কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২)

ভালাে সমস্যা হল । আমি সিগারেটে টান না দিয়ে থাকতে পারি না। করিডােরে গিয়ে খাবেন।কিছুক্ষণ

বুড়াে বলল, আমার শরীর ভালাে না। আর্থরাইটিসের ব্যথা। হাঁটাহাঁটি করতে পারি না। প্রতিবার সিগারেটের জন্যে করিডােরে যাওয়া আমার জন্যে সমস্যা। যাই হােক তােমার নাম কি? 

চিত্রা। 

চিত্রা নামের অর্থ কি? 

জানি না । (চিত্রা তার নামের অর্থ জানে। বুড়ােটাকে অর্থ বলতে ইচ্ছা হচ্ছে না। চিত্রা একটা নক্ষত্রের নাম।) 

আমার নাম রশিদ। আব্দুর রশিদ উদ্দিন। শুধু রশীদ উদ্দিন নাম হলে ভাল হত। বাবা আবার কি মনে করে নামের আগে আব্দুর বসিয়েছেন। তুমি কি পড়াশােনা করছ? ছাত্রী? 

জি। 

কি পড়ছ? ফিজিক্স। কোন ইয়ার? থার্ড ইয়ার। এবার অনার্স দেব। ঢাকা ইউনিভার্সিটি? জি। ইউনিভার্সিটি খােলা না? খােলা। ইউনিভার্সিটি খােলা, তাহলে যাচ্ছ কোথায়? ক্লাস মিস করে ঘােরাঘুরি করার মানে কি? 

জবাব না দিয়ে চিত্রা বের হয়ে গেল। ক্লাস মিস দিয়ে ঘােরাঘুরি করলে বুডাের কি? বুড়াের সঙ্গে অকারণ কথা বলার চেয়ে করিডােরে হাঁটাহাঁটি করা ভালাে। ট্রেনে বুফে কার নিশ্চয়ই আছে। বুফে কারে জানালার পাশে বসে চা খেতে খেতে দূরের দৃশ্য দেখা যেতে পারে। সন্ধ্যা এখনাে মিলায়নি। শেষ বিকেলের আলােয় দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত দেখতে ভালাে লাগার কথা। রিডার্স ডাইজেস্ট খুলে ‘jokes’ পড়া যেতে পারে। যদিও সে এখনাে রিডার্স ডাইজেস্টের কোন ‘জোক’ পড়ে হাসেনি। ভাগ্য ভাল থাকলে এবার হয়ত হাসবে। 

তিন কামরা পরেই বুফে কার। সেখানে চা নেই আছে কফি। চা বিক্রিতে লাভ নেই। কফিতে লাভ বলেই কফি।

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২)

কফির কড়া গন্ধ চিত্রার ভালাে লাগে তারপরেও সে কফি নিয়ে জানালার পাশে বসল। ব্যাগের ভেতর মােবাইল ফোনের রিং বাজছে। মনে হচ্ছে হাত ব্যাগের ভেতর ছােট্ট কোনাে শিশু হাত পা ছুঁড়ে কাঁদছে। এক্ষুনি তাকে কোলে নিতে হবে। 

টেলিফোন করেছে লিলি। ধরবে না ধরবে না করেও চিত্রা টেলিফোন ধরল। লিলি অকারণে কথা বলবে। বিরক্ত অবস্থায় কারাের অকারণ কথা শুনতে ভাল লাগে না। 

হ্যালাে চিত্রা, ট্রেন ছেড়েছে? 

টঙ্গী পার হয়ে গেছে? 

হুঁ হুঁ করছিস কেন। কথা বল। নিজের মতাে করে টু সিটের স্লিপার পেয়েছিস? 

হুঁ। বললাম না মামাকে বললেই মামা ব্যবস্থা করে দেবে। এখন দরজা বন্ধ করে হাফ নেংটা হয়ে শুয়ে পড়। তুইতাে আবার ট্রেনে ঘুমাতে পারিস না। গল্পের বই নিয়ে বসে যা। গান শােনার যন্ত্রপাতি নিয়েছিস? এম পি থ্রটা আছে না? 

 সেকি? আমার ওয়াকম্যানটা তােকে নিয়ে যেতে বললাম না? বের করে তাের টেবিলে রেখেছিলাম। 

ওয়াকম্যানে গান শুনতে আমার ভালাে লাগে না। মনে হয় কানের সঙ্গে মুখ লাগিয়ে কেউ গান করছে। 

লিলি আনন্দিত গলায় বলল, এটাইতাে ভালাে। শুধু পুরুষ গায়কদের গান শুনবি। মনে হবে কোনাে পুরুষ তাের কানে চুমু খাচ্ছে। 

চিত্রার বিরক্তি লাগছে। লিলির মুখ আলগা। অশালীন কথাবার্তা সে অবলীলায় বলে। চিত্রা বলল, লিলি একটা কথা—তাের মামা কিন্তু আমাকে একা সিট দেননি। আমার সঙ্গে এক বুড়াে আছে। 

বলিস কি? আমি এক্ষুনি মামাকে টেলিফোন করছি। এখন টেলিফোন করে লাভ কি? 

অবশ্যই লাভ আছে। প্রয়ােজনে ট্রেন ব্যাক করে ঢাকা যাবে। নতুন বগি লাগানাে হবে। নাে হাংকি পাংকি । 

কেন অর্থহীন কথা বলছিস? লিলি বলল, আমি মােটেই অর্থহীন কথা বলছি না।

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২)

আমি অর্থহীন কথা বলার মেয়ে না। এক্ষুনি টেলিফোন করে আমি মামার বারটা বাজিয়ে দিচ্ছি । আর শােন, বুড়াে যেহেতু আছে-“খবরদার ঘুমাবি না। বুড়ােগুলাে হয় sex starved। শুধু ছোঁক ছোঁক করে। রাতে ঘুমিয়ে পড়বি হঠাৎ জেগে উঠে দেখবি বুড়াে তাের বিশেষ কোনাে জায়গায় হাত রেখে ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে আছে। 

Please stop it. এরচে ভয়ংকর কিছুও ঘটতে পারে। যেমন ধর… চিত্রা টেলিফোনের লাইন অফ করে দিল। লিলি থামবে না—ননাংরা কথা বলতেই থাকবে। লিলি পরীর মতাে একটা মেয়ে । মায়া মায়া চোখ। পবিত্র চেহারা অথচ কি সব নােংরা ধরনের কথা। চিত্রা কফিতে চুমুক দিল। যা ভেবেছিল তাই অতিরিক্ত চিনি এবং কুসুম গরমও না। কফি থেকে হরলিক্সের গন্ধও আসছে। এর মানে কি? বয়কে ডেকে একটা ধমককি দেয়া যায় না? অবশ্যই দেয়া যায়। তবে এই মুহূর্তে ধমক দেয়া যাবে না।

অন্য একজন ধমকা ধমকি করছেন। তিনি গর্ভবতী বােরকাওয়ালীর স্বামী-মাওলানা । তিনি পানি কিনতে এসেছেন। ছােট এক বােতল পানি তের টাকা চাচ্ছে। অথচ বাইরে বার টাকা। বয় নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, বাইরে থেকে পানি কিনেন। খামাখা প্যাচাল পারেন কেন? | মাওলানা এখনাে তার স্ত্রীকে পানি খাওয়াননি ভেবে চিত্রার খারাপ লাগছে। তার স্বামীও কি এরকম ইনসেনসেটিভ হবে?

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২)

 চিত্রা যাচ্ছে বিয়ে করতে। যদিও তার বড় মামা খােলাসা করে কিছু বলছেন না। তিনি খােলাসা করে কিছু বলার মানুষও না। তিনি জানিয়েছেন–আমার শরীর খুব খারাপ, স্ট্রোক হয়েছে। একটা পা অবস। আমি তােকে প্রতিষ্ঠিত দেখে মৃত্যুর জন্যে তৈরি হতে চাই। চিত্রাকে প্রতিষ্ঠিত দেখার মানে নিশ্চয়ই তাকে বিবাহিতা দেখা। পুরুষদের কাছে মেয়েদের প্রতিষ্ঠার একটাই অর্থ বিবাহ। | চিত্রা কফির কাপ সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে এটেনডেন্টকে খুঁজে বের করবে। সে কোনাে ব্যবস্থা করেছে কি-না দেখব। 

বুড়াে সিগারেট হাতে করিডােরে দাঁড়ানাে। চিত্রাকে দেখে বলল, কোথায় গিয়েছিলে? 

 

Read more

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *