আমার আছে জল পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

আমার আছে জল পর্ব – ২

দিলু বাবুকে কোলে নিয়েই বললো—সাব্বির ভাই, আমাদের একটা ছবি তুলে দিনতো। এই বাবু, উনার দিকে তাকিয়ে হাসতো লক্ষ্মী ছেলের মত। সাব্বির ক্যামেরা ঠিকঠাক করতে লাগলো। এবং ছবি তুললো বেশ কয়েকটি। রেহানার মনে হলো এই একটি ব্যাপারে ছেলেটির আগ্রহ আছে। ছবি তোলায় তার কোন ক্লান্তি নেই।ওসমান সাহেব ভেবে রেখেছিলেন রেহানার উপর খুব রাগ করবেন। সেটা সম্ভব হলো না। সাব্বির রয়েছে। তার সামনে সিন ক্রিয়েট করার প্রশ্নই ওঠে না।

তবুও বিরক্ত স্বরে বললেন—তোমরা ছিলে কোথায়?………..কাছেই। তোমার জীপ তো এখনো আসেনি। এত তাড়া কিসের? জীপ আসবে না। নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। গরুর গাড়ী নিয়ে এসেছে।গরুর গাড়ী? দু’টা গরুর গাড়ী একটা মহিষের গাড়ী। তাড়াতাড়ি রওনা হওয়া দরকার। পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হবে।রেহানা অবাক হয়ে বললেন—তিনটা গাড়ী কেন? পাগল-ছাগলের কাণ্ড। যতগুলি পেয়েছে, নিয়ে এসেছে।তোমার পুলিশের লোকজন কেউ আসেনি? না।

ওসমান সাহেবের মনে হলো রেহানা মুখ টিপে হাসছে। কেউ নিতে আসেনি ব্যাপারটা দুঃখজনক। এ নিয়ে হাসবে কেন? রেহানা বললেন—তোমার খবর বোধ হয় পায়নি। পেলে আসত।ওয়ারলেস ম্যাসেজ দিয়েছি। পাবে না মানে? তোমাদের নীলগঞ্জ থানায় হয়তো ওয়ারলেস নেই।প্রতিটি থানায় ওয়ারলেস সেটা আছে। কি বলছ এসব? দিলু বললো—বাবা, আমি কিন্তু মহিষের গাড়িতে করে যাব।

ওসমান সাহেব একটা ধমক দিতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করে বের হয়েছেন ছুটির সময়টায় কোন রাগারাগি করলেন না।কিন্তু মেজাজ ঠিক রাখা যাচ্ছে না। কেন কেউ নিতে আসবে না? থানাওয়ালাদের এত বড় স্পর্ধা থাকা ঠিক নয়।গাড়িতে গুছিয়ে বসতে বসতে ন’টা বেজে গেলো। প্রথম কথা হয়েছিলো একটিতে যাবে শুধু মালপত্র। অন্য দু’টির একটিতে জামিল ও সাব্বির এবং আরেকটিতে দিলুরা। কিন্তু নিশাত বললো, আমি মা, বাবুকে নিয়ে একটি গাড়িতে একা যেতে চাই।কেন?

কোন কেন-টেন নেই। এমনি যেতে চাই।সব সময় তুই একটা ঝামেলা করতে চেষ্টা করিস।ঝামেলা করতে চেষ্টা করি না। কমাতে চেষ্টা করি। আমি মা একা যেতে চাই।নিশাত শেষ পর্যন্ত অবশ্যি একা একা গাড়িতে উঠেনি। রেহানা উঠেছেন তার সঙ্গে। প্রথম গাড়িটিতে বাবা, দিলু ও বাবু। মহিষের গাড়িটিতে জামিল ও সাব্বির।গাড়ি চলা শুরু করা মাত্রই সাব্বির মাথার নিচে একটা হ্যাণ্ড ব্যাগ দিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়লো।

জামিল বললো—কি, ঘুমুচ্ছেন নাকি?………..হ্যাঁ। রাতে ভাল ঘুম হয়নি।……………….এই ঝাঁকুনিতে ঘুম হবে?……………..হবে। আমার অভ্যেস আছে।……………….ঘুমুবার আগে একটা সিগারেট খাবেন?………………..জ্বি না, আমি সিগারেট খাই না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সাব্বির ঘুমিয়ে পড়লো। জামিল একটা সূক্ষ্ম ঈর্ষা বোধ করলো। এত সহজে কেউ অমন ঘুমিয়ে পড়তে পারে? একা বসে থাকা ক্লান্তিকর ব্যাপার। নেমে গিয়ে প্রথম গাড়িটিতে উঠা যেতে পারে। সেখানে সিগারেট খাওয়া যাবে না এই একটা ঝামেলা। তাছাড়া সঙ্গী হিসাবে ওসমান সাহেব বেশ বোরিং হবেন বলেই তার ধারণা। লোকটির রসবোধ নেই। অফিসের বাইরে যে আরো কিছু থাকতে পারে তা খুব সম্ভব তিনি জানেন না।

এক সময় জামিলের মনে হলো এখানে আসা কি সত্যি দরকার ছিলো? মানুষ বেড়াতে যায় ফূর্তি করবার জন্য। এখানেও কি সে রকম কিছু হবে? সম্ভাবনা খুব কম। জামিল গাড়োয়ানের পাশে এসে বসলো। রাস্তায় ধুলো উড়ছে। গরুর গাড়ি খুব ধীরে চলে বলে যে ধারণা আছে সেটা ঠিক নয়। বেশ দ্রুতই চলছে। গান শুনতে শুনতে যেতে পারলে হতো। কিন্তু ক্যাসেট প্লেয়ারটি নিশাতদের সঙ্গে।

ওদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে আসবে নাকি? ……নিশাতের নাক ভার হয়ে আছে। মাথায় একটা ভোঁতা যন্ত্রণা। সে বললো—মা, তোমার কাছে প্যারাসিটামল আছে? আছে। তোর জ্বর নাকি? না সর্দি। মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে।রেহানা তার গায়ে হাত দিলেন—গা তো বেশ গরম। শুয়ে থাক।শুয়ে থাকতে হবে না। তুমি দু’টি ট্যাবলেট দাও।পানি তো নাই। পানির বোতল পেছনের গাড়িতে।পানি লাগবে না। তুমি দাও।রেহানা দু’টি ট্যাবলেট দিলেন।

নিশাত একটুও মুখ বিকৃত করলো না। ট্যাবলেট দু’টি গিলে ফেললো।শুয়ে থাক।আমার শুয়ে থাকার যখন প্রয়োজন হবে আমি শুয়ে থাকব। তোমার বলতে হবে না।তুমি এত রেগে আছিস কেন?.নিশাত মায়ের চোখে চোখ রেখে শীতল গলায় বললো—সাব্বির সাহেব আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে কেন? ঠিক করে বল তো মা।বেড়াতে যাচ্ছে, আবার কেন? ও বাংলাদেশের অনেক ছবি তুলে নিতে চায়। আমরা গ্রামের দিকে যাচ্ছি শুনে সেও আগ্রহ করে যেতে চাইলো।না, সে কোন আগ্রহ দেখায়নি।

তুমি ঝুলাঝুলি করছিলে।যদি করেই থাকি তাতে অসুবিধা কি? আমাদের আত্মীয়, এতদিন পর দেশে এসেছে। ঘুরে-ফিরে দেখতে চায়।আসল ব্যাপার কিন্তু তা নয় মা।আসল ব্যাপারটা কি শুনি?……তুমি চাচ্ছ ঐ ছেলেটি যাতে আমাকে পছন্দ করে ফেলে। এবং পুরানো দুঃখ-কষ্ট ভুলে আমি তাকে বিয়ে করে ফেলি।যদি চেয়েই থাকি সেটা কি খুব অন্যায়? হ্যাঁ অন্যায়। তুমি যা ভাবছ সেটা ঠিক নয়।আমি কি ভাবছি? তুমি ভাবছ আমার স্বামী নেই। একটা বাচ্চা আছে, কাজেই আমার একটা অবলম্বন দরকার। এটা মা ঠিক না। আমি তোমাদের বিরক্ত করব না, আমি নিজের দায়িত্ব নিজে নেব। অনেকবার তো তোমাদের বলেছি।

নিশাত দেখলো জামিল এগিয়ে আসছে। সে চুপ করে গেলো।ক্যাসেট প্লেয়ারটা তোমাদের কাছে? জ্বি না, দিলুর কাছে।জামিল এগিয়ে গেলো। সামনের গাড়িটি অনেক দূর চলে গেছে। নিশাত দেখলো জামিল দৌড়াতে শুরু করেছে। এই দৃশ্যটি তার কেন জানি ভালো লাগলো। রেহানা বললেন—জামিলকে বলে দে পানির বোতলটা নিয়ে যাক।

কেন? অষুধ খেয়ে তোর মুখ তেতো হয়ে আছে না?…….মা, আমার জন্যে তোমাকে এত ভাবতে হবে না।দিলু ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছিলো। ওসমান সাহেব অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন তিনি দিলুর কথা বেশ মন দিয়ে শুনছেন এবং তাঁর ভালোই লাগছে।সোগাগী নাম কেমন করে হয়েছে শুনবে বাবা? বল শুনি।আমার দিকে তাকাও বলছি।

অন্যদিকে তাকিয়ে আছ কেন?……ওসমান সাহেব মেয়ের দিকে তাকালেন। দিলু হাত নেড়ে নেড়ে গল্পটা বললো। ওসমান সাহেব বললেন—এই জাতীয় মীথ প্রায় সব পুকুর সম্পর্কেই থাকে। এটা ঠিক নয়। একটা নির্দিষ্ট গভীরতায় মাটি কাটলেই পানি আসবে। শীতের সময় যদি নাও আসে বর্ষার সময় বৃষ্টির পানি ভরে যাবে। দিলুর মন খারাপ হলো। গল্পটা তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হচ্ছে।

ওসমান সাহেব বললেন—রাজার মেয়ের নাম সোহাগী এটাও বিশ্বাসযোগ্য নয়।বিশ্বাসযোগ্য নয় কেন?…রাজাদের মেয়ের এমন সাধারণ নাম থাকে না। ওদের গালভরা নাম থাকে। ফুলকুমার, রূপকুমারী, নূরজাহান, নূরমহল।দিলুর মন বেশ খারাপ হলো। সে মুখ ফিরিয়ে বাইরে তাকালো এবং অবাক হয়ে দেখলো জামিল ভাই আসছেন।

ক্যাসেট প্লেয়ারটা তোর কাছে?………..হ্যাঁ।ওটা নিতে এসেছি।জামিল গরুর গাড়ীর পেছনে পা ঝুলিয়ে বসলো।দিলু, ভালো দেখে কয়টা ক্যাসেট দে।রবীন্দ্র সঙ্গীত? না হিন্দী-ফিন্দী।দিলু ক্যাসেট বাছতে বাছতে বললো—বাবা কিন্তু সোহাগী পুকুরের গল্পটা বিশ্বাস করেন নি। বাবা বলছেন মাটি কিছু দূর খুঁড়লেই পানি আসবে।এটা ঠিক নয়। ঢাকা আর্ট কলেজে একটা বিরাট পুকুর আছে। খুব গভীর। বর্ষাকালে পর্যন্ত সেখানে এক ফোঁটা পানি থাকে না।

সত্যি?……….হ্যাঁ। এবং অমাবশ্যা-পূর্ণিয়ায় কেউ যদি সেই পুকুরে নামে তাহলে খিলখিল হাসির শব্দ শোনে।ওসমান সাহেব পাইপে তামাক ভরতে ভরতে বললেন—জামিল, সত্যি নাকি?পুকুরে পানি নেই বর্ষাকালেও এটা সত্যি, আমি নিজে দেখেছি। তবে হাসির কথাটা জানি না, ওটা বানানোও হতে পারে।

দিলু বললো—আমাকে ঐ পুকুরটা দেখাবেন?…….একদিন গিয়ে দেখে এলেই হয়। তোদের বাসার কাছেই তো।জামিল ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে নেমে গেলো। দিলু বললো—জামিল ভাই অনেক কিছু জানে। ওসমান সাহেব জবাব দিলেন না।

জামিল ভাই, আমাকে একটা ধাঁধা জিজ্ঞেস করেছিলো, সেটা দারুণ মজার, তোমাকে জিজ্ঞেস করব?…………….কর।আচ্ছা মনে কর তোমার কাছে দশ সের পানি দেয়া হলো। এখন তুমি কি পারবে এই দশ সের পানি একবার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিতে। বালতি টালতি কিছু ব্যবহার করতে পারবে না। শুধু হাত দিয়ে নেবে এবং একবারে নেবে।ওসমান সাহেব ভ্রু কুঁচকে ভাবতে লাগলেন। দিলু মিটি মিটি হাসতে হাসতে বললো—খুব সহজ বাবা। চেষ্টা করলেই পারবে।

একটু হিন্টস দেব?……….না হিন্টস দিতে হবে না।ওসমান সাহেব সত্যিই গভীরভাবে চিন্তা করতে শুরু করলেন।জামিল নিজের গাড়িতে ফিরে এসে দেখে সাব্বির উঠে বসেছে। ক্যামেরা নিয়ে কি সব যেন করছে।কি ঘুম হয়ে গেলো? হ্যাঁ।কি করছেন? একটা ব্লু ফিল্টার লাগাচ্ছি।ব্লু ফিল্টার দিয়ে কি হয়? দিনের বেলা ছবি তুললে মনে হয় জ্যোৎস্না রাত্রিরে ছবি তোলা হয়েছে।আপনি নিজে তো একজন ইন্জিনিয়ার? জ্বি।

আপনাকে দেখে মনে হয় ছবি তোলাই আপনার একমাত্র কাজ।এটা আমার একটা হবি।খুব বড় ধরনের হবি মনে হচ্ছে?…….সাব্বির শান্ত স্বরে বললো—আমি কিন্তু খুব নামকরা ফটোগ্রাফার। আমার নিজের তোলা ছবি নিয়ে আমেরিকান এক পাবলিশার একটি বই বের করেছে, নাম হচ্ছে—অন দি টপ অব দি ওয়ার্লড।আপনার কাছে কপি আছে? আছে, দিচ্ছি।সাব্বির আহমেদ তিনশ পৃষ্ঠার একটি বই বের করলো তার স্যুটকেস থেকে। জামিলের বিস্ময়ের সীমা রইলো না।এই বইটির কথা কি দিলুরা জানে? না। নিজের কথা বলতে ভাল লাগে না।

সাব্বির ছবি তুলতে শুরু করলো। ক্যামেরার শাটার পড়ছে। কোন কিছু যে সে দেখছে মন দিয়ে তা মনে হচ্ছে না।একটা গ্রাম্য বধু লম্বা ঘোমটা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শাটার পড়তে লাগলো ঘটাঘট।ছাগলের গলার দড়ি ধরে একটা আট-ন’ বছরের বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে। ঘটাঘট শাটার পড়তে শুরু করলো। জামিল বললো—এই ছবিটা আপনার ভাল হবে না। জোছনা রাতে কেউ ছাগল চড়াতে বের হয় না। আপনি বরং ব্লু-ফিল্টার বদলে নিন।

সাব্বির হালকা গলায় বললো—উল্টোটাও হতে পারে। ছবি দেখে মনে হতে পারে রাতের রহস্যময়তায় মুগ্ধ হয়ে একটা শিশু তার পোষা প্রাণীটি নিয়ে বের হয়েছে। দু’জনের চোখেই বিস্ময় ও ভয়, তাদের ঘিরে আছে জোছনা।আপনি কি ফটোগ্রাফার না কবি? আমি একজন ইন্জিনিয়ার।জামিল বইটির পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললো—আপনার এই বইটিতে তো মানুষের কোন ছবি নেই।

শুধুই জড়বস্তুর ছবি। মানুষের ছবি বেশী তোলেন না?……….আমার অন্য একটি বইয়ে মানুষের ছবি আছে। সবই অবশ্যি ‘নূড’ ছবি।বইটি আছে? আছে।আমেরিকায় আপনি কতদিন ধরে আছেন? প্রায় এগারো বছর।দেশে ফিরবেন না? না।কেন? থাকবার জন্য ঐ জায়গাটি ভালো। বিশাল দেশ ঘুরে বেড়ানোর চমৎকার সুযোগ। এরকম পাওয়া চায় না।

তাছাড়া…। তা ছাড়া কি?……..সাব্বির কথা শেষ করলো না। মাঠের দিকে চোখ ফিরিয়ে বললো—এগুলি সর্ষে ফুল না? হলুদ রঙের কি চমৎকার ভেরিয়েসন।তারা নীলগঞ্জে ডাকবাংলোয় এসে পৌঁছলো বিকেল চারটার দিকে, তখন আলো নরম হয়ে এসেছে। শীতের উত্তরী হাওয়া বইছে।

ডাকবাংলোটি চমৎকার। ফিসারিজের বাংলো। হাফ বিল্ডিং। উপরের ছাদ টালীর, মন্দিরের গম্বুজের মত উঁচু হয়ে গেছে। বাড়ি যত বড় তার চেয়েও বড় তার বারান্দা। সেখানে কালো একটি গোল টেবিলের চারপাশে গোটাপাঁচেক ইজিচেয়ার। দেখলেই শুয়ে পড়তে ইচ্ছা করে। বাড়িটির চারপাশে রেণ্টি (রেইন ট্রি) গাছ। বিকেল বেলাতেই বাড়িটিকে অন্ধকার করে ফেলেছে। পেছনে বেশ বড়সড় একটা পুকুর। কাকের চোখের মত জল।

রেহানা অবাক হয়ে বললেন—এই জঙ্গলে এত চমৎকার বাড়ি গভর্ণমেণ্ট কেন বানিয়েছে? ওসমান সাহেব নিজেও হকচকিয়ে গেছেন। এদিকে তাঁর প্রথম আসা। খোঁজ-খবর এসেছে জামিলের কাছ থেকে। জামিল, এই ডাকবাংলো তৈরী হয় কবে? এটা সুসং দুর্গাপুরের মহারাজার শিকার বাড়ি। পরের সরকার নিয়ে নেয়। এখন ফিসারিজ ডিপার্টমেণ্টের হাতে দেয়া হয়েছে।

আগে আরো সুন্দর ছিলো।এরচে সুন্দর আর কি হবে?……একটা কাঁচঘর ছিলো। গোটা ঘরটাই কাঁচের তৈরী। লোকজন কাঁচটাচ সব নিয়ে গেছে। অনেক ঝাড় লণ্ঠন ছিলো। বড় বড় অফিসার একেকজন এসেছেন, একেকটা করে নিয়ে গেছেন। পেছনের পুকুরের ঘাটে মার্বেল পাথরের একটা দেবশিশু ছিলো ঢাকা মিউজিয়াম নিয়ে গেছে।

তুমি এতো কিছু জান কিভাবে?……..আমি তো এখানে প্রায়ই আসি।দিলু বললো—বাবা আমি একটা একটা ঘরে থাকব। ওসমান সাহেব উত্তর দিলেন না। জামিল বললো—তা পারবি না দিলু—সব পুরনো ডাকবাংলোয় ভূত থাকে।আপনাকে বলেছে।সন্ধ্যা হলেই টের পাবি। সন্ধায় নামুক। তখন দেখা যাবে।বাবুর্চি আছে দু’জন। তারা রান্নাবান্না সেরে ফেলেছে। খাবার ঘরে খাবার দিতে শুরু করেছে। খাবার ঘরটা তুলনামূলকভাবে অন্ধকার। একটা হ্যাজাক বাতি জ্বালানো হয়েছে। সবাই হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসেছে শুধু নিশাত নেই। রেহানা খোঁজ নিতে গেলেন। নিশাত শুয়েছিলো। সে ক্লান্তগলায় বললো—আমি কিছু খাব না।কেন খাবি না?

খেতে ইচ্ছে করছে না, তাই খাব না।সারা দিন তো কিছুই মুখে তুলিসনি। কিছু মুখে দে।আমি গোসল না করে কিছু মুখে দেব না। আমার গা ঘিনঘিন করছে।জ্বর গায়ে গোসল করবি কি! প্লীজ মা, আমার ব্যাপারের নাক গলিও না। বাবুকে খাওয়াও। তোমরা খাওয়া-দাওয়া কর।

রেহানা মুখ কালো করে বের হয়ে এলেন। দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করলো নিশাত। ঠাণ্ডা পানি। গায়ে জ্বর থাকার জন্যে পানি বরফ শীতল মনে হচ্ছে। তবু ভালো লাগছে। ঝকঝকে বাথরুম। পেতলের বালতিতে পরিষ্কার জল। মোড়ক খোলা নতুন সাবান।নিশাত যখন বেরিয়ে এলো তখন সত্যি সত্যি অন্ধকার নেমে এসেছে। নিশাত একটি ফুলহাতা সোয়েটার গায়ে দিলো।

উঁকি দিলো মায়ের ঘরে। বাবু অবেলায় হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। আজ সারাদিন বাবুর সঙ্গে তার কোন কথাবার্তা হয়নি। বাবু কি ক্রমেই তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? রাতে সে এখন তার সঙ্গে ঘুমায় না। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে—দাদীর কাছে যাব। রেহানাকে সে দাদী বলে। কেন বলে কে জানে! নিশাত বললো—ও কি কিছু খেয়েছে? ভাত মুখে দেয়নি। দুধ খেয়েছে।নিশাত নিচু হয়ে ছেলের কপালে চুমু খেলো।

রেহানা বললেন—কিছু খাবি মা?……..না। চা খাব এক কাপ।বস তুই এখানে। আমি চায়ের কথা বলে আসি। মশারি খাটানোর কথাও বলতে হবে। খুব মশা এদিকে।দরজায় কার যেন ছায়া পড়েছে। নিশাত মুখ তুলে দেখলো জামিল ভাই।নিশাত, তোমার নাকি জ্বর? ব্যস্ত হবার মত কিছু না।

ব্যস্ত হইনি নিশাত, খোঁজ নিচ্ছি। খোঁজ নেয়াটা অপরাধ নয় নিশ্চয়ই।আমি ভাল আছি।জামিল ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস গোপন করলো। চলে যেতে চাইলো। নিশাত বললো—আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে জামিল ভাই।বল।আপনি বারান্দায় বসুন, আমি আসছি।ঝগড়া করবে মনে হচ্ছে।

 

Read more

আমার আছে জল পর্ব – ৩ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *