আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৬)

ভদ্রলােক ফুর্তির স্বরে বললেন, ‘এই ছেলের কথাই তােমাকে বলছিলাম। একে ফতুর করে দিয়ে গেছে। কীরকম অবস্থা একটু দেখ। হায়রে দুনিয়া! দশ মিনিটের ভেতর এই পরিবারটির সঙ্গে ফিরােজের চূড়ান্ত খাতির হয়ে গেল। ভদ্রলােক এক পর্যায়ে বললেন, ‘দুপুরবেলা ঘােরাঘুরি করে লাভ নেই। হাত-মুখ ধুয়ে ভাত খেয়ে ফেল। বড়-বড় পাবদা মাছ আছে।’ 
আকাশ জোড়া মেঘফিরােজের চোখ প্রায় ভিজে উঠল। এই জীবনে সে অনেকবারই অযাচিত ভালবাসা পেয়েছে। এই জাতীয় ভালবাসা মন খারাপ করিয়ে দেয়। 

অপালার মা হেলেনা প্রথমে লণ্ডনের সেন্ট লিউক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর হার্টের একটি ড্যামেজড় ভান্তু এখানেই রিপেয়ার করা হয়। রিপেয়ারের কাজটি তেমন ভালাে হয় নি। ডাক্তাররা এক মাস পর আর একটি অপারেশন করতে চাইলেন। তবে এও বললেন যে, অপারেশন নাও লাগতে পারে। তবে তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। এক মাস অবজারভেশনে রাখতেই হবে| ফখরুদ্দিন সাহেব লণ্ডনের সাবাবে লাল ইটের ছােটখাটো একটি নার্সিং হােম খুঁজে বের করলেন।

এই হাসপাতালটি ঘরােয়া ধরনের। সবার প্রাণপণ চেষ্টা, যেন কিছুতেই হাসপাতাল মনে না হয়। কিছু অংশে তারা সফল। চট করে এটাকে হাসপাতাল মনে হয় না। তবে তার জন্যে রুগীদের প্রচুর টাকা দিতে হয়। এখানে বড় হাসপাতালের খরচের দেড়গুণ বেশি খরচ হয়। টাকাটাও আগেভাগেই দিয়ে দিতে হয়ফখরুদ্দিন সাহেবের জন্যে সেটা কোনাে সমস্যা হয় নি। টাকা খরচ করতে তাঁর ভালােই লাগে। ফখরুদ্দিন সাহেব নিজে যখন দরিদ্র ছিলেন, তখনাে তাঁর এই স্বভাব 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

ছিল। পড়াশােনার খরচ দিতেন বড়মামা। তাঁর অবস্থা নড়বড়ে ছিল, তবু তিনি মাসের তিন তারিখে একটা মানিঅর্ডার পাঠাতেন। প্রায়ই এমন হয়েছে, মাসের ছ’ তারিখেই সব শেষ। তখন ছােটাছুটি দৌড়াদৌড়ি। ফখরুদ্দিন সাহেবের জীবনের উদ্দেশ্য ছিল একটিই—প্রচুর টাকা রােজগার করা, যাতে দুহাতে খরচ করেও শেষ করা না যায়। ফখরুদ্দিন সাহেবের মেধা ছিল। ভাগ্যও প্রসন্ন ছিল। মাত্র পয়ত্রিশ বছর বয়সে ব্যবসা জমিয়ে ফেললেন। চারদিক থেকে টাকা আসতে শুরু করল। বিয়ে করলেন সাঁইত্রিশ বছর বয়সে। বাসর রাতে স্ত্রীকে বললেল, টাকাপয়সা তােমার কাছে কেমন লাগে? 

হেলেনার বয়স তখন মাত্র সতের। আই এ পরীক্ষা দিয়ে বড় ফুপার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে। সেখানেই চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে বিয়ে। বাসর রাতে টাকা প্রসঙ্গে স্বামীর এই অদ্ভুত প্রশ্নের সে কোনাে আগামাথা পেল না। সে চুপ করে রইল। ফখরুদ্দিন সাহেব অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে বললেন, আমার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্যই হচ্ছে—টু বিকাম রিচ। ভেরি রিচ। টাটা-বিড়লাদের মতাে। তােমার কি ধারণা, আমি পারব? 

হেলেনা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার কেন জানি মনে হতে লাগল,এই লােকটি ঠিক সুস্থ নয়। সুস্থ মানুষ বিয়ের প্রথম রাতে স্ত্রীকে নিশ্চয়ই এই জাতীয় কথা বলে না। ‘বুঝলে হেলেনা, আমার মনে হয় আমি পারব। আমি খুব দ্রুত ভাবতে পারি। ভবিষ্যৎ চোখের সামনে দেখতে পাই। এটা একটা মেজর এ্যাডভানটেজ। অন্যারা যা আজ চিন্তা করে, আমি সেটা দু’বছর আগেই চিন্তা করে রেখেছি। | হেলেনার বিয়ে হয়েছিল শ্রাবণ মাসে। হুট করে বিয়ে। আত্মীয়স্বজন দূরের কথা, নিজের মা পর্যন্ত খবর জানেন না। টেলিগ্রাম করা হয়েছে, এখনাে হয়তাে পৌছে নি। ঘটনার আকস্মিকতা, বিয়ের উত্তেজনায় এমনিতেই হেলেনার মাথার ঠিক নেই, তার ওপর লােকটি ক্রমাগত কী-সব বলে যাচ্ছে। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

‘হেলেনা। 

‘আমি আজ কিঞ্চিৎ মদ্যপান করেছি, যেটা আমি কখনাে করি না। আজ বাধ্য হয়ে নার্ভ স্টেডি রাখার জন্যে করতে হল। তুমি সম্ভবত গন্ধ পাচ্ছ। 

হেলেনা কোনাে গন্ধটন্ধ পাচ্ছিল না। এখন পেতে শুরু করল। তার ইচ্ছে করল চেঁচিয়ে কেঁদে ওঠে। 

এই পৃথিবীতে আমি মােটামুটিভাবে একা। মানুষ করেছেন বড়মামা। তাঁর সঙ্গে কিছুদিন আগে বিরাট একটা ঝগড়া হয়েছে। আজ তােমাকে বলব না, পরে বলব। আজ বরং আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলি তােমাকে বলি। | ঝুমঝুম করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। খােলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট আসছে। ফখরুদ্দিন সাহেব হাতে সিগারেট ধরিয়ে চক্রাকারে হাঁটছেন এবং কথা বলছেন। সিগারেটের ধোঁয়ায় হেলেনার দম বন্ধ হবার যােগাড়। লােকটি একটির পর একটি সিগারেট ধরাচ্ছে। পুরােটা টানছেনা, কয়েকটি টান দিয়েই ফেলে দিচ্ছে। হেলেনার ভয় 

ভয় করতে লাগল। এ-কেমন ছেলে ! কার সঙ্গে তার বিয়ে হল ? 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

এখনকার ট্রেণ্ডটা হচ্ছে কি, জান ? চট করে ইণ্ডাসট্রি দিয়ে দেয়া। এতে সমাজে প্রেস্টিজ পাওয়া যায়। লােকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেইণ্ডাষ্ট্রিয়ালিস্ট। কিন্তু এইসব 

ইণ্ডাস্ট্রি শেষ পর্যন্ত হাতিপােষার মতাে হয়। হাতির খাবার যােগাতে গিয়ে প্রাণান্ত। বুঝতে পারছ, কী বলছি? 

‘র মেটিরিঅ্যাল নিয়ে কেউ চিন্তা করে না। ইণ্ডাস্ট্রির খাবার হচ্ছে র মেটিরিঅ্যাল, যার প্রায় সবই আনতে হয় বাইরে থেকে। আমি তা করব না। আমি যখন কোনাে ইণ্ডাস্ট্রি দেব তার প্রতিটি র মেটিরিঅ্যাল তৈরি করব আমি নিজে। 

হেলেনা হাই তুলল। ফখরুদ্দিন সাহেব অবাক হয়ে বললেন, তােমার ঘুম পাচ্ছে নাকি? 

‘না।” ‘শুধু ব্যবসা নিয়ে কথা বলছি বলে কি বিরক্তি লাগছে? 

‘টাকা খুব ইম্পর্ট্যান্ট জিনিস, বুঝলে হেলেনা। যে-সােসাইটির দিকে আমরা যাচ্ছি, সেই সােসাইটির ঈশ্বর হচ্ছে টাকা। একটা সময় আসবে, যখন তুমি টাকা দিয়ে সব কিনতে পারবে। সুখ, শান্তি, ভালবাসা—সব।’ 

হেলেনা দ্বিতীয় বার হাই তুলল। ফখরুদ্দিন সেই হাই সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বললেন, ‘খুব বেশি দূর তােমাকে যেতে হবে না। আজকের কথাই ধর। তােমার যদি প্রচুর টাকা থাকে, তাহলে তুমি সেই টাকায় বেহেশতে নিজের জন্যে একটা জায়গার ব্যবস্থা করতে পার। 

কীভাবে? | ‘টাকা খরচ করে হাসপাতাল দেবে, স্কুল-কলেজ দেবে, এতিমখানা বানাবে, লঙ্গরখানা বসাবে। এতে পুণ্য হবে। সেই পুণ্যের বলে বেহেশত। কাজেই টাকা দিয়ে তুমি পরকালের জন্যে ব্যবস্থা করে ফেললে, যে-ব্যবস্থ্য এক জন ভিখিরি করতে পারবে না। ইহকালে সে ভিক্ষা করেছে, পরকালেও সে নরকে পচবে—কারণ তার টাকা নেই। হা হা হা। 

তাঁর হাসি আর থামেই না। মাঝে-মাঝে একটু কমে, তার পরই আবার উদ্দাম গতিতে শুরু হয়। হেলেনা ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়াল। বন্ধ দরজার পাশে বাড়ির মেয়েরা এসে দাঁড়িয়েছে।

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৭)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *