জানিনা কেমন। গান শুরু হয় নি। আচ্ছা বাবা শােন, আমি ছােট্ট একটা ঝামেলায় পড়েছি। কি ঝামেলা? কিছু দুষ্ট লােক আমাকে ফলস একুইজিশান দিচ্ছে। আমি নাকি একটা মেয়েকে রেপ করেছি। অথচ ঘটনা যখন ঘটে তখন আমি নারায়নগঞ্জে আমার এক বন্ধুর বাসায়। তুমি বিখ্যাত মানুষ হওয়ায় সবাই লেগেছে আমার পেছনে। আমাকে দিয়ে তারা তােমার ক্যারিয়ার নষ্ট করতে চায়।
মেয়েটা এখন আছে কোথায়? হাসপাতালে।
পুলিশ কেইস হয়েছে?
ওরা কেইস করতে গিয়েছিল। ওসি সাহেব কেইস নেননি। উনি খুবই ভদ্রলােক। আমাকে টেলিফোন করে বলেছেন, চিন্তা না করতে।
পত্রিকায় জানাজানি হয়েছে? এখনাে হয়নি। পত্রিকা চেক দেয়ার ব্যবস্থা করেছি। কি ভাবে? টাকা পয়সা দিয়ে। তৌহিদ আছে আমার ফ্রেন্ড। সে এইসব ব্যাপারে ওস্তাদ।
টেলিফোনের লাইন কেটে গেল। আবুল খায়ের খান সাহেব কপালের ঘাম মুছলেন। তার ছেলে এখনাে মন্ত্রীত্ব যাবার খরবটা জানে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই জেনে ফেলবে। তখন কি হবে? মন্ত্রীত্ব চলে যাওয়া পিতার পুত্ররা ভয়াবহ অবস্থায় পড়বে এটাতাে জানা কথা। ইমতিয়াজ এ্যারেস্ট হবে আজ রাতেই। কোর্টে চালান করা মাত্র কোর্ট তিন দিনের রিমান্ড দিয়ে দেবে।
আবুল খায়ের খান সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। মন্ত্রী থাকতে থাকতে
ছেলের বিয়ে দিতে পারলেন না। দিতে পারলে উপহার দিয়ে ঘর ভরতি করে ফেলতে পারতেন । গাড়ি পাওয়া যেত কম করে হলেও দু’টা। নিউ টেক্সটাইলের মালিক মজিদ সাহেবতাে বলেই রেখেছেন, ছেলের বিয়ের অন্তত ছ’মাস আগে আমাকে খবর দিবেন। আমি জাপান থেকে ব্রান্ড নিউ গাড়ি আনিয়ে দেব। আপনার ছেলে তার চাচার কাছ থেকে একটা নতুন গাড়ি পাবে না তাে কে পাবে? | সুরমা নিজেই গ্লাসে করে দুধ এনেছেন। তিনি স্বামীকে আদুরে গলায় বললেন, এক চুমুকে খেয়ে ফেলতাে। এই নাও এন্টাসিড। দুধ খাওয়ার পর একটা ট্যাবলেট খাবে।
খায়ের সাহেব দুধের গ্লাসে চুমুক দিলেন। সত্যিই বুক জ্বালাপােড়া করছে।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
সুরমা বললেন, এই শােননা, ইমতিয়াজ এই মাত্র টেলিফোন করেছে। শত্রুতা করে কে না-কি তাকে ফাসাতে চেষ্টা করছে। ধানমন্ডি থানার ওসি সাহেবকে একটু বলে দিও। না-কি আমি বলব?
তােমার বলার দরকার নেই। আমি বলতে পারি। আমাকে উনি খুবই সম্মান করেন । খায়ের সাহেব বললেন, বললাম তাে তােমাকে টেলিফোন করতে হবে । কথা যা বলার আমি বলব। | বাবুর্চি জিজ্ঞেস করছিল ডিনার কখন দিবে। ঠিক দশটার সময় দিতে বলব?
বল। দুধের গ্লাস হাতে নিয়ে বসে আছ কেন। খাও। তুমি তােমার কাজে যাও। আমি সময় মতাে খেয়ে নেব। সুরমা বললেন, তুমি একা একা আছ কেন? এসাে সবাই গল্প করি। খায়ের সাহেব বিরক্ত ভঙ্গিতে বললেন, আমাকে কিছুক্ষণ একা থাকতে দাও।
তােমার সমস্যা কি? দশটা না পনেরােটা না—একটা মাত্র শালী। আয়ােজন করে বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছ, একটা কথা বলছ না। ওরা কি মনে করবে? যমুনার হাসবেন্ড কি যে ভালাে জোক বলতে পারে। শুনলে হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাবে। এসাে জোক শুনে যাও।
একটা জরুরি টেলিফোন করে আসি। পাচটা মিনিট দাও।
মনে থাকে যেন পাঁচ মিনিট—আমি কিন্তু ঘড়ি দেখব। পাঁচ মিনিটের মধ্যে না এলে যমুনা এসে তােমাকে এ্যারেস্ট করে নিয়ে যাবে।
সুরমা দ্রুত কেবিনের দিকে রওনা হলেন, তখনই ছােট্ট অঘটন ঘটল। সেলুন কারের একজন এটেনডেন্টের সঙ্গে তাঁর ধাক্কা লেগে গেল । এটেনডেন্টের হাতে ট্রে। ট্রে-তে তিনটা টমেটো জুসের গ্লাস। একটা গ্লাস গড়িয়ে পড়ল সুরমার শাড়িতে। সুরমা কঠিন গলায় বললেন, এই স্টুপিড। তুমি কি অন্ধ। জবাব দাও, তুমি কি অন্ধ? এই শাড়ির দাম জান?
এটেনডেন্ট বেচারা গেল হকচকিয়ে। এইবার তার হাতের ট্রে পড়ে গেল । দ্বিতীয় গ্লাসটাও গড়িয়ে পড়ল। সুরমা চেঁচিয়ে বললেন, এই স্টুপিডটাকে এখানে কে এনেছে? এই ব্যাটা বদমাশ কানে ধর। কানে ধর বললাম।
খায়ের সাহেব বললেন, সুরমা বাদ দাও তাে।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
সুরমা কঠিন গলায় বললেন, আমার এডমিনস্ট্রেশনে তুমি নাক গলাবে না। এদের শাস্তি না দিলে এরা ঠিক হবে না। হাদার মতাে দাঁড়িয়ে আছ কেন? কানে ধর। কানে ধর বললাম। গুড! এখন উঠবােস কর। আমি না বলা পর্যন্ত থামবে না।
সেলুন কারের যাত্রীরা বের হয়ে এসেছে। নতুন বিয়ে হওয়া মেয়েরা স্বামী আশে পাশে থাকলে আহ্লাদ করতে পছন্দ করে। যমুনা সেই কারণেই হয়ত বলল, ভিডিও ম্যান কোথায়? এই ভিডিও ম্যান! দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভিডিও করুন না। এমন একটা ইন্টারেস্টিং ইভেন্ট! আপনি ক্যামেরা নিয়ে হা করে আছেন।
ভিডিও ম্যান ভিডিও স্টার্ট করল। যমুনা বলল, আপা দেখ, ক্রিমিন্যাল মুখ বাঁকা করে আছে। কাদার চেষ্টা করছে। কাঁদতে পারছে না। হ্যালাে ভিডিও ম্যান! আপনি ওর ফেসটা ক্লোজে ধরুন। বিগ ক্লোজ।। | আবুল খায়ের সাহেব এই পর্যায়ে স্ত্রীর পাশে দাঁড়ালেন। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিস করে বললেন, খুব জরুরি কথা, ঐদিকে চল। এক্ষুনি এসাে। রাইট নাউ। সুরমা অনিচ্ছায় এগিয়ে গেলেন। কানে ধরে উঠবােসের দৃশ্য ভিডিও হচ্ছে। দেখতে তাঁর মজা লাগছে।
সুরমা বললেন, কি বলতে চাও? আবুল খায়ের বললেন, আমার মন্ত্রীত্ব নেই। কি বললে?
Read more