পল্লী সমাজ পর্ব:৮ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

 তখন রাত্রি বোধ করি এগারটা। বেণীর চণ্ডীমন্ডপ হইতে অনেকগুলি লোকের চাপাগলার আওয়াজ আসিতেছিল। আকাশে মেঘ কতকটা কাটিয়া গিয়া ত্রয়োদশীর অস্বচ্ছ জ্যোৎস্না বারান্দার উপরে আসিয়া পড়িয়াছিল। সেইখানে খুঁটিতে ঠেস দিয়া একজন ভীষণাকৃতি প্রৌঢ় মুসলমান চোখ বুজিয়া বসিয়া ছিল। তাহার সমস্ত মুখের উপর কাঁচা রক্ত জমাট বাঁধিয়াগিয়াছে—পরণের বস্ত্র রক্তে রাঙা; কিন্তু, সে চুপ করিয়া আছে। বেণী চাপা-গলায়… Continue reading পল্লী সমাজ পর্ব:৮ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পল্লী সমাজ পর্ব:৭ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

মাস তিনেক পরে একদিন সকালবেলা তারকেশ্বরের যে পুষ্করিণীটিকে দুধপুকুর বলে, তাহারই সিঁড়ির উপর একটি রমণীর সহিত রমেশের একেবারে মুখোমুখি দেখা হইয়া গেল। ক্ষণকালের জন্য সে এম্‌নি অভিভূত, অভদ্রভাবে তাহার অনাবৃত মুখের পানে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল যে, তাহার তৎক্ষণাৎ পথ ছাড়িয়া সরিয়া যাইবার কথা মনেই হইল না। মেয়েটির বয়স, বোধ করি, কুড়ির অধিক নয়। স্নান করিয়া… Continue reading পল্লী সমাজ পর্ব:৭ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পল্লী সমাজ পর্ব:৬ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

“জ্যাঠাইমা!” “কে, রমেশ? আয় বাবা, ঘরে আয়।” বলিয়া আহ্বান করিয়া বিশ্বেশ্বরী তাড়াতাড়ি একখানি মাদুর পাতিয়া দিলেন। ঘরে পা দিয়াই রমেশ চমকিত হইয়া উঠিল। কারণ, জ্যাঠাইমার কাছে যে স্ত্রীলোকটি বসিয়াছিল, তাহার মুখ দেখিতে না পাইলেও বুঝিল—এ রমা। তাহার ভারি একটা চিত্তজ্বালার সহিত মনে হইল, ইহারা মাসীকে মাঝ্‌খানে রাখিয়া অপমান করিতেও ত্রুটি করে না, আবার নিতান্ত নির্লজ্জার… Continue reading পল্লী সমাজ পর্ব:৬ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পল্লী সমাজ পর্ব:৫ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বিশ্বেশ্বরীর সেদিনের কথাটা সেইদিনেই দশখানা গ্রামে পরিব্যাপ্ত হইয়া গিয়াছিল। বেণী লোকটা নিজে কাহারও মুখের উপর রূঢ় কথা বলিতে পারিত না; তাই সে গিয়া রমার মাসীকে ডাকিয়া আনিয়াছিল। সেকালে নাকি তক্ষক দাঁত ফুটাইয়া এক বিরাট অশ্বত্থ গাছ জ্বালাইয়া ছাই করিয়া দিয়াছিল। এই মাসীটিও সেদিন সকালবেলায় ঘরে চড়িয়া যে বিষ উদ্গীর্ণ করিয়া গেলেন, তাহাতে বিশ্বেশ্বরীর রক্তমাংসের দেহটা,… Continue reading পল্লী সমাজ পর্ব:৫ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পল্লী সমাজ পর্ব:৪ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পল্লীগ্রামে সহরের কড়াপর্দ্দা নাই। তত্রাচ বিশ্বেশ্বরী বড়বাড়ীর বধূ বলিয়াই হৌক্‌, কিংবা অন্য যে-কোন কারণেই হৌক, যথেষ্ট বয়ঃপ্রাপ্তিসত্ত্বেও সাধারণতঃ কাহারো সাক্ষাতে বাহির হইতেন না। সুতরাং, সকলেই বড় বিস্মিত হইল। যাহারা শুধু শুনিয়াছিল, কিন্তু ইতিপূর্ব্বে কখনো চোখে দেখে নাই, তাহারা তাঁহার আশ্চর্য্য চোখ দুইটির পানে চাহিয়া একেবারে অবাক্‌ হইয়া গেল। বোধ করি, তিনি হঠাৎ ক্রোধবশেই বাহির হইয়া… Continue reading পল্লী সমাজ পর্ব:৪ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পল্লী সমাজ পর্ব:৩ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

ছেলেমেয়ে সঙ্গে করিয়া বৃদ্ধ ধীরে ধীরে চলিয়া গেল। রমেশ ফিরিয়া আসিয়া মুহূর্ত্তের জন্য নিজের রূঢ় কথা স্মরণ করিয়া গাঙুলী মশায়কে কিছু বলিবার চেষ্টা করিতেই, তিনি থামাইয়া দিয়া উদ্দীপ্ত হইয়া বলিয়া উঠিলেন, “এ যে আমার নিজের কাজ, রমেশ, তুমি না ডাক্‌লেও যে আমাকে নিজে এসেই সমস্ত কর্‌তে হ’ত। তাই ত এসেছি; ধর্ম্মদাস-দা’ আর আমি দুই ভায়ে… Continue reading পল্লী সমাজ পর্ব:৩ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পল্লী সমাজ পর্ব:২ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

সহরের ময়রারা ভিয়ান ছাড়িয়া চাহিয়া রহিল। চতুর্দ্দিকে যাহারা কাজকর্ম্মে নিযুক্ত ছিল, চেঁচামিচি শুনিয়া তাহারা তামাসা দেখিবার জন্য সুমুখে ছুটিয়া আসিল; ছেলেমেয়েরা খেলা ফেলিয়া হাঁ করিয়া মজা দেখিতে লাগিল; এবং এই সমস্ত লোকের দৃষ্টির সম্মুখে রমেশ লজ্জায়, বিস্ময়ে, হতবুদ্ধির মত স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। তাহার মুখ দিয়া একটাও কথা বাহিল হইল না। কি এ? উভয়েই প্রাচীন,… Continue reading পল্লী সমাজ পর্ব:২ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পল্লী সমাজ পর্ব:১ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বেণী ঘোষাল মুখুয্যেদের অন্দরের প্রাঙ্গণে পা দিয়াই সম্মুখে এক প্রৌঢ়া রমণীকে পাইয়া প্রশ্ন করিলেন, “এই যে মাসি, রমা কই গা?” মাসী আহ্নিক করিতেছিলেন, ইঙ্গিতে রান্নাঘর দেখাইয়া দিলেন। বেণী উঠিয়া আসিয়া রন্ধনশালার চৌকাঠের বাহিরে দাঁড়াইয়া বলিলেন, “তা হ’লে রমা, কি কর্‌বে স্থির করলে?” জ্বলন্ত উনান হইতে শব্দায়মান কড়াটা নামাইয়া রাখিয়া রমা মুখ তুলিয়া চাহিল,—“কিসের বড়দা?” বেণী… Continue reading পল্লী সমাজ পর্ব:১ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

গৃহদাহ শেষ : পর্ব শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

চক্ষের নিমিষে রামবাবুর সমস্ত ঘটনা স্মরণ হইয়া গেল। তাঁহার বাটীতে আশ্রয় গ্রহণ করা হইতে আরম্ভ করিয়া সেদিনের সে মূর্ছা পর্যন্ত যাবতীয় ব্যাপার বিদ্যুদ্বেগে বার বার তাঁহার মনের মধ্যে আবর্তিত হইয়া সংশয়ের ছায়ামাত্রও কোথাও অবশিষ্ট রহিল না। এ কে, কার মেয়ে, কি জাত—হয়ত-বা বেশ্যা—ইহাকে মা বলিয়াছেন, ইহার ছোঁয়া খাইয়াছেন—ইহার হাতের অন্ন তাঁহার ঠাকুরকে পর্যন্ত নিবেদন করিয়া… Continue reading গৃহদাহ শেষ : পর্ব শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

গৃহদাহ পর্ব:২৮ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

গৃহদাহ পর্ব:২৮ অচলা কিছুই বলিল না। কথা কহিবার শক্তি যে তাহার শুকাইয়া গিয়াছিল, এ কথা সেই প্রায়ান্ধকারের মধ্যে তাহার ভয়ার্ত মুখের প্রতি চাহিয়া সুরেশ ধরিতে পারিল না। ক্ষণকাল আপনাকে সে সংবরণ করিয়া লইয়া পুনরায় বলিতে লাগিল, আমি না এসে থাকতে পারিনে বলেই তোমাকে লুকিয়ে সেদিন ভোরবেলায় পালিয়ে এসেছিলুম। এসে দেখি, গ্রাম প্রায় শূন্য। এ বাড়িতে… Continue reading গৃহদাহ পর্ব:২৮ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়