আজকের দিনটাই মাটি হয়েছে। তিনদিনের ক্যাজুয়েল লিভের আজ হচ্ছে প্রথম দিন। কথা ছিল মুনা অফিসে এসে কোনো একটা অজুহাত দেখিয়ে সাড়ে এগারটার দিকে বেরুবে। তারপর দুজনে মিলে বাড়ি দেখতে যাবে কল্যাণপুরে। সেখানে নাকি নশ টাকায় চমৎকার একটা দুরুমের ফ্ল্যাট আছে। কথা দেয়া আছে একটার সময় বাড়িওয়ালা চাবি নিয়ে থাকবেন। হাতে এখনো সময় আছে।
নিউ পল্টন থেকে মুনাকে উঠিয়ে নেয়া যায়। কিন্তুু মুনার কঠিন নিষেধ যেন কোনোদিন তার মামার বাড়িতে মামুন না যায়। নিষেধ সব সময় মানতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তুু সে রেগে যাবে। একবার রেগে গেলে তার রাগ ভাঙানো মুশকিল। দিনের পর দিন কথা না বলে থাকবে। দশটা কথা জিজ্ঞেস করলে একটা কথার জবাব দেবে। তাও এক অক্ষরের জবাব। হ্যাঁ কিংবা না।
মামুন গুলিস্তান থেকে মীরপুরের বাসে উঠল। জর্দা দিয়ে পান খাবার জন্যেই তার মাথাটা হালকা লাগছে। বমি বমি ভােব কাটেনি। কিন্তু সেই সঙ্গে বেশ ক্ষিধেও লেগেছে। দু’টি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ব্যাপার এক সঙ্গে কিভাবে ঘটছে কে জানে। মামুন একটা সিনেমার কাগজ কিনে ফেলল। প্রথম পাতা জুড়ে তিন রঙা বিশালবীক্ষা মেয়ের ছবি। ভালই লাগে দেখতে।
বলা হয়েছিল মেইন রোডের পাশেই দোতলা বাড়ি। আসলে তা নয়, বেশ খানিকটা ভেতরে যেতে হল। বাড়ি দেখে যে কোনো আশাবাদী মানুষেরই আশাভঙ্গ হবে, মামুনেরও হল। অর্ধসমাপ্ত একটি বাড়ি। সামনে চুনসুড়কির পাহাড়। দোতলায় ওঠার সিঁড়ি এমন যে দু’জন মানুষও পাশাপাশি উঠতে পারে না। বাড়িওয়ালা হাজী সাহেবকেও খুব সুবিধার লোক মনে হল না। যেন বাড়ি দেখানোর তার কোনো গরজ নেই। দুপুর একটায় আসতে হওয়ায় তার যে কত বড় ক্ষতি হল সেই কথা তিনি চার-পাঁচ বার বললেন। সিঁড়িতে উঠতে উঠতে বললেন, স্ত্রীকে নিয়ে আসবেন। বলেছিলেন, আনলেন না কেন?
একটা কাজে আটকা পড়ে গেছে। পরে আসবে।
বাববার তো বাড়ি দেখানো যাবে না। নিতে যদি চান আজই বলবেন। নিতে না চাইলেও আজ বলবেন।
দোতলার বারান্দায় উঠেই মামুন বলল, বাড়ি পছন্দ হয়েছে, আমি নেব।
না দেখেই পছন্দ, ভাল করে দেখেন।
মামুন হৃষ্টচিত্তে ঘুরে ঘুরে বাড়ি দেখল। চমৎকার বাড়ি। দু’টি বিশাল ঘর। দু’টি ঘরের সঙ্গেই অ্যাটাচিড বাথরুম। রান্নাঘরের পাশে ছোট্ট একটা স্টোর রুম। চমৎকার একটা বারান্দা। উথাল পাথাল হাওয়া খেলছে। হাজী সাহেব বললেন, আপনি আসবেন কবে?
সামনের মাসেব দশ-পনের তারিখেই আসব। কিছু অ্যাডভান্স দিয়ে যাই আপনাকে?
অ্যাডভান্স দেয়ার দরকার নেই। আর আপনি যদি সামনের মাসের আগেই উঠতে চান বা জিনিসপত্র ব্যাখতে চান রাখবেন। তার জন্যে কোনো বাড়তি ভাড়া দিতে হবে না।
আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।
ধন্যবাদের দরকার নেই। বাড়িটার যত্ন করবেন, সাত তারিখের মধ্যে ভাড়া দিবেন ব্যস। দেশ কোথায় আপনার?
ময়মনসিংহ।
ময়মনসিংহের লোক খুব পাজি হয়। আমার বাড়িও ময়মনসিংহ। তবে আপনি প্রফেসর মানুষ। এটাই ভরসার কথা।
মেসে ফিরতে ফিরতে চারটা বেজে গেল। ঘরে ঢুকে দেখে মুনা তার চৌকির ওপর একা একা বসে আছে। তার গলায় নীল রঙের একটা মাফলার। নাক দিয়ে ক্রমাগত পানি করেছে। দেখেই বোঝা যায় গায়ে জ্বর। মুনা ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, সেই কখন থেকে বসে আছি, কোথায় ছিলে? মামুন আজ সারাদিন ভেবেছে মুনার সঙ্গে দেখা হলেই খুব কথা শোনাবে। খুব রাগ করবে। কিন্তুু রাগ করা গেল না। মুনার ওপর রাগ করা মুশকিল। মামুন গম্ভীর গলায় বলল, একটার সময় আমাদের এক জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল না?
যাব কিভাবে? অফিসেই গিয়েছি দেড়টার সময। আমার জ্বর, গলা ব্যথা। টনসিল!
আবার টনসিল, বল কী?
বৃষ্টিতে ভিজলাম। আমি ভিজলাম, বকুল ভিজলো, বাবু ভিজলো। ওদের কারো কিছু হয়নি। আমার অবস্থাই কাহিল।
মুনা অসহায়ের মত মুখ করল। মামুন এগিয়ে এসে হাত রাখল তার গলায়। মতলব ভাল নয়। মুনা বলল, কী অসভ্যতা করছ, হাত সরাও।
না সরাব না।
মামুনের ঘরের দরজা হাট করে খোলা। কখন কে এসে পড়বে। বারান্দায় লোকজন চলাচল করছে। মামুন তার হাত সরিয়ে নিল না। তার হাসি হাসি মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে রকম কোনো ইচ্ছাও তার নেই। মামুন নরম স্বরে বলল, কাল তোমার কী প্ল্যান?
কোনো প্ল্যান নেই, কেন?
চল কাল তোমাকে কল্যাণপুরের বাড়িটা দেখিয়ে নিয়ে আসি।
মুনা হ্যাঁ-না কিছু বলল না। মামুন বলল–দু’একটা ফার্নিচারও কিনব। তুমি সঙ্গে থাকলে ভাল হয়।
কী ফার্নিচার?
বড় দেখে একটা খাট!
এমন অসভ্যের মত কথা বলো কেন?
মামুন শব্দ করে হাসল। চোখ ছোট করে বলল, খাট কেনার মধ্যে অসভ্যতার কী দেখলে তুমি?
ভদ্র হয়ে বাসো।
ঠিক আছে বসছি ভদ্র হয়ে। কাল কখন আসবে বল।
কাল আসতে পারব না, অনেক কাজ আছে। ঘরে কাজের লোক নেই মামির অসুখ।
কোনো কথা শুনব না। কাল আসতেই হবে। প্লিজ মুনা। দুপুরে কোনো রেস্টটুরেন্টে বসে খাব। ফাইন হবে।
রেস্টুরেন্টে বসে খাবার মধ্যে ফাইনের কী আছে?
আছে, তুমি বুঝবে না। মুনা, আসবে তো?
দেখি।
দেখাদেখি না। আসতেই হবে। সকাল নটার মধ্যে চলে আসবে, পজিটিভলি।
মুনা হ্যাঁ-না কিছু বলল না। এখান থেকে সে যাবে মামির ভাইয়ের বাড়ি। আংটি দিয়ে আসবে। মামুন বলল … কী আশ্চর্য, এখনি উঠছ কেন?
কাজ আছে আমার।
এত কাজের মেয়ে হয়ে উঠলে কবে থেকে?
মুনা কিছু বলবার আগেই মামুন চট করে তার ঠোঁটে চুমু খেল। মুনা সরে গেল মুহূর্তেই। বিরক্ত স্বরে বলল, কেন সব সময় বিরক্ত কর? দরজা খোলা। লোকজন যাওয়া-আসা করছে।
মামুন হাসিমুখে বলল, ঠিক আছে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছি।
থাক। দরজা বন্ধ করতে হবে না।
তুমি আসছো তো?
দেখি।
কাল নটায়। পজিটিভলি।
মামির ভাই বাসায় ছিলেন না। তার স্ত্রী ছিলেন। ভদ্রমহিলা মুনাকে দেখেই তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন কাল তোমরা কেউ আসলে না যে, ব্যাপারটা কী?
মামির শরীরটা ভাল না।
তোমাদের শরীর তো ঠিক ছিল, না তোমাদের সবার একসঙ্গে শরীর খারাপ হল?
মুনা কিছু বলল না।
শদেড়েক লোক খেয়েছে। অথচ নিজের আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই। বাস তুমি। চা-টা কিছু খাবে?
জি না।
এক বাটি গোস্ত তুলে রেখেছিলাম তোমাদের জন্যে, যাওয়ার সময় নিয়ে যেয়ো।
মুনা ক্ষীণ স্বরে বলল, গোসতের বাটি নিয়ে যাব কিভাবে?
বাটি নিয়ে যাবে কেন? টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে দেব।
মুনাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকতে হল। এ বাড়িতে অনেক লোকজন থাকে। এদের কাউকেই সে ভাল করে চেনে না। সে যে অনেকক্ষণ ধরে একা একা বাস আছে। এটা কেউ তেমন লক্ষ্যই করছে না। পাশের কামরায় বেশ কিছু ছেলেমেয়ে ভি সি আর দেখছে। একটি মেয়ে এসে এক ফাঁকে বলে গেল–অমিতাভের ছবি হচ্ছে, দেখবেন? বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে ছুটে চলে গেছে।
মুনা টিফিন বক্সের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। কাজের ছেলেটি তার সামনে একটা পেপসির বোতল রেখে গেছে। বাড়ির কত্রী টেলিফোন ধরতে গিয়ে আর ফিরছেন না। মুনা ঘড়ি দেখল, সাড়ে ছটা বাজে। আজও বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।
মুখ তেতো, মাথায় ভোঁতা একটা যন্ত্রণা। সকালে নাশতা খেতে গিয়ে টের পেল গলাব্যথা আরো বেড়েছে। গলা দিয়ে কিছুই নামছে না। মুনা ক্লান্ত স্বরে বলল–বকুল, একটু গরম পানি করে দে, গোসল করব। বকুল সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
নাশতা শেষ করে যা। বলা মাত্রই দৌড়াতে হবে নাকি?
আমার নাশতা খাওয়া হয়ে গেছে।
বকুল রান্নাঘরে ঢুকে গেল। মুনা বলল, মামা কোথায় রে বাবু?
সকালবেলা কোথায় যেন গেছেন।
নাস্তা খেয়ে গেছেন?
না। বকুল বলেছিল চা খেয়ে যেতে।
মুনা বিরক্ত হয়ে বলল, বকুল বকুল করছিস কেন? কতবার বলেছি আপা বলতে।
আপাই তো বলি।
আবার মিথ্যা কথা? চড় খাবি।
গার্গল করেও লাভ হল না। পানি বেশি গরম ছিল, মাঝখান থেকে জিব পুড়ে গেল; বকুল বলল, তোমার চোখ লাল হয়ে আছে। শুয়ে থাক গিয়ে। মুনা কিছু বলল না। বকুল ইতস্তত করে বলল, ফজলু ভাইদের বাসায় একটু যার আপা? মুনা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, কেন?
যেতে বলেছিল আমাকে। খুব নাকি দরকার।
কী দরকার?
জানি নাকি, শুধু বলেছেন খুব জরুরি। বোধ হয় ভাবীর সঙ্গে আবার ঝগড়া-টগড়া হয়েছে।
সেটা ওদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার, তুই কেন যাবি?
বকুল আর কিছু বলল না। ফজলুর রহমান সাহেব গলির ওপাশেই থাকেন। মাস ছয়েক হল এসেছেন। খুব সামাজিক ধরনের মানুষ। এসেই আশপাশের সব বাড়িতে গেছেন। বিয়ের সময় নিজে এসে দাওয়াত করে গেছেন। মুনার নিজের ধারণা লোকটি গায়ে-পড়া ধরনের। প্রথম আলাপেই খালা, খালু, আপামণি ডাকাডাকি তার ভাল লাগেনি। বকুলের সঙ্গে ভদ্রলোকের স্ত্রীর খুব খাতির। এটাও মুনার ভাল লাগেনি। অবিবাহিতা মেয়ের সঙ্গে একজন বিবাহিত মহিলার এত ভাব থাকা ঠিক না। বকুল আবার বলল, আপা যাব?
মুনা জবাব দিল না। ব্যাপারটা সে এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু বকুলের চোখে-মুখে আগ্রহ ঝলমল করছে। মুনা বলল, কী নিয়ে তোদের এত গল্প?
বকুল মাথা নিচু করে হাসতে লাগল। তার গালে লাল আভা। নিশ্চয়ই নিষিদ্ধ গল্পগুজব হয়। নতুন বিয়ে হওয়া মেয়েরা সুযোগ পেলেই অন্য মেয়েদের সঙ্গে রাতের অন্তরঙ্গতার গল্প করতে চায়। মুনা এ ধরনের অনেক গল্প শুনেছে। শুনতে ভালই লেগেছে। বকুলেরও নিশ্চয়ই লাগে।
আপা যাব?
না, রান্নাবান্না করতে হবে না? আজ আমি বাইরে যাব; ফিরতে সন্ধ্যা হবে।
জ্বর নিয়ে কোথায় যাবে?
মুনা জবাব দিল না। বকুল বলল–বেশিক্ষণ থাকব না আপা। যাব আর আসব। যাই?
ঠিক আছে যা।
লতিফা বিছানা ছেড়ে উঠলেন দশটার দিকে। আজ তাঁর শরীর বেশ ভাল; দশ-বারো দিনের মধ্যে আজ এই প্রথম ঘর ছেড়ে বের হলেন। বাবু ছুটে গিয়ে মাকে বসার জন্যে একটা মোড়া এগিয়ে দিল। তিনি অবশ্য বসলেন না। দেয়াল ধরে ধরে বসার ঘরে চলে এলেন। বাবু বলল, বেশি হাঁটাহঁটি করবে না মা। লতিফা বললেন, তোর বাবা কোথায়?
জানি না।
বকুল, বকুল কোথায় গেল?
ফজলু ভাইদের বাসায় গেছে। ডেকে নিয়ে আসব?
না ডাকতে হবে না।
তিনি একটি বেতের চেয়ারে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লেন।
মুনাকে বল তো আমাকে এক কাপ আদা চা দিতে।
মুনা আপার জ্বর, শুয়ে আছে। আমি বানিয়ে দেই?
না থাক। হাতটাত পুড়বি। না হাত পুড়ব না।বাবু খুব উৎসাহ নিয়ে চা বানাতে গেল। লতিফা এলেন তার পেছনে পেছনে। বিরক্ত স্বরে বললেন, ইস কী অবস্থা রান্নাঘরের।তোমাকে একটা চেয়ার এনে দেব মা? বসবে?
না চেয়ার লাগবে না।লতিফা নোংরা মেঝেতেই পা ছড়িয়ে বসলেন। বাবু বলল, মা দেখ তো লিকার কড়া হয়ে গেছে? না ঠিকই আছে। মুনার জ্বর কী খুব বেশি? হুঁ। ঐ দিন বৃষ্টিতে সবাই ভিজলাম তো। কারো কিছু হল না, মুনা আপার টনসিল ফুলে গেল।চায়ে চুমুক দিয়েই লতিফার বমি বমি ভাব হল। শরীরটা গেছে। তিনি সাবধানে উঠে দাঁড়ালেন। তার পা কাঁপছে।চা খাবে না?
উঁহু তুই খেয়ে ফেল। শরীরটা খারাপ লাগছে। শুয়ে থাকব। মুনাকে বল তো একটু আসতে।তিনি নিজের ঘরে ফিরে গেলেন। তার মনে হল আর কোনোদিন এ ঘর থেকে বেরুতে পারবেন না। বাকি জীবনটা এ ঘরেই কাটাতে হবে। আজকাল প্রায়ই তার এ রকম মনে হয়। মুনা এসে দেখল। লতিফা কাঁদছেন। সে না দেখার ভান করে সহজ ভাবেই বলল ডেকেছিলে মামি?
তুই একটু বোস আমার পাশে।মুনা বসল। লতিফা কী বলবেন মনে করতে পারলেন না। কি একটা যেন বলতে চেয়েছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরে এ রকম হচ্ছে। কিছুই মনে থাকছে না।কি জন্যে ডেকেছিলে মামি?
এমনি এমনি ডাকলাম! শরীরটা বড় খারাপ।তোমার নিজের জন্যেই তোমার শরীর ঠিক হচ্ছে না মামি। দুপুর একটার আগে কিছু মুখে দাও না। রুগীদের আরো বেশি করে খেতে হয়।
ইচ্ছা করে না, বমি আসে।আসলে আসুক।লতিফা ক্লান্ত স্বরে বললেন, বকুলের একটা বিয়ের ব্যবস্থা কর। তোর মামাকে বল। মুনা অবাক হয়ে বলল, কেন? ওর কী বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি? কী যে তুমি বল।বয়স খুব কমও তো না। নভেম্বর মাসে পনেরো হবে।পনেরো বছর বয়সে কোনো মেয়ের বিয়ে হয় নাকি? বিয়ে দিলেই বিয়ে হয়। আমার বিয়ে হয়েছিল চৌদ্দ বছর বয়সে।তুমি বলছো তেত্ৰিশ বছর আগের কথা।
লতিফা ক্ষীণ স্বরে বললেন, আমার শরীর ভাল না। তুইও চলে যাচ্ছিস। আমার সাহস হয় না। তোর মামাকে বল ঐ ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে। তুই বললে শুনবে।কোন ছেলেটার সঙ্গে? বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল যে। গ্রিন রোডে ফার্মেসি আছে ছেলেটার। মামা মিডফোর্ডের ডাক্তার।বাঁটু বাবাজীর কথা বলছো? তিন ফুট বামুন?
লতিফা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। মুনা বলল, বকুলের বিয়ে প্রসঙ্গে আমি কারো সঙ্গে কোনো কথাটথা বলতে পারব না। ওর মতো সুন্দরী মেয়ে খুব কম আছে। ওর বিয়ে নিয়ে কোনো ঝামেলা হবে না। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।লতিফা মৃদু স্বরে বললেন, আমি বেশি দিন বাঁচব না।মুনা বিরক্ত হয়ে বলল, না বাঁচলে, তাই বলে বাচ্চা মেয়েকে ধরে বিয়ে দিতে হবে? এই সব কী? তুই চলে গেলে ঝামেলা হবে।কী কামেলা হবে?
ছেলেরা চিঠিফিটি লেখে। চিঠি তো লিখবেই। সুন্দরী মেয়েদের এইসব সহ্য করতে হয়। এসব কিছু না।মুনা উঠে চলে এল। বকুল গিয়েছে দেড় ঘণ্টা আগে, এখনো ফেরার নাম নেই। কখন রান্না হবে কে জানে। মামা বাজার নিয়ে ফিরবেন। কিনা তাও বোঝা যাচ্ছে না। মুনা একবার ভাবল ভাতটা চড়িয়ে দেয়। কিন্তু আগুনের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে জ্বর চেপে আসছে।বাবু গম্ভীর হয়ে বসার ঘরে বসে আছে। মুনাকে ঢুকতে দেখে সে কী মনে করে হাসল। মুনা বলল, ছুটির দিনে ঘরে বসে আছিস কেন? বাইরে খেলাধুলা করগে।বাবু আবার মুখ টিপে হাসল।হাসছিস কেন?
এমনি। আমার জ্বর কী-না দেখ তো।হুঁ তোমার জ্বর।গায়ে হাত না দিয়েই টের পেয়ে গেলি? বাবু লজ্জিত মুখে কাছে এগিয়ে এল। তার হাত বেশ ঠাণ্ডা; তার মানে বেশ জ্বর গায়ে। বাসায় কোনো থার্মোমিটার নেই। জ্বর কত বোঝার উপায় নেই।মুনা আপা তুমি শুয়ে থাক, আমি মাথার চুল টেনে দেবো।চুল টানতে হবে না, তুই বকুলকে ডেকে নিয়ে আয়। এক্ষুণি যা। এতক্ষণ কেউ অন্যের বাড়িতে থাকে?
বাবু সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। মুনা আপার কাজ করতে তার এত ভাল লাগে। সারাক্ষণই ইচ্ছা! করে কিছু একটা করে মুনা আপনাকে খুশি করতে।বকুলই রান্না করলো ভাত ডাল এবং ইলিশ মাছের ঝোল। শওকত সাহেব ভর দুপুরে বাজার নিয়ে এসেছেন। রান্না করতে তাই দুটো বেজে গেল। শওকত সাহেব দুবার এসে খোঁজখবর নিলেন তরকারি নেমেছে কিনা। বকুল তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে সব কিছুই কেমন এলোমেলো করে ফেলতে লাগল।
খেতে বসে শওকত সাহেব কঠিন কঠিন কিছু কথা বললেন। এত বড় মেয়ে সামান্য একটা তরকারি রাধতে পারে না কেন এই নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। গলা টেনে টেনে বললেন, লবণ কী সস্তা হয়েছে? আধাসের লবণ দিয়ে দিয়েছিস তরকারিতে। সবটা তুই একা খেয়ে শেষ করবি।
বকুলের লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করল। শওকত সাহেব প্লেট ঠেলে দিয়ে হাত ধুতে গেলেন। বকুল বাবুকে ফিসফিস করে বলল, লবণ খুব বেশি হয়ে গেছে? শুধু মাছটা খা। ডালের সঙ্গে মিশিয়ে খা।তুমি খাবে না? না। বকুল সত্যি সত্যি কিছু মুখে দিল না। নিজের জন্যে তার খুব কষ্টও হল না। এটা তার অভ্যেস আছে। প্রায়ই সে রাগ করে না খেয়ে থাকে।
মুনা দু’টা প্যারাসিটামল খেয়েছে। মাথা ধরা তবু কমেনি। আরো যেন বেড়েই যাচ্ছে। আজ কোথাও বেরুনোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। মামুন অপেক্ষা করে করে মহা বিরক্ত হবে। মুনা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। মামুনের সঙ্গে যে কবার কোথাও যাবার প্রোগ্রাম করা হয়েছে সে কবারই এ রকম ঝামেলা।
মুনা আপা। কী।কিছু খাবে না? না। মামিকে খেতে দিয়েছিস? মা ভাত খাবে না। রুটি বানিয়ে দিতে বলছে। বানিয়ে দে। আটাটা গরম পানিতে সেদ্ধ করে নিবি। নয় তো রুটি নরম হবে না।ঘরে আটা নেই।বাবুকে দোকানে যেতে বল। বাবু যেন কোথায় গেছে। আমি গিয়ে নিয়ে আসব? না, তুই কি যাবি। মামাকে গিয়ে বল। আমি বলতে পারব না। তুমি বল।ঠিক আছে, আমিই বলব।
শওকত সাহেব কোনো রকম বিরক্তি প্রকাশ না করেই আটা আনতে গেলেন। বকুল বলল আপা, টিনা ভাবীর বাচ্চা হবে। মুনা বলল, এখনই বাচ্চা হবে কি, সেদিনই না বিয়ে হল।সেদিন না। ছয় মাস এগার দিন হয়েছে।
তোর দেখি একেবারে দিন-তারিখ মুখস্থ। এত খাতির কেন তোর সাথে? খাতির কোথায় দেখলে? আর খাতির হওয়াটা ও কি খারাপ? বেশি হওয়াটা খারাপ। বেশি কোনোটাই ভাল না।কেন? মুনা প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না। সে লক্ষ্য করল বকুল আজকাল বেশ কঠিন ভঙ্গিতে কথা বলছে। এটা ভাল লক্ষণ। মেয়েদের এত পুতুপুতু থাকলে চলে না।
বকুল বলল মুনা আপা, ওরা শুক্রবারে কাবলিওয়ালা দেখতে যাবে। ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসিব অডিটোরিয়ামে। আমাকেও সাথে যেতে বলছে। আমার জন্যেও টিকিট এনেছে।ওরা স্বামী-স্ত্রী দেখতে যাবে, তাদের মধ্যে তুই যাবি কেন? আমি তো যেতে চাই না। ওরা জোর করছে। আপা যাব? শুক্রবার আগে আসুক তারপর দেখা যাবে।তুমি আগে থেকে বাবাকে বলে রাখবে, নয়ত শেষে রাজি হবে না। তুমি আজ আর কোথাও যাবে না? না।
বকুল মৃদু হেসে বলল, মামুন ভাই অপেক্ষা করে থাকবে। মুনা কিছু বলল না। বকুল তরল গলায় বলল, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তিনি তোমাকে দেখার জন্যে আজ এখানে চলে আসবেন।বকুল লক্ষ্য করল। মুনা এই প্রসঙ্গটি পছন্দ করছে না। সে কিছুটা বিব্রত বোধ করল। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, তোমার চোখ লাল টকটকে হয়ে আছে। শুয়ে থাক না।
