কাঠপেন্সিল পর্ব:০৫ হুমায়ূন আহমেদ

কাঠপেন্সিল

আমেরিকানরা রসিকতা করতে পছন্দ করে। তাদের রসিকতার বিষয় শাশুড়ি, মা না। আমাদের দেশে ব্যক্তি নিয়ে রসিকতা শালা-দুলাভাই, দাদা-নাতিতে সীমাবদ্ধ। মা-শাশুড়ি কিংবা বাবা-শুশুর কখনো না।আমার মা রসিক মানুষ। তিনি তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে রসিকতা করেন। কাজেই তাঁকে নিয়ে তার ছেলেমেয়েদেরও রসিকতা করার অধিকার আছে।

মার রসিকতার নমুনা দেই।একবার এক অপরিচিত মহিলা মাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনা ছেলে কয়টি? মা বললেন, তিনটি।বড় ছেলে কী করে? মা বললেন, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার পিএইচডি ডিগ্রি আছে কেমিষ্ট্রিতে।ভদ্রমহিলা : মাশাল্লাহু। মেজোটি কী করে?

মা : সে সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার একটা পিএইচডি ডিগ্রি আছে ফিজিক্সে।

ভদ্রমহিলা : মাশাল্লাহ। তিন নম্বর ছেলেটি কী করে।

মা : সে উন্মাদ।

ভদ্রমহিলা : আহারে, কী সর্বনাশ! সবচেয়ে ছোট টা উন্মাদ।

মা : সে উন্মাদ না। সে উন্মাদ নামে একটা পত্রিকা বের করে।

ভদ্রমহিলা হতভম্ব। তার সঙ্গে রসিকতা করায় খানিকটা রাগ। মা নির্বিকার।আমি তখন অচিন রাগিনী নামের তিন খণ্ডের একটা নাটক বানিয়েছি। মা আমার বাসায় বেড়াতে এসেছেন। নাটক আমার সঙ্গে দেখবেন। তিনি আগ্রহ নিয়ে নাটক দেখলেন। আমি বললাম, কেমন লাগল? মা বললেন, তোর নাটক দেখতে দেখতে একটা কথা মনে হলো। তোর বাবা আগেভাগে মারা গিয়ে তোর জন্যে সুবিধা করে দিয়েছে।আমি বললাম, কী রকম?

মা বললেন, সে ছিল নাটকপাগল। তোর নাটকে আসাদুজ্জামান নূর যে পার্টটা করেছে, এটা সে করার জন্যে তোকে বলত। তুই পার্ট তাকে দিতি না। এই নিয়ে পিতাপুত্রের মন কষাকষি। সমস্যা না? আগেভাগে মারা যাওয়ায় তুই বিরাট বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিস।এইবার মাকে নিয়ে আমার রসিকতার গল্প। বাবার পোস্টিং তখন কুমিল্লায়। পুলিশের ডিএসপি। আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। ছুটিতে কুমিল্লায় গিয়ে দেখি মা মুরগি পুষছেন। তিনটা মুরগি। মুরগি ডিম পাড়বে।

ঐ ডিম খাওয়া হবে। প্রতিদিন সকালে মা খাঁচা খুলে আগ্রহ নিয়ে দেখেন মুরগি ডিম পাড়ল কি না। প্রতিদিন তাকে হতাশ হতে হয়। আমি গোপনে ডিম কিনে এনে রাতে খাঁচায় রেখে দিলাম। সকালে ঘুম ভাঙল মার আনন্দ চিৎকারে। তিনটা মুরলি একসঙ্গে ডিম দিয়েছে। এরপর থেকে প্রতিদিনই খাঁচায় তিনটা করে ডিম পাওয়া যেতে লসগল। সবাই খুশি। একদিন মার আনন্দ-ধ্বনি শোনা গেল না। অথচ আমি রাতে তিনটা ডিমই রেখেছি। তিনি ডিম হাতে আমার কাছে এসে বললেন, এইসব কী! মার সঙ্গে ফাজলামি?আমি বললাম, কী করেছি?

মা বললেন, এই তিনটা তো হাঁসের ডিম। মুরগি তো হাঁসের ডিম পাড়বে না।আমি বললাম, মা ভুল হয়েছে। এরকম আর করব না।মা এই ঘটনায় খুবই আহত হলেন। বাবার কাছে নালিশ করলেন। বাবা আমাকে ডেকে পাঠালেন। তাকে যমের মতো ভয় পাই। ভয়ে অস্থির হয়ে তার কাছে গেলাম। বাবা বললেন, মুরগির ডিমের বদলে তুই হাঁসের ডিম কিনলি কী মনে করে?

আমি বললাম, মুরগির ডিমই চেয়েছি। ডিমওয়ালা হাঁসের ডিম দিয়েছে।বাবা বললেন, সবচেয়ে ভালো হতো পচা ডিম রাখলে। তোর মা ডিম ভাঙত, বিকট গন্ধে বাড়ি ভরে যেত। তিনটা মুরগি একসঙ্গে পচা ডিম কেন পড়ল এই নিয়ে আমরা তখন গবেষণায় বসতাম।পাঠক, আমার বাবার রসবোধ কি ধরতে পারছেন?

মানুষ যেমন রসিকতা করে প্রকৃতিও কিন্তু করে। সেই রকম একটা গল্প বলি। মার প্রতি প্রকৃতির রসিকতা।মা তখন খুবই অসুস্থ। কিডনি প্রায় অকেজো। বিছানায় বসে থেকেই ঘুমিয়ে পড়েন। ডাকলে সাড়া পাওয়া যায় না। একদিন হঠাৎ অচেতন হয়ে গেলেন।

অ্যাম্বুলেন্স এনে তাঁকে ল্যাব এইড হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। তাকে CCU-তে রাখা হলো। ডাক্তার বরেন চক্রবর্তীর রোগী। তার জ্ঞান ফিরল রাত তিনটায়। তিনি দেখলেন, সবুজ পর্দা ঘেরা একটা ঘরে তিনি শুয়ে আছেন। আরামদায়ক আবহাওয়া। তাঁর সামনে সবুজ পোশাক পরা দুটি রূপবতী (এবং বেঁটে) তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। [এরা নার্স। মার খোঁজ নিতে এসেছিল।]

মার ধারণা হলো তিনি মারা গেছেন। মৃত্যুর পর তার বেহশত নসিব হয়েছে। কারণ বেহেশত সবুজ, এই খবর তিনি জানেন। মেয়ে দুটি যে হুর এটাও বুঝা যাচ্ছে। নিশ্চিত হবার জন্যে তিনি হুরদের জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি বেহেশত?

হুর দুজন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে রোগীকে সন্তুষ্ট করার জন্যে বলল, জি খালাম্মা।মা বললেন, তোমরা আমাকে বেহেশতের আঙ্গুর এনে দাও তো। খেয়ে দেখি কী অবস্থা।হুর দুজন আঙ্গুর নিয়ে এলে কী হতো আমি জানি না। তার আগেই ডিউটি ভাক্তার ঢুকলেন এবং বললেন, খালাম্মার জ্ঞান ফিরেছে। আপনার ছেলেমেয়েরা সবাই বাইরে আছে। ডেকে দেই কথা বলেন।এই ঘটনার পর একদিন মাকে বললাম, আপনার কি খুব বেহেশতে যাবার ইচ্ছা?

মা বললেন, হ্যাঁ।আমি বললাম, আপনি তো লোভী মহিলা না। বেহেশতের লোভ কেন করছেন? মা বললেন, বেহেশতে না পেলে তার বাবার সঙ্গে তো দেখা হবে না। তোর বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্যেই বেহেশতে যেতে চাই।আমি বললাম, প্রথম দেখাতে তাঁকে কী বলবেন?

বলব, ছয়টা ছেলেমেয়ে আমার ঘাড়ে ফেলে তুমি চলে গিয়েছিলে। আমি দায়িত্ব পালন করেছি। এদের পড়াশোনা করিয়েছি। বিয়ে দিয়েছি। এখন তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করবে। বেহেশতের সুন্দর সুন্দর জায়গুলি আমাকে দেখাবে। শুধু আমরা দুজন ঘুরব। তুমি তোমার সঙ্গের হুরগুলিকে বিদায় কর।

মৃত্যু একটি ভয়াবহ ব্যাপার। যখন মাকে দেখি সেই ভয়াবহ ব্যাপারটির জন্যে তিনি আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করছেন, তখন অবাক লাগে।আমি যখন ফাইভ-সিক্সে পড়ি তখন বাজারে প্রথম কোকাকোলা, ফান্টা আসা শুরু হলো। তারপর এল 7up। এর আগে সোডা ওয়াটার পাওয়া যেত। বোতলের মুখ মার্বেল দিয়ে বন্ধ থাকত। বোতল ভালোমতো ঝাঁকালে কার্বন ডাই অক্সাইডের চাপে বন্দুকের গুলির মত মার্বেল ছুটে যেত। বড়ই মজার খেলা।

যাই হোক, প্রথমদিন 7up খেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। এর নাম সেভেন আপ কেন? নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। কারণটা কী? শৈশবে কৌতূহল সহজে যায় না। যাকে পাই তাকেই জিজ্ঞেস করি। কেউ বলতে পারে না। ওপরের ক্লাসের এক বড় ভাই বললেন, এটা খেলে সাতবার ঢেঁকুর ওঠে। কাজেই সেভেন আপ নাম। এরপর থেকে পয়সা জমাতে পারলেই সেভেন আপ কিনি। খেয়ে ঢেঁকুর ওঠে। তিনটা, বড়জোর চারটা ঢেঁকুর ওঠে। এর বেশি না।

কয়েকদিন আগে হঠাৎ করেই সেভেন আপ নামকরণের তাৎপর্য জানতে পেরেছি। পাঠকদের জানাচ্ছি। এই জ্ঞানে তাদের কোনো উপকার হবার কথা না। তারপরেও জানা রইল।সাত এসেছে সাত আউন্স থেকে। প্রথম যে 7Up-এর বোতল ছাড়া হয়েছিল তাতে সাত আউন্স পানীয় ধরত। Up হলো বুদবুদ কোন দিকে উঠবে তার নির্দেশনা।

শৈশবের একটি কৌতুহল মিটল জীবনের শেষ দিকে। আমার কাছে ব্যাপারটা গুরুরুপূর্ণ। আমরা অসংখ্য অমীমাংসিত প্রশ্ন নিয়ে বড় হই। একসময় অমীমাংসিত প্রশ্ন নিয়ে কবরে চলে যাই।সম্প্রতি আমার হাতে দুটা বই এসেছে। একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর, লেখক আইজাক অ্যাসিমভ। নাম Book of Facts। অন্যটির নাম The Book of Useless Information। লেখক নোয়েল বোথাম। দুটি বইতেই মজার মজার সব তথ্য।

উদাহরণ দেই। জীবন্ত কবর দিয়ে দেওয়া হবে এই ধরনের ভীতি নাকি কিছু মানুষের মধ্যে কাজ করে। এই ভীতির নাম Taphephobia। এই ভীতির কথা আমি প্রথম আমার মার কাছে শুনলাম। তিনি এক সন্ধ্যায় মাগরেবের নামাজের পর আমাকে ডেকে বললেন, প্রায়ই একটা কথা ভেবে আমার খুবই ভয় লাগে।আমি বললাম, কী নিয়ে ভয় লাগে?

মা বললেন, তোরা যদি আমাকে মৃত মনে করে জীবন্ত কবর দিয়ে ফেলিস। হঠাৎ অন্ধকার কবরে জ্ঞান ফিরল। তখন আমি করব কী? এরকম ঘটনা যে ঘটে না, তা তো না। ডেডবডি নিয়ে যাচ্ছে তখন হঠাৎ ডেডবডি নড়ে উঠল।আমি বললাম, এই বিষয়টা নিয়ে কী করা যায় তা আমরা পারিবারিক মিটিং বসিয়ে ঠিক করব। আপনি এ নিয়ে একেবারেই চিন্তা করবেন না।

Book of Useless Information পড়ে দেখি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের এই ভীতি ছিল। প্রবলভাবেই ছিল। তিনি উইল করে গিয়েছিলেন যে মৃত্যুর পরে পরেই তাকে কবর দেওয়া যাবে না। তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। দেখতে হবে তিনি আসলেই মারা গেছেন কিনা।বইটি থেকে কিছু মজার তথ্য জানাচ্ছি।

প্রাণীজগৎ

ক. পৃথিবীর ৮০ ভাগ প্রাণীর পা ছয়টি।

খ. ব্যাঙ তরল খাদ্য এবং নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস তাদের চামড়া দিয়ে নেয়। মুখে না।

গ. ছোট্ট একটা ব্যাঙ হজম করতে একটা সাপের ৫২ ঘণ্টা সময় লাগে।

ঘ. মানুষদের জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি গরিলাদের ক্ষেত্রেও কাজ করে।

ঙ. একটা জোকের মস্তিষ্কের সংখ্যা হলো বত্রিশ।

চ. পোলিও রোগের ধরন বুঝার জন্যে ত্রিশ হাজার বাঁদরের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়েছিল।

খাবারদাবার

ক. আদি কোকাকোলার রঙ ছিল সবুজ।

খ. কেচাপ (Ketchup) এর জন্ম চীন দেশে।

গ. পটেটো চিপস প্রথম তৈরি হয় আমেরিকার লুসিয়ানাতে, ১৮৫৩ সনে।

ঘ. পৃথিবীর সবচেয়ে ঝাল মরিচের নাম Habanero।

পাঠক কি হাই তুলতে শুরু করেছেন? আমার বড় সমস্যা হলো আমার যা ভালো লাগে তা সবাইকে জানাতে ইচ্ছা করে। একটা সময় ছিল প্রতি পূর্ণিমায় একদল বন্ধুবান্ধব নিয়ে নুহাশ পল্লীতে পূর্ণিমা দেখতে যেতাম। বন্ধুরা যে হা করে পূর্ণিমা দেখত তা-না। তারা তাস খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ত। আকাশে চাঁদ উঠেছে কি না তারচেয়ে ডিনারে কী আয়োজন হয়েছে–এই সংবাদ সংগ্রহে তাদের উৎসাহী বলে মনে হতো।

আকাশের তারা দেখার জন্যে আমার কাছে খুব দামি দুটা টেলিস্কোপ আছে। এর একটি পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে তাল রেখে নিজেও ঘুরে যেন Focus নষ্ট না হয়। এখন পর্যন্ত আমার কোনো বন্ধুকে বলতে শুনি নি যে, আজ আকাশের তারা দেখা যাক!

অ্যাসিমভের বুক অব ফ্যাক্ট দেখে আমার মনে পড়ল কলেজজীবনের কথা। তখন মোটা একটা চামড়ায় বাঁধানো খাতা কিনেছিলাম। খাতা ভর্তি করে ছিলাম নানান ধরনের তথ্য দিয়ে। খাতাটা এখন সঙ্গে থাকলে কাজে আসত। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবার লাইব্রেরির সমস্ত বইপত্রের সঙ্গে খাতাটাও হারিয়ে গেছে। খাতায় টুকে রাখা একটি তথ্য দেখি নোয়েল বোথাম সাহেবের বইতেও আছে। তথ্যটা হলো—

Twinkle Twinkle Liltle Star

How I Wonder What You are…

এই নার্সারি রাইমটি সঙ্গীতের মাস্টার মোৎসার্ট পাঁচ বছর বয়সে রচনা করেছিলেন।সব বাদ দিয়ে এই তথ্যটি মনে রাখার একটা কারণও আছে। কারণটা হলো লাল কালির একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে আমি লিখেছিলাম, তথ্যটি বিশ্বাসযোগ্য না। মোৎসার্ট ছিলেন জার্মান। পাঁচ বছর বয়সে তাঁর ইংরেজি জানার কথা না।নোয়েল বোথাম সাহেবের বইটিই বা অগ্রাহ্য করি কীভাবে? বইটি Time পত্রিকার Best seller list-এ অনেকদিন ছিল।

বোথাম সাহেব ঢাকার একটি তথ্যও বইতে দিয়েছেন। তিনি অবশ্যি ঢাকাকে India-র একটি শহর ধরে নিয়েছেন। বইয়ে লেখা Decca, India, তথ্যটা হলো— ঢাকা শহরের ভিক্ষুকরা কনভেনশন করে সিদ্ধান্ত নেয় পনেরো পয়সার নিচে তারা ভিক্ষা নেবে না।বোথাম সাহেবের বইয়ের সর্বশেষ তথ্যটি আমার পছন্দ হয়েছে। তিনি বলছেন, যত Statistics প্রকাশিত হয় তার ৯৭ ভাগই বানানো।

কথা হচ্ছে তার নিজের বইটিও Statistics-এ ভর্তি। তাহলে কি… আজকালকার ছেলেমেয়েরা স্লাইড রুলের নাম শোনে নি। স্লাইড রুল হলো গুণভাগ করার স্কেল। একটা স্কেলের ভেতর ছোট্ট একটা স্কেল। ছোট স্কেলটা slide করতে পারে বলে স্লাইড রুল নাম। রুল এসেছে রুলার থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কাজ ছিল ফার্স্ট ইয়ারের কেমিস্ট্রি ছাত্রছাত্রীদের স্লাইড রুলের ব্যবহার শেখানো। বড় বড় অংক কত সহজে রুলার নাড়াচাড়া করেই সমাধান করা যায় তা দেখে সবাই মুগ্ধ হতো। চোখ বড় বড় করে বলত—বাহ! তাদের এই বিস্ময় ধ্বনি শোনার জন্যেই আমি আগ্রহ করে স্লাইড রুল বিষয়ক ক্লাসগুলি নিতাম।

এখন অনেক জটিল অংক নিমিষেই ক্যালকুলেটারের বোতাম টিপে করা যায়। যারা অংকগুলি করে তারা কেউ বিস্ময়সূচক বাহ ধ্বনি করে না। ক্যালকুলেটর জটিল অংক করবে এটা নিপাতনে সিদ্ধ। এই নিয়ে বিস্মিত হবার কিছু নেই।আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের হাত থেকে স্লাইড রুল কেড়ে নিয়েছে। বিস্মিত হবার বিষয়গুলি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।

চলে গেছে টেলিগ্রাম। মোর্স সাহেবের টরে টক্কা। ট্রেনে যাবার সময় রেল লাইন ধরে টেলিগ্রাফের খুঁটি। তারের ওপর পাখিদের বসে থাকার দৃশ্য দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আজ আর কোনো যুবা পুরুষের কাছে টেলিগ্রাম আসে না– Mother serious. Come sharp.

এই টেলিগ্রামের অর্থ যে মা অসুস্থ তা কিন্তু না। এর গূঢ় অর্থ, তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। চলে এসো। মায়ের অসুখের খবর জানিয়ে ছেলেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া।টেলিগ্রামের আলাদা ভাষাই ছিল। মাত্র সাতটা শব্দের মধ্যে যা বলার বলতে হতো। শব্দ বেশি ব্যবহার করার অর্থ বেশি চর্জি। অল্প শব্দে টেলিগ্রাম করার জন্যে বিচিত্র ভাষা তৈরি হয়ে গেল।

উদাহরণ দেই। ছেলেকে জানানো হবে–বাবা এখন অনেক সুস্থ। সবাইকে চিনতে পারছেন। তোমাকে দেখতে চাচ্ছেন। আঙুর খেতে চাচ্ছেন। কিছু আঙুর নিয়ে চলে এসো। দেরি করবে না।BABA BETTER RECOGNIZING SEE YOU COME GRAPE.

অন্যরা এই টেলিগ্রামের মর্মার্থ বুঝবে না। যার কাছে পাঠানো হয়েছে সে ঠিকই বুঝবে।হারিয়ে যাচ্ছে চিঠি। আজকাল কেউ আর চিঠি লিখে না। SMS চালাচালি করে। SMS-এর কী বিচিত্র ভাষা–KFC CHICKEN KHABE? Love U অর্থ–KFCর চিকেন খাবে? তোমাকে ভালোবাসি।ফাউনটেন পেন চলে গেল।

এখন বলপয়েন্ট। কালি শেষ কলম ফেলে দাও। আমাদের সময় চালু ঝর্ণা কলমের নাম ছিল রাইটার আর পাইলট। সবার বুকপকেটে কলম শোভা পেত। জামাইদের উপহার ছিল শেফার্স কলম। তারো আগে নিবের কলম। আমার শৈশবের কলম হলো নিবের কলম। আমাদের সময়ে ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিগত দোয়াত থাকত। একটা দোয়াত ছিল, উল্টে গেলেও কালি পড়ত না। দোয়াতের কালি আমরা নিজেরা বানাতাম। এক আনা দামের কালির ট্যাবলেট পাওয়া যেত।

এক দোয়াল কালি বানাতে একটা টেবলেটই যথেষ্ট ছিল। যে সব ছেলেমেয়ের বাবার টাকাপয়সা আছে, তারা দুটা ট্যাবলেট দিত। তাদের কালির রঙ ছিল দর্শনীয়।হাতঘড়ি উঠে যাব উঠে যাব করছে। তাদের মৃত্যুঘণ্টা বাজছে। সময় দেখার জন্যে এখন আর হাতঘড়ির প্রয়োজন নেই। হাতে মোবাইল আছে। সেখানে সময় দেখা যায়। শুধু সময় না, কী বার, কত তারিখ কোন শতাব্দী সব।

একসময় হাত ঘড়ির কী বাবুয়ানিই না ছিল! রেডিওর সঙ্গে সেই ঘড়ির টাইম মিলানো হতো। হাতঘড়ির টাইম রেডিও টাইম কি না তা জানা আবশ্যক ছিল। জামাইদের উপহার সামগ্রীর মধ্যে অবশ্যই হাতঘড়ি থাকতে হতো।মৃত্যুঘণ্টা বাজছে এমন কিছু জিনিসপত্রের তালিকা আমি তৈরি করেছি। পাঠকরা মিলিয়ে দেখতে পারেন।

১. শিলপাটা

গুঁড়া মসলা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। আদা বাটা, রসুন বাটা পাওয়া যাচ্ছে। মসলা গুঁড়া করার মেশিন সস্তায় কিনতেও পাওয়া যাচ্ছে, শিলপাটার কী দরকার? এই বস্তু যেহেতু চলে যাচ্ছে–চলে যাবে শিলপাটা ধার করাবার কর্মীরা। ক্লান্ত দুপুরে ঘুঘু পাখির ডাকের মতো তাদের গলা শোনা যাবে না। জানালার কাছে এসে কেউ বলবে না, শিলপাটা ধার করাইবেন?

২. বই

বাসস্থান ছোট হয়ে আসছে। বই রাখার জায়গা নেই। বইয়ের প্রয়োজনও তেমন নেই। ইন্টারনেট চলে এসেছে। যে-কোনো প্রয়োজনীয় বই ইন্টারনেটে পড়া যাবে। একটা সময় ছিল যখন মধ্যবিত্তের স্বপ্নে সবসময় ছোট্ট একটা লাইব্রেরি থাকত। সেই লাইব্রেরির দর্শনীয় সংগ্রহ–এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটেনিকা। অতি যত্নে ঝাড়পোছ করে রাখা এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটেনিকা ছিল রুচি এবং বিদ্যানুরাগের শ্রেষ্ঠ নির্দশন। (যাদের সংগ্রহে এই জিনিস আছে, তাদের কেউ তার পাতা উল্টে কখনো দেখেছেন এমন অপবাদ দেওয়া ঠিক হবে না।)

বিত্তবানদের বাড়িতে জায়গার অভাব নেই। তবে তাঁদের বইয়ের লাইব্রেরির জায়গা দখল করে নিয়েছে হোম থিয়েটার নামক এক বস্তু।হারিয়ে যাওয়া জিনিসের তালিকা বড় করতে ইচ্ছা করছে না। যা হারিয়ে যাবার তা হারিয়ে যাবে। এদের জন্যে শোকগাথার কোনো প্রয়োজন নেই। আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম! বলে বিলাপ সঙ্গীত অর্থহীন।

পৃথিবী বদলাবে এটাই তো স্বাভাবিক। হারিয়ে যাওয়া সময় নিয়ে আমরা হা হুতাশ করব এটাও স্বাভাবিক।তাহলে স্লাইড রুল নিয়ে লেখাটা কেন লিখলাম? সেদিন পুরনো ট্রাংক ঘাটতে গিয়ে আমার স্লাইড রুলটা খুঁজে পেলাম। একচল্লিশ বছর আগে আশি টাকা দিয়ে এটা কিনে ভেবেছিলাম বিজ্ঞানের কী অপূর্ব একটা আবিষ্কার এখন আমার হাতে। আমি কত না ভাগ্যবান!

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *