মবিন উদ্দিন কিছু বললেন না। এই আলোচনা চালিয়ে যেতে তাঁর ইচ্ছা করছে না।পুকুরে গ্রাস কার্প ছাড়বেন, সিলভার কাপ ছাড়বেন, সরপুটিও ভাল হয়। ফিসারী ডিপার্টমেন্টের এক অফিসারের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। নিয়ে আসব আপনার কাছে।আচ্ছা।মাছের চাষে অভিজ্ঞতা আছে এমন একজন কর্মচারী রেখে দেবেন। আছে, আমার জানামতে বিশ্বাসী লোক আছে। হ্যাচারীতে কাজ করেছে। ওকে নিয়ে আসব।মবিন উদ্দিন ভেবে পেলেন না, তার মাছের চাষ নিয়ে আব্দুল মজিদ এত উৎসাহী কেন? রহস্যটা কী?
রহস্য কিছু নিশ্চয়ই আছে কিন্তু তিনি ধরতে পারছেন না।হঠাৎ রহস্য পরিষ্কার হয়ে গেল। আব্দুল মজিদ কি ভাবছে তিনি বুঝতে পারছেন। আব্দুল মজিদ এসেছে বাড়িটা কিনে নিতে। শহরের উপর ভাল জায়গায় বাড়ি। চারতলা দালান তুলে ভাড়া দিলে ভাল টাকা আসবে।ভাইজান! বিল।দোকান বিক্রি করে দিয়েছেন শুনে খুবই কষ্ট পেয়েছি। হুট করে বিক্রি করলেন, দামও তো ভাল পান নি।তা ঠিক দাম ভাল পাই নি।বাড়ি বিক্রি করার সময় তাড়াহুড়া করবেন না। আমাকে আগে জানাবেন।তুমি কিনতে চাও? তুমি তো বলছিলে তোমার টাকা পয়সার সমস্যা।সমস্যা তো আছেই। সমস্যা যাই থাকুক জোগাড় করব। আপনি ক্ষতিগ্রস্থ হবেন তা ঠিক না। বাড়ি কবে-নাগদে বিক্রি করার কথা ভাবছেন?
এখনও এই বিষয়ে কিছু ভাবি নি।দেরী করা ঠিক হবে না। দেরী করা মানে জমা টাকা খরচ করা। তাড়াতাড়ি ডিসিসান নিয়ে কাজ কর্ম শুরু করে দেয়া দরকার। আমি কালপরশুর মধ্যে হ্যাচারীর লোকের সঙ্গে কথা বলব। আপনার একটা ভাল ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত মনে শান্তি পাচ্ছি না ভাইজান।ও আচ্ছা।ভাইজান আমি আজ তাহলে উঠি? মর্কিন উদ্দিন আব্দুল মজিদকে বিদায় দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। ম্যাজিশিয়ান ছেলেটা ঠিক আগের জায়গাতেই বসে আছে। তাকে এখন লাগছে পাথরের মূর্তির মতো। মবিন উদ্দিনকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল। মবিন উদ্দিন বললেন, তুমি কি কিছু বলবে?
সে না সূচক মাথা নাড়ল।মবিন উদ্দিন বললেন, তোমাকে আমার একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল। জিজ্ঞেস করলে জবাব দেবে? জ্বি দেব।আমার কাছে মনে হচ্ছিল আমি আব্দুল মজিদের মনের কথা বুঝতে পারছি—এটা কি সত্যি।জ্বি সত্যি।এটা কীভাবে সত্যি হয়? আমি আপনাকে সাহায্য করেছি।তুমি এইসব শিখলে কীভাবে? আমি একটা খাতায় আমার ব্যাপারটা লিখেছি। খাতাটা আপনাকে দিয়ে যাব। আপনি পড়বেন। পড়া শেষ হলে খাতাটা নষ্ট করে ফেলবেন।মবিন উদ্দিন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোমাকে আমি খুবই পছন্দ করি। কিন্তু এইসব ব্যাপার আমার ভাল লাগে না। মানুষ হবে সহজ, সরল স্বাভাবিক—এইসব কী? আমার দুর্ভাগ্য যে আমি অন্য রকম হয়ে গেছি।কীভাবে হলে?
আমি সব লিখেছি। পড়লেই আপনার কাছে পরিষ্কার হবে। আমি চলে যাচ্ছি, আপনি পড়ন। আজ রাতেই পড়ুন।তুমি চলে যাচ্ছ তার মানে কি! কোথায় যাচ্ছ? বুঝতে পারছি না কোথায় যাচ্ছি। আপনার কাছে আমার একটা ক্ষমা প্রার্থনার ব্যাপারও আছে। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।মবিন উদ্দিন বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি কী করেছ যে তোমাকে ক্ষমা করতে হবে? আমি নিজেকে আপনার ছেলের মতো করে উপস্থিত করেছি। তার চেহারা তার গলার স্বর অনুকরণ করেছি। এমন কি নিজের নামও বলেছি টুনু। আমি এই ব্যাপারগুলি করতে পারি। আমার অনেক ক্ষমতা।তুমি কি এখনি চলে যাচ্ছ? তুমি যে ভঙ্গিতে কথা বলছ তাতে সে রকমই মনে হচ্ছে।
জ্বি আমি এখনি চলে যাচ্ছি। আপনার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।সুপ্তি আর তার মার সঙ্গে দেখা না করেই চলে যাবে? জ্বি।তোমার কষ্ট হবে না? মন খারাপ করবে না? আমি অর্ধেক বৃক্ষ, মানুষের আবেগ আমার নেই। আপনি যে স্নেহ করেছেন—সেই স্নেহ অপাত্রে করেছেন।মবিন উদ্দিন আগে লক্ষ্য করেন নি, এখন লক্ষ্য করলেন ঠিক যে পোষাকে কাল যাদুকর এই বাড়িতে ঢুকেছিল সে সেই পোষাকেই পরে আছে। পাতলা একটা শার্ট, খালি পা। কাঁধে ছেড়া সুতা ওঠা কাপড়ের ব্যাগ। টুনুর মুখের কোন আদল তার মুখে এখন আর নেই। নিগ্রোদের চুলের মতো ঘন কালো কোঁকড়ানো চুল। চোখের শাদা অংশ অতিরিক্ত শাদা। মনে হয় অন্ধকারে জ্বলছে।মবিন উদ্দিন হতভম্ব গলায় বললেন, তোমার নাম কী? এখন আমার কোন নাম নেই। তবে এক সময় সুন্দর একটা নাম ছিল।সেই নামটা কী?
টগর।কালো যাদুকর ঘর থেকে বের হয়ে গেল। একবারও পেছনে ফিরে তাকাল। একবারও বলল না—আপনারা আমাকে পুত্র স্নেহে রেখে দিলেন। এই স্নেহের ঋণ আমি স্বীকার করছি।সে এমনভাবে ঘর থেকে বের হল যেন কারো কাছেই তার কোন ঋণ নেই।আমি আমার জীবনের অদ্ভুত একটা গল্প লিখছি। যারা গল্পটি পড়বেন তাদের যে বিশ্বাস করতে হবে এমন না। বিশ্বাস করার কোন দরকার নেই। আবার অবিশ্বাস করারও দরকার নেই। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝামাঝিটা করলেই হল। আমরা সব সময় বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝামাঝি জগতে বাস করি। কে জানে হয়ত এই জগতই সত্যি।
আমার মা খুব অল্প বয়সে মারা গিয়েছিলেন। মা’র কোন স্মৃতি আমার মনে নেই। শুধু একটা স্মৃতি আছে—আমি একটা জলচৌকিতে উবু হয়ে বসে আছি, মা আমার মাথায় ঠান্ডা পানি ঢালছেন—আমার প্রচন্ড শীত লাগছে। আমি শীতে কাপছি। মাথায় পানি ঢালার সময় মা’র হাতের কাচের চুড়িতে টুন টুন শব্দ হচ্ছে। আমার কাছে মা’র স্মৃতি হচ্ছে—ঠান্ডা পানি ঢালার শব্দ, চুড়ির টুন টুন শব্দ। ব্যাস এই পর্যন্তই, মা’র চেহারার কোনো স্মৃতি আমার নেই। তিনি দেখতে কেমন ছিলেন? তাঁর কি মায়া মায়া চোখ ছিল? তিনি কি পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে রাখতেন? কিছু জানি না।মা’র মৃত্যুর দু’বছর পর বাবা আবার বিয়ে করেন। নতুন মা’র কথা আমার খুব মনে আছে।
নতুন মা’র চেহারা খুব সুন্দর ছিল। তিনি হাসি খুশি ধরনের ছিলেন। স্বভাবটা ছিল ছটফটে ধরনের। অনেকটা চুড়ই পাখির মত। কোথাও বেশিক্ষণ স্থির হয়ে থাকতে পারতেন না। নতুন মা আমাকে খুব আদর করতেন। আসল মা’র আদর কেমন তাতো জানি না নতুন মা’র আদর পেয়েই আমার আনন্দের সীমা ছিল না। তিনি আমাকে গ্রহণ করেছিলেন—বন্ধু হিসেবে, খেলার সাথী হিসেবে। নতুন মা’র বয়স অল্প ছিল। তার খেলার সঙ্গীর প্রয়োজন ছিল। আমার বাল্যকাল এবং কৈশোর কেটেছে খুবই সুখে। আমার সুখ স্থায়ী হল না। আমার যখন তের বছর বয়স তখন নতুন মা মারা গেলেন।
নিজের মা’র মৃত্যুতে আমি কষ্ট পাইনি। নতুন মা’র মৃত্যুতে আমি প্রথম কষ্ট পেলাম। নতুন মাও সম্ভবত অন্য ভূবনে যাত্রার আগে আমার কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছিলেন। কারণ তিনি মৃত্যুর আগে আগে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন– আহারে আমি চইল্যা গেলে আমার টগররে কে দেখব? তখন তার নিজের একটি মেয়ে আছে। তারও ফুলের নামে নাম—পারুল। খুবই আশ্চর্যের কথা একবারও তিনি তাঁর মেয়ের কথা বললেন না। একবারও বললেন না, আমার পারুলরে কে দেখব? তিনি কাঁদতে লাগলেন আমার কথা ভেবে।মা’র মৃত্যুর পর বাবা আমাকে ডেকে বললেন–বুঝলি টগর, আমার কপালে সংসার নেই। বিয়েদী আর করব না। তোর ছোট বোনটাকে তো বড় করা লাগবে—দুইজনে মিলে পারব না?
আমি বললাম, পারব।বাবা বললেন, শিশু মানুষ করা কঠিন ব্যাপার। দুইজনে মিলে এই কঠিন কাজটা সমাধা করতে হবে। উপায় কী? তবে মেয়ে তো, একটু বড় হলে দেখবি আমাদের আর তাকে পালতে হচ্ছে না উল্টা সেই আমাদের পালছে। কয়েকটা বছর ধৈর্য ধরে তার বোনটাকে বড় করতে হবে। আগের মতো আর বাইরে ঘোরাঘুরি করা যাবে না। বেশির ভাগ সময় এখন ঘরেই থাকতে হবে।বাবা খুব অস্থির প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তিনি ছোট-খাট ব্যবসা করতেন। কোন ব্যবসাতেই মন বসাতেন বলে মনে হয় না। একটা ব্যবসা মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেলে সেটা ছেড়ে তিনি অন্য ব্যবসা ধরতেন। তাঁর ঘুরে বেড়ানোরও খুব সখ ছিল। তাঁর কথা হল—মানবজীবন অল্প দিনের। এই অল্পদিনে যা দেখার দেখে নিতে হবে। মৃত্যুর পর দেখার কিছু নেই। দোজখে যে যাবে—সে আর দেখবে কী—তার জীবন যাবে আগুন দেখতে দেখতে। আর বেহেশতেও দেখার কিছু নেই। বেহেশতের সবই সুন্দর। যার সবই সুন্দর তার সৌন্দর্য বোঝা যায় না। সুন্দর দেখতে হয় অসুন্দরের সঙ্গে।
খুবই ভারী ধরণের কথা। বাবা ভারী ভারী কথা বলতে পছন্দ করতেন।মা’র মৃত্যুর পর বাবার অস্থির স্বভাবের তেমন কোন পরিবর্তন হল না। তিনি আগের মতই রইলেন। বরং অস্থিরতা সামান্য বাড়ল। মূলত আমি একাই বোনের দেখাশোনা করতে লাগলাম। বাড়িতে একটা কাজের মহিলা ছিল। তাকে আমরা রহিমা খালা ডাকতাম। রহিমা খালা খুব দায়িত্ববান মহিলা ছিলেন। সংসার তিনি একাই সামলাতে লাগলেন। যদিও আগে বলেছি আমি বোনের দেখাশোনা করতে লাগলাম আসল ঘটনা সেরকম নয়। আমার বোন একা একাই বড় হতে লাগল। সে খেলতো নিজের মনে—হেঁটে বেড়াতে নিজের মনে। তার স্বভাব চরিত্র এবং আচার আচরণে বড় ধরনের অস্বাভাবিকতা ছিল।
যা আমার কম বয়সের জন্যে আমি ধরতে পারিনি। রহিমা খালা ঠিকই ধরেছিলেন। তিনি মাঝে মাঝে বলতেন—পারুল জানি কেমন কইরা হাঁটা চলা করে। বগার লাহান ঠ্যাং ফেলে, কেমুন কইরা জানি দেহে। রহিমা খালা এই কথাগুলি নিজেকেই বলতেন। কাজেই আমিও তেমন গুরুত্ব দেইনি।পারুলের যে অস্বাভাবিকতাটা আমার চোখে পড়ত তা হল সে অন্ধকারে সারাবাড়ি হেঁটে বেড়াতে পারত। ভাবটা এমন যেন সে অন্ধকারে দেখতে পায়। আসল ব্যাপারটা ছিল পুরো অন্যরকম। সে চোখে কিছুই দেখত না, সে জন্মান্ধ ছিল। তার টানা টানা সুন্দর চোখ দেখে এ ব্যাপারটা বোঝার কোনো উপায় ছিল না। আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। বাবা বেখেয়ালী ধরনের মানুষ তাঁর ধরতে পারার কথা নয়, আর আমার বয়সতো নিতান্তই অল্প। মা বেঁচে থাকলে অবশ্যই ধরতে পারতেন।
ব্যাপারটা যখন ধরা পড়ল তখন পারুলের বয়স চার। আমরা সবাই হতভম্ব হয়ে পড়লাম। অন্ধকারে তার অনায়াসে হাঁটাহাঁটির অর্থ তখনই পরিষ্কার হল। তার কাছে আলো এবং অন্ধকার আলাদা কিছু ছিল না। দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও পারুলের অন্যসব ইন্দ্রিয় অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ছিল। পাঁচ বছর বয়সেই সে সবকিছু নিজের মতো করে করতে পারত।বাবা অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। সংসারে এমনিতেই তাঁর মন ছিল না। এর পর মন আরও উঠে গেল।বেশিরভাগ সময়ই তিনি বাইরে বাইরে থাকতে শুরু করলেন। বাড়িতে যতক্ষণ থাকতেন গম্ভীর হয়ে বসে থাকতেন। তীক্ষ্ণ দৃস্টিতে দেখতেন পারুল নিজের মনে খেলছে। নিজের মনে কথা বলছে। বাবা তাঁর। মেয়েকে ঢাকায় নিয়ে গেলেন। বড় বড় ডাক্তার দেখালেন। ডাক্তাররা বললেন—জন্ম ত্রুটি, কনজেনিটাল ডিফেক্ট। কিছু করার নেই।
পারুল দেখতে পায় না এনিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা ছিল না। সে ছিল মনের আনন্দে। ছোটাছুটি করছে হৈ চৈ করছে। মনের আনন্দে গান করছে। ‘ট’ উচ্চারণ করতে পারত না বলে আমাকে সে ভকত অগর ভাই। যখন ‘ট’ উচ্চারণ করতে শিখল তখনও আমি অপর ভাই হয়ে রইলাম। পারুলের অন্ধকার ও নিঃসঙ্গ জীবনে আমিই ছিলাম একমাত্র সঙ্গী। তার বুদ্ধি ছিল অসাধারণ। একবার সে আমাকে বলল, অগর ভাই, আমাকে পড়া শেখাও। তখন আমি পড়ি ক্লাস টেনে। আমার এমন কী বিদ্যা যে একটা অন্ধ মেয়েকে পড়া শিখাব? কতগুলি বর্ণ আছে—স্বরবর্ণ কিছু আছে ব্যাঞ্জন বর্ণ এদের আলাদা ধ্বনি আছে। ধ্বনিগুলি তাকে শুনাতে পারব। কিন্তু বর্ণগুলি তো সে কোনদিন দেখবে না।
কাগজের উপর বর্ণগুলি বড় বড় করে লিখে তার উপর দিয়ে পারুলের আঙুল বুলিয়ে নিলে সে কিছুটা আঁচ হয়ত পাবে। কিন্তু যুক্তবর্ণ বুঝব কী করে? আর বুঝতে পারলেও এতকিছু সে মনে রাখবে কী করে? আমি খুবই অনাগ্রহের সঙ্গে কাগজে “অ” লিখে শুরু করলাম। এবং অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম পুরো ব্যাপারটা পারুল শিখল অস্বাভাবিক দ্রুততায়। সে যত না আনন্দিত হল তার চেয়ে একশগুণ আনন্দিত হলাম আমি নিজে।পারুল বেশিরভাগ সময় খুব হাসিখুশি থাকত। তবে সে সত্যি হাসিখুশি থাকত, না—হাসিখুশি থাকার ভান করত তা আমি জানি না। তবে মাঝে মাঝে মন খারাপ করত। মন খারাপটা বেশির ভাগ সময় হত যখন কোন একটা জিনিস সে বুঝতে চাইত অথচ আমি তাকে বুঝাতে পারতাম না। যেমন রঙ আসলে কী? পারুল জানতে চাইল, আম যখন কাঁচা থাকে তখন তার রঙ তোমরা বল সবুজ পাকলে হয় হলুদ। এর মানে কী?
একটা কাঁচা আমের গন্ধ একরকম, পাকা আমের গন্ধ আরেক রকম এটা আমি বুঝতে পারি। গন্ধ না শুকে হাত দিয়ে ছুঁয়েও বোঝা যায় কোনটা কাঁচা কোনটা পাকা। কিন্তু হাত দিয়ে ছুঁয়ে, গন্ধ না খুঁকে দূর থেকে তুমি কী করে বলবে কোনটা কঁচা কোনটা পাকা? রঙ দেখে।সেই রঙটা কী? একটা জিনিসের অনেকগুলি রঙ কেন হয়? কীভাবে হয়? আমি বুঝতে পারি না। হতাশ বোধ করি। যে চোখে দেখতে পায় তার কাছে রঙের ব্যাপারটা যত সহজ, যে দেখতে পায় না তার কাছে এটা ততই কঠিন।এক সময় লক্ষ্য করলাম পারুলের বেশিরভাগ প্রশ্নেরই আমি জবাব দিতে পারছি না। তার প্রশ্নগুলি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।অগর ভাইয়া তুমি প্রায়ই বল চাঁদের আলো সুন্দর। তা হলে কি সূর্যের আলো অসুন্দর?
অসুন্দর না তবে চাদের আলো বেশি সুন্দর। চাঁদের আলো নরম।আলোর ভেতর নরম আর শক্ত কী? তুমি তো আর আলো হাত দিয়ে ধরতে পারছ না।কথার কথা বললাম।সূর্যের আলো গায়ে লাগলে আমি বুঝতে পারি। চাঁদের আলো বুঝতে পারি কেন? ঐ যে বললাম চাঁদের আলো খুব হালকা।হালকা বলছ কেন? আলোর কি ওজন আছে? পারুল আমি বুঝতে পারছি না।তুমি একবার বলেছি পৃথিবীতে সব মিলিয়ে মাত্র সাতটা রঙ। আসলেই কি তাই? হ্যাঁ সাতটা রঙ। তবে একটা রঙের সঙ্গে অন্য রঙ মিলে নতুন রঙ তৈরি হয়।বুঝতে পারছি না।চিনি সঙ্গে যদি সামান্য লবন মেশানো হয় তাহলে খাবারে যমেওন মিষ্টি স্বাদ থাকে তার সঙ্গে সঙ্গে একটু লোনা স্বাদও থাকে। অনেকটা এ রকম? তার মানে কি এই যে পৃথিবীতে রঙের কোনো সীমা নেই?
হ্যাঁ তাই।আরো পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বল আমি কিছু বুঝতে পারছি না।আমি তাকে বুঝাতে পারি। আমি নিজে যেমন হতাশ হই—পারুল তার চেয়ে বেশি হতাশ হয়। সে প্রাণপণে চেষ্টা করে তার হতাশা চেপে রাখার। সেই চেষ্টা ফলবতী হয় না।পারুল যতই বড় হতে থাকল তার ভেতর থেকে হাসি খুশি ভাব ততই কমে যেতে লাগল। এবং তার প্রশ্নগুলিও ততই অদ্ভুত হতে লাগল। যেমন সে একদিন জিজ্ঞেস করল– অগর ভাইয়া একটা মেয়ে যখন একটা ছেলেকে পছন্দ করে—মানে এই ইয়ে ধর ভালবাসে তখন কি সেই ভালবাসারও রঙ আছে?
না।না কেন? সব কিছুর রঙ আছে ভালবাসার রঙ থাকবে না কেন? থাকতেই হবে। ভালবাসার খুব সুন্দর রঙ থাকবে। ঘৃণার থাকবে কুৎসিত রঙ। অবহেলার এক রকম রঙ আবার অভিমানের অন্য রকম রঙ।আমি হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকি। পারুল প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যায়। মনে হয়ে সে যেন রেগে যাচ্ছে। আচ্ছা আবেগের কোন রঙ নেই? শব্দের? শব্দের কী কোন রঙ আছে? গাছের পাতা যখন বাতাসে কাঁপে তখন কি তার রঙ বদলে যায়?
পারুল গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে বলে—আমার মনে হয় শব্দের রঙ আছে। তোমরা ভালমত দেখতে পার না বলে বুঝতে পার না। বৃষ্টি পড়ার শব্দের এক রকমের রঙ, আবার পাখি যখন ডাকল তখন আরেক রকম রঙ। মুরগি যখন জবাই করার আগে চিৎকার করতে থাকে তখন তার চিৎকারের এক রকম রঙ। আবার স্বাভাবিক অবস্থায় যে যখন ডাকে তখন অন্য রকম রঙ।আমি চুপ করে যাই পরুলও চুপ করে যায়। এবং একটা সময় আসে যখন এ জাতীয় কথাবার্তা সে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। বেশির ভাগ সময় সে কাটাতে থাকে আমাদের বাড়ির পেছনের পুকুর পাড়ে। আমি দূর থেকে লক্ষ্য করি সে পুকুরের পাড় ঘেসে হাঁটে আর আপন মনে কথা বলে।
বাবা একদিন বললেন, মেয়েটার হল কী বলতো? পাগল হয়ে গেল নাকি? পুকুরের চারদিকে শুধু চক্কর দেয়। পুকুরটা কি কাবা শরীফ যে তার চারপাশে চক্কর দিতে হবে? নিষেধ করিস তো। কোন দিন পা পিছলে পুকুরে পড়বে। সাঁতার জানে না। একসিডেন্ট করবে।বাবার কথা একদিন ফলে গেল। পারুল পা পিছলে পুকুরে পড়ে গেল। আমরা কেউ তা জানতেও পারলাম না। আমরা জানলাম দুপুরের পর যখন পারুল পুকুরে ভেসে উঠছে।পারুল পা পিছলে পুকুরে পড়েছিল না-কি নিজে ইচ্ছা করে পুকুরে নেমে গিয়েছিল এ বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে।
দৃষ্টিহীন মানুষ অসম্ভব সাবধানী হয়। কলার খোসায় পা পিছলে সাধারণ মানুষ পড়ে, দৃষ্টিহীন মানুষরা পড়ে না। তাছাড়া পুকুর পাড়ের মাটির প্রতিটি ইঞ্চি পারুলের পরিচিত। সে তার ক্ষুদ্র জীবনে খুব কম করে হলেও এক লক্ষবার পুকুরের চারদিকে হেঁটে ফেলেছে।যে রাতে পারুল মারা যায় তার আগের রাতে আমার সঙ্গে সে যে সব কথা বলেছে তার থেকেও খানিকটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আমরা দুজন রাতের খাবার খাচ্ছি—বাবা বাইরে। তিনি রাতেই ফিরবেন, কিন্তু ফিরতে দেরি হবে। পারুল ভাত মাখতে মাখতে হালকা বলল, অগর ভাইয়া মৃত্যুর আগে আগে অন্ধ মানুষ নাকি চোখে দেখতে পায়। বধিরও কানে শুনতে পায়? কথাটা কি সত্যি?
আমি বললাম, কে বলেছে? রহিমা খালা বলেছে।ঠিক বলেনি।পারুল গম্ভীর গলায় বলল, আমার মনে হয় ঠিকই বলেছি। মৃত্যুর আগে শেষবারের মত মানুষ প্রাণ ভরে পৃথিবী দেখবে এটাই স্বাভাবিক। বুঝলে ভাইয়া আমি আর কিছু চাই না শুধু একবারের মত রঙ ব্যাপারটা কী দেখতে চাই।
