বকুল জবাব দিল না। মাথা নিচু করে বসে রইল। আজ সে একটা ছাপা শাড়ি পরেছে। এত সুন্দর লাগছে তাকে দেখতে। মুনা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। আরো কড়া কড়া কিছু কথা বলতে গিয়েও বলতে পারল না। প্রতিমার মত একটি কিশোরীকে কোনো কড়া কথা বলা যায় না। মুনা কোমল স্বরে বলল, কাঁদছিস কেন তুই? বকুল চোখ মুছে বলল, তোমরা সবাই আমার সঙ্গে এ রকম করবে। আর আমি কাঁদতে পারব না?
সেকেন্ড পিরিয়ডে রীতা আপার ক্লাস। ইংলিস সেকেন্ড পেপার। রীতা আপাকে ছাত্রীরা আড়ালে ডাকে রয়েল বেঙ্গল। ভয়ানক রাণী এবং তিনি বেছে বেছে এমন সব ছাত্রীদের পড়া জিজ্ঞেস করেন যারা সেদিন শিখে আসেনি। সবার ধারণা কপালের মাঝখানে তার একটা তিন নম্বর চোখ আছে, যেই চোখ দিয়ে তিনি দেখে ফেলেন কে পড়া করেছে কে করেনি।
বকুল বসে বসে ঘামছিল। রীতা আপা ক্লাসে ঢুকে প্রথম প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করবেন তাকে। প্রথম দাঁড়াতে বললেন। তারপর শীতল চোখে তাকবেন। ক্লাসের সমস্ত সাড়াশব্দ যখন থেমে যাবে তখন প্রশ্ন করবেন। প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করবেন আলাদা আলাদা ভাবে এবং এমন প্রশ্ন করবেন যার উত্তর ক্লাসের কেউই জানে না।
আজও তাই হল। রীতা আপা ক্লাসে ঢুকেই বললেন বকুল দাঁড়া। বকুল দাঁড়াল। আপা তাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, কমন রুমে চলে যা। রেহানা আপা তোকে ডাকছেন। বই-খাতা নিয়ে যা।
রেহানা আপা দারুণ ব্যস্ত। হাতে একগাদা কাগজপত্র কিন্তু মুখ হাসি হাসি। বকুল তার পাশে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, বকুল তুই বাড়ি চলে যা। আজ বিকেল পাঁচটার সময় তোকে দেখতে আসবে, মাকে বলবি। সাজগোজ বেশি দরকার নেই। ছেলের মা আর এক ফুফু আসবে। খবর না দিয়ে হঠাৎ গিয়ে দেখার কথা। সেজেগুজে থাকলে বুঝে ফেলবে। বুঝেছিস?
বকুল মাথা নাড়ল। সে বুঝেছে।
যা একটা রিকশা নিয়ে বাড়ি চলে যা। শাড়ি পাবে থাকবি! কামিজটামিজ না। আর শোন, দুপুরে কাঁচা হলুদ গায়ে দিয়ে গোসল করবি, রঙ খুলবে। আবশ্যি তোর রঙ খারাপ না। চাপা রঙ এটাই ভাল।
বকুল সরাসরি বাড়ি এল না। গেল টিনা ভাবীদের বাড়ি। অনেক দিন পর আসা। টিনা ভাবী ঘুমুচ্ছিল। সে ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলে দিল।
কেমন আছ ভাবী?
আর কেমন আছি। আমাদের খোজখবর কে করে? তোর ফজলু ভাই দারুণ রেগে আছে, তোকে মজা দেখাবে। কাবলিওয়ালা দেখতে এলি না কেন?
বাসা থেকে আসতে দেয়নি। মুনা আপা নট বলে দিয়েছিল।
এরকম দারোগা আপা জোগাড় করলি কোথেকে?
বকুল মৃদু হাসল।
তোর এই আপাকে আমার একেবারেই সহ্যই হয় না। কি রকম পুরুষ পুরুষ মেয়ে।
বকুল অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। মুনা আপার নামে কেউ কিছু বললে তার খারাপ লাগে। টিনা ভাবী বললেও লাগে। যদিও তার প্রায়ই মনে হয় টিনা ভাবীকেই সে সবচে বেশি ভালবাসে।
তোর বিয়ে হচ্ছে। এ রকম একটা গুজব শোনা যাচ্ছে, এটা কি সত্যি?
বলেছে কে তোমাকে?
যেই বলুক, সত্যি কি না বল?
না। সত্যি না।
টিনা ঘাড় কাত করে হাসতে লাগল।
বকুল বলল, হাসছ কেন?
এমনি।
এই কদিনের মধ্যে তোমার পেট অনেকখানি বড় হয়ে গেছে ভাবী।
তা হয়েছে। আমার মনে হয় যমজ। দু’জন আছে এখানে।
যমজ হলে ভালই হয়।
তোর হোক তখন বুঝবি–ভাল কি মন্দ। রাতে ঘুমুতে পারি না। সবচে অসুবিধা হয় তোর ভাইয়ের; বেচারা ক’দিন ধরে দারুণ মনোকষ্টে আছে।
কেন? তা বলা যাবে না।
টিনা রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসতে লাগল। বকুল লজ্জা পেয়ে গেল। টিনা বলল, তুই এমন টমেটোর মত লাল হয়ে গেলি কেন? বুঝতে পেরেছিস নাকি কি জন্যে মনোকষ্টে আছে?
না।
আবার মিথ্যা কথা। ঠিকই বুঝেছিস। আজ তুই সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকবি। তোর ফজলু ভাই আসুক, তারপর যাবি। সে অনেক’দিন তোকে না দেখে মন খারাপ করে আছে।
আজ থাকতে পারব না ভাবী, আমার কাজ আছে।
কি কাজ? এত কাজের লোক হলি কবে থেকে? বাস গল্প করব। বিছানায় পা উঠিয়ে বস না।
বকুল বসল। টিনা এসে বসল তার পাশে। একটা হাত রাখল বকুলের কোলে। মৃদু স্বরে বলল, তুই দিন দিন যা সুন্দর হচ্ছিস। আমারই লোভ, লাগে।
কি যে বল তুমি।
যে তোকে বিয়ে করবে। সে প্রথম তিন মাস এক ফোটাও ঘুমুতে দেবে না। সারা রাত জাগিয়ে রাখবে। যদি না রাখে আমার নাম বদলে ফেলব।
থাক তোমার নাম বদলানোর দরকার নেই।
টিনা মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগল। তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল আমার চেহারা-ছবি তো দেখছিস। এই আমাকেই তোর ভাই এক মাস রাতে ঘুমুতে দেয়নি। সারা রাত জেগে থাকি দিনের বেলায় ফাঁক পেলেই ঘুমাই। শ্বশুর বাড়িতে সবাই হাসাহাসি করে।
বকুল কিছু বলবে না ভেবেও বলে ফেলল, এখন আর তোমাকে জাগায় না?
না। আগের মত না।
বকুল তিনটা পর্যন্ত থাকল সেখানে। টিনা ভাবীর সঙ্গে কথা বলা একটা নেশার মত। কিছুতেই আসতে ইচ্ছা করে না। পুরুষদের নিয়ে এমন সব মজার মজার গল্প সে জানে শুধু শুনতে ইচ্ছা করে। আজ সে একটা গল্প বলেছে যে শুনলেই গা বিমঝিম করে।
টিনা ভাবীর এক খালার বিয়ে হয়েছে রাজশাহীতে। টিনা ভাবী তখন মাত্র মেট্ৰিক দিয়েছে। সেও গিয়েছে বিয়েতে। সমবয়সী মেয়েরা শাড়ি পরে ছুটোছুটি করছে। সেও করছে। রাত নটার সময় বর এল। সবাই ছুটে গেল গেট ধরতে। সে গেল ছাদে। সেখান থেকে সমস্ত ব্যাপারটা ভাল করে দেখা যাবে। তখন হঠাৎ ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। ছাদে পাঞ্জাবি পরা একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলল, খুকী ভয় লাগছে? তারপর…।
গল্প শেষ হবার পর বকুল ক্ষীণ স্বরে বলল, তুমি ফজলু ভাইকে বলেছ এই ঘটনা?
পাগল হয়েছিস? সবাইকে সব কথা বলা যায়! মেয়েদের অনেক কথা পুরোপুরি গিলে ফেলতে হয়।
ঐ লোকটির সঙ্গে আর দেখা হয়েছিল?
না। আর হলেই কি? তুই দেখি গল্প শুনে ঘামতে শুরু করেছিস। মেয়ে হয়ে জন্মানোর অনেক কষ্ট রে বকুল।
এ সময় বাড়িতে মা ছাড়া অন্য কারো থাকার কথা নয়। কিন্তু বকুল অবাক হয়ে দেখল বাবা খালি পায়ে বারান্দায় ক্যাম্পখাটে বসে আছেন। তারও কি অফিস ছুটি? নাকি তিনি খবর পেয়েছেন রেহানা আপা আসবেন ছেলের মাকে নিয়ে?
শওকত সাহেবের মুখ অত্যন্ত বিমর্ষ। খালি গায়ে থাকার জন্যেই হয়ত তাকে দেখাচ্ছে বুড়ো মানুষের মত। তিনি বকুলের দিকে না তাকিয়েই বলল আজি ক্লাস হয়নি? কি অবস্থা, তিন মাস পর মেট্রিক পরীক্ষা।
বকুল কিছু বলল না। মেট্রিক পরীক্ষার এখনো অনেক দেরি। সেদিন মাত্র ক্লাস টেইনে হাফ ইয়ার্লি হল কিন্তু বাবার মাথায় কি করে যেন তিন মাস ঢুকে গেছে।
স্কুলে পড়ায় না?
পড়ায়।
আর পড়া পড়াশোনা কি দেশে আছে? ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি দে।
বকুল পানি নিয়ে এল। শওকত সাহেব তৃষ্ণার্তের মত পানি পান করলেন। তৃষ্ণ মিটলো না।
আরেক গ্ৰাস পানি দে।
সরবত বানিয়ে দেব? ঘরে কাগজি লেবু আছে।
দে! তোর মার শরীর আজ কেমন?
ভাল।
ভাল? এর নাম ভাল। বিছানা থেকে নামতে পারে না। আর শরীর ভাল। খাওয়া-দাওয়া করেছে?
আমি তো জানি না। সকালে স্কুলে চলে গেলাম।
যা আগে খোঁজ নিয়ে আয়। মা-বাপের দিকে একটু লক্ষ্য রাখিস। এটা আবার বলে দিতে হয়। কেন?
লতিফা জেগেই ছিলেন। বকুলকে ঢুকতে দেখে মাথা উঁচু করে বললেন–তোর বাবা এসেছে নাকি? কথা শোনা যাচ্ছে।
দরজা খুলল কিভাবে?
দরজা খোলা ছিল বোধ হয়।
না। আমি নিজের হাতে বন্ধ করলাম। তুই জিজ্ঞেস করে আয় দরজা খুলল কিভাবে?
জিজ্ঞেস করার দরকার নেই আমি পারব না।
জিজ্ঞেস করতে অসুবিধা কি? তোকে তো খেয়ে ফেলবে না।
বকুল বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকাল। অসুস্থ হবার পর লতিফাব এমন হয়েছে। সামান্য ব্যাপারে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
বকুল, তোর বাবা রোজ এমন সকাল সকাল বাড়ি আসছে কেন?
রোজ আসছে নাকি?
কালও তো একটার সময় চলে এসেছে। এর আগের দিন এসেছে দুটার সময় ।
অফিসে কাজ-টাজ বোধ হয় বেশি নেই।
কাজ থাকবে না কেন? কি যে বলিস! যা তো জিজ্ঞেস করে আয় রোজ এত সকাল সকাল আসে কেন?
আমি জিজ্ঞেস করতে পারব না মা।
তাহলে ডেকে দে, আমি জিজ্ঞেস করছি।
ঠিক আছে দিচ্ছি। তুমি কিছু খেয়েছিলে মা?
দুধ-মুড়ি খেয়েছি। যা তোর বাবাকে আসতে বল।
শওকত সাহেব নিঃশব্দে সরবত খেলেন। গ্লাস শেষ করে বিবক্ত স্বরে বললেন, ছেকে দিতে পারলি না, লেবুর ছোবরায় গ্লাস ভর্তি। কোনো একটা কাজ ঠিকমত করতে পাবিস না?
বকুল চুপ করে রইল। শওকত সাহেব বললেন, তোর মা কিছু খেয়েছে?
হ্যাঁ। দুধ-মুড়ি।
রোজ দুধ-মুড়ি। মুড়ির মধ্যে আছেটা কি? এর চাইতে এক বাটি ডাল খেলে পুষ্টি বেশি হয়। যত বেকুবের মত কাজ।
বকুল ক্ষীণ স্বরে বলল, মা তোমাকে ডাকে।
এখন তার ভ্যাজোর ভ্যাজোর শুনতে পারব না। আমার পাঞ্জাবি এনে দে বাইরে যাব।
কখন ফিরবে?
শওকত সাহেব জবাব দিলেন না। ছেলে-মেয়েদেব সব কথার তিনি জবাব দেন না।
রেহানা আপা আসাব কথা বিকাল পাঁচটায, তিনি চারটার মধ্যেই চলে এলেন। তার সঙ্গে অসম্ভব বেঁটে অতিরিক্ত মোটা এক মহিলা। ইনিই সম্ভবত ছেলের মা। আরেকজন তার মত বেটে কিন্তু দারুণ রোগা ছেলের ফুফু হবেন। বেহানা আপা বকুলকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল শাড়ি পরতে বলেছিলাম না? এখনো স্কুলের ড্রেসই পরে আছিস? মাথায় বুদ্ধি-শুদ্ধি কিছু আছে না সবটাই গোবর ?
আপনি বলেছিলেন পাঁচটার সময় আসবেন।
পাঁচটার সময় আসব বলেছি বলেই তুই পাঁচটা বাজার দুমিনিট আগে কাপড় বদলাবি? আর তুই পা ছুয়ে সালাম করলি না কেন?
এখন করব?
এখন করবি কোন অজুহাতে? যাবার সময় করিস। আর মুখ এমন আমসি করে আছিস কেন? হাসিমুখে থাক। তাই বলে কার্য কথায় হাসার দবকার নেই।
ছেলের মাকে বকুলের পছন্দ হল। খুব রসিক মহিলা। ছোটখাটো জিনিস নিয়ে মজার মজার রসিকতা করতে লাগলেন এবং এক ফাঁকে বকুলকে বললেন আমাকে দেখে অনেকেই মনে করে আমার ছেলেমেয়েগুলি বোধ হয় আমার সাইজের। আসলে তা না, ওরা সবাই ওদের বাবাব মত লম্বা। তবে আমি নিশ্চিত আমার নাতিগুলি হবে আমার সাইজের। এই বলে তিনি খুব হাসতে লাগলেন। হাসি এমন আন্তরিক যে সবাই তাতে যোগ দিল। বকুলের সঙ্গে তার কথাবার্তা হল খুবই কম। একবার শুধু জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ভাল নাম কি মা? তার উত্তর শোনার জন্যেও অপেক্ষা করলেন না, অন্য প্রশ্ন করলেন। বেশ মহিলা।
যাবার সময় বকুল পা ছুঁয়ে সালাম করতেই তিনি তাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলেন। অনেক’দিন বকুলকে এমন ভাবে কেউ আদর করেনি।
মামুন বলল কি কেমন দেখছ? বাসা পছন্দ হয়? মুনা এতটা আশা করেনি। সে মুগ্ধ কণ্ঠে বলল, খুবই সুন্দর। তুমি মোটামুটি বলেছিলে কেন? মামুন হাসতে শুরু করল।
এস পেছনের বারান্দাটা দেখি।
পেছনেও বারান্দা আছে নাকি?
থাকবে না মানে। এখন বল বাসা কেমন?
চমৎকার! সত্যি চমৎকার।
একটু দূর হয়ে গেল। তাই না?
হোক দূর।
বসবার কোনো ব্যবস্থাই নেই। মামুন পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসল–জিনিসপত্র কিনে ঘরদুয়ার গোছাও এখন। চল আজ ফেরার পথে বড় দেখে একটা খাট কিনে ফেলি।
তোমার মাথায় শুধু খাট ঘুরছে।
তা ঘুরছে। ফোমের একটা গদি কিনিব বুঝলে মুনা। সাড়ে নশ টাকা দাম।
বাজে খরচ করার পয়সা আমাদের নেই।
ঐটা আমি কিনবাই, তুমি যাই বল না কেন। দাঁড়িয়ে আছ কেন বাস।
মামুন হাত ধরে মুনাকে টেনে পাশে বসাল। কেমন নির্জন চারদিক। একটু যেন গা ছমছম করে। মুনা ক্ষীণ স্বরে বলল হাত সরাও প্লিজ।
এ রকম করছ কেন তুমি? আমার ওপর বিশ্বাস নেই তোমার?
মুনা জবাব দিল না। মামুন তাকে কাছে টানল। গাঢ় স্বরে বলল এমন শক্ত হয়ে আছ কেন? কেউ তো দেখছে না।
চল আজ যাই, সন্ধ্যা হয়ে আসছে।
হোক সন্ধ্যা, তুমি বস তো।
তুমি এ রকম কর, বসতে ভাল লাগে না।
কিচ্ছু করব না তুমি সহজ হয়ে বস।
ওয়ার্ড অব অনার?
হ্যাঁ, ওয়ার্ড অব অনার। শুধু আমার হাত থাকবে তোমার হাতে। নাকি তাতেও আপত্তি?
না তাতে আপত্তি নেই।
মামুন গাঢ় স্বরে বলল চল তাড়াতাড়ি বিয়েটা সেরে ফেলি। আর ভাল্লাগছে না। আগে যে রকম কথা ছিল সে রকমই করি। কাজীর অফিসে গিয়ে ঝামেলা মিটিয়ে দি।
মামা রাজি হবে না। ছোট করে হলেও একটা অনুষ্ঠান করতে হবে। মুনার কথা শেষ হবার আগেই মামুন তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। মুনা কোন বাধা দিল না। তারা সন্ধ্যা না মিলানো পর্যন্ত থাকল সেখানে।
রহস্যময় কিছু সময় কাটল তাদের।
মুনা রোজ ভাবে সকাল সকাল ঘুমুতে যাবে কিন্তু রোজই দেরি হয়। আজও দেরি হল। বারোটার সময় বাতি নেভাতে যেতেই বকুল বলল, একটু পরে আপা। আমার পাঁচ পৃষ্ঠা বাকি আছে। মুনা বিরক্ত স্বরে বলল–মশারির ভেতরে বসে গল্পের বই পড়িস কেন? চোখ নষ্ট হবে। আর প্রতিদিন একটা করে বই জোগাড় করিস কোথেকে?
ফজলু ভাই এনে দেয়।
আমি বারান্দায় বসছি। বই শেষ হলে ডেকে দিস।
আজ গরম নেই। আশ্বিনের শেষাশেষি। শেষ রাতের দিকে ভাল ঠাণ্ডা পড়ে। মুনা ক্যাম্পখাটে বসে অপেক্ষা করতে লাগল। পাঁচ পৃষ্ঠা বাকি কথাটা মিথ্যা। অনেকখানিই বাকি। মুনাকে ডাকতে কেউ আসে না।
শওকত সাহেবকে বারান্দার দিকে আসতে দেখা গেল। তিনি মুনাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, অন্ধকারে বসে আছিস কেন? সাড়ে বারোটা বাজে।
এমনি বসে আছি। তুমি নিজেও তো অন্ধকারে হাঁটাহাঁটি করছো। কিছু খুঁজছো নাকি?
দঁড়ি আছে?
দঁড়ি দিয়ে কি করবে?
মশারি খাটাব।
মশারি তো খাটানোই আছে। আবার নতুন করে খাটাবে কি?
শওকত সাহেব থেমে থেমে বললেন বসার ঘরে বিছানা করেছি। আজ থেকে আলাদা শোব।
কেন?
প্রত্যেক দিন রুগীর সাথে শুয়ে শুয়ে শরীরটাই আমার খারাপ হয়ে গেছে।
শওকত সাহেব বিরক্তির ভঙ্গি করে বসার ঘরের দিকে গেলেন। সেখানে সত্যি সত্যি একটা বিছানা করা হয়েছে। নোংরা একটা মশারি খাটানোর চেষ্টাও হচ্ছে। মশারির তিন কোণ শিথিলভাবে ঝুলছে। দড়ির অভাবে চার নম্বর কোণাটির গতি হচ্ছে না। মুনা বলল দুপুর রাতে দঁড়ি পাওয়া যাবে না। তুমি একটা কয়েল জ্বালিয়ে শুয়ে থাক।
কয়েল আছে?
আছে, এনে দিচ্ছি। আচ্ছা মামা, সত্যি করে বল তো তোমার কি হয়েছে?
কি আবার হবে? রুগীর সাথে ঘুমাতে চাই না। এর মধ্যে হওয়া-হওয়ির কি আছে?
এই কথা না। তুমি নাকি প্রতিদিন দুপুরে অফিস-টফিস বাদ দিয়ে ঘরে এসে বসে থাক?
কে বলেছে, লতিফা?
হ্যাঁ। ব্যাপার কি?
ব্যাপার কিছু না। অফিসে একটা ঝামেলা যাচ্ছে।
ঝামেলা গেলে তো সেখানেই বেশিক্ষণ থাকা উচিত। কি ঝামেলা বল?
শওকত সাহেব বিরক্ত স্বরে বললেন, ভ্যাজোব ভ্যাজোব করিস না। কয়েল জ্বালিয়ে দিয়ে যা। আর দেখ হাতপাখা পাওয়া যায় কি না। বিশ্ৰী গরম।
গরম কোথায়? বেশ তো ঠাণ্ডা।
শওকত সাহেব গুম হয়ে বসে রইল। এখন তিনি আর কথা-টথা বলবেন না। মুনা কয়েল আনতে গেল। মামির ঘরের ড্রয়ারে এক প্যাকেট কয়েল আছে।
লতিফা জেগে ছিলেন। মুনা ড্রয়ার খুলতেই তিনি ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, তোর মামা আলাদা ঘুমাচ্ছে কেন রে?
এই ঘরে গরম লাগে। বাতাস-টাতাস নেই।
ফ্যান আছে তো।
ফ্যানের বাতাসে তার ঘুম হয় না। একেক জনের একেক স্বভাব।
লতিফা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, এতদিন তো ঘুম হয়েছে। আজ হবে না কেন? বলতে বলতেই তার গলা ভারী হয়ে এল। মুনা এসে বসল বিছানার পাশে। লতিফা বললেন, এক সময় তোর মামা আমাকে বিয়ে করার জন্যে কত কাণ্ড করেছে।
এই গল্প মুনার জানা। মামির কাছ থেকে অসংখ্যাবার শুনেছে। আজ রাতে আরেকবার হয়ত শুনতে হবে।
মুনা, কি সব পাগলামি কাণ্ড যে সে করেছে। একবার শুনলাম সে বিষ খাবে। এক বোতল র্যাটম না কি যেন জোগাড় করেছে। আমি ভয়ে বাঁচি না। কি কেলেঙ্কারি কাণ্ড! বাড়িতে সবাই দোষ দিচ্ছে আমাকে। আমি কি জানি বল? আমার সঙ্গে কোনোদিন তার একটা কথাও হয়নি।
বলতে বলতে শাড়ির আঁচলে লতিফ চোখ মুছলেন। প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে মুনা বলল, বকুলের হবু শাশুড়ী নাকি লম্বায় দেড় ফুট? বিয়ের ডেট-ফেট ফেলে দিয়েছ নাকি মামি?
না ডেট হয়নি। বিয়ে নিয়ে কোনো কথাবার্তাই হয়নি।
দুই বেয়ানে কি নিয়ে গল্প করলে?
লতিফা খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। সম্ভবত মনে করতে চেষ্টা করছেন। কিছুই মনে করতে পারলেন না। মুনা বলল, শুয়ে থাক মামি। বাতি নিভিয় দেই। লতিফা চাপা স্বরে বললেন, আমি বেশিদিন বাঁচব না রে।
বুঝলে কিভাবে?
কয়েক’দিন আগে স্বপ্নে দেখলাম আমি আর তোর মা দুজনে ভাত খাচ্ছি। স্বপ্নে মরা মানুষদের সঙ্গে খেতে বসা খুব খারাপ। যে দেখে সে আর বাঁচে না।
কি দিয়ে ভাত খাচ্ছিলে?
লতিফা জবাব দিলেন না। চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলেন। মুনা বাতি নিভিয়ে বের হয়ে এল। বকুলের পাঁচ পৃষ্ঠা এখনো শেষ হয়নি। মুনা কোনো কথা না বলে বাতি নিভিয়ে দিল। বকুল বলল, আর একটা পাতা। আপা, প্লিজ।
কোনো কথা না, ঘুমো।
এই পাতাটা শেষ না করলে আমার ঘুম আসবে না।
ঘুম না এলে জেগে থাক। কথা বলিস না। কি বই এটা?
উপন্যাস।
কার লেখা?
সতীনাথ ভাদুড়ির অচিন রাগিনী। ফজলু ভাই এনে দিয়েছে লাইব্রেরি থেকে।
ভাল নাকি খুব?
মোটামুটি।
মোটামুটি? তুই যেভাবে পড়ছিস তাতে তো মনে হয় রসগোল্লা ধরনের উপন্যাস।
বকুল খিলখিল করে হেসে উঠে জড়িয়ে ধরল। মুনাকে। মুনা বিরক্ত স্বরে বলল, হাত উঠিয়ে নে। গরম লাগছে। বকুল হাত সরালো না। আরো কাছে ঘেঁষে এসে বলল, তুমি এত ভাল কেন মুনা আপা?
জানি না কেন। বিরক্ত করিস না।
বকুল মৃদু স্বরে বলল, একটা গল্প বল না আপা।
কি মুশকিল, রাত দেড়টার সময় গল্প কিসের?
একটা বল আপা। তোমার পায়ে পড়ি? ভূতের গল্প। সত্যি সত্যি তোমার পায়ে ধরছি কিন্তু।
আহ কেন সুড়সুড়ি দিচ্ছিস?
আপা প্লিজ, প্লিজ।
মুনাকে গল্প শুরু করতে হল। ওপাশের বিছানা থেকে বাবু ক্ষীণ স্বরে বলল, একটু জোরে বল আপা, আমিও শুনছি। মুনা অবাক হয়ে বলল, এখনো জেগে আছিস?
হুম, ঘুম আসছে না, কি করব?
বাবু অস্পষ্ট ভাবে কি যেন বলল। পরিষ্কার বোঝা গেল না। মুনা উঁচু গলায় বলল–কি বলছিস ভাল করে বল। বোবা ধরেছিল?
হ্যাঁ।
কাল সকালে মনে করিস তোকে একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।
ঠিক আছে।
গল্প শেষ হতে হতে অনেক রাত হয়ে গেল। বকুল বলল, বাথরুমে যেতে হবে তুমি একটু দাঁড়াও। বাবুর ও বাথরুম পেয়ে গেল। বাবু বলল, আজ না ঘুমিয়ে সারারাত গল্প করলে কেমন হয় আপা? মুনা বিরক্ত স্বরে বলল, ফাজলামি করিস না, বাথরুম শেষ করে ঘুমুতে যা। আর একটি কথাও না।
তারা তিনজন দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েই দেখল। শওকত সাহেব উবু হয়ে বারান্দায় বসে আছেন। অন্ধকার বারান্দা। তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট শুধু উঠানামা করছে। মুনা ডাকল মামা! তিনি ফিরে তাকালেন। কোনো উত্তর দিলেন না।
একা একা কি করছো মামা?
কিছু করছি না।
শওকত সাহেব নিঃশব্দে ঘরের ভেতর ঢুকে গেলেন। বকুল চাপা স্বরে বলল, বাবার কি হয়েছে মুনা আপা? মুনা বলল, কিছুই হয়নি। ঘুম আসছে না। তাই বসে ছিল বারান্দায়। কেন জানি বকুলের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। বাবার বসে থাকার ভঙ্গিটা কেমন দুঃখী দুঃখী। তার মনে হল বাবা লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদছিল। মানুষের কত রকম গোপন দুঃখ থাকে। তার নিজেরও আছে। প্রায়ই সে এ রকম একা একা কাঁদে। তার মত দুঃখ তো বাবা-মায়েদেরও থাকতে পারে। ভাবতে ভাবতে বকুলের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। অল্পতেই তার কান্না পায়।
০৮. জলিল মিয়ার চায়ের দোকানে
সকাল ন’টার মত বাজে।
বাকের জলিল মিয়ার চায়ের দোকানের সামনে বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। কড়া রোদ বাইরে। বাকেরের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। জলিল মিয়া ডাকল–বাকের ভাই, আসেন চা খান। বাকের জবাব দিল না। সব কথার জবাব দেয়া ঠিক না। এতে মানুষের কাছে পাতলা হয়ে যেতে হয়। সে এগিয়ে গিয়ে পান-বিড়ির দোকানটার সামনে দাঁড়াল। বেশ কয়েকজন কাস্টমার দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, দোকানদার সবাইকে বাদ দিয়ে হাসি মুখে জিজ্ঞেস করল, কি দিব বাকের ভাই?
সিগারেট দে।
ফাইভ ফাইভ?
বাকের এমন ভাবে তাকাল যেন সে দারুণ বিরক্ত হয়েছে। তাকে ক্ষমা করে দেয়ার ভঙ্গিতে বলল, অন্য কোনো সিগারেট খাই? দোকানদার জিবে কামড় দিয়ে একটা সিগারেট বের করল। বাকের গম্ভীর গলায় বলল, এক প্যাকেট দে। সে একটা চকচকে একশ টাকার নোট ছুড়ে ফেলল।
আজ তার মন নানান কারণে খারাপ হয়ে আছে। গত রাতে খবর পাওয়া গেছে। ইয়াদ চাকরি পেয়েছে। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা ইয়াদের সঙ্গে ওঠাবসা অথচ এই খবরটা ইয়াদ তাকে দেয়নি। অন্যের কাছে জানতে হল। খবরটা যাচাই করবার জনে সে সাত সকালে গিয়েছিল। ইয়াদের বাড়ি। ইয়াদ হাই তুলে বলল, আর কতদিন এমনি এমনি ঘুরব? আর চাকরিটাও খারাপ না। ঘোরাঘুরি আছে। টি এ ডি এ পাওয়া যায়।
কবে থেকে চাকরি?
সামনের মাসের এক তারিখ থেকে। দেরি আছে। চল যাই চা খেয়ে আসি। নাশতা করেছিস?
চা খেতে খেতেই বাকের একবার বলল, আমরা চারজন মিলে যে স্পেয়ার পার্টস-এর দোকান দেব বলেছিলাম তার কি?
আরে দূর এইসব কি আর হয় নাকি? দুইজন তো ভোগেই গেল, বিয়ে-শাদী করে একেবারে গেরস্ত।
তুই আর আমি দুইজনে মিলে করতে পারতাম।
পয়সা কই?
