূর থেকে বললেন, আমি যদি বেঁচে যাই, যদি দিল্লীর সিংহাসনে বসতে পারি তাহলে তোমার সৎকর্মের প্রতিদান আমি দেব । একদিনের জন্যে হলেও তুমি দিল্লীর সিংহাসনে বসবে ।

ভোর হয়েছে ।

হুমায়ূন-পত্নী বেগা বেগম শের খাঁ’র হাতে বন্দি হয়েছেন । ভয়ে এবং আতঙ্কে তিনি অস্থির । পরাজিত সম্রাটের স্ত্রীর জন্যে কী অসম্মান অপেক্ষা করছে তা তিনি জানেন । রাজপুত রমণীরা এমন অবস্থায় আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে জহরব্রত পালন করেন । মুসলমানদের জন্যে আত্মহত্যা নিষিদ্ধ বলে এমন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না ।

বেগা বেগমকে শের খাঁ’র সামনে উপস্থিত করা হলো । শেল খাঁ বললেন, আপনি কাঁদছেন কেন ?

বেগা বেগম বললেন, অসম্মানের ভয়ে কাঁদছি ।

মা, শুনুন । আপনি যা ইচ্ছা করবেন তা-ই করা হবে । আমি আপনাকে মা ডেকেছি । পুত্রের হাতে মা’র কোনো অসম্মান হবে না এটা আপনি জানেন । আপনি কী চান বলুন ?

আমি দিল্লী যেতে চাই ।

আপনাকে এবং আপনার সঙ্গে যেসব মহিলা এবং শিশু আছে তাদের সবাইকে আমি এক্ষুনি দিল্লী পাঠাবার ব্যবস্থা করছি ।

সম্রাট হুমায়ূনের নয়নমণি আকিকা বেগম এবং তার এক বান্ধবী অম্বাকে পাওয়া যাচ্ছে না ।

আমি তাদের সন্ধানে লোক পাঠাচ্ছি । মা, আপনার আর কিছু কি লাগবে ?

বেগা বেগম বললেন, অজুর পানি লাগবে । জায়নামাজ লাগবে । আমি দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ব ।

নফল নামাজ শেষে প্রার্থনায় বসে হুমায়ূন-পত্নী বেগা বেগম বললেন, হে পরম করুণাময়, তোমার বান্দা শের খাঁ যে সম্মান আমাকে দিয়েছে সেই সম্মান তুমি তাঁকে বহুগুণে বর্ধিত করে ফেরত দিয়ো । হুমায়ূন-পত্নী হয়েও আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি, শের খাঁ যেন তার জীবনে কোনো যুদ্ধে পরাজিত না হয় ।*

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

শুক্রবার । জুম্মার নামাজের সময় হয়েছে । শের খাঁ’র হাতে বন্দি সম্রাট হুমায়ূনের ইমামকেই নামাজ পড়াতে বলা হলো ইমাম খুৎবায় হুমায়ূনের নাম নিলেন ।

শের খাঁ বললেন, খুৎবা পাঠে সামান্য ভুল হয়েছে । ভুল কী হয়েছে ইমাম সাহেব জানেন । তাঁকে নতুন করে খুৎবা পাঠ করতে বলা হচ্ছে । দ্বিতীয় দফায় খুৎবায় শের খাঁন নাম পাঠ করা হলো । নামাজের শেষে শের খাঁ নিজেকে ভারতের সম্রাট ঘোষণা করে ‘শাহ’ উপাধি গ্রহণ করলেন । শের খাঁ হলেন শের শাহ্।

*চৌসার যুদ্ধের পর শের খাঁ কখনোই কোনো যুদ্ধে পরাজিত হন নি । তাঁর মৃত্যু হয়েছিল নিজের একটা কামানের বিস্ফোরণে ।

 

আপনি খুশি না আয়ে

না আপনি খুশি চলে,

লাই হায়াত আয়ে, কাজা লে চলি চলে ।

(পৃথিবীতে নিজের খুশিমতো আসি নি, খুশিমতো চলেও

যাব না । জীবন হাত ধরে নিয়ে এসেছিল বলেই এসেছি ।

মৃত্যু হাত ধরে নিয়ে চলে যাবে, তখন চলে যাব । )

সম্রাট হুমায়ূন মশক বুকে জড়িয়ে গঙ্গা নদীর তীরে শুয়ে আছন । কখন

নদীর স্রোত তাঁকে তীরে এনে ফেলেছে, তিনি জানেন না । অবসাদে,

কান্তিতে হতাশা ও বিষণ্নতায় তাঁর চোখ বন্ধ । তিনি ঘুম এবং জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় আছেন । তাঁর চোখের পাতা বন্ধ । সেই বন্ধ পাতা ভেদ করেও সূর্যের আলো তাঁর চোখে ঢুকে যাচ্ছে । চোখ কটকট করছে, কিন্তু তিনি মাথা ফেরাতে পারছেন না ।

আপনার কী হয়েছে ?

সম্রাট অনেক কষ্টে চোখ মেললেন । ঘোর কৃষ্ণবর্ণের এক রমণী কলসি হাতে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে । সে গঙ্গার পানি নিতে এসেছিল । রমণীর বয়স অল্প । মুখশ্রী কোমল ।

আপনি কে ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

সম্রাট বললেন, আমি বাদশাহ হিন্দুস্থান ।

রমণী বলল, বাদশাহ হিন্দুস্থান থাকবেন সিংহাসনে । কাদাপানিতে না ।

পায়ে সামান্য কাঁটা ফুটলেও হাতির মতো প্রাণী অচল হয়ে যায় । আমি পায়ে কাঁটা-ফোটা হাতি । তুমি কি আমাকে কোনো খাবার দিতে পার ?

আমার ঘরে ছাতু ছাড়া কিছু নেই । গুড় ‍দিয়ে ছাতু মেখে দিলে খেতে পারবেন ?

পারব । কিছু দুধ কি জোগাড় করতে পারবে ? আমার শরীরের এই অবস্থায় দুধ বলকারক ।

দুধের ব্যবস্থা করতে পারব ।

তুমি যে সেবা আমাকে করবে তা হাজার গুণে আমি ফেরত দেব ।

আমি ঋণ রাখি না । তোমার নাম কী ?

লছমি বাই । আমি বুঝতে পারছি আপনার নড়াচড়ার শক্তিও নেই । আপনি শুয়ে থাকুন । আমি খাবার এবং লোকজন নিয়ে আসছি ।

শুকরিয়া । আমি যে হিন্দুস্থানের সম্রাট এটা কি বিশ্বাস হচ্ছে না ?

না । আপনি এক দুর্ভাগা মজনুন (পাগল) ।

ভালো বলেছ, আমি এক দুর্ভাগা মজনুন ।

লছমি বাই চলে গেল । তাঁর গায়ের উপর দিয়ে একটা শকুন চক্কর খাচ্ছে । এটা অলক্ষণ । শকুন আগেভাগে মৃত্যুর খবর পায় । এই শকুনটা কি বুঝে ফেলেছে তিনি মারা যাচ্ছেন ?  ক্লান্ত অবসন্ন সম্রাট উড়ন্ত শকুন দেখতে দেখতে আবারও ঘুমিয়ে পড়লেন ।

বটগাছের নিচে দু’জন মোঘল চিন্তিত ভঙ্গিতে বসা । শের শাহ্’র একদল সৈন্য বটগাছ ঘিরে আছে । তাদের কাছে খবর আছে এই দুজনের একজন দুর্ধর্ষ সেনাপতি বৈরাম খাঁ । বৈরাম খাঁকে হত্যা করে তার কাটা মাথা শের শাহ্-কে দেখাতে হবে ।

তোমাদের মধ্যে কে বৈরাম খাঁ ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

দু’জনের একজন বৈরাম খাঁ । অন্যজন আবুল কাশেম খাঁ । তিনিও সম্রাট হুমায়ূনের একজন সেনাপতি । তোমাদের মধ্যে একজন মিথ্যা কথা বলছ । সে কে ?  আঙুল তুলে দুজনই একে অন্যকে দেখালেন ।

বৈরাম খাঁ’র চেহারা বৈশিষ্ট্যহীন । ছোটখাটো মানুষ । মুখের চামড়া কুঁচকানো । মাথার চুল খাবলা খাবলা করে উঠে গেছে । অন্যদিকে কাশেম খাঁ অসম্ভব রুপবান । স্বাস্থ্য-সৌন্দর্যে ঝলমলে একজন মানুষ । কাশেম খাঁ’র মাথায় একটাই চিন্তা যে কোনোভাবেই হোক বৈরাম খাঁকে দরকার । আবুল কাশেম খাঁকে না পেলেও সম্রাটের চলবে ।

কাশেম খাঁ শের শাহ্’র সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা চেহারা দেখে বুঝতে পারছ না কে বৈরাম খাঁ ? ওই উজবুকটা আমার নফর । মুনিবের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে বৈরাম খাঁ সেজেছে । তার কত বড় স্পর্ধা!

শের শাহ্’র সৈন্যদের কাশেম খাঁ’র কথা যুক্তিযুক্ত মনে হলো । তারা সঙ্গে সঙ্গেই কাশেম খাঁকে হত্যা করে তার কাটা মুণ্ডু নিয়ে উল্লাস ধ্বনি করতে করতে শের শাহ্’র তাঁবুর দিকে রওনা হলো । আসল বৈরাম খাঁ’র দিকে কেউ ফিরেও তাকাল না ।

ইতিহাস কাউকে কাউকে মনে রাখে আবার কাউকে রাখে না । বৈরাম খাঁ’র বীরত্বগাথা ইতিহাস মনে রেখেছে । কাশেম খাঁ’র বীরত্বগাথা মনে রাখে নি ।

প্রবল জ্বরে হুমায়ূন ঘোরের মধ্যে চলে গেছেন । তিনি গঙ্গা নদীর তীরেই কাদামাখা অবস্থায় পড়ে আছেন । বর্ষার ক্লান্তিহীন বর্ষণ হচ্ছে । নদীর পানি ফুলে ফেঁপে উঠছে । পানি উঠে এসেছে কোমর পর্যন্ত । ধুপ ধুপ শব্দে নদীর পাড় ভাঙছে । হুমায়ূনের ধারণা হলো, পাড় ভেঙে তিনি আবারও নদীতে পড়বেন । এবার পড়লে আর রক্ষা নেই । মশকের বাতাস বের হয়ে গেছে । সম্রাট চেষ্টা করলেন হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে । পারলেন না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

আশ্চার্যের ব্যাপার শকুনটা এখনো আছে । তার মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করছে । এই পাখিটির কাছে জীবন্ত প্রাণী অর্থহীন । মৃত প্রাণীই শুধু অর্থবহ । তিনি আবারও জ্ঞান হারালেন । অচেতন অবস্থায় তাঁর মনে হলো আকিকা বেগম তাঁকে ডাকছে-পিতাজি পিতাজি । তাঁর মেয়ে কখনো তাঁকে পিতাজি ডাকে না । আজ কেন ডাকছে ?  তাঁকে পিতাজি ডাকে অম্বা নামের মেয়েটা । আকিকা কি অম্বার কাছ থেকে পিতাজি ডাক শিখেছে ?

হুমায়ূনের কন্যা আকিকা বেগম এবং অম্বা আছে আচার্য হরিশংকরের সঙ্গে । হরিশংকর এই দুজনকে নিয়ে পালিয়েছিলেন । হরিশংকর বলেছিলেন, তোমরা আমার দুই কন্যা । আমার জীবন থাকতে তোমাদের কিছু হবে না । আমি তোমাদের লুকিয়ে রাখব। পরিস্থিতি শান্ত হলে দিল্লী পাঠানোর ব্যবস্থা করব ।

হরিশংকর অম্বাকে তার গ্রামের মানুষদের হাতে তুলে দিলেন । সহমরণ থেকে পালিয়ে আসা মেয়ে হলো কলঙ্কের কলসি । এই কলসি চূর্ণ হওয়া প্রয়োজন । যারা এই কাজে সাহায্য করবে তারা সবাই পুণ্যের ভাগ পাবে । হরিশংকরের পুণ্য প্রয়োজন । গঙ্গার তীরে রাতারাতি আগুন করে জ্বলন্ত অগ্নিতে অম্বাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো । ভয়াবহ চিৎকারে অম্বা ডাকল, আকিকা । আকিকা ।

আকিকা বেগম বান্ধবীকে বাঁচানোর জন্যে দৌড়ে আগুনে ঢুকে গেল । আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ স্পর্শ করছে । সেই আগুনের ভেতর দুই বান্ধবী দুজনকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করছে, পিতাজি! পিতাজি!

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

সম্রাট অচেতন জগৎ থেকে চেতন জগতে ফিরলেন । তিনি অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, তিনি মাটির ঘরে দড়ির এক চৌপায়ায় শুয়ে আছেন । তাঁর গায়ে দুর্গন্ধ কাঁথা । মাথার কাছে কুপি জ্বলছে । কুপি থেকে বুনকা বুনকা কালো ধোঁয়া উঠে ঘর অন্ধকার করে দিচ্ছে । গালভাঙা এক প্রৌঢ় খালি গায়ে তাঁর পায়ের কাছে বসে আছে । প্রৌঢ় তাঁর পায়ে তেল ঘষছে । চার-পাঁচ বছর বয়সের এক উলঙ্গ ছেলে কুকুরের মতো হামাগুড়ি দিয়ে বসে একদৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে । ঘরের ভেতর চুলা জ্বলছে । মাটির হাঁড়িতে কিছু রান্না হচ্ছে । ঝাঁঝালো গন্ধ আসছে । গঙ্গার পাড়ে দেখা হওয়া তরুণীই নাম সম্রাটের মনে পড়ল-লছমি বাই।

সম্রাটকে চোখ মেলতে দেখেই তরুণী প্রৌঢ়কে চোখে ইশারা করল । প্রৌঢ় এগিয়ে এসে সম্রাটের মাথা তুলে ধরল । লছমি মাটির ভাঁড় সম্রাটের মুখের কাছে ধরে বলল, মহিষের গরম দুধ । খেলে বল পাবেন ।

হুমায়ূন দুধ পান করলেন । হ্যাঁ এখন কিছুটা ভালো লাগছে । সম্রাট বললেন, জায়গাটার নাম কী ?

বীরভূম ।

গ্রামের নাম কী ?

নোকরা ।

এই নামগুলি মনে রাখতে হবে । সম্রাট ঠিক করেছেন, তিনি যদি দিল্লীতে ফিরে আবার সিংহাসনে বসতে পারেন তাহলে হতদরিদ্র এই পরিবারের ভাগ্য ফিরিয়ে দেবেন । এই কারণেই নামগুলি মনে রাখা দরকার । তিনি বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, লছমি বাই, বীরভূম, নোকরা । লছমি বাই, বীরভূম, নোকরা …

সম্রাটের কথায় বাচ্চা ছেলেটা মজা পেয়ে হেসে উঠতেই প্রৌঢ় এস সশব্দে তার গালে চড় দিল। চড় খেয়েও বাচ্চাটির কোনো ভাবান্তর হলো না । তার মুখ এখনো হাসি হাসি ।

আচার্য হরিশংকর ভীত চোখে তাকিয়ে আছেন শের শাহ্’র দিকে । শের শাহের লোকজন তাঁকে ধরে এনেছে ।

শের শাহ্ বললেন, সম্রাটের মেয়ে আকিকা বেগম কোথায় ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

হরিশংকর বললেন,  আমি জানি না । জেনানা মহলে যখন হইচই শুরু হলো সে ছুটে গের নদীর দিকে । আমার ধারণা সে নদীতে ডুবে মরেছে ।

তোমার সঙ্গে একটা পুঁটলিতে বেশ কিছু ধনরত্ন পাওয়া গেছে ।

এগুলি কোথায় পেয়েছ ?

সম্রাট হুমায়ূন উপহার হিসেবে আমাকে দিয়েছেন ?

আমার এক কন্যার জন্যে এইসব উপহার ।

আমি যে এখন দিল্লীর সম্রাট এটা কি জানো ?

জানি ।

সম্রাটের সামনে মিথ্যা বলা যায় না এটা জানো ?

হরিশংকর চুপ করে রইলেন ।

শের শাহ্ বললেন, হুমায়ূনের মেয়ে আকিকা বেগমের মৃত্যুর জন্য তুমি দায়ী । তোমাকে আমি মৃত্যুদণ্ড দিলাম । তুমি জ্ঞানী মানুষ। আমি জ্ঞানকে সম্মান করি । কাজেই তোমাকে একটা বিশেষ সুবিধা আমি দেব ।

সম্রাট শের শাহ্’র অনেক দয়া ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

শের খাঁ যদি সাপও হয় সেই সাপ এখন গর্তে ঢুকছে । সাপ গর্তে ঢোকে সোজা হয়ে ঢোকে ।

বৈরাম খাঁ বললেন, সাপ যখন গর্ত থেকে বের হয় তখন কিন্তু আবার একেবেঁকেই চলে ।

এই সাপ সহজে গর্ত থেকে বের হবে না ।

বৈরাম খাঁ ক্লান্ত গলায় বললেন, শের খাঁ ছাড়াও চিন্তিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে । আপনার ভাই কামরান মীর্জা নিজের নামে খুৎবা পাঠ শুরু করেছেন । নিজের নামে স্বর্ণমুদ্রা বের করেছেন ।

সম্রাট বললেন, এটি কামরানের শিশুসুলভ কার্য । শিশুদের সব কাজ গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে নেই । যথাসময়ে সে ক্ষমা প্রার্থনা করবে । এবং আপনি তাঁকে ক্ষমা করে দেবেন ?

হ্যাঁ ।

আপনার আরেক ভ্রাতা হিন্দাল মীর্জাকে রসদের জন্যে পাঠানো হয়েছিল । তিনি কুড়ি হাজার অশ্বরোহী সৈন্য নিয়ে রসদ সংগ্রহ বের হয়ে আর ফিরে আসেন নি । খবর পাওয়া গেছে তিনি দিল্লীর দিকে অগ্রসর হচ্ছেন । মনে হচ্ছে তাঁর ও দিল্লীর সিংহাসনে বসার বাসনা ।

বৃদ্ধকে সম্মান করো, এই সম্মান তাঁর অভিঙ্গতার কারণে,

যুবককে সমীহ করো, এই সমীহ তার তারুণ্যের কারণে,

শিশুকে ভালোবাসো, এই ভালোবাসা তার শিশুসুলভ কর্মকাণ্ডের

জন্যে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

বৈরাম খাঁ বিরস গলায় বললেন, প্রতিটি শের কবির ব্যক্তিগত ধ্যানধারণার ফসল । ব্যক্তিগত কোনো কিছুই সর্বজনীন হতে পারে না । যাই হোক, আমি হস্তীশাবকের স্নান দেখার জন্যে আসি নি । আমি শের খাঁর কাছ থেকে একটি পত্র পেয়েছি । পত্রটি আপনাকে পড়ে শোনানোর জন্যে এসেছি । সম্রাটের অনুমতি পেলে পত্রটি পড়তে চাই ।

পড়ুন ।

বৈরাম খাঁ পত্রটি পড়লেন

সিংহের চেয়ে সাহসী, দিল্লীর সূর্য সম্রাট হুমায়ূনের

প্রিয়ভাজন, বৈরাম খাঁ ।

আমার অভিনন্দন এবং সালাম ।

আপনি ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই অবগত হয়েছেন

যে, সন্ধির সকল শর্ত মেনে আমি আমার বাহিনী

নিয়ে দূরে সরে গেছি । আমার পুত্র সাইফ খাঁকে

নির্দেশ দিয়েছি সে যেন সম্রাটের সঙ্গে দিল্লী যাত্রা

করে ।

আমি যে-কোনো এক শুভদিনে সম্রাটের সামনে উপস্থিত হব । তাঁর পদচুম্বনের দুর্লভ

সুযোগের আশায় কালযাপন করছি ।

এক্ষণ, আপনাকে পত্রদানের কারণ ব্যাখ্যা

করি । আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে,

ঝাড়খণ্ডের দলপতিদের চোরাগোপ্তা হামলায় আমি

বিপর্যস্ত ।

সম্রাট হুমায়ূনের দীন সেবক হিসেবে এবং দিল্লীর সিংহাসনে প্রতি অতি অনুগত ভৃত্য হিসেবে

আমি কি আপনার কাছ থেকে কিছু পরামর্শ পেতে

পারি ?

ঝাড়খণ্ডের দলপতিদের কীভাবে সমুচিত জবার

দেওয়া যায়-এই বিষয়ে পরামর্শ ।

সম্রাটের অনুমতি সাপেক্ষে আপনি যদি রাজি

থাকেন তাহলে আপনাকে সসম্মানে আমার তাঁবুতে

আনার ব্যবস্থা আমি করব ।

পত্রের উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম ।

ইতি

আপনার গুণমুগ্ধ,

মোঘল সম্রাট হুমায়ূনের দীন সেবক,

শের খাঁ

সম্রাট বললেন, পত্রের কী জবাব দেবেন বলে ঠিক করেছেন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

বৈরাম খাঁ বললেন, আপনি যে জবাব দিতে বলবেন আমি সেই জবাবই দেব ।

আমি মনে করি শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে আপনি শের খাঁ’র সঙ্গে দেখা করতে পারেন ।

আপনার যদি এরকম নির্দেশ হয় আমি যাব । এখন আপনার অনুমতি নিয়ে আমি তাঁবুতে ফিরে যেতে চাই । বাংলা মুলুকের প্রচণ্ড তাপে আমি বিপর্যস্ত বোধ করছি ।

সম্রাট বললেন, আপনি নিজের তাঁবুতে ফিরে যান । বিশ্রাম করুন । বৈরাম খাঁ তাঁবুতে ফিরেই শের খাঁ’র পত্রের জবাব দিলেন ।

সেখানে লিখলেন,

পাঠানদের প্রতিনিধি

শের খাঁ,

আপনার পত্র পাঠ করেছি । আমার পক্ষে

কোনোক্রমেই সম্রাট হুমায়ূনকে একা ফেলে আপনার কাছে যাওয়া সম্ভব না ।

ক্ষমাপ্রার্থনাপূর্বক

বৈরাম খাঁ

দিন বৃহস্পতিবার । সময় সুবেহ্ সাদেক ।

শের খাঁ তার দুই পুত্র এবং প্রধান সেনাপতি খাওয়াস খাঁকে নিয়ে গোপন বৈঠকে বসেছেন । শের খাঁ বললেন, আজ মধ্যরাতে আমরা মোঘল বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব । কারও কিছু বলার আছে ?

কেউ জবাব দিল না । খাওয়াস খাঁ বললেন, আজকের রাতটা কি বিশেষ কারণে ঠিক করা হয়েছে ?

শের খাঁ বললেন, হ্যাঁ । আমরা মুসলমানরা ‍দিনগণনা করি চন্দ্র দেখে । সেই হিসাবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবারের শুরু শুক্রবারে মুসলমানরা যুদ্ধযাত্রা করে না । মোঘল বাহিনী নিশ্চিত মনে ঘুমাবে । আমরা মুসলমান হয়েও ঝাঁপিয়ে পড়ব ।

খাওয়াস খাঁ বললেন, দিন নির্ধারণ ঠিক আছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

শের খাঁ বললেন, মোঘল বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হবে এই বিষয়ে আমি একশত ভাগ নিঃসন্দেহ । ইম ঝাড়খণ্ডের দলপতির নামে একটা মিথ্যা গল্প তৈরী করেছি ।বারবার তার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছি । মোঘলরা তা বিশ্বাস করেছে । আমাদের দুটা লাভ হয়েছে । এক. মোঘলদের বিশ্বাস অর্জন । দুই. দ্রুত যুদ্ধযাত্রা করার অনুশীলন ।

শের খাঁ’র পুত্র সাইফ খাঁ বলেলেন, বারবার ঝাড়খণ্ডের দলপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা যে একটি অনুশীলনের অংশ তা আমি আগে বুঝতে পারি নি ।

শের খাঁ বললেন, এখন আমি কিছু কঠিন নির্দেশ দেব । এইসব নির্দেশ অক্ষরে পালন করতে হবে ।

প্রথম নির্দেশ

সম্রাট হুমায়ূনকে কোনো অবস্থাতেই হত্যা বা গ্রেফতার করা যাবে না । তাঁকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে ।

শের খাঁ’র পুত্র জালাল খাঁ বললেন, আপনার এই নির্দেশের পেছনে কারণ কী ?

শের খাঁ বললেন, একটিই কারণ । মানুষ হিসেবে আমি সম্রাট অত্যন্ত পছন্দ করি । আমি আমার ‍দিক থেকে তাঁর কোনো অমঙ্গল হতে দেব না ।

দ্বিতীয় নির্দেশ

সম্রাটের পরিবারের সমস্ত নারী ও শিশু এবং তাঁর

হেরেমের নারীদের কোনোরকম অসম্মান বা ক্ষতি

করা যাবে না ।

তৃতীয় নির্দেশ

যে-কোনো মূল্যে বৈরাম খাঁকে হত্যা করতে হবে ।

বৈরাম খাঁ সিংহের মতো সাহসী আবার শৃগালের

চেয়েওর ধূর্ত । বৈরাম খাঁ বিহীন হুমায়ূন কোনো

শক্তিই না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

শের খাঁ বললেন, এখন খাওয়াস খাঁ’র দায়িত্ব হলো বিশাল সেনাবহিনী নিয়ে ঝাড়খণ্ডের চেরুহ দলপতির বিরুদ্ধে মিথ্যা যুদ্ধযাত্রা করা । সম্রাট হুমায়ূন যেন খবর পান আপনি দলপতিকে শায়েস্তা করতে যাচ্ছেন-আমি সেই ব্যবস্থা করব । আপনি সন্ধ্যা নামার পর ফিরে আসবেন ।

খাওয়াস খাঁ বললেন, আমি কি এখনই যাত্রা করব ?

শের খাঁ বলেলেন, এই মুহূর্তে ।

ভোরবেলা নাশতা খেতে হুমায়ূন শুনলেন, শের খাঁ’র বিশাল বাহিনী খাওয়াস খাঁ’র নেতৃত্বে চেরুহ দলপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছে ।

হুমায়ূন দুঃখিত গলায় বললেন, শের খাঁ বেচারা ভালো ঝামেলায় আছে ।

সারাটা ‍দিন সম্রাটে আনন্দে কাটল । তিনি তাঁর কন্যা আকিকা বেগমের সঙ্গে পাশা খেললেন । আকিকা বেগম পাশা খেলায় পিতাকে হারিয়ে দিলেন । সম্রাট কন্যার কাছে হেরে প্রভৃত আনন্দ পেলেন। তিনি একটি শের আবৃত্তি করলেন । এই শেরটির ভাবার্থ-

সেই ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান যে বুদ্ধিতে নিজ পুত্র-কন্যার

হাতে পরাস্ত হয় ।

আকিকা বেগম বলল, বাবা, আমি তোমাকে বুদ্ধিতে হারাই নি ।

পাশার দানে হারিয়েছি ।

হুমায়ূন হাসতে হাসতে বললেন, একই ব্যাপার ।

অম্বা মেয়েটির সঙ্গেও কিছু কথা বললেন । হুমায়ূন বললেন, আমার এখানে তুমি কি সুখে আছ ?

অম্বা বলল, মহা সুখে আছি । আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে চাই । এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত । আরও চিন্তা করো । সম্রাট দুপুরে আচার্য হরিশংকরের সঙ্গে বসলেন । তাঁর অনুবাদ শুনলেন । সর্বমোট দশ পৃষ্ঠা অনুবাদ হয়েছে । সম্রাট আচার্যকে দশটি রৌপ্যমুদ্রা দিলেন ।

মাগরেবের নামাজের পর কোনোরকম খবর না দিয়ে সম্রাট উপস্থিত হলেন জেনানা তাঁবুতে । মহিলারা অভিভূত । অনেকদিন তাঁরা সম্রাটের দর্শন পায় না ।

হুমায়ূন বললেন, ‍দিল্লী ফিরে গেলে কেমন হয় ?

সবাই একসঙ্গে বলল, খুব ভালো হয় । আমরা এক সপ্তাহের মধ্যে দিল্লীর দিকে রওনা হব ।

মহিলাদের আনন্দের সীমা রইল না । তাঁদের আগ্রহে সম্রাট রাতের খাবার জেনানা তাঁবুতে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন । রাতের খাওয়ার শেষে গানবাজনার আয়োজন করা হলো ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

আনন্দেরও এক ধরনের ক্লান্তি আছে । সম্রাট সেই ক্লান্তি নিয়ে রাতে ঘুমুতে গেলেন ।

শের খাঁ’র বাহিনী কীর্তিনাশা নদীর উপরের কাঠের পুল দিয়ে পার হলো । শের খাঁ বিস্মিত হলেন । এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি পুল, সেখানে কোনো পাহারা নেই । শের খাঁ’র হস্তীবাহিনী কীর্তিনাশা সাঁতরে পার হলো ।

শের খাঁ’র বাহিনী ঘুমন্ত মোঘল সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ।

মোঘল অশ্বারোহীরা তাদের অশ্বের পিঠে জিন পরানোর সময়ও পেল না ।

সম্রাটের ঘুম ভাঙল ‘পালাও’ ‘পালাও’ চিৎকারে। সম্রাট বিস্মিত হয়ে বললেন, কী হয়েছে ?

জওহর আবতাবচি ভীত গলায় বলল, আমরা শের খাঁ কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছি এবং পরাজিত হয়েছি । মোঘল সৈন্যদের প্রায় সকলেই নিহত ।

সম্রাট বললেন, আমি কি দুঃস্বপ্ন দেখছি ?

জওহর আবতাবচি বলল, না । সম্রাট, আপনাকে এক্ষুনি পালাতে হবে ।

আহত মোঘল সেনাদের আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছে । মহিলা এবং শিশুদের কান্না শোনা যাচ্ছে ।

হুমায়ূন ভেবে পেলেন না, তাঁর তাঁবু কেন আক্রান্ত হয় নি । শের খাঁ’র উচিত ছিল সবার আগে সম্রাটকে হত্যা করা । এখানে কি শের খাঁ’র কোনো হিসাব আছে ?

সম্রাট ঘোড়ায় চড়ে কীর্তিনাশা নদীর পাড়ে গেলেন । পুল ভাঙা । শত শত মোঘল সৈন্য পুলে উঠে সেখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে পানিতে পড়ছে । নদীর স্রোতে ভেসে চলে যাচ্ছে । হাতিগুলিরও মনে হয় মস্তিঙ্ক বিকৃতি হয়েছে । তারা কিছুতেই পানিতে নামবে না । অথচ এরা শিক্ষিত হাতি । যুদ্ধক্ষেত্রের সব পরিস্থিতির জন্যে তৈরি ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

হুমায়ূন পেছনে দিকে তাকালেন, তাঁর তাঁবুতে আগুন জ্বলছে । আগুন ছুটে যাচ্ছে জেনানা তাঁবুর দিকে । আগুনের লেলিহান শিখায় আকাশ লাল । সম্রাট হুমায়ূনের ইমাম সাহেব উচ্চস্বরে আযান ‍দিচ্ছেন, আল্লাহু আকবার । আল্লাহু আকবার । মহাবিপদের সময় আযান দিতে হয় । আজ মোগলদের মহাবিপদ ।

সম্রাট ঘোড়া নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিলেন । মুহূর্তের মধ্যে ঘোড়া পানিতে তলিয়ে গেল । সম্রাট নিজেও তলিয়ে যাচ্ছিলেন । হঠাৎ শুনলেন, কে যেন বলছে আমি আপনার দিকে একটা বাতাসভর্তি মশক ছুঁড়ে দিচ্ছি । আপনি মশক ধরে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করুন ।

তুমি কি আমাকে চেনো ?

আপনি মোঘল সম্রাট হুমায়ূন ।

তোমার নাম কী ?

আমি নাজিম । ভিসতিওয়ালা নাজিম । আপনি মশক শক্ত করে ধরে ভাসতে থাকুন ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫