হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-২২

তাহলে দয়া করে চা বানিয়ে নিয়ে এস। আমি কুয়ােতলায় যাচ্ছি। কুয়ােতলা বেশ একটা ইন্টারেস্টিং জায়গা। শ্রাবণীর কথা প্রথম বিশ্বাস করিনি। এখন দেখি কুয়ােতলায় বসে চা খেতে অন্যরকম লাগে।’ 

‘তুমি যাও কুয়ােতলায়, আমি চা নিয়ে আসছি।’ 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণেনবনী রান্নাঘরে ঢুকে দেখে জাহানারা ইতিমধ্যেই চুলায় কেতলি বসিয়ে ময়দা মাখছেন। লুচি তৈরি হবে। জাহানারা বললেন, তােকে এমন দেখাচ্ছে কেন রে নবু? 

‘কেমন দেখাচ্ছে?’ 

মনে হচ্ছে শরীর খুব খারাপ। রাতে ঘুম হয়নি?’ হয়েছে। জ্বর-টর আসেনি তাে নবু? 

‘দেখি কাছে আয়, গায়ে হাত দিয়ে দেখি।’ “তুমি তাে ময়দা মাখছ। গায়ে হাত দেবে কি করে? 

জাহানারা বললেন, তুই আমার গালের সঙ্গে তাের গাল লাগা । তাতেই বুঝব। নবনী এসে মাকে জড়িয়ে ধরে। জাহানারা নবনীর মুখ দেখতে পেলেন না। তিনি বুঝতে পারছেন নবনী কেঁপে কেঁপে উঠছে। তার বুকে একটা ধাক্কা লাগল । 

নবু, মা, কি হয়েছে তাের?’ “কেন জানি মা কিছু ভাল লাগছে না।’ 

ভাল না লাগার মত কিছু হয়েছে। 

না।’ ‘তুই তাে মাঝে মাঝে অকারণেই শাহেদের সঙ্গে ঝগড়া করিস। ঝগড়া হয়নি তাে?” 

না, ঝগড়া হয়নি। দুকাপ চা বানাও তাে মা।’ 

‘তুই বানিয়ে নিয়ে যা । আমার হাত বন্ধ । শাহেদের কাপে চিনি আধ চামচ বেশি দিবি। ও চিনি বেশি খায়। ঐ তাকের উপর টি-ব্যাগ আছে। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-২২

নবনী চা বানাচ্ছে। জাহানারা ময়দা মাখা বন্ধ করে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি অবশ্যি প্রায়ই মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। যত দিন যাচ্ছে, মেয়েটা ততই সুন্দর হচ্ছে। এত সুন্দর যে মাঝে মাঝে মেয়েটাকে তার রক্ত-মাংসের মানুষ বলেই মনে হয় না। 

নবনী বলল, মা, তােমার জন্যে এক কাপ চা বানাব? 

না।’ 

না কেন? খাও না মা। মেয়ের হাতে বানানাে চা খাওয়া যায়। এসাে, আমরা দু’জন বসে চা খাই।’ 

‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ 

নবনী শাহেদের চায়ের কাপ হাতে উঠে গেল । খাবার ঘরে গিয়ে ডাকল, মিলু বুয়া’! মিলু দৌড়ে এল । নবনী খানিকটা অস্বস্তির সঙ্গে বলল, এই চা-টা তােমার শাহেদ ভাইকে 

একটু দিয়ে আস তাে। কুয়ােতলায় আছে । পিরিচ দিয়ে ঢেকে নিয়ে যাও। 

মিলু চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বলল, আম্মার শইল রাইতে খুব খারাপ গেছে। ‘কি হয়েছে? মাথাত না-কি খুব যন্ত্রণা হইছে। বারিন্দায় এই মাথায় ঐ মাথায় হাঁটছেন।’ ‘ডাকলে না কেন আমাকে?’ ‘ডাকতে চাইছিলাম। আম্মা নিষেধ করল।’ 

তুমি চা নিয়ে যাও, মিলু বুয়া। ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।’ 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-২২

জাহানারা মেয়ের সঙ্গে বসে চা খাচ্ছেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না রাতে তার শরীর খারাপ করেছিল। তবে ভাঁকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। নবনী বলল, গত রাতে তােমার একেবারেই ঘুম হয়নি, তাই না? 

হয়েছে কিছু। চেয়ারে বসে বসে ঘুমিয়েছি।’ মিলু বুয়া বলছিল খুব না-কি মাথার যন্ত্রণা হচ্ছিল?’ মাথার যন্ত্রণা তাে সব সময়ই হয়। সেটা কিছু না। 

‘আমার মনে হয় ভালমত ডাক্তার দেখানাে উচিত। নয় তাে পরে হঠাৎ ধরা পড়বে মাথায় টিউমার হয়েছে। আমরা আগে কিছু বুঝতে পারিনি। এবার ঢাকা গিয়ে তুমি খুব ভাল করে চিকিৎসা করাবে।’ 

“আচ্ছা করা।’ কথা দিচ্ছ কিন্তু মা।’ ‘আম্মা।’ 

নবনী চা শেষ করে বাবার খোজে গেল। জামিল সাহেব এমনিতে খুব ভােরে ওঠেন। ফজরের নামাজ পড়েন। এখানে এসে নিয়মের ব্যতিক্রম হচ্ছে। তিনি ভােরে উঠতে পারছেন না। আজ তারও ব্যতিক্রম হয়েছে। তিনি ফজর ওয়াক্তে উঠে নামাজ পড়েছেন। এখন আবার ঘুম পাচ্ছে। ঘুমিয়ে পড়বেন কি-না ভাবছেন। নবনীকে ঢুকতে দেখে তিনি আনন্দিত গলায় বললেন, আমার বড় মেয়ে কেমন আছেন গাে? 

ভাল আছি, বাবা। দুটি কেমন লাগছে? খুব ভাল লাগছে।’ আজ তােদের প্রগ্রাম কি? স্পিড বােটে করে পাখি দেখতে যাব।’ 

যা কুয়াশা পড়েছে! রওনা হতে হতে বেলা হয়ে যাবে। আসল দৃশ্য কিছু দেখতে পাবি না।’ 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-২২

নকলটাই দেখব, বাবা। আসল দৃশ্যের চেয়ে নকল দৃশ্য সব সময় অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং হয়।’ 

জামিল সাহেব হাে হাে করে হাসলেন। মনে মনে বললেন, বাহ, মেয়েটা তাে খুব সুন্দর করে কথা বলল। মেয়ে দু’টার সঙ্গে কথা বলাই হয় না। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে মিটিং-এ। বাকি সময়টা আজেবাজে লােকদের তদবির শুনে। সিনিয়ারকে ডুবিয়ে জুনিয়ার প্রমােশন পেয়েছে, সেই তদবির। ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ায় বদলি করে দিয়েছে, বদলি ফেরানাের তদবির। একজন এসেছিল ওয়াসার পানির লাইন কেটে দিয়েছে– লাইন বসানাের তদবির।

সামান্য পানির লাইন বসানােয় মন্ত্রীর তদবির লাগে? ঘাড় ধরে লােকটাকে বের করে দেবার ইচ্ছা হয়েছিল। তা করেননি বরং হাসি মুখে তার সমস্যা শুনেছেন, এবং সেক্রেটারিকে বলেছেন ওয়াসার একজিকিউটিভ ইন্‌জিনিয়ারকে বলে দিতে। মন্ত্রী পর্যন্ত যারা পৌছতে পারে তারা ক্ষমতাবান মানুষ। এদের অগ্রাহ্য করতে নেই

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-২৩

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *