কুহক পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

কুহক পর্ব – ৬

নিশানাথ বাবু ঘর থেকে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে নাসিমা উঠে চলে গেল। ডাক্তারের দিকে তাকাল পর্যন্ত না। অন্ধ ভয় তাকে গ্রাস করে ফেলছে। সে দ্রুত বাসায় চলে যেতে চায়। বিবাহিত বয়স্ক এই মানুষটিকে তার ভালো লাগে। ভালো লাগে বললে কম বলা হবে। ভালো লাগার চেয়েও বেশি। সে জানে, গোপনে এখানে আসা অন্যায়। খুবই অন্যায়। তবু সে নিজেকে সামলাতে পারে না।

আজ এই বুড়ো লোকটির কথা তাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। শুধু কি কথা? এই বুড়ো লোেকটি কি কথার বাইরেও কিছু করে নি? তার তো মনে হচ্ছে করেছে। কীভাবে করেছে কে জানে? আচ্ছা এই মানুষটা কি কোনো দরবেশ? কোনো বড় ধরনের পীর ফকির? নাসিমা চলে যাবার পর ডাক্তার সাহেব খানিকক্ষণ একা একা বসে রইলেন। তার পর পরপর দুটো সিগারেট খেয়ে মাসুদকে ডাকলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, বস।

মাসুদ আশ্চর্য হয়ে তাকল। ডাক্তার সাহেবের গলা অন্য রকম লাগছে। গলার স্বরে মমতা মাখানো।বসতে বললাম তো, বস।মাসুদ বসল। ডাক্তার সাহেব বললেন, তুমি বয়সে আমার অনেক ছোট, এই জন্যে তুমি বলি। কিছু মনে কর না।জ্বি না, কিছু মনে করি নি।তোমাকে বরখাস্ত করার যে চিঠিটা দিয়েছিলাম ওটা ফেলে দাও।জ্বি আচ্ছা।রাগের মাথায় আমরা অনেক সময় এটা-ওটা বলি বা করি। এটা মনে। রাখা ঠিক নয়।জ্বি স্যার।

তুমি যেমন ভুল কর, আমিও করি। হয়তো তোমার চেয়ে বেশিই করি। যেমন এই যে নাসিমা মেয়েটাকে প্রশ্রয় দেওয়া—বিরাট অন্যায়।বাদ দেন, স্যার।ভালো একটা মেয়ে অথচ প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে– শুধু আপনার তো দোষ না স্যার। মেয়েটারও দোষ আছে–ও আসে কেন? না-না, মেয়েটার কোনো দোষ নেই। বাচ্চা মেয়ে। এদের আবেগ থাকে বেশি। আবেগের বশে– মাসুদ বলল স্যার, উঠি? সাত-আট জন রুগী এখনো আছে।

তুমি আরেকটু বস। তোমার সঙ্গে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।মাসুদ কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে। অনেকক্ষণ ইতস্তত করে ডাক্তার সাহেব বললেন, তুমি কত দিন ধরে আমাকে চেন? প্রায় সাত বৎসর।এই সাত বৎসরে তুমি নিশ্চয় আমার আচার-আচরণ আমার মানসিকতা খুব ভালো করেই জান। জান না? জানি, স্যার।আমার আজকের ব্যবহার কি তোমার কাছে সম্পূর্ণ অন্য রকম মনে হচ্ছে না।হচ্ছে।এর কারণটা কি?

মাসুদ তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না। ডাড়ার সাহেব বললেন, আমার কি মনে হচ্ছে জান? আমার মনে হচ্ছে বুড়ো লোকটি আমাকে কিছু একটা করেছে।হিপনোটাইজ।হিপনোটাইজের চেয়েও বেশি। আমার ধারণা, খুব উঁচু মাত্রার ট্যালিপ্যাথিক ক্ষমতা সে ব্যবহার করেছে। নিতান্তই অবিশ্বাস্য ব্যাপার। তবে আমার এ রকম মনে হচ্ছে। আচ্ছা, এই লোকটির মাথার ভেতর দিয়ে কী পরিমাণ রেডিয়েশন গিয়েছে।আমি তো স্যার বলতে পারব না। টেকনিশিয়ান বলতে পারবে। জেনে আসব।যাও, জেনে আস।

ডাক্তার সাহেব আবার একটি সিগারেট ধরালেন। তিনি সিগারেট ছাড়ার চেষ্টা করছেন, অথচ আজ এই অল্প সময়ের ভেতর তিনটে সিগারেট ধরিয়ে ফেললেন। মনে মনে ঠিক করে ফেললেন কাল-পরশুর মধ্যে একবার মেডিক্যাল কলেজ লাইব্রেরিতে যাবেন। মস্তিষ্কের উপর রেডিয়েশনের প্রভাব এই জাতীয় কোনো বই পান কি-না তা খোঁজ করবেন। এর উপর কোনো কাজ কি হয়েছে? নিউরো-সার্জনরা বলতে পারবেন। এটা তাঁদের এলাকা। হিটলারের সময় কন্সেনট্রেশন ক্যাম্পের কিছু বন্দীকে নিয়ে পরীক্ষা চালান

ঠিক এক্সরে না হলেও মোটামুটি ধরনের শক্তিশালী ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ দীর্ঘ সময় ধরে মাথার ভেতর দিয়ে চালানো হয়েছিল। এই পরীক্ষার ফলাফল কখনো প্রকাশ করা হয় নি। অথচ জোর করে বন্দীদের উপর অন্য যে সব পরীক্ষা চালানো হয়েছে তার সব ফলাফলই সযত্নে রাখা আছে। মস্তিষ্কের উপর রেডিয়েশনের প্রভাবের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হল না কেন? রহস্যটা কোথায়?

ডাক্তারের কাছ থেকে বের হয়ে নিশানাথ বাবু একটা রিকশা নিলেন। রিকশায় ওঠার পরপরই তাঁর মনে পড়ল যে কারণে ডাক্তারের কাছে এসেছিলেন সেটাই পুরোপুরি ভুলে গেছেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অতি দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। এর কারণ কী?

এই ডাক্তারের কাছে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য হল দাঁতের মাড়ির এক্সরে কপি তোলা। নিশানাথ একজন ডেন্টিস্টের কাছে গিয়েছিলেন। সব দাঁত কেন হঠাৎ করে পড়ে যাচ্ছে এটাই দেখতে চান। ডেন্টিস্ট ব্যাপার দেখে হকচকিয়ে গেল। নিশানাথকে বলল একটা এক্সরে করাতে। যদি তাতে কিছু ধরা পড়ে। সেই উদ্দেশ্যেই এবারে তিনি পলিক্লিনিকে এসেছিলেন, অথচ আসল কথাটিই ভুলে গেলেন।রিকশা দ্রুত যাচ্ছে। এই রিকশাওয়ালা বেশ বলশালী। সে ঝড়ের বেগে রিকশা নিয়ে যাচ্ছে। নিশানাথ বললেন, আস্তে চলুন ভাই।

রিকশাওয়ালা বলল, টাইট হইয়া বহেন। চিন্তার কিছু নাই।তিনি রিকশাওয়ালার মনে কী হচ্ছে পরিষ্কার বুঝতে পারছেন। সে খুব ফুর্তিতে আছে। আনন্দে আছে। তার আনন্দের কারণটিও স্পষ্ট। আজ দেশ থেকে তার স্ত্রী এসেছে। অনেক দিন সে খোঁজখবর নিচ্ছিল না। ভয় পেয়ে তার স্ত্রী (যার নাম মনু) একা একা ঢাকা শহরে চলে এসেছে এবং ঠিকানা ধরে ঠিকই তাকে খুঁজে বের করে ফেলেছে। রিকশাওয়ালা মুখে খুবই রাগ করেছে।

মনুর এক-একা চলে আসাটা যে কীরকম বোকামি এবং ঢাকা শহরটা যে কী পরিমাণ খারাপ তা সে তার স্ত্রীকে বলেছে। তবে মনে মনে সে দারুণ খুশি হয়েছে। এই মুহূর্তে সে ভাবছে ঢাকা শহর পুরোটা সে তার স্ত্রীকে দেখাবে। রিকশায় বসিয়ে বিকাল থেকেই ঘুরবে। হাতে সময় নেই। জমার টাকা তুলে ফেলতে হবে।

নিশানাথ রিকশা থেকে নামবার পর ভাড়ার সঙ্গে আরো ত্রিশ টাকা দিলেন বখশিশ।রিকশাওয়ালা অবাক হয়ে তাকাল। তিনি বললেন, মীরপুরের চিড়িয়াখানাটা তোমার স্ত্রীকে দেখিও। খুশি হবে। এখন স্ত্রীর কাছে চলে যাও। জমার টাকা নিশ্চয়ই উঠে গেছে। তাই না? এই টাকাটা হল বাড়তি।রিকশাওয়ালা ক্ষীণ স্বরে বলল, আপনে লোকটা কে?

নিশানাথ নিচু গলায় বললেন, কেউ না, আমি কেউ না।রিকশাওয়ালার বিস্ময় আরো গাঢ় হল। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে অতীন্দ্রিয় কোনো রহস্য চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছে।দীপা দু দিন ধরে ব্যাপারটা লক্ষ করছেন। বই নিয়ে ঘরের এক কোণে আলো বসে থাকে। পাতা ওল্টায়। এমন নিবিষ্ট তার ভাবভঙ্গি যে মনে হয় সে সত্যি সত্যি পড়তে পারছে। দীপা জানেন এটা এক ধরনের খেলা। মেয়েটা একা একা এই অদ্ভুত খেলা খেলে। তাঁর কষ্ট হয়। কিন্তু করার কী আছে?

এই মেয়েটির মধ্যে বড়ো কোনো পরিবর্তন এসেছে। রাতে এখন আর মোটই বিরক্ত করে না। একা একা ঘুমুতে চায়। মাকে বলে বাবার ঘরে গিয়ে ঘুমুতে। বলার সঙ্গে মাথাটা এমন ভাবে নিচু করে ফেলে যাতে মনে হয় বাবা-মার একসঙ্গে ঘুমানোর রহস্যের অজানা অংশটি এখন সে জানে।দীপা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে রওনা হলেন। দারোয়ান এসে খবর দিল–নিশানাথ বাবুর অবস্থা বেশি ভালো নয়, একটু পরপর বমি করছেন।ডাক্তারকে খবর দেয়া হয়েছে না?

জ্বি।খোঁজ নাও এখনো আসছে না কেন।দারোয়ান মুখ নিচু করে বলল, মাস্টার সাব বাঁচতো না, আম্মা।দীপা বলেন, কীভাবে বুঝলে মারা যাচ্ছেন? বোঝা যায় আম্মা, শইলে পানি আসছে। পিঠে চাকা ঢাকা কী যেন হইছে। মাথারও ঠিক নাই, আম্মা।মাথার ঠিক থাকবে না কেন?

বিড়বিড় কইরা সারা দিন কী যেন কয়। নিজের মনে হাসে।দীপার বেশ মন খারাপ হল। তিনি হাতের কাজ ফেলে নিশানাথ বাবুকে দেখতে গেলেন। দূর থেকে দেখলেন নিশানাথ বাবু ঘরের বারান্দায় ইজিচেয়ারে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। তার পাশে আলো। দূর থেকে মনে হচ্ছে তিনি আলোর সঙ্গে কথা বলছেন। এই দৃশ্যটিও অদ্ভুত। আলো অধিকাংশ সময় নিশানাথ বাবুর আশেপাশে থাকে। কেন থাকে কে জানে?

দীপা বারান্দায় পা দেবার সঙ্গে সঙ্গেই চলে গেল। দীপা বললেন, চাচা, কেমন আছেন।নিশানাথ বললেন, বেশি ভালো না, মা। তুমি একটু বস আমার সামনে। তোমার সঙ্গে আমার খুব জরুরি কথা আছে।দীপা বসলেন। কোমল গলায় বললেন, বলুন কী কথা।

শুনতে তোমার কেমন লাগবে জানি না। আমার এখন কিছু অদ্ভুত ক্ষমতা হয়েছে। আমি মানুষের মনের কথা বুঝতে পারি। ইচ্ছা করলেই মানুষের মাথার ভেতরও ঢুকে যেতে পারি।দীপা মনে মনে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন দারোয়ান মিথ্যা কথা বলে নি–মাথা খারাপেরই লক্ষণ।দীপা! জি।শুধু যে মানুষের কথা বুঝতে পারি তাই না–পশুপাখি, জীবজন্তু সবার মনেই কী হচ্ছে বুঝতে পারি।ও আচ্ছা।

নিম্নশ্রেণীর জীবজন্তু মানুষদের মতো গুছিয়ে কিছু ভাবে না। ওদের চিন্তাভাবনার সবটাই খাদ্য নিয়ে। অবশ্যি এদের মধ্যে অদ্ভুত কিছু ব্যাপারও আছে। এরা কী মনে করে জান। প্রত্যেকেই ভাবে তারাই জীবজগতের প্রধান। পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে তাদের জন্যে, তাদের সুখ সুবিধার জন্যে।দীপা মৃদু গলায় বললেন, আমরা মানুষরাও তো তাই মনে করি। করি না? হ্যাঁ করি। কারণ মানুষও তো জন্তুই। জন্তু ছাড়া সে আর কী? হ্যাঁ, তাও ঠিক।

নিম্নশ্রেণীর পশুপাখিরা মানুষদের কী ভাবে, জান? তারা মানুষদের খুবই বোকা এক শ্রেণীর প্রাণী বলে মনে করে। ওরা আমাদের বোকামি নিয়ে সব সময় হাসাহাসি করে।তাই নাকি? হ্যাঁ তাই। ঘরের কোণায় জাল বানিয়ে যে মাকড়সা বসে থাকে সেও মানুষের চরম মুখতা দেখে খিকখিক করে হাসে।দীপা কিছু বললেন না। খুব সাবধানে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। নিশানাথ বললেন, তুমি বোধ হয় আমার কথা বিশ্বাস করলে না?

দীপা হা-না কিছু বললেন না। দুঃখিত চোখে তাকিয়ে রইলেন।নিশানাথ বললেন, তোমার মনের ভেতর কী হচ্ছে আমি বলে দিই? তাহলে তুমি হয়তো আমার কথা বিশ্বাস করবে।দীপা বলল, বলুন।মাথার ভেতর ঢুকতে ইচ্ছা করে না। কেন করে না জান? করে না, কারণ এটা অন্যায়। এটা ঠিক নয়। কিছু না জানিয়ে হুট করে একটা মানুষের ঘরে ঢুকে পড়ার মতো। তাই না, মা?

দীপা পুরোপুরি নিশ্চিত হল মানুষটির মস্তিষ্কবিকৃতির কিছু বাকি নেই। বেচারার সমস্ত শরীর কী কুৎসিত ভাবেই না ফুলে উঠেছে। দেরি না করে তাকে কোনো বড়ো হাসপাতালে কিংবা ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া উচিত।দীপা! জ্বি।আমার এই ক্ষমতা মানুষে কাজে লাগানো যায়। কীভাবে যায়, জান? কী ভাবে?

মানুষের ভেতর মন্দ যে সব ব্যাপার আছে সেগুলি দূর করার জন্যে আমি কাজ করতে পারি।মানুষ তো একজন দু জন নয়–লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ।তাও ঠিক। তবে সব মন্দ মানুষকে ভালো বানানোর দরকার তো নেই। এমন সব মানুষদের ভালো করতে হবে যাদের উপর হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য নির্ভর করে। যেমন ধর রাষ্ট্রপ্রধান, দেশের বড় বড় নেতা।আপনি ঘুমান, চাচা। আমার মনে হয় আপনার ঘুম দরকার।

নিশানাথ বাবু দীপাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বলে চললেন–যত দিন যাচ্ছে ততই অদ্ভুত সব জিনিস আমি জানতে পারছি। আমাদের এই মস্তিষ্ক অদ্ভুত একটা জিনিস। সব রকম স্মৃতি এর মধ্যে আছে। মানুষ যখন হ্যামিবা ছিল সেই স্মৃতিও আছে। আদি প্ৰাণ দীর্ঘকাল কাটাল পানিতে, সেই পানির জগতের স্মৃতিও আছে মানুষের মাথায়। এক সময় এ্যামিবার বিকাশ হল সরীসৃপ হিসেবে। হিংস্র সরীসৃপ, মানুষের আদি পিতা। সেই সরীসৃপের স্মৃতিও সঞ্চিত রইল, মস্তিষ্ক কিছুই হারায় না–।

চাচা, আপনি ঘুমুবার চেষ্টা করুন।আমি তো বেশি দিন বাঁচব না। যা আমি জেনেছি সব তোমাকে বলে যেতে চাই। বুঝলে দীপা, আমাদের মাথায় আছে লক্ষ লক্ষ বছরের স্মৃতি। আমাদের মস্তিষ্কের একটা অংশ সরীসৃপের মতো চিন্তা করে, একটা অংশ জলজ জীবের মতো চিন্তা করে, একটা অংশ– চাচা, আপনি ঘুমুতে চেষ্টা করেন–প্লিজ চাচা– আচ্ছা মা, আচ্ছা। তুমি যা বলবে তাই হবে। তুমি যা বলবে তাই হবে। তুমি যা বলবে তাই হবে। তুমি যা–

নিশানাথ বাবু থামলেন। তীব্র ভয় তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। নিশ্চয় তাঁর মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তিনি যা বলছেন সবই ভুল। সবই ভুল। উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা। কিন্তু কল্পনা বলে তো মনে হয় না।না না না–কল্পনা নয়–সত্যি। যা ঘটছে সবই সত্যি। একটু পরপর মাথায় বিচিত্র সব ছবি আসছে। অদ্ভুত সব ছবি। তিনি বুঝতে পারছেন।

ছবিগুলি কল্পনা নয়, স্বপ্ন নয়, বিভ্রম নয়-সবই স্মৃতি। অতি প্রাচীন স্মৃতি। হাজার বছর, লক্ষ বছর কিংবা আরো আগের কোনো স্মৃতি। কোনো কিছুই হারায় না–জীবজগৎ তার মস্তিষ্কে সমস্ত স্মৃতি ধরে রাখে।কখন প্রাণের বিকাশ হয়েছিল। তিনি জানেন না। তাঁর পড়াশোনা সীমিত, জ্ঞান সীমিত, বুদ্ধি সীমিত, কিন্তু এখন তিনি অনেক কিছু বুঝতে পারছেন। কেউ যেন তাঁকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। এক সময় এই জগৎ ছিল প্রাণহীন।

প্রাণহীন জগতে প্রাণের আবির্ভাব হল। একটি যৌগিক অণু–প্রোটিন। সামান্য ক্ষুদ্র একটি এমিনো এসিড, অথচ কী বিপুল তার সম্ভাবনা একটি স্মৃতিধর অণু। কী রহস্য, কী অপার রহস্য!নিশানাথ বাবু ছটফট করতে লাগলেন। সহ্য হচ্ছে না, তার আর সহ্য হচ্ছে না। তিনি ঘুমুতে চান। ঘুম–শান্তির ঘুম। যেন কত কাল তার ঘুম হয় নি। কত অনন্ত কাল ধরে তিনি জেগে আছেন। তিনি ব্যাকুল স্বরে বললেন, দীপা মা, আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দাও।

ডাক্তার এসে পড়েছেন।দীপা ভয়-পাওয়া গলায় বললেন, দেখুন তো ডাক্তার সাহেব, অনেকক্ষণ ধরে ছটফট করছেন।ডাক্তার রুগীর কপালে হাত রেখে চমকে উঠলেন–জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। শরীরের এই অস্বাভাবিক উত্তাপ দ্রুত কমানো প্রয়োজন। বরফজলে গা ড়ুবিয়ে রাখতে হবে—এ ছাড়া অন্য কিছু তিনি এই মুহূর্তে ভাবতে পারছেন না।নিশানাথ চোখ মেললেন, ঘোলাটে চোখ। মনে হচ্ছে চারপাশের জগৎ তিনি চিনতে পারছেন না। ডাক্তার সাহেব বললেন, কেমন লাগছে?

নিশানাথ ফিসফিস করে বললেন, ভালো লাগছে না।, খুব খারাপ লাগছে, মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে।খুব বেশি যন্ত্রণা? হ্যাঁ, খুব বেশি। মাঝে মাঝে আবার চোখে দেখতে পাই না। সব ঝাপসা লাগে।ডাক্তার সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, চোখে দেখতে পান না? জ্বি না। সব সময় না। মাঝে মাঝে এরকম হয়।এখন কি দেখতে পাচ্ছেন?

হ্যাঁ, পাচ্ছি। ডাক্তার সাহেব, খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। দয়া করে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিন।ডাক্তার সাহেব একটা পেথিড্রিন ইনজেকশন দিলেন। প্রচুর বরফের ব্যবস্থা করতে বললেন। রুগীকেবরফ-পানিতে ড়ুবিয়ে রাখতে হবে। এমন হাই ফিভার তিনি তাঁর ডাক্তার জীবনে কখনো দেখেন নি। অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

বরফ চলে এল। ডাক্তার সাহেবকে সেই বরফ ব্যবহার করতে হল না। তার আগেই রুগীর জ্বর কমে গেল। এটাও একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার।ডাক্তার সাহেব বললেন, রুগীকে এখানে রাখা ঠিক হবে না। হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিন।দীপা বললেন, এঁর কী হয়েছে? আমি ধরতে পারছি না। হাসপাতালে বড় বড় ডাক্তার আছেন। তাঁরা হয়তো বুঝতে পারবেন।

 

Read more

কুহক পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *