আমাকে কয়েনটা দাও আমি দেখাচ্ছি। ট্রেনে যাত্রীদের নিয়ে আমি যখন কনশাসলি চিন্তা করছিলাম তখন আমার ব্রেইন নিজের উদ্যোগে চিন্তা ভাবনা করে কৌশলটা বের করেছে।
আশহাব একটা কয়েন দিল। রশীদ সাহেব বললেন, তােমাকে ম্যাজিকটা দেখালে তুমি মজা পাবে না। কারণ তুমি কৌশলটা জান। এক কাজ কর ঐ মেয়েটাকে ডেকে আন। সে মজা পাবে।
দশটা মিনিট পরে যাই স্যার? দশ মিনিট পরে যাবে কেন? আশহাব বিব্রত গলায় বলল, আমার মা আমার উপর বিশেষ একটি কারণে খুবই রেগে আছেন। তার রাগ পড়ার সময় দিচ্ছি। আধাঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে সাধারণত তার রাগ পড়ে যায়।
তুমি হিসেব করে বের করেছ?
আমার বাবা হিসেব করে বের করেছেন। মা বেশির ভাগ রাগ বাবার সঙ্গে করতেন। বাবার সারভাইবেলের জন্যে হিসাবটা দরকার ছিল।
উনি কি করতেন? ব্যাংকার। গুড আমরা পনেরাে মিনিট অপেক্ষা করব।
চিত্রা বসে আছে সাজেদার সামনে। চিত্রার মনে হচ্ছে ভদ্রমহিলা কিছুটা শান্ত হয়েছেন। তবে এখন তিনি ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছেন। কথারও আগা মাথা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে না। অর্থহীন কথা শুনতে চিত্রার আপত্তি নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিলির অর্থহীন কথা শুনে সে অভ্যস্ত। সমস্যা হল দ্রমহিলা তাকে বৌমা বলে সম্বােধন করছেন। চিত্রার উচিত তাকে মনে করিয়ে দেয়া যে তিনি ভুল করছেন।
চিত্রার সঙ্গে এই প্রথম তার দেখা হয়েছে, এবং চিত্রা তাঁর বৌমা না। বৌমা হবার কোনাে বাসনাও তার নেই।। | বৌমা শােন, আমার ছেলে ইচ্ছা করে আমাকে অপমান করার জন্যে মদ গিলছে। সে কি করবে তােমাকে বলি। গলা পর্যন্ত মদ গিলবে তারপর টলতে টলতে কামরায় ঢুকবে। তােমার সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করবে। তখনতাে
আমি তাকে ছাড়ব না। মায়ের সামনে যে তার স্ত্রীকে অপমান করে তার মতাে কুলাঙ্গার এই দুনিয়ায় জন্মায় নি।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
আমি সেই কুলাঙ্গারকে সহ্য করবআমি খা বাড়ির মেয়ে। আমার দাদা আশরাফ আলীর নাম নিশ্চয় শুনেছ? আমি আশরাফ আলী খাঁ সাহেবের নাতনী। আশরাফ আলী খাঁ সাহেব প্রকাশ্য বাজারে থানার ডিউটি অফিসারকে কি করেছিলেন তা এখনাে ইতিহাস। পুলিশের এস পি খবর পেয়ে জেলা হেড কোয়ার্টার থেকে দাঙ্গা পুলিশ নিয়ে এলেন। আমার দাদাজানের লােকজনও লাঠি-বৈঠা নিয়ে তৈরি হল।
দাদাজান তার দু’নলা বন্দুক বের করলেন। থমথমে অবস্থা। দাঙ্গা বেঁধে যায় এমন অবস্থা। শেষ পর্যন্ত এস পি সাহেবের বুদ্ধিতে সমস্যার সমাধান হল। এস পি সাহেব শাদা পােষাকে এসে দাদাজানের বাড়িতে ঢুকে বললেন, স্যার, আমার চাচা আপনার ছাত্র ছিলেন। দাদাজান সঙ্গে সঙ্গে এস পি সাহেবকে জড়িয়ে ধরে বললেন, বাবা কেমন আছ? এস পি সাহেব বললেন, ভালাে থাকব কি ভাবে? শুনেছি আমার এক অফিসার আপনার সঙ্গে বেয়াদবী করেছে। আমি এস পি। আমার অফিসারের বেয়াদবী আমি সহ্য করব না।
দাদাজানের রাগ সঙ্গে সঙ্গে পানি। তিনি বললেন, এটা কেমন কথা। অল্প বয়সের উত্তেজনায় একটা বেয়াদবী করেছে এটা কোনাে ব্যাপার না। তুমি তাকে খবর দিয়ে আন হাত মিলাই।
এখন বুঝেছ আমি কোন বংশের? চিত্রা বলল, জি বুঝেছি।
সাজেদা বড় করে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি যাও আমার ছেলেকে ডেকে আন। আমি তাকে ক্ষমা করেছি। আমি যেমন রাগতে পারি ক্ষমাও করতে পারি। রাত দশটা বাজে। তার নিশ্চয়ই ক্ষিধে লেগেছে। নটা বাজতেই সে খেয়ে নেয়। ছােট বেলার অভ্যাস।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
চিত্রা উঠে দাঁড়াল। মহিলার সঙ্গে কামরা শেয়ার করার ব্যাপারটা তার এখন আর ভাল লাগছে না। তারচে অনেক ভালবুড়াের অংকের গল্প শুনে রাত কাটানাে।
আশহাব কামরা থেকে বের হয়েছে তবে ঠিক মতাে পা ফেলতে পারছে
তাকে এগুতে হচ্ছে দেয়াল ধরে। চিত্রার সামনে সে খানিকটা বিব্রতও বােধ করছে। চিত্রা বলল, আপনাদের মাতা-পুত্রের সমস্যায় হঠাৎ জড়িয়ে পড়েছি। ভাল লাগছে না।
আশহাব বলল, ভাল লাগার কথা না। সমস্যায় আপনি ইচ্ছে করে জড়িয়েছেন। মা’র সঙ্গে রুম শেয়ার করতে চেয়েছেন। মা কি তার দাদাজানের গল্প শুরু করেছেন?
হঁ্যা করেছেন। উনার দাদাজানের গল্প সমস্যা না। সমস্যা হচ্ছে উনি মাঝে মাঝেই আমাকে বৌমা ডাকছেন। আপনি নিশ্চয়ই বিয়ে করেছিলেন। আপনার মায়ের একজন আদরের বৌমা ছিল। ছিল না?
জি না।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
চিত্রা বলল, আগে বৌমা ডাকার অভ্যাস না থাকলে হঠাৎ করে কারাে মুখ দিয়ে বৌমা বের হবে না।
আশহাব বলল, মার মুখ দিয়ে যে কোনাে কিছু বের হবে। আমার মা’কে আপনি চেনেন না। আমি চিনি। তিনি মানসিক ভাবে সামান্য অসুস্থ। মার হয়ে আপনার কাছে আমি ক্ষমা চাচ্ছি।
আশহাব হাত জোড় করল। চিত্রা বলল, ক্ষমা চাইতে হবে না।
আশহাব বলল, মায়ের অসুখটা প্যারানয়ার অন্য এক ফরম। প্যারানয়ারের রােগী মনে করে সবাই ষড়যন্ত্র করছে তাকে মেরে ফেলার জন্যে। আর মা মনে করেন অপরিচিত যেই তার সঙ্গে কথা বলছে সেই তার পরম আত্মীয়। আপনি এখন মা‘র কাছে আমার চেয়ে একশ গুন বেশি প্রিয়।
চিকিৎসা করাচ্ছেন না? করাচ্ছি।
Read more