আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৩৪)

তিনটার দিকে যাব।’ 

জ্বি আচ্ছা স্যার। 

দুপুরে ফখরুদ্দিন সাহেব একা-একা ভাত খেলেন। অপালা এখনাে ফেরেনি। ভাত খেতে-খেতে দারােয়ানের দিয়ে যাওয়া খাতাটি খুঁটিয়ে-খুটিয়ে পড়লেন। ফাঁকে-ফাঁকে গােমেজের সঙ্গে রান্নাবান্না নিয়ে গল্প করলেন। এটি তাঁর পুরনাে অভ্যেস। 

‘গােমেজ। ‘জ্বি স্যার। 

আকাশ জোড়া মেঘ

পৃথিবীর সব দেশে রান্নায় পনির ব্যবহার করে, বাংলাদেশে কেন করে না? ‘আমি তাে স্যার বলতে পারব না।’ 

এমন তাে নয় যে এ-দেশে পনির তৈরি হত না। হাজার-হাজার বছর ধরে পনির তৈরি হচ্ছে। হচ্ছে না? 

‘জি স্যার। 

‘আমাদের দেশি রান্নায় খানিকটা পনির দিয়ে দিলে কেমন হবে বলে তােমার ধারণা? 

‘আমি তাে স্যার বলতে পারছি না। ‘এক বার দিয়ে দেখবে। “জি আচ্ছা স্যার। 

তিনি বিশেষ কিছু খেতে পারলেন না। কিছুদিন ধরেই তাঁর খিদের সমস্যা দেখা দিয়েছে। 

‘গোমেজ। ‘জি স্যার। ‘লাঞ্চের পর কাউকে তুমি মার্টিনি খেতে দেখেছ? ‘জ্বি স্যার, দেখেছি। মেক্সিকান এক সাহেবকে দেখেছি। 

একটা মার্টিনি তৈরি কর তাে৷ মার্টিনি খেয়ে তাঁর শরীর আরাে খারাপ লাগতে লাগল, তবু তিনি ঠিক তিনটায় অফিসে গেলেন। ডেকে পাঠালেন ঢাকা ব্রাঞ্চের এ. জি. এম. মােস্তফা সাহেবকে। অত্যন্ত ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ‘মােস্তফা, আমার ধারণা যাবতীয় ঝামেলার পিছনে আপনি আছেন। 

এইসব আপনি কী বলছেন স্যার। ‘আমি ঠিকই বলছি। ভুল বললে এত দূর আসতে পারতাম না, অনেক আগেই মুখ থুবড়ে পড়ে যেতাম। আপনি আপনার চার্জ বুঝিয়ে দিন। 

‘স্যার, আমি তাে কিছুই বুঝতে পারছি না।’ ‘আপনি ঠিকই বুঝতে পারছেন। 

ফখরুদ্দিন সাহেব কোটের পকেট থেকে বরখাস্তের চিঠি বের করলেন। এই চিঠি তিনি ইংল্যান্ড থেকেই টাইপ করে নিয়ে এসেছেন। 

চিঠি হাতে মােস্তফা দাঁড়িয়ে, তিনি তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পিএ-কে বললেন, ‘বাসায় টেলিফোন করে দেখ তাে আমার মেয়ে ফিরেছে কি না। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

পি.এ, জানাল এখনাে ফেরে নি। ফখরুদ্দিন সাহেবের কপালে সূক্ষ্ম একটা ভাঁজ পড়ল। সেই ভাঁজ স্থায়ী হল না। তিনি পি.এ.-কে বললেন, ‘গাড়ি বের করতে বল, আমি কারখানা দেখতে যাব। ইউনিয়নের নেতাদেরও খবর দিতে বল—আমি ওদের সঙ্গে কথা বলব। 

আপনার ওখানে এখন যাওয়াটা ঠিক হবে না স্যার। ‘আমাকে উপদেশ দেয়া তােমার কাজের কোনাে অঙ্গ নয় বলেই আমি জানি। তােমাকে যা করতে বলেছি, কর। ‘স্যার, এক্ষুণি ব্যবস্থা করছি। 

গুড়। ভেরি গুড়। 

হাজি সাহেবের স্ত্রী ভিজিটার্স আওয়ারে ফিরােজকে দেখতে এসেছেন। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, ভদ্রমহিলার গায়ে বােরকা নেই। ফিরােজ তাঁকে আগে দেখে নি। সে অবাক হয়ে বলল, ‘কিছু মনে করবেন না, আপনাকে চিনতে পারছি না।’ 

ভদ্রমহিলা একগাদা ফলমূল নিয়ে এসেছেন। এর সঙ্গে আছে একটা হরলিকস, একটা ওভালটিন। তিনি বেশ সহজ ভঙ্গিতে বললেন, ‘আমি হাজি সাহেবের স্ত্রী। 

“ও আচ্ছা। বসুন বসুন। 

বেশিক্ষণ বসতে পারব না। হাসপাতালে ফিমেল ওয়ার্ডে আমাদের এক জন রুগী আছে, তাকে দেখতে যাব। তােমাকেও চট করে দেখে গেলাম। 

‘এইসব খাবারদাবার আমার জন্যে এনেছেন, না শুনার জন্যে ? 

ভদ্রমহিলা হেসে ফেললেন। ভদ্রমহিলার এই হাসি ফিরােজের পছন্দ হল। রসবােধ আছে। মেয়েদের এই জিনিসটা একটু কম। সাধারণ রসিকতাতেও এরা রেগে যায়। 

আপনি আমাকে দেখতে আসবেন, এটা তাে স্বপ্নেও ভাবি নি। কেন দেখতে আসব না? শুধু আমি একা না, আমার মেয়েও এসেছে।’ ‘সে- কী। 

‘ভেতরে আসতে লজ্জা পাচ্ছে—বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। থাকুক দাঁড়িয়ে, আমি আমার রুগী দেখে আসি।’ 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

ভদ্রমহিলা চলে গেলেন। তাঁর ঠোঁটে সূক্ষ্ম একটা হাসির রেখা। ফিরােজ বাইরে এসে দেখল সমস্ত বারান্দা আলাে করে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। এত সুন্দর হয় মানুষ! 

“এই মেয়ে, তুমি একা একা দাড়িয়ে আছ কেন? এস, ভেতরে এস।’ 

সে সঙ্গে-সঙ্গে রওনা হল। তার গায়ে হালকা গােলাপী রঙের শাড়ি। মাথায় ঘােমটা দেয়ার জন্যে কেমন বউ-বউ লাগছে। 

বােরকা কোথায় তােমার? মেয়েটিও তার মায়ের মতাে ভঙ্গিতে হাসল। 

এস, বস।’ 

বেডের সামনে একটা খালি চেয়ার। সে সেখানে বসল না। বিছানায় মাথা নিচু করে বসে রইল। 

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(শেষ-পর্ব)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *