শুধু কেরােসিনের চুলা কিনলে হবে না। এর সঙ্গে আরাে অনেককিছু কিনতে হবে। কী কী কিনতে হবে আসুন তার একটা লিস্ট করে ফেলি। এতে দ্রুত সময় কেটে যাবে।
লিলি তার হ্যান্ডব্যাগ খুলে কাগজ কলম বের করল। মিসির আলিকে অবাক করে দিয়েই টেবিলে ঝুঁকে দ্রুত লিখে ফেলল—
১. কেরােসিনের চুলা ২. চুলার ফিতা ৩, কেরােসিন ৪. ছুরি ৫. কাঠের বাের্ড (মাছ গােসত কাটার জন্যে) ৬. কেতলি ৭. সসপ্যান ৮. দুটি হাঁড়ি (ভাতের এবং তরকারির) ৯, চায়ের কাপ ১০. চামচ ১১. কনডেন্সড মিল্ক ১২. চা ১৩, কফি মেয়েটা এমনভাবে লিখছে যেন মিসির আলি চেয়ারে বসে পড়তে পারেন। মেয়েটার এই ভঙ্গিটা ভালাে লাগছে। কাজের ভঙ্গি। কাজটা সে হেলাফেলার সঙ্গে করছে না, গুরুত্বের সঙ্গে করছে। আপনি একা যাচ্ছেন? হঁ্যা।
আমারাে মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে একা কোথাও গিয়ে থাকতে। রবিনসনশাের মতাে এক কোনাে দ্বীপে বাস করা। কী করব না করব কেউ দেখবে না। আমার মনে হয় আমি একা একা সারা জীবন কাটাতে পারব। আচ্ছা চাচাজি আপনি কি পারবেন?
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
বুঝতে পারছি না। আমি কখনাে ভেবে দেখি নি।
কোনাে পুরুষ মানুষের পক্ষে একা একা সারা জীবন কাটানাে সম্ভব না। পুরুষদের নানান ধরনের চাহিদা আছে। দ্র চাহিদা, অভদ্র চাহিদা। ওদের চাহিদার শেষ নেই।
মেয়েরা কি তার থেকে মুক্ত ?
মেয়েরাও তার থেকে মুক্ত না। তবে মেয়েরা ব্যক্তিগত চাহিদার কাছে কখনাে পরাজিত হয় না। পুরুষরা হয়।
লিলি লেখা বন্ধ করে সােজা হয়ে বসতে বসতে বলল, সব মিলিয়ে আটত্রিশটা আইটেম লিখেছি। এই আটত্রিশটা আইটেম সঙ্গে নিয়ে গেলে আপনি একা একা থাকতে পারবেন। এর মধ্যে অষুধও আছে। চট করে অসুখ বিসুখ হলে ডাক্তারখানা পাবেন না।
থ্যাংক অ্যা।
আমি কাল আবার আসব । এর মধ্যে যদি আরাে নতুন কোনাে আইটেমের নাম মনে আসে আপনাকে বলব ।
আচ্ছা।
লিলি ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এখন একটা বেজে দশ মিনিট। এই নিন চিঠি। দয়া করে ঝুড়িতে ফেলে দেবেন না। পড়বেন। তবে আমার সামনে পড়বেন না। আমি চলে যাবার পর পড়বেন।
অবশ্যই পড়ব।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি বাজার করতে খুব পছন্দ করি। আপনি যদি রাজি হন তাহলে কাল যখন অসিব তখন আপনাকে নিয়ে কেরােসিনের চুলা–টুলা কিনে দেব। আপনি যে দামে কিনবেন, আমি তার অর্ধেক দামে কিনে দেব। আর কিছু আইটেম আছে যা দোকানে গেলে মনে পড়বে। কাগজ কলম নিয়ে বসলে মনে পড়বে না। এইতাে এখন একটা জরুরি আইটেম মনে পড়ল, ন্যাকড়া।
ন্যাকড়া?
হা ন্যাকড়া। ন্যাকড়াকে মােটেই তুচ্ছ মনে করবেন না। চুলা থেকে গরম চায়ের কেতলি নামাবেন কীভাবে? হাতের কাছে ন্যাকড়া না থাকলে হয়তাে গায়ের শার্টের একটা অংশ দিয়ে নামতে যাবেন তারপর এ্যাকসিডেন্ট। সারা গা গেল পুড়ে। ভালাে কথা অষুধের লিস্টে আমি বার্নল লিখে দিয়েছি। নিতে কিন্তু ভুলবেন না ।
আচ্ছা ভুলব না। চাচাজি বাজার করার সময় আমাকে কি আপনি সঙ্গে নেবেন?
তুমি কাল অসি তখন দেখা যাবে। আমার সমস্যা কি জান ? আমি আমার নিজের কাজগুলি নিজেই করতে ভালােবাসি। কেউ আমাকে কোনাে ব্যাপারে সাহায্য করছে এটা ভাবতেই আমার কাছে খারাপ লাগে।
এই জন্যেই কি বিয়ে করেন নি ?
বিয়ে না করার পেছনে এটা কারণ হিসেবে কাজ করে নি। বউকে দিয়ে কাজ করাব— এই ভেবেতাে আর কেউ বিয়ে করে না।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
কাল আমি ঠিক এগারােটার সময় আসব। আচ্ছা।
আমার যেতে ইচ্ছা করছে না। আরাে কিছুক্ষণ আপনার সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছা করছে। বসব?
না। আমি এক নাগাড়ে কারাে সঙ্গেই পঞ্চাশ মিনিটের বেশি গল্প করতে পারি না। দীর্ঘ দিন মাস্টারি করেছি তো। মাস্টারদের ক্লাসগুলি হয় পঞ্চাশ মিনিটের। যে সব শিক্ষক দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন তারা কখনাে পঞ্চাশ মিনিটের বেশি কোনাে সিটিং দিতে পারেন না। আমার নাম কি আপনার মনে আছে?
মনে আছে। ডাক নাম লিলি। ভালাে নাম মারহাবা খাতুন।
আমার ভালাে নাম আসলে মারহাবা খাতুন না। মাহাবা বেগম । আমি মার পরে একটা র’ বসিয়ে মাহাবা–কে মারহাবা করেছি।
মাহাবা তাে বেশ আধুনিক নাম। তুমি কেন বললে খুব পুরনাে ধরনের নাম?
মিথ্যা করে বললাম। ছােট্ট একটা পরীক্ষা করলাম। মিথ্যা কথা বললে আপনি ধরতে পারেন কি না সেই পরীক্ষা। আমি আপনাকে নিয়ে লেখা একটা বইয়ে পড়েছি কেউ মিথ্যা কথা বললে আপনি সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলেন। আসলে আপনি পারেন না।
তুমি নাম নিয়ে মিথ্যা বলতে পার এটা মাথায় আসে নি। কাজেই আমি সেইভাবে তােমাকে লক্ষ করি নি।
মেয়েদের সম্পর্কে আপনি আসলে খুব কম জানেন। নিজের নাম নিয়ে মিথ্যা কথা বলতে মেয়েরা খুব পছন্দ করে।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
তাই নাকি?
হা। ধরুন কোনাে মেয়ে টেলিফোন ধরেছে। অপরিচিত একজন পুরুষ জিজ্ঞেস করল, আপনি কে বলছেন ? মেয়েটা তখন নিজের নাম না বলে ফট করে তার বান্ধবীর নাম বলে দেবে। আচ্ছা আমি যাই, আপনি তাে আবার পঞ্চাশ মিনিটের বেশি কথা বলেন না। আমি যে বাড়তি কিছুক্ষণ কথা বললাম কেন বললাম জানেন ? পঞ্চাশ মিনিট পুরাে করার জন্যে বললাম। আমি আপনার কাছে এসেছি সাড়ে বারােটায় । এখন বাজছে একটা বিশ। পঞ্চাশ মিনিট হয়েছে ?
হা হয়েছে।
আপনি আমাকে দ্রুত বিদায় করতে চাচ্ছিলেন। আমি চলেই যেতাম কিন্তু পঞ্চাশ মিনিটের কথা বলে আপনি নিজেই নিজের ফাদে আটকে গেলেন। খুব বুদ্ধিমান মানুষদের এটা একটা সমস্যা। নিজেদের তৈরি করা ছােট ছােট ফাঁদে তারা নিজেরা ধরা পড়ে। চাচাজি যাই ?
আচ্ছা যাও।
মিসির আলি মেয়েটিকে বাড়ির গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। এই কাজটা তিনি সচরাচর করেন না।
Read more
