‘জি আম্মা। সামান্য জিনিসে স্যার খুশি হবেন ভাবি নাই । স্যার খুশি হয়েছেন । আমার একেবারে চোখে পানি এসে গেছে।’
সুরুজ মিয়ার চোখে আবার পানি এসে গেছে । সত্যি সত্যি পানি। একজন বয়স্ক লােক যার মাথার বেশির ভাগ চুল পাকা সে এত সহজে কেঁদে ফেলতে পারে? নবনী ভেবে পাচ্ছে না, এই লােকটা আসলেই কাঁদছে, না যে কোন পরিস্থিতিতে চোখে পানি আনার দুর্লভ ক্ষমতা আয়ত্ত করেছে?
জামিল সাহেব দরাজ গলায় বললেন, খুশি হবারই কথা। এতবড় মাছ আজকাল তো চোখে পড়ে না। মাছটার ওজন কত হবে মনে হয়?
‘ওজন করাই নাই স্যার। ওজন করায়ে নিয়ে আসি।
না, থাক থাক দরকার নেই।’
অবশ্যই দরকার আন্থে স্যার। আপনার মুখের কথা কুমের বাবা । ওসি সাহেব, মাছটা ধরেন তাে। একলা পারব না।’
দু জন মাছের উপর ঝাপিয়ে পড়ল। শূন্যে ঝুলিয়ে যে দ্রুততার সঙ্গে বের হয়ে গেল তাতে মনে হয় আগামী কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এমন না নিলে একটা বিপর্যয় ঘটে যাবে । জামিল সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন, তাের জন্যে একটা সারপ্রাইজ আছে।
কি সারপ্রাইজ?’ ‘বােস আমার পাশে । এখন অনুমান কর । ‘আমার M.Sc. রেজাল্ট হয়েছে?
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৪
উহ। শাহেদ এসেছে’ “কি বললে?
‘হা শাহেদ। আমি চেয়ারম্যান সুরুজ মিয়ার সঙ্গে গল্প করছিলাম, হঠাৎ দেখি সটকেস হাতে হেলতে দুলতে কে যেন আসছে। চেহারা দেখছি, তারপরেও বিশ্বাস হলে
যা ভেতরে যা।
নবনী ভেতরে গেল না। বসে রইল। বাবার সামনে থেকে উঠে যেতে এখন না লাগছে।
জামিল সাহেব বললেন, কি, এখন খুশি তাে? যা ভেতরে যা । নবনী নিচু গলায় বলল, যাৰ। তাড়া তাে কিছু নেই।
জামিল সাহেব সিগারেটের প্যাকেট বের করতে করতে আনন্দিত গলায় বললেন, ছােটখাট ব্যাপার নিয়ে তােরা যে ঝগড়া মাঝে মধ্যে করিস, আমি মীতিমত আতংকগ্রস্তু হই। তােদের বিয়ের ঝামেলা আমি এবার চুকিয়ে ফেলব। আর দেরি করা যাবে না।
বাবা, তােমাকে তাে বলেছি রেজাল্ট না হলে বিয়ে করব না।‘ | ‘আচ্ছা সেটা দেখা যাবে। রেজাল্টের খুব বেশি দেরি আছে বলে তাে মনে হয় না। এই সপ্তাহেই বের হবার কথা না? মা, আমাকে কফি দিতে বল তাে।’
নবনী উঠে গেল। ঘরের ভেতর ঢুকতে তার লজ্জা লাগছে । চট করে শাহেদের সামনে সে পড়তে চাচ্ছে না। নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে হবে। চুল এলােমেলাে হয়ে আছে। পা ভর্তি ধুলাে। নবনী ধরেই নিয়েছিল শাহেদের সঙ্গে তার দেখা হবে না। দেখা হলেও সৌজন্য কথাবার্তার মত হবে। “কেমন আছ?” “ভাল” জাতীয় অর্থহীন আলাপ ?
জাহানারা রান্নাঘরে। সমুচা ভাজছেন ? পনীরের সমুচা । ভাগ্যিস, ঢাকা থেকে পনীর নিয়ে এসেছিলেন। পীরের সমুচা শাহেদের খুব পছন্দ। সে মিষ্টি খেতে পারে না। ডাক বাংলাে ভর্তি হয়ে গেছে মিষ্টিতে। এত মিষ্টি কি করবেন তিনি জানেন না। ডাকবাংলােয় ফ্রিজ নেই। ইলেকট্রিসিটি যখন আছে একটা ফ্রিজ থাকতে পারত। তিনি ঠাণ্ডা পানি ছাড়া খেতে পারেন না। শীতকালেও তার বরফের কুচি মেশানাে ঠাণ্ডা পানি চান।
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৪
নবনী রান্নাঘরে ঢুকে বলল, মা, বাবা কফি চাচ্ছে । জাহানারা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, শাহেদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ‘এখনাে হয়নি।’
তুই এতক্ষণ ছিলি কোথায়? ‘একটু ঘুরতে গিয়েছিলাম।’
শাহেদ যে এসেছে শুনেছিস?‘
খা।‘
আমি কিন্তু তাের বাবাকে বলেছিলাম—শাহেদ চলে আসবে। আজ সকালেও কেন জানি মনে হয়েছে।‘
‘তােমার অসাধারণ ইএসপি ক্ষমতার জন্যে অভিনন্দন। এখন বাবাকে কফি করে দাও।‘
‘কফি দেয়া যাবে না। সবাইকে এক সঙ্গে চা–নাশতা দেব। তুই যা, শাহেদের সঙ্গে কথা বলে আয়।‘
‘তােমার কোন সাহায্য লাগবে না?‘
‘না, সাহায্য লাগবে না। আমি কবে তাের সাহায্য নিয়েছি? তুই রান্নাঘর থেকে যা তাে।’
রান্নাবান্নার ব্যাপারে জাহানারা কারাের সাহায্যই নেন না। ডাকবাংলােয় একজন বাবুর্চি আছে। তিনি নিজেও তাদের অনেক দিনের পুরানাে বুয়া মিলুকে সঙ্গে এনেছেন। এরা কেউ কিছু করছে না। শুকনাে মুখে দূরে দূরে ঘুরছে। এদের কারােরই খাবার কোন জিনিসে হাত দেয়ার হুকুম নেই। জাহানারার খারাপ ধরনের শুচিবায়ু আছে । নিজে তা স্বীকার করেন না। কেউ এই প্রসঙ্গে কিছু বললেও রেগে যান।
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৪
বাবুর্চিকে দিয়ে খাবার জিনিসে হাত না দেওয়ানাের পেছনে তার বক্তব্য হচ্ছে হাত দিয়ে তারা কখন কি করে তার ঠিক আছে। কিছুক্ষণ আগেই হয়ত নাক ঝেড়ে এসেছে। বেশির ভাগ মানুষই নাক ঝাড়ার পর হাত ঘােয় না। মুছে ফেলে। আর যদি–বা ঘােয়, ক’জন সাবান ব্যবহার করে। এরা অন্য জিনিসে হাত দিচ্ছে, দিক। কিন্তু বাবার জিনিসে হাত দেবে, সেই খাবার আমি খাব–তা হবে না।
মিলু বলল, আপনের গরম লাগছেতে সমুচা আমি ভাজি? জাহানারা বললেন, না। তুই দূরে থাক ।
Read More