আমি খেতে বসেছি। চেয়ারে বসেই বাদলকে ডাকলাম, বাদল খেতে আয়। বাদলের জন্যে একটা প্লেট দেখি।ফুপা বললেন, ও তো ঢোঁকই গিলতে পারছে না। ভাত খাবে কি? তুই তো ওর ব্যাপারটা বুঝতেই পারছিস না।আমি ফুপাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ডাকলাম—বাদল আয়।বাদল উঠে এল। আমার আদেশ অগ্রাহ্য করা সবার পক্ষেই সম্ভব। বাদলের পক্ষে না।
আমি অন্য সবাইকে সরে যেতে বললাম। খাওয়ারসময় একগাদা লোক তাকিয়ে থাকলে খেয়ে আরাম নেই। নিজেকে জামাই জামাই মনে হয়।‘বাদল শোন, তোর পেটে খিদে, তুই খেয়ে যাবি। গলায় ব্যথা করবে—করুক। কিছু যায় আসে না। আপতত কিছু সময়ের জন্যে গলাটাকে পাত্তা দিবি না। কাঁটা থাকুক কাঁটার মত, তুই থাকবি তোর মত। বুঝতে পারছিস?’
‘হুঁ।’ ‘আরাম করে তুই আমার সঙ্গে ভাত খাবি। ভাত খাওয়ার পর আমরা মিষ্টি পান খাব। তারপর তোর কাঁটা নামানোর ব্যবস্থা করব।’ ‘হিমু ভাই , আগে করলে হয় না!’ ‘হয়। আগে করলেও হয়—তাতে কাঁটাটাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। আমরা ফুলকে গুরুত্ব দেব—কাঁটাকে না। ঠিক না?’ ‘ঠিক।’ ‘আয়, খাওয়া শুরু করা যাক।’
বাদল ভাত মাখছে। আমি বললাম, শুকনা মরিচ ভাল করে ডলে নে—ঝালের চোটে নাক দিয়ে, মুখ দিয়ে পানি বেরুবে, তবেই না খেয়ে আরাম। শুরু করা যাক—রেডি সেট গো… বাদল খাওয়া শুরু করল। কয়েক নলা খেয়েই হতভম্ব গলায় বলল, হিমু ভাই, কাঁটা চলে গেছে বলে মনে হচ্ছে! ‘চলে গেলে গেছে। এতে আকাশে থেকে পড়ার কি আছে? খাওয়া শেষ কর।’ ‘ওদের খবরটা দিয়ে আসি?’ ‘এটা এমন কোন বড় খবর না যে মাইক বাজিয়ে শহরে ঘোষণা দিতে হবে। আরাম করে খা তো। আলু ভাজিটা অসাধারণ হয়েছে না?’
‘অমৃত ভাজির মত লাগছে।’ ‘ঘি দিয়ে চপচপ করে খা, ভাল লাগবে।’ ‘আজ তুমি না এলেই মরে যেতাম। আমি সবাইকে বলেছি, হিমু ভাই-ই কেবল পারে এই কাঁটা দূর করতে। কেউ আমার কথা বিশ্বাস করে না?’ ‘মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কিছু যায় আসে না। তোর নিজের বিশ্বাসটাই প্রধান।’ ‘ইরা তো তোমাকে দিয়ে হাসাহাসি করছিল।’ ‘তাই না-কি?’ ‘হ্যাঁ। আমি যখন বললাম, হিমু ভাই হচ্ছে মহাপরুষ, তখন হাসতে হাসতে সে প্রায় বিষম খায়। আজ তার একটা শিক্ষা হবে।’
বাদলের চোখে পানি এসে গেছে। ঝালের কারণে চোখের পানি, না আনন্দের পানি সেটা বোঝা যাচ্ছে না।একেক ধরনের চোখের পানি একেক রকম হওয়া উচিত ছিল। দুঃখের চোখের পানি হবে এক রকম, আনন্দের পানি অন্য রকম, আবার ঝালের অশ্রু আরেক রকম। প্রকৃতি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আবেগের ব্যবস্থা রেখেছে কিন্তু সব আবেগের প্রকাশ চোখের পানি দিয়ে সেরে ফেলেছে। ব্যাপারটা কি ঠিক হল?
দুঃখের চোখের পানি হবে নীল। দুঃখ যত বেশি হবে নীল রং হবে তত গাঢ়। রাগ এবং ক্রোধের অশ্রু হবে লাল। দুঃখ এবং রাগের মিলিত কারণে যে চোখের পানি তার রঙ হবে খয়েরি। নীল এবং লাল মিশে খয়েরি রঙই তো হয়? কাঁটা মুক্তির যে আনন্দ এ বাড়িতে শুরু হল তার কাছে বিয়েবাড়ির আনন্দ কিছু না। ফুপু ছেলেকে জড়িয়ে ধরে মরাকান্না শুরু করলেন। বাদল যতই বলে, কি যন্ত্রণা! মা, আমাকে ছাড় তো। তিনি ততই শক্ত করে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন।
ফুপা আনন্দের চোটে তাঁর হুইস্কির বোতল খুলছেন। আজ বৃহস্পতিবার। এম্নিতেই তাঁর মদ্যপান দিবস। ছেলের সমস্যার জন্যে খেতে পারছিলেন না। এখন ডবল চড়াবেন। ফুপা যে দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাচ্ছেন সংস্কৃত কবিরা সেই দৃষ্টিকে বলেন “প্রেম-নয়ন”। শুধু ইরার চোখ কঠিন। পাথরের চোখেও সামন্য তরল ভাব থাকে। তার চোখে তাও নেই।
রাতে ফুপার বাড়িতে থেকে গেলাম। আজ আমার থাকার জায়গা হল গেস্ট রুমে। এই বাড়ির গেস্ট রুম তালাবন্ধ থাকে। বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর গেস্ট এলেই শুধু তালা খোলা হয়। আজ আমি বিশেষ শ্রেণীর একজন গেস্ট। ঘুমুতে যাবার আগে আগে আমার জন্যে কফি চলে এল। এটিও বিশেষ ব্যবস্থার একটা অঙ্গ। কফি নিয়ে এল ইরা।
ইরা সম্পর্কে এ পর্যন্ত তথ্য যা সংগ্রহ করেছি তা হচ্ছে—মেয়েটা শামসুন্নাহার হলে থেকে পড়ে। তার অনার্স ফাইন্যাল পরীক্ষা। হলে পড়াশোনার সমস্যা হচ্ছে, তাই এ বাড়িতে চলে এসেছে।ফুপার খালাতো ভাইয়ের বড় মেয়ে। দারুণ নাকি ব্রিলিয়ান্ট। না পড়লেও না-কি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হবে। তারপরেও পড়েছে, কারণ রেকড মারক পেতে চায়।আপনার বিশেষ এক অলৌকিক ক্ষমতা দেখালেন? আমি কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে বললাম, তোমার সে রকম ধরণা না?
‘অবশ্যই না। বাদলের আপনার উপর অগ্যধ বিশ্বাস। আপনাকে দেখে সে রিলাক্সড বোধ করেছে। সহজ হয়েছে। ভয়ে–আতংকে তার গলার মাংসপেশী শক্ত হয়ে গিয়েছিল, সেই ভাবও দূর হয়েছে। তারপর আপনি তাকে ভাত খাওয়ালেন। সহজেই কাঁটা বের হয়ে এল, আমি কি ভুল বলছি?’ ‘না, ভুল হবে কেন।’ ‘নিতান্তই লৌকিক একটা ব্যাপার করে আপনি তাতে একটা অলৌকিক ফ্লেবার দিয়ে ফেলেছেন—এটা কি ঠিক হচ্ছে?’
‘আমি কোন ফ্লেবার দেইনি ইরা, এটা তুমি কল্পনা করছ।’ ‘আপনি না দিলেও অন্যরা দিচ্ছে। বাদল দিচ্ছে। আপনার ফুপা-ফুপু দিচ্ছেন।’ ‘তাতে ক্ষতি তো হচ্ছে না। তোমার মত যারা বুদ্ধিমান তারা ঠিকই আসল ব্যাপারটা ধরতে পারছে। ইরা কঠিন গলায় বলল, আমাদের সমাজে কিছু কিছু প্রতারক আছে, যারা হাত দেখে, গ্রহ-নক্ষত্র বিচার করে, পাথর দেয় মন্ত্র-তন্ত্র পড়ে—আপনি কি তাদের চেয়ে আলাদা? আপনি আলাদা না, আপনি তাদের মতই একজন। ‘হতে পারে। কিন্তু তুমি আমার উপর এত রেগে আছে কেন?’
‘আপনি যে শূরু থেকেই আমাকে তুমি তুমি করে বলছেন—সেটাও আমার খারাপ লাগছে। আমি তো স্কুলে পড়া বাচ্চা মেয়ে না। আপনি আমাকে চেনেনও না। প্রথম দেখাতেই আপনি আমাকে তুমি বলবেন কেন?’ ‘ভুল হয়েছে। একবার যখন বলে ফেলেছি সেটাই বাহাল রাখি। মানুষ আপনি থেকে তুমিতে যায়। তুমি থেকে আপনিতে যায় না। নিয়ম ভাঙা কি ঠিক হবে?’ ‘এখন থেকে আপনি করে বলব।’ ‘ধন্যবাদ। আরেকটা কাজ কি দয়া করে করবেন?’
‘অব্যশই করব। বলুন।’ ‘বাদলকে ডেকে একটু কি বুঝিয়ে বলবেন তার গলার কাঁটাটা কি ভাবে গেল? ওর মন থেকে আধিভৌতিক ব্যাপারগূলি দূর করা দরকার। আপনি বুঝিয়ে বলে দিন। আমার বলায় সে কনভিন্সড হবে না। আমি ওকে সঙ্গে নিয়ে আসি।’ ‘জ্বি আচ্ছা, নিয়ে আসুন।’
ইরা বাদলকে নিয়ে ঢুকল। আমি বললাম, বাদল, তুই স্থির হয়ে আমার সামনের চেয়ারটায় বোস। মিস ইরা, আপনিও বসুন। তবে আপনাকে স্থির হয়ে না বসলেও চলবে। আপনি ইচ্ছা করলে নড়াচড়া করতে পারেন।ইরা তাকাচ্ছে তীব্র চোখে।
আমি তার সেই চোখ সম্পৃণ অগ্র্যহ্য করে বাদলের দিকে তাকিয়ে বললাম, বাদল শোন, তুই যদি ভেবে থাকিস আমি আমার মহা ক্ষমাতবলে তোর গলার কাঁটা গলিয়ে পেলেছি, তাহলে তুই বোকার স্বর্গে বাস করছিস। কি ভাবে সেই ঘটনা ঘটল তা ইরা খুব সুন্দর করে ব্যাখ্যা করে দেবে। ব্যাখ্যা শূনে তারপর ঘুমাতে যাবি। তার আগে না। মনে থাকবে?
‘থাকবে।’
‘যা ভাগ।’
বাদল হাসিমুখে উঠে দাঁড়িয়েছে। ইরা এখনো তীব্র চোখে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে সে খুব অপমানিত বোধ করছে। মেয়েটা সুন্দর। এরকম সুন্দর একটা মেয়ে ফিজিক্স পড়ছে কেন? ফিজিক্স পড়বে শূকনা রস কষহীন মেয়েগুলি। ইরার পড়া উচিত ইংরেজি কিংবা বাংলা সাহিত্য।আমি চাদর মুড়ি দিয়ে শূয়ে পড়লাম। ফোম বিছানো গদি—আরামের বিছানা। এত আরামের বিছানায় কি ঘুম আসবে?
‘হিমু, হিমু।’
‘জ্বি।’
‘তোর সঙ্গে কিছু গল্প গুজব করা যাক—ম্যান টু ম্যান টক। তু্ই আজ ভালই ভেল্কি দেখালি। দরজা খোল। হিমু, হিমু।’ মাতাল দরজা খোলাতে চাইলে খুলিয়ে ছাড়ব। ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যান করতেই থাকবে। কাজেই দরজা খুললাম। বড় ফুপা গ্লাস এবং বোতল হাতে ঢুকে পড়লেন।
‘তোর ফুপু ঘুমিয়ে পড়েছে। খুব টেনশনে গেছে তো, এখন আরামে ঘুমুচ্ছে। আমি ভাবলাম ‘কন্টক-মু্ক্তিটা’ সেলিব্রেট করা যাক। কন্টক-মু্ক্তি শব্দটা কেমন লাগছে? ‘ভাল লাগছে।’ ‘কন্টক মুক্তির ইংরেজী কি হবে?“Freedom from thorn?” ফুপা আপনি দ্রুত চালাচ্ছেন। আমার মনে হয় এখন উচিত শুয়ে ঘুমিয়ে পড়া।’
‘তোর সঙ্গে গল্প করতে এসেছি। গল্প করতে ভাল লাগছে। আমার ধারণা তোর উপর ইনজাসটিস করা হয়েছে। তোকে যে আমি বা তোর ফুপু দেখতে পারি না এটা অন্যায়। ঘোরতর অন্যায়। তোর অপরাধ কি? আমি পয়েন্ট বাই পয়েন্ট ভেবেছি। তোর নেগেটিভ দিকগুলো কি— এক. তোর চাকরি বাকরি নেই। এটা কোন ব্যাপার না, পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ লোক পৃথিবীর সব পযটকরাই অপরাধি।
‘আর খাবেন না ফুপা।’ ‘কথার মাঝখানে কথা বলিস না হিমু। আমি কি যেন বলছিলাম?’ ‘পযটকদের সম্পর্কে কি যেন বলছিলেন।’ ‘কোন পযটক? হিউয়েন সাং? হিউয়েন সাং এর কথা খামাখা বলব কেন?’ ‘আর না খেলে হয় না ফুপা?’ ‘হয়। হবে না কেন? তবে আনন্দ পরিপৃর্ণ হয় না। হিউয়েন সাং-এর কথা কি বলছিলাম?’ ‘আমার ঠিক মনে পড়ছে না।’ ‘শোন হিমু, তুই লোক খারাপ না। এবং তোর ক্ষমতা আছে। বাদল যে তোর নাম বলতে অজ্ঞান হয়ে যাব, বদলের কোন দোষ নেই। I Like You Himu.’ থ্যংক ইউ ফুপা।’
‘তোর একটাই অপরাধ তুই শুধু হাঁটিস। এই অপরাধ ক্ষমা করা যায়। হিউয়েন সাংওতো হেঁটেছে। এই দেখ আবার হিউয়েন সাং-এর কথা চলে এসেছে। বারবার এই নাক চ্যাপ্টা চাইহীজটার কথা কেন বলছি কিঝুই বুঝতে পারছি না।’
ফুপা চোখ মুখ উল্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তারপড় হড়হড় শব্দ হতে লাগল। র্দীঘ নিঃশ্বাস ফেলা ছাড়া আমার কিছু করার নেই। ফুপা বিছানাতে বসেছিলেন। বিছানা এবং আমার শরীরের এক অংশ তিনি ভাসিয়ে ফেলেছেন। বিড় বিড় করে বলছেন,“ I am a dead man, I am a dead man,” বদরুল সাহেব আমাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন, কোথায় ছিলেন এতদিন?
তাঁর গলা মোটা, শরীর মোটা, বৃদ্ধিও মোটা। আমি আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি প্রশস্ত মানুষের অন্তরও প্রশস্ত হয়। বদরুল সাহেবের অন্তর প্রশস্ত, মনে মায়াভাব প্রবল। আমি ছ’-সাত দিন ধরে মেসে আসছি না। কেউ হয়ত ব্যাপারটা লক্ষ্যই করেনি। তিনি ঠিকই লক্ষ্য করেছেন। আমাকে দেখে তিনি যে উল্লাসের ভঙ্গি করলেন সেই উল্লাসে কোন খাদ নেই। ‘কোথায় ছিলেন রে ভাই?’
আমি হাসলাম। অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর আমি ইদানীং হেসে দেবার চেষ্টা করছি। একেক ধরনের প্রশ্নের উত্তরে একেক ধরনের হাসি। এখন যে হাসি হাসলাম তার অর্থ হচ্ছে—আশেপাশেই ছিলাম।বদরুল সাহেব বললেন, গত বৃহস্পতিবার মেসে ফিস্ট হল। বিরাট খাওয়া-দাওয়া। পেলেও, খাসির রেজাল সালাদ। খাসির মাৎস আমি নিজে কিনে এনেছিলাম। একটা আস্তে খাসি দেখিয়ে বললাম, হাফ আমাকে দাও, নো হাংকি-পাংকি।
‘হাফ দিয়েছিল?’ ‘দিবে না মানে? মাংস কেটে আমার সামনে পিস করতে চায়। আমি বললাম, খবর্দার, আগে ওজন করে তারপর পিস করবে।’ ‘আগে পিস করলে অসুবিধা কি?’ ‘আগে পিস করতে দিলে উপায় আছে? ফস করে বাজে গোসত মিক্স করে ফেলবে। কিছু বুঝতেই পারবেন না। ম্যাজিক দেখিয়ে দেবে। খাসির গোশত কিনে নিয়ে রান্না করার পর খেতে গিয়ে বুঝবনে পাঁটার গোশত। মিস্টার পাঁটা।’
বদরুল সাহেবের সঙ্গে আমার দেখা মেসের সিঁড়িতে, তিনি বেরুাচ্ছিলেন। আমাকে দেখে আমার পেছনে পেছনে ঘরে এসে ঢুকলেন। ফিস্টের ব্যাপারটা না বলে তিনি শান্তি পাবেন না। গোশত কেনা থেকে যে গল্প শুরু হয়েছে সেই গল্প শেষ হবে খাওয়া কিভাবে হল সেখানে। আমি ধৈর্ঘ নিয়ে গল্প শোনার প্রস্ততি নিচ্ছি। খাওয়া-দাওয়ার যে কোন গল্পে ভদ্রলোকের অসীম আগ্রহ। এত আনন্দের সঙ্গে তিনি খাওয়ার গল্প করেন যেন এই পৃথিবী সৃষ্টিই হয়েছে খাওয়ার জন্যে। খাওয়া ছাড়াও যে গল্প করার আরো বিষয় থাকতে পারে ভদ্রলোক তা জানেন না।
‘খু্ব চর্বি হয়েছিল। গোশতের ভাজে ভাজে চর্বি।’ ‘বাহ, ভাল তো।’ ‘চর্বিদার গোশত রান্না করা কিন্তু খুব ডিফিকাল্ট। বাবুর্চি করে কি—যেতেতু চর্বি বেশি, তেল দেয় কম। এটা খুব ভুল। চর্বিদার গোশত তেল লাগে বেশি।’ ‘জানতাম না তো।’ ‘অনেক ভাল ভাল বাবুর্চিই ব্যাপারটা জানে না। রান্না তো খুব সহজ ব্যাপার না। আমি নিজে বাবুর্চির পাশে বসে দেখিয়ে দিলাম।’ ‘খেতে কেমন হয়েছিল?’
‘আমি নিজের মুখে কি বলব—আপনার জন্য রেখে দিয়ছি। চেখে দেখবেন।’ ‘রেখে দিয়েছেন মানে? বৃহস্পতিবার ফিস্ট হয়েছে, আজ হল শনিবার।’ ‘দুই বেলা গরম করেছি। নিজের হাতেই করেছি। অন্যের কাছে এইসব দিয়ে ভরসা পাওয়া যায় না। ঠিকমত জ্বাল দেবে না। বসুন, আমি নিয়ে আসছি।’
তিনি আনন্দিত মুখে গোশত আনতে গেলেন। আজ দিনটা মনে হয় ভালই যাবে। সকালে ভরপেট খেয়ে নিলে সারাদিন আর খাওয়া নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। বড় ফুপার বাসা থেকে ভোরবেলা বের হয়েছি। সবাই তখনো ঘুমে। কাজের মেয়েটা জেগে ছিল। সেই দরজা খুলে দিল। বেরিয়ে আসার সময় টুক করে এক কদমবুসি। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, ব্যাপার কি?
সে নিচু স্বরে বলল, খাস দিলে আফনে এটু দোয়া করবেন ভাইজান। আমার মাইয়াটা বহুত দিন হইছে নিখোঁজ। ‘বল কি? কতদিন হয়েছে নিখোঁজ।’ ‘তা ধরেন গিয়া দুই বচ্ছর হইছে। এক বাড়িত কাম করত। এরা মাইর-ধইর করতো—একদিন বাড়ি থাইক্যা পালাইয়া গেছে। আর কোন খুঁইজ নাই।’
সমাজে সর্বনিম্ন স্তরে যাদের বাস তাদের আবেগ-টাবেগ বোধহয় কম থাকে। দু’বছর ধরে মেয়ে নিখোঁজ এই সংবাদ সে দিচ্ছে সহজ গলায়। যেন তেমন কোন বড় ব্যাপার না।
‘নাম কি তোমার মেয়ের?’
‘লুৎফুন্নেসা। লুৎফা ডাকি।’
‘বয়স কত?’
‘ছোট মাইয়া, সাত-আট বছর। ভাইজান, আফনে এটু চেষ্টা নিলে মেয়েটার ফিরত পাই। মেয়ে ঢাকা শহরেই আছে।’ ‘জান কি করে ঢাকা শহরে আছে?’ ‘আয়না পড়া দিয়া জানছি। ধনখালির পীর সাব আয়না পড়া দিয়া পাইছে। অখন আফনে একটু চেষ্টা নিলে…’ ‘আচ্ছা দেখি।’
সে আবার একটা কদমবুসি করে ফেলল।সকালের শুরুটা হল কদমবুসির মাধ্যমে। শুরু হিসেবে মন্দ না। সাধু-সন্ন্যাসীর স্তরে পৌঁছে যাচ্ছি কি-না বুঝতে পারছি না। সাধু-সন্ন্যাসীরা পায়ের পবিত্র ধূলি বিতরণের মাধ্যমে সকাল শূরু করেন। তারপরের অংশে ভুরি ভোজন, ঘি, হালুয়্য, পারেট মাংস।
বদরুল সাহেব তাঁর বিখ্যাত খাসির গোশতের বাটি নিয়ে এসেছেন। গোশত বলে সেখানে কিছু নেই। জ্বালের চোটে সব গোশত গলে কালো রঙের ঘন স্যুপের মত একটা বস্ত তৈরি হয়েছে। চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেলা যায়। তবে বদরুল সাহেবের বিবেচনা আছে। তিনি সঙ্গে চায়ের চামচ এনেছেন। আমি সেই চামচে তরল খাসির মাংস এক চুমুক মুখে দিয়ে বললাম, অসাধারণ! রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার কাছাকাছি।বদরুল সাহেব উজ্জ্বল মুখ করে বললেন, বাসি হওয়ার টেন্ট আরো খুলেছে, তাই না? গোছতের ঐ মজা যত বাসি তত মজা। টেস্টে খুলছে না?
‘খুলছে বললে কম বলা হয়।এক্কেবারে ডানা মেলে দিয়েছে।’ ‘গরম গরম পরোটা দিয়ে খেলে আরো আরাম পেতেন! আপনি একটু ওয়েট করুন, আমি দৌড় দিয়ে দু’টা পরোটা নিয়ে আসি। সাড়ে ছ’টা বাজে, মোবারকের স্টলে পরোটা ভাজা শুরু করেছে।’ ‘পরোটা আনার দরকার নেই। আপনি আরাম করে বসুন তো। বরং এক কাজ করুন, আরেকটা চামচ নিয়ে আসুন, দু’জনে মিলে মজা করে খাই।’
‘না না, অল্পই আছে।’
‘নিয়ে আসুন তো চামচ। ভাল জিনিস একা খেয়ে আরাম নেই।’
‘এটা একটা সত্য কথা বলেছেন।’
Read more
