ভদ্রলােকের কথার মাঝখানেই অপালা বলল, ‘এতে কি মালিকপক্ষের দোষই স্বীকার করে নেয়া হচ্ছে না? সবাই কি তাহলে ভাববে না, এটা আমরাই করিয়েছি?
আসগর সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আমরা যে ধােয়া তুলসীপাতা, তাও কিন্তু মিস অপালা।
ছােট হলেও আমাদের একটা ভূমিকা আছে।
‘অ-আচ্ছা, আছে তাহলে। ‘আপনার সেফটির ব্যাপারটাও দেখতে হয়। আপনার নিরাপত্তা হচ্ছে আমাদের টপ প্রায়ােরিটি।
‘আমার নিরাপত্তার ব্যাপারটা আসছে কেন?
প্রতিশােধের ব্যাপার আর কি। ধরুন, একটা হাতবােমা এসে ফেলে দিল, অ্যাসিড ছুঁড়ে মারল……’
অপালা চুপ করে রইল। আসগর সাহেব বললেন, ‘আগেও এ-রকম ঝামেলা হয়েছে। টাকাপয়সা দিয়ে মিটমাট করা হয়েছে। অবশ্যি এত বড় স্কেলে ঝামেলা হয়। নি। দিস টা.. ।
‘আপানারা যা ভালাে মনে করছেন, তা করাই ভালাে।
‘আপনাকে একটা অনুরােধ, এক-একা বাইরে যাবেন না। সবচেয়ে ভালাে হয়, প্রয়ােজন ছাড়া ঘর থেকে না-বেরুলে।
‘আমি এমনিতেই ঘর থেকে বের হই না।
‘ডি.সি. সাউথকে আমি অবশ্যি রিকোয়েস্ট করেছি কয়েক দিনের জন্যে বাড়ির সামনে একটা ফিক্সড সেন্ট্রির ব্যবস্থা করতে। কথায় আছে না, প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর? আজ তাহলে উঠি। আপনাকে কষ্ট দিলাম।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
রাতে অপালা অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখল। যেন বিকেল হয়েছে। সূর্য ডুবে যাবার আগের মায়াবী আলাে চারদিকে। সে একা-একা বাগানে হাঁটছে। হঠাৎ কে যেন ডাকল— এই…… এই। অপালা চমকে তাকাল—কেউ তাে কোথাও নেই। কে ডাকল! অপালা ভয়-পাওয়া গলায় বলল, কে ডাকছে আমাকে?
‘আমি। আমি ডাকছি আপনাকে।
অপালা দেখল, গেটের বাইরে সেই এগার-বার বছরের মেয়েটি দাঁড়িয়ে, যে তার বাবার সঙ্গে ঘরে ঢােকে নি। একা-একা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।
নাম কি তােমার? মেয়েটি নাম বলল না। খুব হাসতে লাগল।
ঐ দিন তুমি ঘরে ঢোক নি কেন? কেন তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলে?
এই প্রশ্নেরও কোনাে জবাব দিল না মেয়েটি। অপালার বুক কাঁপতে লাগল, কারণ এই মেয়েটিকে তার চেনা-চেনা লাগছে। খুব চেনা—অসম্ভব চেনা। কিন্তু তবুও অচেনা। | এ কেমন স্বপ্ন। ঘুম ভাঙার পরও অপালার হাত-পা কাঁপছে। পানির পিপাসায় বুক
শুকিয়ে কাঠ। তার খুব ইচ্ছে করছে চেচিয়ে কাঁদে।
ঐ মেয়েটিকে সে কেন স্বপ্নে দেখল? মানুষের অবচেতন মনে কত রহস্যই-না খেলা করে। কোনাে দিন মানুষ তা জানতে পারে না। অপালার বড় জানতে ইচ্ছে করে।
হেলেনা ভিজিটার্স রুমে ঢুকে একটু অবাক হলেন। | ফখরুদ্দিন সাহেব বসে আছেন। তাঁর হাতে জ্বলন্ত চুরুট। হেলেনা অবশ্যি তাঁর বিস্ময় গােপন করলেন। সহজ স্বরে বললেন, ‘কেমন আছ?”
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
খুব ভালাে।’ ‘চুরুট টানছ? খােকিং এখানে নিষিদ্ধ। দেয়ালে লেখা চোখে পড়ে নি?
পড়েছে। দেয়ালে লেখা “ধূমপান না করার জন্যে অনুরােধ করছি”। আমি অনুরােধটা রাখলাম না। হা হা হা।
‘তােমার কি শরীর খারাপ? ‘না, শরীর ভালােই আছে। ‘কোথায় ডুব দিয়েছিলে? ‘আশেপাশে ছিলাম। ভােমরা অবস্থা কি? ‘ভালাে।’
কী-রকম ভালাে? ‘বেশ ভালাে। অপারেশনটা লাগবে না। ইচ্ছা করলে দেশে ফিরে যেতে পারি।
ইচ্ছা করছে?
হেলেনা জবাব দিলেন না। ফখরুদ্দিন সাহেব বললেন, এই মুহূর্তে দেশে ফিরতে পারছি না। এখানে আমার কিছু কাজ আছে। কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
‘ক’দিন লাগবে কাজ শেষ হতে?
দিন দশেক লাগবে। “কি কাজ?
ফখরুদ্দিন সাহেব এ-প্রশ্নের জবাব দিলেন না। ডাক্তাররা তাঁর শরীরটা খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে চায়। দিন দশেক সময় এই কারণেই তারা চাচ্ছে। হেলেনাকে তা বলার তিনি কোনাে প্রয়ােজন বােধ করছেন না। আজ যে হাসপাতাল থেকে বের হয়েছেন, সেও বহু কষ্টে। বলে এসেছেন দু’ ঘন্টার মধ্যে ফিরবেন। তাও সম্ভব হবে কি না কে জানে? দু ঘন্টার এক ঘন্টা তাে এখনই শেষ।
‘হেলেনা। ‘বল।’ ‘চল, একটু হেঁটে আসি। ‘কোথায় হাঁটবে?’
‘এই বাগানেই হাঁটব। বেশি দূর যাব না। তােমার হাঁটহাঁটিতে কোনাে বাধা নেই তাে?’
‘না, নেই। ‘গুড। গায়ে ওভারকোট জাতীয় কিছু-একটা চাপিয়ে এস।”
ছবির মত সুন্দর বাগান। এত সুন্দর যে কৃত্রিম মনে হয়। বড় বেশি সাজানাে।
ফখরুদ্দিন সাহেব মাঝে-মাঝে কাশছেন, কিন্তু কোনাে কথা বলছেন না। হেলেনা হঠাৎ বললেন, ‘তুমি যে খুব অসুস্থ, একটা হাসপাতালে আছ, এই খবর কিন্তু আমি জানি।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
‘জানলে তাে ভালােই। ‘অন্যের কাছ থেকে জানতে হল।
ফখরুদ্দিন সাহেবের চুরুট নিভে গিয়েছিল; অনেক কায়দা করে সেটা ধরাতে হল। তিনি কিছু বললেন না।
‘আমাকে খবরটা না-জানানাের পিছনে তােমার যুক্তিগুলি কি, একটু বল তাে শুনি।
‘কোনাে যুক্তি নেই। এস, কোথাও একটু বসা যাক। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে।’
তাঁরা বসলেন। হেলেনা মৃদু স্বরে বললেন, ‘এখনাে কি তুমি বিশ্বাস কর, টাকা দিয়ে সব পাওয়া যায়?
‘হা, করি।’ ‘মানুষ হিসেবে তুমি কি সুখী?
‘হ্য, সুখী। তােমার মতাে বানানাে দুঃখ-কষ্ট আমার নেই। আমার বুদ্ধিবৃত্তি নিম্নস্তরের। আমার মতাে মানুষের কোনাে কাল্পনিক দুঃখ-কষ্ট থাকে না। ঐ সব থাকে খুব উচ্চমার্গের লােকদের।’
Read more