হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-১৮

জামিল সাহেব ঘরে ঢুকলেন। মেয়ের বিছানায় পা তুলে বসলেন। তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। তিনি বললেন, তাের ঘরে সিগারেট খাবার অনুমতি আছে তাে? 

‘অনুমতি নেই, তবে তুমি খেতে পার।’ ‘জানালাটা ভাল করে খুলে দে, ধোঁয়া চলে যাবে।’

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে 

শ্রাবণী জানালা খুলে দিল। জামিল সাহেব বললেন, তাের সুন্দর বনের বাঘের খবর চলে এসেছে। লাস্ট সেনসাস রিপাের্ট। বাঘ-বাঘিনীর সংখ্যা সবই আছে। এই সঙ্গে 

স্পটেড ডিয়ারের সংখ্যাও আছে। এই যে কাগজটায় লেখা। 

“থ্যাংকস বাবা। মেনি থ্যাংকস।’ 

জামিল সাহেব সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বললেন, নবনীকে দেখছি না। নবনী কোথায়? 

শাহেদ ভাইয়ের সঙ্গে নদীর দিকে হাঁটতে গেছে।’ ‘ও দেখি সারাদিন হাঁটাহাঁটির মধ্যে আছে। তাের হাঁটতে ভাল লাগে না?’ 

না।’ ‘তাের পায়ের অবস্থা কি? ব্যথা সেরেছে

জামিল সাহেব চুপচাপ সিগারেট টানতে লাগলেন। শ্রাবণী বলল, বাবা, আমার মনে হয় তুমি আমাকে কিছু বলতে এসেছ। এখন বুঝতে পারছ না বলা ঠিক হবে কি-না। দ্বিধার মধ্যে পড়েছ। বলে ফেল। 

জামিল সাহেব বললেন, একটু আগে তুই যে কাণ্ডটা করেছিস তা আমার পছন্দ হয়নি। সেই কথাই বলতে এসেছি। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৮

‘কোন কাণ্ডের কথা বলছ? হারবােলাকে যে এক হাজার টাকা দিয়েছি, সেটা? 

হ্যা। এক হাজার কেন, ইচ্ছে হলে তুই পাঁচ হাজার টাকা দিবি—সেটা কোন কথা । কিন্তু যেখানে আমি দু’শ টাকা দিয়েছি সেখানে তুই আমাকে ডিঙিয়ে এক হাজার টাকা দিলি । তুই আমাকে ছােট করলি।’ 

বাবা, আমি ওর কাণ্ড-কারখানা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, আমরা যেমন মুগ্ধ হয়েছি, তুমিও লােকটাকে ঠিক সে রকম মুগ্ধ করবে। কিন্তু তুমি তাকে মাত্র দুশ টাকা দিলে । আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল।’ 

এই দরিদ্র দেশে দুশ টাকা মাত্র না মা! তাের কাছে মাত্র মনে হয়েছে। ওর কাছে এ ছিল অপ্রত্যাশিত ও প্রচণ্ড রকম খুশি হয়েছিল।’ 

যা, খুশি অবশ্যি হয়েছিল । কিন্তু তুমি তার খুশি হবার ক্ষমতা অতিক্রম করতে পারনি। আমি করেছি। এক হাজার টাকা পেয়ে কি রকম ভেউ ভেউ করে কাঁদছিল। ওর কান্না দেখে আমার নিজের চোখে পানি এসে গেল। যে কাজটা আমি করলাম সে কাজটা তুমি কেন করতে পারলে না? তােমার তাে টাকার অভাব নেই।’ 

টাকা থাকলেই সব সময় এমন দেয়া যায় না। পাবলিক ফিগারদের দিকে সবার চোখ থাকে। সবাই বলবে, জামিল সাহেব দু’হাতে টাকা ছড়ায়। কোথায় পায় এত টাকা?’। 

‘কে কি ভাববে না ভাববে তাই মেনে আমাদের চলতে হবে?” ‘তােমাকে না চললেও চলবে। কিন্তু আমাকে চলতে হবে।’ 

শ্রাবণী নিচু গলায় বলল, বাবা, আমি তােমাকে হার্ট করে থাকলে ক্ষমা চাচ্ছি । আমি কাউকেই হার্ট করতে চাই না। কিন্তু আমার ভাগ্য এত খারাপ যে সবাইকে হার্ট করি। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৮

জামিল সাহেব উঠতে উঠতে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। এটা এমন কিছু না। Let us forget it. 

 শ্রাবণী কাঁদছে। বাবা কঠিন কিছু বললেই তার চোখে পানি আসে। 

একটু আগে চাঁদ উঠেছে। আলাে এখনাে স্পষ্ট হয়নি। স্বপ্ন স্বপ্ন আলাে। নবনী এবং শাহেদ হাঁটছে। নবনী তার অত্যাসমত মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটছে। পায়ের নিচে চকচকে সাদা বালি। নবনীর মনে হচ্ছে চিনির দানার উপর দিয়ে হাঁটছে। খানিকটা বালি এনে জিভে ছোঁয়ালে মিষ্টি লাগবে। নবনী নিচু হয়ে কিছু বালি হাতে নিল । শাহেদ বলল, কি করছ? 

‘কিছু করছি না। বালি নিয়ে খেলছি। তুমি হাতে নিয়ে দেখ কি ঝকঝকে বালি । হাত পাত, তােমার হাতে কিছু বালি দিয়ে দি। | শাহেদ বলল, শ্রাবণীর মধ্যে তাে আছেই, তােমার মধ্যেও অনেক ছেলেমানুষি আছে। 

নবনী বলল, আমাদের সবার মধ্যেই আছে। তােমারও আছে। ‘থাকলেও চাপা পড়ে আছে। পাথর চাপা।’ ‘পাথরটা সরিয়ে ফেল। তারপর আমার সঙ্গে কিছু ছেলেমানুষি কর।’ শাহেদ হাসতে হাসতে বলল, কি করতে বলছ? 

তােমার যা করতে ইচ্ছা হয় কর। জুতা খুলে ফেলে চল আমরা ঐ চরে চলে যাই। মাঝখানে পানি খুব অল্প। হাঁটু-পানিও না। 

‘চল যাই।’ 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৮

তারা চরে গিয়ে উঠল। চরের বালি আরাে পরিষ্কার। ঝকঝক করছে । নবনী বলল, তােমার কাছে কি মনে হচ্ছে না সাদা চাদর বিছানাে?  

আমার কাছে বালি বিছানাে বলেই মনে হচ্ছে । ছেলেরা বাই নেচার প্র্যাকটিক্যাল ধরনের হয়। কল্পনা-বিলাস ছেলেদের এমনিতে কম? আমার আরাে কম। আমি হলাম ব্যবসায়ী মানুষ।’ 

ব্যবসায়ী মানুষের কল্পনাশক্তি থাকে না? 

‘খুব কম থাকে। তুমি একজন কবি-সাহিত্যকের নাম বলতে পারবে না যে ব্যবসায়ী। চরের বালি দেখে আমার জানতে ইচ্ছা হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে এই বালি নিয়ে বিক্রি করা যায় কি না।’ 

‘কেন বাজে রসিকতা করছ? এসাে বসি। ‘তােমার সুন্দর শাড়ি নষ্ট হয়ে যাবে না?” ‘হােক নষ্ট।’ 

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-১৯

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *