মেয়েটি বিস্মিত গলায় বলল, ‘আর তাে কোনাে রুগী নেই।
ফিরােজ কী বলবে ভেবে পেল না। কিছু একটা বলতে ইচ্ছে করছে। বড় মায়া লাগছে মেয়েটির জন্যে।

‘তুমি চা খাবে? ‘জ্বি-না।
খাও-না এক কাপ। তােমার সঙ্গে আমিও খাব। এখানে একটা বয় আছে, ওকে বললেই নিচ থেকে চা এনে দেয়।
বলুন।
ফিরােজ চায়ের কথা বলে এল। মেয়েটি কৌতূহলী হয়ে রুগীদের দিকে দেখছে।
হাসপাতাল নিশ্চয়ই তােমার খুব খারাপ লাগে, তাই না? | ‘জ্বি-না। অনেক দিন আমি হাসপাতালে ছিলাম, হাসপাতাল আমার ভাললাই লাগে। আপনার অসুখ এখন সেরে গেছে, তাই না?
চা এসে গেল। মেয়েটি ছোেট-ঘােট চুমুকে চা খাচ্ছে। বার-বার তাকাচ্ছে। ফিরােজের দিকে। এখন আর সেই দৃষ্টিতে কোনাে লজ্জা আর সঙ্কোচ নেই। ফিরােজ
আন্তরিকভাবেই বলল, তুমি এসেছ, আমার খুব ভালাে লাগছে।’
মেয়েটি অত্যন্ত মৃদু স্বরে প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘অপালা বলে যে-মেয়েটি আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল, ওকে আপনি কীভাবে চেনেন?
‘হঠাৎ করে পরিচয়। ও আমাকে সুন্দর একটা চিঠি লিখেছে, তুমি কি ঐ চিঠিটা পড়বে?
‘জ্বি-না। ‘তুমি পড়, তুমি পড়লে আমার ভালাে লাগবে।’
ফিরােজ চিঠি বের করল। মেয়েটি লুকিয়ে আছে তার দিকে। কী সুন্দর স্বচ্ছ চোখ। শুধু চোখের দিকে তাকালেই যেন এই মেয়েটির অনেকখানিই দেখে ফেলা যায়। | বিকেল হয়ে আসছে। দিনের আলাে কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। চেনা পৃথিবীও এই আলােতে অচেনা হয়ে যায়।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
ফখরুদ্দিন সাহেব বাগানে চেয়ার পেতে বসে আছেন। তাঁকে চা দেয়া হয়েছে। তিনি চা খাচ্ছেন না। তাঁর পায়ের কাছে অরুণা ও বরুণা। তিনি বরুণার পিঠ মাঝে-মাঝে চুলকে দিচ্ছেন। তাঁর কাছেই গােমেজ দাঁড়িয়ে। তাকে তিনিই ডেকে পাঠিয়েছিলেন। এখন কিছু
বলছেন না। গােমেজ যেতে পারছে না, অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
‘গােমেজ। ‘জুি স্যার। ‘ক’টা বাজে বল তাে? ‘সাড়ে চারটা বাজে স্যার।
‘মাত্র সাড়ে চার, কিন্তু চারদিক এমন অন্ধকার হয়ে আসছে কেন? সূর্য ক’টার সময় ডােবে?’
‘ঠিক বলতে পারছি না স্যার।
‘খবরের কাগজে দেখ তাে ওখানে দেয়া আছে কি না। সানসেট এবং সানরাইজ যদি দেয়া না থাকে, তাহলে আবহাওয়া অফিসে টেলিফোন করবে।’
‘জি আচ্ছা স্যার। ‘ঘটঘট শব্দ হচ্ছে কিসের? ‘বসার ঘরটা নতুন করে সাজানাে হচ্ছে স্যার।
‘ওদের নিষেধ করতে বল। আমার মেয়ে পছন্দ করে সাজিয়েছে ওটা, যেমন আছে তেমন থাকুক।
‘জি আচ্ছা স্যার।
গােমেজ চলে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল। মৃদু স্বরে বলল, আপাকে কি খুঁজতে বের হব?
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
না। ফখরুদ্দিন সাহেব অরুণার পিঠ চুলকে দিতে লাগলেন। বাগান এখন প্রায় অন্ধকার। তাঁর শীত লাগছে, তবু তিনি বসেই আছেন। আকাশে একটি-দুটি করে তারা ফুটতে শুরু করেছে। গােলাপ-ঝাড় থেকে ভেসে আসছে মিষ্টি সৌরভ।
অপালা বাড়ি ফিরল সন্ধ্যা মেলানাের পর। সে ভেবেছিল, গেটের পাশে সবাই ভিড় করে থাকবে। তা নয়, গেট ফাঁকা। অন্য সময় তালা দেয়া থাকে, আজ তাও নেই। দারােয়ান টুলের ওপর বসে-বসে ঝিমুচ্ছে। অপালাকে দেখে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু কিছু বলল না।
অপালা বারান্দায় উঠে এসে প্রথম লক্ষ করল বাগানে বেতের চেয়ারে কে যেন বসে আছে। বাগানের আলাে জ্বলছেনা। জায়গাটা অন্ধকার। সিগারেটের আগুন ওঠানামা করছে। অপালা তীক্ষ কণ্ঠে ডাকল, “বাবা!
ফখরুদ্দিন সাহেব উত্তর দিলেন না। সিগারেট ছুঁড়ে ফেললেন। অপালা ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বালিকার মতাে শব্দ করে কাঁদতে শুরু করল। ফখরুদ্দিন সাহেবের একটা হাত মেয়ের পিঠে। তিনি গাঢ় স্বরে বারবার বলছেন, ‘মাই চাইল্ড। মাই চাইল্ড।’
অপালা ফোঁপাতে-ফোঁপাতে বলল, কখন এসেছ? এই তাে সকালে। তুমি সারা দিন কোথায় ছিলে? নানান জায়গায় ছিলাম। তুমি কেমন আছ বাবা? ‘ভালাে। আমি খুব ভালাে আছি।’ ‘ঠাণ্ডার মধ্যে এখানে বসে আছ কেন?
তোমার জন্যে বসে আছি।’ ‘মা আসে নি, তাই না?
কী করে বুঝলে? ‘মা এলে সেও তােমার সঙ্গে বসে থাকত। তুমি এসেছ, বাবা, আমার খুব ভালাে লাগছে।’
অপালা আবার ফোঁপাতে শুরু করল। ‘মা এল না কেন? ‘ডাক্তাররা এখন বলছে, বাই পাস সার্জারি লাগবে।
একেক সময় এরা একেক কথা বলে কেন? ‘কি জানি, কেন। ‘বাবা এস, তােমাকে আমাদের বসার ঘরটা দেখাই, কী সুন্দর যে করেছে।
Read more