আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৯)

তিনি খুবই অবাক হলেন। এত অবাক হলেন যে হাসির গল্প মনে এল না। তিনি হাসির গল্পের জন্যে আকাশপাতাল হাতড়াতে লাগলেন। অপালা নাশতা শেষ করে অরুণা-বরুণার খোঁজে গেল। অরুণা তাকে বিশেষ পছন্দ করে না, তবে বরুণা তার জন্যে পাগল। আজ দু জনই ছুটে এল। লাফালাফি করতে লাগল।

আকাশ জোড়া মেঘবরুণার স্বভাব হচ্ছে আদর দেখানাের জন্যে পা কামড়ে ধরার ভঙ্গি করা। অপালা যখন বলে—এই, এ-সব কী! তখন তার ফুর্তির সীমা থাকে না। অনেকটা দূরে ছুটে যায়, আবার দৌড়ে এসে কামড়ের ভঙ্গি করে। আজ দু জনই এক খেলা খেলছে। দু’জনের মনেই আনন্দ। 

গােমেজ এসে বলল, ‘আপা, আপনার টেলিফোন।’ গােমজের হাতে এক কাপ কফি। ‘আপা, কফিটা নিন। অন্য রকম করে বানিয়েছি। ‘অন্য রকম মানে? লবণ দিয়েছ নাকি গােমেজ ভাই? ‘খেয়ে দেখেন আপা। 

অপালা কফির কাপ হাতে টেলিফোন ধরতে গেল। টেলিফোন করেছেন মা। তাঁর গলাটা কেমন অদ্ভুত শােনাচ্ছে। যেন খুব সূক্ষ্মভাবে কাঁপছে। 

‘মা, তুই কেমন আছিস?’ ‘আমি ভালাে আছি। আমি খারাপ থাকব কেন? আমার তাে আর হার্টের অসুখ হয় 

‘আজ তাের পরীক্ষা না? ‘হা, বিকেলে। ‘তাের বাবা বলছিল, তুই নাকি পরীক্ষা দিবি না?” 

‘পরীক্ষা দেব না কেন? এত পড়াশােনা শুধু-শুধু করলাম? তবে পরীক্ষাটা খুব খারাপ হবে। 

‘তুই কাল তাের বাবাকে কী বলেছিলি? সে সারা রাত ঘুমুতে পারে নি।  

-মা, সে কী কথা। আমি তাে কিছু বলি নি। কই, বাবাকে দাও তাে, তােমার কাছে আছেন না? 

‘না। টিকিটের জন্যে ছােটাছুটি করছে। টিকিট পাচ্ছেনা। এখন গেছে অ্যারােফ্লটের অফিসে মক্কা হয়ে ঢাকায় যাবে। 

‘তােমাদের এত ব্যস্ত হবার কিছু নেই। আমার কিছু হয় নি। আমি খুব ভালাে আছি।’ 

‘সত্যি ভালাে আছিস? ‘হ্যা, সত্যি ভালাে। মিথ্যা ভালাে আবার কেউ থাকে নাকি? অপালা হেসে ফেলল। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

প্রশ্ন হাতে নিয়ে অপালার জ্বর এসে গেল। সব অচেনা। মনে হচ্ছে অন্য কোনাে সাবজেক্টের প্রশ্ন ভুল করে দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, লিখতে গিয়ে দেখল সে লিখতে পারছে। উত্তরগুলাে বেশ ভালােই হল। রিগ্রেশন মডেলের একটা জটিল অঙ্কও শেষ পর্যন্ত মিলিয়ে ফেলল। কে জানে, হয়তাে এই শেষ পরীক্ষাটাই তার সবচেয়ে ভালাে হয়েছে। 

অনার্সের কঠিন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে। বেশ লাগছে তার। ইচ্ছে করছে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতে। গাড়িতে করে নয়, হেঁটে-হেঁটে। ফিরােজ নামের ঐ ছেলেটিকে সঙ্গে নিলে কেমন হয়? তাকে গিয়ে সে যদি বলে, আপনি আপনার বান্ধবীর কাছে আমাকে নিয়ে চলুন, ঐ মেয়েটিকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। 

হাজি সহেব অবাক হয়ে একটি দৃশ্য দেখলেন। বিশাল একটা নীল রঙের গাড়ি তাঁর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছে। লম্বা, ফর্সা একটা মেয়ে নামছে গাড়ি থেকে। বেশ সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দোতলায় উঠে যাচ্ছে। যেন অনেক বার সে এসেছে। সবকিছু তার খুব ভালাে চেনা। দোতলায় এই মেয়েটি কার কাছে যাচ্ছে? মেয়েটির বয়স এমন যে চট করে তুমি বলা যায় না। আবার তাঁর মতাে একজন বয়স্ক লােকের পক্ষে আপনি করে বলাও মুশকিল। তাঁর বড় মেয়ের বয়স নিশ্চয়ই এর চেয়ে বেশি। হাজি সাহেব ইতস্তুত করে বলেই ফেললেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ? 

অপালা সিঁড়ির মাঝামাঝি থেমে গেল। দু পা নেমে এসে বলল, ‘ফিরােজ বলে। এক জন ভদ্রলােক থাকেন, তাঁর কাছে‘ 

‘উনি তাে হাসপাতালে। 

সে কী, কেন? ‘আকাশপাতাল জ্বর। আমিই হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি।’ ‘কোন হাসপাতাল, কত নম্বর বেড, এইসব বলতে পারবেন? 

‘মুখস্থ বলতে পারব না। আমার কিছু মনে থাকে না। তবে লেখা আছে। আমার সঙ্গে এস, দিচ্ছি। 

অপালা নেমে এল। হাজি সাহেব বললেন, ‘ফিরােজ তােমার কে হয়?’ ‘কিছু হয় না। আমার খুব পরিচিত। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

হাজি সাহেবের ভুরু কুঞ্চিত হল। বেফাঁস কিছু বলে ফেলছিলেন, বহু কষ্টে নিজেকে সামলালেন। মেয়েটাকে ঘরে নিয়ে হাসপাতালের নাম-ঠিকানা দেবার কোনাে আগ্রহ এখন আর অনুভব করছেন না। তবু মুখের ওপর বলা যায় না। তুমি চলে যাও, তােমাকে কিছু দেব না। 

অপালা হাজি সাহেবের পিছনে-পিছনে বসার ঘরে গিয়ে ঢুকল। সেখানে তার জন্যে বড় রকমের একটা বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। হাজি সাহেবের ছােট মেয়ে বিছানার ওপর বসে আছে। তার ছবিই সে ফিরােজের কাছে দেখেছে। মেয়েটি ছবির চেয়েও অনেক সুন্দর। তবে সে বােধহয় নিজের পরিবারের বাইরে কারাে সঙ্গে মিশতে অভ্যস্ত নয়খুব হকচকিয়ে গেছে। একটি কথাও না-বলে চলে যাচ্ছে ভেতরের দিকে। কেমন অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাঁটছে। এমনভাবে হাঁটছে কেন? 

অপালা বলল, ‘এই মেয়েটির সঙ্গেই কি ফিরােজ সাহেবের বিয়ের কথা হচ্ছে? 

হাজি সাহেব এবং তাঁর মেয়ে দু জনই চমকে উঠল। মেয়েটি দরজা ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল। হাজি সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর হাতে একটা নােটবই। নােটবইটা হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল। তিনি অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন, ‘বিয়ের কথা তুমি কী বললে? 

‘আমি বােধহয় কোনাে ভুল করেছি। কিছু মনে করবেন না। 

‘ভুল না, তুমি ঠিকই বলেছ। আমি গােড়া থেকে সে-রকমই সন্দেহ করছিলাম। ওর মাকে বলেছিও কয়েক বার।’ 

দরজা ধরে দাঁড়ানাে মেয়েটি চট করে সরে গেল। হাজি সাহেব বললেন, ‘মুখ ফুটে নিজের কথা বললেই হয়, কিংবা আত্মীয়স্বজনদের দিয়ে বলাতে পারে, তা না। 

বিস্মিত অপালা বলল, ‘বিয়ের ব্যাপারে তাহলে উনি আপনাদের কিছু বলেন নি? 

‘আরে না! একেক সময় একেক কথা বলে। এক বার বলল—বিয়ের সব দায়িত্ব আমার। তখনই সন্দেহ হল। চালাক ছেলে। তুমি বস, দাঁড়িয়ে আছ কেন? দাঁড়াও, চায়ের কথা বলে আসি। আর এই হল ঠিকানা, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ওয়ার্ড নাম্বার পাঁচ। বেড নাম্বার তেতাল্লিশ। ওয়ার্ডে ঢুকেই প্রথম বিছানাটা।’ 

অপালাকে ঘন্টাখানেক বসতে হল। হাজি সাহেবের স্ত্রী এই এক ঘন্টা ক্রমাগত কথা বললেন। মােটাসােটা ধরনের মহিলা, কথা বলার সময় খুব হাত নাড়ান। শুরুই করলেন ‘মা’ ডাক দিয়ে।

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৩০)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *