ছেলেটা পর্ব-০৬ হুমায়ূন আহমেদ

ছেলেটা পর্ব-০৬

আমার সঙ্গে আর কথা বলবে না। প্লিজ।লুতপাইন ফিসফিস করে বলল, বড় হয়ে আমি কী করব জানো? বড় হয়ে আমি তোমাকে বিয়ে করব।রনি একদৃষ্টিতে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে। এমন ভাব করছে যে সে লুতপাইনের কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছে না।লুতপাইন বলল, আমি বাবাকে বলেছি যে বড় হয়ে তোমাকে বিয়ে করব। বাবা বলেছেন, Ok. রনি কঠিন গলায় বলল, চুপ।

মিস তখন রনির দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যালো রনি, তুমি দেখি ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছ। ক্লাসের সময় কথা বলা ঠিক না রনি।রনি বলল, সরি মিস।মিস লুতপাইনকে কিছুই বলেন নি, তারপরেও লুতপাইন দাঁড়িয়ে অবিকল রনির মতো বলল, সরি মিস।ক্লাসের সবাই হেসে ফেলল। এমনকি মিস নিজেও হাসলেন।

টিফিন টাইমটা রনির খুব খারাপ কাটে। তখন তার প্রধান চেষ্টা থাকে লুতপাইনের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকা। সেটা কখনো সম্ভব হয় না। লুতপাইন খুঁজে খুঁজে বের করে ফেলে। আজ রনি ঠিক করেছে সে এমনভাবে লুকিয়ে থাকবে যেন লুতপাইন কিছুতেই তাকে খুঁজে না পায়। টিফিনের ঘণ্টা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রনি বইয়ের ব্যাগ নিয়ে ছুটে বের হয়ে গেল।

চট করে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। যা ভাবছে তাই। লুতপাইন তার দিকে তাকিয়ে দ্রুত ব্যাগ গোছাচ্ছে। কী সর্বনাশ!স্কুল কম্পাউন্ডে থাকা যাবে না। যেখানেই যাবে লুতপাইন তাকে খুঁজে বের করবে। স্কুল কম্পাউন্ডের বাইরে চলে যেতে হবে। দারোয়ান সেটা করতে দেবে না। গেটে আটকাবে। দারোয়ানকে বলতে হবে গেটের বাইরে আমার গাড়ি আছে, গাড়িতে আমার স্কেল। আমি স্কেল আনব। দারোয়ান রনির ড্রাইভারকে চেনে।

রনি দেখেছে এই দুজন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করতে করতে চা খাচ্ছে। কাজেই দারোয়ান তাকে ছেড়ে দেবে। সে করবে কী টিফিনের সময়টা গাড়িতে বসে থাকবে। টিফিন পিরিয়ড শেষ হলে স্কুল কম্পাউন্ডে ঢুকবে। একটা সমস্যা অবশ্যি থেকেই যায়–লুতপাইন তাকে খুঁজে না পেয়ে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করতে পারে। এই মেয়ের যা বুদ্ধি!রনি কোনো ঝামেলা ছাড়াই স্কুল কম্পাউন্ডের বাইরে চলে এল। গাড়ির কাছে গেল।

ড্রাইভার গাড়ির আশপাশে নেই। গাড়ি তালা মেরে কোথায় যেন গেছে। রনিদের গাড়ির পাশে ভক্সওয়াগান গাড়িটাও আছে। এই গাড়ির ড্রাইভার নেই। ড্রাইভারের সঙ্গীও নেই। সবাই দল বেঁধে কোথাও আড্ডা দিতে গেছে বলে মনে হয়। দুই গাড়ির দুই ড্রাইভার একজন আরেকজনের শত্রু হবার কথা। কিন্তু তাদের মধ্যেও খুব খাতির। তারা একসঙ্গে চা খায়। সিগারেট টানে।হ্যালো রনি।রনি তাকিয়ে দেখে হাব্বত আলি রিকশায় বসে আছেন। রিকশা রনির দিকেই আসছে।

রনি আছ কেমন?

ভালো আছি।

বেড়াতে যাবে নাকি?

আমার ক্লাস আছে।

ছাত্রজীবনে এক আধবার স্কুল না পালালে স্কুল-জীবন সম্পূর্ণ হয় না। তাছাড়া আজকে টিফিনের পর তোমার কোনো গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসও নেই। গেমস, লাইব্রেরি, মিউজিক। এই তিনটাই তো–তাই না? আপনি কী করে জানলেন? একদিন গিয়েছিলাম না তোমাদের স্কুলে? রুটিন ঘেঁটে দেখলাম। তুমি কি উঠবে রিকশায়? রনি কিছু না বলে রিকশায় উঠে পড়ল। মন ঠিক আছে রনি? ঠিক আছে।

ঘোঁৎ চিকিৎসা লাগবে না?

না। আমরা কোথায় যাচ্ছি?

হাব্বত আলি বললেন, হাসপাতালে গেলে কেমন হয়? তোমাদের নাজমা মিস আছেন। তাকে দেখে এলাম। যাবে? রনি আগ্রহের সঙ্গে বলল, যাব।হাব্বত আলি বললেন, উনার অবস্থা ভালো না, তবে এখনো বেঁচে আছেন। দেশের বাইরে নিতে পারলে ভালো হতো।দেশের বাইরে নিচ্ছে না কেন?

বললেই তো নেয়া যায় না। টাকা লাগে রে বাবা, টাকা। টাকা উল্টালে কী হয় জানো? টাকা উল্টালে হয় কাটা। একটা চন্দ্রবিন্দু যোগ করলে কাটা হয়ে যায় কাঁটা। কাঁটা মানে কন্টক।রনি বলল, এইসব কী হাবিজাবি বলছেন? হাব্বত আলি নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, জগতটাই হাবিজাবি। বলেই সুর করে প্রায় গানের মতো গাইলেন–

ওপরে কন্টক দাও

নিচেতে কন্টক

ডালকুত্তাদের মাঝে করহ বন্টক।

রনি বলল, এই ছড়াটার মানে কী?

হাব্বত আলি বললেন, কোনো মানে নেই। চোখ বন্ধ কর। এখন আমরা কিছুক্ষণ শূণ্য ভ্রমণ করব। রনি সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেলল, বাহ্ সত্যি সত্যিই মনে হচ্ছে সে শূন্যে ভেসে যাচ্ছে। প্রথম দিনের চেয়েও আজকের শূন্যে ভাসাটা অনেক বেশি মজার হচ্ছে। এই মজার ব্যাপারটা লুতপাইনকে বললে হতো। সেও মজা পেত। লুতপাইনের কথা ভেবে হঠাৎ তার কেন জানি একটু খারাপ লাগল।হাব্বত আলি বললেন, মন খারাপ কেন রে ব্যাটা?

রনি বলল, মন খারাপ না। আপনি আমাকে ব্যাটা বললেন কেন? আদর করে বললাম।আমার বাবা আমাকে ব্যাটা ডাকত।কী ডাকত তোমার তো মনে থাকার কথা না।মনে আছে।ব্যাটা উল্টা করলে কী হয় জানো? ব্যাটা উল্টো করলে হয় টাবে। হাব্বত আলি সুর করে বললেন,

টাবে টাবে

দুটা ভাত খাবে?

আপনি এত হাবিজাবি কথা বলেন কেন?

বিরক্তি লাগছে?

লাগছে।

বিরক্তি কাটাবার একটা বুদ্ধি শিখিয়ে দেব?

দিন শিখিয়ে।

আজ না।

আজ না কেন?

আমরা হাসপাতালে চলে এসেছি। এইজন্যে আজ না।রনি এই প্রথম কোনো হাসপাতালে ঢুকেছে। হাসপাতালে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বলে একটা জায়গা। সেখানে মরণাপন্ন সব রোগীকে রাখা হয়েছে। নাকে নল, মুখে নল। নাজমা ম্যাডামের পুরো শরীরটা ব্যান্ডেজ করা, মাথায় ব্যান্ডেজ, মুখে ব্যান্ডেজ, শুধু চোখ দুটা খোলা। সেই চোখ বন্ধ।

রনির শরীর কাঁপতে লাগল। কী ভয়ঙ্কর অবস্থা! সে শক্ত করে হাত আলির হাত ধরে বলল, বাসায় যাব।হাব্বত আলি বললেন, অবশ্যই বাসায় যাবে। তবে তুমি যে মিসকে দেখতে এসেছ, এটা তাকে জানিয়ে গেলে তিনি হয়তো খুশি হবেন। মিসের কাছে গিয়ে বলো, মিস আমি রনি।

ভয় লাগছে।ভয় লাগার কিছু নেই, বলো।রনি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, মিস আমি এসেছি।নাজমা মিস সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেললেন। একটু মাথা কাত করে রনিকে দেখলেন। তার ঠোঁটের কোণায় সামান্য হাসির আভাস দেখা গেল।রনির কী যে খারাপ লাগল! সে বুঝতে পারছে তার চোখে পানি এসে যাচ্ছে। সে চায় না মিস তার চোখের পানি দেখেন। কিন্তু চোখের পানি সে আটকাতে পারছে না।

হাব্বত আলি সাহেবকে জিজ্ঞেস করতে হবে উনি চোখের পানি আটকাবার কোনো কৌশল জানেন কি-না। জানার তো কথা। উনার যা বুদ্ধি।রিকশায় ফেরার পথে রনি মন খারাপ করে থাকল। হাব্বত আলি বললেন, রনি, আমি কিন্তু আজ তোমাকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারব না।রনি বলল, কেন পারবেন না?

কারণ তোমাদের বাসায় হুলস্থুল পড়ে গেছে। পুলিশে খবর দেয়া হয়েছে। আমি যদি তোমাকে নামিয়ে দেই, পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে আমাকে হাজতে ঢুকিয়ে দেবে।হাজত কী? পুলিশ অপরাধীদের ধরে প্রথমে যেখানে রাখে তার নাম হাজত।ভয়ঙ্কর? খুবই ভয়ঙ্কর। হাজত হলো হাবিয়া দোজখের খালাতো ভাই।হাবিয়া দোজখ কী?দোজখের ইংরেজি হচ্ছে Hell এবং হাজত হচ্ছে হাবিয়া দোজখের First Cousin, এখন বুঝেছি?

হুঁ।আমি রিকশাওয়ালাকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছি। সে তোমাকে ঠিক তোমাদের বাড়ির সামনে নামিয়ে দেবে। ঠিক আছে? হ্যাঁ ঠিক আছে।একা যেতে ভয় পাবে না তো? ভয় পাব।পরের বার যখন তোমার সঙ্গে দেখা হবে, তখন ভয় দূর করার কৌশল শিখিয়ে দেব। ঠিক আছে? জি ঠিক আছে।

কয়েকবার ঘোঁৎ বলে দেখতে পার। ঘোঁৎ বললেও ভয় কাটার কথা।হাব্বত আলি রিকশা থেকে নামলেন। রিকশাওয়ালাকে ঠিকানা বুঝিয়ে ভাড়া দিয়ে দিলেন। রনিকে বললেন, তোমাকে একটা ললিপপ কিনে দেই। ললিপপ খেতে খেতে যাও।

রনি বলল, দিন।হাব্বত আলি রনিকে সবুজ রঙের একটা ললিপপ কিনে দিলেন। রনি বলল, থ্যাংকস।হাব্বত আলি বললেন, সবুজ রঙটা দেখে একটা কথা মনে পড়েছে। তোমার মিসকে যে গাড়িটা ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে গেছে সেটার রঙ ছিল সবুজ। তোমাদের বাসায় তো অনেকগুলি গাড়ি–সবুজ রঙের কোনো গাড়ি কি আছে?

রনি বলল, না।রিকশা চলতে শুরু করেছে। হাব্বত আলি রোদে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন।রনির বাবা মজিদ সাহেব রনিকে নিয়ে লাইব্রেরি ঘরে বসেছেন। তাঁর মুখ গম্ভীর। তিনি একটু পর পর আঙুল দিয়ে তার কপাল টিপে ধরছেন। রনির ধারণা তাঁর প্রচণ্ড মাথা ব্যথা। মাথা ব্যথা হলেই মানুষ এইভাবে টিপে।

রনি!

জি।

পুলিশ অফিসার আফসারউদ্দিন সাহেব এসেছেন। তিনি তোমার সঙ্গে আলাদা বসবেন। তার আগে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলব। প্রতিটি প্রশ্নের ঠিক জবাব দেবে।জি।টিফিন টাইমে তুমি আজ স্কুল থেকে পালিয়ে গেছ? পালিয়ে যাই নি। উনার সঙ্গে গেছি।আগে যে লোক তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল সেই লোক? রনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, না, অন্য একজন।অন্য একজন মানে?

কী বলো এইসব! লোকটা দেখতে কেমন? উনার গায়ের রঙ খুব ফর্সা। মাথায় ক্রিকেটারদের মতো ক্যাপ। গায়ে লাল চাদর।মজিদ সাহেবের মুখ হা হয়ে গেল। তিনি নড়েচড়ে বসলেন। এদিকওদিক তাকালেন। রনি স্পষ্ট বুঝতে পারছে তার এই মিথ্যা কথা উনাকে কাবু করে ফেলেছে। রনি ঠিক করল, এই মিথ্যাই সে চালিয়ে যাবে।লোকটা তার কোনো পরিচয় তোমাকে দিয়েছে?

না।পুরো ঘটনা বলো। কীভাবে তুমি স্কুল থেকে বের হলে? কীভাবে তার সঙ্গে চলে গেলে? কোনো ডিটেল বাদ দেবে না। এইভাবে পা দুলিও না। পা দোলালে আমার কনসেনট্রেসন কেটে যায়। এখন বলো।কী বলব? কীভাবে তুমি লোকটার সঙ্গে গেলে? উনি রিকশা নিয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। আমাকে দেখেই বললেন, এই ব্যাটা উঠে আয়। আমি রিকশায় উঠে গেলাম।তোমাকে ব্যাটা বলল?

জি।আর তুমি সঙ্গে সঙ্গে রিকশায় উঠে গেলে? জি। উনাকে আমার খুবই পরিচিত মনে হচ্ছিল তো এইজন্যে।পরিচিত মনে হচ্ছিল? জি।তোমরা কী করলে? আমরা অনেকক্ষণ রিকশায় করে ঘুরলাম। উনি আমাকে ললিপপ কিনে দিলেন। ললিপপ খেলাম। উনি ছড়া বললেন।

কী ছড়া বললেন?

উনি বললেন–টাবে টাবে, দুটা ভাত খাবে।

আবার বলো।

টাবে টাবে

দুটা ভাত খাবে।

তারপর কী হলো?

আমরা নাজমা মিসকে দেখতে হাসপাতালে গেলাম।

নাজমা মিসটা কে?

আমাদের একজন মিস। সবুজ রঙের একটা গাড়ি উনাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। উনি খুবই অসুস্থ। হাসপাতালে আছেন।লোকটা তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল? জি।কেন? একটু আগেই তো বলেছি–নাজমা মিসকে দেখতে নিয়ে গেলেন।সে তোমাকে বাসায় না নামিয়ে চলে গেল কেন? সেটা তো আমি জানি না।তুমি রিকশা করে একা একা এসেছ? জি।ভয় পাও নি?

একটু একটু ভয় পাচ্ছিলাম। তবে উনি আমাকে ভয় না পাবার একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছিলেন। মন্ত্রটা মনে মনে পড়লে ভয় কেটে যায়। কী মন্ত্র? ঘোঁৎ মন্ত্র। আবার বলো, কী মন্ত্র? ঘোঁৎ মন্ত্র।আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে আর প্রশ্ন করব না। পুলিশ ইন্সপেক্টর আফসারউদ্দিন সাহেব তোমার সঙ্গে কথা বলবেন। তার আগে হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা খাও। আফসার সাহেবকে আমি তোমার ঘরে পাঠিয়ে দেব।আচ্ছা।

রনি লাইব্রেরি ঘর থেকে চলে যাচ্ছে, মজিদ সাহেব একদৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁকে অসম্ভব চিন্তিত মনে হচ্ছে। চিন্তার প্রধান কারণ রনি যে ছড়াটা বলল সেই ছড়া। এই ছড়া রনির আসল বাবা বলতেন। রনিকে কোলে নিয়ে দোলাতে দোলাতে বলতেন–টাবে টাবে দুটা ভাত খাবে। রনির এই ছড়া মনে থাকার কোনো কারণ নেই। তাহলে ব্যাপারটা কী?

ভৌতিক কোনো ব্যাপার অবশ্যই না। তিনি মনে করেন না–রনির মৃত বাবা রনিকে নিয়ে রিকশায় ঘুরছেন। তবে কিছু একটা ঘটছে। সেই কিছুটা কী? রনিকে নাশতা দেবার সময় ইদরিস মিয়া গলা নিচু করে বলল, আফনেরে রিকশায় নিয়া যে ঘুরছে সে কে জানেন?

রনি বলল, না।কাউরে যদি না বলেন তাইলে বলতে পারি।আমি কাউরে বলব না।আল্লাহর নামে কসম কাটেন। বলেন, আল্লাহর কসম, কাউরে বলব না।আল্লাহর কসম, কাউরে বলব না।আফনেরে রিকশায় নিয়া ঘুরছে আফনের আসল পিতা।উনি তো মারা গেছেন।ঘটনা তো ঐখানেই। বড়ই জটিল ঘটনা।

মৃত মানুষ কি ফিরে আসতে পারে? ক্ষেত্র বিশেষে পারে ভাইজান। ক্ষেত্র বিশেষে পারে। আমি একদিন বড় সাহেবরে আপনের ঘরে দেখেছি। চেয়ারে বইসা দোল খাইতেছেন।সত্যি? যদি মিথ্যা বলি আমার মাথায় যেন বজ্রাঘাত হয়। বড় সাহেবের সঙ্গে আমার কথাবার্তাও হইছে।কী কথা হইছে?

আমারে জিজ্ঞাসা করেছেন–ইদরিস মিয়া, আছ কেমন? আরো অনেক আলাপ হইছে, সেইসব আপনেরে বলা যাবে না। খুবই জটিল অবস্থা ভাইজান। খুবই জটিল অবস্থা। বাড়িতে পুলিশ আনা হইছে–সিআইডি, ডিআইবি কোনো লাভ নাই।লাভ নাই কেন?

এইটা এখন পুলিশের বিষয় নাই। অন্য বিষয় হইয়া গেছে। মুনশি মওলানা কিছু করলেও করতে পারে। দেখি আপনের জন্যে কোনো তাবিজ কবচের ব্যবস্থা নিতে পারি কি-না। তাড়াতাড়ি নাশতা শেষ করেন। আপনের ঘরে পুলিশের অফিসার বসা।

আফসারউদ্দিন সাহেব রনির ঘরে ঢুকে খুবই মজা পাচ্ছেন। আগ্রহ নিয়ে রনির খেলনা দেখছেন। একটি খেলনা তাঁর মন হরণ করেছে। কাচের একটা পাখি তার সামনে রাখা বাটিতে চুমুক দিয়ে পানি খেয়েই যাচ্ছে। পাখির তৃষ্ণা দূর হচ্ছে না।তিনি রনিকে জিজ্ঞেস করলেন, এই খেলনাটা কি ব্যাটারিতে চলে?

রনি বলল, না।আফসারউদ্দিন বললেন, ব্যাটারি ছাড়া এটা কীভাবে হচ্ছে? রনি বলল, আপনি তো ডিটেকটিভ। আপনি বের করুন।সায়েন্সের ব্যাপার তো বুঝতে পারছি না। জিনিসটা খুবই ইন্টারেস্টিং।পাখিটার পানি খাওয়া বন্ধ করার কোনো উপায় আছে? হাত দিয়ে ধরলে পানি খাওয়া বন্ধ হবে। ছেড়ে দিলে আবার পানি খাওয়া শুরু করবে।

আফসারউদ্দিন এসেছেন রনিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। এখন তার কাজ হচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর হাত দিয়ে ধরে পাখির পানি খাওয়া বন্ধ করা, আবার হাত ছেড়ে দিয়ে পানি খাওয়ানো শুরু করা। রনি রকিং চেয়ারে দোল খেতে খেতে ভদ্রলোকের কাণ্ড দেখছে এবং বেশ মজা পাচ্ছে। কোনো বয়স্ক মানুষকে সে বাচ্চাদের খেলনা নিয়ে এভাবে খেলতে দেখে নি।

রনি বলল, আপনার একটা জিনিস কিন্তু আমার কাছে আছে।আফসারউদ্দিন বললেন, কী জিনিস? আপনার নকল দাড়ি। আজ যাবার সময় নিয়ে যাবেন।আমার নকল দাড়ি তোমার কাছে গেল কীভাবে? আপনি চিন্তা করে বের করুন কীভাবে আমার কাছে গিয়েছে। আপনি ডিটেকটিভ মানুষ। ডিটেকটিভদের অনেক বুদ্ধি হয়। ফেলুদার অনেক বুদ্ধি?

ফেলুদা কে?

ফেলুদা কে আপনি জানেন না?

না তো।

খুব নাম করা ডিটেকটিভ।

জানি না তো।

ফেলুদার খুবই বুদ্ধি। যত বড় ক্রিমিনাল হোক ফেলুদার হাতে ধরা পড়বেই। আপনি না এসে আমার কাছে যদি ফেলুদা আসতেন, তাহলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলতে পারতেন কোন সবুজ গাড়িটা নাজমা ম্যাডামের রিকশাকে ধাক্কা দিয়েছে। উনি সঙ্গে সঙ্গে সবুজ গাড়ি ড্রাইভারকে অ্যারেস্ট করে ফেলতেন।

আফসারউদ্দিন অবাক হয়ে বললেন, সবুজ গাড়ির ব্যাপারটা কী? এখানে সবুজ গাড়ি কোত্থেকে এল? রনি বলল, সেটা আমি আপনাকে বলব না। আপনি খুঁজে বের করুন।আর শুনুন, পাখির এই খেলনাটা আপনি নিয়ে যান। এটা আমি আপনাকে দিলাম। উপহার।

আরে না, তোমার খেলনা আমি কেন নেব? কী বলো তুমি!আপনাকে এই খেলনাটা নিতেই হবে। আপনি যদি না নেন, আমি আপনার সঙ্গে কোনো কথাই বলব না।আশ্চর্য ছেলে তো! আমি মোটেই আশ্চর্য ছেলে না। আমি আমার বাবার মতো হয়েছি।তোমার বাবা কি সবাইকে খেলনা দিয়ে বেড়াতেন?

 

Read more

ছেলেটা পর্ব-০৭ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *