Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

কাঠপেন্সিল পর্ব:০৩ হুমায়ূন আহমেদ

চলন্তিকা ডিকশনারিতে আড্ডার অর্থ দেয়া হয়েছে—কুলোকের মিলনস্থান। আমার ‘দখিন হাওয়া’র বাসায় প্রায়ই আড্ডা বসে। অর্থাৎ কিছু কুলোক একত্রিত হন। আড্ডার প্রধান ব্যক্তিকে বলে আড্ডাধারী। আমি সেই জন। বাকিদের পরিচয় দিচ্ছি।শাওন। (তার বাড়িতেই আড্ডা বসছে, সে যাবে কোথায়?)

আলমগীর রহমান। (অবসর এবং প্রতীক প্রকাশনীর মালিক। আমার নিচতলায় থাকেন।) আর্কিটেক্ট করিম। (তিনি আপে দখিন হাওয়াতেই থাকতেন, এখন বিতাড়িত।) মাজহারুল ইসলাম। (অন্যদিন পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক, অন্যপ্রকাশ এবং অন্যমেলার স্বত্বাধিকারী। আমার পাশের ফ্ল্যাটেই থাকেন।)

কমল বাবু। (নাম কমল বাবু হলেও ইনি মুসলমান। মাজহারুল ইসলামের পার্টনার। শখের অভিনেতা। যে কটি নাটকে উপস্থিত তার প্রতিটি ডায়লগ মুখস্থ। কবিতা আবৃতির মতো তিনি ডায়লগ বলে আনন্দ পান।)

এঁরা আড্ডার স্থায়ী পাখি। সবসময় থাকেন। বেশ কিছু অতিথি পাখিও আছেন। এঁরা হঠাৎ হঠাৎ আসেন। যেমন চ্যালেঞ্জার, মাসুদ আখন্দ।কিছু আছেন নিমন্ত্রিত পাখি। নিমন্ত্রণ করলে এরা আসেন। অনিমন্ত্রিতভাবে কখনোই উপস্থিত হন না। যেমন, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, শফি আহমেদ, আর্কিটের রবিউল হুসাইন… প্রয়োজনের পাখিও আছে। তাঁদের উপস্থিত দেখলেই বুঝা যায় কোনোকিছুর প্রয়োজন হয়েছে। যেমন, অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর।

আমাদের এই আড্ডার একটি নামও আছে। Old Fools’ Club, বৃদ্ধ বোকা সংঘ। ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আড্ডার নাম বুধসন্ধ্যা। তাঁরা প্রতি বুধবার বসেন। প্রধানত সাহিত্য নিয়ে কথাবার্তা হয়। রচনা পাঠ করা হয়।আমাদের এখানেও রচনা পাঠ করা হয়। আমার একার রচনা। বৃদ্ধ বোকা সংঘে আমি ছাড়া লেখক কেউ নেই। তবে অত্যন্ত সুখের বিষয়, সাহিত্য নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তুবতা, কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমগ্র রচনায় কোনো কৃষক চরিত্র নেই কেন–এ নিয়ে কোনো আলোচনায় কেউ যায় না। তাহলে আমরা কী করি?

শুরুর কিছুক্ষণ আমরা ঝিম ধরে থাকি। যাদের মোবাইল আছে, তারা মোবাইল টিপাটিপি করে। আলমগীর রহমান ঘনঘন হাই তোলেন এবং বলেন, শরীর ভালো লাগছে না। আজ যাই। মুখে বলে, কিন্তু উঠেন না। কেউ তাকে থাকার জন্যে সাধাসাধিও করে না।

বাকি সদস্যরাও আলোচনা শুরুর বিষয় পান না। তারাও উসখুস করেন। তখন আড্ডাধারী হিসেবে আমার দায়িত্ব পড়ে আসর জমানোর। আমি নৌকার পাল তুলে দেই। জানি পাল তুললেই নৌকা চলা শুরু করবে। রাজনীতির কোনো প্রসঙ্গ তুলি। সবাই লুফে দেয়। তুমুল আলোচনা শুরু হয়ে যায়। বাঙালিরা হলো নাচুনি বুড়ি। আর রাজনীতি ঢোলের বাদ্য।

উদাহরণ দেই। আমি বললাম, আওয়ামী লীগের ডিজিটাল মন্ত্রীসভায় কিছু মন্ত্রী থাকা উচিত, যাদের কোনো দপ্তর থাকবে না। তাদের একটাই কাজ। তারা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে শুধু টকশো করবেন।করিম বলল, তাদের গাড়িতে কি ফ্ল্যাগ থাকবে?

আলমগীর বলল, অবশ্যই থাকবে। ডাবল ফ্ল্যাগ থাকবে। একটা আমাদের জাতীয় পতাকা, আরেকটা যে টিভি স্টেশনে টকশোতে অংশ নিতে যাচ্ছেন তাদের মনোগ্রামখচিত পতাকা।কমল বলল, আর কিছু মন্ত্রী থাকবেন যারা শুধু সংবাদ সম্মেলন করবেন। আর কিছু না। তাদের টাইটেল, চিৎকারক মন্ত্রী।আলোচনা জমে ওঠে। একটা পর্যায়ে শাওন হতাশ এবং দুঃখিত গলায় বলে, তোমাদের এই রাজনৈতিক আলাপটা কি বন্ধ করবে? এই আলোচনার কোনো ফলাফল কি আছে?

সমস্যা হচ্ছে আড্ডার কোনো আলোচনারই কোনো ফলাফল নেই। শুধু আড্ডা কেন, গোটা বাংলাদেশেরই আলোচনা, গোলটেবিল বৈঠক, চারকোনা টেবিল বৈঠক, চলমান গাড়ি বৈঠক সবই ফলাফল শূন্য। আনক্সা সবাই শূন্য আমাদের এই শূন্য রাজত্বে।

আড্ডায় মাঝে মাঝে গানের আসর বসে। শাওনের মুড ভালো থাকলে একের পর এক গান করতে থাকে। আবার অতিথি পাখি সাব-ইন্সপেক্টর টুটুল (এস আই টুটুল) যখন আসে তখনো গান হয়। তবে সে এই আড্ডায় কখনো হুমায়ুন আহমেদের লেখা গান ছাড়া অন্য কোনো গান করে না। আবার শুনেছি যখন সে অন্য কোনো আড্ডায় যায়, তখন হুমায়ুন আহমেদকে ভাসুরের মতো দেখে। তার গান দূরে থাকুক, নামও উচ্চারণ করে না। হুমায়ূন আহমেদ বিষয়ক পরচর্চায়ও না-কি অনিচ্ছায় অংশগ্রহণ করে।

টুটুল শুধু যে গান চমৎকার করে তা-না। আড্ডাবাজ হিসেবেও সে অসাধারণ। তার মতো সুন্দর করে গল্প আর একজনই শুধু করতে পারে, তার নাম জাহিদ হাসান। আমাদের আড্ডায় সে অতিথি পাখি ক্যাটাগরিতে পড়ে। আরেকজন অতিথি পাখির নাম জুয়েল আইচ। আগে যখন ধানমণ্ডিতে থাকতেন, তখন প্রায়ই আসতেন। এখন প্রায় ভিসা নেবার দূরত্বে চলে গেছেন বলে তার ক্যাটাগরি অতিথি পাখি থেকে বদলে হয়েছে নাই পাখি। তিনিও সুন্দর কথা বলেন এবং কথা বলতে পছন্দ করেন। তবে ইদানীং কথা বলায় তাঁর কিছু সমস্যা যাচ্ছে বলে আড্ডায় ঠিকমত অংশ নিতে পারছেন না।

জুয়েল আইচ আড্ডায় উপস্থিত হওয়া মানেই ম্যাজিক এই কথা আমাদের Old Fools ক্লাবের জন্যে সত্যি না। আমাদের কয়েকটি নিয়ম আছে–আড্ডায় কোনো ম্যাজিশিয়ান এলে তাকে ম্যাজিক দেখাতে বলা যাবে না, কোনো ডাক্তার এলে রোগের বর্ণনা নিয়ে তার কাছে যাওয়া যাবে না, কোনো গায়ক এলেই বলা যাবে না, ভাই শুরু করুন তো। কেউ নিজ থেকে কিছু করতে চাইলে কোনো বাধা নেই।

জুয়েল আইচ আমাদের আড্ডায় নিজ থেকে কিছু অসাধারণ ম্যাজিক দেখিয়েছেন। তাসের একটা Closetup মাজিক মানুষকে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও প্রতিবন্ধী অবস্থায় নিয়ে যায়।আমাদের আড্ডার আরেকটি ক্যাটাগরি হচ্ছে Foreign পাখি। যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার বা আগরতলার কবি রাতুল দেব বর্মন। তখন তাঁদের সম্মানে ঢাকা ক্লাব থেকে তরল খাবার আসে। বিদেশী পাখিরা তাঁদের কোমল শারীরবৃত্তীয় কারণে কঠিন খাবার সহ্য করতে পারেন না।

আমরা তখন মোটামুটি সচেতন আলোচনা করি। বেশির ভাগ সাহিত্য বিষয়ক। যেমন নি কেন শব্দের সঙ্গে ব্যবহার না করে আলাদা ব্যবহার করা হচ্ছে। নি তো নার মতো আলাদা শব্দ না।একজন বলেন, নি এসেছে নাই থেকে, খাই নাই থেকে খাই নি। কাজেই আলাদা হবে।আরেকজন বলেন, যেহেতু উচ্চারণ একসঙ্গে করা হয় কাজেই একসঙ্গেই হবে। আলাদা কখনোই হবে না।কি এবং কী নিয়ে কথা ওঠে। দীর্ঘ ঈ-কার যখন আমরা উঠিয়েই দিচ্ছি তখন শুধু ক বেচারার ওপর কেন এই হামলা?

আলোচনা কঠিন থেকে আরো কঠিনে চলে যায়। সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা কী জাতীয় জটিলতা নিয়ে দার্শনিক কথাবার্তা। একসময় নৌকার হাল ফেরাবার জন্যে আমি বেমাক্কা কিছু কথা বলি। যেমন, আচ্ছা সুনীলদা, চর্যাপদে মৌরলা মাছের উল্লেখ আছে, কিন্তু ইলিশ মাছের উল্লেখ নেই, কেন বলুন তো?

বিদেশী পাখিদের উপস্থিতিতে আড্ডা শেষ হয় গানে। এই উপলক্ষে হায়ার করে অর্থাৎ পেটেভাতে কিছু গায়ক আনা হয়। যেমন, সেলিম চৌধুরী।বিদেশী পাখিদের আড্ডায় আনার সবচয়ে বড় সমস্যা, তাদের সঙ্গে থাকে ফেউ পাখি। আরো খারাপভাবে বললে সাহিত্যের মাছি। এইসব মাছির কাছে পশ্চিমবঙ্গের লেখক মানেই পাকা কাঁঠাল। তারা কাঁঠাল ঘিরে ভনভন করে উড়বেই।

সবচেয়ে মুশকিল হয়, যখন পশ্চিমা দেশের সাহেবরা এসে উপস্থিত হন। একজনের গল্প বলি। তিনি এসেছেন রাশিয়া থেকে। বাংলাদেশের রাশিয়ান অ্যাম্বাসিতে কাজ করেন। তিনি এসেছেন সাহিত্য নিয়ে আলাপ করতে। আমি হতাশ হয়ে আড্ডার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বললাম, মহাযন্ত্রণায় পড়লাম। এই রাশিয়াভসকির সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে কী ঘটর ঘটর করব?

রাশিয়ান হাসিমুখে পরিষ্কার এবং শুদ্ধ বাংলায় বলল, আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ভালোমতো অধ্যয়ন করেছি, আপনি ইচ্ছা করলে আমার সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে ঘটর ঘটর করতে পারেন। এই রাশিয়ান (পাভেল) আমার একটি উপন্যাস সবাই গেছে বনের রুশ ভাষায় অনুবাদ করেছেন।

আড্ডাতে আরেক ধরনের উপস্থিতির কথা তুলতে ভুলে গেছি। এঁরা আসেন তাদের বানানো ছবি বা টেলিফিল্ম দেখাতে কিংবা ছবির জন্যে গান রেকর্ড করেছেন তা শোনাতে। এদের উপস্থিতিতে নিয়মিত আড্ডা বাতিল হয়ে যায়। আড্ডাবাজরা জ্ঞানীর মতো মুখ করে ছবি দেখেন, টেলিফিল্ম দেখেন। ছবির গান শোনেন এবং গোপন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

প্রয়াত লেখক প্রণব ভট্ট আড্ডায় যোগ দেখার আগে সবসময় খোঁজ নিতেন খাসির মাংসের কোনো ব্যবস্থা আছে কি-না। ব্যবস্থা থাকলে তিনি অবশ্যই আসবেন। দুর্ভাগ্য এই খাসির হাতেই তাঁর মৃত্যু হলো। আর্টারীতে চর্বি জমে হার্ট অ্যাটাক।এদেশের লেখকলের মধ্যে ইমদাদুল হক মিলন প্রায়ই আসতেন। এখন টকশোতে অতি ব্যস্ত বলে আসতে পারেন না। আড্ডায় তাঁকে সবাই অত্যন্ত পছন্দ করে, কারণ তিনি সবার সঙ্গে সব বিষয়ে একমত হন।

আড্ডায় কেউ যদি বলে–রবীন্দ্রনাথ কোনো লেখকই না। ইমদাদুল হক মিলন বলবেন, একটা খাঁটি কথা সাহস করে বলেছেন। ধন্যবাদ। (মিলন এই লেখা পড়লে রাগ করবে। আরে বাবা, ঠাট্টা করলাম। তবে আনন্দের কথা মিলন এই লেখা পড়বে না। সে সেলিব্রেটি টকশো নিয়ে ব্যস্ত। কাঠপেন্সিল পড়ার তার সময় কোথায়? কাঠপেন্সিল সেলিব্রিটি না, পার্কার ফাউনটেন পেন হলেও কথা ছিল। হা হা হা।) এখন আমাদের আড্ডার কিছু নিয়মকানুন বলি। সবই অলিখিত নিয়ম, তবে কঠিনভাবে মান্য করা হয়–

ক) কোনো খারাপ শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। উপস্থিত মহিলারা যেন কোনো অবস্থাতেই আহত না হন।

খ) পরচর্চা করা যাবে, তবে শুধুই শুধু মজা করার জন্যেই এবং যার পরচর্চা করা হবে তাকে আড্ডায় উপস্থিত থাকতে হবে। তার অনুপস্থিতিতে না।

গ) আড্ডায় মনোমালিন্য কথা কাটাকাটি হতেই পারে। আড্ডা শেষ হওয়া মাত্র সব ভুলে যেতে হবে। আড্ডার ডেডবডি কেউ কাঁধে করে বাড়িতে নিয়ে যাবে না।

‘দখিন হাওয়া’র এই আড্ডার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, আড্ডায় যাদের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে তারা কখনো কোনোদিনও তাদের স্ত্রীদের নিয়ে আসেন না। মাজহার যেহেতু পাশের বাসায় থাকে, তার স্ত্রী স্বর্ণা এসে মাঝে মধ্যে উঁকি দিয়ে স্বামীকে দেখে যায় এবং চোখের ইশারায় স্বামীকে উঠে যেতে বলে। মাজহার ভান করে সে চোখের ইশারা দেখে নি।একমাত্র ব্যতিক্রম ঔপন্যাসিক মইনুল আহসান সাবের। তিনি আমাদের আড্ডায় কম আসেন, তবে বেশির ভাগ সময় তার স্ত্রীকে নিয়ে আসেন।

মহিলারা কেন Old Fools’ Club এড়িয়ে চলেন তা এখনো জানি না। মিসির আলি সাহেবকে কারণটা বের করতে বলেছি। তিনি চিন্তাভাবনা করছেন। সিদ্ধান্তে পৌঁছালেই আমি জানব।কিছুদিন আগে আমাদের আড্ডা সম্পর্কে আমি একটি ভয়ঙ্কর তথ্য আবিষ্কার করেছি। বন্ধুদের বলেছি। সবাই একমত হয়েছেন। তথ্যটা আপনাদের জানাই।

তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই এমন কেউ যদি হঠাৎ এসে এই আড্ডায় আসক্ত হন, তাহলে বুঝা যাবে তার দিন শেষ হয়েছে। ডাক এসেছে, তাকে চলে যেতে হলে। চারজনের উদাহরণ আমাদের কাছে আছে। তাদের নাম বলতে মন সায় দিচ্ছে না। সর্বশেষ নামটা শুধু বলি। কেমিস্ট্রির দেলোয়ার ভাই। তিনি যাবেন ইউরোপ। রাত একটায় ফ্লাইট। তারপরেও কিছুক্ষণ আড্ডায় থাকার জন্যে তিনি টেলিফোন করেছিলেন। টেলিফোনে এটাই তাঁর সঙ্গে আমার শেষ যোগাযোগ। ইউরোপ থেকে ফিরেই তিনি মারা গেছেন।

এখন হঠাৎ আড্ডায় যোগ দিয়েছেন নতুন একজন। আমার শৈশববন্ধু কঠিন মাওলানা সেহেরি। সন্ধ্যা মিলানোর পর তিনি ঘরে থাকতে পারেন না। যদি কোনো একদিন না আসেন আমি ভয়ে ভয়ে তাঁর বাসায় টেলিফোন করি। ভাবি টেলিফোন ধরেন। আমি বলি, ভাবি, সেহেরি কেমন আছে? তার কোনো সমস্যা নাই তো? শরীর ঠিক আছে?

ভাবি বলেন, বুড়া ভালো আছে। খাটে বসে বকরবকর করছে।আমি বলি, শুনে শান্তি পেলাম ভাবি। পৃথিবীতে বকরবকর অবিনশ্বর। আর সবই নশ্বর। Silence is golden কথাটা মিথ্যা। Silence কখনোই Golden না।কাউকে মুখের ওপর না বলা আমার স্বভাবে নেই। না বলতে না-পারার অক্ষমতার খেসারত আমাকে নানানভাবে দিতে হয়। যেমন—

ক) চিনি না জানি না তরুণীর বিয়েতে উকিল বাবা।

খ) অপরিচিত্র শিশুর খৎনা অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি।

গ) নতুন লেখকের অখাদ্য উপন্যাসের ভূমিকায় লেখা– তরুণ ঔপন্যাসিকের গল্প বলার মুন্সিআনায় আমি বিস্মিত।

না বলতে না-পারার জটিল ব্যাধিতে যিনি আক্রান্ত তাকে দিয়ে ঢেঁকি বা রাইসমিল গেলানো তেমন কঠিন কর্ম না। কাজেই এক দুপুরে আমি দেখলাম যে নুহাশ পল্লীর হিমু উৎসব নামক রাইসমিল আমি গিলে বসে আছি।কুড়িজন হিমু (এদের মধ্যে চারজন তরুণী হিমু) যাবে নুহাশ পল্লীতে। তারা সারাদিন সেখানে ঘুরবে। আমাকে হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো তাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকতে হবে। উদ্যোক্তা বাংলালিংক নামক টেলিফোন কোম্পানি।

হিমুদের নিয়ে তারা একটি sms কনটেস্ট করেছে। পঞ্চাশ হাজারের মতো হিমু সেই কনটেস্টে অংশগ্রহণ করেছে। এদের মধ্যে সেরা বিশজন যাবে নুহাশ পল্লীতে।প্রতিটি দুষ্ট বুদ্ধির পেছনে একজন দুষ্টমান থাকেন। (বুদ্ধিমানের মতোই দুষ্টমান।) পুরো পরিকল্পনার দুষ্টমানের নাম ইবনে ওয়াহিল বাপ্পি। সে একসঙ্গে অনেক কিছু করে—

কবিতা লেখে।

নাটক লেখে।

অভিনয় করে।

বই ছাপায়।

অ্যাড বানায়।

প্রয়োজন অপ্রয়োজনে জনসংযোগ করে।উদ্ভট উদ্ভট আইডিয়া দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে।বাপ্পির আইডিয়াতে হিমু উৎসবে রাজি হলাম। বাপ্পি বলল, স্যার, দেখার মতো দৃশ্য হবে। বিশজন হিমু মনের আনন্দে হলুদ পোশাক পরে খালিপায়ে নুহাশ পল্লীতে ছোটাছুটি করছে। হিমুর স্রষ্টা হিসেবে তাদের আনন্দ আপনি দেখবেন না?

আমি বললাম, আনন্দ দেখা যেতে পারে।সে উৎসাহের সঙ্গে বলল, হিমু সঙ্গীত লিখে ফেলেছি। একটা অন্তরা শুধু বাকি। আশা করছি ঐদিন হিমু সঙ্গীত গীত হবে।হিমু সঙ্গীতও আছে? অবশ্যই। আমার মূল পরিকল্পনা জাতীয় পর্যায়ে হিমু দিবস পালন। অশোকের শিলালিপির মতো জায়গায় জায়গায় হিমুলিপি। হিমু পদযাত্রা।আমি বললাম, সেটা আবার কী?

একদল খাঁটি হিমু তেতুলিয়া থেকে হাঁটতে হাঁটতে টেকনাফ যাবে। সেখান থেকে যাবে সেন্টমার্টিন। আপনার বাড়ি সমুদ্র বিলাস-এ পৌঁছার পর পদযাত্রার সমাপ্তি। আপনিও আমাদের সঙ্গে থাকবেন। তবে আপনাকে হাঁটতে হবে না। আপনি থাকবেন গাড়িতে।

হিমু সঙ্গীত একটা অন্তরার অভাবে শেষ পর্যন্ত আটকে রইল। তবে কেন্দুয়া থেকে ইসলামুদ্দান বয়াতী তার দলবল নিয়ে চলে এল এবং সকাল থেকে বাদ্যবাজনা শুরু হয়ে গেল–

নুহাশ পল্লীতে এলে আমরা

কী দেখিতে পাই?

চারদিকে ঘুরিতেছে

শত হিমু ভাই।

আহা বেশ বেশ বেশ

আহা বেশ বেশ বেশ।

তাদের গায়ের জামা হলুদ রঙের হয়

পায়ে জুতা স্যান্ডেল কখনোই নয়।

আহা বেশ বেশ বেশ

আহা বেশ বেশ বেশ

এগারোটার দিকে টেলিফোন কোম্পানির গাড়ি ভর্তি করে হিমুদের দল চলে এল। অবাক হয়ে দেখি তাদের কারো গায়েই হলুদ পাঞ্জাবি নেই এবং কারোর পা খালি না। আমি বাপ্পিকে বললাম, ব্যাপার কী? এরা শুনেছি ভেজালবিহীন খাঁটি হিমু। এদের হলুদ পাঞ্জাবি কোথায়?

বাপ্পি মাথা চুলকে বলল, ব্যাপারটা আমিও বুঝতে পারছি না। আমার ধারণা ব্যাগে করে নিয়ে এসেছে। এখন পরবে।আলোচনার শুরুতেই ছিল পরিচয়পর্ব। পরিচয়পর্বে দেখা গেল অর্ধেকের বেশি মফস্বলের হিমু। চাঁদপুরের হিম, দিনাজপুরের হিমু। মফস্বলের হিমুদেরকে খানিকটা উগ্র বলেও আমার কাছে মনে হলো। তারা আমাকে জানাল যে, হিমু বিষয়ক সমস্ত বই তারা অধ্যয়ন করেছে। একটি বিষয়ে তারা কোনো দিকনির্দেশনা পাচ্ছে না বলে চিন্তিত। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, কোন বিষয়ে?হিমুদের কি প্রেম করার অধিকার আছে?

আমি জবাব দেবার আগেই অন্য হিমুরা কথা বলা শুরু করল। এবং তাদের কাছ থেকে জানলাম–

ক) হিমুরা আগ বাড়িয়ে প্রেম নিবেদন করতে পারবে না। তবে কোনো মেয়ে তাদের প্রেমে পড়লে তারা ধরি মাছ না ছুঁই পানি নীতি অবলম্বন করবে।

খ) হিমুদের রূপা টাইপ প্রেমিকা একজন থাকতে পারে। তবে রূপার সঙ্গে (অর্থাৎ রূপা টাইপ প্রেমিকার সঙ্গে) কখনো দেখা করা যাবে না, তবে মোবাইলে কথা বলা যাবে এবং sms চালাচালি করা যাবে।

আলোচনার মাঝখানে একজন মফস্বল হিমুকে হঠাৎ বের হয়ে যেতে দেখলাম। মিনিট দশেক পর সে হলুদ পাঞ্জাবি, খালি পা এবং সানগ্লাস চোখে পরে উদয় হলো।বাকি হিমুরা হৈহৈ করে উঠল, হিমুরা কখনো সানগ্লসি পরে না।বেচারা সানগ্লাস খুলে মনমরা হয়ে একা ঘুরে বেড়াতে লাগল।

আধঘণ্টা পর নুহাশ পল্লীর ম্যানেজার চিন্তিত মুখে কানে কানে আমাকে বলল, খালি পায়ের হিমু ভাইয়ের মাথায় মনে হয় ক্র্যাক স্যার। উনি কিছুক্ষণ এক জায়গায় লাফিয়ে এখন কদম গাছের মগডালে উঠে কেমন করে জানি শুয়ে আছে। মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছেন।আমি বললাম, তুমি আশে পাশে থাক। এবং যে-কোনো সময় যে-কোনো দুর্ঘটনার জন্য তৈরি থাক।ম্যানেজার চিন্তিত মুখে কদমগাছের দিকে ছুটে গেল।অনুষ্ঠানের একটি পর্বে ছিল হিমুর স্রষ্টার সঙ্গে একান্তে কিছুক্ষণ।

এই পর্বে আমি সবার চোখের আড়ালে বসে থাকব। আমার সামনে একটা খালি চেয়ার থাকবে। হিমুরা একজনের পর একজন সেই চেয়ারে বসবে এবং একান্তে কথা বলবে।আমি বাপ্পিকে বললাম, এই পর্বটি বাদ দাও। আমি হিমুদে ভাবভঙ্গির মধ্যে হঠাৎ প্রবল আউলাভাব লক্ষ করছি। কে কী করে বসে তার নাই ঠিক।এই পর্ব বাদ গেল।

দুজন হিমুকে দেখলাম অত্যন্ত উত্তেজিত। তারা বলছে, একটা হলুদ পাঞ্জাবি কিনলেই হিমু হওয়া যায় না। হিমু হওয়া সাধনার ব্যাপার। যুব সমাজের ভেতর এই সাধনার অভাব। বাংলাদেশে যত হিমু দেখা যাচ্ছে তার সবই ভেজাল। প্রতি পূর্ণিমাতে জোছনা দেখা হিমুদের জন্যে অবশ্যকর্তব্য, অথচ বেশির ভাগ হিমু পূর্ণিমা কবে তাই জানে না। হিমদের জন্যে মিসির আলির বই পড়া নিষিদ্ধ। অথচ এখানে অনেক হিমু আছে যারা মিসির আলির বই পড়ে। এরা হিমু সমাজের কলঙ্ক।হিমুদের যে মিসির আলির বই পড়া নিষিদ্ধ এই তথ্য আমি নিজেও জানতাম না। নতুন জ্ঞান পেয়ে ভালো লাগল।

মেয়ে হিমুদের একজন এসে বলল, স্যার, সোনার রঙ তো হলুদ। আমরা মেয়ে হিমুরা কি সোনার গয়না পরতে পারি? আমি বললাম, অবশ্যই পরতে পার।হলুদ শাড়ি পরলে মনে হয় কোনো গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। এর কী করব? হলুদ পাঞ্জাবি পরলে হয় না? না হয় না। তাহলে ছেলে হিমুদের সঙ্গে আমাদের তফাত কী থাকল?

টেলিফোন কোম্পানি হিমুদের জন্যে কিছু গিফটের ব্যবস্থা করেছিল। তার মধ্যে একটা করে মোবাইল ফোনের সেট ছিল। হিমুরা সবাই আগ্রহ করে মোবাইল সেট নিল, যদিও হিমুদের বৈষয়িক আসক্তি থেকে মুক্ত থাকার কথা।

দুপুর আড়াইটায় খাবার দেয়া হলো। হলুদ রঙের খাবার– খিচুড়ি। আমি প্রচণ্ড মাথা ধরেছে এই অজুহাতে হিমুদের কাছ থেকে বিদায় চাইলাম।তারা বলল, গুরু রেস্ট নিন। আপনার রেস্টের প্রয়োজন আছে।খুব হালকাভাবে লেখাটা লিখলাম। লেখাটা আরেকটু গুরুত্বের সঙ্গে লেখা উচিত ছিল। পৃথিবীতে কাল্টের (Cult) বিষয়টি প্রবলভাবেই আছে। কিছু মানুষের জিনের ভেতরই হয়তোবা Cult সদস্য হবার বিষয় থাকে। গুরুর নির্দেশে এরা করতে পারে না এমন কাজ নেই।

কাল্টের সংজ্ঞা হচ্ছে, ক্ষুদ্র একদল মানুষ যারা গুরুর পেছনে সীমাহীন আবেগে একত্রিত হয়। শ্রীলঙ্কার প্রভাকরণকে এক অর্থে Cult গুরু বলা চলে। তালেবানরাও তাই। জাপানে এক প্রায় অন্ধ Cult গুরুর (Shoko Asahara) আদেশে বহু মানুষকে Serin গ্যাস দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনা ১৯৯৫ সনের। এই গুরুর দলের নাম Aum Shinikyo দলের সদস্যরা গুরুকে দেখত শারের

জিম জোনস (James Warrarn Jim Jones)-এর ঘটনা তো সবার জানা। ১৭ নভেম্বর ১৯৭৮ সনে তার কারণে ৯০০ মানুষ স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করে।হিমু নামের যে গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে এরা অবশ্যই নির্বিষ, ভেজিটেবল টাইপ। তবে এদেরকে কখনোই একত্রিত হতে দেয়া যাবে না। সব কাল্ট সদস্য একসময় নির্বিষ ভেজিটেবল থাকেন।

রাশিয়ার মস্কো শহরে একটি হিমু ক্লাব হতে যাচ্ছে। ক্লাবের সদস্যরা বাঙালি না, রাশিয়ান। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের ছাত্রছাত্রী। ওরা হিমুকে নিয়ে লেখা কয়েকটি বই রুশ ভাষায় অনুবাদ করেছে। বইগুলির প্রকাশনা উৎসবেই ক্লাব তৈরির ঘোষণা দেয়া হবে। উৎসবে আমন্ত্রিত সব অতিথিনে হলুদ রঙের কিছু পরতে হবে। অতিথিদের বড় অংশ ডিপ্লোমেট। তাদের জন্যে ৫০টা হলুদ টাই কেনা হয়েছে।

সূত্র : বাংলাদেশে রুশ দূতাবাসের এক তরুন কর্মকর্তা, পাভেল। সে নিজেও নাকি একজন হিমু।

 

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

কাঠপেন্সিল পর্ব:০২ হুমায়ূন আহমেদ

বাসায় হটাৎ এক পালকি উপস্থিত।সুন্দর করে সাজানো কাগজের রঙিন পালকি। পালকির দরজা খুলে দাওয়াতের চিঠি উদ্ধার করলাম, ‘অমুক আপুর গায়ে হলুদ।আপনি সবাইকে নিয়ে আসবেন।’ইত্যাদি।

সবকিছু বদলে দেখার জন্য চারদিকে ভালো হৈচৈ শুরু হয়েছে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকেও দেখলাম নিজেকে বদলানোর জন্য কাগজপত্রে দন্তখত করছেন। লোকমুখে শুনেছি তার বাসার কাজের ছেলেকে তিনি এখন দুবেলা পড়ান। কাজের ছেলে চাকরি ছেড়ে পালিয়ে যাবার ধান্দায় আছে।তাকে ঘর থেকে বের হতে দেখা যাচ্ছে না। গ্রাজুয়েট হয়ে বের হবে,তার আগে না।

দেশ অবশ্যি নিজের নিয়মেই বদলাচ্ছে। পালকির ভেতরে নিমন্ত্রণ পত্র তার প্রমাণ। নিমন্ত্রণ ধরণ পাল্টাচ্ছে।বিয়ের আচার অনুষ্ঠান পাল্টাচ্ছে। আমার ছোট ভাই আহসান হাবিবের কাছে শুনলাম সে মাথায় টুপি পরে।কোনো এক কুলখানিতে গিয়েছিল। সেখানে মিলাদের পরিবর্তে হটাৎ করে মৃত ব্যক্তির প্রিয় গানের আসর বসল। আহসান হাবিব চট করে টুপি পাঞ্জাবির পকেটে লুকিয়ে ফেলল এবং গানের তালে তালে মাথা দুলাতে লাগল। আহসান হাবিব যেহেতু উন্মাদ নামক পত্রিকা চালায়,তার সব কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

বিয়ের আচার অনুষ্ঠান কিভাবে বদলাচ্ছে সেই নিয়ে কিছুক্ষণ গল্প করি।আমার শৈশবের বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রধান অনুসঙ্গ ছিল ‘প্রীতি-উপহার’ নামক এক যন্ত্রণা।কেন যন্ত্রণা বলছি তা ব্যাখ্যা করব,তবে তার আগে ‘প্রীতি-উপহার’ বিষয়ে বলি।বর-কনেকে আশির্বাদ এবং বরণসূচক ছড়ার সংকলনই ‘প্রীতি-উপহার’। সস্তা কোনো প্রেস থেকে এই জিনিস ছাপা হয়ে আসত। শুরুতে ছবি মেহেদী পরা একটা হাত পুরুষের গরিলা টাইপ একটা হাতকে হ্যান্ডসেক করছে। কিংবা একটা কিশোরী  পরী ফুলের মালা হাতে আকাশে উড়ছে। প্রীতি উপহারের শুরুটা হয় এই ভাবে –

দোয়া মাপি তোমার হাতে ওগো দয়াময়

দুটি প্রাণের মিলন যেন পরম সুখের হয়।

এখন বলি কেন প্রীতি উপহারকে আমি যন্ত্রণা বলেছি। আমার বাবা তার সমস্ত আত্মীয়স্বজনের বিয়েতে প্রীতি উপহার দেওয়া আবশ্যকতা মনে করতেন।রাত জেগে নিজেই লিখতেন। বিয়ের আসরে এই কাব্য আমাকেই পাঠ করে শুনাতে হতো।পাঠ শেষে তা জনে জনে বিলি করা হতো। তারপর আমাকে প্রীতি উপহার নিয়ে পাঠানো হতো মেয়ে মহলে। কনেকে ঘিরে থাকতো তার বান্ধবীরা। তারা তখন আমাকে নিয়ে নানান রঙ্গ  রসিকতা করতো। আমি যথেষ্ট আবেগ দিয়ে প্রীতি উপহার পড়ছি,এর মধ্যে কেউ একজন বলে বসল, ‘এই বান্দর চুপকর’।মেয়েরা সবাই হেসে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়তো। আমি চোখ মুছতে মুছতে বিয়ের আসরে ফিরতাম।

ওখানকার পাঠকরা কেউ যেন ভুলেও মনে না করবেন প্রীতি উপহার কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। আমাদের এক আত্মীয়ের বিয়ে ভেঙ্গে গিয়েছিল,কারণ বরপক্ষ প্রীতি উপহার আনে নি। অনেকবার বরপক্ষের সাথে কনেপক্ষের হাতাহাতি শুরু হলো।কারণ প্রীতি উপহারে কনের বাবার নাম ‘সালাম’র জায়গায় ছাপার ভুলে লেখা হয়েছে ‘শালাম’। কনেপক্ষের ধারণা, ইচ্ছাকৃতভাবে কনের বাবাকে শালা ডাকা হয়েছে।

কবি শামসুর রহমানের বিয়েতে প্রীতি উপহার ছাপা হয়েছিল এবং দেশের কবিরা সবাই সেখানে লিখেছিল।এই তথ্য কি জানা আছে? যে সংকলনটি বের হয় তার নাম কবি শামসুর রহমানই দেয়। নাম ‘জীবনের আশ্চর্য ফাল্গুন’। সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন তার প্রেসে ছেপে দেন।[সূত্র: বাংলাদেশের বিবাহ সাহিত্য। আবদুল গফফার চৌধুরী।]

প্রাচীনকালে বিয়ে কিভাবে হতো তা বললে বুঝা যাবে আমরা কতটা বদলেছি। বৈদিক যুগে কোনো তরুণীর বিয়ে একজনের সঙ্গে হতো না। তার সমস্ত ভাইদের সঙ্গে হতো। ঋগ্বেদে এবং অথর্ববেদে এমন কিছু শ্লোক আছে যা থেকে বুঝা যায় বড় ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে যৌনমিলনের অধিকার কনিষ্ঠ ভাইদেরও থাকতো।এই দুই গ্রন্থেই স্বামীর ছোট ভাইকে বলা হয়েছে দেবৃ অথবা দেবর। দ্বিতীয় বর।

বেদের জাতীত্ববাচক কয়েকটি শব্দ থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, স্ত্রীলোকের অনেক স্বামী থাকতো।এর কারণও কিন্তু আছে। আর্যরা যখন এই দেশে ঢুকলো,তখন তাদের সঙ্গে মেয়ের সংখ্যা ছিল খুবই কম। আর্যরা দেশী কৃষ্ণ রমনীদের প্রচন্ড ঘৃণার চোখে দেখতো। কাজেই তাদের সঙ্গে করে আনা মেয়েদের ভাগাভাগি করে গ্রহণ করা ছাড়া দ্বিতীয় বিকল্প ছিল না।[সূত্র: ভারতের বিবাহের ইতিহাস। অতুল সুর।]

রাহুল সাংস্কৃত্যায়নের বইতে পড়েছি, তিব্বতে সব ভাইরা মিলে একজন তরুণীকে স্ত্রী রূপে গ্রহণ করতো। তিব্বতে মেয়ের সংখ্যা কম না,তারপরেও এই অদ্ভূত নিয়মের কারণ হলো তিব্বতে জমির খুব অভাব।সব ভাই যদি আলাদা হয়ে সংসার শুরু করে,তাহলে জমি ভাগাভাগি হয়ে কিছুই থাকবে না। তিব্বতে সে সব মেয়েদের বিয়ে হবে না তাদের গতি কি হবে?তারা মন্দিরের সেবাদাসী হবে। অর্থাৎ বেশ্যাবৃত্তি করবে।একবার মন্দিরের দেবতার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেলে অন্য পুরুষদের সঙ্গে আনন্দ করতে বাঁধা নেই।

 কী ভয়ঙ্কর! DFP থেকে প্রকাশিত সচিত্র বাংলাদেশ পত্রিকার নভেম্বর সংখ্যায় বিয়ের রীতিনীতি এবং ইতিহাস নিয়ে অনেক গুলো লেখা ছাপা হয়েছে। আমি পড়ে খুবই আনন্দ পেয়েছি। কৌতূহলী পাঠক সংখ্যাটি সংগ্রহ করে পড়লে খুবই আনন্দ পারেন। সেখান থেকে ‘উকিল বাপ’বিষয়ে লেখাটি তুলে দিচ্ছি।

আমাদের দেশে মুসলিম রীতির বিয়েতে ‘উকিল বাপ’ পদবিধারী একজন ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়।যারা বিয়েতে মেয়ের কাছ থেকে অনুমতি আনে এবং বিয়ের মজলিসে এসে মেয়ের সম্মতির কথা জানায়।এই উকিল বাপকে এতই গুরুত্ব দেওয়া হয় যে,এটা না হলে বিবাহ হবে না বলে মনে করা হয় এবং পরবর্তীতে এই উকিল বাবাকে মেয়েরা নিজের বাবার মতো শ্রদ্ধা করে থাকে।তার নাম বিয়ের রেজিস্ট্রেশন ফরমেও তোলা হয়।

অধিকাংশ ক্ষেতেই দেখা যায়,এই উকিল বাপ ব্যক্তিত্বটা এমন একজন ব্যক্তি হয়ে থাকেন যার সাথে পিতৃতুল্য সম্পর্ক হওয়ার সম্ভবনা নয় বা মেয়ের তার সাথে দেখা সাক্ষাৎ জায়েজ নয়। পিতৃতুল্য শ্রদ্ধা দেখাতে গিয়ে মেয়েরা পদবি বিষয়টিকে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন মনে করে না।এতে করে উভয়ই গুনাহগার হয়ে থাকেন। মুসলিম রীতির বিয়েতে উকিল বাপ পদবিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে প্রচলিত হলেও বিষয়টি শরিয়ত বিরোধী একটি প্রথা। কারণ শরিয়তে উকিল বাপের কোনো ধারণা নেই।

ইসলাম ধর্ম মতে, প্রতিটি মেয়ের জন্য পর্দা করা ফরজ হওয়ায় উকিল বাপ সম্পর্কটি হারাম বলে বিবেচিত  হয়। মেয়ের কাছ থাকে অনুমতি নেওয়ার জন্য তৃতীয় পক্ষ উকিল বাপের চেয়ে তার বাবা অথবা ভাইয়ের এই দায়িত্ব পালন করাই শ্রেয়।

[উপরিউক্ত ফতোয়া সংগ্রহ করা হয়েছে মুফতি মানসুরুল হক:ইসলামী বিবাহ, রাহমানীয়া পাবলিকেশন্স,ঢাকা,২০০৫,পৃষ্টা ১৮-১৯ থেকে।] আমি অনেক মেয়ের উকিল বাপ হয়েছি। এখন ঠিক করেছি আর না। উকিল দাদু হওয়ার বিধান থাকলে অবশ্যি সেকেন্ড থট দেব।

বিয়ের গান হিসাবে ‘লীলাবালি লীলাবালি’ গানটি প্রায় গীত হয়। আমাদের ছবি ‘দুই দুয়ারী’তেও গানটি ব্যবহার করা হয়েছে। গানটি গাওয়া হয় –

              লীলাবালি লীলাবালি

                     বড় যুবতী সই গো

               কী দিয়া সাজাইমু তোরে?

গানের কথায় ভুল আছে।’বড় যুবতী’ হবে না, হবে ‘বর অযুবাতী’।এর অর্থ -বর আসছে।আমার ভুলের কারণে এখন অন্যরাও ভুল করছেন।শেষে দেখা যাবে ভুলটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।আদি ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

অল্প কিছুদিনের মধ্যে কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর নানান পত্রিকায় বেশ কিছু লেখা পড়েছি। উনার জন্মশতবার্ষিকী এক বছর আগেই শেষ হয়েছে। তার পরেও একটি পত্রিকা ঘটা করে জন্মশতবার্ষিকী পালন করল। তাতে আমি কোনো সমস্যা দেখি না। একজন বড় লেখককে সম্মান দেখানো হচ্ছে, এটাই বড় কথা। আমাদেরমধ্যে সম্মান করা এবং অসম্মান করার দুটি প্রবণতাই প্রবলভাবে আছে। কাউকে পায়ের নিচে চেপে ধরতে লামাদের ভালো লাগে, আবার মাথায়। নিয়ে নাচানাচি করত্রে এ ভালো লাগে।

একটা সময় স্বয়ং রবীন্দ্রনাগকে নানান অসম্মানের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। তাকে বাকবাকুম কবি বলা হয়েচ্ছে। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা এমএ পরীক্ষায় তাঁর রচনার অংশবিশেষ তুলে ধরে বলা হয়েছে–শুদ্ধ বাংলায় লিখ।ভাগ্যিস উনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। বাঙালিকে তিনি মাথায় তোলার সুযোগ করে দিয়েছেন। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বিশেষ্য বক্তৃতামালা দেবার আমন্ত্রণ জানিয়ে ধন্য হয়েছে।

পশ্চিমা দেশেও (যাদের আমরা সভ্য বলে আনন্দ পাই) এক প্রবণতা আছে। তরুণ আইনস্টাইন চাকরি চেয়ে নানান বিশ্ববিদ্যালয়ে দরখাস্ত করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি আবেদনের জবাব পর্যন্ত দেয় নি। আইনস্টাইন অতি বিখ্যাত হবার পর তাঁর চাকরির আবেদনগুলি বাঁধিয়ে অহঙ্কারের সঙ্গে প্রদর্শিত হচ্ছে। অহঙ্কারের বিষয় হলো, আইনস্টাইনের মতো লোক এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির আবেদন করেছিলেন।

মানিক সাশ্যাপাধ্যায়ের কাছে ফিরে যাই। তাঁকে সম্মান দেখানোর আতিশয্যে এক প্রবন্ধকার লিখেছেন, সস্তাধারার জনপ্রিয় লেখক শরৎচন্দ্রকে পেছনে ফেলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এগিয়ে গেছেন কত দূর। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা মানেই পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা ইত্যাদি।

সমস্যা হচ্ছে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের স্বীকারোক্তি আছে তিনি শরৎচন্দ্রকে কতটা শ্রদ্ধার চোখে সারাজীবন দেখেছেন। গবেষক সরোজ মোহন মিত্র তাঁর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ও সাহিত্য গ্রন্থে বলেছেন, মানিকের জীবনে শরৎচন্দ্রের প্রভাব ছিল অসীম।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন পড়ে অভিভুত ও বিচলিত হয়েছেন, তা লিখে গেছেন ‘সাহিত্য করার আগে’ নামের প্রবন্ধে।বেচারা শরৎচন্দ্রের সমস্যা, তাঁর রচনা সব বাঙালি মেয়েরা চোখের জল ফেলতে ফেলতে পড়ে। আমাদের ধারণা বহুলোক যা পছন্দ করে তা মধ্যম মাত্রার হবে। কারণ বেশির ভাগ মানুষের মেধা মধ্যম মাত্রার।

বাংলা ভাষার ঔপন্যাসিকদের প্রচুর ইন্টারভিউ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। একটি প্রশ্ন বেশির ভাগ সময়ই থাকে আপনার প্রিয় ঔপন্যাসিক কে? প্রশ্নের উত্তরে কেউ কখনো শরৎচন্দ্রের নাম দেন না। হয়তো ভয় করেন এই নাম দিলে নিজে মিডিওকার খাতায় নাম উঠাবেন।মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু কঠিন গলায় শরৎচন্দ্রের নাম বলতে দ্বিধা বোধ করেন নি। কারণ তিনি ভালোমতোই জানতেন তিনি যাই বলেন না কেন তাঁকে মিডিওকার ভাবার কোনো কারণ নেই।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে আমি একটা লেখা শুরু করেছিলাম। কিছুটা লিখে থমকে গেছি। শুরুটা এরকম– সেটেলমেন্ট বিভাগের দরিদ্র কানুনগো হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সর্বমোট ১৪টি সন্তান। পঞ্চমটির নাম প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ছেলেটি পড়াশোনায় ভালো। প্রবেশিকা পরীক্ষায় গণিতে ডিসটিংশন নিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ দিয়েছে। আইএসসিতে প্রথম বিভাগে পাশ করে অংকে অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছে প্রেসিডেন্সি কলেজে।

হরিহর বাবু এবং তার স্ত্রী নীরদা সুন্দরী দেবী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন এই ভেবে যে, পঞ্চমটির একটি গতি হয়ে গেল।সমস্যা বাঁধাল প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু বন্ধু। একদিন ক্লাসের ফাঁকে তুমুল তর্ক। তর্কের বিষয় বড় কোনো কাগজে নবীন লেখকদের লেখা ছাপা নিয়ে। তারা বলছে, নবীন লেখকদের লেখা সম্পাদকরা পড়েনই না।

প্রবোধ একা বলছে, নবীনদের কোনো ভালো গল্প পায় না বলেই ছাপা হয় না। ভালো গল্প পেলেই ছাপবে।অসম্ভব কথা।আয় আমার সঙ্গে বাজি রাখ। আমি একটা গল্প লিখে পাঠাব। কোলকাতার সবচেয়ে ভালো পত্রিকা বিচিত্রা। বিচিত্রাতেই পাঠাব। তারা অবশ্যই ছাপবে।তুই গল্প লিখবি?

বাজি জেতার জন্যে লিখ। আজ রাতেই লিখব।অঙ্কের বই সরিয়ে রেখে রাত জেগে গল্প লেখা হলো। গল্পের নাম অতসী মামী। লেখক হিসেবে প্রবোধ তাঁর ভালো নাম না দিয়ে মা তাঁকে যে নামে ডাকতেন সেই নাম দিলেন– মানিক।পৌষ সংখ্যা বিচিত্রায় (ডিসেম্বর ১৯২৮) অতসী মামী প্রকাশিত হলো। লেখকের নাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।বাংলা কথাসাহিত্যের দিবাকর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যাত্রা শুরু অতসী মামীর হাত ধরে।

বিচিত্রা পত্রিকাতেই তাঁর আরো দুটি গল্প প্রকাশিত হয়। তিনি অঙ্কের বই পুরোপুরি শেলফে তুলে লিখতে শুরু করেন প্রথম উপন্যাস দিবারাত্রির কাব্য।সেবছরই তাঁকে কঠিন মৃগী রোগ কব্জা করে ফেলে। লেখার সময় Epilepsy-র আক্রমণ বেশি হয়। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকেন। একসময় জ্ঞান ফিরে, আবার লেখা শুরু করেন। ১৯৩৫ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে লিখেন, পুতুলনাচের ইতিকথা।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় পুতুলনাচের ইতিকথা দিয়ে। পরিচয়ের ঘটনা বলা যেতে পারে। আমার আবার পোস্টিং তখন বগুড়ায়। আমি বগুড়া জিলা স্কুলে ক্লাস টেনে পড়ি। সেখানকার পাবলিক লাইব্রেরির নাম উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরি। লাইব্রেরির অবৈতনিক সিক্রেটারি একজন উকিল। অল্পবয়েসীরা লাইব্রেরি থেকে কী বই নিচ্ছে না নিচ্ছে সেই দিকে তাঁর তীক্ষ্ণ নজর। আমার হাত থেকে পুতুলনাচের ইতিকথা তিনি কেড়ে নিয়ে বললেন, এই বয়সে মানিক না পড়াই ভালো। বইটা কঠিন। অশ্লীলতাও আছে।

আমি বললাম, বইটা আমি আমার পড়ার জন্যে নিচ্ছি না। বইটা বাবা পড়তে চেয়েছেন। তাঁর জন্যে নিচ্ছি। আমার জন্যে নিয়েছি সুন্দরবনে আর্জান সরদার।বই নিয়ে বাসায় ফিরলাম। সঙ্গে সঙ্গেই পড়তে শুরু করলাম। উপন্যাসের শুরুটা কী অদ্ভুত।খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল। আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কটাক্ষ করিলেন।এই শুরুটা পড়ে আমি কিন্তু বুঝতে পারি নি যে হারু ঘোষের ওপর বজ্রপাত হয়েছে। সে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। উপন্যাসের কী আশ্চর্য শুরু এবং কী আশ্চর্য লেখা।

পুতুলনাচের ইতিকথা নিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মোটামুটি কঠিন সমালোচনার মধ্যে পড়েন। কমিউনিস্টরা বললেন, মানিক বাবু মানুষকে পুতুল হিসেবে দেখছেন। নিয়তির হাতের পুতুল। তা হতে পারে না। মানুষই তার নিয়তির স্রষ্টা। একজন লেখক সেই সত্যই লিখবেন। নিয়তির হাতে সব ছেড়ে দেবেন না।

যে যা বলে বলুক, আমার ধারণা বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলির মধ্যে এটি একটি। উপন্যাসটি আমাকে কতটুক আচ্ছন্ন করেছে তার প্রমাণ দেই। আমার উপন্যাস শ্রাবণ মেঘের দিনের প্রধান চরিত্র কুসুম। এই কুসুম এসেছে পুতুলনাচের ইতিকথা থেকে। শশী ডাক্তারের প্রণয়িনী। স্ত্রী শাওনকে আমি ডাকি কুসুম নামে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমি তখন নিজেকে শশী ডাক্তার যে ভাবি না তা কে বলবে!

আমার মেজো মেয়ের নাম শীলা। এই নামটিও নিয়েছি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প শৈলজ শিলা থেকে। গল্পের শেষে তিনি বলছেন—শৈলে যাহার জন্ম, শিলা যাহার নাম সে শিলার মতো শক্ত হইবে জানি কিন্তু রসে ডুবাইয়া রাখিলেও শিলা কেন গলিবে না ভাবিয়া মাথা গরম হইয়া উঠে।তাঁর কোন লেখা কেমন, কোন গ্রন্থে জাদুবাস্তবতা আছে, কোনটিতে নেই, এইসব তাত্ত্বিক আলোচনায় যাব না। সাহিত্যের সিরিয়াস অধ্যাপকদের হাতে এই দায়িত্ব থাকুক। আমি ব্যক্তি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাচ্ছি।

নিঃসঙ্গ মানুষটার কোনো বন্ধু ছিল না। এতগুলি বই লিখেছেন, কাউকে কোনো বই উৎসর্গ করেন নি।এই পর্যন্ত লিখে আমি থমকে গেলাম। অন্যদের মতো আমিও কি মানুষটাকে গ্ল্যামারাইজড করার চেষ্টা করছি না? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো বন্ধু নেই। একজন কাউকে পান নি বই উৎসর্গ করার জন্যে, এটা তো তার ব্যর্থতা। কোনো অর্জন না।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়াশোনা বাদ দিয়ে সাহিত্যে নিজেকে সম্পূর্ণ নিবেদন করেন।–এই বাক্যটাতেও তাঁকে বড় করার প্রচ্ছন্ন চেষ্টা থাকে। মূল ঘটনা সেরকম না। তিনি দুবার B.Sc. পরীক্ষা দিয়ে ফেল করার পরই তাঁর ডাক্তার ভাই পড়াশোনার খরচ দেয়া বন্ধ করেন। বাধ্য হয়েই তাঁকে পড়াশোনায় ইতি টানতে হয়।

তাঁর কঠিন মৃগী রোগের চিকিৎসায় সেই সময়কার সবচেয়ে বড় চিকিৎসক এগিয়ে এসেছিলেন–ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়। তিনি তখন শুরু করেন মদ্যপান। এই সময় অতুল চন্দ্র সেনগুপ্তকে এক চিঠিতে লেখেন–

ডাক্তারের সব উপদেশ মেনে চলা বা সব অষুধ নিয়মিত খাওয়া সম্ভব হয় নি। কারণ অর্থাভাব এবং অতিরিক্ত খাটুনি। আজ এখন অষুধ খেয়ে ঘুমোলে কাল হাঁড়ি চড়বে না। খানিকটা এলকোহল গিললে কিছুক্ষণের জন্যে তাজা হয়ে হাতের কাজটা শেষ করতে পারব। এ অবস্থায় এলকোহলের আশ্রয় নেয়া ছাড়া গতি কি?

খোঁড়া যুক্তি। যারা মদ্যপান করেন তারা জানেন এই জিনিস কাউকে তাজা করে না। আচ্ছন্ন করে। বোধশক্তি নামিয়ে দেয়।আমার খুবই কষ্ট লাগে যখন দেখি এতবড় একজন যুক্তিবাদী লেখক নিজের জীবনকে পরিচালিত করেছেন ভুল যুক্তিতে।তাঁর শেষ সময়ের চিত্র শরৎচন্দ্রের চরিত্রের চিত্রের মতো। তাঁর নিজের লেখা চরিত্রের মতো না।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তখন আশ্রয় নিয়েছেন বস্তিতে। তাঁকে জাপ্টে ধরেছে চরম দারিদ্র, মদ্যপানে চরম আসক্তি এবং চরম হতাশা। তাঁকে দেখতে গেলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। অবস্থা দেখে তিনি গভীর বেদনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রীকে বললেন, এমন অবস্থা! আগে টেলিফোন করেন নি কেন? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী অস্ফুট গলায় বললেন, তাতে যে পাঁচ আনা পয়সা লাগে ভাই।১৯৫৬ সনের ডিসেম্বর মাসে বাংলা কথাসাহিত্যের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র মারা। যান। তাঁর বয়স তখন মাত্র ৪৮।

যদ্যপি আমার গুরু শুড়ি বাড়ি যায়

তদ্যপি আমার গুরু নিত্যানন্দ রায়।

এই লেখাটির জন্যে প্রতীক ও অবসর প্রকাশনার আলমগীর রহমান নানান বইপত্র দিয়ে সাহায্য করেছেন। তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

 

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

কাঠপেন্সিল পর্ব:০১ হুমায়ূন আহমেদ

বলপেন নামে আমি ব্যক্তিগত কিছু লেখা লিখেছি।বই আকারে বেরও হয়েছে। আনন্দ, দুঃখ এবং কল্পনার আরো কিছু গল্প আমার ঝুলিতে আছে। মাঝে মধ্যে লিখতে ইচ্ছা করে। কাঠপেন্সিল নাম দিলাম, কারণ এই লেখাগুলো ইরেজার দিয়ে মুছে ফেললে সাহিত্যের কোনো ক্ষতি হবে না, বরং লাভ হবার সম্ভাবনা আছে।

পুত্র নিষাদকে নিয়ে শুরু করি।বইমেলা(2009) শেষ হয়েছে। প্রকাশকরা লেখকদের প্রাপ্য কপি দিয়ে গেছেন। বন্ধু বান্ধবদের বিলিয়েও ঘরভর্তি বই।পুত্র নিষাদ প্রতিটি বইয়ের ফ্ল্যাপ খোলে। তার বাবার ছবি বের করে আর এটা আমার বাবা বলে বিরাট চিৎকার দেয়।তার এই চিৎকার আমার কানে মধু বর্ষণ করে।

দুই বছর বয়সে হটাৎ এক দুপুরে সে সমালোচকের  কঠিন ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। আমাকে এসে বলল,বাবা বই ছিড়বো। আমাকে বলার উদ্দেশ্য হলো, আমি না বলব না।তার অনেক কর্মকাণ্ডে তার মা নিষেধাজ্ঞা জারি করে। আমি করি না। করুক না যা ইচ্ছা।আমি বললাম ঠিক আছে বাবা বই ছেঁড়ো।সে কয়েকটি বই ছিঁড়লো আর বুঝতে পারলো, বই ছেঁড়া খবরের কাগজ ছেঁড়ার মতো সহজ কাজ না।তখন সে বলল,বাবা আমি তোমার বইয়ের উপর হিসু করবো।

আমার কঠিন সমালোচকদের মুখে এখন নিশ্চয় হাসি ফুটেছে। তাঁরা আত্মতৃপ্তি নিয়েই বলছেন, পেসাব করার মতোই জিনিস।আরো আগে পেসাব করা উচিত ছিল।দেরি হয়ে গেছে।যাই হোক, আমি আমার বইয়ের স্তূপের উপর পুত্রকে দাঁড় করিয়ে দিলাম।সে হাসিমুখে পেসাব করলো।তখন আমার বন্ধু বান্ধবরা বই নিতে এলে প্রথমেই বলেন, পেসাব ছাড়া কোনো বই আছে? থাকলে দিন।

দশ বছর বয়সের নিচের শিশুদের প্রতি আমার অন্য একধরনের মমতা আছে।তারা তাদের ভূবনে আনন্দ নিয়ে বাস করে।তাএর সাথে গল্প করলে তাদের অদ্ভুত ভূবনের কিছুটা আঁচ পাই।তারা বিচিত্র ধরনের খেলা খেলে। সেই খেলায় অংশ নেওয়াও আনন্দের ব্যাপার।

পুত্র নিষাদের বর্তমান খেলা হলো,সে তার নিজের ছোট একটা প্লাস্টিকের মগ নিয়ে এসে বলবে বাবা,এটা গরম চা।খুব গরম।খাও।আমি খুব গরম চা খাওয়ার অভিনয় করলাম। তারপর সে নিয়ে এলো ঠান্ডা চা।আমি ঠান্ডা চা খাওয়ার অভিনয় করলাম।তারপর চলে এলো ঝাল চা। আমাকে ঝাল চা খেয়ে কিছুক্ষণ উহ আহ করতে হলো।তখন হটাৎ খেয়াল হলো।বারবার যে সে  মগে করে পানি আনছে, কোথেকে আনছে?বোতল থেকে সে তো পানি ঢালতে পারে না।আমি বললাম।বাবা পানি কোথেকে আনছো?

সে বলল, বাথরুম থেকে।আমি বললাম, কি সর্বনাশ !বাবা তুমি কি কমোড থেকে আনছো? সেখানে তুমি হাগু করো সেখান থেকে? সে বলল, হ্যাঁ।আমি কমডের তিন মগ পানি খেয়েছি।আমার একটাই সান্ত্বনা,আমার কিছু বন্ধুবান্ধব ও নিষাদের চা খাওয়ার খেলা খেলেছে।তারা চায়ের উৎস জানে না।এজন্যই কবি বলেছে, Ignorence is bliss. আমি আগেই বলছি,দশ বছর নিচের শিশুদের আমি অত্যন্ত পছন্দ করি।দশ পার হলেই Off limit. যাদের বয়স দশের চেয়ে বেশি তাদের ঠিক চিনতে পারি না। নিষাদের দশ হতে এখনো আট বছর বাকি।

আমি ঠিক করেছি আমার অন্য বাচ্চাদের যেভাবে আনন্দ দিয়েছি তাকেও সে ভাবে দেব। আমার অন্য বাচ্চারা ভাইবোনদের মধ্যে বড় হয়েছে।সে বড় হচ্ছে একা।কাজেই আমি একদিন ঘোড়া সেজে বললাম,বাবা, পিঠে ওঠ।আমি তোমাকে নিয়ে ঘুরবো।নিষাদ বলল,ঘোড়ায় উঠব না,তুমি ফেলে দিবে।আমি ফেলবো না। আমি অত্যন্ত শান্ত ঘোড়া। প্রায় গাধাটাইপ।পুত্র নিষাদ  চড়ল।তাকে নিয়ে হামা দিয়ে এগুচ্ছি। পুত্রের মাতা বলল,কি হচ্ছে?

আমি বললাম, ঘোড়া হয়েছি। পৃথিবীতে বৃদ্ধ ঘোড়াও কিন্তু আছে।সে বলল,তুমি একজন লেখক মানুষ। তুমি ঘোড়া হয়ে ঘুরছ,দেখতে কেমন জানি লাগছে।আমি বললাম, আমাদের নবীজী (সাঃ) ঘোড়া হয়ে তার নাতি হাসান -হুসাইনকে পিঠে নিয়ে ঘুরতেন। আমি কোন ছাড়! লেখকদের গ্রান্ডমাস্টার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নাতনিদের পিঠে চড়িয়ে ঘুরতেন।ঘোড়ার প্রতি তার বিশেষ দূর্বলতাও ছিল। ঘোড়কে নিয়ে তার বিখ্যাত সব কবিতা আছে

তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে

দরজা দুটি একটু ফাঁক করে,

আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে

টকবগিয়ে তোমার পাশে।

রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে

রাঙা ধুলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।

অশ্বারোহীর মা ক্যামেরা নিয়ে এল।তার একটা ডিজিটাল ক্যামেরা আছে।এই ক্যামেরায় এক লক্ষ ছবি তোলা হয়েছে,যার সবই পুত্র নিষাদের। আমি বললাম,একটা ছবি ‘মানবজমিন’কাগজে পাঠিয়ে দাও।ওরা অনেক দিন আমাকে নিয়ে কিছু লিখতে পারছে না।লেখার সুযোগ করে দাও। ক্যাপশন হবে- হুমায়ূন আহমেদ এখন ঘোড়া।

মাটি কাটা ছাড়া এক জগতে দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে শিশুদের ঘুম পাড়ানো। ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে যিনি শিশুদের ঘুম পাড়াতে চেষ্টা করেন। প্রায় দেখা যায় গানের সুরে তিনিই ঘুমিয়ে পড়েন,শিশু জেগে থাকে।

নিষাদের ঘুম পাড়ানোর কঠিন কাজটি আমাকে প্রায় পালন করতে হয়।আমি গল্প বলে এই চেষ্টাটা করি।

গল্প শুনবে বাবা?

শুনব।

রাজার গল্প?

না।

রানীদের গল্প? শেখ হাসিনা, খালেদা? 

না।

ভূত প্রেত, রাক্ষস খোক্কস?

না।

তাহলে কিসের গল্প শুনবে?

এসির গল্প।

এসি নামক যন্ত্রটি তার মাথায় কিভাবে ঢুকে গেছে আমি জানি না।একটা কারণ হতে পারে -গরমে যখন কষ্ট পায় তখন এসির ঠান্ডা বাতাসে আরাম পায়। দ্বিতীয় কারণ, চারকোনা একটি বড় বোতাম টিপলেই হিম হাওয়া দেয় এই রহস্য।

যাই হোক,আমি এসির গল্প বলার প্রস্তুতি নিলাম। গল্প বানানো আমার জন্য তেমন কঠিন কাজ না(চব্বিশ বছরের অভ্যাস)। কিন্তু পড়লাম মহাবিপদে।এসি নিয়ে কি গল্প ফাঁদব?বাবা এসি,মা এসি এবং তাদের শিশুসন্তান এসির মানবিক গল্প?সেটা তো বিশ্বাসযোগ্য হবে না।যে কোনো গল্পকেই বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে।আমি শুরু করলাম,একদেশে ছিল এক এসি।নিষাদ বলল,এক দেশে ছিল এক এসি রিমোট।

আমি বললাম,গল্পের মধ্যে কথা বলবে না বাবা। গল্পের মধ্যে কথা বললে গল্প বন্ধ হয়ে যায়।….. একদিন কি হলো শোনো।এসিটা বলল মানুষকে ঠান্ডা বাতাস দিতে আমার খুব কষ্ট হয়।আমার শরীর গরম হয়ে যায়। তখন জ্বর আসে।আমি সারারাত মানুষকে ঠান্ডা বাতাস দেই।আর সারারাত আমার গা এতো গরম হয়ে থাকে। এতো জ্বর আসে।

হটাৎ তাকিয়ে দেখি এসির প্রতি মমতায় আমার পুত্রের ঠোঁট ভারী হয়ে এসেছে। সে বলল,বাবা এসি বন্ধ করে দাও,আমার ঠান্ডা লাগবে না।এক ঘটনা আমি কিভাবে দেখবো? গল্প সৃষ্টির ক্ষমতা হিসাবে,না_কি দু বছর বয়সী শিশুর বিশুদ্ধ  আবেগ হিসাবে। লেখক হিসাবে আত্মশ্লাঘা অনুভব করার জন্য আমি প্রথমটা নিলাম।

আমার বড় পুত্র নুহাশের কাছ থেকেও আমি আত্মশ্লাঘা অনুভব করার মতো উপকরণ একবার পেয়েছিলাম।তার বয়স তখন বারো। সে আমাকে বলল,বাবা,আমি তোমার বই যখন পড়ি তখন বাথরুমে বসে পড়ি।আমি বললাম,বাথরুমে বসে পড়তে হবে কেন বাবা?

তোমার বই পড়তে গেলে কিছুক্ষণ পর পর চোখে পানি আসে।সবার সামনে পড়তে ভালো লাগে না। এইজন্য বাথরুমের দরজা বন্ধ করে পড়ি।পুত্র নিষাদের কাছে ফিরে যাই।তার গল্প দিয়ে নিষাদনামা’র ইতি টানি।নিষাদ খুব গানভক্ত।তার অতিরিক্ত সঙ্গীত প্রীতি  আমার মধ্যে সামান্য হলেও টেনশন তৈরি করে। কারণ গানের প্রতি অস্বাভাবিক দূর্বলতা অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে দেখা যায়।

নিষাদের গান পাগল হবার অনেক গুলি কারণ অবশ্যি আছে।তার মা শাওন গায়িকা।তার নানী তহুরা আলীও বেতার এবং টিভির তালিকাভুক্ত একজন সঙ্গীত শিল্পী।তার বড় মা(শাওনের নানিজান)একজন গায়িকা।

নিষাদের বাবা গায়ক না,গলায় কোনো সুর নেই কিন্তু গানপাগল।তার দাদার গলাতেও সুর ছিল না,তিনিও ছিলেন গানের মহাগানপাগল।তার বড়দাদা(আমার দাদা) মাওলানা মানুষ ছিলেন। বাড়িতে গানবাজনা সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল।তিনি একদিন আমার ছোট বোন শেফুর গাওয়া ‘তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে’গান শুনে ঘোষণা করলেন বাড়িতে ইসলামী গান চলতে পারে। শেফুকে পর পর তিনবার এক বৈঠকে গান শুনাতে হলো এবং দাদাজান কয়েকবার আহা আহা করলেন।

নিষাদ যেহেতু এই ঘরানার,গানের প্রতি তার মততা হওয়াটাই স্বাভাবিক।মায়ের সব গান এবং ‘মনপুরা’ ছবির সবগান তার মুখস্থ।এক দুপুরের কথা।লেখার টেবিলে বসেছি। ‘মাতাল হাওয়া’ উপন্যাস লিখছি।জটিল অংশে আছি।এই অবস্থায় হাতি দিয়ে টেনেও টেবিল থেকে সরানো আমাকে সম্ভব না।পুত্র নিষাদ এসে তার কোমল হাতে ধরে বলল,বাবা আসো।আমি বললাম,কোথায় যাব?

নিষাদ বলল,ছাদে।ঝড় হবে।তুমি ঝড় দেখবে।আমি ঝড় দেখতে গেলাম। বৈশাখ মাসের দুপুরে হটাৎ করেই মেঘে মেঘে অন্ধকার।আকাশে এমন ঘন কালো মেঘ দেখেই রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রথম ভাব সমাধি হয়েছিল। আমি মুগ্ধ হয়ে আকাশের ঘন কালো মেঘ দেখছি।হটাৎ বাতাসের শব্দে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়তে শুরু করলো।আর তখনই আমাকে ভয়ঙ্করভাবে চমকে দিয়ে পুত্র নিষাদ গাইল-

        আজি ঝর ঝর মুখর বাদল দিনে

এই গানটি তার মা গেয়েছে।’নয় নম্বর বিপদ সংকেত ‘ ছবিতে ব্যবহার করেছি।ছবিতে তানিয়া  প্রচণ্ড ঝড় বাদলায় নাচতে নাচতে গানটি করছিল। এই গান পুত্র নিষাদ মুখস্থ করে রাখবে, এটাই স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক ব্যাপার হলো,গানটি ঝড় বাদলায় গীতি হতে হবে এটা বোধ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শতবর্ষ পরে তার রচনা পঠিত হবে কি না তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। শত বছরেরও পরে দু বছরের একটা শিশু তাঁর গান করবে,এটা কি কখনো ভেবেছিলে?আমার হটাৎ মনে হলো, রবীন্দ্রনাথ এই দৃশ্য দেখছেন।এবং নিজের কবিতা থেকেই বলছেন,’আমাকে তুমি অশেষ করেছ একি লীলা তব!

রান্নার সঙ্গে সবসময় বান্না যুক্ত হয় কেন? খেলাধুলার তা ও অর্থ করা যায়। খেলার সময় ধুলা উড়ে বলেই খেলাধুলা। খাবারের সঙ্গে যুক্ত হয় দাবার। খাবারদাবার। দাবার আবার কি? দাবারের একটা অর্থ আমি করেছি। তেমন সুবিধার খাবার যেটা না সেটাই দাবার। কোথাও দাওয়াতে গেলে(সচরাচার যাওয়া হয় না, তারপরেও হটাৎ…….)টেবিলে প্রচুর খাবার দেওয়া হয়।আমি সেখান থেকে খাবার গুলো আলাদা করি, দাবারের কাছে যায় না।সাত পদ রান্না হলে পাঁচ পদই যে দাবার হবে,এটি কিন্তু নিপাতনে সিদ্ধ।

যাই হোক রান্নাবান্নাই ফিরে যায়।  চৈত্র মাসের এক দুপুরে খেতে বসেছি। টেবিলে খাবার সাজানো। ছোট নিঃশ্বাস ফেললাম। প্রতিটি আইটেম দেখাচ্ছে রোগীর পথ্যের মতো।পানি পানি ঝোলে ধবধবে সাদা শিং মাছের টুকরো। সঙ্গে সবজি হলো কাচকলা।যে মেয়েটি তরকারি রান্না করে তাকে ডেকে শাওন বলল,তোমাদের স্যার তরকারিতে লাল রঙ পছন্দ করেন।তেল মসলা ছাড়া খান না।

শাওনের বক্তৃতার ফল রাতে ফলল।খেতে বসে দেখি রঙের হলি খেলা।করলা ভাজির রঙ ও টকটকে লাল।দুপুরে ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম,রাতে বড় নিঃশ্বাস ফেলে বললাম,আমি রান্নার একটা বই লিখব।অন্যপ্রকাশের মাজহার এই কথা শুনে আহ্লাদিত হলো।এবং সিরিয়াস মুখ করে বলল,বইয়ের  নাম বলুন আমি ধ্রুবকে কভার করতে বলে দেব।কাজ এগিয়ে রাখি।

কাজকাল টিভি খুললেই রান্না এবং টকশো র অনুষ্ঠান।দুটো অনুষ্ঠানে মধ্যে মিলও আছে। রান্নার অনুষ্ঠান থেকে কেউ রান্না করতে পারছে না, টকশোর অনুষ্ঠান থেকেও কেউ কিছু শিখছে না।সেলিব্রেটি রান্না নামে আরেক বস্তু বের হয়েছে। গায়ক-গায়িকা, চিত্রশিল্পী,নায়ক-নায়িকারা অনুষ্ঠানে নতুন নতুন রান্না শেখাচ্ছেন। (অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকাই সব তৈরি করে রাখছেন। সেলিব্রেটিরা হাসিমুখে চামচ নাড়ছেন।)শাওন গায়িকা এবং অভিনেত্রী হিসাবে এক রান্নার অনুষ্ঠানে গেল। কড়াইয়ের খুন্তি নাড়তে নাড়তে তার চার লাইনের গান করতে হলো:

আমার ভাঙা ঘরের ভাঙা চালা ভাঙা বেড়ার ফাঁকে

অবাক জোসনা ঢুইকা পড়ে…………

খুন্তি কড়ায় এবং রঙধনু কোপ্তার (শাওনের রান্না করা খাদ্যদ্রব্যটির এটাই নাম ) সঙ্গে অবাক জোসনার কি সম্পর্ক ঠিক বুঝলাম না।অনেকক্ষণ হালকা ধরনের কথা বললাম,এখন মাঝারি টাইপ হালকা কথা বলি।নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ঔপন্যাসিক পার্ল এস বাকের (গুড আর্থ) সীমাহীন আগ্রহ ছিল রান্নাবান্নায়।তিনি রান্নায় একটা বইও লিখেছেন।এই বইটির কপি আমার কাছে আছে।

কবি সৈয়দ আলী আহসান সাহেব ও রান্নার বই লিখেছেন।তার বইয়ের রেসিপি ব্যবহার করে শুধু রসুন দিয়ে আমার বাসায় মুরগি রান্না হয়েছিল। খেতে অসাধারণ হয়েছিল।যদিও বই দেখে রান্না কখনো ভালো হয় না,এই তথ্য নিউটনের সূত্রের মতো সত্য।

বতর্মানের এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ সাহেব যখন মন্ত্রী ছিলেন না,তখন একরাতে আমার ঘরে আড্ডা দিতে এসেছিলেন। আড্ডায় রান্নার প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি মোটামুটি অভিভূত গলায় বললেন, হুমায়ূন ভাই,শেখ হাসিনা যে কতো ভালো রাঁধতে পারেন তা কি আপনি জানেন?

আমি বললাম,জানি না।জানার কোনো সুযোগ নেই।সৈয়দ আশরাফ বললেন,তাঁর রান্না শুধু যে অসাধারণ তা নয়, অসাধারণের অসাধারণ।বঙ্গবন্ধুর কন্যার এই গুণটির কথা কেউ মনে হয় জানেন না।সুযোগ পেয়ে জানিয়ে দিলাম।

প্রধানমন্ত্রীর কেবিনেটে কিছু নারীমুখ দেখছি।টিভি পর্দায় তাদের যখন দেখি,তখন প্রথমেই মনে হয়,আচ্ছা এই অতি ব্যস্ত মহিলা কি রাঁধেন? বা রান্না নামক ব্যাপারটা জানেন?তাদের প্রিয়জনরা কি তাদের হাতের রান্না খেয়ে কখনো বলেছেন,বাহ! অসাধারণ।

আমার নিজের ধারণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন রান্না জানেন না। রাঁধার মতো সুযোগই পান নি। রাজনীতি করে এবং বক্তৃতা দিতে দিতেই তার জীবন কেটে গেছে। টিভিতে তাকে  মাঝে মধ্যে দেখি।যাই বলেন বিকট চিৎকার দিয়ে বলেন।মনে হয় পল্টন ময়দানে ভাষণ দিচ্ছেন,মাইক কাজ করছে না বলে চেচিয়ে বলতে হচ্ছে।উনি চিৎকার করতে থাকুন,আমি রান্নাবান্নায় ফিরে আসি। প্রথমেই কুইজ- স্বাদ কত রকমের?

   তিক্ত

   ঝাল

   লবণ

   মিষ্টি

   টক

পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মতো পঞ্চ স্বাদ।সবাই কুইজে ফেইল করেছেন।স্বাদ ছয় রকমের।ষষ্ঠ স্বাদের নাম umami.সব খাবারেই কিছু umami স্বাদ থাকে। মাংসে আছে, টমেটোতে আছে। সয়াসসে আছে প্রচুর পরিমাণে। umami স্বাদটা আসে একধরনের লবণ থেকে। লবণের নাম monosodimu glutamate.

প্রকৃতি মানুষের মুখে পাঁচ রকমের স্বাদ কেন দিয়েছেন? দিয়েছেন আমাদের সতর্ক করার জন্য। পৃথিবীর যাবতীয় বিষাক্ত জিনিসের স্বাদ তিতা।আমরা যেন তিতা না খায়।নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবারের স্বাদ টক। আমাদের নষ্ট খাবার বিষয়ে সতর্ক করির জন্যেই টক স্বাদ বুঝার টেষ্ট বাড জিভে দেয়া আছে। এখন আমরা বুঝে শুনে খেতে শিখেছি।আদি মানুষের সেই বোধ ছিল না। তাদেরকে নির্ভর করতে হতো জিভের উপর।

পশ্চিমে রান্নাবান্নার পুরোটাই পুরুষের দখলে। বাংলাদেশে ঘটনা সেরকম না।তার প্রধান কারণ আমাদের কালচারে পুরুষদের রান্নাঘরে ঢোকাকে মেয়েলি স্বভাব বলে মনে করা হয়। স্বামীকে রান্না ঘরে ঢুকতে দেখলে বিরক্ত হন না এমন স্ত্রী পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। বাংলাদেশে বাবুর্চি শব্দটাও বুদ্ধিজীবীর মতো তুচ্ছার্থে ব্যবহার হয়। বিখ্যাত শেফ টমি মিয়াকে বাবুর্চি টমি মিয়া বললে তিনি নিশ্চয় রাগ করবেন।

আমার ধারণা সব পুরুষের মধ্যেই সুপ্ত অবস্থায় রান্নার শখ আছে। আমার নিজের তো আছেই। শখ মেটাতেই রান্নার বই পড়া। আমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরির একটা বড় অংশে আছে রান্নার বই। আমার গল্প উপন্যাসের চরিত্ররাও ভালো রান্নার পছন্দ করে। হিমু তো করেই। সে মাজেদা খালার বাড়িতে যায় ভালো ভালো খাবারের লোভে।মিসির আলীর মতো নিরাসক্ত লোকও  খাবার খেয়ে তৃপ্তির বিরাট বর্ণনা দেয়।

আমার বইয়ে অনেক রেসিপিও দেওয়া থাকে। অনেক আবার সেই রেসিপি দেখে রাধতে গিয়ে ধরা খান। যাই হোক,একটি অতি সহজ রেসিপি দিচ্ছি।আমি এর নাম দিলাম ‘ডিজিটাল জাউভাত’।আতব চাল লাগবে।পাটপাতা লাগবে। পেঁয়াজ লবণ নিশ্চয় ঘরে আছে।পরিমাণ? মেপে পরিমাণ দিতে পারছি না।হাঁড়িতে আতব চাল সিদ্ধ করুন। সঙ্গে সামান্য পেঁয়াজ এবং লবণ।চাল সিদ্ধ জাউ জাউ হয়ে যাওয়ার পর পাটপাতা (তেতোটা) দিয়ে দিন ঘোটা। তৈরি হয়ে গেল ডিজিটাল জাউ।গরম গরম পরিবেশন করুন।

চেহারা দেখে কেউ খেতে চাইবে না।তবে রাঁধুনীর প্রতি মমতাবশত কিংবা ভদ্রতাবশত কেউ যদি এক চামচ মুখে দেয়,সে দ্বিতীয়বারও নেবে।এই রেসিপি আমি পেয়েছি নিউইয়র্ক প্রবাসী এক মহিলা কবির কাছ থেকে। তার নাম নার্গিস আলমগীর।অতি সাদামাটা রেসিপি দেখে যারা নাসিকা কুঞ্চন করছেন তাদের জন্য মিশরের ফারাওদের একটা রেসিপি। সম্রাটদের খানা বলে কথা।

চাল,ঘি,ভেড়ার মাংস হাঁড়িতে নিন। হাঁড়ির ঢাকনা আটা দিয়ে আটকে দিন। অল্প আচে সাত আট ঘন্টা রাখুন। রেসিপিতে মসলার উল্লেখ নেই বলে দিতে পারছি না। মসলা এবং লবণ দিতে ভুলবেন না।(সূত্র: বিরিয়ানীর নেপথ্য কাহিনি, শাহরিয়ার ইকবাল ) রান্নার উপর কোনো বই না লিখলেও একটা রান্নার বইয়ের ভূমিকা আমার লেখা। বইটি হলো অবসর প্রকাশনীর ইলিশ রান্না।পাঠকদের জন্য ইলিশ রান্না বইটির ভূমিকাটা দিয়ে দিলাম।

তখন আমেরিকার ফার্গো শহরে থাকি। জানুয়ারি মাস, হাঁড়কাপানো শীত। থার্মোমিটারের পারদ নেমে গেছে শূন্যেরও কুড়ি ডিগ্রি নিচে।সকাল থেকেই তুষারপাত হচ্ছে। দৃশ্য খুবই সুন্দর,তবে বাইরে বের হয়ে দেখার দৃশ্য না।ঘরে বসে জানালা দিয়ে দেখার দৃশ্য। এমন দূর্যোগের দিনেও বিকেল থেকে আমার বাসায় অতিথিরা আসতে শুরু করলো। নর্থ ডাকোটা টেষ্ট ইউনিভার্সিটি এবং মুরহেড টেষ্ট ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশী ছাত্র।

কারণ আজ আমার বাসায় ইলিশ মাছ রান্না হচ্ছে। ইলিশ মাছ এসেছে বাংলাদেশ থেকে।সিল করা টিনে ইলিশ। যতদূর মনে পড়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরির পাইলট প্রকল্পের জিনিস।যে প্রকল্পটি শেষ পযর্ন্ত কাজ করেনি।কৌটা খুলে দেখা গেল হলুদ রঙের আলুভর্তা জাতীয় পদার্থ।সেই জিনিস তেলে ভাজা হলো। সবাই চায়ের চামচের ছ’চামচ করে পেল। সবার মুখে আনন্দের উদ্ভাসিত।যেন অমৃত চাখা হচ্ছে।

খাওয়া দাওয়ার পর রাতভর শুধু ইলিশের গল্প। পদ্মার ইলিশের স্বাদ বেশি, না যমুনার ইলিশের? সুরমা নদীতে যে ইলিশ ধরা পড়ে তার স্বাদ গভীর সমুদ্রের ইলিশের মতো।তার কী কারণ?এই নিয়ে গবেষণামূলক আলোচনা।একজন আবার শুনালেন হার্ডিঞ্জ ব্রিজের স্প্যানে ধাক্কা খাওয়া ইলিশের গল্প।স্প্যানে ধাক্কা খেয়ে ইলিশ মাছের নাক থ্যাঁতো হয়ে যায়।সেইসব নাকভাঙ্গা ইলিশই আসল পদ্মার ইলিশ।

এরপর শুরু হলো ইলিশ রান্নার গল্প।দেখা গেল সবাই ইলিশ রান্নার কোনো না কোনো পদ্ধতি জানে।ভাপে ইলিশ, চটকানো ইলিশ,শুধু লবণ আর কাঁচা মরিচ দিয়ে সেদ্ধ ইলিশ। গভীর রাত পযর্ন্ত গল্প চলতেই লাগল।পঁচিশ বছর আগের আমেরিকার এক দূর্যোগের রাতের সঙ্গে এখানকার অবস্থা মিলানো যায় না।এখন আমি ঢাকার শহরে বাস করি।ইলিশ মাছ কোনো ব্যাপার না।প্রায় রোজই রান্না হয়।নতুন নতুন পদও হয়।এইতো সে দিন ইংল্যাণ্ডের বিখ্যাত শেফ টমি মিয়া নিজে রান্না করে ইলিশ মাছের একটি পদ খাওয়ালেন-স্মোকবিহীন ‘স্মোকড্ হিলসা’। সাহেবদের পছন্দের খাবার।

স্মোকড হিলসা খেতে খেতেই শুনলাম অবসর প্রকাশনা সংস্থার আলমগীর রহমান শতাধিক পদের ইলিশ রান্নার একটি বই কম্পোজ করে রেখেছেন। কাউকে দিয়ে ভূমিকা লেখানো যাচ্ছে না বলেই বইটি প্রকাশ করা যাচ্ছে না। আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম,ভূমিকা আমি লিখে দেব।

সাধারণত দেখা যায় লেখকদের লেখার ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হবার পর তারা ভূমিকা এবং সমালোচনা জাতীয় রচনা লেখা শেষ করেন।যে আগ্রহে ভূমিকা লিখতে রাজি হয়েছি তাতে মনে হয় আমার ঘন্টা বেজে গেছে।আচ্ছা বাজুক ঘন্টা আমি ভূমিকাতেই থাকি।

গুরুগম্ভীর ভূমিকা লেখার বিশেষ কায়দা আছে। প্রথমেই নামের উৎপত্তিতে যেতে হয়। ইলিশ নামটি কিভাবে এলো,কেন এলো।এই প্রজাতির মাছ পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চলে পাওয়া যায়।যেসব মাছ সমুদ্রে থাকে এবং ডিম পাড়ার জন্য মিঠা পানিতে আসে তাদের শ্রেনিবিন্যাস। সেই বিন্যাসে ইলিশের অবস্থা কোথায় সে বিষয়ে আলোচনা। তারপর আসবে ইলিশের ইতিহাস।

বাংলা আদি সাহিত্য (চর্যাপদে) ইলিশ মাছের উল্লেখ কেন নেই সে বিষয়ে গবেষণামূলক সুচিন্তিত মতামত। মোগল রসুইখানায় ইলিশের অনুপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা।….আমি এইসব কিছুই জানি না।আমি শুধু জানি বাংলা বর্ণমালার শিশুশিক্ষা বইয়ে অ-তে হয় অজগর, আ-তে আম,ই-তে ইলিশ…….এই তথ্যই কি ইলিশ রান্না বিষয়ক একটি বইয়ের ভূমিকার জন্য যথেষ্ট নয়?

 

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

পেন্সিলে আঁকা পরী শেষ : পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

এই ঘরে না, পাশের ঘরে আস। এই ঘরে লাইলীর বাবার কাছে বাইরের লোকজন আসে।মবিন পাশের ঘরে গেল। এটা মনে হচ্ছে গেষ্টরুম। সুন্দর করে সাজানো। আলনা খালি দেখে মনে হয়। কেউ থাকে না। বোস, তুমি চেয়ারটায় বোস। মবিন অস্বস্তির সঙ্গে বসল। ভদ্রমহিলা দরজা ভিজিয়ে দিয়ে মবিনের সামনে এসে দাঁড়ালেন। গলার স্বর নিচু করে বললেন, কাজের ছেলেটা যে দুপুরে তোমার জন্যে খাবার নিয়ে যায়–লাইলী কি ঐ ছেলের হাতে তোমাকে কোনো চিঠি পাঠিয়েছে?

মবিন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। ভদ্রমহিলা বিষন্ন গলায় বললেন, সত্যি কথা বল। আমি খুব অশাস্তিতে আছি।আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। ও শুধু শুধু আমাকে চিঠি লিখবে কেন? লেখে নাই তাহলে? জ্বি না।আচ্ছা তুমি যাও।সমস্যাটা কী হয়েছে আপনি কি বলবেন?

না, সমস্যা কিছু না।আমার কারণে কোনো সমস্যা হয়ে থাকলে আমাকে বলে দিন।বললাম তো কোনো সমস্যা হয় নি। আপনার যদি মনে হয় লাইলীকে পড়াতে না এলে ভালো হয়–তাহলে আমি কাল থেকে আসব না।ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আচ্ছা তাহলে তুমি বরং এস না।জ্বি আচ্ছা।আমি শুনেছি তুমি চাকরি খুঁজছ, পাচ্ছো না। আমি লাইলীর বাবাকে বলে দেব। যদি কিছু করতে পারে। ওর তো অনেক জানাশোনা।তার কোনো দরকার নেই। আমি তাহলে যাই?

দাঁড়াও একটু, তোমার বেতনটা দিয়ে দিই।মবিন বেতনের অপেক্ষায় বসে রইল। মাস এখনো শেষ হয় নি। দশদিন বাকি। মবিনকে তিনি খামে করে পুরো সাত শ টাকা দিয়ে গেলেন। মবিনের এত খারাপ লাগছে বলার নয়। তার ইচ্ছা করছে টাকাটা রেখে চলে আসতে। সেটা বড় ধরনের অভদ্রতা হয়। সেই অভদ্রতা করার অধিকার তার নেই। তারচেয়ে বড় কথা-সাত শ টাকা তুচ্ছ করার মতো মনের জোরাও তার নাই। সাত শ টাকা অনেক টাকা।

সন্ধ্যাবেলা এখন আর তার কিছু করার নেই। একটা টিউশনি ছেড়ে দিয়ে এইটা নিয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে একুল ওকুল দু’কূলই গেছে।চিঠির ব্যাপারটাও বেশ রহস্যময়। এই মেয়ে তাকে চিঠি লিখবে এ জাতীয় উদ্ভট চিন্তা ভদ্রমহিলা কেন করছেন? এতটা সন্দেহ বান্তিকগ্ৰস্ত হলে চলবে কীভাবে?

মবিনের নিজের কুঠুরিতে ফিরতে ইচ্ছা করছে না। কী হবে সেখানে গিয়ে? শীতলপাটির বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে থাকবে? বালিশের নিচে রাখা মা’র চিঠিটা দ্বিতীয়বার পড়বে?

বাবা মবিন,

আমার দোয়া নিও। দীর্ঘদিন তোমার পাত্ৰাদি পাইতেছি না। তোমার বাবার চোখের অবস্থা খুবই খারাপ হইয়াছে। ডাক্তার দেখাইয়াছি। তাহার অভিমত অতি সত্ত্বর ঢাকা নিয়া চিকিৎসা না করাইলে চক্ষু নষ্ট হইবে। এখন তোমার বিবেচনা।

তুমি সংসারের হল অবস্থা জানা। জানিবার পরও তোমার কোনো পরিবর্তন নাই। ইহাতে আমি এবং তোমার বাবা দু’জনই মর্মাহত। গত মাসে মাত্ৰ পাঁচ শ টাকা পাঠাইয়াছ। অথচ তুমি জানা জোছনার সন্তান হইবে। সে এই কারণে বাবা-মা’র কাছে আসিয়াছে। আমি কোন মুখে জামাইয়ের নিকট হাত পাতিয়া আমার মেয়ের সন্তান প্রসবের খরচ নেই?

তোমার কারণে জামাইয়ের কাছে মাথা হেঁট হইয়াছে। যাহা হউক শুনিয়া খুশি হইবে জোছনার পুত্ৰ সন্তান হইয়াছে। জামাই অত্যন্ত খুশি হইয়াছে। নাতির মুখ দেখিয়া আমি কিছু দিতে পারি নাই। এই লজ্জা রাখবার আমার জায়গা নাই। তুমি অতি অবশ্যই একটি সোনার চেইন খরিদ করিয়া পঠাইবার ব্যবস্থা করিবে।

আল্লাহপাকের দরবারে সর্বদাই তোমার মঙ্গল কামনা করি।

দোয়াগো–

তোমার মা।

মবিন রাত আটটা পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় হাঁটল। তারপর রওনা হলো মিতুদের বাড়ির দিকে।তার মন বেশি রকম খারাপ হয়েছে। মিতুকে না দেখলে মন ভালো হবে না।মিতু বাসায় ছিল না।

ঝুমুর হাসিমুখে বলল, আপা রাতে ফিরবে না। আপার সঙ্গে দেখা করতে হলে সারারাত থাকতে হবে। আপা ভোর রাতের দিকে চলে আসবে। ভালোই হয়েছে, আসুন আমরা সারারাত গল্প করে কাটিয়ে দেই। আপনার কি শরীর টরীর খারাপ করেছে মবিন ভাই? কী অদ্ভুত দেখাচ্ছে! চা খাওয়াতে পারবে?

অবশ্যই পারব। চিনি এবং চা পাতা ছাড়া চা বানাতে হবে। দু’টাই নাই।তুমি পানি গরম করতে দাও, আমি নিয়ে আসছি।আপনি কি জানেন মবিন ভাই দুদিন আগে যে রাতদুপুরে আপনার খোঁজে গিয়েছিলাম?

জানি না তো।তা জানবেন কেন? আপনি কি আমাদের খোঁজ নেন? খোঁজ নেন না। আমরাই যখন তখন আপনার কাছে ছুটে যাই। মা’র শরীর হঠাৎ খুব খারাপ করেছিল। তখন আপনাকে আনতে গিয়েছিলাম।কী হয়েছিল?

সে এক লম্বা গল্প, আপনার শুনতে অনেক সময় লাগবে। চা পাতা আর চিনি নিয়ে আসুন, তারপর আপনাকে বলব। আপনার রাতের খাওয়া কি হয়ে গেছে মবিন ভাই? না।খুব ভালো হয়েছে, রাতে আমার সঙ্গে খাবেন। আমি আপনাকে রান্না করে খাওয়াব। ঘরে অবশ্য রান্নারও কিছু নেই। আপনাকে ডিমও কিনে আনতে হবে।আর কিছু লাগবে?

না। আর কিছু লাগবে না। আপনি কিন্তু বেশি দেরি করতে পারবেন না–যাবেন আর আসবেন।আচ্ছা।চলুন রাস্তা পর্যন্ত আপনাকে এগিয়ে দিই। আপনাকে একটা গোপন খবর বলি মবিন ভাই। কাউকে কিন্তু বলবেন না। আপা যদি জানে তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।খবরটা কী? গতকাল থেকে আমাদের টেস্ট পরীক্ষা হচ্ছে। আমি পরীক্ষা দিচ্ছি না। পরীক্ষা দিয়ে তো গোল্লাই খাব। কী দরকার সেধে গোল্লা খাবার?

ঝুমুর খিলখিল করে হাসছে। ঝুমুরের হাসিও মিতুর মতো। হাসলে ঝনঝন শব্দ হয়। মবিনের হাসি শুনতে ভালো লাগছে।জয়দেবপুর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে মোবারক সাহেবের একটা কুঁড়েঘর আছে। লোকে বাসাবাড়ি তৈরি করে; তিনি কুঁড়েঘর বানিয়েছেন।

আক্ষরিক অর্থেই কুঁড়েঘর। তিনি একর জমি নিয়ে ছোট্ট মাটির ঘর। খড়ের ছাদ।আধুনিক কুঁড়েঘরের এক ফ্যাশন ইদানীং চালু হয়েছে। মাটির দেয়াল, খড়ের ছাদের ভেতর থাকে কার্পেট। এয়ারকুলার বিজবিজ করে চলে। বাথরুম হয় মার্বেল পাথরের। কুঁড়ে ঘর নিয়ে এক ধরনের রসিকতা।

মোবারক সাহেব তা করেন নি। তার ঘরে বড় একটা চৌকি পাতা। চৌকির উপর হোগলার পাটি–মাথার নিচে দেয়ার জন্যে শক্ত বালিশ। এ বাড়িতে কোনো টেলিফোন নেই। তিনি ইলেকট্রসিটিও আনেন নি। সন্ধ্যার পর হারিকেন জ্বলে।দর্শনীয় কোনো বাগানও করা হয় নি। কেনার সময় গাছগাছড়া যা ছিল এখনো তাই আছে। তিনি শুধু তাঁর জমিটা কংক্রিটের পিলার এবং শক্ত কাটা তারের বেড়া দিয়ে আলাদা করেছেন। বাড়ির গেটে পাহারাদার আছে।

বছরে দু’একবার শুধু রাত কাটাতে আসেন। রাত নটা-দশটার দিকে এসে ভোরবেলা চলে যান। একাই আসেন। পাহারাদার দু’জন গেটে তালা দিয়ে চলে যায়।আজ একা আসেন নি। মিতুকে সঙ্গে এনেছেন। পাজেরো জিপ তাদের নামিয়ে চলে গেছে। মোবারক সাহেব গেটের দারোয়ান দু’জনকেও চলে যেতে বলেছেন।

তারা এখনো যায় নি। মোবারক সাহেবের মালপত্র ঘরে ঢুকিয়ে গেটে তালা দিয়ে তারা যাবে। রাতটা থাকবে জয়দেবপুরে। ভোরবেলা এসে গেটের তালা খুলবে।মিতু হকচাকিয়ে গেছে। তার চারদিকে ঘোর অন্ধকার। জোনাকি পোকা জ্বলছে-নিভছে। আলো বলতে জোনাকি পোকার আলো।মোবারক সাহেব হালকা গলায় বললেন, ভয় লাগছে? মিতু বলল, না। ভয় লাগার কিছু আছে কি?

সাপ আছে। বর্ষাকাল তো–খুব সাপের উপদ্ৰব।মোবারক সাহেবের হাতে ছোট একটা পেনসিল টর্চ। টর্চ ছোট হলেও আলো তীব্ৰ। তিনি আলো ফেললেন। ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে রাস্তা। জায়গায় জায়গায় পানি জমে আছে। সেখানে ইট বিছানো। মোবারক সাহেব টর্চ নিভিয়ে ফেললেন–ঘন অন্ধকারে চারদিক ঢেকে গেল।দারোয়ান দু’জন জিসিনপত্র রেখে চলে এসেছে। কুঁড়েঘরে আলো জ্বেলে এসেছে। জানালা দিয়ে ক্ষীণ আলোর রেশ দেখা যাচ্ছে।

মোবারক সাহেব টৰ্চটা মিতুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, তুমি চলে যাও। আমি ওদের বিদেয় করে আসছি। মোবারক সাহেব ভেবেছিলেন মিতু বলবে–আমার একা যেতে ভয় লাগছে। আমি অপেক্ষা করি। দু’জন একসঙ্গে যাব। মিতু তেমন কিছু বলল না। টর্চ হাতে এগিয়ে গেল।

তিনি দারোয়ানদের বিদেয় করলেন। গোটে তালা দিয়ে চাবি নিজের কাছে নিয়ে নিলেন। পকেটে হাত দিয়ে দেখলেন সিগারেট আছে কিনা। সিগারেট আছে। কয়েকদিন হলো সিগারেট বেশি খাওয়া হচ্ছে। তিনি একটা সিগারেট ধরালেন। আকাশ মেঘলা বলে তারার আলো নেই। চাঁদ উঠবে রাত তিনটার দিকে। কাজেই রাত তিনটা পর্যন্ত এমন ঘন অন্ধকার থাকবে। ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে না। এই অঞ্চলের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক বিখ্যাত। এরা ডাকা বন্ধ করেছে এর অর্থ হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি শুরু হবে।

বৃষ্টি শুরুর আগে আগে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাক বন্ধ করে দেয়। জোনাকি পোকারাও তাদের আলো নিভিয়ে ফেলে। জোনাকি পোকারা অবশ্যি তাদের আলো এখনো নিভায় নি। কাজেই বৃষ্টি শুরু হতে একটু দেরি আছে। এইসব তথ্য তিনি তাঁর কুঁড়েঘরে রাত্রি যাপন করে শিখেছেন।তাঁর শেখার ক্ষমতা ভালো। তিনি দ্রুত শিখতে পারেন। তার পর্যবেক্ষণ শক্তিও ভালো। লেখালেখির ক্ষমতা থাকলে তিনি ভালো লেখক হতে পারতেন।

সিগারেট শেষ হয়ে গেছে। তবু তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়েটি ঘরের ভেতর কী করছে কে জানে। তার কি উচিত না উদ্বিগ্ন হয়ে একবার বারান্দায় এসে দাঁড়ানো? মেয়েটি তাঁকে পছন্দ করছে না। কিন্তু একদিন করবে। অবশ্যই করবে। মেয়েটির শরীর তিনি কিনে নিয়েছেন। আত্মা শরীরেই বাস করে। একদিন সেই আত্মাও তিনি কিনতে পারবেন। বেঁচে থাকার জন্যে একটি শুদ্ধ ও সুন্দর আত্মার তাঁর খুব প্রয়োজন।

তিনি আকাশের দিকে তাকালেন–তারা দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি নামবে। আজ রাতে কোনো এক সময় ঘনবর্ষণ হবে। ঠিক কখন হবে তা বলা যাচ্ছে না। মানুষকে সেই ক্ষমতা দেয়া হয় নি। সেই ক্ষমতা দেয়া হয়েছে মানুষের চেয়ে অনেক নিম্নশ্রেণীর পশুপাখিকে, কীটপতঙ্গকে। গাছদের কি দেয়া হয়েছে? অবশ্যই দেয়া হয়েছে। তার ধারণা, প্রতিটি গাছ জানে কখন বৃষ্টি হবে। তাঁর এই বাগানবাড়ির প্রতিটি গাছ অপেক্ষা করছে…।

সরসর শব্দ করে তাঁর ডান দিকের ঝোপে কী যেন চলে গেল। সাপ হতে পারে। বৃষ্টির আগে আগে তারা জায়গা বদল করে নিচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে যখন সাপের গর্ত ভর্তি হয়ে যায় তখন তারা কী করে? তারা নিশ্চয়ই বৃষ্টির পানিতে ডুবে বসে থাকে না? মোবারক সাহেব ঘরের দিকে এগোলেন। টর্চলাইটটা হাতে থাকলে হতো। অন্ধকারে কোথায় পা ফেলতে কোথায় ফেলছেন কে জানে। এক জায়গায় পানি জমে ছিল। তিনি পানিতে পা ফেলে পায়ের পাতা ভিজিয়ে ফেললেন।

কুঁড়েঘরের বারান্দায় বড়ো বালতি ভর্তি পানি। পানির উপর মগ ভাসছে। একপাশে সাবানদানিতে সাবান। তিনি উঠানে উঠে সহজ স্বরে ডাকলেন, মিতু হারিকেন নিয়ে এস তো।মিতু হারিকেন হাতে পাশে এসে দাঁড়াল।মগে করে আমার পায়ে পানি ঢাল। কাঁদায় পা দিয়ে ফেলেছি।মিতু পানি ঢালছে। মোবারক সাহেব বললেন, আমার বাগানবাড়ি পছন্দ হয়েছে?হয়েছে।মনে হচ্ছে না জায়গাটা পৃথিবীর বাইরে?

মিতু জবাব দিল না। মোবারক সাহেব বললেন, আমার মাঝে মাঝে একা থাকতে ইচ্ছা করে, তখন এখানে আসি।আজ তো একা আসেন নি।না, আজ অবশ্যি একা আসি নি। এখানে এক রাত্রি যাপন করতে কেমন লাগে তা আমি জানি। দুজনে কেমন লাগে তা জানি না। এই জন্যেই তোমাকে নিয়ে এসেছি। দু’জনে মিলে অন্ধকার দেখব, ইন্টারেস্টিং সব গল্প করব। আমি অসংখ্য অদ্ভুত গল্প জানি। সবচে’ বেশি জানি ভূতের গল্প। ভূতের গল্প তোমার কেমন লাগে?

ভালো লাগে।মোবারক সাহেবের হাত-মুখ ধোয়া শেষ হয়েছে। তিনি কিছু বলার আগেই মিতু ঘরের ভেতর চলে গেল। তোয়ালে এনে হাতে দিল। তিনি তোয়ালে দিয়ে হাত-পা মুছলেন।বারান্দায় কিছুক্ষণ বসা যাক কী বল মিতু।আপনি যা বলবেন তাই হবে। কোথায় বসব? চেয়ার তো নেই।ঘরের ভেতর মাদুর আছে। তুমি খুঁজে পাবে না, আমি নিয়ে আসছি।

মোবারক সাহেব নিজেই মাদুর এনে বিছিয়ে দিলেন। শান্ত স্বরে বললেন, পুরোপুরি অন্ধকার হলে ভালো লাগত। কিন্তু আলো কিছু রাখতেই হবে–নয়তো সাপ উঠে আসবে। একবার কী হয়েছে শোন–একা একা বারান্দায় বসে আছি। চারদিক অন্ধকার, ঘরের বাতিও নেভানো। পা মেলে বসে অন্ধকার দেখছি। হঠাৎ ভারি কী যেন পায়ের উপর উঠে গেল। পায়ে যে সাপ উঠে গেছে সেটা বুঝতে বুঝতে সাপ নেমে গেল। কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার, কিন্তু মনে হয় অনন্তকাল। তুমি বোস, দাঁড়িয়ে আছ কেন?

মিতু বসল। মোবারক সাহেব বললেন, আরাম করে বোস।আমি আরাম করেই বসেছি।তুমি গান জান? জ্বি না।ভালো টিচার রেখে গান শেখার ব্যবস্থা করে দেব। তোমার গলা ভালো। গান ভালোই গাইবে। তাছাড়া নাচ-গান এইসব ভালোমতো জানা তোমার নিজের স্বার্থেই দরকার। ছবির জগতের প্রধান নায়িকা নাচ-গান না জানলে চলে? আমি যে একটা ছবি বানাচ্ছি সেটা কি তুমি জান? জ্বি শুনেছি।সেই ছবির তুমিই প্রধান নায়িকা এটা শুনেছ? আঁচ করতে পারছি।তোমার ভালো লাগছে না?

চারদিকের বিপুল গাঢ় অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মিতু বলল, ভালো লাগছে। খুব ভালো লাগছে।, প্রায় এক ঘণ্টার মতো হলো মবিন এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে আছে। চিঠি যখন পড়েছে তখন ঘরে দিনের আলো ছিল। এখন অন্ধকার। মবিন আলো জ্বলে নি। অন্ধকার ঘরেই বসে আছে। তার চারদিকে পিনপিন করছে মশা। মশা তাড়াবার স্বাভাবিক ইচ্ছাটাও হচ্ছে না।

অবিশ্বাস্য এবং অকল্পনীয় একটা ব্যাপার ঘটে গেছে। সিলেটের চা বাগানের এক ব্রিটিশ মালিক খোদ ইংল্যান্ড থেকে জানাচ্ছেন–তাকে লাক্কা টি গার্ডেনের ম্যানেজারের নিয়োগপত্র দেয়া হচ্ছে। এক বছরের ট্রেনিং পিরিয়ডের পর চাকরি স্থায়ী হবে। ট্রেনিং পর্ব দুভাগে বিভক্ত। প্রথম চার মাস ট্রেনিং হবে শ্ৰীলঙ্কার ‘ইয়ালো বিং টি গার্ডেন’। পরের আট মাস ইংল্যাণ্ডে।

ট্রেনিং পিরিয়ডের ভাতা উল্লেখ করা আছে। অঙ্কটা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। পোশাক পরিচ্ছদ এবং প্যাসেজ মানির জন্যে চেস ম্যানহাটন ব্যাংকের ইসু্য করা একটি ব্যাংক ড্রাফট চিঠির সঙ্গে আছে। পাউন্ড স্টারলিঙে যে অঙ্ক সেখানে বসানো তা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।

চা বাগানের চাকরির চেষ্টা সে করেছিল। ইন্টারভ্যু দিতে চিটাগাং পর্যন্ত গিয়েছিল। যাওয়া-আসার ভাড়া মিতু দিয়েছিল। সেই চাকুরি ছোট একটা চাকুরি। অন্য চা বাগান। এই যোগাযোগ কী করে হলো মবিন বুঝতে পারছে না। ইন্টারভ্যু বোর্ডের কেউ কি তার জন্যে সুপারিশ করেছেন? রহস্যটা কি?

মবিনের হতভম্ব ভাব কিছুতেই কাটছে না। চেস ম্যানহাটন ব্যাংকের ড্রাফটটা সঙ্গে না থাকলে ভাবত কেউ রসিকতা করছে। মানুষ নির্মম রসিকতা মাঝে মধ্যে করে।এখন সে কী করবে? আনন্দ প্রকাশের জন্যে কিছু একটা করা উচিত। কাকে খবরটা প্রথম দেয়া যায়? মিতুকে তো বটেই। যদিও তার ইচ্ছা হচ্ছে একটা মাইক ভাড়া করে গাজীপুর শহরে রিকশায় ঘুরে ঘুরে খবরটা বলে বেড়ায়।এ রকম একটা খবর মিতুকে খালি হাতে জানানো যাবে না। এক লাখ গোলাপ কিনতে পারলে এক লাখ গোলাপ নিয়ে মিতুর কাছে যাওয়া যেত। কত দাম এক লাখ গোলাপের?

মিতু খবরটা শুনে কী করবে? কী করবে। মবিন আন্দাজ করতে পারে। চট করে উঠে দাঁড়াবে, তারপর ছুটে সামনে থেকে চলে যাবে। কাঁদার জন্যে যাবে। মিতু তার সামনে কাঁদতে পারে না। অনেকক্ষণ পর সে ফিরে আসবে। খুব স্বাভাবিক আচরণ করার চেষ্টা করবে। কিন্তু স্বাভাবিক হতে পারবে না। মিতুর ধারণা অভিনেত্রী হিসেবে সে খুব বড়ো। আসলে বড়ো না। আসলে সে কাঁচা অভিনেত্রী। আবেগ লুকাতে পারে না।

না মিতুকে খবরটা এভাবে দেয়া যাবে না। মজা করে দিতে হবে। মুখ শুকনো করে তার কাছে যেতে হবে। বেশ রাত করে। মিতু উদ্বিগ্ন হয়ে বলবে, কী ব্যাপার এত রাতে? তখন সে বলবে, ঘরে কোনো খাবার আছে মিতু? সারাদিন খাই নি। হাত একেবারে খালি। লজ্জায় আসতেও পারছিলাম না। এটা শুনে মিতুর মুখ ছাইবৰ্ণ হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখে পানি এসে যাবে এবং সে দৌড়ে সামনে থেকে চলে যাবে। আধঘণ্টা পর এসে বলবে, এস খেতে এস। এমনভাবে বলবে যেন কিছুই হয় নি।

মা’কে একটা চিঠি লিখতে হবে। আজ রাতেই চিঠি লিখতে হবে।

মা,

আমার সালাম নিও।

তোমার চিঠি পেয়েছি। নানান ঝামেলায় ব্যস্ত ছিলাম বলে। উত্তর দিতে দেরি হলো। জোছনার ছেলে হয়েছে শুনে খুব খুশি হয়েছি। ওকে আমার অভিনন্দন

দিও। বাবার চোখের খবর শুনে উদ্বিগ্ন বোধ করছি। আমার উচিত নিজে গিয়ে বাবাকে নিয়ে আসা। সেটা সম্ভব হচ্ছে না। চা বাগানের ম্যানেজারের একটি চাকরি পেয়েছি। প্রাথমিক ট্রেনিঙে আমাকে শ্ৰীলঙ্কা এবং পরে ইংল্যান্ডে যেতে হবে। ভিসা এবং অন্যান্য ব্যাপারে খুব ব্যস্ততা যাচ্ছে। যাই হোক, আমি টাকা পাঠাচ্ছি। তুমি বাবাকে নিয়ে চলে এস, আমি এখানে ভালো একটা হোটেল ব্যবস্থা করে রাখব। তোমরা ঢাকায় আসার পর বাবাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটির কাজগুলো মিতু করবে। মিতু হচ্ছে রফিকের বোন। ঐ যে একবার রফিককে নিয়ে এসেছিলাম। বাঁশি বাজিয়ে যে সবাইকে হতভম্ব করে দিয়েছিল।

মিতু খুবই চালাকচাতুর মেয়ে। সে তোমাদের কোনো অসুবিধাই হতে দেবে না। আমি যখন দেশের বাইরে থাকব। তখনো সে-ই তোমাদের দেখাশোনা এবং খোঁজখবর করবে।তোমরা কবে নাগাদ আসবে। আমাকে টেলিগ্ৰাম করে জানিও। ভালো কথা, জোছনার ছেলের জন্যে সোনার চেইন, জোছনার জন্যে ভালো একটা শাড়ি কেনার জন্যে আলাদা করে টাকা পাঠালাম। তোমরা ভালো থেক। বাবাকে আমার সালাম দিও… ঘর অন্ধকার করে বসে আছ কেন?

মবিন দারুণ চমকে উঠল। মিতু দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। মনে হয় অনেকক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে আছে। মবিন উঠল। বাতি জ্বালাল। অদ্ভুত গলায় বলল, ভেতরে এস মিতু।মিতু ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, অন্ধকারে মূর্তির মতো বসে কী করছিলে? চিঠি লিখছিলাম?

চিঠি লিখছিলে মানে?মনে মনে লিখছিলাম। মনে মনে চিঠি লিখতে কাগজ, কলম, আলো কিছুই লাগে না। মনে মনে লেখা চিঠিতে কোনো বানান ভুলও হয় না।কী হয়েছে তোমার বল তো? অদ্ভুত একটা চিঠি পেয়েছি। চিঠিটা রেজিস্ট্রি ডাকে ইংল্যান্ড থেকে এসেছে।খারাপ কিছু?

ভয়ঙ্কর খারাপ। নাও পড়। মিতু চিঠি পড়ছে। মনিব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মিতুর দিকে। সে যা ভেবেছে তাই। মিতুর চোখে পানি এসে গেছে। সে আঁচল দিয়ে চোখ মুছল। ধরা গলায় বলল, দশ হাজার পাউন্ড স্ট্যার্লিং মানে কত টাকা?

ষাট দিয়ে গুণ দাও। গুণ দিলেই বেরিয়ে পড়বে।তোমার হাতে তো একদম সময় নেই।মবিন উদ্বিগ্ন গলায় বলল, ছোটাছুটি করতে করতে জান বের হয়ে যাবে। শোন তোমাকে আগেভাগে বলে রাখছি, যাবতীয় ছোটাছুটিতে তুমি আমার সঙ্গে থাকবে। সিনেমা টিনেমা বাদ দাও। তুমি অনেক কষ্ট করেছ। আর কষ্ট করতে হবে না।আর কষ্ট করতে হবে না? অবশ্যই না। আজ এই মুহুর্ত থেকে তোমার যাবতীয় কষ্টের অবসান হলো, ঝুমুরকে নিয়ে বা তোমার মা’কে নিয়েও তোমার চিন্তা করতে হবে না।সব চিন্তা তোমার?

অবশ্যই। বিয়ের ব্যাপারটা এক সপ্তাহের মধ্যে সেরে ফেলব। বাবা চোখ দেখানোর জন্যে ঢাকা আসবেন, মাও আসবেন। ঝুমুর আছে, তোমার মা আছেন–আমরা আমরাই, বাইরের কাউকে বলার কোনো দরকার নেই। বাইরের কেউ তো নেইও। তুমি যদি তোমার ফিল্ম লাইনের কাউকে বলতে চাও বলবে।টেপীকে বলব?

মিতু এমনভাবে প্রশ্ন করল যে মবিন চমকে তাকাল। তাকিয়েই রইল। মিতু হাসল। সহজভাবেই হাসল। সেই হাসিতেও কিছু একটা ছিল। মবিন চোখ ফেরাতে পারল না। মিতু বলল, তোমার জন্যে সিগারেট এনেছি। নাও।

মবিন হাত বাড়িয়ে সিগারেট নিতে নিতে অস্পষ্ট গলায় বলল, মিতু তুমি হঠাৎ করে টেপীর কথা তুললে কেন?মিতু শান্ত স্বরে বলল, তোমার এত বুদ্ধি। তারপরেও একটা সাধারণ ব্যাপার ধরতে তোমার এত সময় লাগল কেন?মবিন সিগারেট ধরাল। তার হাত কাঁপছে। তার চোখ-মুখ ফ্যাকাসে। মিতু বলল, আমার ধারণা টেপীকে তুমি অনেক আগেই ধরেছ। তারপরেও না ধরার ভান করে গেছ। নিজের সঙ্গে ভান। নিজেকে প্রতারণা। তাই না?

মবিন কিছু বলল না।মিতু বলল, এখন বল। আমার দিকে তাকিয়ে বল, এখন কি তুমি আমাকে বিয়ে করতে পারবে? পারব।সত্যি পারবে? অবশ্যই পারব।মিতু ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমারও মনে হয় তুমি পারবে। কিন্তু বিয়েটা ভালো হবে না। যতবারই আমাকে জড়িয়ে ধরবে ততবারই মনে হবে–আরো অনেকে এই ভঙ্গিতেই আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। মনে পড়বে না?

না।ছেলেমানুষের মতো কথা বলবে না তো মবিন ভাই। তুমি ছেলেমানুষ না। তুমি এখন চোখ-কান বন্ধ করে আমাকে বিয়ে করবে। তার পেছনে ভালোবাসা অবশ্যই আছে। সেই সঙ্গে কৃতজ্ঞতাবোধও আছে। আমি তোমার দুঃসময়ে তোমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছি। সেই কৃতজ্ঞতাবোধ। ঠিক কিনা বল?

মবিন চুপ করে রইল। তার হাতের সিগারেট নিভে গেল। মিতু হালকা গলায় বলল, দু’জনের জীবন নষ্ট করে তো লাভ নেই। একজনেরটাই নষ্ট হোক। একজন টিকে থাক। তুমি খুব ভালো দেখে একটা মেয়েকে বিয়ে কর। তুমি সুখে আছ, আনন্দে আছ–এই দৃশ্য দূর থেকে দেখলেও আমার ভালো লাগবে। একদিন হয়তো তোমার চা বাগানে বেড়াতে যাব। তোমার বাংলোতে বসে তোমার সঙ্গে এককাপ চা খাব। তোমার স্ত্রী, তোমার ছেলেমেয়ের সঙ্গে ছবি তুলব। সেই আনন্দও কম কি?

মিতুর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। সে বলল, মবিন ভাই তোমার কাছে রুমাল আছে, দাও রুমাল দিয়ে আমার চোখ মুছিয়ে দাও। আমি এখন চলে যাব।মবিন সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। হালকা পায়ে নেমে যাচ্ছে মিতু। সে মাথার উপর শাড়ির আঁচল টেনে দিয়েছে। তাকে কেমন বউ বউ লাগছে। চারদিকের বিপুল অন্ধকারে মিশে যাবার জন্যে নেমে যাচ্ছে অপূর্ব একটি মেয়ে। তাকে কি এইভাবে নেমে যেতে দেয়া উচিত?

মবিন কঠিন গলায় ডাকল, মিতু দাড়াও। কোথায় যাচ্ছ তুমি? উঠে এস। উঠে এস বললাম।মবিন এখন পর্যন্ত কোনোদিন মিতুর হাত ধরে নি। তার খুব লজ্জা লাগে। এই প্রথম লজ্জা ভেঙে সে মিতুর হাত ধরল। আহ্‌ কী কোমল সেই হাত!

                          (সমাপ্ত)

 

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

পেন্সিলে আঁকা পরী পর্ব:১২ হুমায়ূন আহমেদ

ঝুমুর দোকানে ঢুকেছে। দোকানে লোকটা একা না। আট-দশ বছরের একটা ছেলেও আছে। সে শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে। লোকটা একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলল, বসেন।ঝুমুর বসল। না বসে সে কী আর করবে। লোকটা এখন কী করবে ঝুমুর জানে। কোনো একটা অজুহাতে ছেলেটাকে বাইরে পাঠিয়ে দেবে। তারপর দরজা বন্ধ করে দেবে।মবিন সাহেব বাসাতেই থাকে। আজ যেন কোথায় গেছে। এসে পড়বে।

ঝুমুরকে উদ্দেশ করে কথাগুলো বলা। পরিস্থিতি শুরুতে একটু স্বাভাবিক করা।চা খাবেন? ঝুমুর হ্যাঁ না কিছু বলল না। লোকটা পকেট থেকে পাঁচ টাকার একটা নোট বের করে বলল, ইসমাইল দৌড় দে।ঝুমুর যা ভেবেছে তাই–ছেলেটাকে সরিয়ে দিচ্ছে। তার ইচ্ছা করল চিৎকার করে বলে খবরদার তুই যাবি না, তুই বসে থাক।ছেলেটা ছোট একটা কেতলি হাতে উল্কার মতো বের হয়ে গেল। মনে হয় চা-আনার কাজ তার খুব পছন্দ।

মাথাটা মুছে ফেলেন।লোকটা একটা তোয়ালে ঝুমুরের দিকে বাড়িয়ে ধরেছে। ঝুমুর বলল, মাথা মুছতে হবে না। লোকটা তোয়ালে রেখে দিয়ে সহজ গলায় বলল, ভয় পাবেন না। ভয় পাওয়ার কিছু নাই। মবিন সাহেব আসতে দেরি করলে আমি আপনাকে বাসায় দিয়া আসব।

ঝুমুর যা ভেবেছে তা হচ্ছে না। ছেলেটা চলে যাবার পরও লোকটা দরজা বন্ধ করছে না। বরং ছেলেটার ফেলে যাওয়া শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে। শার্টের বোতাম লাগানোর কাজগুলো সাধারণত মেয়েরা করে। ছেলেদের এই কাজ করতে দেখলে একটু অস্বস্তি লাগে।এই দোকানটা কি আপনার? না, আমি একজন কর্মচারী।আপনার বাসা কোথায়? বাস-টাসা নাই।রাতে থাকেন কোথায়?

দোকানেই থাকি।হোটেলে খাই।ঝুমুর খুব অবাক হচ্ছে। কারণ সে লোকটার সঙ্গে কথা বলছে। আগ্রহ করে কথা বলছে। অবশ্য কথা না বলেই বা কী করবে? দু’জন মানুষ তো চুপচাপ বসে থাকতে পারে না। তাছাড়া মানুষটাকে তার এখন খুব ভদ্র, খুব বিনয়ী মনে হচ্ছে। ছোট কাজ যারা করে তারাও ভদ্র হতে পারে, বিনয়ী হতে পারে।ছেলেটা চা নিয়ে এসেছে। তিনটা কাপ বের করল। ছোট ছোট কাপ। কাপের সাইজ যে এত ছোট হতে পারে ঝুমুরের ধারণা ছিল না।

তারা তিনজনই চুকচুক করে চা খাচ্ছে। সবচে’ বেশি মজা করে চা খাচ্ছে ছোট ছেলেটা। প্রতিবারই চুমুক দিয়ে আহ্‌ করে উঠছে। বাইরে বৃষ্টির তোড় আরো বেড়েছে। ছোট ছেলেটা দীত বের করে বলল, শহীদ ভাই তুফান আইতাছে। যেন তুফান আসা খুব আনন্দের ব্যাপার। ঝুমুর বলল, আমার মার খুব শরীর খারাপ। এই জন্যে মবিন ভাইকে নিতে এসেছি।কী হয়েছে? অজ্ঞান হয়ে গেছে।জ্ঞান ফেরো নাই? আমি যখন আসি তখনো ফেরে নাই।বলেন কী?

ঝুমুরেরও মনে হলো আরো তাই তো! এতক্ষণে একবারও তার মা’র কথা মনে হয়। নি। সে বেশ আরাম করে চা খাচ্ছে। মা কেমন আছে কে জানে। মারা যায় নি তো? ঝুমুর উঠে দাঁড়াল। ক্ষীণস্বলে বলল, আমি চলে যাব।শহীদ নামের লোকটা বলল, চলুন আমি সঙ্গে যাই।ঝুমুর কোনো আপত্তি করল না। লোকটাকে তার ভালো লাগছে। বেশ ভালো লাগছে।

শহীদ ঝুমুরকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েই ডাক্তার আনতে গেল। এবং মুহুর্তের মধ্যে ডাক্তার নিয়ে এল। ডাক্তার ব্লাডপ্রেসার মাপলেন। প্রেসার কমাবার ওষুধ দিলেন। শহীদ ওষুধ আনতে গেল। ছাতা নেই, ভিজতে ভিজতে গেল।মিতু বলল, লোকটা কে রে? ঝুমুর বলল, আমার চেনা একজন।চেনা মানে কি? কীভাবে চিনিস? পরিচয় হয়েছে কোথায়?

ঝুমুর জবাব দিল না।মিতু চিন্তিত গলায় বলল, কত দিনের পরিচয়? ঝুমুর বলল, অনেক দিনের।অনেক দিনের মানে কি? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। ও কি প্রায়ই আসে। নাকি? কথা বলছিস না কেন? কী করে? শার্টের বোতাম লাগায়।তুই কি আমার সঙ্গে ফাজলামি করছিস? ফাজলামি করছি না, যা সত্যি তাই বলছি।বান্দরের মতো দেখতে একটা লোক, তার সঙ্গে তোর এত খাতির কীভাবে হলো?তুমি এত রাগছ কেন আপা? না। আমাকে বল এত খাতির কীভাবে হলো?

তোমার হৈচৈ শুনে মা জেগে যাবে আপা।মিতু বিস্ময় নিয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে আছে। ঝুমুর বলল, আপা উনি ওষুধ নিয়ে আসার পর উনাকে রাতে খেয়ে যেতে বলি? বেচারা হোটেলে খায়। হোটেলের কুৎসিত খাবার খেয়ে খেয়ে শরীরের কী হাল করেছে দেখেছ?

তুই খুবই আশ্চর্য একটা মেয়ে রে ঝুমুর।রাতদুপুরে মবিন ভাই যদি এরকম ছোটাছুটি করত তুমি কি তাকে না খাইয়ে বিদেয় দিতে? মবিন ভাই আর সে এক হলো? এক ভাবলেই এক।মিতু তীব্ৰদূষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ঝুমুর সেই তীব্ৰদৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বলল, চারটা চাল বসিয়ে দেব আপা? যা ইচ্ছা কর।বেগুন আছে। বেগুন ভেজে ফেলি? যা ভাজতে ইচ্ছে করে সব ভেজে ফেল।মিতু অবাক হয়ে দেখল ঝুমুর সত্যি সত্যি রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে। মেয়েটা কি পাগল হয়ে গেল?

শহীদ খাবারের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল। ঝুমুর বলল, না না করলে হবে না, আপনাকে খেয়ে যেতে হবে। গামছাটা দিয়ে ভালোমতো মাথা মুছে ফেলুন।আমি খাব না। অন্য কোনো দিন এসে… আপনাকে খেয়ে যেতে হবে। না খেয়ে আপনি যেতে পারবেন না।শহীদ অস্বস্তিতে মরে যাচ্ছে। মেয়েটার কাণ্ডকারখানা সে কিছুই বুঝতে পারছে না। মেয়েটা কি পাগল টাইপের? ঝুমুর বলল, খাবার কিছু নেই–বেগুন ভাজা, ডাল আর আলু ভর্তা। আপনার কষ্ট হবে।মিতু বলল, উনি খেতে চাচ্ছেন না, তুই এত জোর করছিস কেন?

এত রাতে উনি হোটেলেও কিছু পাবেন না, না খেয়ে থাকবেন নাকি? শহীদ শরমে মরে গিয়ে মিতুর দিকে তাকাল।মিতু বলল, আপনি খেয়ে যান। ঝুমুর চট করে খাবার দিয়ে দে।মিতু মা’র ঘরে বসে আছে। দরজা খোলা। খোলা দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে–মাথা নিচু করে মানুষটা খাচ্ছে। তার সামনে ঝুমুর বসে আছে। সে খাবার তুলে দিচ্ছে। কী যেন আবার নিচু গলায় বলছে। কী বলছে? বলুক যা ইচ্ছা।শাহেদার ঘুম ভেঙেছে। শাহেদা বললেন, ছেলেটা কে রে?

মিতু বলল, আমি জানি না মা।শাহেদা বললেন, যার ইচ্ছা আসছে, খেয়ে যাচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারছি না মা, কিছুই বুঝতে পারছি না।তুমি চিন্তা কোরো না মা। আমার মনে হয় না চিন্তার কিছু। তুমি ঘুমিয়ে থাক।শাহেদা চুপ করে গেলেন। তাঁর চোখ বন্ধ। বন্ধ চোখের কোণা বেয়ে পানি পড়ছে। ঘরে আলো নেই বলে মিতু তা দেখতে পাচ্ছে না।ঝুমুর চাদরে সারা শরীর ঢেকে শুয়ে আছে। মাথাও চাদরের নিচে ঢুকানো। আজ সে একা ঘুমুবে। মিতু ঘুমুবে মা’র সঙ্গে। ঘুমুতে যাবার আগে সে বোনের ঘরে ঢুকল। বিছানায় বসতে বসতে বলল, ঘুমুচ্ছিস নাকি ঝুমুর?

ঝুমুর জবাব দিল না। মিতু বলল, তুই জেগে আছিস আমি জানি। মুখ থেকে চাদর সরা।ঝুমুর চাদর সরাল। মিতু বলল, ছেলেটা কে? জানি না।জানি না মানে? ওর নাম কি? শহীদ।তোর সঙ্গে কত দিনের পরিচয়? আজই পরিচয় হয়েছে।সে কী! মবিন ভাইয়ের বাসার নিচে দরজির দোকানে কাজ করে। আমাকে তাদের ঘরে নিয়ে গেল। চা খাওয়াল।আর তুই তাকে এরকম খাতির-যত্ন করে দিলি। না জানি সে কী ভাবছে?

ঝুমুর লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসছে। হঠাৎ হাসি থামিয়ে সে বলল, পরশুদিন সকালে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে আপা।পরশুদিন আসুক। তখন দেখা যাবে।তুমি তো আজকের কাণ্ড দেখ নি–আজকের কান্ত দেখলে তোমার আক্কেলগুডুম হয়ে যেত।তোর কাণ্ড দেখে আমার আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেছে।ঝুমুর মাথা নিচু করে খুব হাসছে। হাসি দেখে মিতুর বড় মায়া লাগল। হঠাৎ সে বলল, আয় তো ঝুমুর তোকে একটু আদর করি। ঝুমুর চোখ তুলে তাকাল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আপাকে জড়িয়ে ধরল।

দু’বোন দু’জনকে জড়িয়ে ধরে অনেক রাত পর্যন্ত কাঁদল। কেন কাঁদল তারা জানে না।এক সময় ঝুমুর চোখ মুছে লজ্জিত ভঙ্গিতে ডাকল, আপা! কি?আমরা এত কান্নাকাটি করছি কেন? আমি কী জন্যে কাঁদছি সেটা আমি জানি, তুই কী জন্যে কাঁদছিস সেটা তোর জানার কথা।আমি জানি না।

না জেনেই ভেউ ভেউ করে কাঁদছিস? হুঁ। আপা শোন– বল শুনছি।পরশু কী হবে বল তো—বাড়িওয়ালা চাচা যখন আসবে তখন তুমি যদি না থাক? আমি না থাকলে তুই তো থাকবি। তুই সামলাবি।আমি সামলাব? তুমি কি পাগল-টাগল হয়ে গেলে? কী সব কুৎসিত কথা যে লোকটা বলছিল! বলুক না। এক সময় বলার কথা শেষ হয়ে যাবে।লোকজন সঙ্গে করে নিয়ে আসবে। কুৎসিত কুৎসিত কথা বলবে তখন আমি কী করব?

তুই ঘর থেকে কাঁদতে কাঁদতে বের হবি। তাতেই কাজ হবে। কিছু মানুষের সিমপ্যাথি পেয়ে যাবি। যদি কাদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাস তাহলে আর দেখতে হবে না। সব লোক তোর পক্ষে চলে আসবে।কী যে তোমার কথা। আপা ! মিতু হাসতে হাসতে বলল, ইচ্ছা করলে লোকটাকে আমরা কঠিন শাস্তিও দিতে পারি। কীভাবে জনিস? কিভাবে?

খুব সহজ-কাঁদতে কাঁদতে ছোট্ট একটা অভিনয় করতে হবে। লোকজনের দিকে তাকিয়ে বলতে হবে–যখন তখন আমাদের বাসায় আসত। কখনো পেঁপে নিয়ে আসত, কখনো কলা, কখনো আম নিয়ে আসত। একদিন খারাপ একটা ইঙ্গিত করে। আমরা তাকে ঘর থেকে বের করে দেই। তারপর থেকে সে আমাদের তাড়িয়ে দেবার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে।

কেউ তোমার কথা বিশ্বাস করবে না।করবে। মানুষের চরিত্রের দিকে ইঙ্গিত করে যাই বলা হয় তাই সবাই বিশ্বাস করে।তুমি বলতে পারবে এমন কথা? না।পরশুদিনের কথা ভেবে আমার এমন অস্থির লাগছে! অস্থির লাগার কিছু নেই। পরশুদিন কেউ আসবে না। আমি ব্যবস্থা করব।

কী ব্যবস্থা করবে? সেটা তোর জানার দরকার নেই। তবে নিশ্চিত থাক। পরশুদিন কেউ আসবে না। কী ব্যবস্থা তুমি করবে। সেটা না জানলে আমি নিশ্চিত হতে পারব না। আমি ঘুমুতে পারব না।আমার চেনা একজন মানুষ আছে। তাকে জানালেই আর কোনো সমস্যা হবে না।উনি কি ভয়ঙ্কর কোনো মানুষ?

মোটেই না। আমুদে একজন মানুষ। কিন্তু তার ভয়ঙ্কর ক্ষমতা।এরকম মানুষকে তুমি চেন কীভাবে? বেঁচে থাকার জন্যে অনেক” মানুষকে চিনতে হয়। অনেক কুৎসিত কাণ্ডকারখানা করতে হয়।বেঁচে থাকাটা কি এতই জরুরি? মিতু ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলল, মাঝে মাঝে মনে হয় বেঁচে থাকা খুব জরুরি। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় মোটেই জরুরি না।কখন তোমার কাছে মনে হয় বেঁচে থাকাটা জরুরি? ঘুম পাচ্ছে–শুয়ে পড়।না বল–কখন তোমার কাছে মনে হয় বেঁচে থাকাটা জরুরি?

মিতু নিচু গলায় বলল, মাঝে মাঝে শুটিং শেষ হবার পর–অনেক রাতে বাসায় ফিরি। পথে মনে হয় তুই আমার জন্যে বারান্দায় চুপচাপ বসে আছিস। পথে কোনো রিকশা দেখলেই চট করে উঠে দাঁড়াচ্ছিস, তখন বেঁচে থাকাটা খুব জরুরি মনে হয়। মাঝে মাঝে শেষ রাতের দিকে হঠাৎ মনে হয় মা আমার কপালে হাত রেখে দেয়া পড়ছেন, তখন বেঁচে থাকাটা জরুরি মনে হয়। শুধু জরুরি না, অসম্ভব জরুরি মনে হয়।

তুমি আসল কথাটা কিন্তু আপা বল নি। আসল কথাটা এড়িয়ে গেছ।আসল কথাটা কী? আমরা কিছু না–মবিন ভাইয়ের কথা তোমার যখনই মনে হয় তখনি বেঁচে থাকাটা তোমার কাছে খুব জরুরি মনে হয়। ঠিক বলেছি না। আপা? হয়তো ঠিক বলেছিস।হয়তো না–আমি জানি এটাই আসল সত্য, বাকি সব নকল সত্য।বয়সের তুলনায় তুই বেশি বেশি জেনে ফেলছিস। জানা ভালো, তবে বেশি জানা ভালো না।

ঝুমুর বিছানায় উঠে বসতে বসতে বলল, খুব দুঃখী মানুষেরও বোধহয় বেঁচে থাকা জরুরি মনে হয় তাই না। আপা?হয় বোধহয়। নয়তো তারা বেঁচে থাকে কেন?সবাই তো আর বেঁচে থাকে না। কেউ কেউ আবার মরেও যায়। বিষ খায়। গলায় দড়ি দিয়ে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে পড়ে। কেন পড়ে?জানি না কেন?মবিন ভাইকে প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেছিলাম—উনি উত্তর দিতে পারেন নি।তাকে আবার কখন জিজ্ঞেস করেছিস?

ঐ দিন স্কুল থেকে টিফিন পিরিয়ডে পালিয়ে তাঁর কাছে চলে গেলাম। তাঁর ঘরে কী সুন্দর একটা শীতলপাটি পাতা! আমার সব সময় মনে হয়েছে তার ঘরটায় একা একা হাত-পা ছড়িয়ে শীতলপাটিতে ঘুমুতে পারলে খুব একটা আরামের ঘুম হবে। সেই জন্যে গিয়েছিলাম। তখন প্রশ্নটা করলাম।মিতু তীক্ষ্ণ গলায় বলল, ঘুমিয়েছিলি?

হুঁ। মবিন ভাই ঘরের ভেতরে আমাকে রেখে তালা দিয়ে ছাত্র পড়াতে চলে গেলেন। সন্ধ্যাবেলা এসে তালা খুললেন। আমি সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমিয়েছি। কী শান্তির ঘুম যে ঘুমিয়েছি! ও আচ্ছা।তুমি কি রাগ করলে আপা?

না।কিন্তু তোমার গলার স্বর কেমন কঠিন হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে তুমি রাগ করেছ।পাশের ঘর থেকে শাহেদা ডাকলেন, মিতু, এই মিতু।মিতু উঠে গেল। ঝুমুর আবার চাদর দিয়ে সারা শরীর ঢেকে ফেলল। চাদর দিয়ে শরীর ঢাকামাত্র আলাদা একটা জগৎ তৈরি হয়ে যায়। সেই জগতে কত কাণ্ড হয়। আধোঘুম জাগরণে ঝুমুর তার রহমস্যময় জগতে ঘুরে বেড়াতে লাগল।

এখন সে হয়েছে দারুণ বড়োলোকের এক মেয়ে। ঘর থেকে সে পালিয়ে চলে এসেছে। তাকে খোঁজার জন্যে হুলস্থূল পড়ে গেছে। দু’লাখ টাকা পুরস্কার পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খুঁজে পাওয়া যাবে কী করে, সে অতি সাধারণ একটা জায়গায় লুকিয়ে আছে। একটা দরজির দোকানে। দরজির দোকানের কর্মচারীর নাম শাহেদ। সে রাতে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে দেখে এক কোণায় রাজকন্যাদের মতো একটা মেয়ে লুকিয়ে আছে। সে ভয় পেয়ে বলল, কে?

ঝুমুর বলল, আমি নীলাঞ্জনা (রাজকন্যার নাম নীলাঞ্জনা চৌধুরী) আপনি এখানে কেন? আমি কয়েকদিন লুকিয়ে থাকব। আপনি কি আমাকে লুকিয়ে রাখতে পারবেন না? আপনার মতো রূপবতী মেয়েকে আমি কোথায় লুকিয়ে রাখব? লুকিয়ে রাখতে না চান না রাখবেন, শুধু আজ রাতটা থাকতে দিন, আমি ভোরবেলা চলে যাব।রাতে কোথায় ঘুমুবেন?

কেন আপনার খাটে ঘুমুব। আপনি একদিকে তাকিয়ে ঘুমুবেন, আমি অন্যদিকে তাকিয়ে ঘুমুব। মাঝখানে একটা বালিশ দিয়ে রাখব যাতে গায়ের সঙ্গে গা লেগে না যায়।আপনি তো ভয়ঙ্কর কথা বলছেন।আমি মোটেই ভয়ঙ্কর কথা বলছি না। আমি সহজ স্বাভাবিক কথা বলছি।ঝুমুর নীলাঞ্জনা চৌধুরীর ভূমিকায় অনেক রাত পর্যন্ত অভিনয় করল। তার ঘুম এল শেষ রাতে। তখন মোরগ, ডাকতে শুরু করেছে।

মাগরিবের নামযের পর মবিন তার ছাত্রীর বাড়িতে যায়। গরমের দিন বলে সন্ধ্যা ৭টার দিকে আযান পড়ে। সাতটা থেকে নটা–এই দুঘণ্টা একনাগাড়ে পড়ায়। মাঝখানে ইন্টারভ্যালের মতো হয়। ছাত্রী এবং ছাত্রীর মা দু’জন উঠে চলে যান। তখন তার জন্যে চা আসে–লেবু চা। চা খাওয়া শেষ হওয়ামাত্র ছাত্রী এবং ছাত্রীর মা ঢোকেন। পড়াশোনা শুরু হয়। দেয়াল ঘড়িতে ন’টার ঘণ্টা পড়ামাত্র ছাত্রী প্ৰথমে ঘড়ির দিকে, তারপর তার মা’র দিকে তাকায় –এর অর্থ পড়া শেষ। দু’জন আবার উঠে চলে যায়।

মবিনের মাঝে মাঝে মনে হয় সে রোবটকে পড়াচ্ছে। যা বলছে লাইলী নামের রূপবতী রোবট তার মেমরি সেলে ঢুকিয়ে নিচ্ছে। পড়ানোয় রোবটের লাভ কতটুকু হচ্ছে তাও ধরা যাচ্ছে না। এ ধরনের ছাত্রী পড়িয়ে আরাম নেই। তাছাড়া সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। কোনো কারণে রোবটের মর্যাদা বা সম্মান ক্ষুন্ন না হয় সেই ভয়।

একবার একটিভ ভয়েস পেসিভ ভয়েস পড়ানোর সময় মবিন একটু ঝুকে এসে–ছেটেবিলের নিচে তার পা লেগে গেল রোবটের সঙ্গে। রোবট ভয়ঙ্করভাবে কেঁপে উঠল। মুখ তুলে তাকাল মবিনের দিকে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ঠোঁট কাঁপতে শুরু করছে। মনে হচ্ছে এক্ষুণি প্ৰচণ্ড এক চিৎকার দেবে। মবিনের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। রোবটের মা টেবিলের নিচে কী হয়েছে বুঝতে পারলেন না। তবে মেয়ের মুখভঙ্গি দেখে কিছু আঁচ করলেন। শঙ্কিত গলায় বললেন, কী হয়েছে রে?

লাইলী চোখ নামিয়ে বলল, কিছু না।হাঁপ ছেড়ে মবিন আবার পড়াতে শুরু করল। একবার তার ইচ্ছে করল একটা কাগজে ইংরেজিতে লেখে Young lady, that was not intentional–দিকে বাড়িয়ে দেয়। সেই সাহসও হলো না। মেয়েটি যদি কী লেখা হয়েছে না পড়েই প্ৰেমপত্র লেখা হয়েছে মনে করে চিৎকার দিয়ে ওঠে।

চাকরিটা ছেড়ে দিতে পারলে মবিনের জন্য ভালো হতো। ছাড়া যাচ্ছে না। দুঘন্টা পরিশ্রমে সাত শ’ টাকা বেতন প্লাস দুবেলা খাওয়া ভাবা যায় না।মবিনের ধারণা ছাত্রীর রোবট ভাব এবং ছাত্রীর মায়ের খবরদারি কিছুদিনের মধ্যেই কমে যাবে। যখন দু’জনই লক্ষ করবে এই মাস্টারের উদ্দেশ্য পড়ানো–টেবিলের পা দিয়ে পা চেপে ধরা না, প্রেমপত্র লেখা না।

মবিনের ধারণা মিলছে না–দু’মাস হলো সে পড়াচ্ছে, ছাত্রী এবং ছাত্রীর মা দু’মাস আগে যেমন ছিল এখনো তেমনই আছে। মবিনকে পড়ানোর সময় হাত-পা খুব সাবধানে রাখতে হয়। সারাক্ষণ মনে হয় সে একটা কচ্ছপ হলে মেয়েটিকে পড়ানো সহজ হতো। হাত-পা খোলসের ভেতর ঢুকিয়ে শুধু মাথাটা বের করে ছাত্রী পড়াত।প্রকৃতি জীব জগতের নানান ‘ফরম’ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর মানুষের জন্যে বর্তমান ফরম বেছে নিয়েছে। মানুষের জন্যে কচ্ছপ ফরমটাও খুব খারাপ ছিল না।

মবিন তার ছাত্রীর বাসার বারান্দায় উঠে কলিংবেলে হাত রাখল। এই আরেক বিরক্তিকর ব্যাপার। এ বাড়িতে কলিংবেল টেপার অনেকক্ষণ পর একজন কেউ এসে দরজা খোলে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে হয় অনন্তকাল পার করে দিচ্ছে।আজ দেরি হলো না। কলিংবেল টেপামাত্র দরজা খুলে গেল। বুড্ডা মাথা বের করে বলল, আফা পড়ব না।

মবিনের ভুরু কুঞ্চিত হলো। গতকালও রোবট পড়তে আসে নি। কেন আসে নি। সেই কারণও দর্শানো হয় নি। রোবটমাতা শুধু বলেছেন–লাইলী আজ পড়বে না। তুমি রাত ন’টার দিকে এসে খেয়ে যেও। মবিন চলে এসেছে। রাত ন’টায় ভাত খাবার জন্যে যায় নি। খাওয়ার জন্যে আবার ফিরে যেতে লজ্জা লাগল। রাতে হোটেলে খেয়ে নিয়েছে। মানুষের অভ্যাস কত দ্রুত বদলায় কাল রাতে সে টের পেয়েছে। হোটেলের খাবার বলতে গেলে কিছুই খেতে পারে নি। যা খেয়েছে তাও হজম হয় নি–পেট নেমে গেছে।

বুড্ডা বলল, আফনেরে বলছে ভাত খাইয়া যাইতে।তোমার আপা আজো পড়বে না? জ্বে না।পড়বে না কেন শরীর খারাপ? জ্বে।কী হয়েছে তার? শইল খারাপ হইছে।মবিন চলে আসছে। তার মন একটু খারাপ। হোটেলের ভয়ঙ্কর খাবার আজো খেতে হবে। পেট খারাপের ব্যাপারটা মনে হয় স্থায়ী হয়ে যাবে। মবিন গেট পর্যন্ত চলে এসেছে, বুড়া ছুটে এসে বলল, আম্মা আফনেরে ডাকে।

রোবটের মা অবশ্যি সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিলেন না। মবিনকে আধঘণ্টার মতো বারান্দায় বসে থাকতে হলো। বুডা এসে এক সময় বলল, আফনেরে ভিতরে যাইতে বলছে। মবিন বুডার পেছনে পেছনে ঢুকল। রোবটমাতা বললেন, তুমি কাল খেতে আস নি কেন? লাইলী পড়ুন না পড়ুক তোমার দু’বেলা খাওয়ার কথা, তুমি খাবে।ওর কী হয়েছে?গায়ে গোটা গোটা উঠেছে, মনে হয় হাম।আমি কয়েকদিন আসা বাদ দেব?

বাদ দাও। ও সুস্থ হলে আমি খবর পাঠাব।জ্বি আচ্ছা। আজ তাহলে যাই? এখনি যাবে কেন? ভাত খাও। ভাত খেয়ে একবারে যাও। ভাত দিতে বলেছি। মবিনের খাওয়ার সময় ভদ্রমহিলা সামনে থাকেন না। আজ রইলেন। কাছে এলেন না–দূরে বসে রইলেন। মবিনের অস্বস্তি লাগছে। দীর্ঘদিন একা একা খেয়ে অভ্যাস হয়ে গেছে। মহিলাদের কেউ আশপাশে থাকলে অস্বস্তি লাগে। ভদ্রমহিলা অবশ্যি দূরে বসে আছেন। সেটাও অস্বস্তিকর। মাতৃসম মহিলারা খাবার সময় এত দূরে থাকবেন কেন?

তোমার বাবা-মা কি বেঁচে আছেন? জ্বি।কোথায় থাকেন, দেশে? জ্বি।বাবা কিছু করেন? স্কুল টিচার ছিলেন। এখন গ্রামেই থাকেন। সামান্য জমিজমা আছে, না থাকার মতোই।ভাইবোন ক’জন? ভাই নেই, চার বোন।বোনদের সব বিয়ে হয়ে গেছে? দু’জনের হয়েছে।ব্যক্তিগত সব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার জন্যে রাগ করছ না তো? জ্বি না। আমার কাজের ছেলেটা বলছিল তোমার ঘরে সুন্দরমতো একটা মেয়েকে দেখেছে।মেয়েটা কে?

ওর নাম মিতু। ওর বড় ভাই আমার সঙ্গে পড়ত।যে ভাই খুনের জন্যে জেল খাটছে? মবিন বিরক্ত হলো–মহিলা সব জেনেশুনেই জিজ্ঞেস করছেন মেয়েটা কে? এতসব প্রশ্নের দরকারই বা কি? সে দরিদ্র প্রাইভেট মাস্টার। পড়াতে এসেছে, পড়িয়ে চলে যাবে। ব্যাস।ঐ মেয়ে কি তোমার কাছে প্রায়ই আসে?

জ্বি।মেয়েটা কী করে।সিনেমার ছোটখাটো রোল করে।এতেই ওদের সংসার চলে? চলে আর কোথায়? কোনোমতে জীবন ধারণ করা।তিনজনের সংসার, বাড়ি ভাড়া, বোনের স্কুলের খরচ সব মেয়ের সামান্য রোজগারে চলে?

চালাতে হয়।আমি মেয়েটার নামে অনেক আজেবাজে কথা শুনি। দামি দামি গাড়ি নাকি মাঝেমধ্যে নামিয়ে দিয়ে যায়।মবিনের খাওয়া হয়ে গেছে। সে হাত ধোয়ার জন্যে উঠল। ভদ্রমহিলা নিজেও উঠে দাঁড়ালেন। উপদেশ দিচ্ছেন এমন ভঙ্গিতে বললেন, এ জাতীয় মেয়েদের সাথে সম্পর্ক না রাখাই ভালো।মবিন কঠিন কিছু কথা বলতে গিয়েও বলল না। কী হবে কঠিন কথা বলে?আমি তাহলে যাই?

বোস। আরেকটু বোস। তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে। খুব জরুরি।মবিন বিস্মিত হলো। তার সঙ্গে এই মহিলার কী জরুরি কথা থাকতে পারে? টেবিলের নিচে একবার তার রোবটকন্যার পায়ের সঙ্গে তার পা লেগে গিয়েছিল–এই খবরটা কি মেয়ে তার মা’কে জানিয়েছে?

 

Read more

পেন্সিলে আঁকা পরী শেষ : পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

পেন্সিলে আঁকা পরী পর্ব:১১ হুমায়ূন আহমেদ

মাঝে মাঝে করি। যখন করি তখন খুব খারাপ লাগে।মবিন হাসছে। মিতুও হাসছে। মিতু বলল, চুল আঁচড়ানোটা ভালো হয় নি। এস আবার আঁচড়ে দিই। এরকম শক্ত হয়ে থাকবে না–আমার শরীরে কুষ্ঠ হয় নি যে ছোঁয়া লাগলে তোমার ক্ষতি হবে।মবিন হড়বড়িয়ে বলল, কী যে তুমি বল!ঠিকই বলি–তুমি আমার সঙ্গে সব সময় এমন ভাব করা যেন আমি তোমার ছাত্রী। 

তুমি আমাকে পড়াচ্ছ এবং আমার মা একটু দূরে বসে পড়ানো কেমন হচ্ছে লক্ষ করছেন।মবিন হাসল।মিতু কঠিন গলায় বলল, আমি সামান্য এক্সট্রা মেয়ে হতে পারি। কিন্তু আমার হাত দু’টা সুন্দর। সুন্দর না? দেখা কী সুন্দর লম্বা লম্বা আঙুল! সে তো সব সময়ই দেখছি।হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখ। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলে তোমার মান যাবে? মবিন বিস্মিত হয়ে বলল, আজ তোমার কী হয়েছে বল তো?

কিছু হয় নি। হবার মধ্যে যা হয়েছে তা হলো তোমার দেয়া শাড়িটা পরেছি। বেগুনি রং আমার অসহ্য কিন্তু শাড়িটা পরার পর নিজেকে এত সুন্দর লাগছে কেন কে জানে। আয়নায় নিজেকে দেখে চমকে উঠেছি। তোমার কাছে কি আমাকে সুন্দর লাগছে না? লাগছে।সত্যি লাগছে, না আমাকে খুশি করার জন্যে বলছ? সত্যি লাগছে।তাহলে তোমার আজ ভয়ঙ্কর বিপদ।তার মানে? আমি আজ কোথাও যাব না। সারারাত গল্প করব। যদি ঘুম পায় তোমার এই খাটে তোমার পাশে শুয়ে থাকব। তোমার কি একটাই বালিশ?

মবিন তাকিয়ে আছে। তার চোখে পলক পড়ছে না। মিতু বলল, এভাবে তাকিয়ে থাকবে না। আমি মন ঠিক করে এসেছি।তোমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে।মিতু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তাই বোধহয়। ক’টা বাজে দেখ তো? সাতটা।তুমি ওঠ, স্যান্ডেল পরে নাও। আমাকে বাসে তুলে দেবে। রাতে আমার শুটিং আছে। এতক্ষণ ঠাট্টা করছিলাম। আমি কী সুন্দর অভিনয় পারি দেখলে তো? আমার কথা বিশ্বাস করে ভয়ে ঘেমে-টেমে একেবারে অস্থির। এত ভয় পাচ্ছিলে কেন? না মানে, লোক জানাজানি হলে তোমার অসম্মান। আজ রাতে তোমার শুটিং?

হুঁ। কিছু প্যাঁচওয়ার্ক দরকার পড়ে গেল। নরমাল টাইমে শিডিউল পাচ্ছিল না। আজই শেষ।শেষ হলেই ভালো। সারারাত জেগে কাজ করা কী বিশ্ৰী ব্যাপার! সবাই সুশ্ৰী ব্যাপার করবে তা তো হয় না। কাউকে কাউকে বিশ্ৰী ব্যাপারও করতে হয়। আমরা কিন্তু রিকশা নেব না। হেঁটে হেঁটে বাসস্টেশন পর্যন্ত যাব। আমার হাঁটতে ইচ্ছা করছে।অনেকখানি রাস্তা তো।অনেকখানি রাস্তাই তোমার সঙ্গে হেঁটে পার হব। তুমি আমার হাত ধরে থাকবে।

অন্ধকার রাস্তা–কেউ দেখবে না।মনিব বলল, চল তোমাকে এফডিসি পর্যন্ত দিয়ে আসি।কোনো দরকার নেই। আমি একাই যাব।আমি সঙ্গে গেলে অসুবিধা আছে?আছে। এক্সট্রাদের সঙ্গে যে সব পুরুষ মানুষ থাকে তাদের দালাল দালাল মনে হয়। আমি তোমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে সবাই আড়চোখে তোমাকে দেখলে, আমার অসহ্য লাগবে। আমাদের বিয়ের পর তোমাকে নিয়ে যাব। পরিচিত সবাইকে ক্যান্টিনে চা-টা খাইয়ে দেব। তুমি কী বল?

সেটা মন্দ না।তারা বাসস্টেশনে চলে এসেছে। ঢাকা যাবার বাস আসছে দেখা যাচ্ছে। মিতু বিষন্ন ভঙ্গিতে বলল, এতটা রাস্তা আমরা পাশাপাশি হেঁটে এলাম, তুমি কিন্তু একবারও আমার হাত ধর নি।ও সরি। দেখি তোমার হাত।থাক দেখতে হবে না। বাস চলে এসেছে।দিলদার খাঁ দরজা খুলেই বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল, এতক্ষণে। ক’টা বাজে জান?

রেশমা লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, বাস পথে জ্যামের মধ্য পড়েছে। অ্যাকসিডেন্টের জন্যে এয়ারপোর্ট পুরা দুঘণ্টা বন্ধ। কী করব বলুন।রাত বাজে এগারটা, পার্টি এতক্ষণ তোমার জন্যে বসে থাকবে? আমার নিজেরও একটা বদনাম হয়ে গেল। কথা রাখতে পারলাম না।সরি দিলদার ভাই।এখন সরি বলে লাভ কী? রাত ন’টা পৰ্যন্ত পার্টিকে ধরে রেখেছি। তারপর বাধ্য হয়ে অন্য ব্যবস্থা করেছি। হুট করে তো কাউকে পাওয়া যায় না। পার্টির পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার আছে।রেশমা বলল, আমি এখন কী করব?

কী আর করবে? বাসায় চলে যাবে।এত রাতে বাসায় যাব না। ভোরবেলা যাব। রাতটা আপনার বাসায় থেকে যাই।দিলদার বিরক্ত গলায় বলল, আরো সর্বনাশ! বাসায় থাকতেই পারবে না। তোমার ভাবি এইসব ব্যাপারে অসম্ভব স্ট্রিক্ট।বসার ঘরের সোফায় শুয়ে থাকব।অসম্ভব। বসার ঘরের সোফা কেন, বারান্দায় শুয়ে থাকলেও সে ঝাঁটাপেটা করবে।

রেশমা বলল, ঠিক আছে থাকব না। ঘরে ঢুকতে দিন। ভয়ঙ্কর তৃষ্ণা হয়েছে। এক গ্লাস পানি খাব–তারপর ভেবে ঠিক করব কী করা যায়।দিলদার খাঁ নিতান্ত অনিচ্ছায় দরজা থেকে সরে দাঁড়াল।পুরনো অসুখটা কি আবার তাঁকে ধরেছে? সেই ভয়াবহ অসুখ? যে অসুখ গভীর গোপনে লুকিয়ে থাকে, হঠাৎ বের হয়। যখন বের হয় তখন সমগ্ৰ চিন্তা-চেতনা আচ্ছান্ন করে দেয়।

মোবারক সাহেবের চিন্তা-চেতনা গুলিয়ে যাচ্ছে। তিনি বসে আছেন তার এল সি থ্রি পারসোনাল কম্পিউটারের সামনে। পর্দায় দাবার বোর্ড। এবারের চাল তার দেয়ার কথা। পর্দায় ফ্ল্যাসিং সাইন উঠছে। সুন্দর চাল তাঁর আছে। মন্ত্রীর সামনের বড়ে এক ঘর এগিয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষের নাইটকে বেকায়দায় ফেলা। তিনি চাল দিচ্ছেন না। মূর্তির মতো বসে আছেন। তাঁর ভেতর থেকে একজন কেউ বলছে, অর্থহীন, এই চাল দেয়া অর্থহীন। কে বলছে? তাঁর পুরনো অসুখটা বলছে?

হ্যাঁ সেই পশুটাই বলছে। কিন্তু পশুটাকে এখন আর পশু বলে মনে হচ্ছে না। পশুর গলার স্বর মধুর। প্রথম যৌবনের কিশোরী প্রেমিকার কণ্ঠস্বরের মতো। তাঁর প্রথম যৌবনে কোনো কিশোরী প্ৰেমিকা ছিল না। থাকলে অবশ্যই সে এরকম কণ্ঠে কথা বলত।কণ্ঠস্বর বলল, দাবার চাল দিয়ে কী হবে?

তিনি যুক্তি দিতে চেষ্টা করলেন। ক্ষীণস্বরে বললেন, আনন্দ। খেলার আনন্দ। জয়পরাজয়ের আনন্দ।জয়-পরাজয়ের আনন্দ সবার জন্যে নয়। এই খেলায় জয় করেও তুমি আনন্দ পাবে না। পরাজিত হয়েও তুমি আনন্দ পাবে না। একটু শুধু ক্লান্ত হবে। তুমি ক্লান্ত হবার জন্যে খেলছ? না।তাহলে শুধু শুধু খেলছ কেন? খেলছি না তো আমি বসে আছি।এভাবে কতক্ষণ বসে থাকবে? জানি না।অনন্তকাল বসে থাকবে?

অনন্তকাল বসে থাকব। কেন? আমি এখন উঠব। হাত-মুখ ধোব, কফি খাব, তারপর ঘুমুতে যাব।কারো কারো জন্যে সময় থেমে যায়। তোমার জন্যে সময় থেমে গেছে। তুমি যাই কর তোমার কাছে মনে হবে তুমি অনন্তকাল ধরে করছি। সত্যি না? হ্যাঁ সত্যি।তুমি যখন তোমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বল— তোমার কাছে মনে হবে তুমি অনন্তকাল ধরে কথা বলছি। তুমি যখন হাতে কফির পেয়ালা নেবে তখন মনে হবে অনন্তকাল ধরেই কফির পেয়ালা হাতে তুমি বসে আছ।আমি কি অভিশপ্ত?

সব মানুষই অভিশপ্ত। ওরা তা জানে না বলে ওরা হেসে খেলে জীবন ধারণ করছে। তুমি জেনে গেছ। তোমার মতো আরো অনেকেই জেনেছে। জাপানের নোবেল পুরস্কার পাওয়া সেই ঔপন্যাসিকের নাম যেন কি? কাওয়াবাতা।হ্যাঁ কাওয়াবাতা। তিনি যখন সব পেয়ে গেছেন তখন তিনি আত্মহত্যা করেন। এরকম উদাহরণ আরো আছে। আছে না? আছে? কবি মায়াকোভস্কি, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে… পুশকিনকেই বা বাদ দেবে কীভাবে?

পুশকিন ডুয়েলে মারা গেছেন।একই কথা। ব্যাপার একই। জীবন তাদের কাছে অসহ্য বোধ হয়েছিল। তাঁরা বুঝে গিয়েছিলেন বেঁচে থাকার কোনো কারণ নেই। তুমিও বুঝে গেছ… আমার বিশাল কর্মকাণ্ড, ব্যবসা… তাদের কর্মকাণ্ড কি তোমার চেয়ে কম ছিল?

মৃত্যু আমাকে কী দেবে? কিছুই দেবে না। এটা কি অনেক বড় উপহার না? সে রকমই মনে হচ্ছে।একটা বইয়ের শেষ পাতায় কী লেখা থাকে–দি এন্ড। সমাপ্তি। মৃত্যু তোমাকে শেষ পাতায় এনে দেবে। এটা কি আনন্দময় একটা ব্যাপার না?হ্যাঁ। আমাকে তুমি এখন কী করতে বল?

তুমি তোমার কম্পিউটারে লেখ–The End. সুন্দর করে লেখ। কম্পিউটারের পর্দায় তিনি লিখলেন The End. এত ছোট করে লিখেছ কেন? বড় টাইপে লেখা। সব ক্যাপিটেল লেটারে।তিনি লিখলেন– THE END.

আর তখন বিশ্ৰী শব্দে ইন্টারকম বাজতে লাগল। তিনি ইন্টারকমের রিসিভার কানে নিলেন। ইদরিস বলল, স্যার স্নামালিকুম।তিনি যন্ত্রের মতো বললেন, কী ব্যাপার ইদরিস?একটা মেয়ে এসেছে স্যার। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছে।কে এসেছে? এই বাড়িতে সে আগে একবার এসেছিল।টেপী? নাম বলল রেশমা।ও আচ্ছা।ওকে কী বলব স্যার?

মোবারক সাহেব চুপ করে রইলেন। তার ভেতরে সেই পশু কিছু বলে কিনা শুনতে চেষ্টা করলেন। কেউ কিছু বলছে না। তিনি আগ্রহের সঙ্গে বললেন, ইদরিস রেশমাকে উপরে নিয়ে এস।জুি আচ্ছা স্যার।রেশমা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ভয়ে ভয়ে উঠছে। সিঁড়ির মাথায় মোবারক সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। মোবারক সাহেবের মুখ হাসি হাসি।তিনি দূর থেকে বললেন, কী ব্যাপার বল তো?

রেশমা থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তাকে একটু যেন বিভ্রান্ত মনে হচ্ছে। সে বলল, আমি আমার চুলের ফিতাটা ফেলে গিয়েছিলাম। নিতে এসেছি।মোবারক সাহেবের মনে হলো, বুদ্ধিমতী একটা মেয়ে। সুন্দর জবাব দিয়েছে। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ থাকলে মনের ভেতেরের পশুটাকে অনেকক্ষণের জন্যে আটকে রাখা যাবে।তুমি কি ফিতা নিয়েই চলে যাবে?

আপনি থাকতে বললে থাকব।দাঁড়িয়ে আছ কেন, এস! এস! মোবারক সাহেব হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। রেশম ইতস্তত করছে। মোবারক সাহেব বললেন, ধর আমার হাত ধর।রেশমা হাত ধরল। মোবারক সাহেব বললেন–তুমি হঠাৎ করে আসায় আমি যে কী ভয়ঙ্কর খুশি হয়েছি তুমি কোনোদিনও তা জানবে না। তুমি আমার কাছে কিছু চাও। যা চাইবে তাই পাবে। এটাকে মাহেন্দ্ৰক্ষণ হিসেবে ধরে নাও। বল কী চাও? রেশমা বলল, আমি কি অন্য কারো জন্যে কিছু চাইতে পারি?

হ্যাঁ পার।আমার একজন অতি প্রিয় মানুষ আছে। চা বাগানের একটা চাকরির তার খুব শখ। ভালো একটা চাকরি।মোবারক সাহেব বললেন, আমার সঙ্গে আসি। আমি কম্পিউটারে তার নাম-ঠিকানা তুলে নিচ্ছি। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা করব।মোবারক সাহেব তাঁর কম্পিউটার থেকে The End লেখা মুছে ফেললেন। জরুরি লেখা ফোন্ডার ওপেন করে বললেন–বল রেশমী, নাম বল।রেশমা নাম বলল।তুমি কি খেয়ে এসেছ?

জ্বি না।আশ্চর্য! আমিও খাই নি। ইদরিসকে বলি খাওয়ার ব্যবস্থা করতে। তুমি কী খেতে পছন্দ কর? আমি সবকিছুই পছন্দ করি। আপনি কী পছন্দ করেন? জানি না। আসলেই জানি না। মজার ব্যাপার কী জান মিতু অনেকদিন পর কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি কী পছন্দ করি।—ঐ ভদ্রলোকের ঠিকানা কী বল? মেইলিং অ্যাড্রেস।

ঝুমুরদের রান্নাঘর বারান্দায়। করোগেটেড টিন দিয়ে বারান্দার একটা অংশ আলাদা করে রান্নাঘর। চালে কয়েক জায়গায় ফুটো আছে। বৃষ্টির সময় ফুটো দিয়ে পানি পড়ে। রাঁধতে শাহেদার খুব যন্ত্রণা হয়। শাহেদা এই মুহূর্তে যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। বড়া ভাজার জন্যে তেল চড়িয়েছেন। বৃষ্টির পানি ফুটন্ত তেলে এসে পড়ছে। ফুটন্ত তেলের ছিটা তার মুখে এসে পড়েছে। মুখের খানিকটা তো অবশ্যই পুড়েছে। শাহেদাকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। তিনি আহু উহু জাতীয় কোনো শব্দ করেন নি। তাঁর ব্যস্ততা চুলাটা নিরাপদ কোনো জায়গায় সরিয়ে নেয়ার দিকে। এই সময় ঝুমুর এসে বলল, বাড়িওয়ালা এসেছে মা।

শাহেদা বললেন, কাল সকালে এসে বাড়ি ভাড়া নিয়ে যেতে বল।বাড়ি ভাড়া নিতে আসেনি মা। বাড়ি ছেড়ে দেয়ার কথা। আমরা বাড়ি ছাড়ি নি এই নিয়ে খুব চোঁচামেচি করছে।শাহেদা নির্বিকার গলায় বললেন, করতে থাকুক।তিনি কেরোসিনের চুলা দেয়ালের দিকে সরিয়ে দিলেন। সেখানে পানি আরো বেশি পড়ছে। ঝুমুর বলল, মা তুমি আস উনি বিশ্ৰী বিশ্ৰী সব কথা বলছেন। বাড়ির সামনে লোক জমে গেছে।

শাহেদা চুলা থেকে কড়াই নামালেন। মাথার উপর আঁচল তুলে দিলেন। ঝুমুর মা’র সঙ্গে গেল না। তার হাত-পা কাঁপছে। তার মনে হচ্ছে ভয়ঙ্কর একটা কাণ্ড হতে যাচ্ছে। এমন সময় হচ্ছে যখন আপা বাড়িতে নেই। আপা থাকলে যত ভয়ঙ্কর কাণ্ডই হোক সামাল দিতে পারত। এখন কে সামলাবে? এক ফাঁকে সে গিয়ে কি মবিন ভাইকে নিয়ে আসবে? মাঝে মাঝে একজন পুরুষ মানুষের উপস্থিতির এমন প্রয়োজন পড়ে!

শাহেদা বারান্দার খোলা দরজার পাশে দাঁড়ালেন। বাড়ির উঠানে এবং রাস্তায় এতগুলো মানুষ দাঁড়িয়ে থাকবে তিনি কল্পনা করেন নি। হৈচৈ শুনে এরা জড়ো হয়েছে তাও মনে হচ্ছে না। বৃষ্টি মাথায় করে এতগুলো মানুষ জড়ো হবে না। নিজামউদ্দীন সাহেব মনে হচ্ছে এদের সঙ্গে করেই এনেছেন। ফুটন্ত তেল শাহেদার থুতনির কাছে পড়েছে।

জায়গাটা কালো হয়ে ফুলে উঠেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পানি জমে ফোঁসকা উঠে যাবে। তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। শাহেদা বললেন, কী হয়েছে?নিজামউদ্দীনের গলা শীতল। কণ্ঠস্বরে কোনো রাগ নেই। তার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য পরিষ্কার। তিনি কথা বললেন উঁচু গলায় যাতে জড়ো হওয়া প্রতিটি মানুষ তার কথা শুনতে পায়।

কী হয়েছে আমাকে জিজ্ঞেস করেন কেন? কী হয়েছে সেটা তো আপনি বলবেন। একত্রিশ তারিখ বাড়ি ছাড়ার কথা। আজ সাত তারিখ। বাড়ি ছাড়ার কোনো লক্ষণ নাই। বাড়ি ভাড়া দেয়ার সাড়াশব্দ নাই। ভাড়া আমার দরকার নাই। বাড়ি ছাড়েন।শাহেদা শান্ত গলায় বললেন, ছাড়ব তো বটেই। বাড়ি খুঁজছি। পাওয়া গেলেই ছেড়ে দেব।আমি খোঁজাখুঁজির কথা শুনতে চাই না। বাড়ি ছাড়বেন। আজ রাত্রেই ছাড়বেন।আজ রাত্রেই ছাড়তে হবে? অবশ্যই। ভদ্রপাড়ায় বাস করে দুই মেয়ে নিয়ে ব্যবসা করবেন সেটা আর হতে দেয়া যায় না।আপনি কী বলছেন?

গলা বড় করবেন না। আমি বড় গলার ধার ধারি না। ভদ্রলোকের পাড়ায় বাস করে ব্যবসা করবেন আর আমরা চুপ করে থাকব? ঢাকা শহরে খারাপ পাড়ার তো অভাব নাই, সেখানে গিয়ে ওঠেন। ব্যবসাও ভালো হবে। উঠতি বয়সের দুই মেয়ে!

শাহেদা ভাঙা গলায় বললেন, চুপ করুন। আমি আপনার পায়ে ধরছি। চুপ করুন। আজ রাত্রেই আমি আপনার বাড়ি ছেড়ে দেব। আসুক, মেয়েটা আসুক।নিজামউদ্দীন হৃষ্ট গলায় বললেন, মেয়ে ট্রিপ দিতে গেছে, এত সহজে কি আসবে? তার আসতে রাত দু’টা-তিনটা বাজবে।ভিড়ের ভেতর থেকে একজন বলল, চুপ করেন না ভাই, অনেক তো বললেন।শাহেদা দরজা ধরে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর শরীর কাঁপছে। মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন। বুকের ভেতর প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। মনে হচ্ছে চিৎকার করে উঠলে ব্যথা কমবে।

নিজামউদ্দীন খড়খড়ে গলায় বললেন, আমি যা বলেছি। সত্য কথা বলেছি। যদি মিথ্যা বলি আমার উপর যেন আল্লাহর গজব পড়ে। তারপরেও বলতেছি–রাতটা থাকেন, পরের দিনটাও থাকেন। ব্যাস। পরশুদিন সকালে যেন দেখি বাড়ি পরিষ্কার। ভাড়া বাকি পড়েছে–দেয়া লাগবে না। মেয়ে খাটা পয়সার আমার দরকার নাই।

নিজামউদ্দীন নেমে যাচ্ছেন। যুদ্ধজয়ীর ভঙ্গিতে নামছেন। বৃষ্টির বেগও বাড়ছে। বাড়ির সামনে জড়ো হওয়া লোকজন চলে যাচ্ছে। শাহেদা দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। বুকের যন্ত্রণাটা খুব বেড়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।ঝুমুর এসে ডাকল, মা মা। শাহেদা তাকালেন না। বড়ো বড়ো করে নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন। মা তুমি বিছানায় এসে শোও।

ঝুমুর মা’র হাত ধরল। শাহেদার ইচ্ছা করল প্ৰচণ্ড ধাক্কা দিয়ে মেয়ের হাত সরিয়ে দেন। কিন্তু তিনি কোনো জোর পাচ্ছেন না। তাঁর শরীর পাখির পালকের মতো হালকা লাগছে। ঝুমুর হাত ধরে তাকে বিছানায় এনে শুইয়ে দিল। কাঁদ কাঁদ গলায় বলল, মা তুমি এরকম করছি কেন? শাহেদা বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। তার হাত-পা ঘামছে। খুব তৃষ্ণা বোধ হচ্ছে। মেয়েকে পানি এনে দেবার কথা বলতে পারছেন না। জিভ ভারি হয়ে গেছে। প্ৰচণ্ড ঘুমাও পাচ্ছে।

এই ঘুমাই কি শেষ ঘুম? মেয়েগুলোকে কয়েকটা কথা বলে যেতে চাচ্ছিলেন। বলা বোধহয় সম্ভব হবে না। চোখে আলো লাগছে। তিনি চোখ বন্ধ করে ফেললেন।আবার যখন চোখ মেললেন তখন করুণ একটা মুখ তার মুখের উপর বুকে আছে। সেই মুখ গভীর মমতায় জানতে চাইল, কেমন আছ মা? চিনতে পারছ না। আমাকে? আমি মিতু।শাহেদা ক্ষীণস্বরে বললেন, পানি খাব।মিতু পানির গ্লাস নিয়ে এল। চামচ নিয়ে এল।

সে চামচে করে মা’কে পানি খাওয়াতে যাচ্ছে কিন্তু তার হাত এত কাঁপছে যে চামচ থেকে ছলকে পানি পড়ে যাচ্ছে। মিতু কাঁদছে। নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কাঁদছে। এত বেশি কাঁদছে যে তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। শাহেদা বললেন, কাঁদিস না মা। তিনি মাথা ঘুরিয়ে ঝুমুরকে খুঁজলেন। মিতু বলল, ঝুমুরকে পাঠিয়েছি মবিন ভাইকে আনতে।কয়টা বাজে?

রাত বেশি হয় নি মা, আটটা।শাহেদা মেয়ের দিকে তাকিয়ে আবারো বললেন, কাঁদিস না।মবিনের ঘরের সামনে ঝুমুর দাঁড়িয়ে আছে। ঘর বন্ধ, তালা ঝুলছে। নিচতলার দরজির দোকান খোলা। সেখান থেকে সেলাই মেশিনের খটখটি শব্দ আসছে। ভয়ে ঝুমুর অস্থির হয়ে গেছে। সে কী করবে বুঝতে পারছে না। বৃষ্টি পড়ছে। সে দাঁড়িয়ে আছে দেয়াল ঘেঁসে।

মাথার উপর ছাদের মতো একটু আছে বলে বৃষ্টিতে ভিজছে না। তাতে কি? কতক্ষণ সে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে? সে যে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে তা দরজির দোকানের লোকটি দেখেছে। মেশিন বন্ধ করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। ঝুমুরের মনে হচ্ছে সেই লোকটা উপরে উঠে আসবে। একা আসবে না, দু-একজন বন্ধুবান্ধব সঙ্গে নিয়ে আসবে।

ঝুমুর এখন কী করবে? বাসায় ফিরে যাবে? বাসায় ফিরে যাবার পথেও তো ঝুমুরকে তারা ধরে ফেলতে পারে। এমন অন্ধকার রাস্তা। তারা যদি রিকশা থামায়। রিকশা থামিয়ে ঝোপঝাড়ের দিকে নিয়ে যায়? চিৎকার করে উঠলে লাভ হবে না। এখনকার সময় এমন যে চিৎকার শুনলে কেউ আসে না। বরং দূরে সরে যায়।বৃষ্টি জোরে নেমেছে। ঝুমুরের পা ভিজে যাচ্ছে। নিচের সেলাই মেশিনের খটখটি শব্দ এখন আর শোনা যাচ্ছে না। লোকটা নিশ্চয়ই সেলাই মেশিন বন্ধ করে উপরে উঠে আসছে।

ঝুমুরের গা ঝিমঝিম করছে। মনে হচ্ছে সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। তার যে এত ভয়ঙ্কর বিপদ তা কেউ জানতে পারছে না। দরজির দোকানের লোকটা তাকে কোনো একটা খুপড়ি ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেবে–তারপর সারারাত ধরে কুৎসিত কাণ্ডকারখানা করবে। ভোরারাতে গলা টিপে মেরে ফেলে রাখবে ধানক্ষেতে। এই ক্ষেত্রে এরকমই হয়।

বৃষ্টির সঙ্গে বাতাস দিচ্ছে। ঝুমুর এখন পুরোপুরি ভিজে যাচ্ছে। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ হচ্ছে। আসছে, দরজির দোকানের লোকটা আসছে। ভয়ঙ্কর কাণ্ডটা ঘটতে যাচ্ছে। সে এখন কী করবে? ছাদ থেকে লাফিয়ে নিচে পড়ে যাবে? সাহস কি তার আছে? এমনও তো হতে পারে যে দরজির দোকানের লোকটা না মবিন ভাই-ই আসছেন। যদি মবিন ভাই হয় সে প্রথমে আনন্দে একটা চিৎকার দেবে এবং ছুটে গিয়ে মবিন ভাইকে জড়িয়ে ধরবে। এতে মবিন ভাই কিছু মনে করলেও তার কিছুই যায় আসে না।

না, মবিন ভাই না। দরজির দোকানের লোকটা। লম্বা কালো, রোগা একটা লোক। কী বিশ্ৰীভাবে সে তাকিয়ে আছে! ঝুমুর প্রায় দেয়ালের সঙ্গে মিশে গেল। লোকটা বলল, মবিন সাহেবের খোঁজে আসছেন? ঝুমুর কোনো উত্তর দিল না। তার শরীর শক্ত হয়ে গেছে।বৃষ্টিতে ভিজতেছেন। নিচে বসেন। আসেন।বদমায়েশ লোকটা তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে জেনেও ঝুমুর যাচ্ছে। কারণ না গিয়ে সে কী করবে? কী হবে চিৎকার করে?

সাবধানে নামবেন, সিঁড়ি পিছল। ঝুমুর নিশ্চিত হলো সিঁড়ি পিছল এই অজুহাতে লোকটা তার হাত ধরবে। আচ্ছা! ঝুমুর কি পারে না প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়ে লোকটাকে সিঁড়িতে ফেলে দিয়ে ছুটে পালিয়ে যেতে? তার জন্যে খুব বেশি সাহস কি লাগে? আচ্ছা আল্লাহ্ কিছু কিছু মানুষকে এত কম সাহস দিয়ে পাঠান কেন? তাকে যদি একটু বেশি সাহস দিয়ে পাঠাতেন। সামান্য বেশি, তাহলে তাঁর এমন কী ক্ষতি হতো?

 

Read more

পেন্সিলে আঁকা পরী পর্ব:১২ হুমায়ূন আহমেদ

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

পেন্সিলে আঁকা পরী পর্ব:১০ হুমায়ূন আহমেদ

না মানায় না। আপনার টাকা আমি নিয়েছি। সংসারে খরচ করেছি।তুমি তোমার একটা চুলের ফিতাও ফেলে রেখে গিয়েছিলে। রেশমা চোখ তুলে তাকাল। লোকটির কাণ্ডকারখানা সে ঠিক বুঝতে পারছে না। এই লোক তার কাছে কী চায়। খারাপ মেয়েদের নিয়ে নানান ধরনের মজা করতে লোকজন ভালবাসে। এও কি মজা করছে? লোকটা জানে না যে ইচ্ছে করলেই রেশমাও লোকটাকে নিয়ে মজা করতে পারে। না রেশমা পারে না। টেপী পারে। টেপী নানান ধরনের মজা করে।

কিন্তু এখন সে টেপী না, সে এখন রেশমা। রেশমা মোটামুটিভাবে ভদ্র মেয়ে। আর মিতু কেমন মেয়ে? এই ভদ্রলোক জানেন না মিতু কেমন মেয়ে। শুধু মবিন ভাই জানেন।এই লোকটার সামনে সে কি কিছুক্ষণের জন্যে মিতু হবে? লোকটা তাকে চমকে দেয়ার চেষ্টা করছে। নানান ধরনের চশমা পরে, নানানভাবে তাকাচ্ছে। চুলের ফিতার প্রসঙ্গ তুলেছে–তার মানে চুলের ফিতা সঙ্গে নিয়ে এসেছে। রেশমা সহজ হয়ে বসল। মিষ্টি করে হাসল, একটু ঝুঁকে এসে বলল, আপনি কি আমার চুলের ফিতা নিয়ে এসেছেন?

হ্যাঁ।চুলের ফিতা ফেরত দেবার দরকার ছিল না। চুলের ফিতা আমি ইচ্ছা করে রেখে এসেছিলাম।কেন? উপহার। একটা খারাপ মেয়েরও তো উপহার দেবার ইচ্ছা হতে পারে। পারে না? হুঁ পারে। কাজেই তুমি বলতে চোচ্ছ যে আমি ঐ ফিতা রেখে দিতে পারি?

হ্যাঁ। পারেন।তুমি কথা তো খুব গুছিয়ে বলছি।নানান ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশি। নানান রকমের কথা বলা শিখি।আমার সঙ্গে তো বেশ কিছু সময় ছিলো। আমার কাছ থেকে কী শিখেছ? আপনার কাছ থেকে শিখেছি মানুষকে কী করে ভয় দেখাতে হয়। আপনার কর্মচারীরা নিশ্চয়ই আপনাকে অসম্ভব ভয় পায়।হ্যাঁ পায়।আপনার স্ত্রীও খুব ভয় পান তাই না?

মনে হয় পায়। সে রাতে তুমি ভয় পেয়েছিলে, এখন তো মনে হয় পাচ্ছ না।না এখন পাচ্ছি না।পাচ্ছ না কেন? আমার যা মনে আসছে সেটা যদি বলে ফেলি আপনি রাগ করবেন না তো? বল, রাগ করব না।আপনাকে ভয় পাওয়ার মতো প্রচুর লোকজন আপনি চারদিকে জড়ো করে রেখেছেন, কিন্তু আপনার কথা বলার লোক নেই। যে জন্যে আপনার লোকজন আমার মতো মেয়েদের খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসে।আমার সঙ্গে খানিকক্ষণ থেকে তোমার এই ধারণা হয়েছে?

জ্বি। অনেকের সঙ্গে মিশেছে তো। মানুষের অনেক কিছু চট করে ধরে ফেলতে পারি।তোমার জীবনের পরিকল্পনা কী? কোনো পরিকল্পনা নেই।সে কী! কোনো পরিকল্পনা নেই? না।বিয়ে করে সংসারী হবার পরিকল্পনাও নেই? রেশমা চুপ করে রইল। মোবারক সাহেব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ছবির জগতের সঙ্গে যুক্ত আছ। তোমার কি ইচ্ছে করে না কোনো একটা ছবির নায়িকা হবে? সুপারস্টার হবে? ইচ্ছে করে?

রেশমার খুব ইচ্ছা করে। মিতুর করে না।বুঝতে পারছি না।বাবা আমার নাম রেখেছিলেন মিতু। আমার ছবির নাম রেশমা। আর রাতে যখন আপনাদের মতো মানুষদের কাছে যাই তখন আমি টেপী।তোমাকে আমি কোন নামে ডাকব? টেপী নামে ডাকবেন। টেপী নামটা খুব খারাপ লাগলে রেশমা ডাকবেন।মিতু ডাকা যাবে না? না। আপনি টেপীকে চেনেন। মিতুকে চেনেন না।চা খাবে?

না।খাও, চা খাও।মোবারক সাহেব ইন্টারকমে চা দিতে বললেন। চোখ থেকে চশমা খুলে ফেললেন। বেশিক্ষণ তিনি চোখে চশমা রাখতে পারেন না। মাথায় সূক্ষ্ম যন্ত্রণা হয়। তিনি চোখের ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছেন।ডাক্তারের ধারণা–চশমার জন্যে চোখে যন্ত্রণা হবার কোনো কারণ নেই। ব্যাপারটা মনস্তাত্ত্বিক। একজন সাইকিয়াট্রিন্টের সঙ্গে এক ফাঁকে কথা বলতে হবে।

মোবারক সাহেব চশমা ড্রয়ারে রাখলেন। সেখান থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরালেন। এটি দিনের প্রথম সিগারেট। প্ৰথম সিগারেট খেতে ভালো লাগে না। দ্বিতীয়টি ভালো লাগে। তিনি ঠিক করে ফেললেন, মেয়েটি থাকতে থাকতেই দ্বিতীয় সিগারেট ধরবেন। কফির সঙ্গে সিগারেট–ভালো লাগবে। মোবারক সাহেব খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। খুব পছন্দ হয়েছে। তোমাকে চমৎকার কোনো গিফট আমি দিতে চাই। কী গিফট পেলে তুমি খুশি হবে বল? যা চাই তাই দেবেন?

দিয়ে ফেলতেও পারি। পরীক্ষা করে দেখ।রেশমা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আমি কারো কাছ থেকে গিফট নেই না।তুমি তো ঠিক কথা বললে না টেপী। তুমিও গিফট নাও। মবিন বলে এক ভদ্রলোক তোমাকে গিফট দেন না? রেশমা বিস্মিত হয়ে বলল, আপনি সব খবর জানেন? হ্যাঁ। কেন?পরে এক সময় বলা যাবে।আজ বলবেন না?

না। একটা বেজে গেছে। একটার সময় আমার অন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট।স্যার আমি যাই।আচ্ছা যাও। কোথায় যাবে নিচে গিয়ে বল গাড়ি তোমাকে পৌঁছে দেবে।গাড়ি লাগবে না।মোবারক সাহেব সাধারণত আধকাপের বেশি কফি খান না। আজ পুরোকাপ শেষ করলেন। কয়েকটা জরুরি টেলিফোন কল সারলেন। তবে কোথাও খুব মন বসাতে পারলেন না।

ইনক্যামট্যাক্স লইয়ারকে এগারটায় আসতে বলেছিলেন। সে এসেছে, নিচে অপেক্ষা করছে–তার সঙ্গে বসতে ইচ্ছা করছে না। তাকে চলে যেতে বলতেও মন সায় দিচ্ছে না। অস্থির ভাবটা হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে চলে যাব–ইনক্যামট্যাক্স লইয়ারের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করবে। সে চলে গেলে হয় কী করে। অপেক্ষা করুক। টেবিলের উপর সেক্রেটারির হাতে লেখা নোট পড়ে আছে। তাকে মনে করিয়ে দেবার জন্যে নোটগুলো লেখা। দু’টা পয়েন্টে লাল স্টার মার্ক দেয়া।

১. শিক্ষামন্ত্রী আফসারউদ্দিন খাঁ দু’বার টেলিফোন করেছেন। তিনি দু’টা পর্যন্ত দপ্তরে আছেন।

২. গুলশান থেকে আম্মা টেলিফোন করেছেন। খুব জরুরি খবর আছে।

৩. চেম্বার অব কমার্সের মিটিং সোনারগাঁ হোটেলের বলরুম—সন্ধ্যা ৭টায়।

৪. বিথোভেনের স্মরণে জার্মান দূতাবাসে ককটেল পার্টি—সন্ধ্যা ৭টায়।

এক এবং তিন নম্বর আইটেমে লাল স্টার মার্ক দেয়া।

দু’ নম্বর আইটেম মোটেই জরুরি নয়। তারপরেও মোবারক সাহেব পিএকে বললেন তার স্ত্রীকে লাইনে দিতে। সঙ্গে সঙ্গে লাইন পাওয়া গেল।হ্যালো রেহানা! জরুরি কী খবর যেন দেবে বলেছিলে।তোমাকে তো টেলিফোন করে করে আমি হয়রান হয়ে গেলাম। কখনোই লাইন দেয় না। তোমার সেক্রেটারির দল কি ইচ্ছা করে আমাকে এভায়েড করে? ওদের দোষ নেই–মিটিঙে ছিলাম। জরুরি খবরটা কি বল?

তুমি যে স্বপ্নতথ্যের দু’টা বই এনেছ, দু’টা বই সম্পূর্ণ দু’রকম। একটাতে লেখা হাতি স্বপ্নে দেখলে ধন লাভ হয়। আরেকটায় লেখা হাতি স্বপ্ন দেখা বিপদের পূর্বাভাস। সম্পূর্ণ উলটা না? তা তো বটেই।এখন আমি কোনটা বিশ্বাস করব? যেটা ভালো সেটা বিশ্বাস করাই তো নিরাপদ। তুমি কি হাতি স্বপ্নে দেখেছি?

না।তাহলে হাতি দেখা নিয়ে মাথা ঘামোচ্ছ কেন? একটা বইয়ের সঙ্গে অন্যটা মিলিয়ে দেখছি–কিছু করার নেই তো… যতই ঘাটছি ততই অবাক হচ্ছি। অবশ্যি কিছু কিছু জায়গায় দু’টা বইয়ের একই অর্থ, যেমন ধর–পানি স্বপ্নে দেখলে অসুখবিসুখ হবে।ও আচ্ছা।আমি করছি কি যে সব স্বপ্লের অর্থ দু’টা বইয়ে একই লেখা সেগুলো সবুজ কালি দিয়ে দাগাচ্ছি।দাগাদাগির কাজ তো সাধারণত লাল কালি দিয়ে করা হয়, তুমি সবুজ কালি ব্যবহার করছ কেন?

আচ্ছা আচ্ছা দাঁড়াও দাঁড়াও এক সেকেন্ড খুব একটা জরুরি কথা, পরে বলতে ভুলে যাব–সিমির যমজ মেয়ে হয়েছে। আমি হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম–খুব সুন্দর হয়েছে।সিমিকে মোবারক সাহেব চিনতে পারলেন না, তারপরেও যথেষ্ট উদ্বেগের সঙ্গে বললেন, সিমি ভালো আছে তো? হ্যাঁ ভালো। যমজ মেয়ে দেখে একটু মন খারাপ করেছে।মন খারাপের কী আছে?

আগে আরো দু’টা মেয়ে আছে এই জন্যে একটু মন খারাপ।ও আচ্ছা, আগেও তো দু’টা মেয়ে আছে–ভুলে গিয়েছিলাম। রেহানা শোন, একটু পরে তোমাকে আবার টেলিফোন করব। ইনক্যামট্যাক্সের এক উকিল এসেছে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে।মোবারক সাহেব রেহানাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলেন না। টেলিফোন নামিয়ে রেখে লাল কালি দিয়ে তাঁর সামনে রাখা নোটের দু’নম্বর আইটেম কেটে দিলেন। পিএকে বললেন শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে।

শিক্ষামন্ত্রী আফসারউদ্দিন খাঁ অত্যন্ত আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন, মোবারক সাহেব নাকি? আরে ভাই আপনাকে তো পাওয়াই যায় না।খুবই ব্যস্ততার ভেতর আছি স্যার।ব্যস্ত মানুষ ব্যস্ততা থাকবে না? তাই বলে একেবারে যোগাযোগ বাদ দিবেন। এটা কেমন কথা!এই তো স্যার যোগাযোগ করলাম–এখন বলুন কী করতে পারি।খেদমত আপনি কী করবেন? খেদমত করব আমরা। আমরা হলাম জনগণের খেদমতগার।গরিবকে স্মরণ করেছেন কী জন্যে স্যার বলুন।আমার মেজ মেয়ের বিয়ে।

বাহ্‌ বাহ্‌ খুব ভালো সংবাদ।ভালো সংবাদ মন্দ সংবাদ জানি না। মেয়ে যখন আছে পার তো করতে হবে–আপনার ছেলেপুলে নাই–ঝাড়া হাত-পা মানুষ, ছেলেপুলের বিয়েশাদির যন্ত্রণা আপনাকে পোহাতে হচ্ছে না। You are a lucky man.মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে যদি আপনার কোনো কাজে লাগি বলতে লজ্জা করবেন না।

আরে লজ্জা করব কেন? আপনি তো বাইরের কেউ না। আপনার ভাবি কাল রাতেও বলছে–মোবারক সাহেবকে কিন্তু টেলিফোনে দাওয়াত দেবে না। নিজে গিয়ে দাওয়াত দেবে।আপনি কিন্তু স্যার ভাবির কথা শোনেন নি, টেলিফোনে দাওয়াত সেরেছেন।আরো ছিঃ ছিঃ কী যে বলেন! বিয়ের খবরটা ইন অ্যাডভান্স আপনাকে দিলাম–দাওয়াতের তো কার্ডই ছাপা হয় নি।স্যার বিয়েটা কবে?

এখানো দেরি আছে। ২৫ তারিখ শুক্রবার, সেনাকুঞ্জে।আপনার মেয়েকে একটু জিজ্ঞেস করে দেখবেন সে চাচার কাছ থেকে কী উপহার চায়। নাকি আমি নিজেই জিজ্ঞেস করব? সর্বনাশ ঐ কাজ করতে যাবেন না। সে গাড়ি চেয়ে বসবে। ঐ দিন সে তার মাকে বলছিল মোবারক চাচার অভ্যাস উপহার দেয়ার আগে জিজ্ঞেস করা কী উপহার চাই। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করে আমি বলব–লাল রঙের টয়োটা সিভান।লাল রঙের টয়োটা সিভানের শখ?

আরে ভাই ছিঃ ছিঃ আমার এই পাগলি মেয়ের কথার কোনো গুরুত্ব দেবেন না। যদি কিছু দিতে হয় একটা কোরান শরিফ দেবেন। মোবারক সাহেব।জ্বি।মেয়ের লাল গাড়ির শখের কথা আপনাকে বলা উচিত হয় নি। আপনি তো আবার ছেলেমেয়ের শখের অত্যধিক গুরুত্ব দেন–ভাই শুনুন আমার নিজের ব্যক্তিগত ধারণা–আল্লাহপাকের পাক কালামের চেয়ে ভালো গিফট কিছুই হয় না। এখন এর কারণে আপনারা আমাকে প্রাচীনপন্থী মনে করেন বা না করেন–কিছু যায় আসে না…

আফসারউদ্দিন খাঁ সাহেবও রেহানার মতো দীর্ঘ সময় কথা বললেন। মোবারক সাহেব ছাড়া পেলেন আধঘণ্টা পর। পিএকে বললেন–নোট করে রাখুন মন্ত্রী আফসারউদিনের মেয়ের বিয়ে ২৫ তারিখ। সেনাকুঞ্জে। বিয়ের টাইমটা জেনে নেবেন। গিফট আইটেম–একটা কোরান শরিফ সুন্দর করে র‍্যাপিং পেপারে মোড়া।কোরআন শরিফ?

হ্যাঁ।মোবারক সাহেব মনে মনে হাসলেন। মন্ত্রী আফসারউদিনের সঙ্গে এই রসিকতা করা যায়। সে নিশ্চিত ধরে নিয়েছে লাল রঙের টয়োটা সিভান আসছে। সে জানে না। এই জগতের কোনো কিছুই নিশ্চিতভাবে নেয়া ঠিক না। জগতের কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়।ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে চিঠি এসেছে। রফিক লিখছে–সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তার শরীর খারাপ। মা যেন একবার তাকে দেখতে যায়।

শাহেদাকে সেই চিঠি দেখানো হয়েছে। তিনি কিছু বলেন নি। ঝুমুর বলল, তুমি কি দেখতে যাবে? শাহেদা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়েছেন। সেই প্রশ্নেরও জবাব দেন নি। ঝুমুর বলল, তুমি যদি যেতে চাও, আপাকে বলতে হবে। দেখা করতে চাইলেই তো দেখা হয় না। ঘুস-টুস খাওয়াতে হয়। আগে থেকে না জানালে আপা ব্যবস্থা করবে কীভাবে? শাহেদা তারপরেও জবাব দিলেন না। ঝুমুর বলল, তুমি কি আপার সঙ্গে কথা বলবে? আপা ঘরেই আছে। আজ সে কোথাও যাবে না।তুই স্কুলে যা। তোকে এত কথা বলতে হবে না।

আমি আজ স্কুলে যাব না। আপার সঙ্গে সারাদিন গল্প করব।কর যা ইচ্ছা।মিতু দরজা ভিজিয়ে শুয়ে আছে। ছোট বোনের সঙ্গে গল্প করার ব্যাপারে তার তেমন আগ্ৰহ দেখা যাচ্ছে না। ঝুমুর কয়েকবার কাছে গেল, বিছানার পাশে বসল। মিতু তাকিয়ে দেখল–কিছু বলল না আপা মাথা বিলি দিয়ে দেব? মিতু না-সূচক মাথা নাড়ল।শুয়ে আছ কেন? শরীর খারাপ লাগছে? শরীর খারাপ লাগছে না। শরীর ভালোই, আরাম করছি। বিকেল পর্যন্ত শুয়ে থাকব।তারপর? বিকেলে বেরুব।ঝুমুর আপার চোখের উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, রাতে শুটিং আছে?

হুঁ।সারারাত শুটিং চলবে? মিতু হাঁ-সূচক মাথা নেড়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে পাশ ফিরল। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল, ঝুমুর তুই কি আমার একটা কাজ করে দিবি? অবশ্যই দেব।একটা চিরুনি কিনে আনবি। সুন্দর একটা চিরুনি।চিরুনি দিয়ে কী করবে?

চিরুনি দিয়ে মানুষ কী করে।তোমার তো চিরুনি আছে এই জন্যেই জিজ্ঞেস করছি।মবিন ভাইকে দেব। ঐ দিন দেখলাম ওর চিরুনি নেই।আমিও তাই আন্দাজ করছিলাম।জানালার পর্দা টেনে দে তো।ঝুমুর উঠে পড়ল। জানালার পর্দা টেনে দিতে বলার অর্থ–আমি এখন ঘুমুব। আপা তাকে খুব ভদ্রভাবে বলছে, তুই উঠে চলে যা।আপা তুমি চা খাবে? চা বানিয়ে আনব?

না।ঝুমুর ইতস্তত করে বলল, তোমাকে আমি একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম। আপা, জরুরি কথা।বল।আমি এই বছর পরীক্ষা দেব না। সামনের বছর দেব।মিতু কিছু বলছে না। চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। মনে হচ্ছে সে ঘুমিয়ে পড়েছে।আপা আমি একদম পড়াশোনা করতে পারছি না। বই নিয়ে বসি অন্য কথা ভাবি। সামনের বছর আমি খুব মন দিয়ে পড়ব। পরীক্ষায় দেখবে খুব ভালো করব। ঠিক আছে আপা? মিতু চোখ না মেলেই বলল, আমার হ্যান্ডব্যাগ থেকে টাকা নিয়ে একটা চিরুনি কিনে না।এখনি যাব?

এক সময় গেলেই হবে।পরীক্ষার ব্যাপারে তো তুমি কিছু বললে না।মিতু চাপা গলায় বলল, পরীক্ষা দেয়া না-দেয়া তোর ব্যাপার। আমার আর বলার কী আছে? রাগ করছ না তো? না। তুই এখন ঘর থেকে যা।ঝুমুর চিরুনি কিনতে বের হয়ে গেল। তখন ঘরে ঢুকলেন শাহেদা। তাঁর হাতে চায়ের কাপ। পিরিচে দু’টা বিসকিট। মিতু বিছানায় উঠে বসতে বসতে বলল, চা খাব না। মা। তুমি খেয়ে ফেল। বিসকিটও খাব না।

সকালে নাশতাও খাস নি। খিদে জমাচ্ছি। দুপুরে এক গামলা ভাত খেয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমুব।শাহেদা মেয়ের পাশে বসে চা খাচ্ছেন। মিতু বলল, বিসকিট খাও মা। তোমার খাওয়া দেখি।খাওয়া দেখার কী আছে? অনেক কিছুই আছে। পৃথিবীর সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো খাওয়া। সেই খাওয়া দেখাটা তুচ্ছ করার মতো কিছু না।বাড়িওয়ালা বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেছে, শুনেছিস? হুঁ। ঝুমুরের কাছে শুনলাম।বাড়ি দেখেছিস?

না।এক তারিখের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে তো।বললেই তো বাড়ি ছেড়ে দেয়া যায় না।আমি বলেছি ছেড়ে দেব।বলেছ, ভালো করেছ। আমি বুঝিয়ে বলব।আমি এখানে থাকতে চাই না। লোকজন আজেবাজে কথা তোর নামে ছড়াচ্ছে।যেখানে যাবে সেখানেও তো ছড়াবে।শাহেদা চুপ করে গেলেন। চায়ে বিসকিট ভিজিয়ে তিনি বিসকিট খাচ্ছেন। মিতু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।আজ রান্না কী মা?

নলা মাছ নিয়ে এসেছিল। রাতে খাবি। দুপুরে ডাল ভাত।দুপুরেই রাঁধ মা। আরাম করে খাই। রাতে আমি থাকব না। রাতে শুটিং আছে।আজ শুক্রবারে। শুক্রবার তো শুটিং থাকে না।আজ আছে।ঐ দিন না বললি ছবির কাজ শেষ হয়ে গেছে? প্যাঁচওয়ার্ক বাকি আছে। কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল সেগুলো আবার করা হবে।রাতে ফিরবি না? না।শাহেদা মুখ শক্ত করে বসে আছেন। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। চায়ের কাপে তিনি এখন আর চুমুক দিচ্ছেন না। বিড়বিড় করে কী যেন বললেন। মিতু শঙ্কিত গলায় বলল, কিছু বলছ মা?

শাহেদা ক্ষীণ স্বরে বললেন, তোর বাবাকে কাল রাতে স্বপ্নে দেখেছি। মুখটা খুব মলিন। তিনি বললেন–তুমি এত কষ্ট করছ, কেন? কষ্ট করার দরকার কি? এই টিনটা রাখ, এখানে ইঁদুর মারা বিষ আছে। তুমি নিজে খাও–মেয়ে দু’টাকে খাওয়াও, দেখবে সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এই বলে তিনি একটা টিনের কৌটা আমার হাতে দিলেন।রাতদিন এইসব ভাব এই জন্যেই স্বপ্নে দেখেছি।তোর বাবা কথাটা কিন্তু ভুল বলে নি।মিতু হাসছে। শাহেদা বললেন, হাসছিস কেন?

এমনি হাসছি। তুমি ঝাল ঝাল করে নলা মাছ রাঁধ তো মা। ইঁদুর মারা বিষ আবার মিশিয়ে দিও না। আমার এখন মরার কোনো রকম ইচ্ছা নেই।শাহেদা নড়লেন না। বসেই রইলেন। মিতু বলল, এক কাজ করলে কেমন হয় মা, আজ আমি রান্না করি, রান্না করে তোমাকে খাওয়াই। তুমি চুপচাপ শুয়ে বিশ্ৰাম কর। আরেকটা কথা শোন, সংসারের সমস্যা নিয়ে তুমি মোটেও ভাববে না। আমি কী করব তোমাকে বলি, ঝুমুরকে বিয়ে দিয়ে দেব। ওর আর পড়াশোনা হবে না। ওর পড়াশোনায় মন নেই। মোটামুটি ধরনের একটা ছেলে দেখে ওর বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। ওর চেহারা ভালো–ছেলে পাওয়া কোনো সমস্যা হবে না। তোমাকে আমি বলি নি।

এর মধ্যেই একটা সম্বন্ধ এসেছে। ছেলেটা ব্যাংকে চাকরি করে। ছোট চাকরি। তবে সংসারের দায়দায়িত্ব নেই। দু’জন মিলে ওরা সুখেই থাকবে। মবিন ভাই এর মধ্যে একটা চাকরি পেয়ে যাবে। তখন আমি বিয়ে করব। তুমি থাকবে আমার সংসারে। মাঝে মাঝে ঝুমুরকে গিয়ে দেখে আসবে। এখন তুমি আসি তো আমার সঙ্গে, রান্নার সময় যদি ভুল-টুল করি তুমি ধরিয়ে দেবে। আরেকটা কথা মা–এর পরে যদি কোনোদিন স্বপ্নে বাবাকে দেখ তোমার কাছে ইঁদুর মারা বিষ গছিয়ে দিতে চাচ্ছে তাহলে তুমি তাঁকে কিন্তু কঠিন ধমক দেবে।

মিতু বিছানা থেকে নামল। তার মাকে হাত ধরে তুলল। মিতুর মুখ হাসি হাসি।শাহেদা বললেন, ঝুমুরকে বিয়ে করতে চাচ্ছে যে তার নাম কি? আমানুল্লাহ্। অগ্ৰণী ব্যাংকে কাজ করে।কী রকম কাজ? দারোয়ান টারোয়ান না তো? না দারোয়ান না, ক্লার্ক।তোকে সরাসরি বলেছে? আমাকে বলে নি, মবিন ভাইকে বলেছে।ওকে কেন বলবে? ও কে? তার কিছু বলার থাকলে সরাসরি তোকে কিংবা আমাকে বলবে। ছেলেটার দেশ কোথায়? আমি মা কিছুই জানি না। আমি খোঁজ নিয়ে বলব।কবে খোঁজ নিবি?

আজই খোঁজ নেব। এফডিসিতে যাবার আগে মবিন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে তারপর যাব।মবিন শুয়ে ছিল। মিতুকে দেখে ধড়মড় করে উঠে বসল। অবাক হয়ে বলল, আরো তুমি।মিতু বলল, অবেলায় শুয়ে আছ কেন? বেকার মানুষের আবার বেলা, অবেলা, কালবেলা? তুমি এই সময় যে? এটা কি নিষিদ্ধ সময়? না নিষিদ্ধ হবে কেন? এস ভেতরে এস? আমার চিরুনি এনেছ? হুঁ।সিগারেট? না। সিগারেট আনা হয় নি।কতক্ষণ থাকবে? রাত আটটা পর্যন্ত থাকতে পারি। কিন্তু তোমার তো সময় হবে না।সময় হবে না তোমাকে কে বলল? সন্ধ্যাবেলায় তোমার টিউশানি আছে না?

ছিল–এখন নেই। সন্ধ্যাটায় আমি এখন স্বাধীন। গতকাল সন্ধ্যায় কী করেছি। জান, একটা সিনেমা দেখে ফেললাম, ‘জানি দুশমন’। আশায় আশায় গিয়েছিলাম, হয়তো তোমাকে দেখব। জানি দুশমন ছবিতে তুমি কাজ কর নি। তাই না? না!টেপী কি করেছে? সুন্দর মতো একটা এক্সট্রা মেয়ে দেখলাম। নায়িকার সঙ্গে নদীতে পানি আনতে গেল।টেপী ঐ ছবিতে কাজ করেছে কিনা বলতে পারছি না।দেখা হলে জিজ্ঞেস কোরো তো। ওর সঙ্গে এখন দেখা হয় না?

কম হয়।ছবির ঐ মেয়েটাকে দেখে মনে হলো, এ নিশ্চয়ই টেপী। মেয়েটার মাথা ভর্তি চুল, জোড়া ভুরু।জোড়া ভুরু! তাহলে টেপী না। টেপীর জোড়া ভুরু না।মবিন আগ্রহের সঙ্গে বলল, টেপীর কথা আমার প্রায়ই মনে হয়। ওকে আমার দেখার খুব ইচ্ছা। একদিন তোমার সঙ্গে এফডিসিতে যাব। মেয়েটাকে দেখে আসব।আচ্ছা।ও আছে কেমন?ভালোই আছে। দারুণ এক বড়োলোকের সঙ্গে তার ভাব হয়েছে। সেদিন এফডিসি থেকে গাড়ি পাঠিয়ে তাকে নিয়ে গেল।বল কী! সত্যি? হ্যাঁ সত্যি।টেপী নিশ্চয়ই খুব খুশি।না খুশি না। ও দেখলাম খুব ভয়ে ভয়ে গাড়িতে উঠল। মুখটা কান্নাকান্না।কেন বল তো?

বড়লোকেরা গাড়ি পাঠিয়ে তো আর গল্প করার জন্যে নিয়ে যায় না, প্রেম করার জন্যেও নিয়ে যায় না–অন্য কারণে নিয়ে যায়। সবাই সেটা জানে। কাজেই সবার চোখের উপর দিয়ে বিরাট এক গাড়িতে করে যাওয়া খুব লজ্জার ব্যাপার না?অস্বস্তির ব্যাপার তো বটেই। দারুণ বড়লোকদের জন্যে দারুণ বড়লোক মেয়ে পাওয়া সমস্যা না–তারা পথেঘাটের মেয়েদের গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে যাবে কেন?

মিতু হাই তুলতে তুলতে বলল, পথের মেয়েদের সঙ্গে যত সহজ হওয়া যায় অন্যদের সঙ্গে তো তত সহজ হওয়া যায় না। পথের মেয়ের আলাদা আনন্দ আলাদা থ্রিল। যাই হোক টেপীকে নিয়ে আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। অন্য কিছু নিয়ে কথা বল।কী কথা শুনতে চাও?যা ইচ্ছা বল। তার আগে কাছে আস তো আমি তোমার চুল আঁচড়ে দিই। নাকি আমি চুল আঁচড়ে দিলে লজ্জা লাগবে?

না লজ্জা লাগবে না।মবিন এগিয়ে এল। খুব কাছে এল না। মাথা এগিয়ে দিল। যেন গায়ের সঙ্গে গা লেগে গেলে মস্ত বড়ো অন্যায় হয়ে যাবে। মিতু চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল, তুমি কি ঝুমুরের জন্যে একটা ছেলে যোগাড় করে দেবে? আমি ওর বিয়ে দিয়ে দেব।বাচ্চা মেয়ে বিয়ে দেবে কেন?

ওরা এখনই বিয়ে হওয়া ভালো। বিয়ে হলে মা মানসিক শান্তি পাবেন। মা ওকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করেন। মা’কে আমি অবশ্যি বলেছি আমানুল্লাহ নামের এক ছেলে ঝুমুরকে বিয়ে করতে চায়। এতেই মা খুশি।আমানুল্লাহ কে?

মিতু হাসতে হাসতে বলল, আমানুল্লাহ কেউ না। আমার বানানো এক নাম। মা’কে খুশি করার জন্যে গল্পটা তৈরি করা।তিনি খুশি হয়েছেন? হ্যাঁ খুশি হয়েছেন। অভিনয় তো আমি ভালো পারি–যাই বলি এত সুন্দর করে বলি, সবাই বিশ্বাস করে।আমার বেলাতেও তাই করা? না।কখনো না?

 

Read more

পেন্সিলে আঁকা পরী পর্ব:১১ হুমায়ূন আহমেদ

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

পেন্সিলে আঁকা পরী পর্ব:০৯ হুমায়ূন আহমেদ

আমি জানি। এখন তুমি আমার দিকে তাকাও।উফ! তুমি কী যে বিরক্ত কর! আমার দিকে না তাকালে আমি আরো বিরক্ত করব।সে ঝুমুরের দিকে তাকাল। তাকিয়েই হেসে ফেলল। এত সুন্দর করে সে হাসল যে হাসি দেখে ঝুমুরের চোখে পানি এসে গেল।ভেতর থেকে শাহেদা আবারো ক্লান্ত গলায় ডাকলেন, ঝুমুর।

ঝুমুর কঠিন স্বরে বলল, ডাকাডাকি করবে না মা, আমি আসব না।না, ঝুমুর যাবে না। সে বারান্দায় বসে থাকবে–সারারাত বসে থাকবে। পাশে বসে থাকা মানুষটার সঙ্গে কথা বলবে। ওকে একা রেখে সে যেতে পারবে না। পাশে বসা মানুষটা বলল, পানি খাব ঝুমুর।

ঝুমুর বলল, না তুমি পানি খাবে না। পানি খাবার কথা বলে তুমি আমাকে ভেতরে পাঠাতে চাচ্ছ। ভেতরে গেলেই মা’র কাছে যেতে হবে। মা’র কাছে গেলে আমি আর আসতে পারব না। তোমার সঙ্গে গল্প করাও হবে না।মা’কে তুমি ভালোবাস না?

না, আমি কাউকেই ভালোবাসি না।আমার ধারণা তুমি রাগ করে এ রকম কথা বলছি–আসলে তুমি সবাইকে ভালোবাস।তোমার ধারণা নিয়ে তুমি বসে থাক।কী ব্যাপার, তুমি দেখি আমার উপরও রাগ করছ।আমি সবার উপরই রাগ করছি।কিছুক্ষণের জন্যে কি রাগ বন্ধ করা যায়? যায়।বেশ, রাগটা খানিকক্ষণের জন্যে ধামাচাপা দাও। ধামাচাপা দিয়ে আমার হাত ধরে বস। গল্প কর।কী গল্প?

যে-কোনো গল্প। তোমার বাবার গল্প বল।বাবার কোনো গল্প নেই। ভালোমানুষ ছিলেন–হঠাৎ একদিন মরে গেলেন। ব্যাস।তোমাদের ভালোবাসতেন না? বাসতেন? খুব ভালোবাসতেন, না মোটামুটি?

ভাইয়াকে খুব ভালোবাসতেন। ভাইয়াকে ডাকতেন ভোম্বল সিং। ছোটবেলায় গোব্দা গোদা ছিল তো–ভোম্বল সিং নাম দিয়েছিলেন–বড় হয়েও সেই নাম। ভাইয়া কত রাগ করেছে, কান্নাকাটি করেছে, লাভ হয় নি। বাবা ভোম্বল সিং ডাকবেই।তোমার ভাইয়া বাবাকে কেমন ভালোবাসত?

ভাইয়া ভালোবাসত টাসত না, বাবাকে এড়িয়ে চলত। বাবার খুব চিড়িয়াখানা দেখার শখ। আমরা ঢাকায় থাকতাম, উনি থাকতেন সিলেটের জঙ্গলে।। যতবার ঢাকায় আসতেন ঘ্যান ঘ্যান করতেন–ভোম্বল সিং, চল যাই চিড়িয়াখানা দেখে আসি। ভাইয়া যাবে না। কত সাধাসাদি। শেষটায় মন খারাপ করে আমাকে নিয়ে যেতেন। বাবা ঢাকা এসেছেন অথচ চিড়িয়াখানায় যান নি–এরকম কখনো হয় নি। বাবা কীভাবে মারা গোল সেটা শুনবেন?

বল।গরমের সময় হঠাৎ ছুটি নিয়ে ঢাকা চলে এলেন। মা’কে বললেন, একা একা থাকতে অসহ্য লাগে। তোমরা এক জায়গায়-আমি অন্য জায়গায়। উপায়ও নেই, জঙ্গলের মধ্যে তোমাদের আমি কোথায় রাখব? বাচ্চাদের পড়াশোনা। মন মানে না বলে ছুটি নিয়ে চলে আসি। ভাবছি টাকা-পয়সা প্রভিডেন্ট ফান্ডে যা আছে তাই নিয়ে ব্যবসা করব। মা বলল, তাই কর। চাকরি যথেষ্ট হয়েছে।

এই বয়সে সিরিয়াস ব্যবসা তো পারব না। টাকা-পয়সা যা আছে তা দিয়ে একটা ফার্মেসি দেব। তার আয়ে সংসার চলবে। কেমন হবে বল তো? ভালোই হবে।ছেলেমেয়ের জন্যেই তো সংসার। সেই ছেলেমেয়েই যদি চোখের সামনে না থাকল তাহলে সংসার করে লাভ কী?

ঠিকই বলেছ।এবার ফিরে গিয়েই চাকরি ছাড়ার ব্যবস্থা করব। যথেষ্ট হয়েছে। আর সহ্য হচ্ছে না।চাকরি ছেড়ে দেবেন। এই সিদ্ধান্ত নেবার পর বাবা খুব খুশি। সবাইকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় যাবেন। মা-ও যাচ্ছেন। শুধু ভাইয়া যাবে না। জন্তু-জানোয়ার তার নাকি ভালো লাগে না। বাবা কত অনুরোধ করলেন। লাভ হলো না।

শেষে মন খারাপ করে বাবা আমাদের নিয়েই গেলেন। বাঁদর দেখলেন, ময়ুর দেখলেন, হাঁটতে হাঁটতে আমাদের পায়ে ব্যথা–বাবা নির্বিকার। বিকেলে চিড়িয়াখানা থেকে ফিরে এসে বাবা বললেন, শাহেদা আমার শরীরটা যেন কেমন করছে।মা উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, কেমন করছে মানে কী? বুঝতে পারছি না। কী রকম যেন লাগছে–ভোম্বল সিং কোথায়? ও গেছে বন্ধুদের বাসায়। ডাক্তার ডাকতে হবে? বুঝতে পারছিনা। হঠাৎ প্রেসার বেড়ে গেল কিনা, সব কেমন যেন অন্ধকার লাগছে। ধোঁয়া ধোঁয়া।এইসব কী বলছ? ভোম্বল সিং কোথায়? ভোম্বল?

আপা ছুটে গেল। ডাক্তার ডাকতে। আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে থাকলাম, মা কাঁদতে লাগল। বাবা শুধু একটু পর পর বলতে লাগল–ভোম্বল কোথায়? ভোম্বল সিং? ঠিক দু’ঘণ্টার ভেতর বাবা মারা গেলেন। আমরা হাসপাতালে নেবারও সময় পেলাম না। ভাইয়া বাসায় ফিরাল সন্ধ্যার পর। বাসায় তখন অনেক লোকজন। ভাইয়া অবাক হয়ে বলল, ব্যাপার কী? কী হয়েছে? তারপর?

তারপর আবার কী? কিছু না।তোমার ভাইয়া বাবার মৃত্যু কীভাবে গ্রহণ করল? জানি না। কীভাবে গ্রহণ করল। সে ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। ফিরে এল তিনদিন পর। বাবার এর মধ্যে কবর হয়ে গেছে। ঘরে লোকজনের ভিড় নেই। মা’র হার্টের অসুখের মতো হয়েছে–বিছানায় শোয়া। ডাক্তার তাঁকে কড়া ঘুমের ওষুধ দিয়েছে। ঘুমের ওষুধ খায়–ঘুমুতে পারে না–ঝিম মেরে পড়ে থাকে।

ভাইয়া ফিরে এসে সংসারে হাল ধরল। তার তখন কত বয়স? বি এ ফাস্ট ইয়ারে পড়ে। চাকরি বাকরির অনেক চেষ্টা করল, পেল না। বাবার প্রভিডেন্ট ফান্ড দিয়ে ব্যবসার চেষ্টা করল। হেন ব্যবসা নেই যা সে করে নি। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরিশ্রম।

মানুষ যে কী অমানুষিক পরিশ্রম করতে পারে আপনি ভাইয়াকে সেই সময় না দেখলে বিশ্বাস করবেন না, এক সময় খবর পেল এফডিসিতে মালামাল সাপ্লাইয়ের ভালো ব্যবসা আছে। ইনভেস্টমেন্ট কম, লাভ বেশি। শুরু করল সেই ব্যবসা।লাভ হলো? মোটামুটি হলো। ভাইয়ার ভাগ্য ছিল খারাপ। খারাপ ভাগ্যের মানুষ তো খুব ভালো কিছু করতে পারে না।উনি মানুষ খুন করলেন কেন?

সেটা আমি আপনাকে বলব না। সব কথা বলতে নেই। কিছু কিছু কথা না বলাই ভালো। হয়েছে কী জানেন? ভাইয়া তো গভীর রাতে ফেরে, সেদিন হঠাৎ দুপুরে এসে হাজির। আমাকে বলল, খুকি চিড়িয়াখানায় যাবি? ভাইয়া আমাকে ঝুমুর ডাকত না, ডাকত খুকি। ভাইয়া আমাকে চিড়িয়াখানায় নিয়ে যেতে চায় শুনে আমি অবাক হলাম না।

কারণ আমি জানতাম বাবার মৃত্যুর পর ভাইয়া প্রায়ই চিড়িয়াখানায় যায়। বানরের খাচার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি বললাম, হ্যাঁ ভাইয়া যাব। আমি কাপড় পরে তৈরি হয়েছি। ভাইয়া বলল–না থাক। তখন আমরা মগবাজারের একটা বাসায় থাকতাম। ছোট একতলা বাসার একদিকে আমরা অন্যদিকে হাফিজ সাহেব বলে এক ভদ্রলোক আর তার স্ত্রী, দুই ছেলে। সেদিন ভাইয়া সেই যে দুপুরে এসেছে আর বেরুচ্ছে না। সন্ধ্যাবেলায় মা বললেন–কী-রে তোর কি শরীরটা খারাপ?

ভাইয়া বলল, হঁ।জ্বর-টর নাকি রে দেখি কাছে আয় তো।ভাইয়া বলল, দেখতে হবে না। জ্বর টর কিছু হয় নি। রাতে ভাইয়া ভাত খেল না। ন’টার সময় ঘুমিয়ে পড়ল। সে বাইরের ঘরে ঘুমাল। আমি গিয়ে দেখি মশা ভিনভন করছে–এর মধ্যেই ভাইয়া ঘুমাচ্ছে। আমি মশারি খাটিয়ে দিলাম। ভাইয়া রাত বারটার দিকে জেগে উঠল। নিজেই রান্নাঘরে ঢুকে চায়ের কেতলি বসাল। খটখট শব্দ শুনে মা জেগেছে।

রান্নাঘরে ঢুকে অবাক হয়ে বলল, তুই এখানে কী করছিস, ভাইয়া হাসিমুখে বলল, চা বানাচ্ছি। তুমি খাবে মা? মা বলল, না। ভাইয়া বলল, খাও না। দেখ আমি কী সুন্দর চা বানাই! ভাইয়া চা বানোল। মা’কে নিয়ে দু’জনে মিলে চা খেল। তার কিছুক্ষণ পর দরজার কলিংবেল বাজতে লাগল। মা বললেন, কে? পাশের ঘরের হাফিজ সাহেব বললেন, খালাম্মা দরজা খুলুন। পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলেছে।

মা হতভম্ব হয়ে দরজা খুললেন। আমি তখন জেগেছি, আপা জেগেছে। আমরা বুঝতেই পারছি না। কী হচ্ছে। আমরা দেখলাম, অনেকগুলো পুলিশ বাড়িতে ঢুকাল। ওরা বিছানা, বালিশ, খাট, মিটসেফ ওলট-পালট করতে লাগল। আপা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ভাইয়া কী ব্যাপার? ভাইয়া জবাব দিল না। একজন পুলিশ অফিসার বললেন, ভয়ের কিছু নেই। রুটিন চেক। আমরা এক্ষুণি চলে যাব।

তারা কিছুক্ষণের মধ্যে চলে গেল, তবে যাবার সময় ভাইয়াকে নিয়ে গেল। আপা বললেন, ভাইয়াকে কোথায় নিচ্ছেন? পুলিশ অফিসার বললেন, থানায় দুএকটা প্রশ্নট্ৰিশ্ন জিজ্ঞেস করে ছেড়ে দেব। আজ রাতেই ছেড়ে দেব। ভয়ের কিছু নেই।

পুলিশ ভাইয়াকে ছাড়ল না। এই যে ভাইয়া গেল আর বাসায় ফিরল না। পরদিন ভোরবেলা আপা আমাকে নিয়ে থানায় গেছে। ভাইয়ার সঙ্গে দেখা হলো হাজতে। ভাইয়া আপার দিকে তাকিয়ে বলল, এখানে ঘোরাঘুরি করে লাভ নেই। বাসায় চলে যা। আমি একটা খুন করেছি। পুলিশের কাছে স্বীকার করেছি।ঝুমুর।ঝুমুর পেছন ফিরল। শাহেদা দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখে বিস্ময় ও ভয়। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, কার সঙ্গে কথা বলছিস?

ঝুমুর বলল, কারো সঙ্গে না। নিজের মনে কথা বলছি।আয় ঘুমুতে আয়।ঝুমুর বলল, আমি আরো কিছুক্ষণ বসে থাকব।দুপুররাতে একা একা বারান্দায় বসে থাকবি এটা কেমন কথা? আমার বসে থাকতে ভালো লাগছে মা। আয় লক্ষ্মীসোনা, ঘরে আয়। শাহেদা বারান্দায় এসে ঝুমুরের হাত ধরলেন। ঝুমুর আপত্তি করল না, উঠে এলো। শাহেদা বললেন, রাতে তো কিছু খাস নি। খিদে হয়েছে, কিছু খাবি? একটা পরোটা ভেজে দেব?দাও, তোমার শরীরটা এখন ভালো লাগছে মা?

শাহেদা জবাব দিলেন না। রান্নাঘরে ঢুকলেন। পরোটা বানানো গেল না। ময়দা শেষ হয়ে গেছে। তিনি ভুলে গেছেন। ময়দার কথা মিতুকে বলা হয়েছে–ভোরবেলা সে নিয়ে আসবে।শাহেদা বললেন, চারটা চাল ফুটিয়ে দিই? ঝুমুর বলল, কোনো কিছু ফুটিয়ে দিতে হবে না। তুমি ব্যস্ত হয়ে না। এক গ্লাস শরবত খেতে পারি। ঘরে কি চিনি আছে মা?

শাহেদা দেখলেন চিনির কোটাও খালি। ঝুমুর বলল, একেকটা দিন খুব অদ্ভুত হয়। কিছু পাওয়া যায় না। আবার কোনো কোনো দিন আছে–সব পাওয়া যায়। সেদিন তুমি যা চাইবে তাই পাবে।শাহেদা শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছেন। রান্নাঘরের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে ঝুমুর। মেয়েটাকে আজ অনেক বড় বড় লাগছে। ঝুমুর বলল, মা শোন, আপার একটা কথা তোমাকে বলি–আপাকে নিয়ে মাঝে মাঝে তুমি দুশ্চিন্তা কর। আজেবাজে কথা ভাব। এইসব ভাবার কোনো কারণ নেই। আপা মরে যাবে তবুও অন্যায় কিছু করবে না।

শাহেদার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ঝুমুর বলল, সিনেমার কাজ, শুটিঙের কাজ–রাত দিন বাইরে থাকতে হয় বলে লোকজন আজেবাজে কথা বলে। ওদের আজেবাজে কথা বলার কোনো কারণ নেই।শাহেদা কাপা গলায় বললেন, সেইটাই তো আমি বলি মা। আমার নিজের মেয়ে আমি তাকে জানি না?

লোকজনের আজেবাজে কথা বলার কোনো অধিকারও নেই। আপা কি সামান্য চাকরির জন্যে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে যায় নি? কেউ কি দিয়েছে তাকে কিছু জোগাড় করে? আজি কোন বড় বড় কথা বলে? শাহেদার চোখে পানি এসে গেছে। তিনি চোখ মুছলেন। চোখ মুছতে মুছতে বললেন–তুই যে বললি ও রাতে ঘুম থেকে উঠে কাঁদে। কাঁদে কেন?

মনের দুঃখে কাঁদে। আমার মনে হয় বেশিরভাগ সময় মবিন ভাইয়ের জন্যে কাঁদে। প্রায়ই তো মবিন ভাইয়ের টিউশ্যানি চলে যায়। বেচারার প্রায় না খেয়ে থাকার মতো জোগাড় হয়। একবার কী হয়েছে জান মা? প্ৰায় দশদিন মবিন ভাই ভাত খায় নি। যে হোটেলে বাকিতে খেত তারা খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে…

থাক এসব শুনতে চাচ্ছি না।শোন না মা—মবিন ভাই বাধ্য হয়ে চিড়া আর গুড় কিনে আনল। চিড়া পানিতে ভিজিয়ে গুড় দিয়ে খায়। আপা জানতে পেরে হোটেলের বিল মিটিয়ে দিয়ে এসে খুব কাঁদছিল।শাহেদা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। ঝুমুর এসে মায়ের পাশে বসল। কোমল গলায় বলল, তুমি মবিন ভাইয়ের সঙ্গে আপার বিয়ে দাও মা। ওরা কয়েকটা দিন আনন্দ করুক।ও বউকে খাওয়াবে কী?

চিড়া আর গুড় খাওয়াবে। তাতে কী মা? ওরা দু’জন যখন বারান্দায় বসে গল্প করবে তখন দেখো তোমার কত ভালো লাগবে।শাহেদা দেখলেন ঝুমুরের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।আজমল তরফদারের ছবি ‘প্ৰেম দেওয়ানা’র ডাবিং শুরু হয়েছে। ডাবিং স্টুডিওতে জমজমাট অবস্থা। ন’টা থেকে শিফট শুরু হলেও স্টার সুপারস্টাররা দশটা-এগারটার দিকে আসেন।

যিনি যত বড়ো স্টার তিনি আসবেন তত দেরিতে। গ্যালাক্সি স্টার ফরহাদের সেই হিসেবে বারটার দিকে আসার কথা। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় তিনি সকাল ন’টার সময় চলে এসেছেন। তাঁর মুডও আজ খুব ভালো। গাড়ি থেকে নেমেই চেঁচিয়ে বললেন, আজমল ভাই জস্পেশ করে চা বানান দেখি। আপনার ব্যাটেলিয়ান রেডি?হ্যাঁ রেডি।দেখবেন ইনশাল্লাহু চল্লিশ লুপ এক শিফটে নামিয়ে দেব। ম্যাডাম এসেছেন?এখনো আসেন নি।ডায়ালগ দিতে বলুন। বসে বসে মুখস্থ করতে থাকি। চা তো এখনো দিল না।

ফরহাদ সাহেব ডাবিং রুমে ঢুকে গেলেন।আজমল তরফদারের সঙ্গে বিমল দাঁড়িয়ে আছে। সে এসেছে বিশেষ কারণে, রেশমাকে বড় সাহেবের অফিসে নিয়ে যেতে হবে। বড় সাহেব খবর পাঠিয়েছেন। রেশমা’র আজ ডাবিং আছে। সে ন’টার আগেই এসে পড়ে। আজই শুধু দেরি হচ্ছে।বিমল ফরহাদকে দেখিয়ে নিচু গলায় বলল, উনি কি আপনার ছবির হিরো?

হুঁ। যা তা হিরো না গ্যালাক্সি হিট হিরো।আমাদের ছবিতে কি উনি থাকছেন? হুঁ। না থাকলেই ভালো হত।কেন? গাধা। অভনয় জানে না।তাহলে তাকে নিচ্ছেন কেন? রিকশাওয়ালারা তাকে দেখতে চায়।তাকে কি নতুন ছবির কথা বলা হয়েছে? এখনো বলা হয় নি, তবে সে জেনে গেছে যে আমরা বড় বাজেটে নামছি। ছবি পাড়ায় খবর হয়ে গেছে। আজ যে ন’টার সময় উপস্থিত–এই কারণেই উপস্থিত।আপনাকে খাতির করা শুরু করেছে?

হুঁ।লুপ লাগানো হয়েছে। খণ্ড খণ্ড দৃশ্য বড় পদায় দেখানো হচ্ছে। ছবি দেখে দেখে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ডায়ালগ বলবেন, ম্যাগনেটিক ফিতায় সেই শব্দ ধরা হবে। পরে একসঙ্গে জোড়া লাগানো হবে।বিমল বলল, ব্যাপারটা তো খুব ইন্টারেস্টিং।

কাগজে-কলমে খুব ইন্টারেস্টিং। তবে কাজ শুরু হলে দেখবে কত ঝামেলা। ঠোঁট মেলানো যায় না। ডায়ালগ যায় একদিকে ঠোঁট নড়ে অন্যদিকে।কাজ শুরু হবে কখন? ম্যাডাম এলেই শুরু হবে।ফরহাদ সাহেব চায়ের কাপ এবং হাতে স্ক্রিপ্ট নিয়ে আজমল তরফদারের কাছে চলে এলেন।কাজ শুরু হবে। কখন আজমল ভাই?

এই তো অল্প কিছুক্ষণ।আপনার সঙ্গে বসে গল্পগুজব করি? নতুন বই নাকি করছেন? বিগ বাজেট মুভি।হ্যাঁ।স্টোরি লেখা হয়েছে? হচ্ছে।নায়ক-নায়িকা কয় পেয়ার? ওয়ান ওর টু? এখনো কিছুই ঠিক হয় নি।আর্টিস্টের ব্যাপারে কিছু ভাবছেন? এখনো ভাবি নি।আমার অবশ্য দম ফেলার সময় নেই। হেভি বুকিং। তারপরেও আপনার ব্যাপার অন্য।থ্যাংক য়্যু।

আপনার ‘প্ৰেম দেওয়ানা’ও হিট করবে। ডায়ালগ মারাত্মক। হিট ডায়ালগ। ডায়ালগের জন্যে উঠে যাবে….কথাবার্তার এই পর্যায়ে ডাবিং স্টুডিওর দরজা ফাঁক করে রেশমা তাকাল। আজমল তরফদার ফরহাদ সাহেবের কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বললেন, রেশমা এস এস।

রেশমা পুরোপুরি হকচাকিয়ে গেল। আজমল তরফদার এরকম অন্তরিক ভঙ্গিতে ডাকবেন ভাবাই যায় না। সে দেরি করে এসেছে বলেই কি রসিকতা করছেন? এখনই কুৎসিত গালি শুরু হবে? হলভর্তি মানুষের সামনে গালি শুনতে এত খারাপ লাগে। তার হাত-পা জমে যাবার মতো হলো।

দাঁড়িয়ে আছ কেন, আস? পরিচয় করিয়ে দিই— এ হলো বিমল। বিমলচন্দ্র হাওলাদার। বিমল এর নাম রেশমা।বিমল তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়েছে। বিনীতভাবে সে সালাম দিল। ফরহাদ পর্যন্ত অবাক হয়ে তাকাচ্ছে।রেশমা ইতস্তত করে বলল, বাসের চাকা পাংচার হয়ে গিয়েছিল। ঠিক করল। এই জন্যে দেরি হয়েছে।

আজমল তরফদার বললেন, নো প্রবলেম। এগারটার আগে ডাবিং শুরু হবে না। তোমার বোধহয় দু’টা লুপ। এক সময় করে ফেললেই হবে। বিমল তোমাকে নিতে এসেছে। ওর সঙ্গে একটু যাও।কোথায় যেতে হবে, কী ব্যাপার। এইসব কিছুই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হচ্ছে না। রেশমা’র মনে হলো সে পালিয়ে যেতে পারলে বাচে।

আজমল তরফদার বললেন, রেশমা তুমি কি চা খেয়ে যেতে চাও r চা হয়ে গেছে। এক কাপ চা খেয়ে যাও।ডাইরেক্টর সাহেবের জন্যে আলাদা সুন্দর কাপে চা আসে। আজমল তরফদার নিজেই তার চায়ের কাপ এগিয়ে ধরলেন।রেশমা ক্ষীণ গলায় বলল, চা খাব না।আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি ফিরে এসে চা খেয়ো, এখন বরং বিমলের সঙ্গে চলে যাও।

ডাবিং স্টুডিওর সামনে কালো রঙের বিরাট একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির জানালার কাচে পর্দা দেয়া। বিমল এসে গাড়ির দরজা খুলে দিল। আশপাশের লোকজন কৌতুহলী চোখে তাকে দেখছে। তারচেয়েও বড় কথা আজমল তরফদার তাকে গাড়িতে তুলে দিতে এসেছেন।

মোবারক সাহেবের চোখে রিডিং গ্লাস। অর্ধচন্দ্ৰাকৃতি চশমা। এই চশমার অসুবিধা এই যে, যার দিকে তাকানো হয়। সে চোখ দেখতে পায়। তিনি কাউকে তার চোখ দেখাতে চান না। তাঁর ধারণা শরীরের যেমন পোশাকের প্রয়োজন, চোখের তেমন পোশাক দরকার। নগ্ন চোখ নগ্ন শরীরের মতো।মোবারক সাহেব বললেন, বোস, দাঁড়িয়ে আছ কেন?

রেশমা বসল। জড়োসড়ো হয়ে বসল। মেয়েটিকে তিনি আগে একবারই দেখেছেন। সে দেখা রাতের দেখা। দিনে কখনো দেখেন নি। এখন ঝকঝকে দিন। ঘড়িতে বাজছে বারটা একুশ। রাতের দেখা মানুষ দিনের আলোয় সম্পূর্ণ অন্য রকম হয়ে যায়। এই মেয়েটার ক্ষেত্রে সে রকম ঘটে। কিনা তাঁর জানার ইচ্ছা।

মেয়েটি সাজগোজ করে নি। ঐ রাতে বেশ সেজেছিল। কপালে টিপ ছিল। ঠোঁটে লিপস্টিক ছিল। আজ কপাল শূন্য, ঠোঁটেও লিপষ্টিক নেই। মেয়েটি কোলের উপর হাত রেখে বসেছে বলে তিনি তার হাত দেখতে পাচ্ছেন না। ঐ রাতে মেয়েটির হাতে সবুজ রঙের কাচের চুড়ি ছিল। আজ বোধ হয় চুড়ি পরে নি। চুড়ি পরলে চুড়ির টুংটং আওয়াজ কানে আসত।তোমার নাম টেপী তাই তো?

রেশমা জবাব দিল না। চুপ করে বসে রইল। মোবারক সাহেব চোখ থেকে রিডিং গ্রাস পুরোপুরি খুলে ফেললেন। তাঁর যে শুধু কাছে দেখার সমস্যা তাই না—মায়োপিয়া আছে বলে দূরের জিনিসও ভালো দেখতে পান না। মেয়েটিকে ভালোমতো দেখার জন্যে অন্য একটা চশমা দরকার। তিনি ড্রয়ার খুললেন। চশমা বের করে পরলেন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকলেন।ঐ দিন তুমি মিথ্যা করে কেন বললে তোমার নাম টেপী, বোনের নাম হ্যাপী? মিথ্যা বলার প্রয়োজন ছিল কি?

ছিল।আসল নাম, পরিচয় কাউকে জানতে দিতে চাও না, এই তো ব্যাপার? জ্বি।যে তোমার সত্যিকার পরিচয় বের করতে চায় তার জন্যে তো খুব সমস্যা হবার কথা না? কেউ সত্যিকার পরিচয় বের করতে চায় না।তুমি চা বা কফি খাবে? জ্বি না।তুমি সিনেমার লাইনে, সেখান থেকে নতুন পেশায় কীভাবে চলে এলে?

আমি বলতে চাচ্ছি না।বলতে চাচ্ছ না কেন? বলতে ইচ্ছা করছে না। গল্প করার মতো মজার কোনো বিষয় এটা না।আমি তো গল্প করছি না। জানতে চাচ্ছি।জানতে চাচ্ছেন কেন? কৌতুহল বলতে পার। তোমার এক ভাই তো জেলে আছে। ও জেলে গেল কেন?

ও জেলে আছে সেটা যখন জানেন তখন জেলে কেন সেটাও জানা আপনার জন্যে কোনো সমস্যা না।তুমি বলতে চাচ্ছ না।জ্বি না।মোবারক সাহেব ইন্টারকমে বোতাম টিপে দু’গ্লাস পানি দিয়ে যেতে বললেন। পানি সঙ্গে সঙ্গে চলে এল। তিনি নিজে এক গ্লাস পানি নিলেন। রেশমার দিকে একটা গ্লাস বাড়িয়ে দিলেন।নাও পানি খাও।আমার তৃষ্ণা পায় নি। আমি পানি খাব না।ঐ রাতে তুমি তো বেশ হাসিখুশি ছিলে–গল্প করছিলে, আজ এমন গভীর হয়ে আছ কেন?

ঐ রাতে আপনি আমাকে কী জন্যে ডেকে এনেছিলেন আমি জানতাম। আজ কী জন্যে এনেছেন আমি জানি না।তোমাকে কী জন্যে আনা হয়েছে তুমি জান না? জ্বি না।অনুমান করতে পারছি? না তাও পারছি না? পারছি না।ঐ দিন তোমাকে কিছু টাকা দিয়েছিলাম। টাকা ফেলে চলে গেলে কেন? রাগ হয়েছিল। ঐ জন্যে ফেলে চলে গেছি।তুমি যে জীবনযাপন করছ, সে জীবনে কি টাকার উপর রাগ করা মানায়?

 

Read more

পেন্সিলে আঁকা পরী পর্ব:১০ হুমায়ূন আহমেদ

Categories
Uncategorized শিল্প-ও-সাহিত্য

পেন্সিলে আঁকা পরী পর্ব:০৮ হুমায়ূন আহমেদ

আজমল তরফদার মোবারক হোসেনের চেক ক্ষীণ সন্দেহ নিয়ে ব্যাংকে জমা দিয়েছিলেন। তার মনে হয়েছিল। চেক ক্যাশ হবে না। বড়লোকদের নানান খেয়াল হঠাৎ মাথায় চাপে আবার হঠাৎই মিলিয়ে যায়। হঠাৎ উদয় হওয়া শখ হঠাৎ মেটাই স্বাভাবিক। চেক দেবার পর পরই হয়তো উনার শখ মিটে গেছে। উনি ব্যাংকে টেলিফোন করে বলে দিয়েছেন এত নাম্বারের চেক ক্যাশ করবেন না।

বড় চেকের সঙ্গে চিঠি দিতে হয়। ব্যাংক ম্যানেজার চিঠি না পেলে চেক ক্যাশ করেন না। অনেকে আবার আরেক কাঠি সরাস–কারেন্ট অ্যাকাউন্টে চেক না কেটে সেভিংস অ্যাকাউন্টে কাটে। আজমল তরফদার এইসব জটিলতার সঙ্গে পরিচিত। পরিচিত বলেই খানিকটা হলেও সন্দেহ নিয়ে তিনি ছিলেন। তিন দিনের ভেতরে চেক ক্যাশ হবার কথা, তারপরেও তিনি সাত দিন সময় দিলেন। সাত দিন পর ব্যাংকে টেলিফোন করে জানলেন চেক ক্যাশ হয়েছে।

তিনি তার পর পরই মোবারক সাহেবকে টেলিফোন করলেন। ছবি নিয়ে কথাবার্তা বলা দরকার। সামান্য বিয়ের মতো ব্যাপারে এক লাখ কথা খরচ হয়–আর এ হলো ছবি। কুড়িটা বিয়ে একসঙ্গে হবার মতো যন্ত্রণা–এখানে কথা বলতে হবে খুব কম করে হলেও কুড়ি লাখ।

টেলিফোন ধরলেন মোবারক সাহেবের পিএ। তিনি জানালেন, স্যার ব্যস্ত আছেন। কথা বলবেন না।আজমল তরফদার বললেন, আপনি কি আমার নাম বলেছেন? বলেছেন যে ফিল্ম ডাইরেক্টর আজমল তরফদার। আমি স্যারের জন্যে ছবি বানাচ্ছি।জ্বি আপনার নাম এবং পরিচয় বলা হয়েছে।আমি কি পরে টেলিফোন করব?

করতে পারেন, তবে স্যার কথা বলবেন বলে মনে হয় না।আমার সঙ্গে কথা বলবেন না। এরকম মনে হবার কারণ কী?কারণ সার বলেছেন ছবি নিয়ে যা কথা বলার তা বলা হয়েছে, নতুন কিছু বলার নেই।আমার টেলিফোন নাম্বারটা রাখুন। যদি স্যার কথা বলতে চান।দিন, টেলিফোন নাম্বার দিন।

আজমল তরফদার টেলিফোন নাম্বার দিয়েছেন। কেউ সে নাম্বারে টেলিফোন করে নি। ছবি তৈরি কোনো সহজ ব্যাপার তো না। স্ক্রিপ্ট রাইটারকে দিয়ে স্ক্রিপ্ট লেখাতে হবে, তাকে টাকা দিতে হবে; আর্টিস্ট ঠিক করতে হবে, তাদের শিডিউল নিতে হবে; এফডিসিতে চার লাখ টাকার মতো জমা দিতে হবে–এই কাজগুলো করবে কে? আজমল তরফদার আবার টেলিফোন করলেন। পিএ ধরল।

আমি ফিল্ম ডাইরেক্টর আজমল তরফদার… কথা শেষ করার আগেই পিএ বলল, স্যার ব্যস্ত আছেন, কথা বলতে পারবেন না।আজমল তরফদার বিরক্ত গলায় বললেন, কথা তো আমাকে বলতেই হবে, গল্প লাগবে, চিত্ৰনাট্য লাগবে, গান লাগবে –এর প্রতিটির জন্যে… আমি যতদূর জানি এইসব দায়িত্ব আপনাকেই পালন করতে বলা হয়েছে।ভাইসাহেব, দায়িত্ব তো পালন করব কিন্তু এর প্রতিটির জন্যে টাকা লাগবে। টাকা দেবে কে?

টাকা স্যারের অফিস দেবে, স্যার তো দেবেন না। আপনি অফিসে চলে আসুন। কোন খাতে কত দরকার বলুন। ভাউচারে সই করে টাকা নিয়ে যান।কখন আসব? অফিস টাইমে আসবেন।অফিস টাইম কখন? দশটা থেকে চারটা।এখন বাজছে তিনটা, এখন আসতে পারি?

অবশ্যই পারেন।আজমল তরফদার তৎক্ষণাৎ অফিসে চলে গেলেন। তার ধারণা ছিল তিনি নিতান্তই বিশৃঙ্খল অবস্থায় পড়বেন। এই টেবিল থেকে ঐ টেবিলে যেতে হবে। ম্যানেজার টাইপের একজন শেষ পর্যায়ে শুকনো মুখে বলবে, আপনার কী ডিমান্ড একটা কাগজে লিখে দিয়ে যান আমরা ইনকোয়ারি করি–সপ্তাহখানেক পরে এসে খোঁজ নেবেন।বাস্তবে তিনি সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার দেখলেন। ছবির কাগজপত্র এবং টাকা-পয়সার ব্যাপারে দেখাশোনার জন্যে আলাদা একজন লোক রাখা হয়েছে। তার নাম বিমলচন্দ্ৰ হাওলাদার। বাচ্চা ছেলে কিন্তু মনে হচ্ছে কাজকর্মে খুব সেয়ানা।

আজমল তরফদার ঘরে ঢুকতেই সে তাকে অত্যন্ত যত্ন করে বসাল। কফি খাবেন না চা খাবেন জানার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।বিমল হাসিমুখে বলল, ছবির কাজ কি সম্বর শুরু হচ্ছে? হ্যাঁ হবে। তবে ছবি তো আর স্পিঙের খেলনা না যে চাবি দিলেই চলবে। গল্প, চিত্ৰনাট্য–এইগুলো লেখাতে হবে না? স্যার অবশ্যই হবে।এর জন্যে টাকা লাগবে না?

চেক বই তো স্যার আমার কাছে। আপনি বলবেন, আমি চেক লিখব। আপনি যেদিন বলবেন আপনার সঙ্গে যাব–আর্টিস্টদের বাসায় চেক পৌছে দেব। স্যার, এখন বলুন কী খাবেন? কফি দিতে বলি?

বলুন।আমাকে তুমি করে বলুন স্যার।এফডিসিতে টাকা জমা দিতে হবে। পি টাইপ ছবির জন্যে সাড়ে চার লাখ টাকা জমা দিতে হয়।ঐ টাকাটা স্যার জমা দেয়া হয়েছে।বল কী?

শুটিং শিডিউলও স্যার নেয়া আছে।আজমল তরফদার বিস্মিত হলেন। বিমলচন্দ্র তাঁর দিকে ঝুকে এসে বলল, স্যার, আমাদের অফিস হলো দশটা-চারটা কিন্তু আপনার জন্যে আমি সারাক্ষণই থাকব। যখন বলবেন তখন আপনার বাসায় উপস্থিত হব।বাসার ঠিকানা জান?

জানি। ফাইলে আছে।কফি চলে এসেছে। কফির পেয়ালা হাতে নিতে নিতে আজমল তরফদার বললেন, কিছু মনে করবে না বিমল, ছবির ফান্ড কি আলাদা করা, নাকি মেইন ফান্ড থেকে খরচ হচ্ছে?

স্যার, ছবির জন্যে আলাদা ফান্ড দেয়া হয়েছে।মোট কত টাকা আছে সেই ফান্ডে? বলতে যদি কোনো বাধা না থাকে।বলতে কোনো বাধা নেই স্যার। মোট দেড় কোটি টাকা আলাদা করা হয়েছে। সেখান থেকে খরচ হয়েছে চার লাখ টাকা। ডাইরেক্টর হিসেবে আপনাকে টাকা দেয়া হয়েছে।আজমল তরফদার বললেন, ছবির লাইনে তোমার কি কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে?

বিমল হাসিমুখে বলল, স্যার, ছবির লাইনে কোনো অভিজ্ঞতা আমার নেই। কিন্তু আপনি আমার উপর ভরসা করতে পারেন। আমি খুব দ্রুত কাজ শিখতে পারি। বড় সাহেব এই কারণে আমাকে খুব পছন্দ করেন। তিনি যে-কোনো নতুন প্রজেক্ট আমাকে দিয়ে শুরু করেন।ও আচ্ছা।

স্ক্রিপ্ট লেখার টাকাটা আজ স্যার আপনি নিয়ে যান। কত দেব? এক লাখ টাকা দাও।একটা কথা বলব স্যার? বল।পুরো টাকাটা একসঙ্গে দিলে কাজ আদায় হবে না। আমরা যদি শুরুতে দশ হাজার টাকা দেই এবং বলি যেদিন স্ক্রিপ্ট শেষ হবে সেদিনই পুরো টাকা একসঙ্গে দেয়া হবে তাহলে বোধহয় ভালো হবে।কথাটা মন্দ বল নি।

আরেকটা কাজ স্যার করা যেতে পারে। আমরা বলতে পারি–স্ক্রিপ্ট যদি খুব ভালো হয় এবং স্যারের যদি খুব পছন্দ হয় তাহলে পঞ্চাশ হাজার টাকা বোনাস।ক্রিপ্টের জন্যে কত টাকা ধরা আছে? স্ক্রিপ্টের জন্যে দশ লাখ টাকা ধরা আছে।এত টাকা? স্ক্রিপ্ট তো স্যার একটা হবে না, বেশ কয়েকটা হবে। এর মধ্যে আমরা একটা বেছে নেব।কে বাছবে? আপনি বাছবেন।আবার কে? স্যার, আরেক কাপ কফি দেই? দাও।আপনার কি কোনো ট্রান্সপোর্ট আছে স্যার?

জ্বি না।অফিস থেকে আপনি একটি গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে নিন। যতদিন কাজ করবেন। ততদিন গাড়ি চব্বিশ ঘণ্টা আপনার সঙ্গে থাকবে।ড্রাহভারসহ?অবশ্যই ড্রাইভারসহ। আমি বলি কি স্যার আপনি বড়ো একটা গাড়ি নিন–মাইক্রোবাস বা পিক-আপ, এতে আপনার কাজের সুবিধা হবে।বিমল, তোমার এখানে কি সিগারেট খাওয়া যায়?

জ্বি স্যার, খাওয়া যায়।আরেকটা কথা–মোবারক সাহেব নামের লোকটির কত টাকা আছে তুমি জান?আমার কোনো ধারণা নেই স্যার।কোনো আন্দাজ আছে? আমি স্যার ছোট মানুষ, ছোট ছোট বিষয় নিয়ে আন্দাজ করি। বড় বিষয় নিয়ে আন্দাজ করে সময় নষ্ট করি না। স্যার, কী ধরনের গাড়ি নেবেন তা তো বললেন না?

দাঁড়াও একটা সিগারেট খেয়ে নিই। বিমল তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে।বিমল হাসতে হাসতে বলল, আমাকে আপনার আরো পছন্দ হবে। যত দিন যাবে। ততই আপনি আমাকে পছন্দ করবেন।কেন বল তো? স্যার, আমি যে-কোনো কাজ খুব সুন্দর করে করতে পারি।আমার তো মনে হচ্ছে তুমি অহঙ্কারী।কিছু অহঙ্কার তো স্যার থাকবেই। রাস্তার যে ভিখিরিটি অন্যদের চেয়ে বেশি ভিক্ষা পায় সেও অহঙ্কার করে, আমি কেন করব না?

স্যার কি আরেক কাপ কফি খাবেন? আগেরটা খান নি এই জন্যে বলছি।দাও খাই আরেক কাপ।আপনার বোধহয় সিগারেট শেষ হয়ে গেছে। সিগারেট আনিয়ে দেব? দাও।আজমল তরফদারের জন্যে নতুন করে কফি আনতে গিয়েছে, কিন্তু তিনি মনের ভুলে ঠাণ্ডা, সরপড়া কফিতেই চুমুক দিয়ে ফেলেন।বিমল।জ্বি স্যার? তোমাদের এই বড় সাহেবের, আই মিন মোবারক সাহেবের ছবি বানানোর শখের পেছনের কারণটা কী?

ব্যবসা। ছবির ব্যবসা তো ভালো ব্যবসা। বাংলাদেশে পাঁচ শ’র মতো সিনেমা হল-প্রতি হল থেকে গড়পড়তা দশ হাজার টাকা পেলেও প্রথম রানে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা উঠে আসে। তাছাড়া আমি যতদূর জানি উনি সিনেমা হলও বানাবেন।সিনেমা হল বানাবেন? জায়গা নেয়া হয়েছে, আর্কিটেক্টকে ডিজাইন করতে বলা হয়েছে।বল কী?

স্যার, উনি খুব গোছানো মানুষ।তাই তো দেখছি। আমার ধারণা ছিল ছবি তৈরির ব্যাপারটা হুট করে মাথায় এসেছে।নতুন কফি এসেছে। পিরিচে বেনসন এন্ড হেজেস-এর প্যাকেট এবং দেশলাই। আজমল তরফদার বললেন, বিমল তুমি সিগারেট খাও?

জ্বি স্যার, খাই।নাও সিগারেট নাও।আপনার সামনে খাব না স্যার।খাও খাও, ফিল্ম লাইনে সব সমান।বিমল সিগারেট ধরাল না। আজমল তরফদাব সিগারেট ধরিয়ে তৃপ্তির সঙ্গে কফিতে চুমুক দিলেন। বিমল বলল, স্যার যারা কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে তারা শুধু যে ভাগ্যের জোরে সেটা করে তা কিন্তু না। ভাগ্য থাকে তাদের হাতের মুঠোয়, ভাগ্য নিয়ে তারা খেলা করে। পৃথিবীতে যারা বিলিওনিয়ার আছে তারা কোনো কারণ ছাড়াই বিলিওনিয়ার হয় নি।তুমি কী বলতে চোচ্ছ বুঝতে পারছি না।আমি বলতে চাচ্ছি—বড় সাহেব হুট করে কোনোদিনই কিছু করেন না। তিনি যখন ছবির জগতে এসেছেন তখন ধরে নিতে হবে এই জগৎ তিনি নিয়ন্ত্রণ করবেন।

আজমল তরফদার উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, আমি বিলিয়নিয়ার না, সামান্য ফিল্ম মেকার–আইএ পাস বিদ্যা। আমি তোমাকে একটা কথা বলছি, শুনে রাখ। ছবি বানানোর এই ঝোঁক তোমার বড় সাহেবের হঠাৎ করেই হয়েছে। আমাদের ছবি পাড়ার একটা মেয়ে–আজেবাজে টাইপের মেয়ের জন্যে এটা তার গিফট। তবে ঝানু ব্যবসায়ীরা গিফট থেকেও লাভ করে। যে কারণে এত আটঘাট বেঁধে ছবিতে নামা হচ্ছে। রেশমা নামের বলতে গেলে পথের-কুকুরি সুপারস্টার হিসেবে বের হয়ে আসবে। সে তার পুরস্কার পেয়ে গেল। একই সঙ্গে ছবির বাণিজ্যও হলো।

বিমল চুপ করে আছে। কী একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। আজমল তরফদার বললেন, বিমল তোমাকে আমার মনে ধরেছে বলে আমি এই কথাগুলো বললাম।বিমল বলল, স্যার আপনাকেও আমার মনে ধরেছে। ছবি বানানোর ব্যাপারে আমাদের টিমওয়ার্ক খুব কাজে আসবে। আপনি গাড়ি রিকুইজিশন না করেই উঠে যাচ্ছেন। কী গাড়ি নেবেন তা তো বলেন নি। আরেকটু বসুন–কাজটা শেষ করি। আপনি কিন্তু দ্বিতীয়বারের কফিটাও খান নি–ঠাণ্ডা করে ফেলেছেন।

ঝুমুর দরজা খুলে দেখে বাড়িওয়ালা চাচা নিজামউদ্দীন। আজো তার হাতে দু’টো পাকা পেঁপে। তার আগের বার দিয়ে যাওয়া পেঁপে দু’টোর একটা এখনো পড়ে আছে। ফেলে দেয়াই উচিত। মিষ্টি-টিষ্টি কিচ্ছু নেই–তিতকুট স্বাদ। এত বড় একটা পাকা পেঁপে ফেলতে মায়া লাগে বলে ফেলা হয় নি।

নিজামউদ্দীন হাসিমুখে বললেন, কেমন আছ গো মা?ঝুমুর বলল, ভালো।আপা আছে? জ্বি না।ফিরবে না? আজ রাতে ফিরবে না।ছবির শুটিং কি সারারাত ধরেই চলে? সব সময় চলে না, মাঝে মাঝে চলে–যখন ছবির কাজ দ্রুত শেষ করতে হয় তখন সারারাত কাজ করতে হয়।হতে পারে। ছবির লাইনের কাজকারবার তো জানি না। তোমার আপার সঙ্গে দরকার ছিল। যাই হোক মা আছে না?

আছে। উনার শরীর ভালো না–শুয়ে আছে।আমার কথা একটু গিয়ে বল। দু’টা কথা বলে চলে যাব। নাও পেঁপে দু’টা নিয়ে যাও।আপনি বসুন।নিজামউদ্দীন বসতে বসতে বললেন, ঘরে পান থাকলে আমাকে একটু পান দিও তো মা। রাতে ভাত খেয়েই বের হয়েছি।–মুখ মিষ্টি হয়ে আছে।ঘরে পান নেই, মা পান খায় না।তাহলে থাক। কিছু লাগবে না।শাহেদা চাদর গায়ে জড়িয়ে বারান্দায় এলেন। নিজামউদ্দীন মধুর গলায় বললেন, আপার শরীরটা নাকি খারাপ?

না তেমন কিছু না। সামান্য গা গরম।সামান্য বলে অবহেলা করবেন না। আপনার আমার যা বয়স–এই বয়সে সামান্য বলে কোনো কিছুকেই অবহেলা করতে নেই। নিজের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। যাই হোক আপ–মেয়ের সঙ্গে কি কথা বলেছিলেন? ঐ যে বাড়ির বিষয়ে–বাড়িটা যে আমার লাগে।এখানো বলি নি।

একটু যে তাড়াতাড়ি করতে হয় আপা। মাস শেষ হতে তো বাকি নেই।ভাই সাহেব। আমাদের তো সময় দিতে হবে। বললেই তো বাসা পাওয়া যায় না। দু’টা মেয়ে নিয়ে যেখানে সেখানেও তো উঠতে পারি না।আমি নাচার! সামনের মাসের ১ তারিখ থেকে বাড়ি আমার লাগবেই।শাহেদা কিছু বললেন না। নিঃশ্বাস ফেললেন। নিজামউদ্দীন বললেন, মানুষের সমস্যা মানুষ ছাড়া কে দেখবে? মানুষই দেখবে। আমি তো আপনাদের সমস্যা অনেকদিন দেখলাম। এখন আপনারা আমার সমস্যা একটু দেখুন।

শাহেদা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, আমার কোন সমস্যা দেখেছেন? আমি তো বিনা ভাড়ায় আপনার বাড়িতে থাকি নি। যথানিয়মে ভাড়া দিয়েছি। ভাড়া দিতে কখনো কখনো দেরি হয়েছে কিন্তু দেয়া হয়েছে।ভাড়ার কথা তো আপা আসছে না। আপনাদের বাড়ি দেয়ার জন্যে কতরকম সমালোচনা সহ্য করেছি। দশজনের দশ রকম কথা।কী কথা? বাদ দেন, সব কথা শুনতে নাই।না না বলুন কী কথা শুনেছেন?

এই যে ধরুন মিতু ছবিতে কাজ করে। এইসব কাজের ধরন-ধারণ তো আলাদা। রাত-বিরাত পার করতে হয়। এমনও হয়েছে–দুদিন-তিনদিন মেয়ের খোঁজ নাই। যে কাজের যে দস্তুর। সাধারণ মানুষ তো এইসব বুঝে না। অকথা-কুকথা বলে।শাহেদা কাঁপা গলায় বললেন, আমার মেয়েকে নিয়ে কুকথা বলে? আমার মেয়েকে নিয়ে–যে মেয়ে সংসার টিকিয়ে রাখার জন্যে দিনরাত খেটে মরছে সেই মেয়েকে নিয়ে কুকথা বলে?

এই তো আপা আপনি মনটা খারাপ করলেন। মন খারাপ করার কিছু নাই। দুনিয়ার এই হলো হাল। মানুষের মুখ তো আপনি বন্ধ করতে পারবেন না। এই পৃথিবীতে সবচে’ খারাপ জায়গা হলো পায়খানা। মানুষের মুখ সেই পায়খানার চেয়েও খারাপ। পায়খানার দরজা বন্ধ করা যায়, তালা দেওয়া যায়–মানুষের মুখ বন্ধ করা যায় না।শাহেদা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, আমি আপনার বাড়ি ছেড়ে দেব। এক তারিখের আগেই ছাড়ব। আমার মেয়ের কারণে আপনাকে কথা শুনতে হচ্ছে এটা যদি আগে জানাতেন আগেই ছেড়ে দিতাম।

নিজামউদ্দীন খুশি খুশি গলায় বললেন, তুচ্ছ ব্যাপার আপনার কানে তুলব কেন? আমার একটা বিবেচনা আছে না। আমার তো চোখ আছে। আমি দেখছি না–একটা বাচ্চা মেয়ে সংসার টানছে? বড় ভাই মানুষ খুন করে জেলে বসে আছে। লোকে কী বলে না বলে সেটা শুনলে দুনিয়া চলত না। শোনেন একটা ঘটনা বলি। ঘটনাটা না শুনলে বুঝতে পারবেন না।থাক ঘটনা শুনতে হবে না।

আপা শোনেন। শোনার দরকার আছে–গত জুম্মাবারে জুম্মা পড়ে বাসায় ফিরছি। ইসলাম সাহেব পথে আমাকে ধরলেন। ইসলাম সাহেব আমার ভাড়াটে-অগ্রণী ব্যাংকের ম্যানেজার। আমাকে বললেন… আমার শরীরটা ভালো না। কিছু শুনতে ভালো লাগছে না।থাক তাহলে। মানুষের কানকথা যত কম শোনা যায় ততই ভালো, শুনলেই বিপদ। আপা তাহলে উঠি?

জ্বি আচ্ছা।তাহলে এই কথা রইল— মাসের এক তারিখ ইনশাল্লাহ্ ঘর খালি করে দিচ্ছেন।বললাম তো দিব।আলহামদুলিল্লাহ। সত্যি কথা বলতে কি আপা একশ একটা পাপ করার পর লোকে ভাড়াটে হয়। টু লেট সাইন ঝুলালে ভাড়াটে পাবেন না। যখন ভাড়াটে তুলতে যাবেন এরা উঠবে না। যেন তাদের বাপের বাড়ি… শাহেদা বিছানায় এসে শুয়ে পড়লেন, রাতের রান্না কিছু হয় নি। ঝুমুরকে বলেছেন একার জন্যে চারটা চাল ফুটিয়ে ডিম ভেজে খেযে নিতে।

ঝুমুর এখনো চুলা ধরায় নি। শাহেদা ক্লান্ত গলায় ডাকলেন, ঝুমুর।ঝুমুর দরজা ধরে দাঁড়াল।তোর নিজের জন্যে দু’টা ভাত রেঁধে ফেল, আমি খাব না।আমিও খাব না।রাতে না খেয়ে থাকবি? হুঁ।করা যা ইচ্ছা। তোর আপা কি বলেছে–রাতে ফিরবে না? না, সারারাত শুটিং চলবে। তোমার কি মাথায় যন্ত্রণা? হুঁ।মাথা টিপে দেব?

কিছু করতে হবে না। তুই ঘরের বাতি নিভিয়ে চলে যা।মশারি খাটিয়ে দেব? মশা আছে তো।যেতে বললাম না! ঝুমুর মা’র ঘর থেকে চলে এলো। তার টেস্ট পরীক্ষা শুরু হচ্ছে ন’তারিখ থেকে। বই নিয়ে বসতে ইচ্ছা করছে না। এমনিতে সে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে পারে কিন্তু বই নিয়ে বসলেই শুধু হাই ওঠে।

ঝুমুর খাটের উপর পা তুলে বসল। বই নিয়ে বসবে কি বসবে না ঠিক করতে পারল না। কারো সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছা করছে— গল্প করার মানুষ নেই। কথা শুনতে ভালবাসে এমন কোনো ছেলের সঙ্গে বিয়ে হলে সে বেঁচে যায়। সমস্ত পুরুষদেরকে ঝুমুর তিন ভাগে ভাগ করেছে– এক, এরা কথা শুনতে ভালোবাসে। স্বামী হিসেবে এরা আদর্শ।দুই, এরা কথা বলতে ভালোবাসে। স্বামী হিসেবে এরা মোটামুটি।তিন, এরা কথা শুনতেও ভালবাসে না, বলতেও ভালোবাসে না। স্বামী হিসেবে এরা ভয়াবহ।

মবিন ভাই কোন শ্রেণীর ঐ প্রথম শ্রেণীর? পুরোপুরি না। তিনি কথা শোনার চেয়ে বলতে বেশি পছন্দ করেন। স্বামী হিসেবে মবিন ভাইকে আদর্শ বলা যাবে না। উনার বেশি বুদ্ধি। স্বামীদের কম বুদ্ধি থাকা ভালো। বেশি বুদ্ধির মানুষরা নানান ধরনের চালাকি করে।ঝুমুর।জ্বি।এক গ্ৰাস পানি দিয়ে যা।ঝুমুর উঠে গিয়ে পানির গ্লাস ভর্তি করে পানি নিয়ে গেল। বাতি জ্বালাল।শাহেদা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, বাতি নেভা। বাতি জ্বেলেছিস কেন? অন্ধকারে পানি খাবে কীভাবে?

ঝুমুর লক্ষ করল পানির গ্লাস হাতে নিতে গিয়ে শাহেদার হাত কাঁপতে লাগল। ঝুমুর বলল, মা তোমার কি জ্বর বেড়েছে? জানি না। বাতি নিভিয়ে চলে যা।তুমি আমার সঙ্গে অকারণে এত রাগারগি করছ কেন? বাড়িওয়ালা চাচার কথা শুনে তুমি রেগেছ–সেই রাগ ঝাড়ছ আমার উপর। মানুষ কত কথা বলবে–তাই শুনে রেগে যেতে হবে? কুৎসিত কথা শুনব তার পরেও রাগিব না?

কুৎসিত কথা তো আমি সারাক্ষণই শুনি–আমি কি রাগ করি? রাগ করি না। আমি থাকি আমার মতো।তুই সারাক্ষণ কুৎসিত কথা শুনিস? হ্যাঁ।কে বলে? স্কুলের মেয়েরা বলে। সেদিন জিওগ্রাফি আপা আমাকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন… কী জিজ্ঞেস করলেন?

হেনতেন নানান কথা, সংসার চলে কী করে? বড় বোন কী করে। এইসব জাবিজাবি।কই আমাকে তো কোনোদিন কিছু বলিস নি।তোমাকে শুধু শুধু বলব কেন? তাছাড়া আমি একজনের কথা আরেকজনকে বলি না।ঝুমুর, তুই আমার কাছে এসে বোস।কেন?

বসতে বলছি বোস।তুমি এমনভাবে বলছি যে মনে হচ্ছে তুমি আমাকে মারবে।মারব না, কাছে আয়। বোস এখানে–তোর আপার সঙ্গে তুই তো গুটিগুটি করে অনেক কথা বলিস। সে কি কখনো তোকে গোপন কিছু বলেছে?

না। আপার স্বভাব হলো চুপচাপ থাকা। বকবক যা করার আমিই করি। আপা শুধু শুনে যায়। আপা পুরুষ মানুষ হলে খুব ভালো স্বামী হত।শাহেদা ভুরু কুঁচকে তাকালেন। ঝুমুর বিরক্ত গলায় বলল, তুমি এভাবে তাকিয়ো না–তোমাকে আমাদের জিওগ্রাফি আপার মতো লাগছে।শাহেদা চাপা গলায় বললেন, তোর আপার সঙ্গে রাতে যখন ঘুমাস সে কিছুই বলে না? ঘুমের মধ্যে কথা বলবে কীভাবে! আপা ক্লান্ত হয়ে থাকে, মরার মতো ঘুমায়। মাঝে মাঝে… মাঝে মাঝে কী? মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসে। দু’হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কাঁদে।তুই তখন কী করিস?

কিছুই করি না। ভান করি যেন মরার মতো ঘুমুচ্ছি।ও কেন কাঁদে।আমি কী করে জানিব কেন কাঁদে? সে যেমন রাতে মাঝে মাঝে কাদে, তুমিও কাঁদ। তুমি কেন কাঁদ সেটা যেমন আমি জানি না, আপা কেন কাঁদে সেটাও জানি না–জানতে ইচ্ছাও করে না।

শাহেদ ক্লান্ত গলায় বললেন, সেই ইচ্ছা করবে কেন? সংসারের কোনো কিছু নিয়ে তো তোকে ভাবতে হচ্ছে না। দিব্যি খাচ্ছিস, ঘুমুচ্ছিস–গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরছিস।তুমি আমার উপর শুধু শুধু রাগ করছ। রাগ করার মতো যখন কিছু করব তখন রাগ কোরো। তোমাকে বেশি দিন অপেক্ষাও করতে হবে না। রাগ করার মতো কিছু খুব শিগগিরই করব।সেটা কী?

টেস্ট পরীক্ষায় প্রতিটি বিষয়ে গোল্লা খাব।শাহেদা কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলেন। ঝুমুর উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, মা তোমাকে একটা কথা বলি মন দিয়ে শোন–আপা কী করে সংসার চালাচ্ছে সেটা তুমি খুব ভালো করেই জান। তুমি ভান করছ, তুমি কিছু জান না। আমিও ভান করছি আমি কিছু জানি না। এটা কি মা ঠিক হচ্ছে?

শাহেদা তাকিয়ে আছেন। পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছেন। তার হাত-পা থারথার করে কঁপিছে। ঝুমুর উঠে দাঁড়াল। শান্ত ভঙ্গিতে ঘরের বাতি নিভিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। সেখান থেকে চলে গেল বারান্দায়। বারান্দায় দেয়াল ঘেসে মোড়া পাতা। দেয়ালে হেলান দিয়ে ঝুমুর বসেছে।

বাইরে সুন্দর জোছনা। খানিকটা জোছনা বারান্দায় এসে পড়েছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে জোছনা নেমেছে। বারান্দায় সুন্দর পাতার নকশা। বাতাসে পাতা কাঁপছে–জোছনার নকশাও কাঁপছে। ঝুমুর সেই অপূর্ব নকশার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে।

ভেতর থেকে শাহেদা ডাকলেন, ঝুমুর, ঝুমুর।ঝুমুর জবাব দিল না। সে চোখের পানি মুছে খালি চেয়ারটা নিজের পাশে টেনে আনল। তার কাছে এখন মনে হচ্ছে –খালি চেয়ারে তার স্বামী বসে আছে। সে তাঁর পায়ের কাছাকাছি বসেছে। ঝুমুর বলল, ঘুমাবে না?

সে বলল, না।ঘুমাবে না কেন? রাত তিনটা বাজে।তুমি বডড বিরক্ত কর ঝুমুর। দেখছ না জোছনা দেখছি।তুমি কি কবি যে তোমাকে হাঁ করে জোছনা দেখতে হবে? হ্যাঁ আমি কবি।কবিরা জোছনা দেখে না। তারা তাদের স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।কে বলেছে তোমাকে?

 

Read more

পেন্সিলে আঁকা পরী পর্ব:০৯ হুমায়ূন আহমেদ

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

পেন্সিলে আঁকা পরী পর্ব:০৭ হুমায়ূন আহমেদ

পায়েস বা এই জাতীয় কিছু। সবাই খাবার টাবার নিয়ে যায়—আমরা শুধু যাই খালি হাতে।তোদের কিছু নিতে ইচ্ছে হলে নিজেরা রেঁধে নিয়ে যা।ঝুমুর আর কিছু বলল না। তবে সে উঠে গেল না, মা’র পাশে বসে রইল। ঘরে তারা দু’জন ছাড়া আর কেউ নেই। আপা শুটিঙে গেছে। সে বাসায় ফিরবে না। এফডিসির গেট থেকে আপাকে তুলে নিতে হবে। জয়দেবপুর থেকে তাকে একা একা যেতে হবে এফডিসি, এটাও তার জন্যে বিরাট সমস্যা। তার সাহস একেবারেই নেই। স্কুল থেকে সে বাসায়ও একা একা আসতে পারে না।

তার এক বান্ধবীর সঙ্গে আসে। সেই বান্ধবী তাকে তাদের বাসার গেট পর্যন্ত দিয়ে তারপর তার বাসায় যায়। আজ একা একা এফডিসি পর্যন্ত কী করে যাবে কে জানে। যাওয়া অবশ্য খুব সোজা। ফার্মগেটে বাস থেকে নেমে একটা রিকশা নিতে হবে। পাঁচ টাকা নেবে রিকশা ভাড়া। আপা কখনো রিকশা নেয় না। বাস থেকে নেমে সে হেঁটে হেঁটে যায়। তার পক্ষে সম্ভব না। তাকে উপায় না থাকলেও পাঁচ টাকা খরচ করতে হবে।

মা।হুঁ।একা একা এফডিসির গেট পর্যন্ত যাব কীভাবে? মিতু যেভাবে যায় তুইও সেইভাবে যাবি। তোর জন্যে চৌকিদার পাব কোথায়?মবিন ভাইকে বলব আমাকে পৌঁছে দিতে? না।অসুবিধা তো কিছু নেই। উনার যদি কাজ না থাকে… তোর যাবার দরকার নেই। তোর আপা একাই যাবে।মবিন ভাইকে তুমি এত অপছন্দ কর কেন? পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার না, শুধু শুধু বাইরের একটা মানুষকে বিরক্ত করবি কেন?

উনি বাইরের মানুষ না, দুদিন পর বিয়ে হচ্ছে আপার সঙ্গে।যখন হবে তখন দেখা যাবে।ঝুমুরকে রান্নাঘরে রেখে তিনি উঠে গেলেন। বালতিতে কাপড় ভেজানো আছে। কাপড় ধুবেন। ঝুমুর একা একা বসে রইল। তার এখন ইচ্ছা করছে কলঘরে মা’র পাশে গিয়ে বসতে। সে একা একা বেশিক্ষণ থাকতে পারে না।

হঠাৎ ঝুমুরের মনে হলো, তার যখন বিয়ে হবে তখন তার স্বামী বেচারা খুব ঝামেলায় পড়বে। সারাক্ষণ সে স্বামীর সঙ্গে থাকবে। কে জানে সে হয়তো অফিসেও চলে যাবে। স্বামী কাজ করছে–সে তার সামনের চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে। ঝুমুরের এইসব ভাবতে খুব লজ লাগছে আবার না ভেবেও পারছে না। ইদানীং সে এইসব ব্যাপার নিয়ে খুব ভাবে। সে যখন একা থাকে। শুধু যে তখন ভাবে তা না, যখন অনেকের সঙ্গে থাকে তখনো ভাবে।

সবচে’ বেশি ভাবে ক্লাসে। আপা অঙ্ক করাচ্ছেন। সবাই বোর্ড থেকে অঙ্ক টুকছে আর সে ভাবছে অন্য কিছু। সেই অন্য কিছু মানে খারাপ কিছু না, আবার খারাপও। যেমন–আপা যখন অঙ্ক করাচ্ছিলেন তখন সে ভাবছে… ভাবছে না, পরিষ্কার চোখের সামনে দেখছে লাল রঙের একটা গাড়ি স্কুলে ঢুকল। গাড়ি থেকে একজন নামল–তার পরনে ধবধবে সাদা প্যান্ট, গায়ে চকলেট রঙের হাওয়াই শার্ট। শার্টের রঙটা কটকট করে চোখে লাগছে। তাকে দেখেই সে বের হয়ে আসছে। অঙ্ক আপা কঠিন গলায় বললেন, এই ঝুমুর কোথায় যাচ্ছ?

সে লজ্জিত গলায় বলল, আমার হাসবেন্ড আমাকে নিতে এসেছে আপা।ও আচ্ছা যাও। তুমি কিন্তু খুব ক্লাস মিস দিচ্ছ।না গেলে ও খুব রাগ করবে।আচ্ছা যাও। উনাকে বলবে স্ত্রীর পড়াশোনার দিকে লক্ষ রাখতে হবে। শুধু সঙ্গে নিয়ে ঘুরলে হবে না।জ্বি, আপা বলব। সে বের হয়ে হনহন করে গাড়ির দিকে এগুল।

তারপর বিরক্ত গলায় বলল, আচ্ছা তোমাকে কতবার না বলেছি। চকলেট কালারের এই শার্টটা পরবে না। তারপরেও পরেছ? হাতের কাছে পেয়েছি, পরে চলে এসেছি।তুমি এই শার্ট গায়ে দিয়ে থাকলে আমি কোথাও যাব না।তাহলে শার্ট খুলে ফেলি, শার্টের নিচে স্যান্ডো গেঞ্জি আছে। স্যান্ডো গেঞ্জি পরা থাকলে যাবে? আবার ঠাট্টা করছ?

ঝুমুরের চোখে পানি এসে গেছে। সে সবার ঠাট্টা সহ্য করতে পারে, এই মানুষটার ঠাট্টা সহ্য করতে পারে না। ঝুমুরের চোখে পানি দেখে সে লজ্জিত ভঙ্গিতে এসে তার হাত ধরল। ঝুমুর ঝটিকা মেরে সেই হাত সরিয়ে দিয়ে কঠিন গলায় বলল, ছিঃ এইভাবে হাত ধরলে–ক্লাসের সব মেয়েরা তাকিয়ে আছে, আপারা দেখছে।দেখুক। তুমি কাঁদবে কেন?

আমি এক শ বার কাঁদব।আমিও এক শ বার হাত ধরব।এইসব ভাবতে ঝুমুরের এত ভালো লাগে! যা ভাবা হয়। সত্যিকার জীবনে তা কখনো ঘটে না। ঝুমুরের নিশ্চিত ধারণা তার বিয়েই হবে না। আর হলেও পানের দোকানদার টাইপ কারো সঙ্গে হবে। যার গায়ে সবসময়ই ঘাম আর কড়া সিগারেটের গন্ধ থাকবে।

দুপুরে ঝুমুর কিছু খেতে পারল না। তাকে একা একা ঢাকা যেতে হবে এই টেনশানেই তার মুখে কিছু ভালো লাগছে না। কেমন যেন গা গুলাচ্ছে। ঝুমুর বলল, মা তুমি আমাকে বাসে তুলে দিয়ে আস।শাহেদা শান্ত গলায় বললেন, কোথাও তুলে দিতে পারব না। তুই নিজে নিজে বাস খুঁজে বের করবি। নিজে নিজে উঠবি।আচ্ছা। ভাইয়াকে কিছু বলতে হবে?না।আপাকে কিছু বলতে হবে?ঘরে চা নাই, চিনি নাই।চা চিনি ছাড়া আর সব আছে? শাহেদা জবাব দিলেন না।আমি কি এই কামিজটা পরেই যাব? তোর যা ইচ্ছা পর।কামিজটা যা নোংরা হয়ে আছে। আপার একটা শাড়ি পরে ফেলব মা?

শাহেদা জবাব দিলেন না। কথাবার্তা তিনি এমনিতেই কম বলেন–যত দিন যাচ্ছে কথাবার্তা আরো কমিয়ে দিচ্ছেন।ঝুমুর ঘর থেকে বের হয়ে অসীম সাহসী এক কাণ্ড করল। মবিনের মেসে যাবার জন্যে একটা রিকশা ঠিক করে ফেলল। কাজটা অসীম সাহসিক এই কারণে যে মবিনকে যদি না পাওয়া যায় তাহলে সে ঘোরতর সমস্যায় পড়বে। টাকায় টান পড়ে যাবে। ফার্মগেট থেকে নেমে এফডিসি যেতে হবে হেঁটে হেঁটে। সে চিনে যেতে পারবে কিনা তাও এক সমস্যা। বাইরে একা বেরোলেই তার শুধু সমস্যা হয়। হয়তো স্যান্ডেলের স্ট্যাপ ছিঁড়ে যাবে।

তাকে যেতে হবে স্যান্ডেল হাতে নিয়ে। তারচে’ বড়ো সমস্যাও হতে পারেহয়তো ইতিমধ্যে মবিন ভাই তার ঘর বদলেছেন। সে দরজির দোকানের সিঁড়ি বেয়ে উঠে দরজায় নক করল। দরজা খুলল–দেখা গেল ভয়ঙ্কর দর্শন কয়েকজন চৌকিতে বসে তাস খেলছে। সবার সামনে মদের গ্লাস। ঝুমুর কাঁদ কাঁদ গলায় বলল, মবিন ভাই কি এখানে থাকেন না? একজন চাপা গলায় উত্তর দিল, জ্বি না খুকুমণি, উনি থাকেন না। তাতে কী হয়েছে আমরা তো থাকি?

সেই লোকটা তারপর মাথা ঘুরিয়ে কোণায় বসে থাকা এক লোককে বলল–ঐ যা তো মেয়েটাকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দে। মুখে রুমাল ওঁজে দে। নয়তো চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলবে।ঝুমুর দরজার কড়া নাড়ল ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে। সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল। মবিন বলল, ঝুমুর তুমি, ব্যাপার কি?

আমি ঢাকা যাব মবিন ভাই।ঢাকা যাবে অতি উত্তম কথা। এটা তো ঢাকা যাবার দোতলা বাস না যে তুমি দোতলায় উঠে এলে।আপনি আমাকে ঢাকার বাসে তুলে দেবেন।অতি উত্তম তুলে দেয়া হবে।শুধু তুলে দিলে হবে না। আপনাকে আমার সঙ্গে এফডিসির গেট পর্যন্ত যেতে হবে।ব্যাপার কী?

আজ ভাইয়ার সঙ্গে দেখা করার ডেট। আপা আমাকে বলেছে আড়াইটার সময় এফডিসির গেটে থাকতে। একা একা আমি কোথাও যাই না। তবু … কোনো সমস্যা নেই, তোমাকে একা একা যেতে হবে না।আপনি কিন্তু আমাকে নামিয়ে দিয়েই চলে যাবেন এবং আপনি যে আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেছেন সেটা আপাকে বলবেন না।এত গোপনীয়তা কেন?

আপাকে বললেই আপার কাছ থেকে মা জানবে। মা খুব রাগ করবে। এই ক্ষেত্রে গোপনীয়তাই শ্ৰেয়। আড়াইটার সময় পৌঁছতে হবে? হুঁ।তাহলে বোস কিছুক্ষণ, আমি ভাত খেয়ে নি।আচ্ছা।তুমি খেয়ে এসেছ? হুঁ।আমার সঙ্গে চারটা খাবে? খেতে পারি। আমি কি আপনার বিছানায় পা তুলে বসব মবিন ভাই? অবশ্যই বসবে।আপনার ঘরে ঢুকলেই কেমন শান্তি শান্তি ভাব হয়। কেন বলুন তো মবিন ভাই?

ঘরটা ফাঁকা তো–কোনো আসবাব নেই–একটা চৌকি, একটা চেয়ার। চৌকিতে শীতলপাটি বিছানো। শীতলপাটি মানেই শান্তি, ফাঁকা ঘর মানেই শান্তি। এই জন্যে আমার ঘরে পা দিলেই শান্তি শান্তি ভাব হয়।আপনি কি আপার সঙ্গেও এরকম করে কথা বলেন, না আপার সঙ্গে অন্যরকম করে কথা বলেন?এরকম করেই কথা বলি।সে কি আপনার কথা শুনে খুশি হয়?

জিজ্ঞেস করি নি কখনো।জিজ্ঞেস করতে হবে! মুখ দেখেই তো বোঝা যায়।আমি তোমার আপার মুখ দেখে কিছু বুঝতে পারি না।আমিও পারি না।মবিন খবরের কাগজ বিছাচ্ছে। টিফিন কেরিয়ারের বাটি বের করছে। ঝুমুর বলল, আমাকে কি আজ একটু অন্যরকম লাগছে না? হুঁ লাগছে।কেন অন্যরকম লাগছে বলুন তো?

শাড়ি পরেছ এই জন্যেই অন্যরকম লাগছে।ও আপনি তাহলে লক্ষ করেছেন। আমি ভাবলাম বোধহয় লক্ষ করেন নি।লক্ষ করব না কেন, করেছি।যারা দিনরাত বই পড়ে তারা বই ছাড়া আর কিছুই লক্ষ করে না।আমি করি।ঝুমুর বাসায় কিছু খেতে পারে নি। এখানে একগাদা ভাত খেয়ে ফেলল। হাসিমুখে বলল, মবিন ভাই, ঘুমে এখন আমার চোখ জড়িয়ে আসছে। আপনার শীতলপাটিতে ঘুমুতে নিশ্চয় খুব আরাম।আমার তো আরামই লাগে।আমি একদিন স্কুল ফাঁকি দিয়ে আপনার শীতলপাটিতে এসে আরাম করে ঘুমুব।বাসায় আরাম করে ঘুমুতে পার না?

না, এতটুকু একটা বিছানা, আপা আর আমি দু’জন ঘুমাই। খুব চাপাচাপি হয়। মা’র বিছানাটা বড় কিন্তু মা’র সঙ্গে ঘুমুতে ইচ্ছা করে না। মা’র রাতে ঘুম হয় না তো–সারারাত এপাশি-ওপাশ করে। মাঝে মাঝে কাঁদে। তার গায়ের সঙ্গে গা লাগলে কী করে জানেন? ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়।

ঝুমুর চল, ওঠা যাক। এখন রওনা না হলে আড়াইটার সময় পৌঁছাতে পারবে না।ঝুমুর অনিচ্ছার সঙ্গে উঠল। মবিন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে তার সব সময়ই ভালো লাগে। আজ অন্য দিনের চেয়েও ভালো লাগছে।মবিন ভাই! হুঁ।আপনাদের বিয়ে কবে হবে? বুঝতে পারছি না। চাকরি বাকরি ছাড়া বিয়ে করা ঠিক হবে না।চাকরির আশায় বসে থাকলে আপনার আর বিয়ে হবে না।তোমার ধারণা আমার চাকরি বাকরি হবে না?

হুঁ।ভুল ধারণা। আমি বিরাট একটা চাকরি পাব। চা বাগানের ম্যানেজার। বাংলো টাইপ একটা বাড়ি থাকবে, মালী থাকবে, সুইপার থাকবে। চা বাগানে ঘোরার জন্যে ল্যান্ড রোভার জিপ থাকবে। বিকেলে আমাদের অফিসার্স ক্লাবে গিয়ে হাফপ্যান্ট আর টি শার্ট পরে লং টেনিস খেলিব। জোছনা রাতে বাংলোর বারান্দায় আমি আর তোমার আপা রকিং চেয়ারে বসে চুকচুক করে শেরী খাব এবং জোছনা দেখব।শেরীটা কী? মদ?

মদ বলবে না। মদ বললে মনে হয় ধেনো মদ। শেরী হলো মিষ্টি মিষ্টি এক ধরনের পানীয় যার অল্প খানিকটা পেটে গেলে জোছনা অনেক সুন্দর মনে হয়। বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করে।শেরী যারা খায় না তাদের বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করে না?

বেঁচে থাকার মধ্যে পার্থক্য আছে। সব বেঁচে থাকা একরকম না।ঝুমুর ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এইসব চাকরি আপনাকে মানবে না মবিন ভাই। আপনি যা আছেন, তাই আপনাকে মানাচ্ছে। ছোট্ট সুন্দর একটা ঘর। পাটি বিছানো চৌকি …বাহ্‌।মবিন হো-হো করে হেসে ফেলল। ঝুমুর অপ্ৰস্তুত হয়ে বলল, হাসলেন কেন?

আছে একটা কারণ। তোমাকে বলা যাবে না।আচ্ছা ঠিক আছে বলতে না চাইলে বলবেন না–শুধু একটা সত্যি কথাই বলুন। আমাকে খুশি করার জন্যে মিথ্যা বলতে পারবেন না।আচ্ছা যাও সত্যি কথাই বলব।শাড়ি পরায় আমাকে কি খুব সুন্দর লাগছে? যে সুন্দর সে যাই পারুক তাকে সুন্দর লাগবে।আমি কি সুন্দর মবিন ভাই?

অবশ্যই সুন্দর।আপা বেশি সুন্দর, না। আমি? সত্যি কথা বলতে হবে কিন্তু।দু’জনের সৌন্দৰ্য দু’রকম। কোনো দু’জন রূপবতী মেয়ের ভেতর তুলনা চলে না। একেক জনের সৌন্দৰ্য একেক রকম। কেউ নদীর মতো, কেউ অরণ্যের মতো, আবার কেউ আকাশের মতো! আমি কীসের মতো? ঝরনার মতো।আর আপা? সে অরণ্যের মতো।অরণ্য বেশি সুন্দর না ঝরনা? কারো কারো কাছে অরণ্য সুন্দর, কারো কাছে ঝরনা।ঝুমুর অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আপনার কাছে অরণ্য সুন্দর তাই না? এই জন্যেই চা বাগানের চাকরি আপনার এত পছন্দ, ঠিক না?

মবিন জবাব দিল না। সে একটু অস্বস্তির সঙ্গে শাড়ি পরা মেয়েটির দিকে তাকাল।ঝুমুর ঠিক আড়াইটার সময় এফডিসির গেটে এসেছে। তখন থেকেই সে অপেক্ষা করছে। আপার বেরুবার নাম নেই। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা খুব অস্বস্তিকর। একগাদা লোক দাঁড়িয়ে আছে। কোনো একটা গাড়ি এফডিসির ভেতরে ঢুকলেই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। নায়ক-নায়িকা কাউকে এক ঝলক দেখা যায় কিনা।

কাউকে দেখা যাচ্ছে না। নায়ক-নায়িকারা আসছে পর্দ ঢাকা গাড়িতে। অনেকের গাড়ির কাচ টিনটেড। বাইরে থেকে কিছু দেখা যায় না। একগাদা মানুষের ভেতর ঝুমুর একাই মেয়ে। সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। একজন এসে জিজ্ঞেস করল সে এফডিসির ভেতর ঢুকতে চায় কিনা। ঝুমুর ভীত গলায় বলল, না।

ভিতরে যাইতে চাইলে সমস্যা নাই–নিয়া যাব।জ্বি না, আমি যাব না।লোকটা তবু তাকে ছাড়ছে না। তার আশপাশেই আছে। ভদ্রলোকের মতো চেহারা কিন্তু মতলববাজ তা বোঝাই যাচ্ছে–নয়তো ঝুমুরকে এফডিসির ভেতর নিয়ে যাবার ব্যাপারে তার এত আগ্রহ হবে কেন? সময় কতক্ষণ গেছে ঝুমুর বুঝতে পারছে না। তার সঙ্গে ঘড়ি নেই। লোকটাকে অবশ্যি জিজ্ঞেস করা যায়। তার হাতে বাহারি ঘড়ি।

আচ্ছা আপা কোনো কারণে বাসায় চলে যায় নি তো? যদি চলে গিয়ে থাকে তাহলে তো সে ভয়ঙ্কর বিপদে পড়বে। একা একা ফিরতে হবে জয়দেবপুর। এই বদলোক নিশ্চয়ই তার পেছনে পেছনে যাবে।ঝুমুর।ঝুমুর চমকে তাকাল। মিতু বের হয়েছে। তার মুখে মেকআপ। ঠোঁট টকটকে লাল। তাড়াতাড়ি আসার জন্যে মেকআপ তোলারও সময় পায় নি।তুই কি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছিস? হুঁ। তোমার শাড়ি পরে চলে এসেছি। রাগ কর নি তো?

না, শুধু শুধু রাগ করব কেন? চল যাই–আয় একটা রিকশা নিয়ে নিই। একা একা আসতে ভয় লাগে নি তো? উঁহুঁ।বাহ্‌। তোর তো সাহস বেড়েছে। কিছুক্ষণ হাঁটতে পারবি ঝুমুর? হুঁ পারব।তাহলে আয় একটু হাঁটি–বাংলামোটর পর্যন্ত গেলে টেম্পো পাওয়া যাবে।তুমি ঢাকা শহরে সব রাস্তাঘাট চেন তাই না?

মোটামুটি চিনি।আপা, বাসায় চিনি নাই, চা নাই।মিতু ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল। সেই নিঃশ্বাস ফেলা দেখে ঝুমুর নিশ্চিত বুঝল আপার কাছে কোনো টাকা-পয়সা নেই।তোর কি হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে ঝুমুর? উঁহুঁ।হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্যেও ভালো।তুমি তো আর স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্যে হাঁটছ না, দায়ে পড়ে হাঁটছ। গাড়ি থাকলে তুমি কি আর স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যে হাঁটতে?

তাও ঠিক।আপা, আজ খুব ভোরবেলা বাড়িওয়ালা এসেছিল দু’টা পেঁপে নিয়ে। তার বাগানের পেঁপে। মা’র সঙ্গে কথা বলল।বাড়ি ছেড়ে দিতে বলল? হুঁ।বেশি ভাড়ার ভাড়াটের কাছে ভাড়া দেবে? তা বলল না। তার নিজের জন্যেই বাড়ি দরকার। সংসার বড় হয়েছে, ছোট ছেলে হুট করে বিয়ে করে ফেলেছে–এইসব কথা।মা কী বলল? মা কিছুই বলে নি, শুধু শুনেছে।হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে ঝুমুর?

না।এই তো এসে পড়েছি।আমরা কি সত্যি সত্যি-টেম্পোতে করে একদল পুরুষের সঙ্গে গা ঘেসাঘেঁসি করে যাব? আমার তো ভাবতেই বমি আসছে।তোকে এক কোণায় বসিয়ে দেব। তোর আর কারো সঙ্গে গা ঘেঁসে যেতে হবে না।তোমার তো যেতে হবে।আমার এইসব গা সহা হয়ে গেছে।আমাদের মতো খারাপ অবস্থায় বোধহয় কেউ নেই, তাই না আপা?

থাকবে না কেন, আমাদের চেয়েও অনেক খারাপ অবস্থায় লোক আছে। আমার পরিচিত এক মেয়ে আছে–ওর নাম টেপী। ছবিতে ছোটখাটো রোল করে। বিরাট সংসার তাকে একা টানতে হয়। ছবির পয়সায় তো হয় না–কিছু জঘন্য কাজ তাকে করতে হয়।জঘন্য কাজটা কী?

মিতু জবাব দিল না। টেম্পোস্ট্যান্ড চলে এসেছে। সে বোনের হাত ধরে খালি টেম্পো খুঁজছে। সবার আগে উঠলে ঝুমুরকে কোণার দিকে নিরাপদ জায়গায় বসাতে পারবে।রফিক দু’বোনকে দেখে হাসল। গতবার তার মুখভর্তি দাড়ি ছিল। এখন নেই। মাথার চুলও ছোট ছোট করে কাটা। তার গায়ের রং ধবধবে ফর্সা। লম্বা হালকাপাতলা শরীর। জেলের বাইরে সাধারণ কোনো পোশাক পরিয়ে দিলেও তাকে দেখে সবাই বলবে, বাহু ছেলেটা সুন্দর তো! আজি তাকে মোটেই সুন্দর লাগছে না। তার চোখের নিচে গাঢ় হয়ে কালি পড়েছে। ঠোঁট ফ্যাকাসে। ঠোঁটের দু কোণায় ঘায়ের মতো হয়েছে। ঝুমুর কাঁপা গলায় বলল, কেমন আছ ভাইয়া?

রফিক মাথা নাড়ল। কিছু বলল না। তার স্বভাবও শাহেদার মতো। সেও কথা কম বলে।ভাইয়া, তোমার কি শরীর খারাপ?একটু খারাপ।কী হয়েছে?রাতে ঘুম হয় না।মিতু বলল, তোমাদের জেলে ডাক্তার নেই? আছে–ডাক্তার, হাসপাতাল সবই আছে।ঘুম হচ্ছে না, সেটা তাহলে ডাক্তারকে বল। কতদিন ধরে ঘুম হচ্ছে না? রফিক প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আগ্রহের সঙ্গে বলল, মা’র শরীর কেমন? ভালো।আমাকে দেখার জন্যে আসতে চায় না? না।এমনিতে শরীর ভালো?

হুঁ।তোরা চলে যা, আর কী, দেখা তো হলো।মিতু বলল, ভাইয়া তোমার শরীর কিন্তু খুবই খারাপ করেছে। তুমি ডাক্তারকে তোমার অসুখের কথা বল।বলব।ভাইয়া। তোমার জন্যে দুশ টাকা এনেছি। জেল গেটের জমাদার মোসাদেক আলীর কাছে দিয়েছি। তোমার কাছে পৌঁছবে তো? অর্ধেক পৌঁছবে।আর তোমার জন্যে এক প্যাকেট সিগারেট এনেছি।সঙ্গে ম্যাচ আছে?

হ্যাঁ।দে তাহলে একটা খাই।রফিক সিগারেট ধরাল। নীরবে টানছে। ঝুমুর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করছে। বলতে পারছে না। সে কোনোমতে বলল, জেলখানায় থাকতে তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না ভাইয়া?

রফিক সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, না, কষ্ট আর কী? মানুষ খুন করে জেলে আছি–ঠিকই তো আছে। অনেকে কোনো অপরাধ না করে খুনের দায়ে যাবজীবন জেল খাটছে। কষ্ট তাদের। তোরা চলে যা। মা’কে একবার ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে আসিস। উনার বয়স হয়েছে, হুট করে কোনোদিন মরে যাবেন, আর দেখা হবে না।মিতু বলল, পরের বার যখন আসি নিয়ে আসব। ভাইয়া আমরা এখন যাই?আচ্ছা যা। ঝুমুর ছয় মাসে এত বড় হয়ে গেল কীভাবে?

ঝুমুর লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, আমি বেশি বড় হইনি ভাইয়া। শাড়ি পরেছি। এই জন্যে বড় লাগছে।মা যদি আমার কথা জানতে চায় তাহলে বলিস। আমি ভালোই আছি। রাতে ঘুম হচ্ছে না। এইসব বলার দরকার নেই।ফেরার পথে তারা মোটামুটি ফাঁকা বাস পেয়ে গেল। ঝুমুর জানালার পাশে বসেছে। একটু পর পর চোখ মুছছে। ভাইয়াকে দেখে ফেরার পথে সব সময় সে এরকম কাঁদে। প্ৰতিবারই ভাবে সে মা’র মতো হয়ে যাবে–কখনো দেখতে যাবে না। কখনো না।

 

Read more

পেন্সিলে আঁকা পরী পর্ব:০৮ হুমায়ূন আহমেদ