আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৪)

ফখরুদ্দিন সাহেব উঁচু গলায় হাসতে লাগলেন। অপালার এই কথায় হঠাৎ করে । তিনি খুব মজা পেলেন।আকাশ জোড়া মেঘ 

আচ্ছা মা, রাখলাম। ‘তুমি ভালাে আছ তাে বাবা? ‘অসম্ভব ভালাে আছি। খােদা হাফেজ। 

অপালা নিচে নেমে এল। ঐ ভদ্রলােক বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে আছেন। তার সঙ্গের দু’ জন লােক করাত দিয়ে কাঠ টুকরাে করছে। অপালা বসার ঘরে উকি দিল। সমস্ত ঘর লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে। পেইনটিংগুলি নামিয়ে রাখা হয়েছে, শাে-কেসটি নেই। কার্পেট ভাঁজ করে এক কোণায় রাখা। অপালা বলল, আপনি কেমন আছেন? 

ফিরােজ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ‘আমাকে বলছেন? ‘হ্যা, আপনাকেই। আপনার নাম কি মতিন? ‘আমার নাম মতিন হবে কী জন্যে? আমার নাম ফিরােজ। ‘আপনার নাম ফিরােজ হলে বড়াে রকমের সমস্যা কাজ বন্ধ।’ 

কাজ বন্ধ মানে?’ ‘কাজ বন্ধ মানে হচ্ছে আপনি আপনার জিনিসপত্র গুছিয়ে বাড়ি চলে যাবেন। 

ফিরােজের মুখ হাঁ হয়ে গেল। যেন এমন অদ্ভুত কথা এর আগে সে শশানে নি। অপালা হেসে ফেলল। সে অবশ্যি হাসি মুহুর্তের মধ্যেই সামলে ফেলল। শান্ত গলায় বলল, ‘বাবা টেলিফোনে বললেন, মতিন নামের একজনের নাকি কাজটা করার কথা। 

কিন্তু আমি তাে ঠিক তার মতােই করছি। 

‘আপনি করলে হবে না।’ ‘মতিন এখন ছুটিতে আছে। তার বড়াে বােনের অসুখ। বরিশাল গেছে। 

বরিশাল থেকে ফিরে এলে আবার না-হয় করবেন। | ফিরােজ সিগারেট ধরাল। মেয়েটির কথা তার এখন বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সে ঠাট্টা করছে। যদি ঠাট্টা না হয়, তাহলে তার জন্যে বড়াে ধরনের ঝামেলা অপেক্ষা করছে। এই কাজটি সে জোর করে হাতে নিয়েছে। করিম সাহেবকে বলেছে, কোনাে 

অসুবিধা নেই, মতিনের চেয়ে কাজ খারাপ হবে না। করিম সাহেব বিরক্ত হয়ে বলেছেন, “আরে না। ভদ্রলােক মতিনের কথা বলেছেন। 

 ‘আমি নিজে তাঁর মেয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। সে বলেছে, আমি করলেও চলবে। কাজ ভালাে হলেই চলবে। | ‘দেখেন, পরে আবার ঝামেলা না হয়। বড়লােকের কারবার। মুডের উপর চলে। মাঝখানে যদি বন্ধ করে দেয়…..’ 

‘পাগল হয়েছেন! কাজ দেখে চোখ ট্যারা হয়ে যাবে। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

এখন অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে, তাতে ফিরােজেরই চোখ ট্যারা হয়ে যাবার যােগাড়। বি: করিম লােকটি মহা তাড়। হয়তাে বলে বসবে, ফিরােজ সাহেব, এই ফার্মে আপনার কাজ ঠিক পােযাচ্ছে না। দু’দিন পর-পর ফার্মকে একটা ঝামেলায় জড়িয়ে ফেলছেন। আপনি ভাই অন্য পথ দেখুন। | করিম সাহেবের পক্ষে এটা বলা মােটেই অস্বাভাবিক নয়, বরং খুবই স্বাভাবিক। ব্যাটা অনেকদিন থেকেই সুযােগ খুজছে। মাঝে-মাঝে ইশারা-ইঙ্গিতও করছে। গত সপ্তাহে বেতনের দিন বলল, ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি হয়ে গেছে। কাজের চেয়ে মানুষ বেশি। বার হাত কাঁকুড়ের আঠার হাত বিচি। 

ফিরােজ আধ-খাওয়া সিগারেট ফেলে দিয়ে অপালার দিকে তাকাল। অপালা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ হাসি-হাসি। মনে হচ্ছে কায়দা করে এই মেয়েটিকে রাজি করিয়ে ফেলা যাবে। উনিশ-কুড়ি বছর বয়সী মেয়েদের মন তরল অবস্থায় থাকে। দুঃখ-কষ্টের কথা বললে সহজেই কাবু হয়ে যায়। মুশকিল হচ্ছে বলাটাই। এই বয়সী। মেয়েদের সঙ্গে ভিখিরির গলার স্বরে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। তাতে নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়। 

‘আমি বরং কাজটা শেষ করি। আমার ধারণা, আপনার বাবা যখন দেখবেন একটা চমৎকার কাজ হয়েছে… মানে চমৎকার যে হবে এই সম্পর্কে… 

অপালা হাসি মুখে বলল, ‘না।’ ফিরােজ স্তম্ভিত। হাসিমুখে কাউকে না বলা যায়। 

এইভাবে আমি যদি চলে যাই তাহলে আমার নিজের খুব অসুবিধা হবে। চাকরিটা হয়তাে থাকবে না। আপনি আপনার বাবাকে বুঝিয়ে বলতে পারেন। আমার ধারণা, আপনার কথা উনি শুনবেন। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

‘আপনার ধারণা ঠিক নয়। 

এই বাজারে আমার চাকরি নিয়ে সমস্যা হলে কী যে অসুবিধায় পড়ব, আপনি বােধহয় বুঝতে পারছেন না। আপনাদের বােঝার কথাও নয়। নিজ থেকে বলতে আমার খুবই লজ্জা লাগছে…’ 

অপালা মৃদু স্বরে বলল, ‘যাবার আগে ঘরটা আগের মতাে করে যাবেন। এ-রকম এলােমেলাে ঘর দেখলে বাবা খুব রাগ করবেন। 

ফিরােজ দ্বিতীয় সিগারেট ধরাল। তার সঙ্গের লােক দু’টি চিন্তিত মুখে ফিরােজের দিকে তাকাচ্ছে। ফিরােজ নিচু গলায় বলল, ‘যাও, ঘরটা গুছিয়ে ফেল। | অপালা চলে যাচ্ছে। ফিরােজের গা জ্বালা করছে, মেয়েটি এক বার বলল না— সরি। মানবিক ব্যাপারগুলি কি উঠেই যাচ্ছে? গল্প-উপন্যাস হলে এই জায়গায় 

মেয়েটির চোখে পানি এসে যেত। সে ধরা গলায় বলত—আমার কিছু করার নেই ফিরােজ ভাই। আমার বাবাকে তাে আপনি চেনেন না—একটা অমানুষ। 

ফিরােজ বলত, তুমি মন খারাপ করাে না?

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৫)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *