এই ট্রেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যাচ্ছেন। আমার বর্তমান মিশন তার নাম জানা । তাঁর নাম A K K। A K K মানে? আবুল খায়ের খান। উনার জন্মতারিখ জানেন? জন্মতারিখতাে জানিনা। জন্মতারিখ দিয়ে কি হবে?
উনার রাশি গণনা করব। উনি কোন রাশির জাতক, উনার শুভ সংখ্যা কি ইত্যাদি বের করা হবে।
চিত্রা বলল, আপনার কি হয়েছে একটু বলবেন? আপনার কথা জড়িয়ে
যাচ্ছে। আপনি এলােমেলাে পা ফেলছেন।
আশহাব বলল, আমার কি হয়েছে আপনি সত্যি জানতে চান? চাই।
আশহাব বলল, তিন পেগ হুইস্কি খেয়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যে আরেক পেগ খাব। তখন হবে চার পেগ। পিথাগােরাসের মতে চার একটি ম্যাজিকেল সংখ্যা। চারের বর্গমূল হল দুই। এটি একটি প্রাইম সংখ্যা। মহান অংকবিদ পিথাগােরাসের কারণেই আমাকে চার পর্যন্ত যেতে হচ্ছে। আর কিছু জানতে চান?
চিত্রা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে। আশহাব বলল, আপনি কি আমার জন্যে একটা কাজ করতে পারবেন? ছছাট্ট কাজ। কাজটা করলে আমার খুব উপকার হয়।
কাজটা কি?
আমার মাকে গিয়ে বলবেন যে তার গুণধর পুত্র মদ খাচ্ছে। গ্রীন লেভেল হুইস্কি । ভালাে কথা, মন্ত্রীর নামটা আরেকবার বলুন। ভুলে গেছি।।
আবুল খায়ের খান। গুড। মাওলানা সাহেবের নামটা জানতে পারলে ভাল হত। উনার নামের প্রয়ােজন পড়তে পারে।
কোন মাওলানা?
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
আছেন একজন ৭ নাম্বার বগিতে আছেন। ধারণা করা যাচ্ছে তিনি ট্রেনের ৬৪৯ জন যাত্রীর মধ্যে সবচে ধার্মিক। | আশহাব রশীদ সাহেবের কামরায় ঢুকে শব্দ করে দরজা বন্ধ করে ফেলল। কামরার বাইরে হতভম্ব অবস্থায় চিত্রা দাঁড়িয়ে আছে।
মাওলানা সাহেবের নাম আজিজুর রহমান। বয়স ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ। রােগা পাতলা চেহারা থুতনিতে সামান্য দাড়ি। মাওলানা সাহেব মনে হচ্ছে শৌখিন মানুষ। তার গায়ের পাঞ্জাবীটা দামী। ফুলের নকশা কাটা। পাঞ্জাবীর উপর যে শালটা দিয়েছেন সেই শালও যথেষ্ট দামী। মাথার টুপিটা রঙিন নকশাদার।
মাওলানা স্ত্রীর সঙ্গে রাগারাগি করছেন তবে গলা নামিয়ে । রাগারাগির কারণ তাঁর স্ত্রী আফিয়া মাগরেবের নামাজ পড়ে নি।
মাওলানা বললেন, নামাজটা কেন পড়লে না একটু বলতে শুনি। তুমি জান নামাজ কাজা করতে দেখলে আমার ভাল লাগে না।
আফিয়া বলল, আমার শরীরের যে অবস্থা নিচু হতে পারি না। সেজদায় যাব কি ভাবে?
বসে বসে নামাজ পড়। তােমার এই অবস্থায় বসে নামাজ জায়েজ আছে।
আফিয়া বলল, আমার অবস্থা দেখলে আল্লাহপাক বলতেন, যা বেটি তাের নামাজ এখন মাফ।
মাওলানা স্ত্রীর বেয়াদবিতে কিছুক্ষণের জন্যে বাক্যহারা হলেন। নিজেকে সামলাতে সময় লাগল। ধর্ম কর্ম, আল্লাহপাক এই সব অতি গুরুতর বিষয় নিয়ে আফিয়ার হালকা কথাবার্তার অভ্যাস আছে। আগে অনেকবার লক্ষ্য
করেছেন। অনেকবার নিষেধও করেছেন।
আফিয়া! জি।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
তুমি একটু আগে মস্তবড় একটা গুনার কাজ করেছ। তওবা কর। তওবা করার পর কাজা নামাজ পড়।
কি ভাবে তওবা করব? আমার সঙ্গে তিনবার বল, আল্লাহুম্মাগফিরলি ওয়ার হামনি। আফিয়া তিনবার বললেন।। তােমার অজু আছে না? আছে। জানালার সামনে বসে বসে পড়। জানালাটা পশ্চিম। ট্রেন যখন ঘুরবে তখনতাে কেবলা বদলে যাবে। মাওলানা বিরক্ত গলায় বললেন, চলন্ত ট্রেনে নামাজে দাঁড়াবার সময় কেবলা ঠিক করে নিতে হয়। এরপরে কেবলা বদলে গেলে অসুবিধা নাই।
আফিয়া বললেন, আপনি আমার জন্যে আরেক বােতল পানি আনেন। পানি খেয়ে তারপর নামাজ পড়ব।
মাওলানা বললেন, আগের বােতলের পানিতে শেষ কর নাই অর্ধেক এখনাে আছে। আফিয়া তুমি নামাজ না পড়ার বাহানা করছ। আল্লাহপাক খুবই রাগ হবেন।
আফিয়া বলল, আপনাকে একটা সত্যি কথা বলি। আমি এখন নামাজ পড়লেই আল্লাহপাক রাগ হবেন। আমার পানি ভাঙছে। আপনি চিন্তায় পড়বেন বলে কিছু বলি নাই। ট্রেনেই আমার সন্তান হবে। আপনি খোজ নেন ট্রেনে কোনাে ডাক্তার আছে কি-না।
কথা শেষ করার আগেই প্রবল ব্যাথায় আফিয়া মুখ বিকৃত করল। চাপা গলায় তার মাকে ডাকল—মা! মা গাে । মাওলানা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। একি মুসিবত! আল্লাহপাকের এটা আবার কোন পরীক্ষা।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
এই মুহূর্তে হতভম্ব অবস্থায় অন্য যে ব্যক্তি মােবাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর নাম এ কে কে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল খায়ের খান। তিনি কোন দলের মন্ত্রী তা ব্যাখ্যা করার কোনাে প্রয়ােজন নেই, সব দলের মন্ত্রীই এক। তাঁদের মধ্যে গুণগত প্রভেদ যেমন নেই, দোষগত প্রভেদও নেই। তাদের সঙ্গে গ্রাম্য বাউলদের কিছু মিল আছে। বাউলরা যেমন বন্দনা না গেয়ে মূল গান গাইতে পারেন না, এরাও সে রকম নিজ নিজ নেত্রীর বন্দনা না গেয়ে কোনাে কথা বলতে পারেন না।।
আবুল খায়ের খান সাহেবের হাতে মােবাইল। তিনি মােবাইল বন্ধ করার পরেও মােবাইলের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর গলায় টক ভাব হচ্ছে। প্রচণ্ড এসিডিটি হলে এ রকম হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুক জ্বলা শুরু হবে।
Read more