অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী পর্ব:৩ আহমদ ছফা

অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী পর্ব:৩

অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী পর্ব:৩

ড. মাহমুদের বাড়ি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মনোভাব নিয়ে আমি ফিরলাম । দুরদানা সম্পর্কে যেসব কথা শুনলাম, তাতে করে তাকে একজন দেবী চৌধুরানী জাতীয় নায়িকা বলে মনে হচ্ছিল। ওই রকম অঘটনঘটনপটিয়সী, দুর্দান্ত সাহসী একজন তরুণীর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছে, এটাকে আমি ভাগ্যের ব্যাপার বলেই ধরে নিলাম। তাদের কথাবার্তা থেকে যে জিনিসটি বেরিয়ে এসেছে তার মধ্যে দোষের কোনো কিছুই খুঁজে পাইনি। বরঞ্চ আমার মনে হয়েছে, দুরদানা এক অসাধারণ তরুণী।

যে মেয়ে একদল বদমাশের ভেতর থেকে শুধু রিভলবারের একটা আওয়াজ করে বেরিয়ে আসতে পারে, তার হিম্মতের তারিফ করার বুকের পাটা কারো নেই। তারা যেগুলোকে দোষের বিষয় বলে বয়ান করলেন, আমি সেগুলোকে গুণ বলে মনে করলাম। এতক্ষণ ড. মাহমুদের বাড়িতে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের মুখ থেকে দুরদানা সম্পর্কিত যে অপবাদ আমাকে শুনতে হলো, সেগুলোকে আমি কতৃপ্রয়াসী কতিপয় ঝুনো পণ্ডিতের নিছক অক্ষম কাপুরুষতা বলে ধরে নিলাম।

ড. মাহমুদের বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর আমি যেন দুরদানা সম্পর্কে নতুন একটা দিব্যদৃষ্টি লাভ করলাম। মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে আমার নতুন জন্ম হয়েছে। আমি অনেক তথাকথিত পবিত্র মানুষের লোভ-রিরংসা একেবারে চোখের সামনে বীভৎস চেহারা নিয়ে জেগে উঠতে দেখেছি। আবার অত্যন্ত ফেলনা তুচ্ছ মানুষের মধ্যেও জ্বলন্ত মনুষ্যত্বেও শিখা উজ্জল হয়ে জ্বলে উঠতে দেখেছি। আমার চেতনার কেন্দ্রবিন্দুটিতে এমন একটা চুম্বক-ক্ষেত্র তাপে-চাপে তৈরি হয়ে গেছে, সামান্য পরিমাণে হলেও খাঁটি পদার্থ দেখতে পেলে মন আপনা থেকেই সেদিকে ধাবিত হয়।

গতানুগতিক নারীর বাইরে দুরদানার মধ্যে আমি এমন একটা নারীসত্তার সাক্ষাৎ পেলাম, সর্বান্তঃকরণে তাকে আমাদের নতুন যুগের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করতে একটুও আটকালো না । দুরদানা যখন সাইকেল চালিয়ে নাখালপাড়া থেকে আর্ট ইনস্টিটিউটে আসত, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতাম। আমার মনে হতো দুরদানার প্রতিটি প্যাডেল ঘোরানোর মধ্য দিয়ে মুসলিম সমাজের সামন্তযুগীয় অচলায়তনের বিধি-নিষেধ ভেঙে নতুন যুগ সৃষ্টি করছে। সেই সময়টায় আমরা সবাই এমন একটা বদ্ধ গুমোট পরিবেশের মধ্যে বসবাস করছিলাম, অনেক সময় নিজের নিশ্বাসের শব্দ শুনেও আতঙ্কে চমকে উঠতে হতো।

আমরা পাকিস্তানের আতঙ্ক-রাজ্যের অস্তিত্ব খুঁড়িয়ে দিয়ে নিজেরা সজ্ঞানে-স্বেচ্ছায় আরেকটা আতঙ্ক রাজ্য কায়েম করে তুলেছিলাম। আমাদের জনগণের রক্ত থেকে, মৃত্যু থেকে, আমাদের মুক্তিসেনানীদের মৃত্যুঞ্জয়ী বাসনার উত্তাপ থেকে রাতারাতি কী করে কখন আরেকটা কারাগার আমাদের জাতীয় পতাকার ছায়াতলে তৈরি করে নিলাম, নিজেরাও টের পাইনি। আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের সম্মোহন-মন্ত্রে স্বর্গাদপি গরিয়সী মাতৃভূমিটির যে উদার গগনপ্রসারী ছবি ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করতাম, সেই প্রয়াস বার বার ব্যর্থ হয়ে যেত।

দৃষ্টির সামনে বার বার একটা খাঁচা তার চারদিকের দেয়ালের সোনালি কারুকাজসহ দৃষ্টির সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। এই খাঁচার ভেতরেই আমাদের বসবাস। এখানে সবকিছু বিকলাঙ্গ, সবকিছু অসুস্থ, অস্বাস্থ্যকর।এই পরিবেশে, এই পরিস্থিতিতে একজন তরুণী সমস্ত বাধা-নিষেধ অস্বীকার করে প্রবল প্রাণশক্তির তোড়ে চারপাশের সমস্ত কিছু একাকার করে ফেলতে চাইছে, আমি একে জীবনের স্বাধীনতা সৃষ্টির একটা মহৎ প্রয়াস বলে ধরে নিলাম।

লোকে দুরদানা সম্পর্কে যত আজে-বাজে কথা বলুক না কেন, সেগুলোকে আমি জমাট-বাঁধা কাপুরুষতা ছাড়া কিছুই মনে করতে পারলাম না। বিকৃত রুচির কিছু মানুষ যেমন এলিজাবেথ টেলর কিংবা সোফিয়া লোরেনের ছবি সামনে রেখে গোপনে মাস্টার্বেশন করে আনন্দ পায়; দুরদানা সম্পর্কে রটনাকারীদেরও তাদের সমগোত্রীয় বলে ধরে নিলাম। মাঝে মাঝে মনে হতো যুগের প্রয়োজনে এই মেয়ে পাতাল-ফুড়ে গোঁড়া মুসলমান সমাজে আবির্ভূত হয়েছে। সে যদি শাড়ি-ব্লাউজের বদলে প্যান্ট-শার্ট পরে বেড়ায়, তাতে কি হয়েছে? তুচ্ছ গয়নাগাটির বদলে ছুরি-পিস্তল নিয়ে যদি ঘোরাঘুরি করে, সেটা অনেক বেশি শোভন, অনেক বেশি মানানসই।

আমি দুরদানার দিকে প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়লাম। ঝুঁকে পড়লাম তার প্রেমে পড়েছি বলে নয়। তার মধ্যে প্রাণশক্তির সবল অঙ্কুরণ দেখে তার প্রতি আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। লোকে তার নামে যা-তা বলে বেড়ায়, কারণ সে অন্য রকম। কেউ কখনো বলতে পারে নি সে পুরুষ মানুষের সঙ্গে ক্লাবে গিয়ে মদ খেয়ে কখনো মাতাল হয়েছে, টাকা নিয়ে কোনো ধনী ব্যক্তির অঙ্কশায়িনী হয়েছে, কিংবা প্রেমের ছলনা করে সাত-পাঁচটা পুরুষ মানুষকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে বেরিয়েছে। লোকে তার নিন্দে করত, কারণ সে ছিল একান্তভাবে সুস্থ এবং স্বাভাবিক।

একদিন তার বাবা যখন বললেন, কলেজে আসা-যাওয়ার রিকশা ভাড়া দেয়ার ক্ষমতা তার নেই, তখন সে সাইকেল চালানো শিখে নিয়ে একটা সেকেন্ডহ্যান্ড সাইকেল জোগাড় করে রিকশা ভাড়ার সমস্যার খুব একটা সহজ সমাধান করে নিল। একা একটা মেয়েকে সাইকেলে চলাচল করতে দেখলে সময়-অসময়ে বখাটে ছেলেরা তার ওপর চড়াও হতেও দ্বিধা করত না। এই রকম উৎপাত থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য সম্প্রতি সে নিজের সঙ্গে একটা চাকু রাখতে আরম্ভ করেছে। সাইকেল চালাতে গিয়ে একদিন সে আবিষ্কার করল শাড়ি পরে সাইকেল চালাতে বেশ অসুবিধে হয়। সে শাড়ির পাট চুকিয়ে দিয়ে প্যান্ট-শার্ট পরতে আরম্ভ করল।

তার ভাই চরমপন্থী রাজনীতি করত। রাজরোষ তার মাথার ওপর উদ্যত খড়গের মতো ঝুলছিল। সরকার তার মাথার ওপর চড়া দাম ধার্য করেছে। এমন ভায়ের বোন হিসেবে তার লুকিয়েচুপিয়ে থাকা উচিত ছিল। কিন্তু দুরদানা সে অবস্থাটা মেনে নেয় নি। ভাইয়ের বিপ্লবী রাজনীতি সম্বন্ধে তার অপরিসীম গর্ববোধ ছিল। তাই সবসময় সে মাথা উঁচু করে বেড়াতো। আমাদের সমাজে এই এতখানি স্বাভাবিকতা সহ্য করার খুব বেশি মানুষ ছিল না। কেউ কেউ তাকে পথেঘাটে আক্রমণ করত। যারা তার ওপর হামলা করত দুরদানা তাদের কোনো ক্ষতি করে নি। যারা তার নামে নানা রকম অশ্লীল গল্প রটিয়ে বেড়াতো, তাদের যৌন-যন্ত্রটা আসল জায়গার বদলে মগজের গভীর প্রদেশে অবস্থান করত বলে এমন সুন্দর কাহিনী তারা অনায়াসে রচনা করতে পারত।

দুরদানা আমার ঘরে এসেছে, দারোয়ান হোস্টেলে ঢুকতে বাধা দিয়েছে, সে পকেট থেকে ধারালো চাকু বের করে দারোয়ানের ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে দিতে গিয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব দারোয়ান একজোট হয়ে ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে বিচার দাবি করেছে এবং ভাইস চ্যান্সেলর আমাকে ডেকে কড়া কৈফিয়ত তলব করেছে, এইসব খবর গোটা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বোমা ফাটানোর মতো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল। আমি খুব অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম আর্ট ইনস্টিটিউটে দুরদানা নামে এক ডাকাবুকো মহিলা আছে এবং সে সব ধরনের অকাণ্ড ঘটিয়ে তুলতে ওস্তাদ, একথা আমি ছাড়া সবাই জানে।

ঘটনাটি মওলানা হান্নানকে কি রকম বিচলিত করে তুলেছিল তার উল্লেখ করছি। অবশ্য তার আগে মওলানা হান্নানের বিষয়ে একটা ধারণা দেয়া প্রয়োজন। হান্নান সম্প্রতি ইসলামিক স্টাডিজের লেকচারারের চাকরি পেয়েছে। সে সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরে ক্লাস করতে আসত এবং দাড়ি রাখার একটা নতুন স্টাইল সৃষ্টি করেছিল। কানের নিচে থেকে শুরু করে থুতনি হয়ে কানের অপর অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো দাড়িতে তাকে ভাল কি খারাপ দেখাতো, সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু চোখে পড়ত।

রোদ বৃষ্টি থাকুক-বা-না-থাকুক সময় সময় ছোট ছাতাটা মাথার ওপর মেলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসত। সে সময় গোল টুপিটা মাথার বদলে শোভা পেত হাতে। তার সম্পর্কে আরেকটি মজার সংবাদ হলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পর পাজামা-পাঞ্জাবি বদলে শার্ট-প্যান্ট পরত। আমরা তাকে নিয়ে নানারকম মজা করতাম। আমাদের ঠাট্টা-তামাশা সে গায়ে মাখত না। আমরা জিজ্ঞেস করতাম, মওলানা তুমি এরকম করে দাড়ি ঘেঁটেছ কেন? হান্নান গম্ভীর হয়ে জবাব দিত, চাঁদ হলো ইসলামের চিহ্ন। তাই আমার দাড়ি আমি আলহেলালের মতো করে রেখেছি। মওলানা হান্নানের এরকম অনেক ব্যাপার ছিল, যেগুলো চট করে চোখে পড়ে যেত।

ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বুড়ি বুড়ি শিক্ষিকাদের রুমে রুমে গিয়ে গল্প করতে সে খুব পছন্দ করত। সেদিকে ইঙ্গিত করে কোনো কিছু বললে, পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে জবাব দিত, না না, বেআইনি কিছু নয়। গুলশান আপার সঙ্গে আমি ধর্ম এবং দর্শনের কিছু সমস্যার কথা আলোচনা করে আনন্দ পেয়ে থাকি। তার মুখে একটা লজ্জার ছোঁয়া লাগত। সেটা চাপা দেয়ার জন্যে ‘গুলশান আপার ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে কত অগাধ জ্ঞান’ বলে একটা নাতিদীর্ঘ লেকচার দিয়ে বসত।

হান্নান এক শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের সামনে আমাকে আটক করে বসল। সে জুমার নামাজ আদায় করে মসজিদ থেকে বেরিয়েছে। আমি তাকে পাশ কাটিয়ে চলে আসছিলাম। হান্নান আমার কলার ধরে হিড়হিড় করে ছাতিম গাছের গোড়ায় টেনে নিয়ে গেল। আমি আশঙ্কা করছিলাম, হান্নান শুক্রবারে জুমার নামাজ পড়ার ফজিলত সম্পর্কে কিছু হেদায়েত করবে। আমিও একটু ভড়কে গিয়েছিলাম।

সে আজ পাঞ্জাবির ওপর আচকান চাপিয়েছে, চোখে সুরমা, কানে আতর মাখানো তুলো গোঁজা। সব মিলিয়ে একটা পবিত্র-পবিত্র ভাব। এই বিশেষ সাজ-পোশাকে আমার সঙ্গে যদি গুলশান আপার সঙ্গে যেমন করে, সেরকমভাবে ধর্মতত্ত্বের আলোচনা শুরু করে, আমি বেকায়দায় পড়ে যাব।তাই তাড়াতাড়ি কাট মারার জন্যে বললাম, হান্নান, কি বলবার আছে তাড়াতাড়ি বলো, খিদেয় প্রাণ বেরিয়ে আসছে। হান্নান আমার কথা গ্রাহ্যই করল না। জামার কলারটা ভাল করে চেপে ধরে বলল, জাহিদ তোমার কাজটা বেআইনি হচ্ছে।

আমি বললাম, বেআইনী কাজ তো তুমিই করো। গুলশান আপার মতো মডার্ন মহিলার সঙ্গে ধর্মতত্ত্বের আলোচনা করাটা হলো দুনিয়ার সবচাইতে বেআইনি কাজ। হান্নান আমার কথা মোটেই আমল না দিয়ে মুখ গম্ভীর করে বলল, আমি জানি তুমি দুরদানা বেগমের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে আসছ। আমি বললাম, আড্ডা দিয়ে আসছি ভাল করেছি, তুমি জানলে কি করে? সে বলল, শাহবাগ থেকে আসার সময় তোমাদের দুজনকে দেখেছি। আমি বললাম, দেখেছ বেশ করেছ। মওলানা তুমি মিছেমিছি নামাজ পড়লে । আল্লাহ তোমার জুমার নামাজ কবুল করবে না। তুমি নামাজ পড়তে পড়তে কোন্ ছেলে কোন্ মেয়ের সঙ্গে কি করল এসব চিন্তা করেছ। কলার ছাড়, আমি যাই।

মওলানা হান্নানের মুখের ভাবে একটা পরিবর্তন এল, জাহিদ, আমি তোমার ভালর জন্যেই বলছিলাম, দুরদানা বেগমের সঙ্গে তোমার মেলামেশা ঠিক হচ্ছে না । কথাটা শুনে চটে উঠলাম, হান্নান, হঠাৎ করে আমার ভাল-মন্দ নিয়ে তুমি এমন আগ্রহী হয়ে উঠলে কেন? সে বলল, আহা ভাই চটো কেন? দুরদানা বেগম একটা বিপজ্জনক মহিলা। সে প্যান্ট-শার্ট পরে, গলায় মেশিনগানের বুলেটের হার ঝোলায়, পকেটে এই এ্যাত্তবড় চাকু রাখে, ব্যাটাছেলেদের কাঁধে হাত দিয়ে কথা বলে, ভুস ভুস ধোয়া ছেড়ে সিগারেট খায়, আর সাইকেলে চড়ে যেখানে-সেখানে চলে যায়। বন্ধু হিসেবে বলছি, এই রকম মেয়েছেলের সঙ্গে চলাফেরা করলে তোমার নামে কলঙ্ক রটে যাবে। তার অনেক খবর আমি রাখি।

তবে একটা কথা তোমাকে বলি, দুরদানা সত্যিকার মেয়েছেলে কি না আমার সন্দেহ আছে। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল দুরদানাকে গিয়ে ডেকে আনি এবং বলি, দুরদানা, তোমার ছুরিখানা মওলানা হান্নানের থলথলে হুঁড়িটার মধ্যে ঢুকিয়ে দাও। সেটি যখন আপাতত সম্ভব হচ্ছে না হান্নানের সঙ্গে রসিকতা করার ইচ্ছেটাই আমার প্রবল হয়ে উঠল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মওলানা, দুরদানা যে মেয়ে না, কি করে তোমার এ সন্দেহ জন্মাল? হান্নান কানে গোঁজা আতর মাখানো তুলোর টুকরোটি বের করে নিয়ে আমার নাকে চেপে ধরল। তারপর বলল, শুঁকে দেখো, গন্ধ কেমন। উৎকট বোটকা গন্ধে আমার কাশি এসে গেল।সেদিকে খেয়াল না করেই বলল, মেয়ে মানুষের হওয়া উচিত এই আতরের গন্ধের মতো এবং আরো হওয়া উচিত মাখনের মতো তুলতুলে নরম ।

যে মেয়েমানুষ প্যান্ট-শার্ট পরে, সিগারেট খায়, ব্যাটাছেলের কাঁধে হাত দিয়ে চলাফেরা করে, যখন-তখন সাইকেলে চড়ে জায়গা-অজায়গায় যাওয়া-আসা করে, তার মধ্যে মেয়েমানুষের কি থাকে? আমার কথাগুলো তুমি একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখো। আমি বললাম, মওলানা আতরের ঘ্রাণের মতো, মাখনের মতো তুলতুলে মেয়ে মানুষের কথা তুমি এবাদত করার সময় চিন্তা করতে থাক, আল্লাহ মেহেরবান, মিলিয়েও দিতে পারেন। আমি চলোম। রাগে-ক্ষোভে হান্নানের ছাতিটা দশ হাত দূরে ছুঁড়ে দিয়ে আমি চলে এসেছিলাম।হান্নান মওলানার কবল থেকে রেহাই পেয়ে আমি তো হোস্টেলে এলাম। কিন্তু তারপর থেকে আমার মনে একটা চিন্তা জন্ম নিল। মওলানার জগৎ বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, বাসা এবং নিউমার্কেটের কাঁচাবাজার।

এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ দুরদানার সমস্ত সংবাদ তার নখদর্পণে। আমি দুপায়ে সমস্ত ঢাকা শহর চষে বেড়াচ্ছি কিন্তু দুরদানার বিষয়ে কোনো কিছু জানিনে। নিজের সম্পর্কে একটা ধারণা ছিল। সেটা ভেঙে গেল । নিজের ওপর চটে গেলাম। সেদিন দুপুরে খাওয়ার পর সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। কখন রাজ্যের ঘুম এসে আমার সমস্ত চেতনা আচ্ছন্ন করে ফেলল, টেরই পাইনি। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে একটা বিদঘুঁটে স্বপ্ন দেখলাম। আমি একটা মোটরযানের ওপর চড়েছি। গাড়ি, ট্রাক, পিকআপ, এমনকি জিপের সঙ্গেও যানবাহনটির তুলনা চলে না। বাইরে থেকে দেখলে অনেকটা মিলিটারির ট্যাঙ্কের মতো দেখায়।

কিন্তু ভেতরের আসন ইত্যাদি সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম। এই যন্ত্রযান তীব্রবেগে সামনের দিকে ছুটে যাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, শহরের বাঁধানো রাজপথ দিয়ে যানটা চলছে না। ঘরবাড়ি ইলেকট্রিক পোস্ট সবকিছু তছনছ করে অত্যন্ত মসৃণ গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর একজন মহিলা ডান হাতে স্টিয়ারিং হুইল ঘোরাচ্ছে এবং বাম হাতে সিগারেট টানছে। ভদ্রমহিলার চেহারা ভাল করে চোখে পড়ছে না। আমি শুধু তার মুখের একটা অংশ দেখতে পাচ্ছি। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ঘুম ভেঙে গেল। জেগে ওঠার পরও অনেকক্ষণ পর্যন্ত ইঞ্জিনের ভন ভন শব্দ আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। ক্রমাগত নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলাম, এরকম একটা উদ্ভট স্বপ্ন দেখলাম কেন!

দুদিন বাদে হুমাযুন শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে আমাকে পাকড়াও করে বলল, জাহিদ ভাই, আপনার সঙ্গে কথা আছে। আমি বললাম, বলে ফেল। হুমায়ুন বলল, আপনি চা-টা শেষ করুন, এখানে বলা যাবে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ভাল, না খারাপ কথা। হুমায়ুন বলল, সে আপনি পরে বিবেচনা করবেন। তারপর সে আমাকে রমনা রেসকোর্সের এক কোণায় নিয়ে গেল। হাজি শাহবাজের মসজিদের উত্তর দিকের ঝাঁকড়া বিলেতি গাব গাছটার গোড়ায় গিয়ে পা ছড়িয়ে বসল। আমাকেও বলল, জাহিদ ভাই, বসুন। তার কথামতো আমিও বসে পড়লাম। ভেবে পাচ্ছিলাম না, হুমায়ুনের এমন কি গোপন কথা থাকতে পারে বলার জন্যে এতদূরে এই নির্জন গাছতলায় টেনে নিয়ে আসার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

হুমায়ুন বলল, আমাকে একটা স্টার সিগারেট দেন। প্যাকেট খুলে একটা নিজে ধরালাম, আরেকটা ওকে ধরিয়ে দিলাম। হুমায়ুন সিগারেটে লম্বা টান দিল, তারপর নাক-মুখ দিয়ে ধোয়া ছেড়ে বলল, জাহিদ ভাই, আপনাকে একটা ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে দেয়ার জন্যে এই এতদূরে নিয়ে এসেছি। আমি বললাম, আমি কি তোমার কোনো ক্ষতি করেছি? হুমায়ুন বলল, আপনি সবসময় আমার উপকারই করেছেন। কিন্তু আপনি নিজের ক্ষতি করতে যাচ্ছেন। আমি একটুখানি চমকে গিয়ে বললাম, আমি নিজের ক্ষতি করতে যাচ্ছি! কিভাবে? হুমায়ুন বলল, দুরদানার সঙ্গে আপনি ইদানীং খুব ঘোরাঘুরি করছেন, কাজটা ভাল হচ্ছে না। আমি বললাম, বুঝিয়ে বলল, কেন ভাল হচ্ছে না। হুমায়ুন বলল, মহিলা অসম্ভব রকম ড্যাঞ্জারাস। আমি বললাম, ড্যাঞ্জারাস মহিলাদের আলাদা আকর্ষণ আছে, সেকথা চিন্তা করে দেখেছ?

আপনি রসিকতা করে উড়িয়ে দিতে চাইছেন, কিন্তু জিনিসটা খেলা নয়, তার স্বরে একটা চাপা উত্তেজনার আভাস। আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে মনের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করলাম। হুমায়ুনের মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। সে বলতে থাকল, জানেন, আমরা আপনাকে কি রকম শ্রদ্ধা করি, আপনাকে এমন কাজ করতে দিতে পারিনে, যাতে সে শ্রদ্ধার ভাবটি চলে যায়। একটুখানি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। হুমায়ুন কি বলতে চাইছে, সেটাই আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব হচ্ছিল না। আমি বললাম, তোমরা শ্রদ্ধা করো, ঘৃণা করো, সে তোমাদের ব্যাপার। আমি তোমাকে বলিনি যে আমাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। আর যদি শ্রদ্ধাই করো, তোমাকে খুলে বলতে হবে, কি কারণে সেটা চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

হুমায়ুন বলল, আপনি দুরদানার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবেন না। আমি বললাম, কেন রাখব না, সেটা বুঝিয়ে বলতে হবে। তোমার সঙ্গে ওই মহিলার হৃদয়ঘটিত কোনো ব্যাপার আছে? হুমায়ুন থু করে একদলা থুথু ফেলল, আমাকে কি এতই বাজে লোক মনে করেন যে, ওই মহিলার সঙ্গে হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক তৈরি করব! তার সবটাইতো শরীর, হৃদয় কোথায়? আমি বললাম, মহিলার শরীর মন্দ জিনিস নয়, রোগা ছিপছিপে মহিলাকে নিয়ে ঘর করে আসছ, শরীরের মাহাত্ম বোঝার সুযোগ পাও নি, তাই এ কথা বলছ।আমার কথা শুনে হুমায়ুনের মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। সে ঘেরঅলা পাঞ্জাবির পকেট হাতিয়ে একটা পিস্তল বের করে আনল। আমাকে বলল, ধরে দেখেন। দেখলাম এই মারণাস্ত্রটির পিছল শীতল শরীর।

সে আমারই সামনে যন্ত্রটি খুলে ছয়টি ছুঁচোলো গুলি দেখাল। তারপর ট্রিগারে হাত দিয়ে বলল, জানেন, এইখানে একবার চাপ দিলে একটা গুলি বেরিয়ে আসবে এবং একটা গুলিই একজন মানুষকে খুন করার পক্ষে যথেষ্ট। আমার হাসি পেয়ে গেল। হুমায়ুন পিস্তল দেখিয়ে দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদককে কবিতা ছাপতে বাধ্য করেছে। সেই টেকনিকটা আমার ওপর প্রয়োগ করতে এসেছে। হুমায়ুন বলল, তাহলে জাহিদ ভাই আপনার সঙ্গে ফাইনাল কথা বলতে চাই। আমি বললাম, বলে ফেল। সে বলল, দুরদানার সঙ্গে মেশামেশি বন্ধ করতে হবে। আমি বললাম, একই কথা বার বার বলছ, আমি যদি তোমার প্রস্তাবে রাজি না হই, কি করবে?

সে পিস্তলটা আঁকড়ে ধরে বলল, যদি কথা না রাখেন গুলি করে দেব। আমি বললাম, করে দাও। আমি জামার বোতাম খুলে বুকটা উন্মুক্ত করে দিলাম। সে ট্রিগারে হাত দিয়ে পিস্তলটা তাক করে রেখেছে, কিন্তু তার হাত কাঁপছে। সে বলল, রাজি হয়ে যান, নইলে ট্রিগার টিপে দিচ্ছি। আমার খুব রাগ হলো, দুঃখ হলো। জোরের সঙ্গে বললাম, আমি ভয় পেতে ঘৃণা করি। তুমি ট্রিগার টিপে দাও। তার সারা শরীরে একটা খিচুনি দেখা দিল এবং পিস্তলটা হাত থেকে পড়ে গেল। হুমায়ুন আওয়াজ করে বাচ্চা ছেলের মতো কাঁদতে আরম্ভ করল। আমি হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কাঁদছ কেন? হুমায়ুন বলল, অন্তত আপনি ভয়তো পাবেন। আমি বললাম, ওহ্ তাই বলো।

 

Read more

অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী পর্ব:৩ আহমদ ছফা

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *