আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২২)

‘আমার কিন্তু ধারণা, তুমি খুব দুঃখী মানুষ। “তাই নাকি? ভেরি ইন্টারেস্টিং। ‘তুমি যে খুব দুঃখী, এটা তুমি নিজেও জান। 

ফখরুদ্দিন সাহেব চুরুটটা ছুঁড়ে ফেললেন। ঢালু জায়গা পেয়ে চুরুটটা গড়াতে গড়াতে নিচে নামছে। সেই দিকে তাকিয়ে বিদ্যুতের মতাে তাঁর মাথায় এল, মানুষের জীবনও কি এ-রকম গড়িয়ে যাওয়া নয়? আকাশ জোড়া মেঘকেউ কিছু দূর গিয়েই আটকে যায়, আবার কেউ যেতেই থাকে। এমন কিছু উচ্চশ্রেণীর দার্শনিক চিন্তা নয়, তবু ফখরুদ্দিন সাহেবের বেশ ভালাে লাগছে। তিনি পকেট থেকে আরেকটি চুরুট বের করে গড়িয়ে দিলেন। হেলেনা বললেন, কি করছ? 

এক ধরনের খেলা, তুমি বুঝবে না। ‘না-বােঝারই কথা। তােমার বেশির ভাগ কাজকর্মই আমি বুঝি না। ‘তুমি কি করে বুঝবে বল, আমি নিজেই বুঝি না। 

বলতে-বলতে ফখরুদ্দিন সাহেব খুব হাসলেন। হাসতে-হাসতে তাঁর চোখে পানি এসে গেল। তিনি পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছলেন। হেলেনা বললেন, তােমার অসুখটা কী? | ‘জানি না, কি। ডাক্তাররা জানার চেষ্টা করছে। কেন জানি মনে হচ্ছে, ডাক্তাররা খুঁজে-খুঁজে একটা খারাপ অসুখই বের করবে। রাজকীয় কোনাে অসুখডায়রিয়া বা আমাশার মতাে অসুখে আমাকে মানাবে না; এইসব হচ্ছে ভিখিরিদের অসুখ। আমি কি ভিখিরি? হা হা হা। | লণ্ডনের আকাশ আজ ঘন নীল। বাতাস মধুর। রােদের রঙ কাঁচা সােনার মতাে। অদ্ভুত সুন্দর একটি দিন। ফখরুদ্দিন সাহেব এমন চমৎকার একটি দিনেও খানিকটা 

বিষন্ন হলেন। সুনীল আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। হেলেনা বললেন, ‘আজ তুমি অপালার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলল। 

‘কেন বল তাে? 

‘গুর বােধহয় খুব মন-খারাপ। কী-একটা দুঃস্বপ্ন দেখে খুব কেঁদেছে। আমাকে বলতে-বলতেও কাঁদল।’ 

কী দুঃস্বপ্ন? ‘একটা ছােট্ট মেয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে, এইসব কি হাবিজাবি। 

‘দুঃস্বপ্নটা কী, তা তাে বুঝলাম না। রাক্ষস-খােক্কস স্বপ্নে দেখলেও না-হয় কথা ছিল। ছােট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাে কী হয়েছে?” 

 হেলেনা ক্লান্ত গলায় বললেন, মাঝে-মাঝে সুন্দর-সুন্দর স্বপ্ন দেখেও মানুষ ভয় পায়। তুমি ওর সঙ্গে কথা বলবে। 

‘আমি এক্ষুণি টেলিফোন করছি।” ‘ফখরুদ্দিন সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। 

ফিরােজের দুপুরে ঘুমানাের অভ্যেস নেই। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

তার ধারণা গৃহী টাইপের মহিলা এবং ডায়াবেটিক প্রৌঢ়াই নিয়ম করে দুপুরে ঘুমায়। এক জন ইয়াংম্যান, যার রক্তে উত্তেজনা টলমল করছে, তার দুপুরে ঘুমানাের প্রশ্নই ওঠে না। ফিরােজের ধারণা, সে নিজে এক জন ইয়াংম্যান এবং তার রক্তে উত্তেজনা টলমল করছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এইসব ধারণা থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক দিন ধরে তাকে নিয়মিত ঘুমুতে দেখা যাচ্ছে। মশারি খাটিয়ে বেশ একটা আয়ােজনের ঘুম। 

মশারি খাটানাের কারণ হচ্ছে, এ-বাড়ির মশারা দিন এবং রাত্রির পার্থক্য বােঝে না। এরা দিনে বেশি কামড়ায়। | দুপুরে ঘুমানাের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, ঘুম ভাঙলেই বিচিত্র কারণে মন সাঁতসেঁতে হয়ে থাকে। কোনাে কিছুই ভালাে লাগে না। মন-খারাপ ভাব কিছুতেই কাটতে চায় না। ফিরােজের ধারণা, বেশির ভাগ যুবক আত্মহত্যা করে দুপুরে ঘুমের পর। একটি উদাহরণ তার কাছে আছে। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সমু, এক দুপুরে লম্বা ঘুম দিয়ে উঠল। চায়ের দোকানে চা খেয়ে এসে দীর্ঘ একটি চিঠি লিখল। সেই চিঠিতে কোনাে সম্বােধন নেই, কাজেই বােঝা গেল না কাকে লেখা চিঠি শেষ করে তাদের তিনতলার ছাদ থেকে রাস্তায় লাফিয়ে পড়ল। 

দুপুরবেলায় ঘুমুলে ফিরােজেরও এ-রকম নাটকীয় কিছু করতে ইচ্ছে করে। এই মুহুর্তেই করছে। সে বারান্দায় কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হাঁটল, তারপর ঠিক করল অপালা মেয়েটির সঙ্গে এক কাপ চা খাবে। সে-বাড়িতে যাবার জন্যে একটা অজুহাত ভেবে-চিন্তে বের করতে হবে। সেটা যে এখনই বের করতে হবে, এমন কোনাে কথা নেই। পথে যেতে-যেতে ভাবলেই হবে।

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

এই মেয়েটি তাকে এত ভােগাচ্ছে কেন? রােজ খানিকক্ষণের জন্যে হলেও এর কথা মনে পড়ে। এটা মােটেও ভালাে লক্ষণ নয়। আসল কথা হল, কেন বারবার মনে পড়ছে? | মেয়েটি রূপবতী। এটা এমন কোনাে ব্যাপার নয়। এ-শহরে প্রচুর রূপবতী মেয়ে আছে। এদের কারাে-কারাে সঙ্গে তার পরিচয়ও আছে। কই, ওদের কথা তাে মনে পড়ে না। 

মেয়েটির মধ্যে রহস্য আছে। সে তাে সব মেয়ের মধ্যেই আছে। মেয়ে মানেই তাে রহস্য। আনসলভড় মিস্ট্রি। | মেয়েটি অন্য কোনাে মেয়ের মতাে নয়। এটা কোনাে কথা হল না। কোনাে মেয়েই অন্য কোনাে মেয়ের মতো নয়। প্রতিটি মেয়েই আলাদা। 

ফ্রয়েডীয় তাত্ত্বিকদের মতাে চিন্তা করা যাক। এই মেয়েটির চেহারা বা আচার আচরণে কোথাও ফিরােজের মা’র সঙ্গে মিল আছে। মায়ের সঙ্গে মিল আছে এই জাতীয় মেয়ের প্রতি পুরুষেরা প্রচণ্ড আকর্ষণ বােধ করে। বােগাস কথা! ফিরােজের মা ফিরােজের জন্মের সময় মারা যান। সেই মহিলার কোনাে স্মৃতি ফিরােজের মনে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। 

মেয়েটির প্রচুর টাকাপয়সা-এটা কি একটা কারণ হতে পারে? না, হতে পারে না। টাকার লোভ ফিরােজের আছে, তবে তা নিশ্চয়ই খুব প্রবল নয়। প্রবল হলে সিনেমার কাজ ছেড়ে দিত না। মােটামুটি ভালাে টাকাপয়সার একটা সম্ভাবনা ঐ লাইনে ছিল। 

অপালাদের বাড়ির সামনে এক জন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। এর মানে কী? মেয়েটির বাবা কি মন্ত্রী-ফন্ত্রী হয়ে গেলেন নাকি? পয়সাওয়ালা লােকজন হঠাৎ করে মন্ত্রী হয়ে যান। ইনিও হয়তাে হয়েছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী কিংবা পাটমন্ত্রী। আচ্ছা, দেশে পাটমন্ত্রী আছে, চা-মন্ত্রী নেই কেন? 

রপ্তানিযােগ্য প্রতিটি আইটেমের ওপর এক জন করে মন্ত্রী থাকলে ভালাে হত। চামড়া-মন্ত্রী, রেডিমেড গার্মেন্ট-মন্ত্রী, চিংড়ি-মন্ত্রী। সবচেয়ে ভালাে হয় এক জন ব্যাঙ-মন্ত্রী থাকলে। ব্যাঙও তাে আজকাল রপ্তানি হচ্ছে। তবে এই দপ্তর হয়তাে কেউ নিতে চাইবেন না। কে আর শখ করে ব্যাঙ-মন্ত্রী হবে? 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

অপালাদের গেটে বিশাল এক তালা, এ-ও রহস্যজনক। দিনে-দুপুরে গেটে তালা থাকবে কেন? দারােয়ান ব্যাটা টুলে বসে আছে। ফিরােজকে দেখেও সে বসে রইল। এটাই স্বাভাবিক। সে যদি চট করে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে বসত, তাহলেই অস্বাভাবিক হত। 

এই যে দারােয়ান, গেটটা খােল।’ 

দারােয়ান তাকে ভালােই চেনে। ফিরােজ বেশ কিছুদিন এ-বাড়িতে কাজ করেছে, তাকে না-চেনার কোনােই কারণ নেই। দেখা হয়েছে দু’ বেলা। তবু এই ব্যাটা এমন করে তাকাচ্ছে, যেন ফিরােজ খুনের পলাতক আসামী—এই বাড়িতে আশ্রয়ের খোঁজে এসেছে। 

‘আফনে কার কাছে যাইবেন? 

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *