রাস্তায় নেমেই সাজ্জাদ ঠোঁটে সিগারেট নিয়েছে কিন্তু ধরাবার কথা তার মনে নেই। সে হাঁটছে উদ্দেশ্যহীনভাবে। কোথায় যাবে তাও ঠিক করা নেই। এত রাতে কারো বাসায় ওঠা যাবে না, উঠতে হবে হোটেলে। সস্তাদরের হোটেল কোন অঞ্চলে আছে তাও মনে পড়ছে না। টাকা-পয়সা সে সামান্যই সঙ্গে এনেছে। এই মুহূর্তে মেয়ের অসুখের চেয়েও দিলশাদের ব্যবহার তাকে বেশি কষ্ট দিচ্ছে। রেল স্টেশনের দিকে চলে গেলে কেমন হয়? প্ল্যাটফরমে হাঁটাহাঁটি করে রাত পার করে দেয়া যায়। কিংবা সারারাত রাস্তায় হাঁটাও যেতে পারে।
শহরের এ-মাথা থেকে ও-মাথা। শহরটা গত বিশ বছরে কত বড় হয়েছে সেটা তাহলে আন্দাজ করা যেত। তাতে অবশ্যি খোলা ক্ষুর হাতে হাইজ্যাকারের মুখোমুখি হবার আশঙ্কা থাকে। থাকুক না, আজ রাতে কোনো কিছুই ভয়ঙ্কর বলে মনে হবে না। ভোলা ক্ষুর হাতের হাইজ্যাকারদের দেখা পাওয়াও হবে a welcome change, বরং ওদের সে বলতে পারে- বন্ধুরা, তোমাদের খুশি করার মতো অর্থ আমার কাছে নেই। যা আছে তা অতি সামান্য। সেটা তোমাদের দিয়ে দিচ্ছি। প্লাস একটা হাতঘড়ি। ঘড়িটা দামি।
পুরনো হলেও দামি। বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া। তার বদলে আমাকে তোমাদের সঙ্গে নিয়ে চল– টু নাইট লেট আস বি ফ্রেন্ডস। চল আজ রাতে একসঙ্গে নেশা-টেশা করি। সস্তায় নেশা করার জায়গা নিশ্চয়ই তোমাদের জানা আছে। বাংলা মদ এখন কী দরে বিক্রি হচ্ছে? হাঁড়ি কত? দামি বোতলে সুন্দর লেবেল সেঁটে এই জিনিস বিদেশে এক্সপোর্ট করলে বিদেশীরা বুঝত– আমরা কী জিনিস। বোতলের গায়ে টকটকে লাল অক্ষরে লেখা থাকবে বাংলা। ইংরেজি লেবেলেটা হবে এরকম
BANGLA
The fire from Bangladesh
তৃষ্ণায় সাজ্জাদের শরীর এখন কাঁপছে। তার কাছে মনে হচ্ছে কোনো নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে মদ্যপান করার সুযোগের বিনিময়ে সে এখন সবকিছুই দিয়ে দিতে পারে। তার আত্মাও বন্ধক রাখা যেতে পারে। আত্মা বন্ধক রাখার লোক মেসিফস্টোফিলিস কাব্যে পাওয়া যায়, বাস্তবে পাওয়া যায় না। বাস্তবের মানুষ আত্মা সম্পর্কে খুব আগ্রহী, তবে আত্মার কেনা-বেচায় আগ্রহী না। আগ্রহী কোনো মানুষকে পাওয়া গেলে সে তার আত্মা বিক্রি করে দিত। আত্মাবিহীন মানুষ হবারও নিশ্চিয়ই অনেক মজা আছে।
দিলশাদ নিঃশব্দে রাতের খাওয়া শেষ করল। তার যে এত খিদে পেয়েছিল সে আগে বুঝতে পারে নি। ঘন ডালটা খেতে এত ভালো হয়েছে! ডাল থাকলে আরো কিছু ভাত খাওয়া যেত।ফুলির মা বলল, চা দিমু আম্মা? দিলশাদ বলল, দাও! তোমার পান আছে না? সেখান থেকে আমাকে একটু পান দিও। পান খেতে ইচ্ছা করছে।দিলশাদ বারান্দার দিকে রওনা হলো। নাতাশার ঘরের ভেতর দিয়ে যাবার সময় লক্ষ করল নাতাশা এই গরমে চাঁদর গায়ে শুয়ে আছে। তার চোখ বন্ধ, তবে দিলশাদ পুরোপুরি নিশ্চিত নাতাশা জেগে আছে।
সাজ্জাদের সঙ্গে তার কথাবার্তা কী হয়েছে সবই শুনেছে। সময় বিশেষে এই মেয়েটার ঘাপটি মেরে থাকার অভ্যাস আছে।দিলশাদ বলল, মা, জেগে আছিস? নাতাশা জবাব দিল না। দিলশাদ বারান্দায় চলে গেল। আজ খুব গুমট। কিছুক্ষণ আগে গোসল করা হয়েছে, এর মধ্যেই গা ঘেমে যাচ্ছে। শোবার আগে আবার গোসল করতে হবে। ফুলির মা চা দিয়ে গেছে। খেতে ভালো লাগছে। দিনের শেষ চা ফুলির মা ভালো বানায়। এক কাপ শেষ করার পর আরেক কাপ খেতে ইচ্ছা করে।
ফুলির মা, নাতাশা রাতে দুধ খেয়েছে? জে খাইছে।সবটা খেয়েছে? তলার মধ্যে অল্প একটু ছেল। আফার বমি আসতে ছেল, তখন চাচাজান। বলছেন, থাউক শেষ করনের প্রয়োজন নাই।তোমার চাচাজান দুনিয়ার সবকিছু বেশি বোঝেন তো তাই বলেছেন— থাক প্রয়োজন নেই। এত বড় একটা অপারেশন হবে, অপারেশন সহ্য করার শক্তি লাগবে না? দুধ-টুধ না খেলে শক্তিটা আসবে কোত্থেকে? আকাশ থেকে?
কথা তো আম্মা ঠিকই বলছেন।কাল তোমার চাচাজান আবার আসবে। ফোপরদালালি করতে চেষ্টা করবে। তখন কঠিন গলায় বলবে– আম্মার নিষেধ আছে। মনে থাকবে? জে, মনে থাকব।ভেতর থেকে নাতাশা ক্ষীণ গলায় ডাকল, মা! দিলশাদ তৎক্ষণাৎ উঠে গেল।বাথরুমে যাব মা।দিলশাদ হাত ধরে মেয়েকে বিছানা থেকে নামাল। ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে গেল। আবার ফিরিয়ে এনে বিছানায় বসিয়ে দিল। কোমল গলায় বলল, আজ মাথাব্যথা হয়েছিল মা?
নাতাশা হাসিমুখে হা-সূচক মাথা নাড়ল যেন মাথাব্যথা হওয়াটা মজার একটা ব্যাপার।কবার হয়েছিল? তিনবার।খুব বেশি? হুঁ।ব্যথার সময় ওষুধ খেয়েছিলি? হুঁ।তাতে কি ব্যথা কমেছিল? হুঁ।রাতের দুধ নাকি পুরোটা খাস নি? বমি আসছিল মা।বমি এলেও খেতে হবে। না খেলে শরীরে শক্তি আসবে না।তুমি পান খাচ্ছ নাকি মা? হ্যাঁ।চপচপ করে পান খাওয়া আমার এত ভালো লাগে। আমাকে একটু পান দাও তো, আমি খাব। তোমার চাবানো পান একটু দাও।আমার মুখের পান খেতে হবে না। দাঁড়া তোকে সুন্দর করে পান বানিয়ে দিচ্ছি।না, তোমার মুখ থেকে দাও। কিচ্ছু হবে না।অন্যের মুখের পান খাবি? ঘেন্না লাগার কথা। তোর ঘেন্না লাগে না?
উঁহু।দিলশাদ নিতান্ত অনিচ্ছায় মেয়েকে পান দিল। নাতাশা পান চিবুতে চিবুতে সুন্দর একটা অভিনয় করল, হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল, বাবা কোথায় মা? দিলশাদ অস্বস্তির সঙ্গে বলল, ও তার এক বন্ধুর বাড়িতে গেছে। কী নাকি দরকার। না গেলেই না। তুই কি এতক্ষণ ঘুমুচ্ছিলি? হুঁ। বাবা আমাকে কিছু না বলে চলে গেল? তুই ঘুমুচ্ছিলি বলে তোকে জাগায় নি।রাতে ফিরে আসবে? রাতে আর আসবে না। কাল সকালে চলে আসবে।
নাতাশা খুব ভয়ে ভয়ে ছিল হয়তো মা তার অভিনয় ধরে ফেলবে। মা’র যা বুদ্ধি! ধরে ফেলারই কথা। তবে খুব বুদ্ধিমান মানুষরাই সবচে বেশি বোকার মতো কাজ করে। নাতাশার ধারণা, বাবার সঙ্গে তার মা যে ঝগড়াটা করেছে তা নিতান্ত বোকা মেয়েরাই করবে। এবং এই যে সে মিথ্যা অভিনয় করছে শুধুমাত্র বোকা মায়েদেরই সেটা ধরতে পারার কথা না। একজন সাধারণ বুদ্ধির মা হলেও ধরে ফেলত। তার মা’র এত বুদ্ধি অথচ সামান্য ব্যাপারটা ধরতে পারছে না।
এটা খুবই আশ্চর্যের কথা।অভিনয়টা করে নাতাশার ভালো লাগছে। বাবা-মা কেউ জানবে না তাদের কুৎসিত ঝগড়া সে শুনেছে। তারা স্বস্তি বোধ করবে। এটা আনন্দিত হবার মতোই ঘটনা।তোর বাবার সঙ্গে তুই কি অনেক গল্প-টল্প করেছিস? হুঁ।কী নিয়ে গল্প হলো? সাইনবোর্ডের গল্পটা আবার শুনলাম। পুরোটা শোনা হয় নি। অর্ধেকটা বাকি আছে।সাইনবোর্ডের কোন গল্প? ঐ যে বাবা আর তার বন্ধুরা মিলে তাদের শহরের সব সাইনবোর্ড এক রাতে পাল্টে দিল। ছেলে হয়ে জন্মানোর কত মজা, তাই না মা? তারা কত কিছু করতে পারে?
দিলশাদ ভুরু কুঁচকে বলল, তুই কি তোর বাবার ঐসব বানানো গল্প বিশ্বাস করে বসে আছিস? বানানো গল্প? অবশ্যই বানানো গল্প। কয়েকজন মিলে এক রাতে সব সাইনবোর্ড খুলে অন্যখানে লাগাল। সাইনবোর্ড খোলা এত সহজ? মার কথায় নাতাশা একটু মন খারাপ করল। সে জানে তার বাবার এই গল্পগুলি সত্যি গল্প। কিছু কিছু অদ্ভুত মানুষ পৃথিবীতে থাকে। তার বাবা একজন অদ্ভুত মানুষ। অদ্ভুত কোনো কিছু যদি তার মা’র মধ্যে থাকত তাহলে তার মাও হয়তো বাবাকে পছন্দ করত।
মা’র মধ্যে অদ্ভুত কিছু নেই।দিলশাদ বলল, ঘুম পাচ্ছে নাতাশা? নাতাশার ঘুম পাচ্ছে না, তবু সে বলল, হ্যাঁ।যা, শুয়ে পড়।তুমি ঘুমুবে না? আমি আরেকবার গোসল করব। আমার খুব গরম লাগছে।দিলশাদ আবার দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করল। তার এত ক্লান্তি লাগছিল মনে হচ্ছিল গায়ে পানি ঢালতে ঢালতে সে ঘুমিয়ে পড়বে। শরীর বেশি ক্লান্ত থাকলে ঘুমের খুব অসুবিধা হয়। বিছানায় শোয়ামাত্র ঘুম চলে যায়।
দিলশাদ বাথরুম থেকে বের হয়ে দুটা রিলাক্সেন খেল। তার সঙ্গে একটা প্যারাসিটামল ট্যাবলেট। এই দুয়ের কম্বিনেশন ঘুমের জন্যে ভালো। রিলাক্সেন ট্যাবলেটের নিয়ম হলো খাওয়ার পর আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ঝিমুনির মতো শুরু হলে বিছানায় যেতে হয়।দিলশাদ ভেতরের বারান্দার পাটিতে পা ছড়িয়ে বসে আছে। ঝিমুনি আসার জন্যে অপেক্ষা করছে। কাল সারাদিনে অনেকগুলি কাজ করতে হবে। কোনটার পর কোনটা করা হবে একটু গুছিয়ে নেয়া দরকার।
১. আমেরিকান অ্যাম্বেসি থেকে ভিসা ফরম আনতে হবে।
২. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটা চিঠি বের করতে হবে। চিঠির বিষয়বস্তু হলো- নাতাশার অপারেশন দেশে হওয়া সম্ভব না বলে তাকে বাইরে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। এই চিঠির জন্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অনেক আগেই জমা দেয়া হয়েছে। এখন হঠাৎ করে তারা চাচ্ছে মেডিকেল বোর্ডের মতামত। চারজনের একটা মেডিকেল বোর্ড লাগবে। নাতাশার ডাক্তার বলেছেন মেডিকেল বোর্ডের মতামত ছাড়াই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠি বের করার ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন।
৩. ফরেন কারেন্সি নেয়ার অনুমতির জন্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে যেতে হবে। তাদের কী সব ফরম-টরম পূরণ করতে হবে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠি ছাড়া ব্যাংকে গিয়ে লাভ হবে না।
৪. বিমানের অফিসে যেতে হবে। গুরুতর অসুস্থ রোগী নিতে হলে কী সব পারমিশনের ব্যাপার আছে। এইসব ছোটখাটো সমস্যা। দিলশাদ জানে এই জাতীয় সমস্যার সমাধান হয়। ছোটাছুটি করলেই হয়। বড় সমস্যা টাকার সমস্যা। দিলশাদ টাকা এখনো জোগাড় করতে পারে নি। বড় দুলাভাই এখনো টাকা
আজ ভিসা হলো। সবচে’ কঠিন অংশটাই বোধহয় সবচে’ সহজে হলো। ভিসা অফিসার আমেরিকান। তাঁর চোখমুখ কঠিন। ভুরু সবসময় কুঁচকানো। কিন্তু তিনি দিলশাদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। চমৎকার বাংলায় বললেন, বিকাল তিনটার পর এসে পাসপোর্ট নিয়ে যাবেন।দিলশাদ উদ্বিগ্ন গলায় বলল, ভিসা কি হয়েছে? হ্যাঁ হয়েছে।স্যার, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। অনেক অনেক ধন্যবাদ।ভিসা অফিসার আবারো হাসলেন। সেই হাসি দেখে দিলশাদের চোখ ভিজে ওঠার উপক্রম হলো। কিছুদিন হলো এটা হয়েছে।
কেউ মমতা নিয়ে কিছু বললেই চোখে পানি এসে যাচ্ছে। সেদিন অফিসে তার বস রহমান সাহেব তার কামরায় ডেকে পাঠালেন। দিলশাদ ভাবল কঠিন কিছু কথাবার্তা তাকে শুনতে হবে। সে দিনের পর দিন অফিস কামাই করছে। ছুটি নিচ্ছে না। ছুটি জমা করে রাখছে। কতদিন আমেরিকা থাকতে হয় কে জানে। সে রহমান সাহেবের ঘরে ঢুকল ভয়ে ভয়ে। প্রায় ফিস ফিস করে বলল, স্যার ডেকেছেন?
রহমান সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, যা, বসুন। দিলশাদ ভয়ে ভয়ে বসল। রহমান সাহেব বললেন, আপনাকে কোনো কাজে ডাকি নি। আমার সাথে কফি খাওয়ার জন্য ডেকেছি। আপনি সারাক্ষণ এত টেনশনের ভেতর দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন দেখে মায়া লাগে। এত চিন্তিত হবেন না। যা হবার হবে। নিন, কফি খান আর শুনুন। আপনার মেয়েকে নিয়ে যদি কোথাও যাবার দরকার হয় আপনি অফিস থেকে গাড়ি নিয়ে যাবেন। আমি ট্রান্সপোর্ট সেকশানকে বলে দিয়েছি। অফিস টাইমের বাইরেও যদি গাড়ি লাগে, আমাকে বলবেন। আমার ড্রাইভার আছে, গাড়ি পাঠিয়ে দেব।
দিলশাদ বলল, থ্যাংক য়্যু স্যার। বলতে বলতেই সে লক্ষ করল, তার চোখ ভিজে উঠতে শুরু করেছে। সে নিশ্চিত, রহমান সাহেব আর একটা কোনো মমতার কথা বললে সে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলবে। ভাগ্যিস তিনি আর কোনো কথা বলেন নি। গম্ভীর মুখে কফির কাপে চুমুক দিয়েছেন। সেও কফি খেয়েছে একবারও তার দিকে না তাকিয়ে।আজ আমেরিকান অ্যাম্বেসিতে সে এসেছে অফিসের গাড়ি নিয়ে। গাড়ি ছাড়া উপায় কী? নাতাশাকে আনতে হয়েছে।
নাতাশা এখন ওয়েটিংরুমে তার বাবার কাঁধে হেলান দিয়ে বসে আছে। নাতাশাকে চিন্তিত মনে হচ্ছে না। সে বরং কৌতূহলী হয়ে ভিসাপ্রার্থীদের শুকনো মুখ দেখছে। কিন্তু সাজ্জাদকে চিন্তিত মনে হচ্ছে। দিলশাদ সামনে এসে দাঁড়াতেই সাজ্জাদ বলল, ভিসা হয়েছে? দিলশাদ ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, হুঁ। আমাকেও দিয়েছে? হুঁ।থ্যাংক গড।বিকেল তিনটার সময় এসে পাসপোর্ট নিয়ে যেতে বলল।দিলশাদ হাত ধরে মেয়েকে তুলল।নাতাশা বলল, তুমি শুধু আমার হাতটা ধর মা। আমি নিজে নিজে হাঁটতে পারব।
নাতাশা হাঁটতে পারছিল না। এলোমেলো পা ফেলছে। ভিসাপ্রার্থীরা সবাই এখন তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাদের চোখে করুণা। নাতাশার খুব লজ্জা লাগছে। মানুষের করুণা গ্রহণ করার মতো লজ্জা আর কিছুতেই নেই।সাজ্জাদের ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করার কোনোরকম ইচ্ছা দিলশাদের ছিল না। দুজনের যাবার টাকাই জোগাড় হচ্ছে না, ততীয় জন কীভাবে যাবে। সাজ্জাদ করুণ গলায় বলেছে– আমি যাব না, শুধু ভিসাটা করিয়ে রাখি।যাবে না, তাহলে ভিসা করে রাখবে কী জন্যে? শেষ মুহূর্তে যদি কিছু টাকা যোগাড় হয়ে যায়।কোত্থেকে জোগাড় হবে? আলাদিনের চেরাগের কোনো সন্ধান পেয়েছ?
তা না। আমার স্কুল জীবনের বন্ধু করিম জার্মানিতে আছে। ওর ঠিকানা জোগাড় করার চেষ্টা করছি। ও জানতে পারলে আমাকে টিকিট পাঠিয়ে দিবে।টিকিট পাঠানোর দরকার নেই। উনাকে টাকা পাঠাতে বলল। টাকা কিছুই জোগাড় হয় নি।সাজ্জাদ বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, নাতাশার চিকিৎসার সব খরচ দেয়ার পরেও যদি কিছু থাকে তাহলেই আমি যাব।তোমার এত আগ্রহ কেন? ঐ দেশে মদ সস্তা, এইজন্যে?
সাজ্জাদের কিছু কঠিন কথা মুখে এসে গিয়েছিল। শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলেছে। কী হবে কঠিন কথা বলে? কঠিন কথা তোলা থাকুক। কোনো এক সময় বলা যাবে। সাজ্জাদ নিজের পাসপোর্ট করিয়েছে এবং দিলশাদের সঙ্গে ভিসার জন্য পাঠিয়েছে। দিলশাদ মুখ কঠিন করে রেখেছে। মেয়ের কথা ভেবেই হয়তো কিছু বলে নি।ভিসা পেয়ে দিলশাদের ভালো লাগছে। ভিসা পাওয়া যাবে না এরকম সন্দেহ কয়েকদিন থেকেই তার হচ্ছিল। তাছাড়া যার সঙ্গে দেখা হয়েছে সে-ই বলেছে– আমেরিকান ভিসা? অসম্ভব। ওরা ভিসা দেবে না। কিছুতেই না।
দিলশাদ বলেছে, না দেয়ার কী আছে? আমরা ঐ দেশে বাস করার জন্যে যাচ্ছি না, চিকিৎসার জন্যে যাচ্ছি।অন্যের চিকিৎসা নিয়ে ওদের কোনো মাথাব্যথা নেই। চিকিৎসা হলেই কী আর হলেই কী? ভিসা অফিসাররাও তো মানুষ।আমেরিকান ভিসা অফিসার মানুষ তোমাকে কে বলল? ভিসা অফিসার হিসেবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়ার আগেই অপারেশন করে ওদের মাথায় কম্পিউটার বসিয়ে দেয়। ওরা হলো যন্ত্র। যন্ত্রের বেশি কিছু না। তোমার যাবতীয় কাগজপত্র উল্টে-পাল্টে দেখবে। তারপর শুকনো গলায় বলবে, সরি! নো।
ব্যাপার তা হয় নি। দিলশাদ যে-রকম চেয়েছে সেরকমই হয়েছে। শেষপর্যন্তও তাই হবে। সে তার মেয়েকে নিয়ে ভর্তি করাবে জন্স হপকিন্সে। পৃথিবীর সেরা সব ডাক্তার দিয়ে মেয়েকে পরীক্ষা করাবে। অপারেশন হবে এবং তার মেয়ে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরবে। মেডিকেল সায়েন্স অনেকদূর এগিয়ে গেছে। যারা এই বিজ্ঞানকে এতদূরে নিয়ে গেছেন দিলশাদ তাদের হাতেই মেয়েকে তুলে দেবে।
মেয়েকে নিয়ে দেশে ফিরে সে কী করবে? প্রথমেই একমাসের ছুটি নেবে। এই একমাস দরজা বন্ধ করে শুধুই ঘুমুবে। এমনিতে ঘুম না এলে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমুবে। তার শরীর-মন অসম্ভব ক্লান্ত। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে ক্লান্তি দূর করবে।নাতাশা গাড়িতে উঠেই বলল, মা’র অফিসের এই গাড়িটা খুব সুন্দর, তাই না বাবা?
সাজ্জাদ বলল, হ্যাঁ।তোমার যদি কোনোদিন টাকা হয় এরকম একটা গাড়ি কিনো তো।আচ্ছা মা কিনব। অবশ্যই কিনব।দিলশাদ তিক্ত গলায় বলল, একটা খেলনা গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই, সে কিনবে পাজেরো। প্রমিজ করতেও লজ্জা লাগা উচিত।নাতাশা মার দিকে তাকাল। সে মনে হয় বাবার পক্ষে কিছু বলতে যাচ্ছিল– বলল না। ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল।সাজ্জাদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, তোর মার অফিসের এই চমৎকার গাড়িতে করে শহরে কয়েকটা চক্কর দিলে কেমন হয়? নাতাশা বলল, ভালো হয় বাবা, খুব ভালো হয়।দিলশাদ বলল, ভালো হলেও চক্কর দেয়া যাবে না। গাড়ি অফিসে পাঠিয়ে দিতে হবে। আমার অফিসে কাজ আছে। আমি অফিসে গাড়ি নিয়ে চলে যাব।মা, তাহলে আমরা রিকশা নিয়ে একটু ঘুরি? না। প্রচণ্ড রোদ। মাথায় রোদ লাগবে।
মেয়েকে রোদে ঘুরতে না দিলেও দিলশাদ নিজে অনেকক্ষণ একা একা রিকশা নিয়ে। ঘুরল। ভিসা হাতে পেয়ে তার খুব আনন্দ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল মেয়ের সুস্থ হয়ে ওঠার প্রথম ধাপটি শেষ হয়েছে। এই তো পাসপোর্টে ছমাসের ভিসার সিল মারা। প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যা শুরু হয় তা শেষও হয়। একদিন এই প্রক্রিয়া শেষ হবে।আনন্দিত মানুষ নিজের আনন্দ ছড়িয়ে দিতে চায়। আনন্দের খবর সবাইকে চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছা করে। দিলশাদের পরিচিত জনের সংখ্যা সীমিত। সেই সীমিত সংখ্যক মানুষদের ঘরে ঘরে খবরটা পৌঁছাতে ইচ্ছা করছে। দিলশাদ প্রথম গেল কলাবাগানে তার মার কাছে।
হাদিউজ্জামান সাহেব বাড়িতে ছিলেন না। তিনি তার পীর সাহেবের কাছে গিয়েছেন। মনোয়ারারও যাবার কথা ছিল। দাঁতের ব্যথার কারণে তিনি যান নি। দুদিন ধরে তিনি দাঁতের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন। আজ সেই ব্যথা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে। গাল ফুলে একাকার।দিলশাদ বলল, তোমার অবস্থা তো মা ভয়াবহ! তোমার দিকে তাকানো যাচ্ছে না।মনোয়ারা হাসলেন। দিলশাদ তীক্ষ্ণ গলায় বলল, এই অবস্থায় তুমি হাসছ কী করে মা? মনোয়ারা বললেন, অনেকদিন পর তুই হাসিমুখে ঘরে ঢুকেছিস। তোর হাসিমুখ দেখে হাসলাম রে মা। আজ তোর মনটা খুশি কেন?
আজ ভিসা হয়েছে। ভিসা নিয়ে একটা দুঃশ্চিন্তা হচ্ছিল– দেয় কি দেয় না। সেই দুঃশ্চিন্তা দূর হয়েছে। এখন টিকিট কাটব।আলহামদুলিল্লাহ। আয় আমার সঙ্গে দুই রাকাত শোকরানা নামাজ পড়।থাক মা।থাকবে কেন, আয়।আমি অফিসের কাপড় পরে আছি। তেমন পরিস্কার নেই।আমি পরিষ্কার শাড়ি দিচ্ছি। আয় তো মা। এখন থেকে বুঝলি মা, প্রতি পদে পদে আল্লাহর কাছে শোকরানা আদায় করে এগুবি দেখবি কোনো সমস্যা হবে না।দিলশাদকে তার মা’র সঙ্গে নামাজ পড়তে হলো। অনেকদিন পর নামাজে দাঁড়িয়ে তার লজ্জা লজ্জা করছিল। তার কেবলি মনে হচ্ছে এই বুঝি ভুল করবে। রুকুতে গিয়ে সিজদার দোয়া পড়ে ফেলবে।
নামাজের শেষে মনোয়ারা বললেন, মা আয়, দুজনে একসঙ্গে আল্লাহর কাছে দোয়া করি। হাত তোল। দুই মা একসঙ্গে আল্লাহর কাছে হাত তুলছে এটা অনেক বড় ব্যাপার। মা’দের ব্যাপারে আল্লাহপাকের দুর্বলতা আছে।দিলশাদ হাত তুলল। মনোয়ারা বেগম প্রার্থনা শুরু করলেন। তাঁর গলার স্বর নিচু কিন্তু প্রতিটি বাক্য স্পষ্ট।হে পরম করুণাময়। তুমি করুণা কর। অবোধ নিষ্পাপ শিশুকে তুমি ভয়াবহ ব্যাধি দিয়েছ। কেন দিয়েছ তা তুমিই জানো। আমরা অতি ক্ষুদ্র মানুষ তোমার, কাজ বোঝার সাধ্য আমাদের নাই। বোঝার চেষ্টাও করব না। শুধু আমরা আমাদের মনের কষ্টের কথা তোমাকে জানাই। তুমি কষ্ট দূর কর আল্লাহপাক। ছোট্ট শিশুটাকে মুক্ত করে দাও।…
