অনীশ-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

অনীশ

মা আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে বললেন, ‘হ্যা, দেব।” ‘সত্যি? ‘হ্যা, সত্যি। কীভাবে যেতে হয়, টাকাপয়সা কত্ত লাগে খোঁজখবর আন্। ‘তুমি সত্যিসত্যি বলছ তাে মা? ‘বললাম তাে হা।’ ‘আমার এখনাে বিশ্বাস হচ্ছে না।’ 

‘বিশ্বাস না হবার কী আছে? এই দেশে কি আর পড়াশােনা আছে? টাকা থাক তােকে বিলেতে রেখে পড়াতাম।’ | আমার আনন্দের সীমা রইল না। ছােটাছুটি করে কাগজপত্র জোগাড় করলাম। অনেক যন্ত্রণা! সরকারি অনুমতি লাগে। আরাে কি কি সব যন্ত্রণা। সব করলেন রুমা বাবা। রুমা হচ্ছে সেই মেয়ে, যে ফোর্থ হয়েছে। রুম্মার বাবা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আডিশনাল সেক্রেটারি।

তিনি যে শুধু ব্যবস্থা করে দিলেন তাই না, আমাদের দুজনের জন্যে দুটো স্কলারশিপেরও ব্যবস্থা করে দিলেন। পাসপাের্টভিসা সব উনি করলেন। বাংলাদেশ বিমানে যাব, সকাল ৯টায় ফ্লাইট। উত্তেজনায় আমি রাতে ঘুমুতে পারলাম না। মা আমাকে জড়িয়ে ধরে সারা রাতই ফুপিয়ে কাঁদলেন। খানিকক্ষণ কাঁদেন, তারপর বলেন, ‘ও বুড়ি, তুই কি পারবি আমাকে ছেড়ে থাকতে? 

‘কষ্ট হবে, তবে পারব। তুমিও পারবে।’ ‘নাআমি পারব না।’ 

‘যখন খুব কষ্ট হবে তখন কোলকাতা চলে যাবে। কোলকাতা থেকে শান্তিনিকেতন দেড় ঘন্টা লাগে ট্রেনে। শান্তিনিকেতনে অতিথি ভবন আছে, সেখানে উঠবে। আমার যখন খারাপ লাগবে, আমিও তাই করব, হুট করে ঢাকায় চলে আসব।’ 

অনীশ-পর্ব-(৭)

‘তুই বদলে যাচ্ছিস!’ ‘আমি আগের মতােই আছি মা। সারা জীবন এই রকমই থাকব। 

না, তুই বদলাবি।

তুই ভয়ংকর রকম বদলে যাবি।

আমি বুঝতে পারছি।

‘তােমার যদি বেশি রকম খারাপ লাগে তাহলে আমি শান্তিনিকেতনে যাবার আইডিয়া বাদ দেব। 

‘বাদ দিতে হবে না। তাের এত শখ, তুই যা। ‘মাশান যাবার পর যদি দেখি খুব খারাপ লাগছে তাহলে চলে আসব।’ 

খুব ভােরে আমার ঘুম ভাঙল। দেখি মা বিছানায় নেই। দরজা খুলতে গিয়ে দেখি বাইরে থেকে তালাবন্ধ। আমি আগের বারের মতো হৈচৈচেঁচামেচি করলাম না, কাঁদলাম না-চুপ করে রইলাম। তালাবন্ধ রইলাম সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যাবেলা মা নিচু গলায় বললেন, ‘ভাত খেতে আয় বুড়ি। ভাত দিয়েছি।’ | আমি শান্ত মুখে ভাত খেতে বসলাম। এমন ভাব করলাম যেন কিছুই হয় নি। মা বললেন, ‘ড়ালটা কি টক হয়ে গেছে? সকালে রান্না করেছিলাম, দুপুরে জ্বাল দিতে ভুলে গেছি। 

আমি বললাম, ‘টক হয় নি। ডাল খেতে ভালাে হয়েছে মা। ভাত খাবার পর কি চা খাবি? চা বানাব?’ 

বানা  আমি চা খেলাম। খবরের কাগজ পড়লাম। ছাদে হাঁটতে গেলাম। মা যখন এশার নামাজ পড়তে জায়নামাজে দাঁড়ালেন, তখন আমি এক অসীম সাহসী কাণ্ড করে বসলাম। বাড়ি থেকে পালালাম। রাত ন’টায় উপস্থিত হলাম এষার বাসায়। এষা আমার বান্ধবী। এষার বাবামা খুবই অবাক হলেন। তাঁরা তক্ষুণি আমাকে পৌছে দিয়ে আসতে নি।

অনীশ-পর্ব-(৭)

অনেক কষ্টে তাঁদের আটকালাম। একরাত তার বাসায় থেকে, ভােরবেলা চলে গেলাম রুবিনাদের বাড়ি। রুবিনাকে বললাম, আমি দু দিন তােদের বাড়িতে থাকব। তোর কি অসুবিধা হবে? আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি।রবিনা চোখ কপালে তুলে ফেলল। আমি বললাম, তুই তোর বাবামাকে কিছু একটা বল, যাতে তাঁরা সন্দেহ না করেন যে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি।’ 

রুবিনাদের বাড়িতে দু’ দিনের জায়গায় আমি চার দিন কাটিয়ে পঞ্চম দিনের দিন মা’র কাছে ফিরে যাওয়া স্থির করলাম। বাড়ি পৌঁছলাম সন্ধ্যায়। মা আমাকে দেখলেন, কিছুই বললেন না। এরকমভাবে তাকালেন যেন কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসেছি। আমি চাপা গলায় বললাম, কেমন আছ মা? 

মা বললেন, ‘ভালাে। 

তুমি মনে হয় আমার উপর ভয়ংকর রাগ করেছ। কি শাস্তি দিতে চাওদাও। আমি ভয়ংকর অন্যায় করেছি। শাস্তি আমার প্রাপ্য। | মা কিছু বললেন না। রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। আমি লক্ষ করলাম, বসার ঘরে অল্পবয়সী একটি ছেলে বসে আছে। কঠিন ধরনের চেহারা। রােগা, গলাটা হাঁসের মতাে অনেকখানি লম্বা। মাথার চুল তেলে জবজব করছে। সে খবরের কাগজ পড়ছিল। অমািকে একনজর দেখে আবার খবরের কাগ প লাগল । 

অনীশ-পর্ব-(৭)

আমি মাকে গিয়ে বললাম, বসার ঘরে বসে আছে লােকটা কে? 

‘ওর নাম জয়নাল। আমাদের দূর সম্পর্কের আত্নীয় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। ফাইনাল ইয়ারে। এবছর পাশ করে বেরুবে। 

এখানে কী জন্যে? ‘তুই চলে যাবার পর আমি খবর দিয়ে আনিয়েছি। একা থাকতাম। ভয়ভয় লাগত। 

‘আই এম সরি মা। এরকম ভুল আর করব না। আমি চলে এসেছি, এখন তুমি তুই আমার ঘরে আয় বুড়িতাের সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছেআমি মাঘরে গেলামমা দরজা বন্ধ করে দিলেনমাদিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠলামএতক্ষণ লক্ষই করিনি এই পাঁচদিনে মাচেহারা, স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ ভেঙ্গে গেছেতাঁকে দেখে মনে হচ্ছে একটা জীবন্ত কঙ্কালমা বললেন, তুই চলে যাবার পর থেকে আমি পানিছাড়া আর কিছু খাইনিএটা কি তাের বিশ্বাস হয়

আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, হয়মা বললেন, দোকান থেকে ইঁদুরমারা বিষ এনে আমি গ্লাসে গুলে রেখেছি তাের সামনে খাব বলেআমি যে তাের সামনে বিষ খেতে পারি এটা কি তাের বিশ্বাস হয়

আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, হয়মা বললেন, এক শর্তে আমি বিষ খাব নাআমি যেছেলেটিকে বসিয়ে রেখেছি তাকে তুই বিয়ে করবিএবং আজ রাতেই করবিআমি কাজি ডাকিয়ে আনব। 

আমি বললাম, এসব তুমি কী বলছ মা! এই ছেলে খুব গরিব ঘরের ছেলেভাল ব্রিলিয়ান্ট ছেলেআমি তাকে ইন্টারমিডিয়েট থেকে পড়ার খরচ দিয়ে যাচ্ছিতাের জন্যেই করছিলামএই ছেলে বিয়ের পর বাড়িতে থাকবে, আমাদের দুজনকে দেখাশােনা করবেআমার মুখে কথা আটকে গেলমাথা ঘুরছেকী বলব কিছুই বুজতে পারছি নামা বললেন, টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখ গ্লাসে বিষগােলা আছেএখন মন ঠিক করতারপর আমাকে বল। 

অনীশ-পর্ব-(৭)

সেই রাতেই আমার বিয়ে হলনয়াটোলার কাজিসাহেব বিয়ে পড়িয়ে দিয়ে গেলেনদেনমােহরানা এক লক্ষ টাকাবিয়ে উপলক্ষে দামি একটা বেনারসি পড়লামমা আগেই কিনিয়ে রেখেছিলেনবাসর হল মাশােবার ঘরে। 

আমার স্বামী বাসররাতে প্রথম যেকথাটি আমাকে বললেন, তা হচ্ছেগত পাঁচদিন তুমি কার কার বাড়িতে ছিলে আমাকে বলােআমি খোঁজ নেব। 

আমি কঠিন গলায় বললাম, কী খোঁজ নেবেন? আমার স্বামী বললেন, গরিব হয়ে জন্মেছি বলে আজ আমার এই অবস্থা বড়লােকের নষ্ট মেয়ে বিয়ে করতে হলনষ্টামি যা করেছ করেছআর নাআমি মানুষটা ছােটখাটো কিন্তু ধানি মরিচা ধানি মরিচ চেন তাে? সাইজে ছােট ঝাল বেশি। 

 

Read more

অনীশ-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *