ও হ্যা, তাই তাে। কথার কথা হিসেবে বলেছিলাম, সত্যি-সত্যি চলে আসবেন ভাবি নি। আপনি কি রােমান হলিডে নামের কোনাে ছবি দেখেছেন?
‘না! কেন? যে-ঘটনাটা আমার জীবনে ঘটছে, তার সঙ্গে ঐ ছবিটার অদ্ভুত মিল আছে।
ঐ ছবিতে একজন রানী এক দিন রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন, সারাটা দিন কাটান এক জন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। সন্ধ্যাবেলা আবার রাজপ্রাসাদে ফিরে যান।
‘আপনি এমনভাবে কথা বলছেন কেন?
আগেই তাে বলেছি, আমি অসুস্থ, আমার মাথা এলােমেলাে হয়ে আছে। যা মনে আসছে বলে ফেলছি। আপনি চলে যাবার আগে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইব। সাবধানে উঠবেন, সিঁড়িটা পিছল।
ফিরােজ অবাক হয়ে দেখল, মেয়েটা কী সুন্দর গুটগুট করে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। তার মনে হল, মেয়েটির মাথাও খানিকটা এলােমেলাে। কিংবা লােকজনের সঙ্গে মিশে তার অভ্যেস নেই। সাধারণ একটি মেয়ে কখনাে কোনাে অবস্থাতেই এমন পরিচয়ে তার ঘরে আসবে না। ব্যাপারটির অস্বাভাবিকতা মেয়েটির চোখেই পড়ছে না, কিংবা কে জানে হয়তাে এটাই স্বাভাবিক। আচ্ছা, এটা স্বপ্নদৃশ্য নয় তাে? সমস্ত ব্যাপারটা হয়তাে স্বপ্নে ঘটে যাচ্ছে। না, তা নয়। ফিরােজ সেন্টের গন্ধ পাচ্ছে। ঘন নীল রঙের আকাশ দেখতে পাচ্ছে। স্বপ্ন হয় গন্ধ ও বর্ণহীন। | অপালা কৌতূহলী হয়ে দেখছে। দেখার মতাে কিছু নেই। অপরিচ্ছন্ন নােংরা একটি ঘর। অন্য দিন এর চেয়ে পরিষ্কার থাকে। অসুস্থ থাকার কারণে কোনাে কিছুতেই হাত দেয়া হয় নি। এখনাে মশারি খাটানাে। মেঝেতে সিগারেটের টুকরাে। ময়লা কাপড়। দু’টি শেষনা-হওয়া পেইন্টিং। রঙের টিউব, ব্রাশ। পিরিচে রঙ, চেয়ারেরঙ, মেঝেতে রঙ। জানালার পাশে আধা-খাওয়া চায়ের কাপের দিকে সারি বেঁধে লাল পিপড়ার দল যাচ্ছে। অপালা বলল, ‘আপনি মনে হচ্ছে খুব গােছানাে মানুষ।
ফিরােজ জবাব দিল না। ‘আপনি ড্রেস চেঞ্জ করুন, আমি বারান্দায় দাঁড়াচ্ছি।’
অপালা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। সুখী-সুখী চোখে তাকিয়ে রইল রাস্তার মানুষজনদের দিকে। কত ব্যস্ত হয়েই-না এরা ছুটছে, দেখে মনে হয় এদের কারাের বিন্দুমাত্র অবসর নেই। সবার ভীষণ তাড়া।
ফিরােজ বেরিয়ে এসে বলল, ‘আপনাকে এনে লজ্জাই লাগছে।
অপালা বলল, ‘আমি ভেবেছিলাম আপনার স্ত্রীকে এ-বাড়িতে দেখব। এখনাে বিয়ে হয় নি?
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
হবে তাে শেষ পর্যন্ত? ‘হা, হবে। ‘আপনি বানিয়ে-বানিয়ে এ-সব বলছেন না তাে? ‘বানিয়ে বলব কেন? আমার কী স্বার্থ? ‘তাও তাে ঠিক। আচ্ছা শুনুন, একটা মজার জিনিস দেখলাম আপনার এখানে।
দুটো চড়ুই পাখি চা খাচ্ছে।
‘ওরা আমার পােষা চড়ই। চা খাইয়ে-খাইয়ে পােষ মানিয়েছি। ‘আপনি কেন বানিয়ে-বানিয়ে এত মিথ্যা কথা বলেন?
‘চড় ইগুলাে যদি কথা বলতে পারত, তাহলে এরা বলত যে এটা সত্যি। দুর্ভাগ্যক্রমে এদের কথা আমরা বুঝি না।
বাসা খুঁজে পেতে অনেক সময় লাগল। গলির পর গলি, তস্য গলি। টিনের একটা ঘর। এর আবার নামও আছে-আনন্দকুটির।
ফিরােজ বলল, আমিও কি আসব আপনার সঙ্গে?
“না, আপনি কেন আসবেন? ‘অপেক্ষা করব এখানে? ‘না, আমি নিজেই চলে যাব।’ ‘আমি না-হয় থাকি, আপনাকে রিকশায় তুলে তারপর যাব।’
না। কেউ অপেক্ষা করে থাকলে আমার অস্বস্তি লাগে। ফিরােজ নিজেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। প্রচণ্ড জ্বরের আগমন সে টের পাচ্ছে। চোখ মেলে রাখতে পারছে না, বমি-বমি ভাব হচ্ছে। ফিরােজের ধারণা, অপালা এটা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু সে একটি কথাও বলছে না। সহজ ভদ্রতার দু’টি কথা কি বলা যায় না? সে যদি জিজ্ঞেস করে-আপনার কি খুব খারাপ লাগছে নাকি? তাতে তাে জগৎ-সংসারের কোনাে ক্ষতি হবে না। ফিরােজ বলল, হয়তাে ওরা বাসায় নেই, কোথাও বেড়াতে-টেড়াতে গিয়েছে। আমি দাঁড়াচ্ছি, আপনি খোঁজ নিয়ে আসুন।
অপালা হেসে ফেলল। ফিরােজ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল, আপনি হাসছেন ? এখন বাচ্চাদের পরীক্ষা-টরীক্ষা হয়ে গেছে, এই সময়ই সবাই নানার বাড়িতে বেড়াতে যায়।’
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
যে-বাড়িতে যাচ্ছি, তাদের বড় মেয়েটির বিয়ে, কাজেই ওরা কোথাও যাবে
হয়তাে দল বেঁধে কেনাকাটা করতে গিয়েছে। বড় মেয়ের বিয়েতে দল বেঁধে কেনাকাটা হয়। আমার বড় বােনের বিয়ের সময় দেখেছি। কাজের মেয়েটিকে পর্যন্ত আমরা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছি। ঘর তালাবন্ধ করে গেলাম, ফিরে এসে দেখি চোর সব সাফা করে দিয়েছে।
‘ফিরােজ সাহেব।
‘এখন চলে যান। প্লীজ। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আপনার সঙ্গে তর্ক করতে ভালাে লাগছে
ফিরােজ গেল না। একটু শুধু সরে গেল। তার কেন জানি মনে হচ্ছে অপালা এক্ষুণি বেরিয়ে আসবে। তখন তার সঙ্গে অনেকক্ষণ হাঁটা যাবে। পাশাপাশি সাত পা হাঁটলে সাত পাকে বাঁধা পড়ে। অনেক বেশি পা হাঁটা হয়েছে। আরাে হােক। সে লক্ষ পা হাঁটবে।
আশেপাশে কোনাে চায়ের দোকান নেই যে বসা যায়। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে।
সামান্য জ্বরে শরীর বড় বেশি কাবু হয়েছে। অসুখ-অসুখ একটা গন্ধ বেরুচ্ছে গা থেকে। পেটে আবার পাক খেতে শুরু করেছে। এবার নির্ঘাত বমি হবে। অপালা ঘর থেকে বেরিয়ে দেখবে সে রাস্তায় উবু হয়ে বসে বমি করছে। সে বড় কুৎসিত দৃশ্য। এই দৃশ্য অপালাকে কিছুতেই দেখানাে যায় না। ফিরােজ একটা রিকশায় উঠে পড়ল।
অপালা অনেকক্ষণ হল কড়া নেড়েছে। ভেতর থেকে মিষ্টি গলায় একটি মেয়ে বলল,
অপালা কী বলবে ভেবে পেল না। সে যদি বলে—’আমি অপালা। তাহলে কেউ কিছু বুঝবে না। শুধু ‘আমি’ বলারও কোনাে মানে নেই। সে আবার কড়ানাড়ল। ভেতর থেকে সেই মেয়েটি আবার বলল, ‘কে?’ যেন জবাব না-পেলে দরজা খুলবে না।
Read more