Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

শের খাঁ যদি সাপও হয় সেই সাপ এখন গর্তে ঢুকছে । সাপ গর্তে ঢোকে সোজা হয়ে ঢোকে ।

বৈরাম খাঁ বললেন, সাপ যখন গর্ত থেকে বের হয় তখন কিন্তু আবার একেবেঁকেই চলে ।

এই সাপ সহজে গর্ত থেকে বের হবে না ।

বৈরাম খাঁ ক্লান্ত গলায় বললেন, শের খাঁ ছাড়াও চিন্তিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে । আপনার ভাই কামরান মীর্জা নিজের নামে খুৎবা পাঠ শুরু করেছেন । নিজের নামে স্বর্ণমুদ্রা বের করেছেন ।

সম্রাট বললেন, এটি কামরানের শিশুসুলভ কার্য । শিশুদের সব কাজ গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে নেই । যথাসময়ে সে ক্ষমা প্রার্থনা করবে । এবং আপনি তাঁকে ক্ষমা করে দেবেন ?

হ্যাঁ ।

আপনার আরেক ভ্রাতা হিন্দাল মীর্জাকে রসদের জন্যে পাঠানো হয়েছিল । তিনি কুড়ি হাজার অশ্বরোহী সৈন্য নিয়ে রসদ সংগ্রহ বের হয়ে আর ফিরে আসেন নি । খবর পাওয়া গেছে তিনি দিল্লীর দিকে অগ্রসর হচ্ছেন । মনে হচ্ছে তাঁর ও দিল্লীর সিংহাসনে বসার বাসনা ।

বৃদ্ধকে সম্মান করো, এই সম্মান তাঁর অভিঙ্গতার কারণে,

যুবককে সমীহ করো, এই সমীহ তার তারুণ্যের কারণে,

শিশুকে ভালোবাসো, এই ভালোবাসা তার শিশুসুলভ কর্মকাণ্ডের

জন্যে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

বৈরাম খাঁ বিরস গলায় বললেন, প্রতিটি শের কবির ব্যক্তিগত ধ্যানধারণার ফসল । ব্যক্তিগত কোনো কিছুই সর্বজনীন হতে পারে না । যাই হোক, আমি হস্তীশাবকের স্নান দেখার জন্যে আসি নি । আমি শের খাঁর কাছ থেকে একটি পত্র পেয়েছি । পত্রটি আপনাকে পড়ে শোনানোর জন্যে এসেছি । সম্রাটের অনুমতি পেলে পত্রটি পড়তে চাই ।

পড়ুন ।

বৈরাম খাঁ পত্রটি পড়লেন

সিংহের চেয়ে সাহসী, দিল্লীর সূর্য সম্রাট হুমায়ূনের

প্রিয়ভাজন, বৈরাম খাঁ ।

আমার অভিনন্দন এবং সালাম ।

আপনি ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই অবগত হয়েছেন

যে, সন্ধির সকল শর্ত মেনে আমি আমার বাহিনী

নিয়ে দূরে সরে গেছি । আমার পুত্র সাইফ খাঁকে

নির্দেশ দিয়েছি সে যেন সম্রাটের সঙ্গে দিল্লী যাত্রা

করে ।

আমি যে-কোনো এক শুভদিনে সম্রাটের সামনে উপস্থিত হব । তাঁর পদচুম্বনের দুর্লভ

সুযোগের আশায় কালযাপন করছি ।

এক্ষণ, আপনাকে পত্রদানের কারণ ব্যাখ্যা

করি । আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে,

ঝাড়খণ্ডের দলপতিদের চোরাগোপ্তা হামলায় আমি

বিপর্যস্ত ।

সম্রাট হুমায়ূনের দীন সেবক হিসেবে এবং দিল্লীর সিংহাসনে প্রতি অতি অনুগত ভৃত্য হিসেবে

আমি কি আপনার কাছ থেকে কিছু পরামর্শ পেতে

পারি ?

ঝাড়খণ্ডের দলপতিদের কীভাবে সমুচিত জবার

দেওয়া যায়-এই বিষয়ে পরামর্শ ।

সম্রাটের অনুমতি সাপেক্ষে আপনি যদি রাজি

থাকেন তাহলে আপনাকে সসম্মানে আমার তাঁবুতে

আনার ব্যবস্থা আমি করব ।

পত্রের উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম ।

ইতি

আপনার গুণমুগ্ধ,

মোঘল সম্রাট হুমায়ূনের দীন সেবক,

শের খাঁ

সম্রাট বললেন, পত্রের কী জবাব দেবেন বলে ঠিক করেছেন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

বৈরাম খাঁ বললেন, আপনি যে জবাব দিতে বলবেন আমি সেই জবাবই দেব ।

আমি মনে করি শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে আপনি শের খাঁ’র সঙ্গে দেখা করতে পারেন ।

আপনার যদি এরকম নির্দেশ হয় আমি যাব । এখন আপনার অনুমতি নিয়ে আমি তাঁবুতে ফিরে যেতে চাই । বাংলা মুলুকের প্রচণ্ড তাপে আমি বিপর্যস্ত বোধ করছি ।

সম্রাট বললেন, আপনি নিজের তাঁবুতে ফিরে যান । বিশ্রাম করুন । বৈরাম খাঁ তাঁবুতে ফিরেই শের খাঁ’র পত্রের জবাব দিলেন ।

সেখানে লিখলেন,

পাঠানদের প্রতিনিধি

শের খাঁ,

আপনার পত্র পাঠ করেছি । আমার পক্ষে

কোনোক্রমেই সম্রাট হুমায়ূনকে একা ফেলে আপনার কাছে যাওয়া সম্ভব না ।

ক্ষমাপ্রার্থনাপূর্বক

বৈরাম খাঁ

দিন বৃহস্পতিবার । সময় সুবেহ্ সাদেক ।

শের খাঁ তার দুই পুত্র এবং প্রধান সেনাপতি খাওয়াস খাঁকে নিয়ে গোপন বৈঠকে বসেছেন । শের খাঁ বললেন, আজ মধ্যরাতে আমরা মোঘল বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব । কারও কিছু বলার আছে ?

কেউ জবাব দিল না । খাওয়াস খাঁ বললেন, আজকের রাতটা কি বিশেষ কারণে ঠিক করা হয়েছে ?

শের খাঁ বললেন, হ্যাঁ । আমরা মুসলমানরা ‍দিনগণনা করি চন্দ্র দেখে । সেই হিসাবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবারের শুরু শুক্রবারে মুসলমানরা যুদ্ধযাত্রা করে না । মোঘল বাহিনী নিশ্চিত মনে ঘুমাবে । আমরা মুসলমান হয়েও ঝাঁপিয়ে পড়ব ।

খাওয়াস খাঁ বললেন, দিন নির্ধারণ ঠিক আছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

শের খাঁ বললেন, মোঘল বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হবে এই বিষয়ে আমি একশত ভাগ নিঃসন্দেহ । ইম ঝাড়খণ্ডের দলপতির নামে একটা মিথ্যা গল্প তৈরী করেছি ।বারবার তার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছি । মোঘলরা তা বিশ্বাস করেছে । আমাদের দুটা লাভ হয়েছে । এক. মোঘলদের বিশ্বাস অর্জন । দুই. দ্রুত যুদ্ধযাত্রা করার অনুশীলন ।

শের খাঁ’র পুত্র সাইফ খাঁ বলেলেন, বারবার ঝাড়খণ্ডের দলপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা যে একটি অনুশীলনের অংশ তা আমি আগে বুঝতে পারি নি ।

শের খাঁ বললেন, এখন আমি কিছু কঠিন নির্দেশ দেব । এইসব নির্দেশ অক্ষরে পালন করতে হবে ।

প্রথম নির্দেশ

সম্রাট হুমায়ূনকে কোনো অবস্থাতেই হত্যা বা গ্রেফতার করা যাবে না । তাঁকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে ।

শের খাঁ’র পুত্র জালাল খাঁ বললেন, আপনার এই নির্দেশের পেছনে কারণ কী ?

শের খাঁ বললেন, একটিই কারণ । মানুষ হিসেবে আমি সম্রাট অত্যন্ত পছন্দ করি । আমি আমার ‍দিক থেকে তাঁর কোনো অমঙ্গল হতে দেব না ।

দ্বিতীয় নির্দেশ

সম্রাটের পরিবারের সমস্ত নারী ও শিশু এবং তাঁর

হেরেমের নারীদের কোনোরকম অসম্মান বা ক্ষতি

করা যাবে না ।

তৃতীয় নির্দেশ

যে-কোনো মূল্যে বৈরাম খাঁকে হত্যা করতে হবে ।

বৈরাম খাঁ সিংহের মতো সাহসী আবার শৃগালের

চেয়েওর ধূর্ত । বৈরাম খাঁ বিহীন হুমায়ূন কোনো

শক্তিই না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

শের খাঁ বললেন, এখন খাওয়াস খাঁ’র দায়িত্ব হলো বিশাল সেনাবহিনী নিয়ে ঝাড়খণ্ডের চেরুহ দলপতির বিরুদ্ধে মিথ্যা যুদ্ধযাত্রা করা । সম্রাট হুমায়ূন যেন খবর পান আপনি দলপতিকে শায়েস্তা করতে যাচ্ছেন-আমি সেই ব্যবস্থা করব । আপনি সন্ধ্যা নামার পর ফিরে আসবেন ।

খাওয়াস খাঁ বললেন, আমি কি এখনই যাত্রা করব ?

শের খাঁ বলেলেন, এই মুহূর্তে ।

ভোরবেলা নাশতা খেতে হুমায়ূন শুনলেন, শের খাঁ’র বিশাল বাহিনী খাওয়াস খাঁ’র নেতৃত্বে চেরুহ দলপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছে ।

হুমায়ূন দুঃখিত গলায় বললেন, শের খাঁ বেচারা ভালো ঝামেলায় আছে ।

সারাটা ‍দিন সম্রাটে আনন্দে কাটল । তিনি তাঁর কন্যা আকিকা বেগমের সঙ্গে পাশা খেললেন । আকিকা বেগম পাশা খেলায় পিতাকে হারিয়ে দিলেন । সম্রাট কন্যার কাছে হেরে প্রভৃত আনন্দ পেলেন। তিনি একটি শের আবৃত্তি করলেন । এই শেরটির ভাবার্থ-

সেই ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান যে বুদ্ধিতে নিজ পুত্র-কন্যার

হাতে পরাস্ত হয় ।

আকিকা বেগম বলল, বাবা, আমি তোমাকে বুদ্ধিতে হারাই নি ।

পাশার দানে হারিয়েছি ।

হুমায়ূন হাসতে হাসতে বললেন, একই ব্যাপার ।

অম্বা মেয়েটির সঙ্গেও কিছু কথা বললেন । হুমায়ূন বললেন, আমার এখানে তুমি কি সুখে আছ ?

অম্বা বলল, মহা সুখে আছি । আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে চাই । এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত । আরও চিন্তা করো । সম্রাট দুপুরে আচার্য হরিশংকরের সঙ্গে বসলেন । তাঁর অনুবাদ শুনলেন । সর্বমোট দশ পৃষ্ঠা অনুবাদ হয়েছে । সম্রাট আচার্যকে দশটি রৌপ্যমুদ্রা দিলেন ।

মাগরেবের নামাজের পর কোনোরকম খবর না দিয়ে সম্রাট উপস্থিত হলেন জেনানা তাঁবুতে । মহিলারা অভিভূত । অনেকদিন তাঁরা সম্রাটের দর্শন পায় না ।

হুমায়ূন বললেন, ‍দিল্লী ফিরে গেলে কেমন হয় ?

সবাই একসঙ্গে বলল, খুব ভালো হয় । আমরা এক সপ্তাহের মধ্যে দিল্লীর দিকে রওনা হব ।

মহিলাদের আনন্দের সীমা রইল না । তাঁদের আগ্রহে সম্রাট রাতের খাবার জেনানা তাঁবুতে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন । রাতের খাওয়ার শেষে গানবাজনার আয়োজন করা হলো ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

আনন্দেরও এক ধরনের ক্লান্তি আছে । সম্রাট সেই ক্লান্তি নিয়ে রাতে ঘুমুতে গেলেন ।

শের খাঁ’র বাহিনী কীর্তিনাশা নদীর উপরের কাঠের পুল দিয়ে পার হলো । শের খাঁ বিস্মিত হলেন । এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি পুল, সেখানে কোনো পাহারা নেই । শের খাঁ’র হস্তীবাহিনী কীর্তিনাশা সাঁতরে পার হলো ।

শের খাঁ’র বাহিনী ঘুমন্ত মোঘল সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ।

মোঘল অশ্বারোহীরা তাদের অশ্বের পিঠে জিন পরানোর সময়ও পেল না ।

সম্রাটের ঘুম ভাঙল ‘পালাও’ ‘পালাও’ চিৎকারে। সম্রাট বিস্মিত হয়ে বললেন, কী হয়েছে ?

জওহর আবতাবচি ভীত গলায় বলল, আমরা শের খাঁ কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছি এবং পরাজিত হয়েছি । মোঘল সৈন্যদের প্রায় সকলেই নিহত ।

সম্রাট বললেন, আমি কি দুঃস্বপ্ন দেখছি ?

জওহর আবতাবচি বলল, না । সম্রাট, আপনাকে এক্ষুনি পালাতে হবে ।

আহত মোঘল সেনাদের আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছে । মহিলা এবং শিশুদের কান্না শোনা যাচ্ছে ।

হুমায়ূন ভেবে পেলেন না, তাঁর তাঁবু কেন আক্রান্ত হয় নি । শের খাঁ’র উচিত ছিল সবার আগে সম্রাটকে হত্যা করা । এখানে কি শের খাঁ’র কোনো হিসাব আছে ?

সম্রাট ঘোড়ায় চড়ে কীর্তিনাশা নদীর পাড়ে গেলেন । পুল ভাঙা । শত শত মোঘল সৈন্য পুলে উঠে সেখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে পানিতে পড়ছে । নদীর স্রোতে ভেসে চলে যাচ্ছে । হাতিগুলিরও মনে হয় মস্তিঙ্ক বিকৃতি হয়েছে । তারা কিছুতেই পানিতে নামবে না । অথচ এরা শিক্ষিত হাতি । যুদ্ধক্ষেত্রের সব পরিস্থিতির জন্যে তৈরি ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

হুমায়ূন পেছনে দিকে তাকালেন, তাঁর তাঁবুতে আগুন জ্বলছে । আগুন ছুটে যাচ্ছে জেনানা তাঁবুর দিকে । আগুনের লেলিহান শিখায় আকাশ লাল । সম্রাট হুমায়ূনের ইমাম সাহেব উচ্চস্বরে আযান ‍দিচ্ছেন, আল্লাহু আকবার । আল্লাহু আকবার । মহাবিপদের সময় আযান দিতে হয় । আজ মোগলদের মহাবিপদ ।

সম্রাট ঘোড়া নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিলেন । মুহূর্তের মধ্যে ঘোড়া পানিতে তলিয়ে গেল । সম্রাট নিজেও তলিয়ে যাচ্ছিলেন । হঠাৎ শুনলেন, কে যেন বলছে আমি আপনার দিকে একটা বাতাসভর্তি মশক ছুঁড়ে দিচ্ছি । আপনি মশক ধরে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করুন ।

তুমি কি আমাকে চেনো ?

আপনি মোঘল সম্রাট হুমায়ূন ।

তোমার নাম কী ?

আমি নাজিম । ভিসতিওয়ালা নাজিম । আপনি মশক শক্ত করে ধরে ভাসতে থাকুন ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

Categories
Uncategorized শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৩

সাইফ খাঁ বললেন, সম্রাট তো একা না । তাঁর পরামর্শদাতারা আছেন । আমীররা আছেন, অতি বিচক্ষণ সেনাপতি বৈরাম খাঁ আছেন । এঁদের সবার চোখ আমরা কীভাবে এড়াব ?

শের খাঁ অসহিষ্ণু গলায় বললেন, সম্রাট চোখ বুজলে তাঁর অনুসারীদেরও চোখ বুজতে হয় এটাই নিয়ম । সম্রাট এবং তাঁর অনুসারীদের বিভ্রান্ত করার জন্যে আমি কিছু কূটকৌশলের ব্যবস্থাও করেছি ।

কী রকম ?

আমি অতি দূর্বল একদল যোদ্ধাকে পাঠাব সম্রাটকে আক্রমণ করার জন্যে । তারা পরাজিত হবে । সম্রাটের ধারণা হবে শের খাঁ’র বাহিনী দুর্বল ।

শের খাঁ’র প্রধান সেনাপতি ওসমান বললেন, কৌশলটা ভালো । সম্রাটের কাছে আমি একটা পত্র পাঠাচ্ছি । এই পত্রেও আমার দুর্বলতা প্রকাশ পাবে ।

জালাল খাঁ বললেন, কী পত্র পাঠাচ্ছেন আমরা কি শুনতে পারি ?

হ্যাঁ । পত্র আমি পড়ে শোনাচ্ছি ।

হিন্দুস্থানের মালিক,

মহাপরাক্রমশালী সিংহহৃদয় জ্ঞানতাপস মহান

মোঘল সম্রাট বাদশাহ নামদার হুমায়ূন ।

অধীন শের খাঁ’র বিনম্র সালাম গ্রহণ করুন । আসসালামু আলায়কুম ।

নিবেদন এই যে, বাদশাহর সম্মানে আমি দু’টি

সামান্য উপহার পাঠালাম ।

দুই শুঁড়বিশিষ্ট একটি হস্তীশাবক, নাম

হরিমতি । এইসঙ্গে জাদুবিদ্যার একটি প্রাচীন অপ্রচলিত ভাষায় রচিত গ্রন্থ । জাদুবিদ্যার প্রতি আপনার আগ্রহের কথা জেনেই এমন ক্ষুদ্র উপহার ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৩

পাঠানোর সাহস করছি ।

এখন আপনার প্রতি আমার সামান্য নিবেদন ।

অধীনের এই নিবেদন আপনি গুরুত্বের সঙ্গে

বিবেচনা করবেন কি না তা আপনার বিবেচনা ।

মাঝে মাঝে বৃহৎবপু হস্তীকেও সামান্য মুষিকের

কথা শ্রবণ করা জরুরি হয়ে পড়ে ।

চুনার দুর্গের পতনের পর আমার দুই বীরপুত্র

জালাল খাঁ এবং সাইফ খাঁ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ।

তারা প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর । যে-কোনোদিন

আমার এই দুই পুত্র আপনার সেনাবাহিনীর উপর

ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে । এর ফলাফল শুভ না হওয়ার

কথা । আমার এই দুই পুত্র অসীম সাহসী ।

প্রতিশোধ গ্রহণের উত্তেজনায় এই সাহস বহুগুণে

বর্ধিত হয়েছে ।

আমার পুত্রদের কাছে মোঘল বাহিনীর পরাজয়

হলে হিন্দুস্থানের মালিক সম্রাট হুমায়ূনের জন্যে তা

বিরাট কলঙ্ক । আমি সম্রাটকে এই কলঙ্কের বোঝা

নিয়ে দিল্লী প্রস্থানের কথা চিন্তাও করি না । সম্রাটের

কলঙ্ক তাঁর দীন সেবক শের খাঁ’র কলঙ্ক ।

এখন আমার অনুরোধ (এবং উপদেশ),

আপনি অতি দ্রুত দিল্লীর দিকে যাত্রা করুন । আমি

আমার ধৃষ্টতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছি ।

আপনাকে বিনয়ের সঙ্গে জানাচ্ছি, পুত্রদের উপর

আমার তেমন নিয়ন্ত্রণ নেই । আপনি নিজে একজন

মহাবীর, আপনি ভালোই জানেন বীররা নিয়ন্ত্রণ

পছন্দ করে না ।

বিনীত

সম্রাটের পদধূলিসম

শের খাঁ

শের খাঁ পত্র পাঠ শেষ করে দুই পুত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাদের কিছু বলার আছে ?

জালাল খাঁ বললেন, আমরা দুই ভাইয়ের যে-কোনো একজন মোঘলদের সঙ্গে নকল যুদ্ধ করতে যাব এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পরাজিত হব ?

হ্যাঁ ।

স্বেচ্ছা-পরাজয়ের ফলাফল হলো মোঘলদের হাতে বন্দি হওয়া । সে সম্ভাবনা অবশ্যই আছে ।

মোঘলদের হতে বন্দি হওয়া মানে হাতির পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে মৃত্যূবরণ ।

এই কথাও ঠিক । বড় মঙ্গলের স্বার্থে ক্ষুদ্র অমঙ্গল গ্রহণ করতে হয় ।

সাইফ খাঁ বললেন, কবে যুদ্ধে যাব ?

সম্রাট যেদিন এই পত্র পাবেন তার সাত দিন পর ।

প্রধান সেনাপতি ওসমান বললেন, আপনার দুই পুত্রের কাউকেই পাঠানোর প্রয়োজন নেই ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৩

আপনার সেনাপতিদের একজন যাবে । শের খাঁ বললেন, তাতে আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না । তবে সাইফ খাঁ’র ভয়ের কোনো কারণ নেই । সে যদি ধরাও পড়ে তার পরিচয় পাওয়ার পর হুমায়ূন তাকে আমার কাছে সসম্মানে ফেরত পাঠাবেন । সম্রাট হুমায়ূনের চরিত্রের সবচেয়ে দুর্বল ‍দিক হচ্ছে তাঁর করুণা এবং ক্ষমা । আমরা তাঁর এই দুর্বলতা ব্যবহার করব ।

শের খাঁ’র উপহার পেয়ে সম্রাট হুমায়ূন উত্তেজিত । জাদুর প্রাচীন বইটিকে স্বর্ণখনি বলে মনে হচ্ছে । তিনি ভাষা পড়তে পারছেন না, তবে বইয়ে অনেক ছবি । ছবিগুলি বইটির বিশেষত্ব বলে দিচ্ছে । একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটা মানুষের মুণ্ডু ধড় থেকে আলাদা করা । তার পরের ছবিতে মুণ্ডু শরীরের সঙ্গে লাগানো । একটা ছবিতে মানুষের শরীরের সঙ্গে বিড়ালের মাথা লাগানো ।

সম্রাট হিন্দুস্থানের বিভিন্ন ভাষার পণ্ডিতদের জড়ো করার নির্দেশ জারি করেছেন । তাদের কেউ-না কেউ গ্রন্থের পাঠোদ্ধার করতে পারবে ।

দুই শুঁড়ের হস্তীশাবক দেখেও তিনি উত্তেজিত । প্রকৃতির বিশেষ খেয়ালে এরকম একটি হস্তীশাবকের জন্ম হয়েছে, নাকি এটি বিশেষ কোনো প্রজাতির ? বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন ।

হরিমতি এখন আছে আকিকা বেগমের তত্ত্বাবধানে । আকিকা বেগম এবং তার বান্ধবী অম্বা হরিমতিকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। আকিকা বেগম হস্তীশাবকের হিন্দু নাম বদলে মুসলমান নাম রাখতে চাচ্ছে । অনেকগুলি নাম সে তাঁর কোরানপাঠ শিক্ষক ওস্তাদের সাহায্যে আলাদা করেছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৩

কোনোটিই পছন্দ হচ্ছে না । যেমন-

নাম           অর্থ

শাহানা          রানী

লাবীবা            জ্ঞানী

আনিসা            কুমারী

সাইয়ারা            রাজকুমারী

সাইয়ারা নাম তার কিছুটা পছন্দ হচ্ছে । কিন্তু সে চাচ্ছে তার নামের প্রথম অক্ষরের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখতে । আনিসা নাম সেই অর্থে ঠিক আছে । ‘আ’ দিয়ে শুরু । কিন্তু । নামের অর্থ (কুমারী) পছন্দ হচ্ছে না । হরিমতি নিশ্চয়ই সারা জীবন কুমারী থাকবে না।

হরিমতিকে নিয়ে সম্রাটের অন্য পরিকল্পনা আছে । তিনি এই অদ্ভুত হস্তীশাবক পারস্য-সম্রাট শাহ তামাস্পকে উপহার হিসেবে দিতে চান । পারস্য-সম্রাটের জীবজন্তুর প্রতি প্রবল আগ্রহ । তাঁর চিড়িয়াখানা সারা পৃথিবী থেকে খুঁজে আনা জীবজন্তুতে পরিপূর্ণ। শাহ এই অদ্ভুত উপহার পেয়ে অবশ্যই আনন্দে আত্মহারা হবেন । পারস্যের সঙ্গে তখন সুসম্পর্ক হবে । এর ফলাফল হবে শুভ।

শুক্রবার জুমার নামাজ শেষ করে সম্রাট বিশ্রামে গেছেন । কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তিনি দুপুরের খাবার খাবেন । ঘুমে সম্রাটের চোখ লেগে আসছে, তখনই তাঁকে ডেকে তোলা হলো । তাঁকে দুঃসংবাদ দেওয়া হলো । শের খাঁ’র পুত্র সাইফ খাঁ প্রায় এক হাজার অশ্বারোহী নিয়ে মোঘল শিবির আক্রমণ করেছে । যুদ্ধের জন্যে মোঘলদের প্রস্তুতি ছিল না বলে অল্পকিছু মোঘল সৈন্য নিহত হয়েছে । সাইফ খাঁ সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়েছে । তাকে বন্দি করা হয়েছে । সাইফ খাঁ’র সঙ্গের সৈন্যদের প্রায় সবাই নিহত হয়েছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৩

সাইফ খাঁ-কে সম্রাটের সামনে আনা হলো । সম্রাট দেখলেন নিতান্তই অল্পবয়সী অতি সুপুরুষ এক যুবক ।

সম্রাট বললেন, অতি অল্পকিছু সৈন্য নিয়ে তুমি বিশার মোঘলবাহিনীকে আক্রমণ করেছে । এটা কি তোমার নির্বুদ্ধিতা নাকি কোনো কৌশল ?

সাইফ খাঁ মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি বিশাল বাহিনী নিয়েই এসেছিলাম । বেশিরভাগই ছিল ভাড়াটে সৈন্য । যুদ্ধ শুরু হওয়ামাত্র তারা পালিয়ে গেছে ।

বন্দি শক্রকে হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট করে মারার রেওয়াজ মোঘলদের আছে, এই তথ্য তুমি জানো ?

জানি ।

তুমি কি আমার কাছে প্রাণভিক্ষা চাও ?

সাইফ খাঁ বললেন, আপনার করুণা এবং দয়ার কথা আমি জানি ।

আপনি যে আমার প্রাণ ভিক্ষা দেবেন সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত ।

আমি এখন দুপুরের খাবার খাব । তুমি আমার সঙ্গে খেতে বসো । খাওয়ার পর তোমার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব । আচ্ছা তুমি যেন শান্তিমতো খেতে পার আমি সেই ব্যবস্থা করছি । তোমাকে ক্ষমা করা হলো । তুমি শের খাঁ’র কাছে ফিরে যাবে এবং তাঁকে বলবে তাঁর পাঠানো উপহার আমার পছন্দ হয়েছে ।

আমি বাবাকে এই সংবাদ দেব ।

সম্রাট বললেন, আমি তোমার পিতার সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে দিল্লী ফিরে যাব । এই খবরও বাবাকে জানাব । তিনি খুশি হবেন ।

সম্রাট হুমায়ূন সাইফ খাঁ-কে ডানপাশে বসালেন । অতি সম্মানিতজনকেই এমন সম্মান দেখানো হয় ।

জায়গাটার নাম চৌসা । গঙ্গা এবং কীর্তিনাশা নদীর সঙ্গমস্থলে ছোট একটা গ্রাম । চৌসার দক্ষিণে হুমায়ূনের বিশাল বাহিনী আস্তানা গেড়েছে । নদীর একদিকে মোঘল বাহিনী, অন্যদিকে শের খাঁ’র আফগান বাহিনী । মাঝখানে খরস্রোতা কীর্তিনাশা নদী । আফগান বাহিনী নদী পার হয়ে মোঘল বাহিনীকে আক্রমণ করবে সেই সম্ভাবনা শূন্য । নদীতে নড়বড়ে কাঠের পুল আছে । সেই পুলে বিশাল বাহিনী পার হতে পারবে না । পুলের উপর কামান গাড়ি তোলার প্রশ্নই আসে না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৩

হুমায়ূনের গুপ্তচর খবর এনেছে শের খাঁ পর্যুদস্ত অবস্থায় আছেন । ঝাড়খণ্ডের চেরুহ দলপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন । তার দেখা না পেয়ে ফিরে আসেন । শের খাঁ যে সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন তাতে বিশাল মোঘল বাহিনীর উপর আক্রমণ চালানোর প্রশ্নই ওঠে না । শের খাঁ চাইবেন যে-কোনো মূল্যে মোঘলদের সঙ্গে সন্ধি ।

মোঘল সম্রাট নিশ্চিত মনে সময় কাটাচ্ছেন । জাদুবিদ্যার বইটির পাঠোদ্ধারের ব্যবস্থা হয়েছে । বইটি প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় লেখা। সেই ভাষার একজন পণ্ডিত বইটি ফার্সি ভাষায় অনুবাদ শুরু করে দিয়েছেন । পণ্ডিত হিন্দু ব্রাক্ষণ, নাম আচার্য হরিশঙ্কর বিদ্যাবাচম্পতি । তিনি প্রতি পৃষ্ঠা অনুবাদ করার জন্যে পাচ্ছেন একটি করে রৌপ্যমুদ্রা ।

সম্রাট নতুন এক খেয়ালেও কিছু সময় দিচ্ছেন । তিনি হিন্দুস্থানি রান্নার একটি কোষগ্রন্থ তৈরি করতে চাচ্ছেন। বিশাল হিন্দুস্থানের নানান অঞ্চলে কত ধরনের রান্নাই-না হয় । সব একত্রিত থাকলে গবেষকদের জন্যে সুবিধা । হিন্দু বিধবারা (যারা নানান কারণে সতীদাহরে হাত থেকে বেঁচে গেছে) মাছ-মাংস খেতে পারে না । তাদের জন্যে বিচিত্র সব নিরামিষ রান্না হয় । বিচিত্র নিরামিষের একটি খেয়ে সম্রাট আনন্দ পেয়েছেন । কাঁঠাল নামের একটি কাঁচা ফল থেকে এই নিরামিষ তৈরি হয় । খেতে মাংসের মতো লাগে। সম্রাট শুরুতে ধরতেই পারেন নি তিনি নিরামিষ খাচ্ছেন, মাংস না । হিন্দুস্থানি রান্নার আকরগ্রন্থ তৈরির বাসনার মূলে আছে কাঁঠালের নিরামিষ ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৩

সম্রাট ঠিক করেছেন, জাদুবিদ্যার বইটির অনুবাদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি চৌসাতে থাকবেন । শের খাঁ’র সঙ্গে সন্ধি করে দিল্লী ফিরে যাবেন । পেছনে শক্র রাখা কোনো কাজের কথা না ।

সন্ধির শর্ত নিয়ে আলোচনার জন্যে সম্রাটের দূত শায়েখ খলিলকে শের খাঁ’র কাছে পাঠানো হলো । শর্তগুলো নিম্নরুপ-

প্রথম শর্ত

শের খাঁতার অবস্থান থেকে পেছনে সরে যাবেন,

যাতে ইচ্ছা করলেই মোঘল বাহিনী কীর্তিনাশা নদী

পার হতে পারে ।

দ্বিতীয় শর্ত

শের খাঁ তার পুরোনো জায়গির বাংলা ও বিহার

ফিরে পাবেন ঠিকই, তবে তাঁকে নিয়মিত কর

পরিশোধ করতে হবে । তিনি খুৎবা পড়বেন সম্রাট

হুমায়ূনের নামে । টাঁকশালের মুদ্রাও মোঘল

সম্রাটের সম্রাটের নামে তৈরি হবে ।

তৃতীয় শর্ত

শের খাঁ’র এক পুত্রকে (সম্রাটের পছন্দ সাইফ খাঁ)

থাকতে হবে দিল্লী দরবারে, সম্রাটের নজরদারিতে ।

চতুর্থ শর্ত

শের খাঁ স্বয়ং হুমায়ূনের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁর

কর্মকাণ্ডের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন । তিনি

আফগান এবং মোঘল সুসম্পর্কের জন্যে ভূমিকা

রাখবেন ।

শের খাঁ প্রতিটি শর্ত মেনে নিলেন । নিজের অবস্থান থেকে কুড়ি মাইল পেছনে সরে গেলেন । হুমায়ূনের কীর্তিনাশা নদী অতিক্রমে কোনো বাধা রইল না ।

সম্রাট তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে নদী অতিক্রম করলেন না, তবে তিনি সপ্তাহে একদিন নদীর তীরে স্বয়ং উপস্থিত হতে লাগলেন । ওই বিশেষ দিনে দুই শুঁড়ের হস্তীশাবককে গোসল করানো হয় । গোসলের সময় সে তার দুই শুঁড় দিয়ে একসঙ্গে আকাশে পানি ছুঁড়ে মারে । সেই পানি বৃষ্টির মতো তার গায়ে নেমে আসে । অদ্ভুত দৃশ্য ।

সঙ্গলবার ‍দ্বিপ্রহর । সম্রাট কীর্তিনাশা নদীর তীরে হস্তীশাবকের স্নানদৃশ্য দেখছেন । সম্রাটের সঙ্গে আছেন বৈরাম খাঁ । বৈরাম খাঁকে চিন্তিত এবং বিষণ্ন দেখাচ্ছে । হস্তীশাবকের জলকেলি দেখে তিনি তেমন আনন্দ পাচ্ছেন না । সম্রাট বললেন, বৈরাম খাঁ, আপনাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন ?

বৈরাম খাঁ বললেন, আমি চিন্তিত বলেই মনে হয় চিন্তিত দেখাচ্ছে ।

চিন্তিত হওয়ার মতো কোনো ঘটনা কি ঘটেছে ?

আমি শের খাঁকে নিয়ে চিন্তিত । সে সাপের মতো ধূর্ত ।

সম্রাট হাসতে হাসতে বললেন, সাপ ধূর্ত না, ভীতু প্রাণী

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৪

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১২

শের খাঁ’র উজির বললেন, শক্র  সম্পর্কে এমন প্রশংসাসূচক বাক্য দুর্বলতার নামান্তর ।

শের খাঁ বললেন, আমি অবশ্যই এই মানুষটির প্রতি দুর্বল । আমি সম্রাটের লেখা একটি কবিতা পাঠ করছি ।

পাঠ শেষ হওয়ামাত্র আপনারা বলবেন, মারহাবা ।

অশ্ব অশ্বারোহীর বন্ধু নয় ।

যেমন বন্ধু নয় বায়ু, মেঘমালার ।

বন্ধু হবে এমন যাদের সঙ্গে কখনো দেখা হবে না ।

দু’জনই থাকবে দু’জনের কাছে অদৃশ্য ।

দৃশ্যমান থাকবে তাদের ভালোবাসা ।

শের খাঁ’র উজির নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে বললেন, মারহাবা ।

হিন্দুস্থানি এক নগ্নগাত্র জাদুকর এসেছে সম্রাটকে ভোজবাজি দেখাতে । তার কোমরের কাছে মালকোঁচা দিয়ে পরা নোংরা ধুতি । মাথায় বিশাল সাদা পাগড়ি । পাগড়ি পরিষ্কার, ঝকঝক করছে । সে কৃশকায়, গাত্রবর্ণ পাতিলের তলার মতো কালো । ভোজওয়ালার সঙ্গে তার কন্যা । বয়স চার-পাঁচ । সেও নগ্নগাত্র। লাল টুকটুকে প্যান্ট পরেছে । মেয়েটির চোখ মায়াকাড়া । সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সম্রাটের দিকে । একবারের জন্যেও দুষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছে না । তার দৃষ্টিতে ভয় এবং বিস্ময় ।

সম্রাট বসেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে । পরিবারের বাইরে আছে অম্বা, কিছু পরিচারিকা এবং একদল খোজা প্রহরী । সম্রাট বললেন, খেলা দেখাও ।

বাজিকর সম্রাটকে কুর্নিশ করল । এতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল তার দুই হাতই খালি, এখন তার ডান হাতে একটা আমের আঁটি দেখা গেল। সে আমের আঁটি মাটিতে পুঁতে দিল । প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মাটি ফুঁড়ে আমগাছ বের হতে শুরু করল । সম্রাট বললেন, সোবহানাল্লাহ্।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১২

বাজিকর গাছের উপর দিয়ে একবার হাত বুলিয়ে নিতেই দেখা গেল গাছে তিনটা পাকা আম ঝুলছে । বাজিকর আম তিনটা ছিঁড়ে সম্রাটের সামনে রেখে আবারও কুর্নিশ করল । সম্রাট বললেন, মারহাবা । বলেই বিস্ময়ে অভিভূত হলেন-যেখানে আমগাছ ছিল সেখানে গাছ নেই । কুণ্ডলী পাকিয়ে বিষধর গোখরো সাপ বসে আছে । সাপ ফণা তুলেছে । ফোঁস ফোঁস শব্দ করছে ।

মহিলারা অস্ফুট শব্দ করে নড়েচড়ে বসলেন । জাদুকর মাথার পাগড়ি খুলে সাপ ঢেকে দিল । বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিতেই দেখা গেল পাগড়ির ভেতর কোনো সাপ নেই । সাপের পরম শক্র  লালচোখা বেজি বসে আছে । এবার সবাই একসঙ্গে বলল, মারহাবা ।

সম্রাট বললেন, তুমি কি আমার সঙ্গে দিল্লী যাবে ? আমি তোমাকে জায়গির দেব । বিশেষ বিশেষ উৎসবে তুমি তোমার খেলা দেখাবে । (সম্রাট কথা বললেন দোভাষীর মাধ্যমে, তিনি হিন্দুস্থানি জানেন না ।) জাদুকর বলল, না ।

না কেন ?

নদী অতিক্রম করা আমার জন্যে নিষেধ ।

নিষেধ কে করেছেন ?

আমার গুরু ।

জাদুকর গুরুর উদ্দেশে আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত জোড় করল। সম্রাট বললেন, জাদু দেখানোর সময় তুমি মন্ত্রপাঠ করেছ । মন্ত্র বলে কি কিছু আছে ?

আছে ।

সবচেয়ে কঠিন মন্ত্র কোনটি ?

শূন্যে ভাসা মন্ত্র । এই মন্ত্র পড়লে শূন্যে ভাসা যায় ।

তুমি শূন্যে ভাসতে পার ?

আমি পারি না, আমার গুরু পারেন ।

জাদুকর আবারও গুরুর উদ্দেশে দুই হাত জোড় করল ।

তুমি কী পার?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১২

আমি পানির উপর হাঁটতে পারি । তবে নদীর পারি না, দিঘির শান্ত পানি । নদীর পানির উপর হাঁটতে পারি । তবে নদীতে পারি না, দিঘির শান্ত পানি । নদীর পানির উপর দিয়ে হাঁটা আমার গুরুর নিষেধ ।

তুমি কি পানির উপর দিয়ে হাঁটার জাদু আমাকে দেখাতে পারবে ?

পারব ।

চিকিৎসক এবং সম্রাট এই দু’জনের কাছে সর্ব অবস্থায় সত্যি কথা বলতে হয় । তুমি সত্যি করে বলো, পানির উপর দিয়ে হাঁটার কি কোনো কৌশল আছে, না শুধুই মন্ত্র ?

কৌশল আছে । তুমি কি এই কৌশল আমাকে শিখাবে ?

সম্রাট রাজ্য শাসন করবেন । ভোজবাজি কেন শিখবেন ?

তুমি তো বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পার । আমি তোমার ভোজবাজি দেখে মুগ্ধ হয়েছি । তুমি আমার কাছে কী চাও বলো ।

আমি ভগবান ছাড়া কারও কাছে কিছু চাই না । আপনি আমার খেলা দেখে খুশি হয়েছেন এতেই আমি খুশি । সম্রাটকে খুশি করতে পারা বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার । আমি ভাগ্যবান ।

সম্রাট তাঁর কন্যা আকিকা বেগমকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন । আকিকা ছুটে এল ।

ভোজবাজির খেলা কেমন লাগল মা ?

খুব ভালো লাগল বাবা ।

এই জাদুকর আমাকে খুশি করেছে, আমি তাকে খুশি করতে চাই । কী উপহার পেলে সে খুশি এবং বিস্মিত হবে ?

বাবা, আপনি তাকে একটা হাতি উপহার দিন ।

হাতি?

হ্যাঁ হাতি । উপহার হিসেবে সে হাতি পাবে এটা কখনো কল্পনা করে নি । আপনার উপহার তার কল্পনাকে ছাড়িয়ে যাবে । তোমার সঙ্গে যে হিন্দুস্থানি মেয়েটি আছে সে কেমন আছে ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১২

খুব ভালো আছে । আনন্দে আছে ।

তার নাম যেন কী ?

তার নাম অম্বা ।

সে কি তার আত্মীয়স্বজনের কাছে ফেরত যেতে চায় ?

না । আত্মীয়স্বজনরা তাকে ফেরত নেবে না । সে বাজি জীবন আমার সঙ্গে থাকবে । বাবা, আপনি কি জানেন আমরা দু’জন এক বিছানায় ঘুমাই

জানতাম না ।

এখন জানলাম । আপনি কি রাগ করেছেন ?

আমি আমার আদরের আকিকা বেগমের উপর কখনো রাগ করব না ।

আমি যদি কোনো অন্যায় করি তারপরেও না ?

তারপরেও না । তুমি কি কোনো অন্যায় করেছ ?

করেছি । বড় অন্যায় করেছি ।

অন্যায়টা কি বলবে ?

না ।

আচ্ছা যাও । তোমার বড় অন্যায় ক্ষমা করা হলো ।

সম্রাটের নির্দেশে হিন্দুস্থানি জাদুকরকে একটা হাতি উপহার হিসেবে দেওয়া হলো । হতভম্ব জাদুকর এবং তার মেয়েকে হাতির পিঠে চড়িয়ে দেওয়া হলো । বাচ্চা মেয়েটি আতঙ্কে অস্থির হয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে থাকল ।*

*হাতির পিঠে হিন্দুস্থানি জাদুকর এবং তার কন্যার মোঘল রীতিতে আঁকা একটি পেইন্টিং ব্রিটিশ জাদুঘরে রক্ষিত আছে ।

শের খাঁ তার সমরবিশারদদের নিয়ে গোপন বৈঠকে বসেছেন । সমরবিশারদদের চারজনের মধ্যে আছে দুই পুত্র জালাল খাঁ, সাইফ খাঁ এবং দুই সেনাপতি ।

শের খাঁ বললেন, যুদ্ধ শুরুর আগে শক্রর সরল এবং দুর্বল দিকগুলি খুঁজে বের করতে হবে । সম্রাট হুমায়ূনের সবল এবং দুর্বল দিক কী ?

জালাল খাঁ বললেন, সম্রাট হুমায়ূন ভীরু মানুষ, এটাই তার দুর্বল দিক । তাঁর কামানবাহিনী হলো তাঁর সবল দিক ।

পুত্র! তুমি ভুল বললে । হুমায়ূন অসম্ভব সাহসী একজন মানুষ । আমোদপ্রিয়, তবে সাহসী । আর তাঁর বিশাল কামানবাহিনী তাঁর সবচেয়ে ‍দুর্বল দিক ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১২

কেন ?

কামানবহর নিয়ে শক্রর উপর ঝাঁপিয়ে পড়া যায় না । এত কামান কীভাবে দ্রুত টেনে নেবে? কামানবহরকে স্থির হয়ে এক জায়গায় থাকতে হয় । বিশাল কামানবহর নিয়ে আক্রমণ করা যায় না । শক্র প্রতিরোধ করা যায় ।

জালাল খাঁ বললেন, আমি এই ভাবে ভাবি নি । আপনার কথা সত্য ।

তবে সম্রাট হুমায়ূন যে কাপুরুষ এই কথাটি সত্য ।

তুমি মনে হয় পানিপথের যুদ্ধের কথা ভুলে গেছ । পানিপথে সম্রাট বাবরের ডানবাহুর দায়িত্বে ছিলেন হুমায়ূন । তিনি অসাধারণ বীরত্ব দেখিয়েছেন । বাহাদুর শাহ’র হাত থেকে তিনি চিতোর কীভাবে ছিনিয়ে নিয়েছেন তাও সম্ভবত তোমার মনে নেই । সম্রাট হুমায়ূন সাহসী, কিন্তু খেয়ালি মানুষ । তাঁর চরিত্রের খেয়ালি অংশই হলো তাঁর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা । আমরা তাঁর এই দুর্বলতাকেই ব্যবহার করব ।

কীভাবে ?

শের খাঁ শান্ত গলায় বললেন, নানান খেয়ালে তিনি যেন সময় পার করতে পারেন আমরা সেই চেষ্টা করব । জাদুবিদ্যার একটা প্রাচীন বই জোগাড় করেছি । সেই বই তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে । বইটি প্রাচীন কোনো অপ্রচলিত ভাষায় লেখা । সম্রাটের সময় যাবে বইটির ভাষা উদ্ধার করতে । আমি ত্রিপুরা রাজ্য থেকে একটা হাতির বাচ্চা জোগাড় করেছি । হাতির বাচ্চার বিশেষত্ব হচ্ছে-প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে সে দু’টা শুঁড় নিয়ে জন্মেছে । সম্রাট দুই শুঁড়ের হাতির বাচ্চা নিয়েও সময় কাটাবেন । আমি কীভাবে শক্তি সংগ্রহ করছি তা তাঁর চোখ এড়িয়ে যাবে ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৩

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১১

অম্বার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে । সে ক্ষীণস্বরে বলল, আমি মরতে চাই না । এরা আমাকে মেরে ফেলবে ।

সম্রাট ঘোড়া থেকে নামলেন । অম্বার কাছে এগিয়ে গেলেন । গলা নিচু করে বললেন, আমি নিজের হাতে তোমাকে পানি খেতে দেব । তুমি বিসমিল্লাহ্ বলে সেই পানি খাবে । মনে থাকবে ?

অম্বা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। সে খানিকটা হকচকিয়ে গেছে । মেয়েটির আত্মীয়স্বজন এবং জড়ো হওয়া লোকজন এগিয়ে আসতে চাচ্ছে কিন্তু সম্রাটের রক্ষীবাহিনীর কারণে কাছে আসতে পারছে না । তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে । হুমায়ূন তাদের দিকে তাকিয়ে গলা উঁচু করে বললেন, অম্বা নামের এই মেয়েটা এইমাত্র আমার হাতে বিসমিল্লাহ্ বলে পানি খেয়েছে । বিধর্মীর হাতে পানি খাওয়ার কারণে তার জাত গেছে । বিসমিল্লাহ্ বলায় মেয়েটি মুসলমান হয়ে গেছে । আমার আইনে কোনো মুসলমান মেয়েকে সতী হিসেবে দাহ করা যাবে না ।

সম্রাট হুমায়ূন অম্বাকে নিয়ে শিবিরের দিকে রওনা হলেন । মাতাল ডোমের দল লাঠিসোটা নিয়ে পিছন পিছন ছুটল । তাদের সঙ্গে পুরোহিতের দল । বাজনাদারদের দল । মহিলাদের দল । ‘সতী’ কন্যাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে-এ হতে দেওয়া যায় না ।

সম্রাটের নির্দেশে তীরন্দাজরা তীর ছুঁড়ল । অব্যর্থ তীরের আঘাতে চারজন পুরোহিতের তিনজনই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল । হতভম্ব দল উল্টাদিকে দৌড়াতে শুরু করল ।

মাগরেবের নামাজের শেষে সম্রাট দরবার বসিয়েছেন । চুনার দুর্গ দখলে এসেছে । দুর্গের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে সেই বিষয়ে পরামর্শসভা বসেছে । বাংলামুলুক অভিযানে কখন রওনা হতে হবে-সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে । আজকের সভা গুরুত্বপূর্ণ। আমীররা সবাই উপস্থিত ।রুমী খাঁ (মীর আতশ) উপস্থিত ।দরবারে খাসের নিয়ম ভঙ্গ করে চারজন নর্তকী উপস্থিত ।এদেরকে আনা হয়েছে চুনার দুর্গ থেকে । গুরুত্বপূর্ণ সভায় নর্তকীরা কখনোই উপস্থিত থাকে না । আজ তারা কেন উপস্তিত বোঝা যাচ্ছে না। নর্তকীরা ভীতসন্তস্ত্র । তারা মাথা নিচু করে আছে । কিছুক্ষণ পরপর একে অন্যের ‍দিকে তাকাচ্ছে । একজন গোপনে অশ্রুবর্ষণ করছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১১

সম্রাট চুনার দুর্গ দখলে আসার কারণে আল্লাহ্ পাকের দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন । সবাই বলল, আমীন ।

আমীর বেগ মীরেক-কে চুনার দুর্গের গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়া হলো । সবাই বলল, অতি উত্তম সিদ্ধান্ত ।

সম্রাট সবাইকে ভোজসভায় আহ্বান জানালেন । মীর আতশ বললেন, অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং গোপন মিটিংয়ে নর্তকীরা উপস্থিত । এর কারণ বুঝতে পারছি না ।

সম্রাট বললেন, এরা আমার কাছে একটা অভিযোগ করেছে । অভিযোগ গুরুতর । আমার ধারণা অভিযোগ মিথ্যা । যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয় তাহলে হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট করে এদের হত্যা করা হবে ।

বৈরাম থাঁ বললেন, অভিযোগ কী ?

হুমায়ূন বললেন, অভিযোগ হচ্ছে রুমী খাঁ দুর্গে প্রবেশের পরপর সাড়ে তিন শ’ মানুষের দুই হাত কেটে ফেলার নির্দেশ ‍দিয়েছেন । সেই নির্দেশ সঙ্গে সঙ্গে পালন করা হয়েছে । রুমী খাঁ, এই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী ?

রুমী খাঁ বললেন, ঘটনা সত্য । আমি যা করেছি মহান সম্রাটের নিরাপত্তার জন্যে করেছি । যে সাড়ে তিন শ’ মানুষের দুই হাত কেটে ফেলা হয়েছে, এরা সবাই দুর্ধর্ষ কামানচি । এরা যেন আর কখনো সম্রাটের বাহিনীর উপর কামান চালাতে না পারে সেই ব্যবস্থাই করা হয়েছে । শক্রকে সমূলে বিনাশ করতে হয় ।

হুমায়ূন বললেন, আপনাকে সাহসী মানুষ ভেবেছি । আপনি নিতান্তই কাপুরুষের মতো একটি কাজ করেছেন । আমি কাপুরুষ অপছন্দ করি ।

যুদ্ধক্ষেত্রে কাপুরুষতা একটি সৎ গুণ । অনেক সময় কাপুরুষতা যুদ্ধজয়ে ভূমিকা রাখে।

সম্রাট বললেন, দুর্গের মানুষজন দুর্গ সমর্পণ করেছেন । কাজেই দুর্গ যুদ্ধক্ষেত্রে ছিল না । আপনি যে ভয়াবহ অন্যায় করেছেন, তার শাস্তি আপনারও দুই হাত কেটে নেওয়া ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১১

উপস্থিত আমীরদের একজন বললেন, সম্রাটকে আমি তাঁর আদেশ পুনর্বিবেচনা করার  জন্যে অনুরোধ করছি । সম্রাটের কামানবহর পরিচালনার দায়িত্ব রুমী খাঁর উপর । শের খানের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধযাত্রা করব । যুদ্ধের জয় পরাজয় নির্ভর করবে কামানের উপর । অর্থাৎ রুমী খাঁর নৈপুণ্যের উপর । যার রণকৌশলে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট তাকে মীর আতশ সম্মানে সম্মানিত করেছেন ।

হুমায়ূন বললেন, যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ভর করে মহান আল্লাহ্ পাকের ইচ্ছায় । কাপুরুষ রুমী খাঁর নৈপুণ্যে না । আগামীকাল ফজরের নামাজের পর মীর আতশের দুই হাত কনুই থেকে কেটে ফেলার নির্দেশ দিচ্ছি ।

সম্র্রাট দরবার ছেড়ে উঠে পড়লেন  । মাগরেবের নামাজের সময় হয়েছে । তিনি অজু করার জন্যে উঠে পড়লেন । রুমী খাঁকে গ্রেফতার করে তার তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হলো । রুমী খাঁ সেই রাতেই বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করলেন ।

অম্বার জায়গা হয়েছে হুমায়ূনের মেয়ে আকিকা বেগমের তাঁবুতে । অম্বা অতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে গেছে । একদিন আগের ঘটনার স্মৃতি কিছুই তার মনে নেই । অম্বা আকিকা বেগমের তাঁবুর জাঁকজমক দেখে হতভম্ব । চারজন খোজা প্রহরী সারাক্ষণ তাঁর পাহারা দিচ্ছে । আকিকা বেগমের সেবায় নিযুক্ত আছে আটজন দাসী । দু’জন দাসীর হাতে ময়ূরের পালক বানানো বিশাল পাখা । তারা সারাক্ষণই হাওয়া করছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১১

আকিকা বেগম অম্বাকে খুবই পছন্দ করেছে । সে তার সঙ্গে পদ্মা ফুল পাতিয়েছে । আকিকা বেগম তার গলার নীলকান্তমণির মালা অম্বার গলায় পরিয়ে দিয়েছে । এখন চলছে ধাঁধার আসর । ধাঁধার উত্তর যে দিতে পারবে না, তাকে সঙ্গে সঙ্গে নাকে মাটি ঘষতে হবে । দু’জনের হাতেই মাটির দলা ।

আকিকা বলল, দিনে রাজপ্রাসাদে থাকে রাতে থাকে জঙ্গলে, ফজরের ওয়াক্তে থাকে মাটির নিচে । এটা কী ?

অম্বা বলল, জানি না ।

আকিকা বলল, মাটি ঘষো ।

অম্বা নাকে মাটি ঘষল ।

আকিকা বলল, এখন তোমার পালা ।

অম্বা বলল, তার এক শ’ চোখ । কিন্তু সে চোখে দেখে না ।

আকিকা এক শ’ চোখ কিন্তু চোখে দেখে না । আমি জানি না এটা কী ।

এর নাম আনারস ।

আনারস আবার কী ?

এক ধরনের ফল বাঙ্গালমুলুকে পাওয়া যায় ।

আকিকা বেগম আনারস ফল বাঙ্গালমুলুক থেকে আনার হুকুম দিল । ফল দেখার পর সে নাকে মাটি ঘষবে । আকিকা বেগমের নির্দেশে দু’জন অশ্বারোহী আনারসের সন্ধানে গেল । অম্বা হতভম্ব । বাচ্চা একটি মেয়ের এত ক্ষমতা!

শের খাঁ গোপন বৈঠকে বসেছেন । চুনার দুর্গ হাতছাড়া হওয়ায় তাঁকে মোটেই বিচলিত বলে মনে হচ্ছে না । শের খাঁ’র দুই পুত্র এবং তিনজন সেনাপতি বৈঠকে উপস্থিত । শের খাঁ বললেন, আমি নিশ্চিত সম্রাট হুমায়ূনকে আমরা পরাজিত করব । আমার পরিকল্পনা নির্ভুল । চুনার দুর্গ দখলের জন্যে হুমায়ূন ছয় মাস অপেক্ষা করেছেন । এই ছয় মাস আমি শক্তি সঞ্চয় করেছি । সম্রাটের প্রধান স্তম্ভ রুমী খাঁ গত । এটা আমাদের জন্যে পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১১

উপস্থিত সবাই বলল, মারহাবা।

শের খাঁ বললেন, এখানে উপস্থিত সবার প্রতি আমার একটি কঠিন নির্দেশ আছে ।

সম্রাট হুমায়ূনকে কোনো অবস্থাতেই হত্যা করা যাবে না ।

শের খাঁর পুত্র জলাল খাঁ বললেন, কেন না ?

শের খাঁ বললেন, হুমায়ূন আমার পরম শত্রু এটা সত্যি, কিন্তু তিনি এমন শত্রু যাঁকে আমি শ্রদ্ধা এবং সম্মান করি ।

তিনি মহান মানুষদের একজন ।

এই মানুষটির অন্তর স্বর্ণখণ্ডের মতো উজ্জ্বল ।

সেখানে কলুষতার কণামাত্রও নাই ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১২

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১০

হতভম্ব সম্রাট রুমী খাঁ-কে দুর্গ দখলের নির্দেশ দিলেন । রুমী খাঁ কামান দাগতে শুরু করলেন । এর উত্তরে কুতুব খাঁ’র দুর্গের ভেতর থেকে কামানের গোলা বৃষ্টির মতো পড়তে শুরু করল । কুতুব খাঁ’র কামানগুলি ছোট তবে তাদের নিশানা অব্যর্থ্ । রুমী খাঁ-কে পেছনে হটতে হলো ।

মোঘল সৈন্যরা দুর্গ অবরোধ করে পাঁচ মাস বসে রইল । দুর্গ দখল করতে পারল না । এর মধ্যে শুরু হলো বঙ্গের বিখ্যাত বৃষ্টি ।

সম্রাট হুমায়ূন দোতলা তাঁবুর (ডুরসানা মঞ্জেল) বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন । তাঁর দৃষ্টি পশ্চিমের দিগন্তরেখায়। ফজরের নামাজ শেষ হয়েছে । সূর্য এখনো পুরোপুরি ওঠে নি । পশ্চিম আকাশে মেঘের ঘনঘটা । সম্রাট প্রথম সূর্যকিরণ কপালে মাখতে চাচ্ছেন । এই মুহূর্তে হুমায়ূনের সৌভাগ্যের ঘাটতি যাচ্ছে । ছয় মাস পার হয়েছে, চুনার দুর্গ দখল হয় নি । গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান মীর আতশ পুরোপুরি ব্যর্থ । সে নৌকায় কামান বসিয়ে কামান দাগার হাস্যকর চেষ্টা করেছিল । কামান দাগামাত্র গোলার প্রবল বিপরীত ধাক্কায় দু’টি বড় নৌকা কামান এবং বারুদসহ পানিতে ডুবে গেছে । কামানের সঙ্গে তিনজন কামানচিও পানিতে । তারা সাঁতার না জানার কারণে পানির নিচ থেকে উঠে আসতে পারে নি ।

পশ্চিম আকাশের মেঘ পরিষ্কার হচ্ছে না, বরং গাঢ় হচ্ছে । ঘন কালো মেঘের যে বিচিত্র সৌন্দর্য আছে তা হুমায়ূন আগে লক্ষ করেন নি । আকাশের এই ছবি এঁকে ফেলতে পারলে ভালো হতো ।তাঁর ছবি আঁকার হাত এখনো সেই পর্যায়ে আসে নি । আফসোস!

আলামপনা !

হুমায়ূন পেছনে তাকালেন ।জওহর আবতাবচি* সম্রাটের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে । তার মুখ হাসি হাসি ।

*আবতার শব্দের অর্থ পানি । আবতাবচি-যে পানি সরবরাহ করে । সম্রাটকে পানি খাওয়ানোর দায়িত্ব জওহর আবতাবচি’র ।

জওহর!সুপ্রভাত ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১০

জওহর লজ্জায় মাথা নিচু করল । সে কিছু বলার আগেই সম্রাট তাকে সুপ্রভাত জানালেন। কী লজ্জা! কী লজ্জা!

জওহর আমতা আমতা করে বলল, সুপ্রভাত মহান সম্রাট । আমি আপনার জন্যে সুসংবাদ নিয়ে এসেছি । কিছুক্ষণ আগে রুমী খাঁ দলবল নিয়ে চুনার দুর্গে প্রবেশ করেছে । শের খাঁ’র ছেলে দুর্গ ছেড়ে পালিয়ে গেছে ।

শুকুর আলহামদুলিল্লাহ । আমার হৃদয় এই মুহূর্তে আনন্দে পূর্ণ ।

আমার কাছে তুমি কী উপহার প্রার্থনা কর ?

আপনার স্নেহ । আল্লাহপাক সাক্ষী, আপনার স্নেহ এবং করুণা ছাড়া আমার আর কিছুই চাইবার নেই ।আমি আমৃত্যু আপনাকে পানি খাইয়ে যেতে চাই ।

তা-ই হবে ।আমি দু’টি রাজকীয় ফরমান জারি করব । কলমচিকে আসতে বলো ।

রাজকীয় ফরমানের প্রথমটিতে লেখা হলো, জওহর আবতাবচি আজীবন সম্রাটকে পানি খাওয়ানোর দায়িত্ব থাকবে । তাকে এক হাজারি মসনদদারি দেওয়া হলো ।

দ্বিতীয় ফরমানে রুমী খাঁকে ‘মীর আতশ’ উপাধি দেওয়া হলো । তাকে চুনার দুর্গের আপাতত দায়িত্ব দেওয়া হলো । দুর্গের বন্দিদের যেন প্রাণহানি না হয় । সম্রাট দুর্গের প্রতিটি বন্দির প্রাণের জিম্মাদার ।

ফরমানজারির পর হুমায়ূন এক পেয়ালা বেদানার রস খেলেন । অজু করে আল্লাহপাকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে সূরা ফাতেহা পাঠ করলেন । জওহর সারাক্ষণই সম্রাটের পাশে বসে রইল ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১০

জওহর ।

জি আলামপনা ।

আমি ছদ্মবেশে কিছুক্ষণের জন্যে শহর ঘুরতে বের হব । হযরত ওমর রাজিআল্লাহুতালা আনহু এই কাজ করতেন ।

উনি রাতে বের হতেন । দিনে না । রাতের আলোয় কিছুই দেখা যাবে না । আমি দিনের আলোয় বের হব। তুমি আমাকে ঘোড়া ব্যবসায়ীর মতো সাজিয়ে দাও । চাদরে আমার ঠোঁট থাকবে ঢাকা । মানুষের পরিচয় লেখা থাকে ঠোঁটে । ঠোঁট ঢাকা মানুষ হলো পরিচয়হীন মানুষ ।

পাশাপাশি দু’টি ঘোড়া চলছে । একটিতে সম্রাট হুমায়ূন অন্যটিতে জওহর আবতাবচি । অনেক দূর থেকে তাদেরকে অনুসরণ করছে সম্রাটের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী বাহিনী । তেমন প্রয়োজনে নিমিষের মধ্যে ছুটে এসে তারা সম্রাটকে ঘুরে বেড়ালেও সম্রাটের নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা নেই ।

শহর শান্ত । দোকানপাট খুলেছে । ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে । চুনার দুর্গ পতনের কোনো প্রভাব শহরে পড়ে নি । শহরের কেন্দ্রে হরিসংকীর্তন শুনলেন ।

একজন নাগা সন্ন্যাসীকে দেখা গেল । গায়ে ভস্ম দেখে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় ঘুরছে । তাকে ঘিরে একদল ছেলেমেয়ে । নাগা সন্ন্যাসী তার সাধনদণ্ডে কাঁসার একটি ঘণ্টা ঝুলিয়ে ‍দিয়েছে । যখন সে হাঁটছে ঘণ্টায় ঢং ঢং শব্দ হচ্ছে । সম্রাট নাগা সন্ন্যাসীর সঙ্গে জওহর আবতাবচির মাধ্যমে কিছুক্ষণ কথা বললেন । তিনি হিন্দুস্থানি ভাষা জানেন না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১০

আপনি নগ্ন ঘুরছেন কেন ?

আমি নাগা সন্ন্যাসী, সবকিছু বিসর্জন দিয়েছি বলেই নগ্ন ।

আপনি তো লজ্জাও বিসর্জন দিয়েছেন । লজ্জা বিসর্জনের জিনিস না ।

তোর কাছে না, আমার কাছে লজ্জাও বিসর্জনের ।

আপনি গোপন অঙ্গে ঘণ্টা বেঁধেছেন কেন ?

সবাইকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্যে ঘণ্টা ।

আপনি তো সবই বিসর্জন দিয়েছেন । গোপন অঙ্গও বিসর্জন ‍দিন ।

এর তো আপনার প্রয়োজন নেই ।

আমাকে নিয়ে তুই মাথা ঘামাচ্ছিস কী জন্যে ? তুই ঘোড়া বেচতে এসেছিস, ঘোড়া বিক্রি কর ।পুণ্য কামাতে চাইলে আমার সেবা কর ।সম্রাট তাকে দশটা তাম্রমুদ্রা দিয়ে শহরের বাইরে চলে গেলেন । নদীর পাড় ঘেঁসে ঘেঁসে যাচ্ছেন । তাঁর অদ্ভুত লাগছে । মধুর বাতাস । পশ্চিম আকাশের মেঘ এখন ভেলার মতো পুরো আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে । একটা তালগাছ বাঁকা হয়ে নদীর দিকে ঝুঁকে আছে । একদল শিশু তালগাছে উঠে সাবধানে মাথা পর্যন্ত যাচ্ছে, সেখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে নদীতে পড়ছে । তাদের কী আনন্দ! সম্রাট বললেন, দেখো জওহর । ওদের কী আনন্দ!

জওহর কিছু বলল না । হুমায়ূন বললেন, সম্রাটের পুত্র-কন্যারা এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত ।

জওহর বলল, তাঁদের জন্য অন্য আনন্দ । মহান আল্লাহ ঠিক করে রেখেছেন কে কী আনন্দ পাবে । সম্রাট বললেন, চলো এগুই। আরও কোনো আনন্দদৃশ্য হয়তো সামনেই আছে ।

সম্রাট এগুলেন । প্রায় দু’ক্রোশ এগুবার পর তিনি থমকে দাঁড়ালেন। সামনে নখখাগড়ায় ঢাকা শ্মশানঘাট । বৃষ্টির সময় আশ্রয় নেওয়ার জন্যে চারদিকে খোলা শ্মশানবন্ধু ঘর । ঘরভর্তি নানান বয়সী নারী । তারা কলকল করে কথা বলছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১০

চারদিকে লোকে লোকারণ্য । ঢোল বাজছে, কাঁসার ঘণ্টা বাজছে । কিছুক্ষণ পরপর সবাই মিলে গগনবিদারী চিৎকার দিচ্ছে-সতী মাই কি জয় ।

চারজন পুরোহিত আসন করে বসে আছে । মন্ত্রপাঠ চলছে । পুরোহিতদের দক্ষিণ দিকে নদীর কাছাকাছি ডোমরা বসেছে কলসিভর্তি চোলাই মদ নিয়ে । তাদের চোখ রক্তবর্ণ ।

সম্রাট বিস্মিত হয়ে বললেন, কী হচ্ছে?

সতীদাহ হবে আলামপনা। মৃত স্বামীর সঙ্গে তার জীবিত স্ত্রীকে চিতায় পোড়ানো হবে ।

এই সেই সতীদাহ! আমি সতীদাহের কথা শুনেছি, আগে কখনো দেখি নি ।

দেখার জিনিস না । হিন্দুস্থানি বর্বরতা । চলুন ফিরে যাই । যে মেয়েটিকে পুড়িয়ে মারা হবে তার সঙ্গে কি কথা বলা যাবে ? আলামপনা । সে কথা বলার মতো অবস্থায় এখন থাকবে না ।

সবাই তাকে ঘিরে আছে । তাকে নিশ্চয়ই আরক খাওয়ানো হয়েছে । সে এখন নেশাগ্রস্ত ।

কদল মানুষ দেখছি লাঠিসোটা নিয়ে দাঁড়িয়ে । এরা কারা ?

সবসময় দেখা গেছে আগুন লাগানোমাত্র সতী দৌড় দিয়ে চিতা থেকে পালাতে চায় । তখন লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তাকে চিতায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং আগুনের উপর মেয়েটিকে চেপে ধরে রাখা হয় ।

নরকের বর্বরতা ।

অবশ্যই ।

আমি এই মুহূর্তে ফরমান জারি করে সতীদাহ বন্ধ করতে চাই ।

আলামপনা । গুস্তাকি মাফ হয় । আপনার সমস্ত প্রজা হিন্দু । আপনি ওদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে তারা বৈরী হয়ে উঠবে । আপনার জন্যে শাসনকার্য পরিচালনা দুঙ্কর হবে ।

আমি মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে চাই।

ঘোড়ার ব্যবসায়ী হিসেবে তারা আপনার সঙ্গে মেয়েটিকে কথা বলতে দেবে না

তাদেরকে তুমি বলো আমি মোঘল সম্রাট হুমায়ূন এবং আমার রক্ষীবাহিনীকে কাছে এগিয়ে আসতে বলো।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১০

চিতায় ঘিয়ের আগুন জ্বলে উঠেছে । সেখানে প্রায় সত্তর বছর বয়সী এক চুলপাকা বৃদ্ধের শবদেহ । তার চুলে আগুন ধরতেই নিমিষে সব চুল জ্বলে গেল । আগুন ভালোমতো জ্বলে উঠলে সতী স্বেচ্ছায় হেঁটে হেঁটে চিতায় উঠবে । তাকে ভাং-এর শরবত খাওয়ানো হয়েছে । তার চিন্তাশক্তি কাজ করছে না ।ঢোলের বাদ্য আকাশ স্পর্শ করছে । শ্মশানঘরের তরুণীরা একে একে আসছে। সতী মেয়েটির কপালে সিঁদুর দিচ্ছে । সেই সিঁদুর নিজের কপালে ঘষছে এবং উপুড় হয়ে পড়ে মেয়ের পায়ে পড়ে তাকে প্রণাম করছে । বাজনাদাররা আধাপাগলের মতো নাচছে । হঠাৎ বাদ্যবাজনা থামল । সম্রাট হুমায়ূন এগিয়ে এলেন ।

তাঁর ঘোড়া এসে থামল সতীদাহের মেয়েটির সামনে । বারো-তের বছর বয়সী একটি মেয়ে । পরনে লালপেড়ে শাড়ি । গা- ভর্তি অলংকার । কী সুন্দর সরল মুখ, বড় বড় চোখ! ভয়ে আতঙ্কে সে থরথর করে কাঁপছে । মেয়েটির সঙ্গে কোথায় যেন সম্রাটের কন্যা আকিকা বেগমের মিল আছে ।

তোমার নাম কী ? বলো, নাম বলো ।

অম্বা ।

তোমার স্বামী মারা গেছে । সে চিতায় পুড়ে কয়লা হবে । তুমি তো বেঁচে আছ, তুমি কেন মরবে?

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১১

 

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৯

মীর হামজা বললেন, অশ্বারোহী বিশাল বাহিনী নিয়ে একান্তে কথা ? আমরা দুজন দূরে সরে যাব । একান্ত কথা সেখানেই হবে । আপনি আপনার বাহিনী নিয়ে এসেছেন কেন ? বৈরাম খাঁ হাসতে হাসতে বললেন, গাধার বেপারি সঙ্গে গাধা নিয়ে চলাফেরা করে। গাধাগুলি হচ্ছে তার শোভা । একজন সেনাপতির শোভা তার সৈন্যবাহিনী ।

আমি আপনার সঙ্গে একান্তে কথা বলব না । যা বলতে চান এখানে বলুন ।

আমার সম্রাটের সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে । সম্রাটকে আপনার কেমন মনে হয়েছে ?

তিনি ভীতুপ্রকৃতির মানুষ ।

ভীতু ?

হ্যাঁ ভীতু । ভীতু বলেই ভাইকে খুশি রাখার চেষ্টা করছেন ।

ভ্রাতৃস্নেহও তো হতে পারে ।

সম্রাটদের ভ্রাতৃস্নেহ থাকে না ।ভ্রাতৃভীতি থাকে ।

সম্রাট হুমায়ূন যুদ্ধযাত্রার পরপর কি কামরান মীর্জা নিজেকে দিল্লীর

সম্রাট ঘোষণা করবেন ?

সেটা উনিই ভালো বলতে পারবেন । আমি অন্তর্যামী না ।

আমি এই তথ্য বিশেষভাবে জানতে চাচ্ছি । সম্রাটের অমঙ্গল আশঙ্কায় আমি অস্থির ।

মীর হামজা বললেন, আপনাকে আগেই বলেছি আমি অন্তর্যামী না ।

কামরান মীর্জার পরিকল্পনা আমি জানি না ।

বৈরাম খাঁ বললেন, আমি কামরান মীর্জার পরিকল্পনা আঁচ করতে পারছি ।

আপনি এই খবর কামরান মীর্জাকে জানাবেন ।

অবশ্যই জানানো হবে ।

বৈরাম খাঁ বললে, আপনাকে মুখে কিছু জানাতে হবে না । আমি

এমন ব্যবস্থা করব যে আপনি লাহোরে উপস্থিত হওয়ামাত্র কামরান

মীর্জা যা বোঝার বুঝে নেবেন ।

কী ব্যবস্থা করবেন ?

আপনার জন্যে একটি গাধা সংগ্রহ করা হয়েছে । আপনি গাধার পিঠে চড়ে লাহোরে যাবেন । নগ্ন অবস্থায় যাবেন ।

আপনি উন্মাদের মতো কথা বলছেন ।

হতে পারে । আপনার সঙ্গের অশ্বারোহীর আমার সেনাবাহিনীতে যোগ দিবে । এরা ভাড়াটিয়া সৈন্য । দলত্যাগে তাদের কখনো সমস্যা হয় না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৯

সম্রাট হুমায়ূনের কানে এই খবর পৌঁছানোর পরিণাম হবে ভয়াবহ ।

তাঁর কানে এই খবর আমিই পৌঁছাব । তাঁকে বলব, মীর হামজা লাহোরের পথে রওনা হওয়ার পর একদল ডাকাতের হাতে পড়েন। ডাকাতরা তাঁর সব লুটে নিয়ে তাঁকে নগ্ন করে গাধার পিঠে তুলে দেয় ।সম্রাট এই খবরে আমোদ পাবেন, তিনি আমোদ পছন্দ করেন ।

মীর হামজাকে সত্যি সত্যি নগ্ন করে গাধার পিঠে চড়িয়ে দেওয়া হলো ।

ফজরের নামাজের পরপরই সম্রাট হুমায়ূনের বিশাল বাহিনী বঙ্গদেশের ‍দিকে যাত্রা শুরু করল । তারিখ : ২৭জুলাই ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দ।

সম্রাট আনন্দিত, কারণ তার দুই ভাই হিন্দাল মীর্জা এবং আসকারি মীর্জা তাঁর সঙ্গে আছেন ।

যাত্রার সময় আশ্চর্য এক ঘটনাও ঘটেছে । ‍দু’টি কবুতর সম্রাটের মাথার উপর চক্রাকারে ঘুরেছে । এটি অতি শুভ লক্ষণের একটি।

অগ্রগামী দলে আছে অশ্বারোহী বাহিনী । তার পেছনের পদাতিক বাহিনী । তার পেছনের পদাতিক বাহিনী । পদাতিক বাহিনী চলছে হস্তীযূথের সঙ্গে । হাতির সংখ্যা আট শ’ । সেনাদল কোথাও না থেমে আসর পর্যন্ত একনাগাড়ে চলবে । আসরের সময় বিশ্রাম এবং আহারের জন্যে থামা হবে । পরদিন আবারও ফজরের নামাজের পর যাত্রা শুরু হবে । যুদ্ধযাত্রার সময় সম্রাট একবেলা আহার করেন ।

প্রথম যাত্রাবিরতিতে সম্রাটকে যে খাবার দেওয়া হয়েছিল, তার

বর্ণনা দেওয়া যেতে পারে ।

পোলাও : পাঁচ ধরনের ।

রুটি : সাত প্রকারের ।

পাখির মাংস : কিসমিসের রসে ভেজানো পাখি ঘিতে ভেজে দেওয়া ।

পাখিদের মধ্যে আছে হরিয়াল, বনমোরগ , বিশেষ শ্রেণীর ময়ূর ।

ভেড়ার মাংস : আস্ত ভেড়ার রোস্ট ।

বাছুরের মাংস : কাবাব ।

পাহাড়ি ছাগের মাংস : আস্ত রোস্ট (সম্রাটের বিশেষ পছন্দের খাবার)।

ফল,শরবত, মিষ্টান্ন ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৯

সম্রাট হুমায়ূন এবং তাঁর পরিবারের জন্যে যুদ্ধকালীন বাবুর্চির সংখ্যা ছিল এক হাজার । প্রধান বাবুর্চি নকি খান নতুন নতুন খাবার উদ্ভাবন করতেন ।তাঁর উদ্ভাবিত একটি খাবার পুরনো ঢাকার কিছু রেস্তোরাঁয় এখনো পাওয়া যায় । খাবারের নাম গ্লাসি ।

গ্লাসির রেসিপি (মোঘল আমলের) দেওয়া হলো । পাতলা স্লাইস করে কাটা খাসির মাংস সজারুর কাঁটা (বিকল্প, খেজুরের কাঁটা) দিয়ে কেঁচতে হবে । কেঁচানো মাংসে দিতে হবে কিসমিচের রস, পোস্তাদানা বাটা , পেস্তা বাটা, শাহী জিরা বাটা, আদার রস, পেঁয়াজের রস, রসুনের রস, দই, দুধ এবং গম বাটা । পরিমাণমতো লবণ । এতে যুক্ত হবে জয়ত্রি গুঁড়া, জায়ফল গুঁড়া, দারুচিনি গুঁড়া । সব ভালোমতো মেখে মাটির হাঁড়িতে রেখে ঢাকনা লাগিয়ে দিতে হবে । মাটির হাড়ি সারা দিন রোদে থাকবে । খাবার পরিবেশনের আগে আগে অল্প আঁচে মাংসের টুকরা মহিষের দুধের ঘিতে (ভৈসা ঘি) ভাজতে হবে ।

বঙ্গদেশের দিকে যাত্রার সময় তাঁর রসদখানায় মহিষের দুধের ঘি

ছিল দশ মণ এবং গরুর দুধের ঘি ছিল ত্রিশ মণ ।

সৈন্যদের খাবার ছিল : এক ঘটি দুধ, যবের রুটি, এক পোয়া ছাতু,

মাংস এবং পেঁয়াজ ।

 

যাত্রাবিরতির প্রথম রাত্রি ।

হুমায়ূন এশার নামাজ শেষ করে তাঁর জন্যে খাটানো চৌরনরৌতি তাঁবুতে গেছেন ।গানবাজনা শুনে আফিং খেয়ে ঘুমাবেন ।

তাঁর নিজস্ব ভৃত্য জওহর আবতাবচি তাঁকে জানাল শের খাঁ তাঁর জন্যে কিছু উপহার পাঠিয়েছেন । উপহারের মধ্যে আছে তিনজন অতি রুপবতী বাঙ্গালমুলুকের তরুণী এবং সাতজন হিজড়া । উপহারের সঙ্গে একটি পত্রও আছে ।

সম্রাট পত্র পাঠ করলেন । শের খাঁ লিখেছেন-

দিল্লীশ্বর সম্রাট হুমায়ূন,

আপনি অধম তুচ্ছাতিতুচ্ছ শের খাঁকে শায়েস্তা

করতে যাচ্ছেন । আমি আপনার দাসানুদাস । আমার

কারণে এই তীব্র গরমে আপনার কষ্ট হচ্ছে, এটা

আমি নিতেই পারছি না ।

আপনি দিল্লীতে ফিরে যান ।

আপনাকে চুনার দুর্গ আমি দিয়ে দিচ্ছি ।

কিছু উপহার পাঠালাম । আমি জানি উপহার

আপনার পছন্দ হবে ।

ইতি

অধম শের খাঁ (ফরিদ)

বাদশাহ নামদার পর্ব –৯

চিঠিতে কাজ হলো । সম্রাট নির্দেশ দিলেন, একদিন বিশ্রামের পর মূল সেনাবাহিনী দিল্লী ফেরত যাবে ।ডেকে পাঠানো হবে শের খাঁকে । চুনার দুর্গের দখল নেওয়ার জন্যে রুমী খাঁকে পাঠানো হবে । রুমী খাঁর নেতৃত্বে থাকবে বেশ কিছু কামান এবং দুই শ’ কামানচি । কামানের প্রয়োজন হবে না ।তারপরেও থাকল ।

ফজরের নামাজের পর দিল্লী যাত্রা শুরু হবে । নামাজের পরপর হুমায়ূন ঘোষণা করলেন চুনার দুর্গ হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় তিনি উপস্থিত থাকতে চান । কাজেই যুদ্ধযাত্রা অব্যাহত থাকবে । সম্রাটের খামখেয়ালির সঙ্গে তাঁর সেনাপতি এবং আমীররা পরিচিত । কেউ অবাক হলেন না ।

চুনার দুর্গের অধিনায়ক শের খাঁ’র পুত্র কুতুব খাঁ ।

চুনার দুর্গে পৌঁছতে হুমায়ূনের চার মাস সময় লাগল । তিনি নভেম্বরে পৌঁছলেন । আরামদায়ক আবহাওয়ায় হুমায়ূন প্রসন্ন । ভেষজবিদ্যার উপর কিছু দুর্লভ বই তাঁর কাছে এসেছে । বইয়ে বর্ণিত গাছের গুণাগুণ পরীক্ষার বাসনায় তিনি অস্থির । দুর্গ দখলের পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্ব শুরু করবেন ।

দুর্গের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার জন্য কুতুব খাঁর কাছে দূত গেল । কুতুব খাঁ বললেন, সম্রাট স্বয়ং উপস্থিত হলেই দুর্গ তার হাতে তুলে দেওয়া হবে ।

সম্রাটের দূত বললেন, সামান্য  দুর্গ দখলের জন্যে হিন্দুস্থানের অধিপতির আসা শোভা পায় না ।

কুতুব খাঁ বললেন, হিন্দুস্থানের অধিপতিকে অনেক তুচ্ছ কাজ কিন্তু করতে হয় । শব্দ করে তিনি বায়ু ত্যাগ করেন । আপনি হয়তো শোনেন নি ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৯

আপনার ঔদ্ধত্যমূলক আচরণের সমুচিত জবাব দেওয়া হবে ।

শুনে খুশি হলাম । আফগানরা সমুচিত জবাব ভালোবাসে ।

আপনি যে নোংরা কথাগুলি বলেছেন আমি নিজে সম্রাটকে তা জানাব ।

সেই সুযোগ আপনি পাবেন না ।

এই কথার অর্থ কী ?

আপনাকে বাধ্য করা হবে সম্রাটকে একটা পত্র পাঠাতে । সেই পত্রে আপনি বিনয়ের সঙ্গে লিখবেন যে, আপনি স্বেচ্ছায় দলত্যাগ করে আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন ।

জীবন থাকতে এ ধরনের চিঠি আমি লিখব না ।

জীবন থাকা অবস্থাতেই আপনি লিখবেন ।আমার নির্দেশে আপনাকে খোজা করানো হবে । খোজা করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ামাত্রই আপনি চিঠি লিখতে রাজি হবেন ।

সম্রাট হুমায়ূন তাঁর দূতের কাছ থেকে একটা চিঠি পেলেন । চিঠিতে জানলেন এই আমীর দলত্যাগ করেছে । তাঁর শক্তি ও সামর্থ্য সে ব্যয় করবে আফগানদের জন্যে ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১০

 

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৮

সভায় নিয়ম অনুযায়ী সবাই একসঙ্গে বলল, মারহাবা!মারহাবা!

সম্রাট বললেন, আগ্রার বুলবুল আসহারি, তোমার কি আর কিছু বলার আছে ?

আসহারি বলল, আছে সম্রাটের অভয় পেলেই বলতে পারি ।

বলো ।

আমি হেরেমবাসী । এতগুলি স্বর্ণমুদ্রা লুকিয়ে রাখা হেরেমে সম্ভব না । আমি আমার এই সম্পদ রাজকোষে জমা দিতে চাই । সম্রাট অনেক জনহিতকর কাজে রাজকোষের সম্পদ ব্যবহার করেন । আমার সামান্য অর্থ সেই কাজে ব্যবহৃত হলেই আমি খুশি হব ।

সম্রাট বললেন, তা-ই করা হবে । আমি আগ্রার বুলবুলের কথায় সন্তোষ লাভ করেছি ।

দরবারে আম শেষ হওয়ায় পর সম্রাট একটা ফরমান জারি করলেন । সেই ফরমানে বলা হলো-এখন থেকে সম্রাট যেখানে যাবেন, প্রমোদভ্রমণ হোক বা যুদ্ধযাত্রা , আগ্রার বুলবুল তাঁর সঙ্গে থাকবে । সে তার বাদ্যযন্ত্রীদের নিয়ে আলাদা রাজকীয় তাঁবুতে থাকবে । তার সেবায় দশজন খোজা প্রহরী থাকবে । ‘মিরনসুর’ পরগানা খেলাত হিসেবে আগ্রার বুলবুলকে দেওয়া হলো । এই পরগনার আয় আগ্রার বুলবুল আসহারি পাবে।

দুই মাসব্যাপী উৎসব শুরু হয়েছে ।প্রচণ্ড দাবাদাহ হঠাৎ শীতল হয়ে গেল।আগ্রার উপর ভারী বর্ষণ, এই সঙ্গে শিলাবৃষ্টি । দুই সের ওজনের একটি শিলা এক প্রজা নিয়ে এল বাদশাহকে দেখাতে । সম্রাট খুশি হয়ে তাকে একটা আশরাফি দিলেন । এতবড় শিলা তিনি আগে কখনো দেখেন নি । তিনি তাঁর দিনলিপিতে লিখলেন,আল্লাহপাকের রহমত এবং নিদর্শন চারদিকে ছড়ানো ।আমরা অন্ধ বলেই তা দেখি না । প্রকাণ্ড এক শিলার মাধ্যমে পরম করুণাময় তাঁর নিদর্শন তাঁর দীন সেবককে দেখালেন । সোবাহানাল্লাহ্।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৮

শিলাখণ্ড গলিয়ে তার পানি সম্রাট পান করলেন । পানিতে বারুদের গন্ধ তাঁকে বিস্মিত করল । এটা কি কোনো যুদ্ধের আলামত? তাঁকে কি যুদ্ধযাত্রা করতে বলা হচ্ছে ?

শাহি ফরমান জারি হয়েছে । সম্রাট হুমায়ূন শের খাঁ’র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবেন । শের খাঁকে বন্দি অবস্থায় দিল্লী আনা হবে । সেই উপলক্ষে মাসব্যাপী উৎসব । উৎসবের নাম ঠিক হয়েছে ‘শের খাতেমুন’, যার অর্থ- শেরের শেষ ।

শের খাঁকে বন্দি করতে কতদিন লাগবে এটা বোঝা যাচ্ছে না । সে সরাসরি সম্মুখ সমরে আসে না । চোরাগোপ্তা হামলা করে । তার যুদ্ধ কাপুরুষের যুদ্ধ । মোঘল বাহিনী কাপুরুষ যুদ্ধে অভ্যস্ত না বলেই সমস্যা । সম্রাট বাংলা মুলুক কখনো দেখেন নি । শের খাঁকে পরাস্ত করে তিনি বাংলা মুলুকে কিছুদিন বাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । বাংলা মুলুকের বর্ষার অনেক গল্প শুনেছেন । সেই বর্ষা দেখবেন । বর্ষায় সেখানকার সব নদী নাকি সমুদ্রের মতো হয়ে যায় । এক কূল থেকে আরেক কূল দেখা যায় না । তাঁর নদী দেখার শখ আছে । বাংলা মুলুকের হিজড়ারা নাকি নৃত্যগীতে বিশেষ পারদর্শী । তাদের নৃত্যগীত সাধারণ নৃত্যগীতের চেয়ে আলাদা । কতটা আলাদা সেটাও সম্রাটের দেখার ইচ্ছা ।*

মোঘল সম্রাটদের যুদ্ধযাত্রা বিশাল ব্যাপার । চারদিকে সাজ সাজ রব পড়ে গেল । যুদ্ধযাত্রার খরচ হিসেবে আমীররা সঞ্চিত ধনরত্ন জমা দিতে শুরু করলেন । শুধু ধনরত্ন না, তাদেরকে ঘোড়াও দিতে হলো । যে এক হাজারি আমীর সে দেবে এক হাজার ঘোড়া । পাঁচ হাজারি

বাদশাহ নামদার পর্ব –৮

*সম্রাটের ভাই আসকারি মীর্জা বঙ্গ বিজয়ের পর সম্রাটের কাছে উপহার হিসেবে কয়েকজন হিজড়া চেয়েছিলেন ।

 

আমীর দেবে পাঁচ হাজার ঘোড়া । করদ রাজ্যের রাজাদের বাধ্যতামূলকভাবে সৈন্য এবং স্বর্ণমুদ্রা পাঠাতে হলো ।

যুদ্ধযাত্রার জন্যে একটা বরগা তাঁবু রওনা হয়ে গেছে । বরগা তাঁবুতে একসঙ্গে দশ হাজার মানুষ দাঁড়াতে পারে । এই তাঁবু খাটাতে এক হাজার তাঁবুর কারিগরকে সাত দিন খাটতে হয় ।

সম্রাটের জন্যে যাচ্ছে ডুরসানা-মঞ্জেল তাঁবু । এটি দোতলা ।উপরের তলায় সম্রাট নামাজ পড়বেন । নিচতলায় বেগমরা থাকবেন । সম্রাট রাতে ঘুমাবেন চৌবিলরৌতি তাঁবুতে । এই তাঁবুর চালের নিচে খসখসের সিলিং দেওয়া । নিচেও থাকে খসখস । খসখসের উপর কিংখাব ও মলমল । তাঁবু খাটাবার দড়ি রেশমের ।

সম্রাট হুমায়ূন আনন্দের সঙ্গে যুদ্ধপ্রস্ততি লক্ষ করতে লাগলেন । তাঁর আনন্দ কিছু বাধাগ্রস্ত হলো বৈরাম খাঁ’র কারণে । বৈরাম খাঁ বললেন, দিল্লী ত্যাগ করা মোটেই ঠিক হবে না । সম্রাট বললেন, সমস্যা কী ?

বৈরাম খাঁ বললেন, সমস্যা আপনার তিন ভাই । আপনার অনুপস্থিতিতে তারা দিল্লীর সিংহাসন দখলের চেষ্ঠা চালাবে ।

হুমায়ূন বললেন, আমি আমার ভাইদের নিজের প্রাণের মতোই ভালোবাসি । তারা তিনজনই আমার সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করবে ।

তারা আপনার সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করবে না ।

তুমি আমার সঙ্গে বাজি রাখতে চাও ?

সম্রাটের সঙ্গে বাজি রাখার স্পর্ধা এই নফরের নেই ।

আমার এই তিন ভাইয়ের কারণেই কি তুমি যুদ্ধযাত্রা করতে চাচ্ছ

না, নাকি আরও কারণ আছে ?

বাংলা মুলুকে বর্ষা এসে যাবে । মোঘল সেনাবাহিনী বর্ষার সঙ্গে পরিচিত না ।

এখন পরিচয় হবে । আমিও পরিচিত হব । কলমচিকে খবর দাও, আমি তিনভাইকে পত্র লিখব । এখনই লিখব ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৮

সম্রাট পত্র লিখলেন । তিনজনকে আলাদা আলাদা চিঠি । মীর্জা কামরানকে লেখা চিঠির নমুনা-

আমার প্রাণপ্রিয় ভ্রাতা কামরান মীর্জা ।

আমার হৃদয়ের পাখি। বাগিচার সৌরভময় গোলাপ ।

প্রিয় ভ্রাতা,

বাংলা মুলুকের শের খাঁ নামের দুষ্টকে শায়েস্তা

করতে বিশাল মোঘল বাহিনী অতি শীঘ্র যাত্রা শুরু

করবে ।তুমি তোমার সৈন্যবাহিনী নিয়ে লাহোর

থেকে চলে এসো । বড়ভাইয়ের দক্ষিণ বাহু হও ।

আমার তিন ভাই পাশে থাকলে আমি বিশ্ব জয়

করতে পারি । যেমন করেছিলেন জুলকারলাইন ।*

আমার বহরের সঙ্গে তোমার অতি আদরের

ভগ্নি গুলবদন থাকবে । সে তোমার সাক্ষাতের জন্যে

আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছে । প্রিয় ভ্রাতা, তোমার

প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন হিসাবে আমি একটি নীলা

এবং একটি পোখরাজ পাঠালাম । তুমি রত্ন দু’টিকে

প্রতিদিন দুগ্ধস্নান করাবে । এর অন্যথা হলে রত্নের

ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হবে । এখন তাৎক্ষণিকভাবে তোমার

উদ্দেশে রচিত পঞ্চপদী-

কামরান

চন্দ্র প্রস্ফুটিত তার দু’নয়ন ।

*আলেকজান্ডার দি গ্রেট

হৃদয় আর্দ্র আবেগে

যার কেন্দ্রে তার ভাই

মীর্জা হুমায়ূন ।

কামরান মীর্জা পত্রের জবাব দিলেন না । তাঁর দরবারের এক আমীরকে সম্রাটের কাছে পাঠালেন । আমীর সম্রাট হুমায়ূনকে জানালেন, পাঁচটি কারণে কামরান মীর্জা তাঁর সঙ্গে যেতে পারছেন না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৮

১. তিনি অসুস্থ । পেটের পীড়ায় ভুগছেন ।

২. তাঁর প্রধান গণক গণনা করে পেয়েছে, যুদ্ধযাত্রায় তাঁর প্রাণনাশের সম্ভাবনা ।

৩. লাহোর অরক্ষিত রেখে রওনা হওয়ার অর্থ শত্রুর হাতে লাহোর তুলে দেওয়া ।

৪. স্বপ্নে তিনি তাঁর পিতা সম্রাট বাবরকে দেখেছেন । সম্রাট বাবর তাঁকে লাহোর ছেড়ে যেতে নিষেধ

করেছেন।

৫. তাঁর প্রিয় ঘোড়া লালী মারা গিয়েছে । তিনি ভালো ঘোড়ার সন্ধানে আছেন । শিক্ষিত এবং

ঘোড়া ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হওয়া যায় না ।

সম্রাট হুমায়ূন আমীরকে বললেন, আমার ভাই কামরান মীর্জা আমার সঙ্গে না যাওয়ার পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছে । একটি কারণই যথেষ্ট ছিল । পাঁচটি কারণের একটিতে সে আমার মহান পিতাকে টেনে এনেছে । তার প্রয়োজন ছিল না । আপনি আমার ভাইকে বলবেন, যা ঘটবে আল্লাহপাকের হুকুমেই ঘটবে । আমি কামরান মীর্জার জন্যে একটি শিক্ষিত আরবি ঘোড়া আপনার সঙ্গে দিয়ে দিচ্ছি । পেটের পীড়া একটি নোংরা ব্যাধি । আমি দ্রুত তার আরোগ্য কামনা করছি ।

সম্রাটের নির্দেশে আমীরকে একপ্রস্থ পোশাক, একটি রত্নখচিত তরবারি, দশটা আশরাফি দেওয়া হলো । ভাইয়ের পাঠানো দূতের প্রতি সম্মান দেখানো হলো । এই আমীরের নাম মীর হামজা ।

মীর হামজা লাহোরে ফিরছেন । তাঁর সঙ্গে বিশজন অশ্বারোহীর একটি ক্ষুদ্র দল । রসদ বহনকারী একটা ঘোড়ার গাড়ি । এই গাড়ির সঙ্গেই কামরান মীর্জাকে দেওয়া সম্রাট হুমায়ূনের আরবি ঘোড়া বাঁধা । ঘোড়ার রঙ সাদা । তার নাম ফাতিন । ফাতিন শব্দের অর্থ সুন্দর ।

বিশ ক্রোশ অতিক্রম করার পর মীর হামজাকে থামতে হলো । অশ্বারোহী বিশাল বাহিনী নিয়ে বৈরাম খাঁ দাঁড়িয়ে আছেন । বৈরাম খাঁ বললেন, সম্মানিত আমীর মীর হামজা! আপনার সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৯

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৭

রোশন কাকু (আমীর) বললেন, আমি শের খাঁ’র পত্রে সন্তোষ বোধ করছি ।

বৈরাম খাঁ বললেন, দুষ্টলোকের ছলনায় ভোলার কোনো কারণ দেখি না ।

কাকু বললেন, শের খাঁ তার নামে খুৎবা পাঠ করে না, এটা তো সত্য । তার নামে মুদ্রা বের হয় নি, এটাও সত্য ।

বৈরাম খাঁ বললেন, খুৎবা পাঠ করছে না । শক্তি সঞ্চয় করছে । চুনার দুর্গ যদি শের খাঁ’র ‍দিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা থাকে তাহলে সম্রাটের যে-কোনো প্রতিনিধির কাছে দুর্গ দেবে । স্বয়ং সম্রাটকে কেন উপস্থিত হতে হবে ।

উজির তর্দি বেগ খান বললেন, আপনি কি মনে করেন সম্রাটের যুদ্ধযাত্রা করা উচিত ?

বৈরাম খাঁ বললেন, অবশ্যই উচিত । এবং এখনই যুদ্ধযাত্রা করা প্রয়োজন ।

তর্দি বেগ বললেন, এখনই কেন ?

বৈরাম খাঁ বললেন, সম্রাটের অনুমতি পেলে আমি ব্যাখ্যা করব

কেন কালবিলম্ব না করে যুদ্ধযাত্রা করা উচিত ।

সম্রাট বললেন, অনুমতি দেওয়া হলো ।

বৈরাম খাঁ বললেন, শের খাঁ হলো ধূর্ত শেয়াল । সুন্দর একটি চিঠি

পাঠিয়ে সে সম্রাটকে শান্ত করেছে । সে কল্পনাও করছে না সম্রাট এরকম একটি চিঠি পাওয়ার পরও যুদ্ধযাত্রা করবেন । কাজেই সে নিশ্চিন্ত আছে । রাজকীয় বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার মতো প্রস্তুতি তার নেই । এই সুযোগে মোঘল সৈন্য অতর্কিতে শের খাঁ’র ঘাড়ের উপর পড়লে চিরদিনের মতো আফগান শক্তির পতন হব।

সম্রাট বললেন, আলোচনা বন্ধ । সবাইকে আমি হামামখানায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছি ।

উপস্থিত শের খাঁ’র পাঠানো ফল এবং বিষ্ণুমূর্তি গোসলখানায় আনার নির্দেশ দিলেন। বিষ্ণুমূর্তি দেখে সম্রাট বিস্মিত হলেন । এত সুন্দর কাজ! সম্রাট বললেন, যে কারিগর এই মূর্তি তৈরি করেছে তার উদ্দেশে মারহাবা ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৭

সবাই বললেন, মারহাবা!

প্রধান উজির বললেন, রাজকোষে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি থাকা বাঞ্ছনীয় না । মূর্তি গলিয়ে সোনা করে রাজকোষে জমা হোক ।

হুমায়ূন বললেন, না । এই মূর্তি যেমন আছে তেমন থাকবে । আমি আজ তার সঙ্গে স্নান করব ।

বিষ্ণুমূর্তি হাম্মামে নামিয়ে দেওয়া হলো । বঙ্গদেশের ফলগুলির মধ্যে একটি সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। অত্যন্ত রসালো ফল । মুখে ‍দিলেই জিভের রঙ বদলে কালো হয়ে যাচ্ছে । এই ফলের কী নাম কেউ বলতে পারল না । (ফলটি কালো জাম, কিংবা তুঁত।)

হুমায়ূন গোসলখানায় ঘোষণা দিলেন শের খাঁ’র বিষয়ে তাঁর কোনো উদ্বেগ নেই । তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার কিছু নেই । বাহাদুর শাহ পরাজিত হয়েছে । পর্তুগীজদের হাতে সে নিহত । সে অপুত্রক বিধায় তাকে এবং তার বংশধর নিয়ে আর চিন্তার কিছু নেই । সেই উপলক্ষে তেমন কোনো আনন্দ-অনুষ্ঠান হয় নি । দুই মাসব্যাপি আনন্দ উৎসবে হবে । এই দুই মাসে প্রতিদিন দশজন করে সাধারণ প্রজা আমার সঙ্গে রাজকীয় খানায় অংশগ্রহণ করবে ।

মাগরেবের নামাজের পর হুমায়ূনকে জানানো হলো, গাধার চামড়া পরিয়ে যে তিন অপরাধীকে সারা দিন ঘুরানো হয়েছে তাদের দু’জন মারা গেছে । একজন এখনো জীবিত। হুমায়ূনের নির্দেশে চামড়া থেকে মুক্ত করে তাকে সম্রাটের সামনে আনা হলো । তার দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই । তার সমস্ত শরীর ফুলে গেছে । চোখ নষ্ট হয়ে গেছে । সম্রাট বললেন, তোমার নাম কী য়

সে অতি কষ্টে বলল, সম্রাট, আমি একজন মৃত মানুষ । মৃত মানুষের নাম থাকে না ।

তুমি কী অপরাধ করেছিলে?

আপনার এক আমীর আমার অতি আদরের কন্যাকে তার হেরেমে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন । আমি সেই নির্দেশ পালন করি নাই । এটাই আমার অপরাধ । আমাকে মিথ্যা হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছিল । মহান কাজি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৭

আমার সেই আমীরের নাম কী ?

সে নাম বলতে পারল না । ততক্ষণে তার হেঁচকি উঠেছে, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে । সে ঠোঁট নাড়ছে কিন্তু মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না । কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মৃত্যু হলো।*

সম্রাট হুমায়ূন এর পরপর একটি রাজকীয় ফরমান জারি করলেন । যে-কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে সম্রাটের অনুমতি নিতে হবে ।

এ ছাড়াও তিনি যুদ্ধে ব্যবহার হয় এমন একটি দামামার ব্যবস্থা করলেন । কোনো প্রজা যদি মনে করে তার উপর বিরাট অবিচার করা হচ্ছে, তাহলে সে দামামায় বাড়ি দিয়ে সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে ।

এই কাজটা করতে হবে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে । এই সময় সম্রাটের শোবার ঘরের জানালা খুলে যায়। তিনি জানালায় মুখ বের করে প্রজাদের দর্শন দেন । এই দর্শনের নাম ‘ঝড়োয়া কি দর্শন’ । প্রজারা সম্রাটকে দেখে আশ্বস্ত হয় যে, সম্রাট বেঁচে আছেন । রাজত্ব ঠিকমতো চলছে ।

বাঁশিতে ভৈরবীর সুর বাজছে । সূর্য উঠছে । সম্রাট হুমায়ূন ‘ঝড়োয়া কি দর্শন’ দেবেন । প্রজার দল উপস্থিত ।

জানালা খুলে গেল । সম্রাটের প্রিয় নফর জওহর আবতাবচি রেশমি পর্দা সরাল । সম্রাটের হাসিহসি মুখে দেখা গেল । সম্রাটের হাতে একটি ফুটন্ত গোলাপ । তিনি গোলাপের ঘ্রাণ নিয়ে জানালার নিচে সমবেত প্রজাদের দিকে ছুঁড়ে দিলেন । সম্রাটের ফুল হাতে পাওয়ার জন্য প্রজারা হুমড়ি খেয়ে পড়ল । আর ঠিক তখনই দামামার শব্দ হলো । সম্রাট ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকালেন ।

*আমীরের নাম তর্দি বেগ খান । সম্রাট আকবরের সময় বৈরাম খাঁ তাঁকে হত্যা করেন ।

বিচার পেতে ব্যর্থ প্রজারাই শুধু এই দামামায় ঘা দিতে পারে । কে ঘা দিল ?

দামামার পাশে সারা শরীর কালো বোরকায় ঢাকা এক জেনানা দেখা যাচ্ছে । সে দামামায় বাড়ি দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সম্রাট নির্দেশে দিলেন আজ সন্ধায় ‘দরবারে-আম’ বসবে । সেখানে এই জেনানার বক্তব্য প্রথম শোনা হবে । দরবারে আমে প্রবেশের জন্য এই মহিলাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে বলা হলো।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৭

‘ঝড়োয়া কি দর্শন’ শেষ হয়েছে । সম্রাট নিজের ঘরে ফিরে গেছেন । তিনি কিছুক্ষণ কোরান পাঠ করবেন । কোরান পাঠের পর একটি বই পড়বেন । মূল বই হিন্দুস্তানি ভাষায় লেখা (মনে হয় সংস্কৃত কিংবা আদি বাংলা,-লেখক)। সম্রাটের নির্দেশে বইটি ফারসি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে । বইয়ের শিরোনাম-

অদৃশ্য হইবার মন্ত্র

বইতে হিন্দু যোগীরা কীভাবে অদৃশ্য হন তার বিষদ বর্ণনা এবং মন্ত্র দেওয়া আছে । যেসব উপকরণের উল্লেখ আছে তা হলো, শ্মশানে ভাঙা কলসির মাথা (কালো রঙ), বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির পাঁজরের হাড়, যে দড়িতে ফাঁসি হয়েছে সেই দড়ি । প্রথম রজস্বলা কিশোরীর দূষিত রক্ত । ত্রিমুখী রুদ্রাক্ষ । বেশ্যা রমণীর যৌনকেশ…ইত্যাদি ।

 

দরবারে আমে বিচারপ্রার্থী তরুণী উপস্থিত । সম্রাটের নির্দেশে সে মুখের নেকাব খুলেছে । তার মুখ দেখা যাচ্ছে । মেয়েটির রুপ দেখে সম্রাট হতভম্ব । কী সুন্দর বড় বড় চোখ । চোখের দীর্ঘ পল্লব । সম্রাট বললেন, নাম?

তরুণী আভূমি নত হয়ে বলল, বাঁদির নাম আসহারি ।

পরিচয়?

সম্রাটকে দেওয়ার মতো কোনো পরিচয় এই বাঁদির নেই । আমি আপনার হেরেমে বাস করি । আপনার মহান পিতা বাদশাহ বাবরকে একবার গান গেয়ে শোনাবার সৌভাগ্য হয়েছিল ।

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৭

তোমার অভিযোগ কী ?

মহান সম্রাট বাদশাহ বাবর আমার গান শুনে খুশি হয়ে আমায় সমওজনের স্বর্ণমুদ্রা দিতে হুকুম করেছিলেন । আমি তা পাই নাই । অবশ্য খাজাঞ্জিখানা থেকে আমাকে সমওজনের তাম্রমুদ্রা দেওয়া হয় । সেটাও কাগজে-কলমে ।

তোমার অভিযোগের পক্ষে কোনো সাক্ষী আছে?

আমার হৃদয় একমাত্র সাক্ষী । আর কোনো সাক্ষী নাই ।

সম্রাট দাওয়াতদারকে (লিখনসামগ্রীর ব্যবস্থাপক।প্রতিদিনের হিসাবরক্ষক।)বললেন, ঐদিনের ঘটনা কী তা যেন রেকর্ড ঘেঁটে জানানো হয় । প্রতিদিনের ঘোষণার কপি কিতাবদারের (গ্রন্থাগারিক) কাছেও থাকে । তাকেও রেকর্ডপত্র বের করতে বলা হলো ।আসহারি বলল, সম্রাট আমার আর্জি শুনেছেন, এতেই আমার জীবন ধন্য । পুরাতন রেকর্ড খোঁজার প্রয়োজন নেই ।

সম্রাট বললেন, কী প্রয়োজন আর কী প্রয়োজন না, তা তোমার কাছ থেকে জানতে আমি আগ্রহী না । আমি আগ্রহী সেই গানটি শুনতে যা আমার মহান পিতা শুনেছিলেন । তুমি কি গান শোনাতে প্রস্তুত হয়ে এসেছ ?

জি জাহাঁপনা ।

সঙ্গীতের আসর বসল । বাদ্যকররা আসহারির সঙ্গে আলোচনা করে তাদের বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে আসহারির গলার সমন্বয় করল ।

আসহারি গান করল । গান শেষ হওয়ামাত্র সম্রাট হুমায়ূন ঘোষণা করলেন, পুরাতন নথিপত্র পরে ঘাঁটা হবে । এই মুহূর্তে গায়িকার ওজনের সমপরিমাণ স্বর্নমুদ্রা তাকে দেওয়া হোক । আমি এই গায়িকাকে ‘আগ্রার বুলবুল’ সম্মানিত করলাম । আজ থেকে তার নামের আগে ‘আগ্রার বুলবুল’ ব্যবহৃত হবে ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৮

 

Categories
আন্তর্জাতিক

দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২৫২ জন প্রবাসীকে নিয়ে সৌদি আরবে সাউদিয়ার ফ্লাইট

করোনাভাইরাসের কারনে বাংলাদেশ-সৌদির ফ্লাইট বন্ধ ছিল অনেকদিন। অবশেষে ২৫২ জন  প্রবাসীকে নিয়ে রিয়াদের উদ্দেশ্য ঢাকা ছেড়েছে সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি  ফ্লাইট । ২৩ সেপ্টেম্বর রাত ১ টা ৮ মিনিটের দিকে হযরত শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ত্যাগ করে ফ্লাইটটি। রাত সাড়ে ১২ টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও এটি ছাড়তে কিছুটা বিলম্ব করে । স্থানীয় সময় ভোর ৪ টা ২৫ মিনিটে ফ্লাইটটি সৌদি আরবে পৌছায়।

 সৌদি  আরব থেকে ছুটিতে আসা কয়েক হাজার প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর । এর মধ্যে সৌদি যেতে বিমানের টিকিট দরকার। কিন্তু  সেই টিকিট পেতেই যত ভোগান্তি ।গত ৩ দিন ধরে টিকিট না পেয়ে রাজধানীতে বিক্ষোভ করেছেন প্রবাসীরা ।গত ২৪ মার্চ  দেশের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ায় সব আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ।

সৌদি  আরব সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটিতে এতদিন বাংলাদেশের সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ ছিল । এদিকে আগামী ১ অক্টোবর থেকে সৌদিতে বাণিজ্যিক ফ্লাইটের অনুমতি পেয়েছে বিমান বাংলাদেশ  এয়ারলাইন্স । অপরদিকে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ রুটে সপ্তাহে ২ টি ফ্লাইটের ঘোষনা দেয় সৌদিয়া । অনেক প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষের দিকে থাকায় সাউদিয়াকে আরও বেশি সংখ্যক ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ।

সংস্থাটির চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো.মফিদুর রহমান বলন ,এতদিন সৌদি  আরবের সঙ্গে আমাদের আকাশ পথে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল ।মধ্যেপ্রাচ্যের অনেক দেশেই  ফ্লাইটশুরু করেছি । আমরা চাচ্ছিলাম সৌদি  আরব থেকেও ফ্লাইট শুরু হোক । আমরা সর্বাত্মক   সহযোগীতা  করবো । সৌদি  আরবে  বাংলাদেশের  রাষ্টদূতের  সঙ্গে কথা বলেছি । বাংলাদেশিদের ফিরে যেতে সাউদিয়া যে কয়টি  ফ্লাইটের অনুমোদন চাইবে ,আমরা দিবো । যেন প্রবাসীরা ফিরে যেতে পারেন । একই সঙ্গে আমাদের বিমান বাংলাদেশেও যেন যেতে পারে সেজন্য কাজ করছি ।

Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৬

হুমায়ূন আবার রক্তপোষাক পরলেন । বাহাদুর শাহ তাঁকে যে হাতিটি দিয়েছেন কুশ তিনি সেই হাতি আনতে বললেন । হাতি হাজির করা হলো ।

সম্রাট বললেন, আজ মাগরেবে যে সূরা পাঠ করা হয়েছে তার নাম ফিল অর্থাৎ হাতি । ইমাম, আপনার প্রিয় বাহাদুর শাহর দেওয়া সেই হাতির পায়ের চাপে পিষ্ট করে আমি আপনাকে হত্যার নির্দেশ দিলাম ।

এই আদেশ এশার নামাজের আগেই যেন কার্যকর হয় ।*

নির্দেশ কার্যকর করা হলো ।

কম্ব দুর্গ থেকে বাহাদুর শাহ পালিয়ে গেলেও তাঁর ধনরত্ন নিতে পারলেন না । সবই হুমায়ূনের হাতে পড়ল । ধনরত্নের বাইরে পেলেন বাহাদুর শাহের পোষা তোতাপাখি ।

এই পাখি নাকি ভবিষৎ বলতে পারে । রুমী খাঁকে সে যতবার দেখে ততবারই বলে, ফট রুমী হারামখোর । ফট রুমী হারামখোর । এর অর্থ হারামখোর রুমীর উপর অভিসম্পাত ।

সম্রাটের প্রধান খেলা এখন হলো পাখির সঙ্গে সময় কাটানো । কম্ব

বিজয়ের পর সম্রাট তোতাকে জিজ্ঞেস করলেন, কে শ্রেষ্ঠ আমি না

*ঐতিহাসিক আবুল ফজল লিখেছেন, এই ঘটনার পর হুমায়ূন অত্যন্ত অনুতপ্ত হন । তিনি সারা রাত একফোঁটা ঘুমাতে পারেন নি। সারা রাত শিশুর মতো কেঁদেছেন । পরদিন ফজরের নামাজের আগে তিনি তাঁর রক্তপোশাক পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন । বাকি জীবন তিনি আর এই ভয়ঙ্কর বস্ত্র পরিধান করেন নি।

বাহাদুর শাহ?

তোতা বলল, আল্লাহু আকবর ।

পাখির মতে আল্লাহই শ্রেষ্ঠ । সম্রাট সন্তোষ লাভ করলেন । তোতাকে স্বর্গীয় পক্ষী উপাধি দিলেন । তার জন্যে সোনার খাঁচা বানানোর নির্দেশ দিলেন ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৬

সম্রাটকে পানি খাওয়ানোর দায়িত্বে নিযুক্ত জওহরকে এই পক্ষীর সেবক নিয়োগ করলেন । (এই জওহর সম্রাট হুমায়ূনের একটি জীবনী রচনা করেন । সম্রাটভগ্নি গুলবদনের পরেই জওহরের জীবনীকে প্রামাণ্য ধরা হয়) সম্রাটের নির্দেশে এই তোতাপাখির একটি ছবি আঁকা হয় । ছবিটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এখনো সংরক্ষিত আছে।

জুন মাস ।আগ্রার উপর দিয়ে কয়েকদিন ধরেই লু হাওয়া বইছে । পিঙ্গল আকাশে মেঘের দেখা নেই । লোকজন দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরে বসা । কিছু মিঠাইয়ের দোকন খোলা । মিঠাইয়ের উপর ভনভন করছে মাছি । গরম কাল মাছিদের প্রিয় সময় । গরমে তারা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে ।

আগ্রার পথেঘাটে ময়ূরের ঝাঁক । তাদের দৃষ্টি আকাশের দিকে । তারা কুৎসিত শব্দে ডাকে, চক্রাকারে ঘোরে, একে অন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে । গরমে এদেরও মাথা খারাপের মতো হয়ে গেছে । ময়ূর পেখম মেলার জন্যে অস্থির । বৃষ্টির দেখা নেই বলে পেখম মেলতে পারছে না ।

আগ্রার অধিবাসীরা আজ খানিকটা উত্তেজিত । প্রধান কাজির নির্দেশে তিন অপরাধীর জন্যে তিনটি গাধা হত্যা করা হয়েছে । গাধাগুলির চামড়া ছিলানো হয়েছে । অপরাধীদের গাধার চামড়ার ভেতরে ঢুকিয়ে চামড়া সেলাই করে দেওয়া হবে । তারপর তাদের শুইয়ে দেওয়া হবে ঘোড়ার গাড়িতে । এই গাড়ি আগ্রা শহরময় ঘুরবে । প্রচণ্ড গরমে গাধার চামড়া এঁটে বসে যাবে অপরাধীদের গায়ে । তাদের মৃত্যু হবে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৬

তিন অপরাধী গাধার চামড়ার মোড়া অবস্থায় ঘোড়ার গাড়ির পাটাতনে শুয়ে আছে । ঘোড়ার গাড়ি চলছে । ঘোড়ার গাড়ির চালকের হাতে রুপার ঘণ্টা । সে মাঝে মাঝে ক্লান্ত ভঙ্গিতে ঘণ্টা বাজাচ্ছে । ঘণ্টাধ্বনি শাস্তির ঘোষণা । প্রচণ্ড গরমে গাধার চামড়া অপরাধীদের গায়ে এঁটে বসছে । তাদের একজন ‘পানি পানি’ বলে অস্ফুট শব্দ করছে । গাড়ির পেছনে এক দঙ্গল ছেলেপুলে । তাদের উৎসাহের সীমা নেই । তারা মাঝে মাঝে ঢিল ছুঁড়ছে । যখনই কোনো ঢিল গাধার চামড়ায় আবৃত অপরাধীদের উপর পড়ছে, তখনই তারা উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠছে ।

গরম অসহনীয় বোধ হওয়ায় সম্রাট গোসলখানায় ‘দরবারে খাস’ বসিয়েছেন । তাঁর প্রিয় অমাত্যরা গোসলখানায় জড়ো হয়েছেন । সম্রাট হাম্মামে বুক পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে আছেন । দুজন খোজা বালক মাঝে মাঝে তাঁর মাথায় পানি ঢালছে । পানিতে গোলাপগন্ধ । অসংখ্য গোলাপ পাপড়ি ছড়িয়ে পানিতে এই গন্ধ আনা হয়েছে । বিশেষ ব্যবস্থায় পানি শীতল করা হয়েছে । শীতলকরণ-পদ্ধতি চালু আছে । সম্রাট যতক্ষণ হাম্মামে থাকবেন ততক্ষণ এই প্রক্রিয়া চলবে ।

পানির শীতলকরণ-পদ্ধতি যথেষ্টই বৈজ্ঞানিক । বাষ্পীভবনের সময় পানি কিছু উত্তাপ নিয়ে বাষ্পে পরিণত হয় । উত্তাপ নেওয়ার কারণে পানি ঠাণ্ডা হয় । প্রকাণ্ড সব মাটির জালার গায়ে পানি ঢেলে বাতাস দেওয়া হচ্ছে । এতে বাষ্পীভবন-প্রক্রিয়া দ্রুত হচ্ছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৬

সম্রাটকে ঘিরে আছেন দরবারে খাসের অমাত্যজন । মন্ত্রীসভার সকল সদস্য আছেন । দুজন সেনাপতি আছেন । আজকের দরবারে খাসে আফগান শের খাঁর বিষয়ে আলোচনা হবে । শের খাঁ শক্তি সঞ্চয় করেই যাচ্ছে । তার বিষয়ে কখন কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা সম্রাট বলবেন । আলোচনায় অন্যরাও অংশ নিতে পারবে, তবে কে অংশ নেবে তা সম্রাট আঙুলের ইশারায় ঠিক করবেন। ইচ্ছামতো মতামত জাহির করার সুযোগ নেই । গোপন আলোচনা খোজাদের সামনেই হচ্ছে, তাতে কোনো সমস্যা নেই। গোসলখানায় উপস্থিত সব খোজাই বধির । কানে গলন্ত সীসা ঢেলে তাদের কান নষ্ট করা হয়েছে ।

সভা শুরুর আগে সম্রাট একটি শের আবৃত্তি করলেন-

মুরদই লাখ বুড়া চাহে তো কেয়া হোতা হ্যায়

ওই হোতা হ্যায় যো মঞ্জুরে খোদা হোতা হ্যায় ।

(শত্রুরা আমার যতই অনিষ্ট কামনা করুক তাতে

কিছুই হবে না । ঈশ্বর যা মঞ্জুর করবেন তা-ই হবে

আমার ভাগ্যলিপি।)

দরবারিরা একসঙ্গে বললেন, মারহারা ! মারহাবা !

সম্রাট হাসলেন । দ্বিতীয় শের আবৃত্তি করলেন-

হর মুসিবৎকো ‍দিয়া এক তবসুমসে জবাব

ইসতরাহ গরদিসে দেীড়োকে রুলায়া হ্যায় ম্যায়নে ।

(দুর্দিন ভেবেছিল সে আমাকে কাঁদাবে ।

উল্টা হাসিমুখে আমি তাকে কাঁদিয়েছি।)

আবারও আওয়াজ উঠল, মারহাবা ! মারহাবা!

প্রধান উজির বললেন, গোস্তাকি মাফ হয় । এই অপূর্ব শের কার

কলম থেকে বের হয়েছে?

সম্রাট বললেন, এই শের তোমাদের বাদশাহর কলম থেকে এসেছে । সে হিন্দুস্থানের বাদশাহ হলেও অন্তরে একজন অক্ষম দুর্বল কবি ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৬

প্রধান উজির কিছু বলতে চাচ্ছিলেন, সম্রাট ইশারায় তাঁকে থামিয়ে সভা শুরু করলেন । এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে অমাত্যদের মধ্যে গৌণ একজনকে হাম্মামে নামতে বললেন । সম্রাটের সঙ্গে স্নান করা পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার । যাকে হাম্শামে নামতে বলা হলো, তাঁর চেহারা অতি সাধারণ । মধ্যম আকৃতির কৃশকায় একজন মানুষ । তাঁর নাম বৈরাম খাঁ । (মোঘল ইতিহাসের প্রধান পুরুষদের একজন।)

গোসলখানায় যখন দরবারে খাস বসে তখন উপস্থিত সবাই পানিতে নামার প্রস্তুতি নিয়ে আসে । যেন সম্রাটের হুকুম পাওয়ামাত্র পানিতে নামতে পারে ।

সম্রাট বললেন, এখন একটি পত্র পাঠ করা হবে । পত্রপাঠের পর পত্রের উপর আলোচনা । পত্র পাঠিয়েছেন আফগান পাঠান-শের খাঁ । সম্রাটের নির্দেশে প্রধান উজির পত্র পাঠ করলেন ।

পত্র

প্রেরক : দাসানুদাস সেবক শের শাহ ।

প্রাপক : আল সুলতান আল আজম ওয়াল খাকাল

আল মুকাররাম, জামিই সুলতানাত-ই-হাকিকি ওয়া

মাজাজি, সৈয়দ আল সালাতিন, আবুল মোজাফফর

নাসির উদ্দিন মোহম্মদ হুমায়ূন পাদশাহ, গাজি জিল্লুল্লাহ ।

হে মহান সম্রাট, হিন্দুস্থানের রক্ষাকর্তা ও মালিক ।

আল্লাহপাকের অনুগ্রহের ফুটন্ত গোলাপ । মহান

কবি ও চিত্রকর হুমায়ূন ।

হে বাদশাহ, আপনি কি অধম শের খাঁ’র উপর

নারাজ হয়েছেন? হিন্দুস্থান হলো গুজবের বাজার ।

সেই বাজারের বর্তমান দুর্গন্ধময় গুজব হলো-

আপনি অধম শের খাঁ’র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি

নিচ্ছেন ।

হে সম্রাট! আমিকি এমন কিছু করেছি যার

জন্যে আপনার বিরাগভাজন হয়েছি?চুনারের দুর্গ

আমার পুত্র কুতুব খাঁর দখলে, এটা সত্য । সম্রাটের

আদেশ পাওয়ামাত্র কুতুব খাঁ দুর্গের চাবি আপনার

পবিত্র হাতে তুলে দিয়ে আপনার পদচুম্বন করবে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৬

তবে আপনার কোনো প্রতিনিধির হাতে না। আপনি

স্বয়ং উপস্থিত হলে তবেই দুর্গের চাবি আপনার হস্ত

মোবারকে দেওয়া হবে । আমি পুত্রকে নিয়ে বঙ্গদেশের

ভেতরে চলে যাব । এর অন্যথা কখনো হবে না ।

হে পবিত্র সম্রাট, আপনি গুপ্তচর মারফত খবর

নিয়ে নিশ্চয়ই জেনেছেন আমি আমার নিজের নামে

খুৎবা পাঠ করাই না । মহান মোঘল সম্রাট হুমায়ূনের

নামের জুমার নামাজে খুৎবা পাঠ করা হয় । টাঁকশাল

থেকে আমার নামে কোনো মুদ্রা তৈরি হচ্ছে না ।

এই অধম যেখানে সম্রাটের সেবায় নিযুক্ত তখন আপনি

তার উপর বিরাগ হচ্ছেন, অথচ আমি যতদূর জানি আপনার

ভাই আসকারি মীর্জা এবং কামরান মীর্জা তাঁদের নামে খুৎবা

পাঠ করছেন । টাঁকশালে তাঁদের নামে স্বর্ণমুদ্রা তৈরি হচ্ছে

এরকম কিছু মুদ্রা আপনার কাছে পাঠালাম ।

মহান সম্রাট, আপনার দুই ভাইয়ের নাম এখানে এন যদি

অপরাধ করে থাকি তাহলে ক্ষমা প্রার্থনা করি । আপনার

মহান পিতা বঙ্গদেশের ফল আম অত্যন্ত পছন্দ করতেন ।

আমি আম এবং আরও কিছু বঙ্গদেশীয় ফল আপনার সেবার

জন্যে পাঠালাম । এই সঙ্গে একটি বিষ্ণুমূর্তি । বিষ্ণুমূর্তিটির

ওজন এগারো সের । সম্পূর্ণ স্বর্ণনির্মিত, এর চোখ নীলকান্তমণির ।

এই বিষ্ণুমূর্তি বিষয়ে প্রচলিত গল্প হলো, ভয়াবহ বিপদের আগে আগে

অশ্রুবর্ষণ করে । রহস্যময় বিষয়ে আপনার আগ্রহের কথা জানি বলেই

বিষ্ণুমূর্তি বিষয়ে প্রচলিত গল্পটি জানালাম ।

ইতি

শের খাঁ

আপনার দাসুনুদাস সেবক ।

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৭