কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৪)

অচেনা পুরুষদের সঙ্গে হড়বড় করে কথা লিলি বলতে পারে। সে পারে না। সে খানিকটা আড়ষ্ট বােধ করে। তার জায়গায় লিলি থাকলে বলতাে-অবশ্যই বসতে পারেন। হঠাৎ আমার সামনে বসতে চাচ্ছেন কেন? নিশ্চয়ই কোনাে কারণ আছে। কারণটা ব্যাখ্যা করুন।কিছুক্ষণ

প্রথমবারেই সুন্দর করে ব্যাখ্যা করবেন যাতে আমাকে দ্বিতীয় বার কোনাে প্রশ্ন না করতে হয়, সহজ বাংলায় ঝেড়ে কাশুন। ভদ্রলােক তার সামনে বসেছেন। বয়স ২৫ থেকে ত্রিশ। চারকোনা মুখ। চোখে গােলাকার মেটাল ফ্রেমের চশমা। চারকোনা মুখের সঙ্গে গােল চশমা মানাচ্ছে না। তাকে বােকা বােকা দেখাচ্ছে। গায়ে ব্লেজার। কফি কালারের ব্লেজার । ভদ্রলােকের মাথা ভর্তি কোকড়ানাে চুল। কোকড়ানাে চুলের জন্যে চেহারায় নিগ্রো নিগ্রো ভাব চলে এসেছে। তবে গায়ের রঙ গৌর। ইনি কি একজন তরুণীকে একা বসে থাকতে দেখে ভাব জমাতে এসেছেন? কিছু পুরুষ থাকে যাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা। 

আমার নাম আশহাব। আশহাব অর্থ বীর। তবে আমি বীর না। ভীতু প্রকৃতির মানুষ । আমি একজন ডাক্তার। মাকে নিয়ে দেশের বাড়িতে যাচ্ছি। 

চিত্রা বলল, ও। তার আড়ষ্ট ভাব কমল না বরং সামান্য বাড়ল। সামনে বসা ভদ্রলােক সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে অচেনা এক তরুণীর সঙ্গে কথা বলছেন যেন তিনি পূর্ব পরিচিত। ঘটনা সে রকম না। চিত্রা এই প্রথম ভদ্রলােককে দেখছে। | দ্রলােক খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, আমি শুনেছি আপনি সামান্য বিপদে পড়েছেন। একটা কাজ করতে পারেন।

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৪)

আমার মা’র সঙ্গে এক কামরায় থাকতে পারেন। আমি চলে যাব আপনার সিটে। 

চিত্রা বলল, থ্যাংক য়ু। চিত্রার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়েছে। ট্রেন জার্নি এখন তার অনেক ভালাে লাগছে। সামনে বসা যুবককে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে জানালা দিয়ে দূরের দিগন্ত দেখতে পারলে ভালাে হত। দিগন্ত ঘন কুয়াশায় ঢাকা। সেই কুয়াশা এগিয়ে আসছে। ট্রেন এমনভাবে ছুটছে যে মনে হচ্ছে কুয়াশা যেন তাকে ধরতে না পারে এটাই ট্রেনটির একমাত্র বাসনা। 

আশহাব বলল, সহযাত্রী হিসেবে আমার মা কেমন সেটা জেনে তারপর ডিসিসান নেবেন। পরে দেখা গেল ফ্রম ফ্রাইং পেন টু ফায়ার । কড়াইয়ে ভাল ছিলেন ঝাপ দিয়ে পড়লেন আগুনে। আমার মা বেশির ভাগ সময়ই বিরক্তি কর। 

 চিত্রা তাকিয়ে আছে। অপরিচিত একজন তরুণীর সঙ্গে কোনাে ছেলে এই ভাবে কথা কি বলে? 

আপনি মা’র সঙ্গে থাকলে সবচে বড় উপকার হবে আমার। মা’র চিৎকার হৈ চৈ শুনতে হবে না। মা নিশ্চয়ই আপনার সঙ্গে চিৎকার করবেন না। 

চিত্রা বলল, চা খাবেন? আমার ফ্লাস্ক ভর্তি চা। আশহাব বলল, আমি চা খাইনা, তবে এখন খাব। আমার মা ট্রেনে উঠার পর থেকে কি নিয়ে হৈ চৈ করছে শুনলে আপনি অবাক হবেন। আপনার শােনাও দরকার । হৈ চৈ আপনার সঙ্গেও করবেন। বলব?

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৪)

চিত্রা বলল, বলুন। 

স্লিপিং কারে একটা ডেডবডি কেন যাচ্ছে এই হচ্ছে মায়ের সমস্যা। ট্রেনে কি যাচ্ছে না যাচ্ছে সেটা আমার ব্যাপার না। ডেডবডি আমি তুলিনি। মা সামনের স্টেশনে নেমে যেতে চাচ্ছেন। অর্থহীন কথা না? | আশহাব উঠে গিয়ে কাউন্টার থেকে কাপ নিয়ে চা ঢালছে। তাকে খুবই বিরক্ত দেখাচ্ছে। তার সামনেই অতি রূপবতী একটা মেয়ে বসে আছে এই ব্যাপারটাই এখন তার মাথায় নেই । 

চিত্রার ইচ্ছা করছে রিডার্স ডাইজেস্টের খােলাপাতাটি ভদ্রলােকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে—এই জোকটা পড়ে আমাকে বলবেন কোন জায়গাটা হাসির। সম্ভব না। এতটা ঘনিষ্ঠতা এই যুবকের সঙ্গে তার হয় নি। হবার 

সম্ভাবনাও নেই। 

তিন নম্বর বগিতে আশহাবের মা সাজেদা বেগম বসে আছেন। তাঁর সামনে। পানের বাটা খােলা। পান, সুপারি, চুন, খয়ের সবই আছে। আসল বস্তু নেই। জর্দা নেই। জর্দা ছাড়া পান কেউ খায়? তাঁর পরিষ্কার মনে আছে পানের বাটায় জর্দা তিনি নিজের হাতে নিয়েছেন। সেই জর্দা গেল কোথায়? অবশ্যই আশহাব সরিয়েছে। জর্দা খেলে এই হয় সেই হয়। বেশি ডাক্তারি শিখে গেছে। এদেরকে সকাল বিকাল দুইবেলা থাপড়াতে হয়। 

দরজায় টুক টুক শব্দ উঠছে। সাজেদা বললেন, কে? দরজা সামান্য ফাঁক হল। চিত্রা মুখ বের করে বলল, আসব? সাজেদা বললেন, এসাে। তােমার নাম চিত্রা? আশহাব বলেছে তুমি আমার সঙ্গে রাতে থাকবে। বােসাে। আমার অসুবিধা নাই।

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৪)

 চিত্রা বসল। সাজেদা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছেন। এত সুন্দর সুন্দর মেয়ে যেখানে সেখানে দেখা যায়, শুধু তিনি তার ছেলের জন্যে মেয়ে খুঁজে পান না। সুন্দরী মেয়ে হঠাৎ পেয়ে গেলে জানা যায় মেয়ের প্রেম আছে। আজকালকার মেয়ে প্রেম ছাড়া থাকতেই পারে না। তার পাশে বসা মেয়েটাকে পছন্দ হচ্ছে। দেখা যাবে এই মেয়ে হয় বিবাহিতা কিংবা 

প্রেমকুমারী । এক সঙ্গে দু-তিনটা প্রেম করে যাচ্ছে। সাজেদা ভাইবা সেসানের জন্যে তৈরি হলেন। রূপবতী কোনাে তরুণী দেখলেই তিনি ভাইবা নেবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি জর্দা ছাড়া পান মুখে দিয়েছেন। মুখ মিষ্টি হয়ে আছে। মিষ্টি মুখে কথা বলতেই ইচ্ছা করে না । 

তােমার কি বিয়ে হয়েছে? জি না। বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে? 

যাচ্ছ কোথায়? দিনাজপুরে আমার বড় মামার কাছে। হঠাৎ বড় মামার কাছে যাচ্ছ কেন? উনি অসুস্থ। উনাকে দেখতে যাচ্ছি। উনার কি অসুখ? হার্টের অসুখ।

 

Read more

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৫)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *