কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৭)

মা কিন্তু অনেক বিরক্ত করবে। রাতে ঘুমুতে দেবে না। উদ্ভট সব ভূতের গল্প শুরু করবেন। সব ভূত উনি নিজেই দেখেছেন।কিছুক্ষণ

চিত্রা বলল, মায়ের উপর আপনার কি কোনাে রাগ আছে? 

আশহাব বলল, আছে। মা হচ্ছে এমন একজন মানুষ যার কাছে অন্যের মতামতের কোনাে মূল্য নেই। আমার ডাক্তার হবার কোনাে ইচ্ছা ছিল না । অন্যের রােগের উপর আমি বেঁচে থাকব ভাবতেই খারাপ লাগে। মা’র জন্যে আমাকে ডাক্তারি পড়তে হয়েছে। আমার বাবার একটা গল্প শুনলেই বুঝবেন মা কেমন মহিলা। গল্পটা বলব? আপনার শােনার ধৈর্য আছে? 

আছে। আপনি গল্প ভালাে বলেন। আশহাব বলল, আমার বাবা ছিলেন খুবই নির্বিরােধী মানুষ। কারাে কোনাে ঝামেলায় নেই। অফিসে যাবেন, অফিস থেকে বাসায় ফিরে চুপচাপ বসে থাকবেন। তিনি একবার ঠিক করলেন সবাইকে নিয়ে কক্সবাজার যাবেন সমুদ্র দেখবেন। তিনি ট্রেনের টিকিট কাটলেন। কক্সবাজারে হােটেল বুকিং দিলেন। তাঁর উৎসাহের সীমা নেই। যেদিন যাব তার আগের দিন মা বললেন, কক্সবাজার যাব না। বাবা হতভম্ব হয়ে বললেন, কেন? 

মা বললেন, কক্সবাজার সি বিচে চোরাবালি আছে। অনেকে চোরাবালিতে ডুবে মারা গেছে। 

বাবা বললেন, সমুদ্রে নামব না। 

মা বললেন, বাদ। বাদ। সমুদ্র বাদ। চল সিলেটে যাই। জাফলং সুন্দর জায়গা। সিমিরা জাফলং গিয়েছিল। ছবি তুলে এনেছে। দেখার মতাে জায়গা। সেখান থেকে ইন্ডিয়া দেখা যায়। 

বাবা বললেন, ইন্ডিয়া দেখার দরকার কি? 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৭)

মা বললেন, সমুদ্র দেখারইবা দরকার কি? চোখ বন্ধ করে ঘরে বসে থাক।। 

আমাদের সমুদ্র দেখার পরিকল্পনা বাতিল হয়ে গেল। বাবা মারা গেলেন সেই বছরই। চিত্রা, আমি যদি একটা সিগারেট ধরাই আপনি কিছু মনে করবেন? 

আমি কিছু মনে করব না। আশহাব সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, মা দুই টিফিন কেরিয়ার ভর্তি খাবার নিয়ে এসেছেন। খাবারের প্রতিটি আইটেম আমাকে খেতে হবে। ভালাে লাগুক বা না লাগুক, খেতে হবে। খাওয়া নিয়ে আরাে ব্যাপার আছে। 

আর কি ব্যাপার? খাবারের প্রথম নলাটা মা আমার মুখে তুলে দেবেন। এতে নাকি ছেলেমেয়ের হায়াত বাড়ে। দৃশ্যটা চিন্তা করে দেখুন—আমি চোখ বন্ধ করে হা করে আছি মা মুখে ভাতের প্রথম নলা তুলে দিচ্ছেন। 

চিত্রার হাসি আসছে সে হাসি চাপতে চাপতে বলল, চোখ বন্ধ করে হা করে থাকবেন কেন? চোখ খােলা রাখবেন। 

চোখ খােলা রেখে সেই সময় মায়ের মুখ দেখব? নাে ।। 

আশহাব সিগারেটে লম্বা টান দিল। ঠিক তখন এটেনডেন্ট বসির বলল, স্যার, আপনাকে আপনার মা ডাকেন। আশহাব চমকে উঠে সিগারেট জানালা দিয়ে ফেলে দিল। সে উঠে দাঁড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ল। বসিরের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি মাকে বলুন আমি এখন আসতে পারব না। একটু দেরি হবে। 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৭)

বসির চলে যেতেই আশহাব ব্ৰিত গলায় বলল, মাকে কেমন ভয় পাই দেখেছেন? মার কথা শুনেই লাফ দিয়ে উঠেছি। 

চিত্রা বলল, দেখলাম। খুবই খারাপ লাগছে। মাকে ভয় পাওয়ার মধ্যে খারাপ লাগার কিছু নেই। আপনি যান তাঁর সঙ্গে দেখা করে আসুন। 

আশহাব উঠে দাঁড়াল। সে দ্রুত যাচ্ছে। চিত্রার মনে হল—এই মানুষটার বর্তমান চেষ্টা এটেনডেন্ট মা’র কাছে পৌছানাের আগেই পৌছানাে। যেন  মহিলাকে শুনতে না হয়, আমি এখন আসতে পারব না। 

সাজেদা বেগম ছেলেকে দেখেই বললেন, আমাকে একা ফেলে রেখে কোথায় ঘুরঘুর করছিস? 

আশহাব জবাব দিল না। সাজেদা বললেন, ঐ মেয়েটা কোথায়? কোন মেয়েটা? রাতে আমার সঙ্গে থাকবে যে মেয়েটা। চিত্রা নাম। আশহাব বলল, জানি না কোথায়। সাজেদা অবাক হয়ে বললেন, মিথ্যা কথা বলছিস কেন? এটেনডেন্ট আমাকে বলল, তুই মেয়েটার সঙ্গে গল্প করছিলি। তুই বলে পাঠিয়েছিস আসতে পারবি না। ঘটনা কি? ঐ মেয়ের সঙ্গে তাের কি? তুই কি ঐ মেয়ের প্রেমে পড়ে গেছিস? 

দশ মিনিট কথা বললে প্রেমে পড়ে যায়? তাহলে মিথ্যা কথা বললি কেন? কেন বললি, মেয়ে কোথায় তুই জানিস । মুখ ভােতা করে থাকবি না। বল ঐ মেয়ের সঙ্গে তাের কি? তাের গা থেকে ভুরভুর করে সিগারেটের গন্ধ আসছে। তুই কি সিগারেট খেয়েছিস? কাছে আয়, মুখ শুকে দেখি । 

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৭)

আশহাব বলল, মুখ শুকতে হবে না মা। আমি সিগারেট খেয়েছি। আজই যে প্রথম খাচ্ছি তা-না, প্রায়ই খাই। 

কি বললি, প্রায়ই খাস? হা খাই। সাজেদা বললেন, তাের ভাব-ভঙ্গি তাে মােটেই ভালাে মনে হচ্ছে না। এখন তাে আমার মনে হচ্ছে তুই সুযােগ পেলে মদও খাস। আমার গা ছুঁয়ে বল তুই মদ খাস কি খাস না। 

মা, আমি কয়েকবার খেয়েছি। হতভম্ব সাজেদা নিজেকে সামলে নিয়ে চাপা গলায় বললেন, তাের বাবা একবার বন্ধুর বাসা থেকে মদ খেয়ে এসেছিল। তাঁকে কি করেছিলাম মনে আছে? 

আশহাব বলল, মনে আছে। আমি যতদিন বাঁচব ততদিন মনে থাকবে। যে অন্যায় সে রাতে তুমি করেছ তার কোনাে তুলনা নেই। | সাজেদা হতভম্ব গলায় বললেন, তুই আমার অন্যায়টা শুধু দেখলি। তাের বাপের অন্যায়টা দেখলি না? বন্ধুর বাসা থেকে মদ খেয়ে এসে আমাকে বলেছে জিরা-পানি খেয়েছে। তার মুখে না-কি জিরার গন্ধ। আমাকে জিরা চেনায়। আমি জিরার গন্ধ চিনি না? আমি মশলা ছাড়া রাধি?

 

Read more

কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৮)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *