‘আমাকে দেখে কি খুব অভাবী লােক বলে মনে হচ্ছে? ‘তােমাদের দেশের সবাই তােমার মতাে? ‘হ্যা। এখন দয়া করে একটু দেখে এস বৃষ্টি হচ্ছে কি না।
বললাম তাে, হচ্ছে না।’ ‘আমি শুনতে পাচ্ছি, তুমি পাচ্ছ না? দয়া করে একটু দেখে এস না! বারান্দায় যেতে তােমার খুব কি কষ্ট হবে?
‘না, হবে না।’
নার্স বারান্দায় গেল না, এক জন ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে এল। ডাক্তার রুগীর প্রেসার মাপলেন, গায়ের তাপ দেখলেন এবং কড়া সিডেটিভ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন।
লােকাটকে এই বসার ঘরে ঠিক মানাচ্ছে না। রােগা ধরনের অভাবী টাইপের এক জন মানুষ। চোখে মােটা কাচের চশমা। স্যাণ্ডেল ঘরের বাইরে খুলে রেখে এসেছে। সেই স্যাণ্ডেলগুলিরও জরাজীর্ণ অবস্থা। অন্য কেউ হলে ফেলে দিত। এই পােক ফেলতে পারছে না।
এই ঘরে যে লােকটিকে মানাচ্ছে না, তা সে নিজেও বুঝতে পারছে। বসে আছে জড়ােসড়াে হয়ে। হাত দু’টি অবসন্ন ভঙ্গিতে কোলের ওপর ফেলে রাখা। গায়ে হলুদ রঙের একটা চাদর। কড়া হলুদ। এই নীল-নীল বসার ঘরে হলুদ রঙ বড় চোখে লাগে। লােকটির বয়স পঞ্চাশের মতাে হবে কিংবা তার চেয়ে কমও হতে পারে। অভাবী লােকদের অল্প বয়সেই চেহারা নষ্ট হয়ে যায়।
অপালা পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। লােকটি এক বার শুধু তাকিয়েছে। তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিয়েছে। অথচ অপলা এমন একটি মেয়ে, যার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। অপালা বলল, আপনি কি বাবার কাছে এসেছেন?
লোেকটি হা-সূচক মাথা নাড়ল। কিন্তু অপালার দিকে তাকাল না। মাথা ঘুরিয়ে জলরঙা ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
‘বাবা তাে দেশে নেই। সপ্তাহখানেক পরে ফিরবেন। আপনি বরং এক সপ্তাহ পরে আসুন।
‘আচ্ছা।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
লােকটি কিন্তু উঠে দাঁড়াল না, বসেই রইল। এইবার সে তাকিয়ে আছে জানালার পর্দার দিকে। যেন পৃথিবীর সমস্ত রহস্য ও সৌন্দর্য জানালার ঐ পর্দাটিতে। অপালা বলল, আপনি কি কিছু বলবেন?
‘তােমার মা আছেন?
অদ্ভুত ব্যাপার তাে, এই লােক তাকে তুমি করে বলছে। অপালাকে তুমি করে বলার মতাে বাচ্চা এখনাে নিশ্চয়ই দেখাচ্ছে না। তার বয়স একুশ। একুশ বছরের একটি মেয়েকে শাড়ি পরলে অনেকখানি বড় দেখায়। কিংবা কে জানে, লােকটি
হয়তাে ভালাে করে তাকে লক্ষই করে নি।
‘আমার মাও দেশের বাইরে। চিকিৎসার জন্যে গিয়েছেন। লােকটি ঠিক আগের মতাে ভঙ্গিতে পর্দার দিকে তাকিয়ে বসে রইল।
আপনার যদি জরুরি কিছু বলার থাকে, আমাকে বলতে পারেন।
লােকটি হলুদ চাদরের ভেতর থেকে একটা কার্ড বের করল। বিড়বিড় করে বলল, আমার বড় মেয়ের বিয়ে ১৭ই পৌষ।
অপালা হাত বাড়িয়ে কার্ডটি নিল। ‘বাবা এলেই আমি তাঁকে দিয়ে দেব। তিনি কি আপনাকে চেনেন? ‘হ্যা। আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন।
অপালা হাসিমুখে বলল, ‘বাবার মন ভালাে থাকলে তিনি সাহায্য-টাহায্য করেন। তাঁর কাছে যেতে হয় মুড বুঝে।
লােকটি উঠে দাঁড়াল। ঘর থেকে বেরােবার সময় হঠাৎ বলে বসল, ছেলেটা ভালাে পেয়েছি। ব্যাঙ্কে কাজ করে। অগ্রণী ব্যাঙ্ক।
‘বাহ্, খুব ভালাে। ‘অফিসার্স গ্রেড। কোয়ার্টার পেয়েছে।
অপালার বড় মায়া লাগল। সে নিতান্তই অপরিচিত একটি মেয়ে। অথচ এই লােকটি কত আগ্রহ করে তার সৌভাগ্যের কথা বলছে। নিশ্চয়ই মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে কিছু সাহায্যের জন্যে এসেছিল। লােকটি নিচু গলায় বলল, “যাই।’
অপালা তার পিছনে-পিছনে বারান্দা পর্যন্ত এল। গেটের বাইরে বার-তের বছরের একটি ফুটফুটে মেয়ে। লােকটি গেট খুলে বেরােতেই এসে তার হাত ধরল। এই মেয়েটি নিশ্চয়ই লােকটির সঙ্গে এসেছে। ভেতরে ঢোকে নি। অপালা ছােট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। মেয়েটি এলেই পারত। বিশাল বাড়ি দেখে হয়তাে ভরসা পায় নি। আগ্রহ এবং কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করেছে বাইরে। ভারি মিষ্টি চেহারা মেয়েটির! লােকটি কেমন—মেয়েটিকে গেটের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
Read more