আপাতত যে কোনাে একজন মানুষ আমার দরকার। তাকে সঙ্গে নিয়ে কর্নেলের খোঁজে বেরিয়ে পড়ব। এ এলাকার কোনাে জায়গাই আমার চেনা নয়। সেজন্যেই এমন কাকেও দরকার, যে এলাকাটা ভালভাবে চেনে। | ওকজঙ্গলটা ঢালু হয়ে নেমে আবার টিলার দিকে উঠেছে। প্রায় দৌড়ে পিচের রাস্তা থেকে নেমে ওই জঙ্গলের রাস্তায় গেলুম। তারপর জঙ্গলটা আমাকে গিলে নিল। খুব সরু রাস্তা-মনে হল, প্রাইভেট রােড। বড় বড় পাথর বসিয়ে কোনরকমে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে যেন।

এই পথটুকু পেরােতে খুব বেশি সময় লাগল না। তারপর দেখলুম, আমি মােটামুটি ফাকা একটা জায়গায় পৌছে গেছি। রাস্তাটা ঘুরে টিলার গায়ে উঠেছে। এবং আন্দাজ দেড়শাে থেকে দুশাে ফুট উঁচুতে একটা বাড়ি আবছা দেখা যাচ্ছে। ওই বাড়ির একটা জানলাতেই আলােটা দেখা যাচ্ছে। বাকি অংশ অন্ধকার। | হাঁফাতে হাঁফাতে যখন ওই দেড়শাে বা দুশাে ফুট উঁচুতে বাড়িটার গেটে পৌছেছি, তখন বড় বাস্তার দিকে যেন গাড়ির শব্দ শুনতে পেলুম। একঝলক আলােও গাছপালার মাথায় শিসিয়ে উঠল। তারপর মিলিয়ে গেল। তাহলে রাস্তায় অপেক্ষা করলেও চলত।
যাই হােক, যখন এসে পড়েছি, স্থানীয় লােকের সাহায্যই ভাল হবে। গেট খুলে লনে দাঁড়ালুম। একটু ইতস্তত করলুম। নিশ্চয় অনধিকার প্রবেশ করছি। আবছা যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, বাড়ির মালিক শৌখিন এবং পয়সাওলা মানুষ। নিশ্চয় কোনাে শৌখিন পুঁজিপতির শৈলাবাসে হানা দিতে যাচ্ছি। লােকটা ধমক দিয়ে ভাগিয়ে দেবে না তাে? আরেকটা ভয় আবশ্য ছিল—তা কুকুরের। কিন্তু গেটে টর্চের আলাে ফেলেও কোনাে কুকুর গর্জাল না যখন, তখন বাড়িতে কোনাে কুকুর নেই তা নিশ্চিত। | মরিয়া হয়ে এগােলাম। নুড়িবিছানাে রাস্তায় আমার গামবুট দেবে যাচ্ছিল। শব্দ হচ্ছিল জোর। কিন্তু কোনাে লােকের সাড়া পেলুম না তখনও।
কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর অংশ-২৩
সামনে কয়েক ধাপ কাঠের সিঁড়ির ওপর বারান্দা দেখতে পেলুম। তিনটে হাল্কা চেয়ার রয়েছে। বারান্দাভর্তি অজস্র টব। টবে গাছপালা আছে। আলাে ফেললেও কেউ ধমক দিয়ে তেড়ে এল না। অথচ একটা ঘরে আলাে জ্বলছে। পর্দা থাকায় ভিতরটা দেখা যাচ্ছে না। আমি বারান্দায় ইচ্ছে করে জুতাের শব্দ তুললুম। তারপর কাশলুম। তবু কোনাে সাড়া নেই। ব্যাপার কী?
এবার একটু ইতস্তত করে ইংরিজিতে বলে উঠলম—কেউ আছেন কি সার?
তবু কোনাে সাড়া নেই। আবার ডাকলুম। তবু জবাব নেই। তখন খুব জোরে বাঁদিকে আলােজ্বলা ঘরটার দরজায় ধাক্কা দিলুম। :
এতক্ষণে মেয়েলি গলার চাপা ভিতু ধরনের সাড়া এল—কে ?
তখন খানিকটা রাগ হয়েছে আমার। অদ্ভুত ব্যাপার তাে এই সবে সন্ধ্য হল। এরি মধ্যে নাক ডাকিয়ে ঘুমােনাে হচ্ছিল ? একটু ক্ষুব্ধ স্বরে বললুম-বাঘ ভালুক নই, একজন বিপন্ন মানুষ। দয়া করে বেরােবেন কি?
পরিষ্কার কথা ভেসে এলনা।।
কী আশ্চর্য। আপনি না বেরােন, কোনাে পুরুষমানুষকে ডেকে দিন। —কোনাে পুরুষমানুষ নেই এখন। —সে কী! আপনি একা আছেন? —হ্যা। -কে আপনি? —আপনি কে?
পাল্টা প্রশ্ন শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেলুম। ঠিকই তাে! নিজের পরিচয়টা আগে দেওয়া উচিত। কণ্ঠস্বর ভদ্র ও বিনয়ী করে বললুম—দেখুন আমার নাম জয়ন্ত চৌধুরী। কলকাতা থেকে এসেছি। বিখ্যাত দৈনিক সত্যসেবকের একজন সাংবাদিক।
—আমি তাে কোনাে ভি আই পি নই। আমার কাছে কী চান?
কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর অংশ-২৩
—আহা! কথাটা শেষ করতে দিন! আমি এসেছিলুম হীরাকুণ্ডা ফরেস্ট এলােয়। শিকারের হবি আছে, তাই। আমার সঙ্গে এসেছিলেন প্রখ্যাত প্রাইভেট নভেস্টিগেটর এবং হত্যাসংক্রান্ত অপরাধবিজ্ঞানী কর্নেল নীলাদ্রি সরকার…
বাধা এল।—কী বললেন?
-কর্নেল সরকার। -হত্যা না কী বললেন? —আজ্ঞে হ্যা। উনি খুনটুনের ব্যাপারে শৌখিন গােয়েন্দাগিরি করেন। —এখানে কেউ খুন হয়নি। আপনারা চলে যান এখান থেকে।
—আহা, কথাটা আগাগােড়া তাে শুনবেন। কর্নেল একটু আগে জঙ্গলে হারিয়ে গেছেন। খুঁজে পাচ্ছি না, তাই…
—মিসিংস্কোয়াডে খবর দিন না! হীরাকুণ্ডা টাউনশিপের থানায় চলে যান। মাত্রা তিন মাইল রাস্তা !
—আপনি তাে ভারি অদ্ভুত! দরজাটা খুলে আগে সবটা শুনুন! —আপনি যে চোরাকাত নন, তার প্রমাণ কী?
প্রমাণ? ভীষণ খাপ্পা হয়ে পকেটে হাত ভরলুম। তারপর আমার সরকারি প্রেসকার্ড এবং অফিসের পরিচিতিপত্র (ছবিসমেত) বের করে বললুম-এই কার্ডদুটো দেখুন। দরজা ফাক করুন, ফেলে দিচ্ছি।
–ওপাশে জানলা খােলা আছে, ফেলে দিন!
-কী অদ্ভুত! বারান্দার আলােটা জ্বেলে দিন না। আমার টর্চের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেল যে।।
–বারান্দ। আর ওদিকের ঘরের কানেকশান কাটা। আলো জ্বলছে না। —কাটা মানে।
-হ্যা, কেউ কেটে দিয়েছে! বলে কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকার পর ফের শােনা গেল—আমিও আপনার মতাে বিপন্ন।
কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর অংশ-২৩
একলাফে নেমে গিয়ে জানলা দিয়ে কার্ডদুটো ভিতরে ছুড়ে দিলুম। তারপর বারান্দায় ফিরলুম। বললুম-এবার বিশ্বাস হল ?
দীর্ঘ দুটি মিনিট চুপচাপ থাকার পর দরজাটা একটু ফাক হল তারপর একটি শরীরের ওপরের দিকটা একটুখানি উঁকি মারল। টর্চের ব্যাটারি সত্যি ফুরিয়ে এসেছিল। তাই চেহারাটা স্পষ্ট বােঝা গেল না।
মহিলাটি ডাকলেন—আসুন।
আমি প্রায় হুড়মুড় করে ভিতরে গেলুম। অমনি উনি দরজা বন্ধ করে দিলেন।
ঘরে একটা উজ্জ্বল বা জ্বলছে। ওঁর দিকে তাকিয়ে আমার চোখদুটো সঙ্গে সঙ্গে ঝলসে গেল। এক আশ্চর্য সুন্দরী যুবতী আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু মুখে কেমন চাপা উদ্বেগ, চেহারা বেশ খানিকটা বিস্ত, চুল এলােমেলাে, শাড়ির ওপর একটা ড্রেসিং গাউন চড়ানাে আছে কিন্তু ফিতে খােলা। তাহলেও বােঝা গেল, উনি শুয়ে ছিলেন না—সম্ভবত ঘরের মধ্যে শ্রমসাপেক্ষ কোনাে কাজ করছিলেন এতক্ষণ। সেই শ্রমের চিহ্ন ওঁর কপালে চিবুকে ও নাকের ডগায় বিন্দুবিন্দু ঘামে প্রতিভাত হচ্ছে। আমি হাঁ করে তাকিয়ে
আছি দেখে উনি বললেন—বসুন মিঃ চৌধুরী।
বসলুম। ততক্ষণে কর্নেলের কথা চাপা দিয়ে এই যুবতীর সম্পর্কে একটা তীব্র কৌতুহল এসে পড়েছে। কে ইনি? এমন একা কেন ? কোনাে লােকজন আয়া পরিচারিকা বা চাকরবাকর কেউ নেই। তার ওপর ওপাশের ঘরের ও বাইরের বারান্দায় নাকি কেউ আলাের তার কেটে রেখেছে। তারের কথা ভাবতে গিয়ে আমার চোখে পড়ল কোনার টেবিলে একটা ফোনও রয়েছে।
Read More
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর অংশ-২৪