বিপদের সঙ্গে সবসময় আপন শব্দটি যুক্ত হয়। আপদ একটি স্ত্রীবাচক শব্দ। অনেক বিপদ স্ত্রীলোক নিয়ে আসে বলেই কি আপদ? আমরা বলি আপদ জুটেছে। এর অর্থ নিশ্চয়ই বিপদ নিয়ে আসবে এমনি এক মহিলা কপালে, জুটে গেছে।আমার দীর্ঘ জীবনে অনেক আপাদের মুখোমুখি হয়েছি। তারা স্ত্রীলোক হিসেবে যেমন এসেছে পুরুষ হিসেবেও এসেছে। কিছু গল্প করা যেতে পারে।
শহীদুল্লাহ হলে থাকি। হাউস টিউটর। এক ছুটির দিনে আপন জুটে গেল। ড্রয়িংরুমে গোঁফওয়ালা এক যুবক বসা, গাট্টাগোট্টা শরীর। অত্রি গম্ভীর। নাম বাহাদুর। সে লেখক স্যারের সঙ্গে দেখা না করে বিদায় হবে না। প্রয়োজনে চব্বিশ ঘণ্টা ঠায় বসে থাকবে।আমি আপদের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। সে অতি বিনয়ে কদমবুসি করতে করতে বলল, আপনাকে একটা উপহার দিতে এসেছি। উপহার গ্রহণ করলে খুশি হব। নিতেই হবে।আমি বললাম, উপহারটা কী?
আমার একটা কিড়নি।আমি বললাম, আমার দুটা কিডনি সচল, তোমাটার আমার প্রয়োজন পড়ছে না।যদি কখনো প্রয়োজন পড়ে সে-কারণে জানিয়ে রাখলাম। স্যার, আপনি ধরে নিন আপনারই একটা কিডনি আমার শরীরে। যখন খবর পাব দিয়ে যাব। নো ডিলে।আচ্ছা যাও প্রয়োজন হলে খবর দেব। এখন যাও, কাজ করছি।
বাহাদুর বলল, মাঝে মাঝে আমি খোঁজ নিয়ে যাব কিডনির প্রয়োজন পড়ল কি না।আমি বললাম, তোমাকে এসে খোঁজ নিতে হবে না। ঠিকানা রেখে যাও, কিডনি নষ্ট হলেই খবর দেব।যুবক বলল, আমার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। একেক সময় একেক জায়গায় থাকি। আমিই এসে খোঁজ নিয়ে যাব।
আমাকে বলতে হলো, আচ্ছা।আমার জীবনে উপগ্রহের মতো আপদ জুটে গেল। সে অদ্ভুত অদ্ভুত সময়ে এসে খোঁজ নেয় আমার কিডনির কোনো সমস্যা আছে কি না। সে যে নিজের কিডনির খুব যত্ন নিচ্ছে সেটা জানাতেও ভোলে না।স্যার, চা-সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি। এতে কিডনির ক্ষতি হতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম করছি। দৈনিক সাত গ্লাস পানি খাচ্ছি। আপনাকে তো একটা খারাপ জিনিস দিতে পারি না। আপনার ব্লাডগ্রুপ কী? আমার ও-পজিটিল।
ব্লাডগ্রুপ জানি না।ব্লান্ডগ্রুপ জেনে রাখবেন স্যার। কিডনির ম্যাচিং-এ লাগে।এই কিডনিওয়ালাকে আমি একবার চাকরি দিয়েছিলাম। তিন মাস সে নুহাশপল্লীতে চাকরি করেছে। এখন অনেকদিন তার খোঁজ নেই। তার জিম্মায় থাকা আমার কিডনির খবর কী কে জানে! দ্বিতীয় আপদের কথা বলি। এই আপদ স্ত্রীলোক। আঠারো-উনিশ বছরের তরুণী। বাড়ি চিটাগাং। ঘটনাটা বলি।
কী কারণে যেন চিটাগাং গিয়েছি। উঠেছি এক হোটেলে। আমার কলিজিয়েট স্কুলের বন্ধু ওমপ্রকাশ (সে নিজেও লেখালেখি করে) আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে বলল, দোস্ত হিন্দু বিয়ে কীভাবে হয় দেখবে? আজ আমার এক আত্মীয়ার বিয়ে হচ্ছে।আমি বললাম, হিন্দু বিয়ে অনেকবার দেখেছি। আর না। হিন্দু বিয়েতে পুতুলখেলা টাইপ কিছু বিষয় আছে। আংটি খোঁজাখুঁজি। এইসব আমার পছন্দ না।
ওমপ্রকাশ বলল, দোস্ত যেতেই হবে। মেয়ে তোমার বিরাট ভক্ত। রাতে তোমার বই পাশে না নিয়ে ঘুমাতে পারে না। বাসর রাতে তোমার কোন বই পাশে থাকবে তাও ঠিক করা।আমি বললাম, কোন বই?
ওমপ্রকাশ বলল, আমি জানি না। তুমি জিজ্ঞেস করে জেনে নিও।এরপর না বলা শুধুমাত্র মহান লেখকদের পক্ষেই সম্ভব। আমি যেহেতু বাজারি লেখক (লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকদের হিসাবে) কাজই রাজি হয়ে গেলাম। বাসর রাতে মেয়েটির পাশে কোন বইটি থাকbe জানতে ইচ্ছা করছে।
কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ে হচ্ছে। মেয়ে সেজেগুজে সবার সামনে স্টেজ বসা। কোনো পুরোহিত বা এই জাতীয় কিছু দেখলাম না। মনে হচ্ছে হিন্দু বিয়ে এখন অনেক আধুনিক হয়েছে।ওমপ্রকাশ আমাকে মেয়েটির কাছে নিয়ে গেল। সেই মেয়ে যেহেতু কোনো লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে যুক্ত না, আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। আমাকে তার পাশে ছবি তোলার জন্য বসতে হলো। সে দুই হাতে আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল, তার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত সে এই হাত ছাড়বে না।
আমি হকচকিয়ে গেলাম। কারণ মেয়েটির মধ্যে হিস্টিরিয়ার সব লক্ষণ প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। বিয়ের উত্তেজনায় এবং অনাহারে (বিয়ের দিনে হিন্দু মেয়েদের না খেয়ে থাকতে হয়) সে মানসিক এবং শারীরিকভাবে দুর্বল। অতি সাধারণ চাপ সহ্য করার শক্তিও তার নেই।এর মধ্যে বরযাত্রী চলে এল। এবং বরপক্ষের একজন এগিয়ে এসে বলল, কন্যা আরেক পুরুষের হাত ধরে বসে আছে কেন? এই পুরুষ কে?
ওমপ্রকাশ ভীত গলায় বলল, উনি বিখ্যাত লেখক। উনার নাম হুমায়ূন আহমেদ। রেবা (মেয়ের নাম) তাঁর বিশেষ ভক্ত।বরকর্তা বললেন, বিশেষ ভক্ত হলে তার বই পড়বে। তার হাত ধরে বসে থাকবে কেন? অন্য কোনো ঘটনা অবশ্যই আছে। এই বিয়ে হবে না। আমরা ফেরত যাচ্ছি।
রেবা অজ্ঞান হয়ে এলিয়ে পড়ে গেল। তার হাতের মুঠি আলগা হলো। আমি উঠে দাঁড়ালাম। কাউকে যে কিছু বলব সেই উপায় নেই। ততক্ষণে ধন্ধুমার শুরু হয়েছে। বরপক্ষ এবং কনেপক্ষের মধ্যে তুমুল তর্তাতর্কি। কয়েকজনকে দেখলাম হাত গুটাচ্ছে।
ওমপ্রকাশ আমাকে ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে পরিস্থিতি সামলাতে গেল।পরে খবর নিয়েছি, বিয়ে লগ্নমতোই হয়েছে। এই শর্তে হয়েছে যে, মেয়ে কোনোদিন হুমায়ূন আহমেদ নামক লেখকের নাম উচ্চারণ করতে পারবে না এবং তার কোনো বই পড়তে পারবে না।দুই দেশী আপদের গল্প বললাম, এইবার বিদেশী আপদের গল্প। এই আপদ পুরুষ। বয়স ৩৬/৩৭, সুইডেনের নাগরিক। নাম মাসুদ আখন্দ।তোমার স্ত্রী-ছেলেমেয়ে বাংলাদেশে আসতে রাজি হবে?
সে সুইডেনে বেশ ভালো বেতনের সরকারি কর্মকর্তা। ছুটি কাটাতে দেশে এসেছে। তার ইচ্ছা একদিন সে সারাক্ষণ আমার সঙ্গে থাকবে। আমি কী করি না করি দেখবে। কথা বলে আমাকে বিরক্ত করবে না। আমার সঙ্গে সারাদিন থাকার একটি বিশেষ কারণও নাকি তার আছে।আমি বললাম, কারণটা কী?
সে বলল, জীবনের একটা পর্যায়ে আমরা চরম দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে গিয়েছি। এখন আপনার বই পড়ে আমরা শক্তি ও সাহস পেয়েছি।আমার বইয়ের যে শক্তি এবং সাহস দেয়ার ক্ষমতা আছে এই তথ্য জানতান। না। আমি বললাম, আমি নুহাশপল্লীতে যাচ্ছি। চল আমার সঙ্গে সারাদিন থাকবে।
সে সারাদিন থাকল। সন্ধ্যাবেলা বলল, স্যার, আমি বাকি টাকা আপনার পাশে থাকতে চাই। নানানভাবে আপনার সেবা করতে চাই। আপনার কাজকর্ম খানিকটা হলেও সহজ করতে চাই। সুইডেনে আমার গাড়ি আছে। আমি ভালো গাড়ি চালাই। আপনি ড্রাইভার বিদায় করে দিন। আপনার গাড়ি আমি চালাব।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম, এ হলো বিদেশী আপদ। এর হাত থেকে অতিদ্রুত মুক্তি না পেলে সমস্যা আছে। আমি বললাম, আমি আমার নাটক এবং ছবির কাজে টেকনিক্যাল লোকের সাহায্য নেই। ক্যামেরাম্যান, এডিটর এইসব। সেই যোগ্যতা তোমার নেই। যদি কোনোদিন যোগ্যতা হয় তখন দেখা যাবে। এখন বিদায়।
তিন বছর পর (চার বছরও হতে পারে) এই যুবক আবার উপস্থিত। আমাকে পা ছুঁয়ে সালাম করে হাসিমুখে বলল, স্যার, আমাকে চিনতে পারছেন? আমি বললাম, না।আমার নাম মাসুদ আখন্দ। এখন চিনেছেন?
না।যুবক আহত পুলায় বলল, স্যার, আপনার সঙ্গে বাকি জীবন থাকার জন্য আমি টেকনিকাল কাজ শিখেছি। সুইডিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট থেকে এডিটিং, স্পেশাল এফেক্ট এবং ডিরেকশনে ডিগ্রি নিয়েছি।আমি মনে মনে বললাম, খাইছে আমারে! প্রকাশ্যে বললাম, এখন তোমাকে চিনেছি। তোমার সরকারি চাকরির কী হলো?
চাকরি ছেড়ে দিয়েছি স্যার।বাকি জীবন বাংলাদেশে থাকবে?অবশ্যই। বাংলাদেশে থাকব এবং আপনাকে সাহায্য করব।তোমার স্ত্রী-ছেলেমেয়ে বাংলাদেশে আসতে রাজি হবে?স্ত্রী রাজি না হলে ডিভোর্স দিয়ে চলে আসব।মাসুদ আখন্দ তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়ে এখন বাংলাদেশে আছে। তার স্ত্রীর ধারণা হুমায়ুন আহমেদ নামক লেখকের কারণে তাদের সুখের সংসার ভেঙে গেছে।
মাসুদকে আমি আমার প্রতিষ্ঠানে যুক্ত করি নি। তাকে বলেছি নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে। যেদিন আমার সত্যিকারভাবেই তাকে প্রয়োজন পড়বে সেদিন ডাকব। যখন পুরোপুরি চুলৎশক্তিহীন হব তখন আমাকে বিছানা থেকে বাথরুম নেয়া-আনার পবিত্র দায়িত্ব সে পাবে। এই মহান দায়িত্ব অন্য কাউকেই দেয়া হবে না।
মাসুদ আখন্দ বিপুল উৎসাহে বাংলাদেশে তার কার্যক্রম শুরু করেছে। Fishbone Films নামের একটি প্রতিষ্ঠান করেছে, সেখানে ভিডিও নাটক এবং ফিল্লা তৈরি হবে। একটি নাটক (উড়াল ফানুস) সে তৈরি ও করেছে। নাটকটা আমাকে দেখানোর মাতো উন্নতমানের হয় নি বলে আমাকে দেখাচ্ছে না। অন্যদের দেখিয়ে বেড়াচ্ছে।
আমার শুভ কামনা তার প্রতি এবং তার প্রতিষ্ঠানের প্রতি। প্রার্থনা করি একদিন তার প্রতিষ্ঠান নুহাশ চলচ্চিত্রকে ছাড়িয়ে অনেক দূর যাবে। পরাজয় অতি দুঃখজনক ঘটনা। শুধু ছাত্র এবং পুত্রের কাছে পরাজয় গৌরবময়।
মাসুদ আখন্দ নামক কঠিন আপদকে আমি ছাত্র এবং পুত্রের মতোই দেখি। পরম করুণাময়ের করুণা তার ওপর শ্রাবণধারার মতো বর্ষিত হোক। এই শুভ কামনা।নুহাশ পল্লী ছাড়া আর কোথাও যেতে আমার ভালো লাগে না। নতুন দেশ দেখা, নতুন জনপদ দেখা আমাকে আকর্ষণ করে না। নিজের দেশই দেখা হয় নি, অন্য দেশ কী দেখব?
মাঝে মাঝে অ্যান্টার্কটিকায় যেতে ইচ্ছা করে। জনমানবশূন্য ধুধু বরফের দেশ দেখতে ইচ্ছা করে। বরফের ঘর ইগলুতে একটা রাত কাটানো। রাতের আকাশে মরুপ্রভার খেলা দেখা।সমস্যা হচ্ছে অ্যান্টার্কটিকায় বইমেলা হয় না। সেখানে লেখকদের সাহিত্য নিয়ে জটিল জ্ঞানের কথা বলার সুযোগ নেই।
এই সুযোগ আছে নর্থ আমেরিকায়। নিউইয়র্কের মুক্তধারার বিশ্বজিৎ প্রতিবছর বইমেলার আয়োজন করে। ফোবানা বলে বাংলাদেশের বাঙালিরা বৎসরের এক সময় একত্রিত হয়। অনুষ্ঠান শেষ হয় মারামারি এবং চেয়ার ছোড়াছুড়িতে। শুনেছি ফোবানা দুই ভাগে এখন বিভক্ত। আওয়ামী লীগ ফোবানা এবং বিএনপি ফোবানা। দেশের সংস্কৃতি বিদেশে আমরা নিতে পারি বা না-পারি, দেশের দলাদলি ঠিকই import করছি।
ভারতীয় বাঙালিরাও বৎসরে একবার সম্মেলন করেন। নাম বঙ্গ সম্মেলন। সেখানে তাঁরা বাংলাদেশেরর কিছু অতিথিকে নিমন্ত্রণ করেন।আমার দুর্ভাগ্য যে প্রতিবছরই সবকটি সম্মেলন থেকে আমি নিমন্ত্রণ পাই। দুর্ভাগ্য বলছি, কারণ নিমন্ত্রণের কারণে আমাকে বেশ কিছু মিথ্যা বলতে হয়। যেমন, ভিসা পাই নি বলে যেতে পারছি না। (ভিসার জন্যে অ্যাপ্লাই-ই করি নি। ভিসা পাব কীভাবে?)
ডাক্তার বলেছে হার্টের অবস্থা ভালো না। এক মাসের জন্য কমপ্লিট বেড রেস্টের ব্যবস্থা দিয়েছেন।ভার্টিগো সমস্যা হচ্ছে। প্লেনে উঠেই অসুস্থ হয়ে পড়ি। বমি টমি করে একাকার।এতকিছু করেও এ বছর শেষ রক্ষা হয় নি। আমি স্ত্রী-পুত্র নিয়ে শুকনা মুখে প্লেনে উঠলাম। নিউইয়র্কে বিশ্বজিতের বইমেলা। সানফ্রানসিসকোতে বঙ্গ সম্মেলন। এইখানেই শেষ না, নিউজার্সিতে আরেক মেলা।
কেউ ভুলেও ভাববেন না ঐসব অনুষ্ঠানে লেখকদের নিয়ে বিরাট মাতামাতি হয়। ঝোঁকটা হকি নাচ-গানের দিকে। লেখকরা শোভা হিসেবে থাকেন। লেখকদের নানা বক্তৃতা শোনার জন্যে আগ্রহ থাকার কারণও অবশ্যি নেই।
বিশ্বজিতের বইমেলায় তিন লেখক হাসান আজিজুল হক, সমাবেশ মজুমদার এবং আমি। অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন হাসান ফেরদৌস। গুরুগম্ভীর অনুষ্ঠান শুরু হলো। আর তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমার দুবছর বয়েসী পুত্র মঞ্চে উঠে এসে ঝাঁপ দিয়ে আমার কোলে উঠে পড়ল। তার মার একক গানের অনুষ্ঠান আছে। সে সঙ্গীতযন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত। পুত্র নিষাদ এই সুযোগ গ্রহণ করেছে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালকের কঠিন কঠিন প্রশ্নের জবাব আমি পুত্রকে কোলে নিয়ে দিচ্ছি। একই সঙ্গে পুত্র নিষাদের প্রশ্নের জবাবও দিতে হচ্ছে। তার প্রশ্নগুলি সহজ। যেমন, মা কোথায় গেল? তোমার ঠান্ডা লাগছে?
নিউইয়র্কে ঝামেলা শেষ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এই মেলায় আমার একটি প্রাপ্তিও ছিল। জীবনের প্রথম পুত্রকে কোলে নিয়ে স্টেজের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে তার মার গান শুনলাম। দর্শকদের অনুরোধে সে গাইল, যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো এক বরষায়। গান শেষ করে শাওন জানতে চাইল, গানটি কার লেখা আপনারা কি জানেন?
শ্রোতাদের একজন বলল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা। আমার পাশে বাচ্চাকোলে আরো এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি গলা নামিয়ে বললেন, এটা নজরুল গীতি। আমি যথেষ্ট আত্মশ্লাঘা অনুভব করলাম, কারণ এই গানটির গীতিকার আমার অতি পরিচিত। তার সাথে রোজই আমার দেখা হয়। ভদ্রলোক ভালো মানুষ টাইপ।
জায়গাটার নাম San Jone, উচ্চারণ সেন হোজে। ক্রিশ্চিয়ান সেইন্টের নামে নাম। বঙ্গ সম্মেলন হচ্ছে হোটেল হিলটনের কনভেনশন সেন্টারে। লোকে লোকারণ্যের মতো দাদায় দাদারণ্য। আমি কাউকে চিনি না। তারাও আমাকে চেনেন না। একজন এসে বললেন, নমস্কার। আপনি কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন?
আমি বললাম, জি।রুনাদির সনে এসেছেন? আমি বললাম, শাওনদির সঙ্গে এসেছি।তিনি বললেন, আপনি কি রুনাদির গানের সঙ্গে তবলা বাজাবেন? আমি বললাম, আপনারা বললে অবশ্যই বাজাব। কিন্তু আমি তো তবলা বাজাতে পারি না।দুজনই দুজনের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। আমি তখনো বুঝতে পারি নি রুনাদি হচ্ছেন রুনা লায়লা।
হিলটন খুবই নামিদামি হোটেল। কিন্তু হোটেলের বাইরে বেমানান সস্তা ধরলে বেঞ্চ পাতা। এই বেঞ্চে বসে বিরস মুখে সিগারেট টানছেল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। পরিচিত মুখ দেখা যাচ্ছে। আমি এগিয়ে গেলাম।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, কোনো মানে হয় হুমায়ুন! সিগারেট খাবার জন্যে প্রতিবার নয়তলা থেকে নেমে হোটেলের বাইরে আসতে হয়। সিগারেট যে পুরোপুরি খারাপ তাও তো না। এর কিছু ভালো দিকও আছে।আমি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললাম, ভালো দিক কী?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, সিগারেটে ৯৮টা দোষ। দুটা মাত্র গুণ। ভালো গুণ দুটি হলো যারা সিগারেট খায় তাদের আলজেমিয়ার্স হয় না। এবং বৃদ্ধ বয়সে তাদের হাড্ডি বেঁকে যায় না।আমি বললাম, আপনার সঙ্গে শাওনের দেখা হলে এই দুটা ভালো গুণের কথা বলবেন, বিপদে আছি।
বঙ্গ সম্মেলনে আছেন তিন লেখক। সুনীল, সমরেশ, হুমায়ুন। সাহিত্যের জটিল সেমিনার। কঠিন সব প্রশ্ন। একেকটা প্রশ্নের জবাব দেই আর মনে মনে বলি, এইসব সেমিনারে আর আসবি? গাধা তোর শিক্ষা হয় না? গোদের ওপর ক্যান্সারের মতো সিনেমা-সেমিনারেও আমাকে অংশগ্রহণ করতে হলো। কারণ আমার দুটা ছবি তারা দেখাচ্ছে, ক. আমার আছে জল। খ. চন্দ্রকথা।
আমার আছে জল আমি নিজেও দর্শকদের সঙ্গে বসে কিছুক্ষণ দেখলাম। একজন মহিলা দর্শকদের মন্তব্য উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না। তিনি পাশের জনকে বললেন, দিদি! বাংলাদেশের এই পরিচালক কিন্তু পানি বলছেন। না। জল বলছেন। ছবির নাম আমার আছে জল। আমার আছে পানি নাম দেন। নি। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ গো। এমনটা দেখা যায় না।
এই জাতীয় সম্মেলনে ভিডিও ক্যামেরা হাতে কিছু সাংবাদিক থাকেন। তারা ইন্টারভিউ নিয়ে বেড়ান। তাদের একজন আমার মুখের ওপর ক্যামেরা ধরে বললেন, দাদা, তসলিমার দেশে ফেরার ব্যাপারে কী করলেন? আমি বললাম, ভাই দেশ তো আমি চালাচ্ছি না। আমি দেশ চালালে অবশ্যই তাকে দেশে ফিরতে বললাম। বাংলাদেশের মেয়ে কেন অন্য দেশে নির্বাসিত জীবনযাপন করবে?দাদা, এটা কি আপনি মন থেকে বলছেন? আমি বললাম, লেখকরা মিথ্যা গল্প তৈরি করেন, সেটাকে ব্যালেন্স করার জন্যেই সবসময় সত্যি কথা বলতে হয়।
পাদটিকা
বঙ্গ সম্মেলনে তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে একটা কবিতা সংকলন বের হয়েছে। সংকলনটির নাম লজ্জার এক বৎসর। সুন্দর সুন্দর কিছু কবিতা সেখানে আছে। বিশেষ করে কবি জয় গোস্বামীর কবিতাটা তো খুবই ভালো লাগল।
তসলিমা নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। ব্যাপারটা কষ্টের। দেশের মেয়ে কেন বাইরে থাকবে? তিনি ভুলভ্রান্তি যদি করে থাকেন তার ফয়সালা দেশেই হবে। বাংলাদেশে এমন কেউ কি আছে যে ভুলের উর্ধ্বে? দেশ মা তার সব সন্তানকে বুকে ধরে রাখতে চান। রাজনীতিবিদরা এই কথা কেন বুঝেন না?